Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,অপেরা হাউজ

তেত্রো দি সান কারলো অপেরা হাউজ । আরফাতুন নাবিলা

Reading Time: 4 minutes

প্রতিষ্ঠা

ইউরোপীয় শিল্পকলার ঐতিহ্যময় অংশ হচ্ছে অপেরা। মানুষকে অতীতের সঙ্গে সংযুক্ত করার অন্যতম মাধ্যমও এটি। পশ্চিমা সভ্যতার সবচেয়ে পুরনো এবং এখনো টিকে আছে এমন কোনো সংগীতের সঙ্গে যদি আপনি পরিচিত হতে চান, তাহলে ইউরোপের সবচেয়ে পুরনো অপেরা হাউজ ‘তেত্রো দি সান কারলো’র চেয়ে ভালো জায়গা আর কোথায় হতে পারে? ১৮ শতকে নির্মিত এই হাউজটি ইতালির নেপলসে অবস্থান করছে প্রায় ৩০০ বছর ধরে। ইতালীয় মজাদার পিৎজা নেপলস থেকেই প্রথম চালু হয়েছে এ কথা যেমন সত্যি, তেমনি ইতালির শৈল্পিক মাধ্যমের মধ্যে অন্যতম সুন্দর স্থাপত্যের নিদর্শন বলা যায় এই অপেরা হাউজকে।

তেত্রো দি সান কারলোর সূচনা হয় রাজা তৃতীয় চার্লসের সময়। তিনি ছিলেন বোরবন রাজবংশের একজন স্প্যানিশ ডিউক। ১৭৩৪ সালে সিসিলি ও নেপলসের রাজবংশগুলো জয় করেন চার্লস। নেপলসের রাজা সপ্তম চার্লস এবং পঞ্চম চার্লসের মুকুট দখল করে নেন তিনি। চার্লস যখন রাজ্যদখল শুরু করলেন, তখন তো একে সত্যিকারের রাজকীয় দেখা চাই! আর সেজন্য তিনি হাতে নিলেন নতুন নতুন উদ্যোগ। এসব উদ্যোগের মধ্যে প্রথমটি ছিল ১৭ শতকে নেপলসে নির্মিত অপেরা হাউজ ‘তেত্রো সান বার্তোলোমিও’। ১৮ শতক পর্যন্ত এই হাউজটি খুব বড় কিছু ছিল না বরং নিতান্তই একটি থিয়েটার ঘর হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল। চার্লস ইতালিতে অপেরার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। শুধু ইতালি নয়, বুঝতে পেরেছিলেন ইউরোপ জুড়েও অপেরার গুরুত্ব বোঝানো প্রয়োজন। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন শিল্পকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হলে শুরু করতে হবে এই অপেরা হাউজ দিয়েই। আর এটিও হতে হবে সভ্য, পরিশীলিত, বুদ্ধিদীপ্ত একই সঙ্গে জনগণের জন্য উন্মুক্ত। এই ভাবনার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হলো অপেরা হাউজ প্রতিষ্ঠার কাজ।

নির্মাণ ও উদ্বোধন

নতুন থিয়েটার নির্মাণের জন্য রাজা তৃতীয় চার্লস নিয়োগ দিয়েছিলেন স্প্যানিশ মিলিটারি আর্কিটেক্ট কর্নেল ব্রিগেডিয়ার জিওভান্নি অ্যান্তোনিও মেদ্রানোকে। অপেরা হাউজের নকশা করার পর সেটির খুঁটিনাটি সব বিষয় খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন প্রথম অপেরা হাউজের নকশাকার অ্যাঙ্গেলো কারাসেল। শুরুতেই তার কাজ রাজা তৃতীয় চার্লস এতটাই পছন্দ করেছিলেন যে, এই নকশাকার পরে বেশ কয়েক বছর অপেরা হাউজের আর্টিস্টিক প্রোডিউসার ও ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজার ছিলেন।

নতুনভাবে নির্মিত তেত্রো দি সান কারলো উদ্বোধন করা হয় ১৭৩৭ সালের ৪ নভেম্বর। এই অপেরা হাউজটি ভেনিসের ফেনিস থিয়েটার, মিলানের স্কালা অপেরা হাউজ এবং আমেরিকার সব থিয়েটারের চেয়েও পুরনো হিসেবে স্থান করে নেয়। নতুন নকশায় নির্মিত হওয়ার পর এখানে প্রথম প্রদর্শিত হয় ‘আকিয়াআইলিস ইন শিরো’। এটি নির্মাণ করেছিলেন বিখ্যাত ইতালিয়ান কম্পোজার পিয়েত্রো মেতাস্তাসিও ও ডোমেনিকো সারো।

স্থাপত্য ও নকশা

ঠিক কী কারণে মেদ্রানো আর কারাসেলের নকশা করা তেত্রো দি সান কারলো এত জনপ্রিয়তা পেল? বলা যায়, এই অপেরা হাউজ নকশার ভিন্নতাই একে সবার থেকে আলাদা করেছে। থিয়েটারের ভেতরের নকশা হর্সশু (ইউ শেইপ) আকৃতির। ১৭৩৭ সালে এমন ধরনের নকশা একেবারেই নতুন, এক কথায় আধুনিক। পরে অবশ্য নকশাটি অনেক জনপ্রিয়তা পায়। এই থিয়েটারে বসার জন্য ৩ হাজার ২৮৫টি আসন ছিল। বর্তমানে এই আসনসংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। অপেরা হাউজের বসার জায়গা বর্তমানে ছয় ভাগে বিভক্ত, যেগুলোর প্রতিটিতে বসার জন্য রয়েছে ১৮৪টি বক্স। থিয়েটারের সব মিলিয়ে মোট আসন ১ হাজার ৩৭৯। থিয়েটারের একদম মধ্যভাগে রয়েছে রয়্যাল বক্স, যেখানে বসে রাজা পুরো অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন। এতগুলো আসন ছাড়াও দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান দেখা যাবে, সে সুযোগও রয়েছে। এ কারণে থিয়েটারের ভেতরে দাঁড়ানোর জন্য অনেকখানি জায়গাও রাখা ছিল। বিশালাকার এই জায়গার কারণে বর্তমানে সবচেয়ে প্রাচীন এই অপেরা হাউজ প্রাচীন সেই সময়েও ছিল অন্যতম বৃহৎ অপেরা হাউজ।

আগুনে ক্ষতি

১৮১৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আগুন লাগলে মাত্র ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সান কারলো থিয়েটারের অনেকখানি পুড়ে যায়। আগুনের হাত থেকে শুধু থিয়েটারের বাইরের দিকের কাজ চলছে এমন দেয়াল সুরক্ষিত থাকে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে আবার নতুন করে তৈরি হতে সান কারলোর সময় লাগে ৯ মাস। এ সময় পুরো কাজে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন অ্যান্তোনিও নিকোলিনি। তিনি আসনগুলো রেখেছিলেন আগের মতো হর্সশু আকৃতির এবং বলতে গেলে মঞ্চের নবগঠনে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনেননি। নতুন বলতে শুধু খুব সুন্দর একটি ঘড়ি লাগিয়েছিলেন থিয়েটারে, যেন অনুষ্ঠান দেখতে এসে সময় নিয়ে কাউকে চিন্তা করতে না হয়। থিয়েটারের সিলিংয়ের মাঝখানের জায়গাটুকু সাজানো আছে অ্যান্তোনিও, জিওসিপ্পি ও জিওভান্নি কাম্মারানোর ছবি দিয়ে। এই আর্টিস্টদের ছবি মঞ্চের পর্দাতেও ছিল, পরে ১৮৫৪ সালে পরিবর্তন করা হয় জিওসিপ্পি মানসিলেনি ও সালভাতোর ফারজোলার আঁকা ছবি দিয়ে। সান কারলোর দেয়ালের যে অংশগুলোর আগুনে ক্ষতি হয়েছিল, সেগুলো ১৮৩৮-১৮৪২ সালের সময়ের মধ্যে নানা চিত্রশিল্পী দিয়ে রঙিন করে তোলেন স্থপতি ফ্রানসিসকো গাভুদান ও পিয়েত্রো গেসি। রাজকীয় এই থিয়েটারের আনুষ্ঠানিক স্থপতি হওয়ায় নিকোলিনি রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সব ধরনের সমন্বয় করেছেন। ১৮৪৪ সালে নিকোলিনির ছেলে ফাস্তো ও ফ্রানসিসকো মারিয়া ডেল জিওডিস অপেরা হাউজকে আরও আধুনিকীকরণ করেন।থিয়েটারের রয়্যাল প্যালেসের পূর্বদিকে বর্তমানে যে বৃহৎ আকারের হলঘরটি রয়েছে, সেটি ১৯৩৭ সালে নকশা করেছিলেন মিশেল প্লাতানিয়া। ১৯৪৩ সালে বোমা হামলায় এটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের পর আবার নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল।

নানা সময়ে অনুষ্ঠান

১৮১৫ সালের ৪ অক্টোবর ২৩ বছর বয়সী ওল্ড কম্পোজার জিওয়াচিনো রসনি সান কারলোতে তার প্রথম কাজ ‘এলিজাবেথ, কুইন অব ইংল্যান্ড’ পারফর্ম করেন।

এতে অংশ নিয়েছিলেন ইসাবেল কলরান, আন্দ্রিয়া নোজারি ও ম্যানুয়েল গারসিয়ার মতো সব বিখ্যাত তারকা। প্রিমিয়ারের পরদিন প্রদর্শিত হয় ‘ঋঁৎড়ৎব!’ এটিও রসনি লিখেছিলেন। দর্শকদের কাছে পরপর দুটি অনুষ্ঠানই ব্যাপক সাড়া ফেলে। ‘আরমিদা’ ও ‘এলিজাবেথ’-এর পর সান কারলোতে একের পর এক রসনির আরও অপেরা যেমন মসেস ইন ইজিপ্ট, রিচিয়ার্দো, জোরাইদ অ্যান্ড এরমায়োন, লা গাজা লাদ্রা, জেলমিরা, জায়েতানো দোনিজেত্তি প্রদর্শিত হয়। তিনি সান কারলোর মঞ্চের সঙ্গে ১৭টি অনুষ্ঠানে কাজ করেছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মারিয়া স্তুয়ারদা, ১৮৩৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রদর্শিত লুসিয়া দি লামেরমুর। মারিয়া মালিব্রান, জিউদিত্তা পাস্তা, লুইজি লাবল্যাশে, জিওভানি বাতিস্তা রুবিনির মতো দোভাষীসহ বিখ্যাত অনেক গায়ক-গায়িকা এই মঞ্চকে সমৃদ্ধ করেছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সান কারলো প্রথম ইতালিয়ান থিয়েটার ছিল, যেটি দেশের বাইরেও অনুষ্ঠান করে। ১৯৪৬ সালে লন্ডনের কভেন্ট গার্ডেনে, ১৯৫১ সালে স্ট্রাসবার্গ ফেস্টিভ্যালে এবং জিওসিপ্পির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্যারিসে, ১৯৫৬ সালে প্যারিসের ফেস্টিভ্যাল অব ন্যাশনে এবং ১৯৬৩ সালে এডিনবার্গে অপেরা প্রদর্শিত হয়।

১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এই থিয়েটারকে আবারও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। যার কারণে প্রায় দুই সপ্তাহ থিয়েটার বন্ধ থাকে। দৃশ্য, সেলাই, নৃত্য বিভাগের কর্মীরা কাজ না থাকায় বেশ খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। এমনকি যারা কোরাসে গান গাইত, তাদেরও অন্য কোথাও কাজ মিলছিল না। এ সময় থিয়েটারকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন স্টকহোমের রয়্যাল অপেরার ডিরেক্টর ও অর্কেস্ট্রা মাস্টার এলিও বনকমপাগনি। ১৯৮০ সালের ভূমিকম্পের পর, থিয়েটারটি নেপলসে দুটো পারফরম্যান্স করে। ১৯৮১ সালে সান কারলো থিয়েটার জার্মানিতে প্রথম নিজেদের মঞ্চস্থ করে।

আর্থিক ধস

১৮৬১ সালের দিকে ইতালির মিউজিক্যাল এই সেন্টারটি সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে থাকে। ১৮৭৪ সাল নাগাদ অনুষ্ঠান থেকে আয়ের পরিমাণ এতই কমতে থাকে যে, বছরখানেক অপেরা হাউজ বন্ধ রাখতে হয়। ১৯ ও ২০ শতকের দিকে জিয়াকমো পুচিনি, পিয়েত্রো মাসকাগনি, লিওঙ্কাভালো, জিওরদানো ও সিলিয়াদের মতো কম্পোজাররা ধীরে ধীরে মঞ্চের প্রতি দর্শকদের আকর্ষণ বাড়াতে থাকেন।

বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ

নেপলসের এই অপেরা হাউজ যে শুধু ইতালিকে সমৃদ্ধ করেছে তা-ই নয়, ইউরোপ জুড়ে সংগীত, শিল্পসহ ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয়কে একীভূত করেছে। ইতালির এই থিয়েটারটি বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো থিয়েটার। ইউনেসকো এই অপেরা হাউজকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। ইতালিকে সমৃদ্ধিশালী ও বিখ্যাত করতে সান কারলোর ভূমিকা তাই অনেক বেশি।

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>