| 18 জুলাই 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য প্রবন্ধ:একা মোর গানের তরী: অতুলপ্রসাদ সেন

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

‘কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে’।
বাংলার দরদি কবি, সুরকার অতুলপ্রসাদ সেন চিরদিন বঙ্গবাসীর হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন। বাংলা সঙ্গীতজগতের একইযুগে তিনজন কবি সুরকার ও গীতিকার বলে সম্মানীত হয়ে থাকেন যে তিনজন তারা হলেন রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল ও অতুলপ্রসাদ। এদের মধ্যে অতুলপ্রসাদের সৃষ্ট সুর বাংলাগানকে অনন্য ধারায় শ্রীমন্ডিত করেছে সন্দেহ নেই। অতুলপ্রসাদের সৃষ্ট গানের অপূর্বভাষা ও সুরে আমরা যেন স্বপ্নরাজ্যের মধ্যে বসে আস্বাদন করি। সঙ্গীতে যে প্রধান গুণ সুর ও কথা তা অতুলপ্রসাদের গানের মধ্যে দিয়ে মুহুর্তে আমাদের হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে। তাঁর গানের অননুকরণীয় বৈশিষ্ট্য হলো বাংলাগানে ঠুংরির সৌন্দর্য ও মাধুর্য দিয়ে মীড়, তান সহযোগে গানের মধ্যে অপূর্ব রসসৃষ্টি করা। বাংলাগানে এর আগে যা দেখা যায়নি। অতুলপ্রসাদ বিনয়ের সঙ্গে দুঃখ করে বলতেন, তাঁর গানে রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলালের মতো পদলালিত্য ও ভাষার ঝঙ্কার নেই। তাঁর গানে সুরের ঐতিহ্য ভাষার দৈন্যকে ম্লান করে দেয়।
বাংলাদেশের ঢাকায় ২০ শে অক্টোবর ১৮৭১—এ অতুলপ্রসাদ সেনের জন্ম। তিনি বাল্যকালে পিতৃহারা হন। মাতামহ কালীনারায়ণ গুপ্তের কাছে তিনি প্রতিপালিত। অতুলপ্রসাদের মা হেমন্তশশী পুনর্বিবাহ করলে তিনি মনে আঘাত পান। যদিও অতুলপ্রসাদকে সৎপিতা দুর্গামোহন স্বস্নেহেই মানুষ করেন ও ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেতে পাঠান। বিলেতে অতুলের মামাতো বোন হেমকুসুমের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। মা—কে নিয়ে অতুলপ্রসাদের যে মনঃকষ্ট ছিল তাতে সান্ত¦না দেন হেমকুসুম। ফলে তাঁকে এক উজ্জ্বল নারী বলে মনে হলে হেমকুসুমকে তিনি বিবাহ করেন। এই বিবাহ হিন্দু ও ব্রিটিশ আইনে নিষিদ্ধ থাকায় তারা স্কটল্যান্ডে গিয়ে সেখানকার রীতিনীতি মেনে বিবাহ করেন। লন্ডনে অতুলপ্রসাদ পসার জমাতে পারেননি। নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়ে দুই পুত্রসন্তানকে নিয়ে সেখানে থাকলেও শেষপর্যন্ত ছোটোছেলে নিলীপ মারা গেলে একমাত্র পুত্র দিলীপকে নিয়ে তিনি ভারতে ফিরে আসেন।
আত্মীয়—স্বজনরা মামাতো বোনকে বিবাহ করার অপরাধে এড়িয়ে চললে তিনি তাঁর সহকর্মী বন্ধু মমতাজ হোসেনের পরামর্শে লক্ষ্মৌ চলে যান। সেখানে অতুলপ্রসাদ নতুন জীবনের সন্ধান পান। সেখানে তিনি খঁুজে পেলেনে নিজস্ব ভূমি। ব্যারিষ্টারিতেও সফল হলেন। পরিচিত হলেন এ.পি. সেন বা সেন সাহেব বলে। তিনি অন্তরঙ্গদের কাছে ‘অতুলদা’ বা ‘ভাইদাদা’। কাব্যচর্চা, হাসি, আনন্দ, গানে দিনগুলো তাঁর কেটে যাচ্ছিল সুন্দর। যেমন রোজগার করতেন তেমন দান করতেন। মা হেমন্তশশীকে নিজের কাছে এনে রাখা নিয়ে স্ত্রী হেমকুসুম—এর সঙ্গেঁ বিরোধ চরমে উঠলে স্ত্রী আলাদা বাড়িতে চলে যান। অতুলপ্রসাদ সেই বিচ্ছেদ যাতনা সহ্য করতে না পেরে লিখলেন, ‘বঁধুয়া নিদ্ নাহি অঁাখিপাতে’, ‘ওগো নিঠুর দরদী একি খেলা খেলছো অনুক্ষন’ ইত্যাদি। স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আর মিলন ঘটেনি। ১৯৩৪—এ ২৬ শে আগষ্ট নিঃসঙ্গ অবস্থায় অনেক বেদনা বুকে নিয়ে তিনি পরলোকগমন করেন।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দিলীপকুমার রায় বলেছিলেন, ভক্তির গানে ফুলের মত ফুটে উঠেছিলেন যে চারজন কবি তাঁরা ছিলেন, দ্বিজেন্দ্রলাল, রবীন্দ্রনাথ, রজনীকান্ত ও অতুলপ্রসাদ। দিলীপকুমারের নিজস্ব অনুভবে অতুলপ্রসাদ সেন হলেন ‘অনলংকৃত কবি’। ঈশ্বরপ্রেম, দেশপ্রেম ও নারীপ্রেম—— এই তিন প্রেমের গানেই তিনি সফল। দেশপ্রেমের গানগুলির মধ্যে বিখ্যাত গান—— ‘উঠগো ভারতলক্ষ্মী’, ‘হও ধরমেতে ধীর’, ‘বলো বলো বলো সবে’, ‘মোদের গরব, মোদের আশা/ আ মরি বাংলা ভাষা’। অতুলপ্রসাদ রবীন্দ্রনাথের এতোটাই ভক্ত ছিলেন যে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাবার পর তিনি গেয়েছিলেন, ‘বাজিয়ে রবি তোমার বীনে/ আনলো মালা জগৎ জিনে’।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয় ‘খামখেয়ালী সভা’—তে। সেই সভার বিবরণ দিতে গিয়ে অতুলপ্রসাদ বলেছেন, ‘‘খামখেয়ালী মজলিসকে মশগুল রাখিতেন পরম হাস্যরসিক দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। আমরা সকলে তাঁর হাসির গানের ফোরামে যোগ দিতাম, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কোরাসের নেতা।’’ রবীন্দ্রনাথ অতুলপ্রসাদকে ডাক পাঠালেন। অতুলপ্রসাদ ঘোর বর্ষায় পাহাড়ী অঞ্চল রামগড়ে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সেখানে বিকেল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত চলতো কবিতাপাঠ ও গানের আসর। অতুলপ্রসাদ সেখানে এক বিরল ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেন। তিনি দেখলেন ভোরবেলা রবীন্দ্রনাথ উদার প্রকৃতির মাঝখানে পাহাড়ে এক খন্ড শিলাসনে বসে গান গাইছেন, ‘এই লভিনু সঙ্গ তব সুন্দর হে সুন্দর’।
একবার অতুলপ্রসাদ লক্ষ্মৌতে নিজের বাসভবনে রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ জানান। অতুলপ্রসাদের স্ত্রী হেমকুসুম রবীন্দ্রভক্ত ছিলেন। তিনি তখন অভিমান ভুলে পুত্র দিলীপকে নিয়ে অতুলের বাড়িতে এসে রবীন্দ্রনাথকে সেবা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ অতুলপ্রসাদ ও হেমকুসুমের অভ্যর্থনায় আপ্লুত হয়েছিলেন। অতুল কবিকে বন্দনা জানিয়ে লিখলেন—— ‘‘এসো হে, এসো হে ভারতভূষণ’। গানটি গাইলেন প্রখ্যাত অভিনেতা যুবক পাহাড়ী সান্যাল। রবীন্দ্রনাথ চলে যেতে হেমকুসুম সপুত্র আবার চলে যান লালবাগ মহলায়। বিরহে অতুলপ্রসাদ গেয়ে ওঠেন——
‘‘আমার বাগানে এতফুল, তবু কেন চলে যায়?’’
গায়নরীতিতে অতুলপ্রসাদের অনুরাগ ছিল খেয়াল ও ঠুংরিতে। আর রবীন্দ্রনাথের ঝেঁাক ছিল ধ্রুপদীরীতিতে। অতুলপ্রসাদ দুশোর কাছাকাছি গান লিখেছেন। বঙ্গসাহিত্যের পরিমন্ডল থেকে দূরে থাকা, পেশাগত চাপ, সাংসারিক অশান্তি—র ফলে তাঁর সৃজনশীলতা হয়তো সেইভাবে স্ফুরিত হয়নি। অনেক সময়ে তাঁর গানে রবীন্দ্রপ্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যেমন——
‘‘রাতারাতি করল কে রে ভরা বাগান ফাঁকা?
রাঙা পায়ের চিহ্ন শুধু আঙিনাতে অঁাকা।’’
গানটি শুনলে রবীন্দ্রনাথের ‘আমার ভাঙা পথের রাঙা ধুলায়’ গানটির কথা মনে আসে।
অতুলপ্রসাদের গানে ট্যাডিশনাল রীতি খঁুজে পাওয়া যায়। যেমন—— খাম্বাজ রাগের ওপর একটি গান——
‘‘কে গো তুমি আসিলে অতিথি
কাঙাল বলিয়া করিও না হেলা।’’
ভৈরবী রাগের ওপর গান——
‘‘কী আর চাহিব বলো/ সবারে বাস্রে ভালো।’’ ইত্যাদি।
অতুলপ্রসাদ রবীন্দ্রগানে প্রভাবিত ছিল তা রাজ্যেশ্বর মিত্রের ‘বাংলার গীতিকার ও বাংলা গানের নানাদিক’ গ্রন্থে দেখতে পাই——
“তাঁর যে সব গান রবীন্দ্র প্রভাবিত বলে মনে হয়, সেগুলিতেও এমন কয়েকটি স্বকীয়তা আছে যাতে গানগুলিতে তাঁর ব্যক্তিত্ব কম পরিস্ফুট নয় । প্রায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো লাগে এমন গান——
‘আমাদের এ অঁাধারে’ বা ‘আপন কাজে অচল হলে’—— এইরকম দু’একটিই আছে”।
রবীন্দ্রনাথ ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থটি অতুলপ্রসাদকে উৎসর্গ করেন।
নজরুলের মতো অতুলপ্রসাদ গজলও লিখেছিলেন। যেমন—— ‘‘কত গান তো হলো গাওয়া’’, ‘‘তব অন্তর এত মন্থর’’, ‘‘কে তুমি ঘুম ভাঙায়ে’’ ইত্যাদি।
সেখানে অতুলপ্রসাদ লিখেছেন——
‘‘সহ¯্র বর্ষণধারা গিয়েছে ছড়ায়ে
প্রাণের আনন্দবেগে পশ্চিম উত্তরে,
দিন বঙ্গবীণাপাণি অতুলপ্রসাদ
তব জাগরনী গানে নিত্য আশীর্বাদ।’’
(২)
প্রেম বিরহের কবি ছিলেন অতুলপ্রসাদ। তিনি নিজেকে ‘কবি—বাউল’ আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ভেতরে সাধন ও বৈরাগ্য দুই ছিল। দাম্পত্য জীবনের জ্বালা—যন্ত্রণা—মাধুর্যে তিক্ত বিষে ভরে গিয়েছিল। যার অন্তর হাহাকার করে উঠেছে। তিনি বলেন——
‘‘আমারে এ অঁাধারে/ এমন করে চালায় কে গো?’’
আবার কখনো বলেন—— ‘‘কী আর চাহিব বলো, হে মোর প্রিয় / তুমি যে শিব তাহা বুুঝিতে দিয়ো”। যাকে তুমি ভালোবেসেছেন তাকে পাবার জন্য ব্যাকুল হন——
‘‘প্রেম অধরা/ কণ্ঠ মদিরা/ পরান পাত্র এ মধুরাত্রে ঢালো গো।’’
বাংলা গানে তিনি নিয়ে এলেন ঠুংরি ও গজল। বাঙালি করুণ ও মধুর রসে মুগ্ধ হলো। তাঁর গানকে সমৃদ্ধ ও অভিনব করে তুললো লাউনি, কাজরি, দাদরা ও খেয়াল। তিনি লিখলেন——
‘‘ওগো দুঃখসুখের সাথী, সঙ্গী দিনরাতি, সঙ্গীত মোর।
তুমি ভবমরু প্রান্তর মাঝে শীতল শান্তির লোর।’’
বৈভব, প্রাসাদোপম বাড়ি, দাসদাসী তবুও অতুলের শান্তি নেই। প্রজ্জ্বলিত প্রেমের প্রদীপ নেই। তিনি ঈশ্বরকে অঁাকড়ে ধরতে চান, তাঁর আশ্রয় চান। লিখলেন——
‘‘এত হাসি আছে জগতে তোমার,
বঞ্চিলে শুধু মোরে
বলিহারি বিধি, বলিহারি যাই তোরে।’’
কখনো গেয়ে ওঠেন ——
‘‘কেন এলে মোর ঘরে আগে নাহি বলিয়া,
এসেছ কি হেথা তুমি পথ তব ভুলিয়া।’’
তাঁর গানের সংকলন ‘গীতিগুঞ্জ’—তে গানের পাঁচটি পর্যায় আছে। যেমন—— দেবতা, প্রকৃতি, স্বদেশ, মানব ও বিবিধ। এমন প্রেমিক ও বিরহী কবি যিনি তিনি রাখলেন না প্রেমের পর্ব। এও তার অভিমান, ক্ষোভ। তাঁর ‘মানব’ পর্যায়ে গানে পাই প্রেমের গান। যেমন——
‘‘তাহারে ভুলিব বলো কেমনে?
গাঁথা যে সে তব শত গানে যতনে।’’
তাঁর গানে ভাঙা মন, ভাঙা কুঞ্জ, ভাঙা ভগ্ন মন্দির খুব বেশি পরিমানে পাওয়া যায়। যা তাঁর ভগ্ন হৃদয়ের ভাঙা প্রেমের বহিপ্রকাশ। যেমন——
১. ‘‘কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে।
হৃদি মোর উঠল কাঁপি চরণের সেই রণনে!’’
২. ‘‘ভাঙা দেউলে মোর কে আইলো আলো হাতে?’’
৩. ‘‘আমার মনের ভগনদুয়ারে
সহসা তুমি কে গো, তুমি কে?’’
ব্যাথিত কবি বলেন, ‘একা মোর গানের তরী/ ভাসিয়া দিলাম নয়নজলে।’
কবির প্রেমিক সত্তা আর্তকণ্ঠে বলে ওঠে,
‘‘কেন মোর গানের ভেলায়/ এলে না প্রভাত বেলায়?
হলে না সুখের সাথি/ জীবনের প্রথম দোলায়?’’
অসীম সম্পদের মাঝে বসেও রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,
‘একাকিনী কাঁদিতেছে বিরহ বেদনা।’
অতুলপ্রসাদের বিরহী মন বলে,
‘আমার বাগানে এতফুল, তবু কেন চলে যায়?’
মিলন অসম্ভব জেনেও অতুলপ্রসাদ মিনতি করেন,
‘‘মম মনের বিজনে আমি মিলিব তব সনে;
জাগরণে যদি পথ নাহি পাব, তুমি আসিও স্বপনে।’’
প্রেম বিরহে পাগলপারা হয়ে সঙ্গীতের মধ্যে তিনি আশ্রয় নেন। যেখানে তাঁর মর্ম বেদনা জর্জরিত হয়ে উঠেছে।——
১. ‘‘বলো গো সজনী, কেমনে ভুলিব তোমায়?
যতন যাতনা বাড়ায়।’’
২. ‘‘কেন দেখা দিলে যদি দেখা নাহি দিবে আর?
কেন গো জাগালে প্রেম পরাণে আমায়?’’
নিজেকে সান্ত¦না দিয়ে নিজেই বলেছেন——
‘তাই ভালো দেবী, স্বপনেই তুমি এলে।’
কবি ছিলেন একজন প্রেম—পিপাসিত চাতক। বৃষ্টি ও বর্ষার পটভূমিতে তাঁর বিরহ প্রেম অদ্ভুত ভাষারূপ পেয়েছে——
১. ‘‘বঁধু এমন বাদলে তুমি কোথা?
আজি পড়িছে মনে মম কত কথা।’’
২. ‘‘বঁধুয়া, নিদ্ নাহি অঁাখি পাতে,
আমিও একাকী, তুমিও একাকী
আজি এ বাদল—রাতে।’’
কখনো আবার নিজেকে প্রেমের কাছে নিজেকে অবহেলিত হতে দেখে তিনি বলেন——
‘‘বাঙালি বলিয়া করিও না হেলা।’’
(৩)
উনিশ শতকের বাঙালির স্বদেশপ্রেমের সূচনা। ক্ষুব্ধ প্রতিবাদী বঙ্গবাসী ইংরেজ শাসন আর শোষণে বীতশ্রদ্ধ হয়ে দেশকে মা বলে অনুভব করলো। তারা মানতে পারে না মায়ের বন্দিত্ব ও অপমান। পরাধীনতার যন্ত্রণায় রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় লিখলেন,
‘‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচতে চায় হে/ কে বাঁচিতে চায়?’’
বঙ্কিমচন্দ্র রচনা করলেন ‘বন্দেমাতরম্’ মন্ত্র। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন, ‘মিলে সবে ভারত সন্তান,’ ‘দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন, ‘মলিন মধুচন্দ্রিমা ভারত তোমারি’। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘অয়ি ভুবনমোহিনী’ এবং নিজের সুরে গাইলেন ‘বন্দেমাতরম্ / সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং’, গীতিকার—সুরকার দ্বিজেন্দ্রনাথ রায় গাইলেন, ‘ধনধান্য পুষ্পেভরা’, রজনীকান্ত সেন বললেন, ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’, নজরুল ইসলাম লিখলেন ও গাইলেন বিদ্রোহের গান ‘কারার ঐ লৌহকপাট’।
স্বদেশ চেতনার এই পটভূমিতে পেলাম মরমী কবি অতুলপ্রসাদ সেনকে। তিনি ভক্তি ও প্রেম—বিরহ গানের পাশাপশি লিখলেন স্বদেশ ভাবনার গান। বাংলাভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখলেন, ‘মোদের গরব মোদের আশা / আমরি বাংলাভাষা।’
তিনি দেশমাতৃকাকে বন্দনা করে শ্রদ্ধা জানালেন——
‘‘উঠগো ভারত—লক্ষ্মী, উঠ আদি—জগত—জন পূজ্যা
দুঃখ—দৈন্য সবনাশি করো দূরিত ভারত—লজ্জা।’’
বাংলার রাজনীতির ক্ষেত্র তখন দুইদলে ভাগ হয়ে যায়। মডারেট ও একস্ট্রিমিস্ট বা উগ্রপন্থী। অতুলপ্রসাদ কংগ্রেসী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি ১৯১৬ খ্রিঃ থেকে ১৯১৭ খ্রিঃ পর্যন্ত কংগ্রেসীকর্মী ছিলেন। পরে মডারেট দলে সঙ্গী হন। তিনি লিবারেল পার্টির সম্মেলনে এলাহাবাদে ১৯৩৩—এ বক্তৃতা দেন। সেখানে তিনি বলেন

“No Self-respecting Indian can help ruling humiliation for such an adjust position.’’

তাঁর গানে এই আবেদনের প্রকাশ দেখতে পাই——
‘‘হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে ধীর / হও উন্নত শীর—নাহি ভয়।
ভুলি ভেদাভেদ জ্ঞান হও সবে আওয়ান/ সাথে আছে ভগবান হবে জয়।
নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান/ বিবিধের মাসে দেখো মিলন, মহান;
দেখিয়া ভারতে মহাজতির উত্থান/ জনগন মানিবে বিষ্ময়।’’
অতুলপ্রসাদ চেয়েছিলেন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমুক্ত মানবসমাজ।
‘‘দেখ্ মা এবার দুয়ার খুলে
গলে গলে এনুমা, তোর
হিন্দু—মুসলমান দু’ছেলে।
এসেছি মা, শপথ করে
ঘরের বিবাদ মিটবে ঘরে
যাবনা আর পরের কাছে,
ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ হলে।’’
তিনি স্বদেশ ও স্বজাতিকে ভালো বেসেছেন। এপি সেন বা সেন সাহেবের দানবীর মূর্তি কে না জনে? রাজনীতির কারণ থেকে দীনদুঃখী মানুষ সবার জন্য তিনি ছিলেন দরাজ হস্ত। ধনীদরিদ্র ভেদাভেদ, জাতবিচার তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর কাছে জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেম, মানবতা মূল্যহীন নয়। যে কারণে তিনি বলেছেন——
‘‘জাতির গলায় জাতে ফাঁস/ধর্ম করেছে ধর্মনাশ
নিজের পায়ে পরলি পাশ/ দাসত্ব ঘোচে না ভাই।’’
মিশ্র খাম্বাজ রাগে জন্মভূমি স্বর্গাদপি গরীয়সী স্বাজাত্যবোধ ও দেশাত্মবোধ তিনি সৃষ্টি করলেন আরেক ‘ভারততীর্থ’——
‘‘বলো বলো বলো সবে, শত বীণা—বেণু—রবে,
ভারত আবার জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন রবে!
ধর্মে মহান হবে, কর্মে মহান হবে,
নব দিনমনি উদিবে আবার পুরাতন এ পুরবে।’
তাঁর দেশপ্রেম প্রীতি এক ঐক্যবোধে উজ্জ্বল——
‘‘এসো হে হিন্দু, এসো মুসলমান,
এসো হে পারসী, বৌদ্ধ খ্রিষ্টিয়ান,
মিল হে মায়ের চরণে।’’
অতুলপ্রসাদ একজন সফল আইনজীবী ও অনন্য গীতিকার। তাঁর জীবনের দুঃখকষ্ট গানের ভাষায় বাঙ্ময় হয়ে উঠেছিল। দেশপ্রেম ও ভক্তি তাঁর গানে থাকলেও বেদনা তাঁর গানের প্রধান অবলম্বন। তিনি যেসব গানে সুর দিয়েছেন সেগুলি অতুলপ্রসাদী সুর নামে খ্যাত। তাঁর মৃত্যুর পরেও মানুষ তাঁকে মনে রেখেছে ব্যারিষ্টার অতুলপ্রসাদ হিসেবে নয়, বাংলাভাষাপ্রেমী ও অসামান্য সঙ্গীতস্্রষ্টা অতুলপ্রসাদ সেন হিসেবে——
‘‘জল বলে চল, মোর সাথে চল
তোর অঁাখিজল, হবে না বিফল,’
কখনো হবে না বিফল
চেয়ে দেখ মোর নীলজলে শত চাঁদ করে টলমল।
জল বলে চল, মোর সাথে চল।’’

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত