| 19 জুন 2024
Categories
ধারাবাহিক

ধারাবাহিক: একাকিনী শেষের কথা (পর্ব-২) । রোহিণী ধর্মপাল

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট
কৃষ্ণ যেদিন প্রথম দ্রৌপদীকে দেখলেন, তার বহু আগেই খবর পেয়েছিলেন দ্রুপদের যজ্ঞের। আর সেই যজ্ঞ থেকে বেরিয়ে আসা দুই আশ্চর্য পুত্র এবং কন্যার। অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাসী তিনি নন। তখনই তিনি বুঝেছিলেন এর পেছনে গল্প আছে। আর যখন চরেদের কাছ থেকে দ্রৌপদীর রূপের বর্ণনা শুনেছিলেন, একটু অবাক হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু শুধু রূপ নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামানোর মানুষ তো তিনি নন। তবে এটুকু বুঝেছিলেন যে এই মেয়ের যদি স্বয়ংবর হয়, আর পাঁচ পাণ্ডব যদি বেঁচে থাকে, তবে এই স্বয়ংবর সভায় তারা আসবেই। তাই যেদিন তিনি খবর পেলেন দ্রুপদ সুবিশাল আয়োজন করেছেন দ্রৌপদীর স্বয়ংবরের, যত দ্রুত সম্ভব, দাদা বলরামকে নিয়ে তিনি চলে এলেন পাঞ্চাল রাজ্যে। আসল দিনের আগে নিজে চারিদিক বুঝে নেওয়ার জন্য। তিনি তো কন্যেটির অভিলাষী হয়ে আসেন নি। তাঁর উদ্দেশ্য পাণ্ডবরা বেঁচে আছেন কিনা দেখা, তাঁদের খোঁজ পেলে তাঁদের সঙ্গে মিলিত হওয়া, তাঁদের শক্তির সঙ্গে নতুন শক্তিকে যুক্ত করে অপরাজেয় করে তোলা। যখন শুনলেন দ্রুপদ দ্রৌপদীকে পাওয়ার জন্য কঠিনতম শর্ত রেখেছেন, তিনি বুঝলেন দ্রুপদও তাঁর মতোই অর্জুনের খোঁজ করছেন। কারণ এমন শর্ত পূরণ একমাত্র অর্জুনের মতো তীরন্দাজের পক্ষেই পূরণ করা সম্ভব। আর অর্জুন যেখানে, বাকি চারজনও সেখানেই থাকবেন। তাই তাঁকে এমন জায়গায় বসতে হবে, যাতে পুরো সভাস্থলটি নিখুঁত দেখা যায়। রাজারাজড়াদের স্পষ্ট করে দেখা না গেলেও চলবে। পরিষ্কার করে ধনু চালানোর জায়গাটি, আর সাধারণ দর্শকের বসার অংশটি দেখতে পাওয়া চাই। আর অবশ্যই দ্রৌপদীকেও। কারণ পাঞ্চাল রাজ্যে এসে থেকে মেয়েটির কথা যা শুনছেন, তাঁর মনেও আগ্রহ তৈরি হচ্ছে মেয়েটিকে দেখার।
 অবশেষে সেই দিনটি এল। দাদাকে নিয়ে কৃষ্ণ এসে ঠাঁই নিলেন আগে থেকেই স্থির করে রাখা এমন জায়গাটিতে, যেখান থেকে দিব্যি দেখা যাবে পুরো সভাস্থল। এক এক করে ভরে উঠতে লাগল স্বয়ংবর সভা। রাজাদের আসার আগে রীতিমত তূর্য বাজিয়ে ঘোষণা করা হতে লাগল তাঁদের নাম। তাঁরা এসে বসতে লাগলেন তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট আসনে। কৃষ্ণের চোখ কিন্তু ঘুরছিল মাটিতে আসন বিছিয়ে যাঁরা এসে বসছিলেন তাঁদের দিকে। অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর, একেবারে পেছন দিকে এসে বসল একটি বড় দল। বসল ব্রাহ্মণদের জন্য রাখা নির্দিষ্ট অংশটিতে। দলটি বিরাট হলেও দুজনের দিকে চোখ পড়ল তাঁর। একজন বিশাল বক্ষ দীর্ঘদেহী, আর একজন তাঁর মতোই কালো, আজানুলম্বিত হাত দুখানি, কঠিন মাংসপেশি, চওড়া করে বাঁধা সাদা চাদর আর ধুতি, মাথার ঘন কালো চুল চুড়ো করে বাঁধা। কৃষ্ণ প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেলেন। এঁরাই ভীম আর অর্জুন। বাকি তিনজনকেও চিনে নিতে বিশেষ সময় লাগল না তাঁর। দাদাকে ইশারা করে দেখালেন, “ওই দেখুন। পাঁচ ভাই আমাদের”। বলরাম উত্তেজিত হয়ে বলতে গেলেন, “সেকী! তারা তো বারাণাবতের আগুনে…..” কৃষ্ণ তাঁকে থামানোর আগেই ভেরি বেজে উঠল। ধৃষ্টদ্যুম্ন ঢুকলেন। আর তাঁর পেছনে…. এই দ্রৌপদী? কৃষ্ণা? পাঞ্চালী? এ কী অপরূপ রূপ! সর্বাঙ্গ দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে! প্রতি পদক্ষেপে কী ব্যক্তিত্বের প্রকাশ! বিনীত কিন্তু ভীরু নয়। মাথা সামান্য নিচু, কিন্তু তা অকারণ লজ্জায় নয়। সেজেছেন কিন্তু সেই সাজ যেন মিশে গেছে তাঁর লাবণ্যের সঙ্গে। মুখে কোমল অরুণ আভা, অথচ চিবুকের কাছটি দৃঢ় সংবদ্ধ। ঠোঁটটি সামান্য পুরুষ্ট, তাতে মৃদু হাসি। মনে হচ্ছে তিনি জানেন, তিনি অসামান্যা। তাঁকে সহজে ধরা যাবে না। তাঁর শরীরের চারধার দিয়ে যেন আগুনের জ্বলজ্বলে আভা ঘিরে আছে। কৃষ্ণ এই প্রথম এতখানি মুগ্ধ হলেন। তাঁর মনে হল এই মেয়েটিকে তিনি যদি পাশে পেতেন! এই তাঁর যথার্থ জীবনসঙ্গিনী হতে পারত। সবাই তাঁকে দেখে মুগ্ধ হয়। তাঁকে ভালোবাসতে চায়। আর আজ এই মেয়েটি তাঁর মনকে উতলা করে দিল।

আরো পড়ুন: একাকিনী শেষের কথা (পর্ব-১) । রোহিণী ধর্মপাল


একটি দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেন তিনি। চাইলে এই মুহূর্তেই এই তেজি ঘোড়ার মতো মেয়েটিকে নিয়ে চলে যেতে পারেন। কে আটকাবে তাঁকে! কিন্তু না। বৃহতের জন্য তিনি যেমন কৈশোরের অতীতকে ভুলে গেছেন, ভুলতে হয়েছে, তেমন এই ইচ্ছেটাকেও ভুলতে হবে। যদিও এইক্ষেত্রে কাজটা অনেক বেশি কঠিন হবে। কারণ তিনি দেখামাত্র কৃষ্ণার প্রেমে ব্যাকুল হয়েছেন। আর ভবিষ্যতে এই মেয়েটির সঙ্গে বারবার মুখোমুখি হতে হবে তাঁকে। বারবার মনে মনে ক্ষতবিক্ষত হবেন তিনি। অথচ বাইরে এতটুকু প্রকাশ করা যাবে না। রাজনীতির চক্র বড় কঠিন, নির্মম। এখানে ব্যক্তির ঠাঁই নেই। সুতরাং তিনি দর্শক হয়ে বসে রইলেন। যখন একের পর এক রাজারা ধরাশায়ী হচ্ছিল, নির্মল আনন্দ উপভোগ করছিলেন। তবে যখন বুঝলেন এইবার অর্জুন উঠছেন, এইবার মাছটি তীরে বিদ্ধ হবে, দ্রৌপদীর হাতের মালা শোভা পাবে অর্জুনের গলায়। একই সঙ্গে তাঁর মনে আনন্দ আর অদ্ভুত অব্যক্ত এক বেদনার অনুভূতি তাঁর ভেতর জেগে উঠল। তিনি চান অর্জুন লক্ষ্যভেদ করুন। আবার কোথাও যেন তিনি চান অর্জুন ব্যর্থ হোক।
এক মুহূর্তের জন্য তিনি অন্যমনস্ক হলেন। তারপরেই তুমুল চিৎকার শুনে বুঝলেন অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে ফেলেছেন। পুরো সভা জুড়ে ব্রাহ্মণদের উড়নি উড়ছে। তাঁরা পাগলের মতো হাত ছুঁড়ছেন। ক্ষত্রিয় রাজারা হাত মুঠো করে মাথা নিচু করে আছেন। কৃষ্ণের নজর গেল দ্রৌপদীর দিকে। দেখলেন সেই আশ্চর্য রমণী কেমন যেন আপনহারা হয়ে তাকিয়ে আছেন অর্জুনের দিকে। সখীরা তাঁকে ধরে আস্তে আস্তে এগিয়ে নিয়ে এল অর্জুনের দিকে। আর বিপুল হর্ষধ্বনি আর শঙ্খ ধ্বনির মধ্যে দিয়ে অর্জুনের গলায় মালাটি পরিয়ে দিলেন কৃষ্ণা। কৃষ্ণের মনে যেন সহস্রটি ছুঁচ বিদ্ধ হল। অথচ এইটাই তো হওয়ার ছিল। তিনি নিজেই তো এমনটাই চেয়েছিলেন। পাণ্ডবদের সঙ্গে পাঞ্চাল রাজার মিত্রতা হোক। কারণ যত শক্তিধর হোন না কেন ভীম আর অর্জুনের জুটি, রাজনীতিতে গোষ্ঠীবদ্ধ হতেই হয়। দ্রুপদের মতো চতুর, বীর, প্রতাপশালী আত্মীয় অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। তার ওপর দ্রুপদ দ্রোণের শত্রু। তার মানেই দুর্যোধন-পক্ষের শত্রু।
 যতক্ষণ কৃষ্ণ ভাবছেন, তার মধ্যেই রাজাদের রাগত কথাবার্তা শুরু হয়ে গেছিল। নিজেদের ব্যর্থতার অপমান ঢাকতে তাঁরা দ্রুপদ আর দ্রৌপদীর দিকে তেড়ে গেলেন। অর্জুন আর ভীম বীর বিক্রমে রুখে দাঁড়ালেন। কিন্তু কৃষ্ণ খেয়াল করছিলেন দ্রৌপদীকে। দেখলেন এত চিৎকার, আক্রমণ, পুড়িয়ে দে মেয়েটাকে ওর বাপসুদ্ধু, এসব শুনেও মেয়েটি পালায় নি। ওর মুখে, শরীরে ভয়ের কোনও চিহ্ন নেই। বরং কঠিন হয়েছে দেহ, মুষ্ঠিবদ্ধ হয়েছে হাত। মুখের মধ্যে একটা তীব্র ভাব, প্রয়োজন হলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে যেন শত্রুর ওপর। একটি বিদ্যুতের তলোয়ার যেন অপেক্ষা করে আছে শুধু।
কৃষ্ণ জানতেন এই রাজাদের ভীম অর্জুন সামলে নেবে অনায়াসে। হলোও তাই। ভীম একটি গাছ তুলে তার ডালপালা ভেঙে বাগিয়ে ধরলেন। অর্জুন লক্ষ্যভেদের জন্য রাখা তীর ধনুক তুলে শত্রুর দিকে লক্ষ্য নিবদ্ধ করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুর্যোধন দুঃশাসন কর্ণ পালালেন। অন্য রাজারাও ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। সময় বুঝে কৃষ্ণ এগিয়ে এসে বোঝালেন, “ধৃষ্টদ্যুম্নের শর্ত অনুযায়ীই তো কাজ হয়েছে। আপনারা এত রাগ করছেন কেন শুধু শুধু? আর এই দুজনের সঙ্গে আপনারা তো পেরেও উঠছেন না। পুরোপুরি হেরে যাওয়ার অপমান থেকে বাঁচতে বরং ব্যাপারটা মেনে এদের ক্ষমা করে দিন”। রাজারা কৃষ্ণের পরামর্শ মেনে, না মেনে উপায় ছিল না, ক্ষান্ত দিলেন। সব কিছু সুন্দর ভাবে শেষ হওয়ার পর কৃষ্ণ তাকিয়ে দেখলেন, পাঁচ ভাই আর দ্রৌপদী সভাস্থলে নেই। অর্থাৎ দ্রৌপদীকে নিয়ে তাঁরা এগিয়ে পড়েছেন। অতি দ্রুত তাঁদের পিছু নিতে হবে। বলরামকে সঙ্গে নিয়ে তিনি তাড়াতাড়ি হাঁটা লাগালেন।
error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত