| 20 মে 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: বুলডোজার । তসলিমা নাসরিন

আনুমানিক পঠনকাল: 10 মিনিট

আফসানার বিস্কুটের দোকানের গা ঘেঁষেই মালতির চায়ের দোকান। তারা এই ব্যবসা করছে দশ বছর। সখ্য তারও আগে থেকে। জাহাঙ্গীরপুরিতে তাদের ঘরও খুব দূরে নয়। এক বস্তি পেরিয়ে পরের বস্তি। আফসানার জন্ম হলদিয়ায়, মালতির জন্ম দীঘায়। অল্প বয়সেই বাবা-মা তাদের নিয়ে এসেছিল  এই অচেনা ঊষর ভূমিতে। সেই থেকে তারা জাহাঙ্গীরপুরিতেই। আফসানার বস্তিতে  মেদিনীপুরের আরও লোক গা ঘেঁষে থাকে। ঘরের গায়ে লাগানো ঘর। এক ঘরেই রাঁধা-বাড়া, শোওয়া, খাওয়া। মালতির বস্তিতেও তাই। আগে জঙ্গলে গিয়ে পেচ্ছাব পায়খানা সেরে আসতো, এখন দু’বস্তিতেই ও কাজ সারার জন্য পাকা ব্যবস্থা হয়েছে। আফসানার স্বামী রিক্সা চালায়, মালতির স্বামী মাটি কাটার কাজ করে। স্বামীদের রোজগারে সংসার চলে না বলেই তারা রোজগারে নেমেছে। বিস্কুট চানাচুর কলা কমলা রুটি ডিম বিক্রি করলেও লোকে একে বিস্কুটের দোকানই বলে। মালতি মাটির ভাঁড়ে চা দেয়। একটা বেঞ্চি পেতে দিয়েছে দোকানে। সকাল থেকেই চা খাওয়ার লোকের ভিড়। মালতির ইচ্ছে দোকানটিকে আরও একটু বড় করে নাস্তার দোকান বানাবে। রুটি ডিম ভেজে দেবে, লুচি সিঙ্গারাও বানাবে, সঙ্গে গরম চা। খরিদ্দার না থাকলে  দুই বন্ধুতে বসে  স্বপ্নের পায়রা ওড়ায় প্রতিদিন, আফসানাও বলে তার ইচ্ছে  চাল ডাল নুন তেল বিক্রি করার। চারদিকে  এত বস্তি,  দোকানে ভিড় মোটেও কম হবে না বলেই তাদের বিশ্বাস। 

 

 

স্বপ্নের পায়রা আফসানা আর মালতি তখনও ওড়াচ্ছে, যখন ঘটনা ঘটে। ভগবান হনুমানের জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে  হনুমান জয়ন্তীর মিছিল বেরোয় এক দুপুরে। মিছিলে লোকের হাতে তলোয়ার, পিস্তল, লাঠি, আর ঝান্ডা। ঠিক আফসানাদের বস্তির গলির মোড়ে এসে মিছিলের একজন  চেঁচিয়ে বললো, ‘এ দেশ সনাতনিদের দেশ, এ দেশে থাকতে হলে জয় শ্রী রাম বলে থাকতে হবে’। বাকিরা ‘জয় শ্রী রাম’ বলে  চিৎকার করে উঠলো।  আফসানা ভুরু কুঁচকে মিছিল দেখছে  আর অবাক হচ্ছে, এমন মিছিল সে আগে কখনও এ পাড়ায় দেখেনি। মালতির চোখও  বিস্ময়ে বড় বড়। তার তেত্রিশ বছরেও এলাকার এই চেহারা সে দেখেনি। কী হচ্ছে কী এসব! দুজনই লক্ষ্য করে মসজিদের সামনে এসে মিছিলটি উত্তেজিত হয়ে উঠছে। কেউ কেউ চেষ্টা করে মসজিদে তাদের নিজেদের হনুমান জয়ন্তীর  ঝান্ডা উড়িয়ে দিতে। কিছু মুসলমান  মসজিদের ভেতর দৌড়ে  ঢুকে যায়। আফসানা অনুমান করে  মুসলমানরা ঘরের ভেতর সেঁধিয়ে গেছে ভয়ে, কেউ কেউ, সে আরও অনুমান করে, পাড়া থেকেই  পালাচ্ছে। মসজিদ থেকে ছুটতে ছুটতে এসে  এক লোক দোকানদারদের বলতে থাকে, ‘দোকান বন্ধ করো, রায়ট লাগতে পারে’। আফসানা আর মালতি দুজনের কেউই ঝাঁপি বন্ধ করে না।  মিছিলটি এগিয়ে যায়, কিন্তু ঘন্টাখানিক  বাদে  ফিরে আসে। ঝান্ডা ওড়াতে চায় মসজিদের গায়ে, এবারও সেই একই চিৎকার, ‘হিন্দুর দেশ এ দেশ, এ দেশে বাস করার অধিকার তোদের নেই। তোরা সব বের হয়ে যা এদেশ থেকে।’ ঝাণ্ডা হাতে কিছু লোক  আফসানার দোকানের দিকে এগিয়ে আসে। তাদের চোখের সামনে মালতি হাতের শাঁখা নাড়ায়, সিঁদুরও মাথা নুইয়ে দেখিয়ে দেয়। এর মানে আমি হিন্দু , আমাকে মারিস না। আফসানার কিছুই দেখানোর নেই। মালতি তার শীর্ণ  শরীর দিয়ে স্থূলকায় আফসানাকে আড়াল করার চেষ্টা করে। ঝাণ্ডাবাহীরা চোখের আড়াল হলে দুজনই  দোকান বন্ধ করে বাড়ির পথে বড় বড় পা ফেলে  হাঁটে। আফসানাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে নিজের ঘরে ফেরার আগে মালতি বার বার বলে যায়, আফসানা যেন ঘরের বাইরে না বেরোয়। বিকেলে আবার  মিছিল এসে দাঁড়ায় মুসলমান বস্তির সামনে, মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে আবার চেঁচাতে থাকে। বিকট হট্টগোলের শব্দ শুনে আফসানা বেরিয়ে আসে ঘরের বাইরে, দেখে মসজিদের ছাদ থেকে মিছিলে  ছোড়া হচ্ছে  ইট পাথর, শিশি বোতল। আফসানা তার  ছোট ভাই আজাদকে দেখে মসজিদের ছাদে। চিৎকার করে সে আজাদকে বলে ছাদ থেকে নেমে আসতে। তার  আওয়াজ  মসজিদের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে তার  কাছেই ফিরে আসে।  হনুমান জয়ন্তীর লোকেরা আহত হতে থাকে। আহতদের নিয়ে কেউ কেউ দৌড়োতে থাকে হাসপাতালের উদ্দেশে। কিছু মুসলমান যুবক রাস্তায় নেমে এসেছে, হাতে তাদেরও তলোয়ার। হাতে তাদেরও  ইটের টুকরো, লাঠি, বন্দুক।  উন্মত্ত হিন্দুরা যে মুসলমানকেই হাতের কাছে পাচ্ছে, পেটাচ্ছে। আনসার তার বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে গেরুয়া মিছিলের ওপর। আফসানা চেনে এই আনসারকে। পাড়ার লোকেরা বলে আনসার পকেটে পিস্তল নিয়ে চলাফেরা করে, তাকে দেখে মুসলমানরাই ভয়ে দশ হাত দূরে থাকে। হিন্দুদের ওপর হামলা হচ্ছে এই খবর পেয়ে হিন্দু -পাড়া থেকে  ঝাঁক বেঁধে হিন্দুরা ছুটে আসে। যা হয় শেষপর্যন্ত,  হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা। আফসানা হতবাক দাঁড়িয়ে থাকে। তার গায়েও ইটের টুকরো এসে লাগে। জিনাত আরা  তাকে টেনে সরিয়ে নিয়ে যায় বস্তির ভেতরে। দূর থেকে আর সব মুসলমান আবালবৃদ্ধবণিতার  পাশে দাঁড়িয়ে   আফসানা দেখে  পুলিশ এলো,  যাকে সামনে পেলো তাকেই বেধড়ক পেটালো।  ভ্যানে উঠিয়ে নিলো  কিছু লোককে। লোকগুলোর মধ্যে ক’জন মুসলমান, ক’জন হিন্দু কেউ সঠিক বলতে পারে না।  অবশ্য রাত যত বাড়তে থাকে, মুসলমান বস্তির লোকেরা তত বলাবলি করতে থাকে যে  ভ্যানে যাদের উঠিয়েছে, তারা সবাই মুসলমান। একটা নীলচে আশঙ্কা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে বস্তিতে, উত্তেজনা হৈ হৈ করে বাড়তে থাকে। কারও ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে, কারও স্বামী আহত, কারও ভাইকে পিটিয়ে আধমরা করে রেখেছে। আফসানার স্বামী সেলিম  বাড়ি ফেরেনি। খবর এলো তাকেও থানায় নিয়েছে। আজাদও বাড়ি ফেরেনা, খবর এলো, সে হাসপাতালে, মাথা ফেটেছে। আফসানা সারারাত এপাশ ওপাশ করেছে, আর অ্যাসবেস্টস সিলিংএর দিকে তাকিয়ে থেকেছে। জিনাত আরা পাশের ঘর থেকে তার পাশে এসে শুলো। তার চোখেও ঘুম নেই। জিনাত আরাই এক সময় বলে–’ভাই গেল, বর গেল, ভালো যে তোমার ছেলেটা গ্রামে তার দাদির কাছে বড় হচ্ছে। এখানে আর এনোনা ওকে। কবে কী হয় কে জানে।’ 

আফসানা কোনও উত্তর দেয় না।  সেও জানে এই বস্তিতে ছেলে তার মানুষ হবে না। দিল্লিতে  রোজগার করে টাকা পাঠায় হলদিয়া গ্রামে, ছেলে হেসে খেলে বড় হচ্ছে, ইস্কুলে যাচ্ছে। এই পোড়া শহরে এসে শিখতে  হবে না সে মুসলমান, সে ভিন্ন জাতি, শিখতে হবে না হিন্দুকে ঘৃণা করা, হিন্দুর দিকে পাথর ছোড়া। 



পরদিন সকালেই   জিনাত আরার ঘরের টেলিভিশনে আফসানা দেখে হই চই পড়ে গেছে শহরে, জাহাঙ্গীরপুরির বাঙালিরা নাকি বাংলাদেশী, তারা নাকি রোহিঙ্গা!  হনুমান জয়ন্তীর  লোকেরা থানায় এ এলাকার মুসলমানের   নামে অভিযোগ করে এসেছে যে এরা  ভারতের নাগরিক নয়। এদের  বস্তি অবৈধ, এদের বসবাস অবৈধ, এদের বাড়িঘর দোকানপাট  অবৈধ। এদের চৌদ্দ গোষ্ঠী অবৈধ। 

আফসানা বাইরে বেরিয়ে দেখে টেলিভিশনের লোকেরা ঘোরাঘুরি করছে। বজরঙ্গিদের কাছে জিজ্ঞেস করছে কী ঘটেছে গতকাল। তারা তাদের মতো করে বর্ণনা করে ঘটনা।

– ‘বাংলাদেশি  আর রোহিঙ্গা মুসলমানেরা হনুমান জয়ন্তির শান্তিপূর্ণ  মিছিলে হামলা করেছে’। মুসলমানদের কাছে কোনও টেলিভিশন শান্তিপূর্ণ মিছিলে কেন হামলা করেছে জানতে চাইলে তারা একজোট  হয়ে উত্তর দিচ্ছে, –’শান্তিপূর্ণ না ছাই, শান্তিপূর্ণ মিছিল তলোয়ার বন্দুক পিস্তল নিয়ে কেউ বের করে? ওদের উদ্দেশ্য আমাদের ভয় দেখানো।’  

আফসানা কাছেই দাঁড়িয়ে শুনছিল। এবার তার দিকেই মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে এগিয়ে এল এক লোক। প্রশ্ন করলো, ‘তুমি তো বাংলাদেশি। না কি রোহিঙ্গা!’ 

আফসানা  বললো– ‘আমি জাহাঙ্গীরপুরিতে তিরিশ বছর ধরে আছি। আমাদের এলাকায় কোনও বাংলাদেশি নেই, কোনও  রোহিঙ্গা নেই। আমি পশ্চিমবঙ্গের, মেদিনীপুরের হলদিয়ায় জন্ম আমার। চাইলে জন্মের কাগজও দেখতে পারো।’

টেলিভিশনের খবর দেখে মালতিও রাস্তায় বেরোয়। রাস্তায় দেখতে পায় মাইক্রোফোন আর ক্যামেরা নিয়ে দৌড়োদৌড়ি করা লোকদের। একজনের কাছে গিয়ে বলে– ‘ আপনারা কী সব প্রচার করছেন শুনি? এই এলাকায় কোনও বাংলাদেশি নেই। সবাই আমরা ভারতীয়। মুসলমানদের ওপর হামলা চালিয়েছে বজরঙ্গির দল। অথচ এই এলাকায় হিন্দু মুসলমানে কোনওদিন দাঙ্গা বাঁধেনি। আমরা জাহাঙ্গীরপুরিতে বহু বছর বাস করছি। কই মুসলমানরা  তো আমাদের মন্দিরে ওদের ঝাণ্ডা লাগাতে আসে না!  হিন্দুরা কেন যায় ওদের মসজিদে ঝাণ্ডা লাগাতে? রোজার সময়, ইফতারের টাইমে এই হামলা কেন? এইসব অনাচার নিয়ে কথা বলেন না কেন?’’ 

মালতি আর আফসানার বক্তব্য টেলিভিশনে সবাই দেখে। পাড়ার লোকেরা চিনতে পারে ওদের। একজনের বিস্কুটের দোকান, আরেকজনের চায়ের। অনেকে বলছে, ‘কেয়াবাত! পুরুষেরা নয়, প্রতিবাদ দুই ধর্মের দুই মহিলাই করলো।’ 

 

আফসানা আর মালতি সেদিন দোকান বন্ধ  রেখেছে।  এলাকা থমথমে, কখন কী হয় বলা যাচ্ছে না।  বজরঙ্গিদের  থানায় জানাশোনা লোক আছে বলেই প্রতিদিনই থানা থেকে লোক এসে  কিছু মুসলমানকে মেরে ধরে ভ্যানে ওঠাচ্ছে। আনসার আর তার বাহিনীকেও উঠিয়ে নিয়ে গেছে। কোনও হিন্দুকে এখন অবধি ওঠায়নি। আফসানা আর মালতি ঘরে ঘরে গিয়ে বলে আসে, ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এ অঞ্চলে বেশির ভাগ হিন্দু আর বেশির ভাগ  মুসলমানই  শান্তির পক্ষে, দাঙ্গা শুধু কিছু দুষ্ট লোকের কাজ। তাছাড়া পুলিশকে খবর দেওয়া আছে, ফের যেন  দাঙ্গা  না লাগতে পারে, পুলিশ দেখবে। সুতরাং ভয় পেয়ে কেউ যেন হাতে পাথর হাতে না নেয়, কেউ যেন লাঠি তলোয়ার বন্দুক হাতে না নেয়। যার যার ঘরে বসে থাকো, কোনও বজরঙ্গির সাহস হবে না হামলা করার, দূরে দাঁড়িয়ে যত ইচ্ছে শ্লোগান দেয় দিক।’ টেলিভিশনে আফসানা আর মালতি বক্তব্য দেওয়ার পর থেকে তারা মনে করছে দাঙ্গার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো তাদেরও কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

 

আফসানা আর মালতি যদিও দিন রাত দাঙ্গার বিরুদ্ধে দু’দলকেই বুঝিয়েছে, কিন্তু দাঙ্গা ঠিকই বাঁধে। ইট পাটকেল দু’দলই ছোঁড়ে। আহত দু’দলই হয়। পুলিশও  আহত হয়। দু’দলের হাতেই তলোয়ার চমকায়।  আফসানা আর মালতি  কোমরে  শাড়ি গুঁজে এত যে  দৌড়াদৌড়ি করেছে দাঙ্গা থামাতে,  কোনও লাভ হয়নি। 

 

সেলিমকে দাঙ্গাবাজদের সঙ্গে পুলিশেরা  ভ্যানে  উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর আফসানার সময় হয়নি থানায় একবার যাওয়ার।   শুনেছে সবাইকে ছাড়িয়ে আনার জন্য চেষ্টা করছে জাহাঙ্গীরপুরির কিছু গণ্যমান্য লোক।  তবে আজাদকে দেখতে সে গিয়েছে হাসপাতালে।  মালতির কারণেই গিয়েছে। মালতি বারবারই তাড়া দিয়েছে যাওয়ার জন্য। ভাড়া নেবে না এমন এক অটোওয়ালাকেও যোগাড় করে এনেছে। ডাক্তার বলে দেন  অপারেশন দরকার, অপারেশনের দিন দু’ব্যাগ রক্তও দরকার। লাইনে প্রচুর রোগী, সুতরাং রোববার বিকেলের  আগে আজাদের অপারেশন  হবে না। আফসানা আর মালতির রক্ত পরীক্ষা করে ডাক্তার দেখে নিয়েছেন দুজনের রক্তের গ্রুপ আজাদের রক্তের গ্রুপের সঙ্গে মেলে। অগত্যা সিদ্ধান্ত হয়  দু’জন দু’ব্যাগ রক্ত দেবে। রোববার দুপুরের মধ্যেই দু’জন চলে আসবে হাসপাতালে।

 

 

পরদিন সকালেই দোকান খুলে বসে আফসানা আর মালতি। দুজনই মনে করে  দাঙ্গাবাজদের  জন্য ব্যবসা বন্ধ রাখা অর্থহীন। দোকান খোলার পর বিক্রি বাটা হতে থাকে, ওর মধ্যেই চিৎকার শুনে দু’জনই বেরিয়ে আসে খোলা রাস্তায়। কী? বিশাল এক বুলডোজার এগিয়ে আসছে জাহাঙ্গীরপুরিতে। 

কেন আসছে এই বুলডোজার? আফসানা আর মালতি একে ওকে  জিজ্ঞেস করে। সকলের চোখে বিস্ময়। কেউ উত্তর জানে না। তাদের বিস্ফারিত চোখের সামনে এক দুই করে ন’টি  বুলডোজার এসে  মানুষের বাড়িঘর দোকানপাট গুঁড়ো করে দিয়ে যেতে থাকে। একসময় বুলডোজারের সামনে আফসানা আর মালতি সটান দাঁড়ায়, বুলডোজারকে এগোতে বাধা দেয়। কিন্তু বুলডোজার কারো কথা শোনে না। মালতি চারপাশে টেলিভিশনের লোকদের খোঁজে। কিন্তু কেউ আর মালতির কথা শোনায় আগ্রহ দেখায় না। বরং ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে  নিজেরাই  বলতে থাকে, ‘অবৈধ নির্মাণ পৌরসভার কর্তারাই  ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।’ আফসানার প্রশ্ন, ‘আগে থেকে আমাদের কেন জানানো হলো না, কেন নোটিশ দেওয়া হলো না যে আমাদের বাড়িঘর দোকানপাট গুঁড়িয়ে দিতে আসবে তারা?’ আফসানার এই প্রশ্নের কোনও উত্তর কারও কাছে নেই। সকলে হয় চেঁচাচ্ছে, নয় স্তব্ধ হয়ে আছে। বুলডোজারে শুধু মুসলমানের বাড়িঘর আর দোকানপাট গুঁড়ো হয়নি, হিন্দুর বাড়িঘর দোকানপাটও গুঁড়ো হয়েছে। বুলডোজার আসছে দেখেও আফসানা তার দোকানের কোনও জিনিসপত্র সরায়নি, মালতিও না। মালতির দোকানের পাশেই পানওয়ালার দোকান। পানওয়ালা  বুলডোজার যারা চালাচ্ছে তাদের জিজ্ঞেস করেছিল  পানের সরঞ্জাম দোকান থেকে সরিয়ে নেবে কিনা। তারা দিব্যি বললো, ‘আরে না, তোমাদের ওদিককার  দোকান ভাঙার কোনও ব্যাপারই নেই।’   মালতি আর আফসানা অনেকটা নিশ্চিত ছিল পানওয়ালার দোকান যেহেতু ভাঙা হবে না, তাদের দোকানও ভাঙা হবে না।  তারা তাই  দেখতে গিয়েছিল যাদের দোকানপাট ভাঙা হচ্ছে তাদের। তাদের সান্ত্বনা দিতে শুধু নয়, দোকানের সরঞ্জাম কিছু কুড়িয়ে দিতেও গিয়েছে।  ফিরে এসে দেখে তাদের দোকান তো গেছেই, পানের দোকানও  গেছে। 

মালতি দাঁতে দাঁত চেপে বললো, মুসলমানদের সর্বস্বান্ত করার জন্য বুলডোজার পাঠানো হয়েছে।’ 

আফসানা  দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘মুসলমানদের শুধু সর্বস্বান্ত করছে না তো। হিন্দুদেরও সর্বস্বান্ত   করছে! হিন্দু মুসলমান নয়, আসলে সর্বস্বান্ত করছে গরিবদের, সর্বহারাদের।’ 

মালতি মাথা নাড়ে, ‘ঠিক তাই, গরিবদের ওপর হামলা হচ্ছে।’ 

 

আফসানার ইচ্ছে করেনা আর কিছু করতে। সে বুঝে গিয়েছে  কোনও চিৎকার চেঁচামেচি করে লাভ নেই। সরকার যা ভেঙে দেওয়ার দেবে। ইটপাটকেল ছুড়েছিল ছেলেরা, কোকের বোতল ছুড়েছিল, তার ফল ভোগ করতে তো হবেই। আফসানা হিসেব করে দেখে, তার দোকান নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পেছনে আছে নিজের মুসলমান পরিচয়, ছেলেদের দাঙ্গা ফ্যাসাদ, আর সবচেয়ে বড় যে কারণ, সেটি হলো সে গরিব। মালতির বেলায় মালতি কোন ধর্ম পালন করে সেটি বড় না হলেও, মালতি গরিব, সেটিই বড় কারণ। যারা মুসলমানদের ঘৃণা করে, তারা গরিবকেও ঘৃণা করে, হিন্দু গরিব হলে তাকেও বুলডোজারে পিষে মারতে তাদেরও দ্বিধা হয় না। কিন্তু এই বুলডোজার তো প্রায়ই বস্তিতে ঢুকে বস্তি নিশ্চিহ্ন করে। কিন্তু আগে এ নিয়ে  আলোচনা হয়, নোটিশজারি হয়! এবার কিছুই হয়নি! 

 

সুপ্রিম কোর্ট থেকে বুলডোজার থামার আদেশ আসার পরও দুঘন্টা ধ্বংসযজ্ঞ করেছে  বুলডোজার। আফসানা আর মালতির দোকান সুপ্রিম কোর্টের আদেশ আসার পরেই ধ্বংস করা  হয়েছে। কার কাছে বিচার চাইবে তারা? সব হারিয়ে রাস্তায় মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে দু’জন, পানওয়ালাও কাছে এসে বসে, মোটর সাইকেল সারাইয়ের দোকান ছিল সানুর, সেই দোকানের টিনও দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছে বুলডোজার। সানু  উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটোছুটি করছে আর বলছে  ‘অবৈধ নয়, এমন দোকানও বুলডোজারের রোষানলে পড়েছে’। 

 

 মালতি আফসানাকে হাত ধরে টেনে ওঠায়। সে শুনেছে কিছু লোক  ক্ষতিপুরণ পাওয়ার জন্য চিঠি পত্তর লিখছে। সেই চিঠি পত্তরে তাদের নামও জুড়ে দিতে হবে।   বাড়ি বাড়ি ঢুকে মালতি খোঁজ করে চিঠি পত্তর লেখা লোকগুলোর। আসলাম, সবুর, নাজিমুদ্দিন আদালতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। ওদের সবাইকে আফসানা চেনে। মালতি ওদের কাছ থেকে কাগজ চেয়ে নিয়ে   নিজের নাম সই করলো, আফসানার নামও সই করালো। আফসানার এই কাগজের চেয়ে বেশি উৎসাহ আরেক দলের দিকে। সেই দলের লোকগুলো মুখ চেনা, কিন্তু তারা আগামীকাল মিছিল করার কথা বলছে। কেন মিছিল কী বৃত্তান্ত জানতে মালতির হাত ধরে    আফসানা ছুটে যায় ওদের দিকে। ওদের একজন বললো, ‘সবাই   তিরঙ্গা যাত্রায় সামিল হও। হাতে পতাকা  নিয়ে মিছিল করবো, হিন্দু -মুসলমান এক সাথে।’ 

 

ঘরে ঘরে গিয়ে সবাইকে তারা বলছে কাল বিকেল ছ’টায় তিরঙ্গা যাত্রা। সেই দলের পেছনে আফসানা ছুটলো, সেও ঘরে ঘরে গিয়ে বলতে শুরু করলো,’হাতে পতাকা নাও, হিন্দু মুসলমানের তিরঙ্গা যাত্রা হবে আগামীকাল রবিবার বিকেল ছটায়’। উত্তেজনায় কাঁপে আফসানা। দোকান ভাঙার টাকা পয়সা ফেরত পাওয়ার চেয়ে তার মনে হয় হিন্দু মুসলমানের সম্পর্ক ভালো করা সবচেয়ে জরুরি, এ সম্পর্ক ভালো না হলে আরও বুলডোজারে ধ্বংস হবে বাড়িঘর দোকান পাট, আরও তাদের বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা বলে ডেকে হেনস্থা করা হবে। আগে নিরাপত্তা আসুক জীবনে, তারপর টাকা পয়সা কামানোর কথা ভাবা যাবে। কামিয়ে কী লাভ যদি সব দাঙ্গার ধাক্কায় ভেঙে যায়!  যদি মুসলমানদের   পরদেশি ভেবে হিন্দুরা এ দেশ থেকে  তাদের তাড়াতে চায়, কী লাভ তবে বাড়ি বানিয়ে, দোকানদারি করে! 

 

মালতি যতই নতুন করে নিজের চায়ের দোকান চালু করতে উদবিগ্ন, আফসানা ততই আসছে তিরঙ্গা যাত্রায় নিজের সামিল হওয়া  নিয়ে উত্তেজিত। সে বড় দুটো পতাকা রাস্তা থেকে কেনে। রাস্তায় ছোট বড় পতাকা বিক্রি করছে পাড়ার ছেলেরা। দ্রুত বদলে যাচ্ছে  জাহাঙ্গিরপুরীর  চেহারা। একটা ঘুমিয়ে থাকা অঞ্চল ছিল এটি। অথচ এখন এমন সজাগ যে কাক পক্ষী উড়ে গেলেও নজরে পড়ছে।   যে বাড়িগুলো থেকে হিন্দুদের দিকে পাথর আর কাচের বোতল ছুড়ে মারা হচ্ছিল, তারাই  হিন্দুদের দিকে পতাকা বাড়িয়ে দিচ্ছে, আর বলছে কাল যেন ছটার সময় তিরঙ্গা যাত্রায় যোগ দেয়। যে হিন্দুরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুসলমানের ওপর, তারাও মুসলমানের  সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। বুলডোজার আসার আগে যদি এই বন্ধুত্ব হতো, তাহলে এত লোককে এত সহায় সম্বল হারাতে হতো না। 

 

আফসানা  তিরঙ্গা যাত্রায়  যাওয়ার জন্য বিকেল চারটা থেকেই তৈরি হয়ে বসে আছে। স্নান করে ভালো একটি শাড়ি পরেছে। চুল আঁচড়ে খোঁপা করেছে। জিনাত আরা উঁকি দিয়ে বলে যায়, ‘কী ব্যাপার, টিভিতে আজও বক্তৃতা দেবে নাকি? এত সাজগোজ কেন?’ 

আফসানা হেসে বলে, ‘তা তো দেবই বক্তৃতা। ঘরে বসে হায় আফসোস করার দিন শেষ।’

আফসানা দুটো পতাকা কিনেছে, একটি তার জন্য, আর একটি মালতির জন্য। মালতি আর সে যাবে তিরঙ্গা যাত্রায়। কিন্তু পৌণে ছ’টা বেজে গেছে, মালতির টিকিটি দেখা গেলো না। মুঠোফোনটি  রিচার্জ করা হয়নি বলে বেকার পড়ে আছে। তিরঙ্গা যাত্রার জন্য গোল চত্ত্বরে পৌঁছোতে তো  মিনিট পনেরো  লাগবেই। মালতির জন্য আর অপেক্ষা না করে  নিজেই চলে যায় যাত্রায়। একা। দু’হাতে দুটো পতাকা। শত শত মানুষ যাত্রায় যাচ্ছে। মুসলমান হিন্দু সব এক জায়গায় মিলিত হচ্ছে।   যাত্রায় প্রায়  সবই পুরুষ। মুসলমান পুরুষদের অনেকে  অন্য সময় মাথায় টুপি না পরলেও জমায়েতে এসেছে টুপি পরে। টুপি পরলেই লোকে বুঝবে মিছিলে মুসলমানও এসেছে। তা না হলে তাদের চিনবে কী করে!  কী করে বুঝবে কে হিন্দু, কে মুসলমান। দেখতে তো সব এক। এক গায়ের রঙ, এক চুলের রঙ, এক নাক চোখ মুখ। মুখের গড়নও এক, মুখের ভাষাও এক।  মেয়েরা দূর থেকে দেখছে; একতলা, দোতলা বাড়ির জানালা থেকে দেখছে, ছোট ছোট পতাকা নাড়ছে জানালায় দাঁড়িয়ে।  আফসানা আর হাতে গোনা কয়েকটি মেয়ে মিছিলে। ভিড়ের দুটো মেয়েকে সে চিনতে পারে,  জ্যোতি আর পূর্ণিমা।  জ্যোতি মালতির কী রকম এক আত্মীয়। সবার হাতে পতাকা নেই, যাদের আছে, তাদের হাতে  একটি   পতাকা। আফসানার হাতেই শুধু দুটো। ভিড়ের মধ্যে এক লোক একটি পতাকা আফসানার হাত থেকে নিতে চায়, কিন্তু দেয় না সে। দেবে কেন, ওটি তো মালতির। মালতির আসতে দেরি হচ্ছে। অথবা ভিড়েই হয়তো কোথাও আছে সে।  যদি মালতি নাও আসে এই যাত্রায়, পতাকাটি মালতির  হয়ে   সে ওড়ায়। দুটো পতাকাই   ডানে বামে দোলাতে থাকে। স্লোগান ওঠেঃ 

‘ভারত মাতা কী জয়।’ 

আফসানাও চেঁচিয়ে বলে, ‘ভারত মাতা কী জয়।’ 

স্লোগান ওঠে ‘একতা কা রাজ চালেগা, হিন্দু মুসলিম সাথ চালেগা।’ 

আফসানাও গলা ছেড়ে দু’হাতের দু’ পতাকা আসমানের দিকে উঁচু করে ধরে বলে, 

‘একতা কা রাজ চালেগা, হিন্দু মুসলিম সাথ চালেগা।’ 

টেলিভিশনের ক্যামেরায় আফসানাকে দেখা গেল কী গেল না, সেদিকে তার খেয়াল নেই। সে শুধু চাইছে, তার আওয়াজ যেন বাকি আওয়াজের সঙ্গে মিলে আকাশ বাতাস কাঁপায়। 

 

রাতে আফসানা মালতির ঘরে যায় খবর নিতে। কী হয়েছে তার যে তিরঙ্গা যাত্রায় এলো না। এমন যাত্রা এ তল্লাটে কোনওদিন আফসানা দেখেনি, মালতিও তো দেখেনি, তবে কী এমন ঘটেছে যে আসেনি সে, কোনও অসুখ বিসুখ! ঘরে ঢুকে   দেখে মালতি আর তার ভাই সমীর শুয়ে আছে বিছানায়। ক্লান্ত মলিন মুখ দুজনের। মালতি বা সমীর কেউই  মিছিলে যেতে পারেনি।  কারণ  হাসপাতাল থেকে ফিরতে ফিরতেই তাদের  রাত হয়ে গেছে। আফসানার ভাই আজাদের জন্য তারা দু’ব্যাগ রক্ত দিয়েছে। হাসপাতাল থেকে দুজনকেই দুটো করে কলা দিয়েছিল  খেতে। পেটে সকাল থেকে  দুটো কলা ছাড়া আর কিছু পড়েনি। ঘরে রান্না হয়নি আজ। সমীর বলে, আজাদের অপারেশান হয়েছে, মাথায় বারোটা সেলাই পড়েছে,  এখনও জ্ঞান ফেরেনি। যাত্রার উত্তেজনায়   আফসানার মনেই ছিল না আজ যে রোববার, তার যে হাসপাতালে যাওয়ার কথা। আজাদের জ্ঞান ফিরেছে কি না সে কি দেখতে যাবে হাসপাতালে! নাকি মালতি আর সমীরকে কিছু খেতে দেবে। আফসানা  তার ঘরে গিয়ে তড়িঘড়ি এক হাঁড়ি খিচুড়ি রেঁধে  আর বেশ কয়েকটি ডিম ভেজে  নিয়ে আসে মালতির ঘরে। তিনজন মেঝেয় বসে    ভাই বোনের মতো খায়। খেতে খেতে আফসানা তার  যাত্রার  অভিজ্ঞতার কথা বলে। বলে, ‘এক সাগর লোক জমেছিল। সাগরের ঢেউয়ের মতো মানুষ চলেছে। সাগরের গর্জনের মতো সবাই গর্জন করে উঠেছে,একতা কা রাজ চালেগা, হিন্দু মুসলিম সাথ চালেগা।’ আফসানা বলতে থাকে আর তার  চোখ মুখ উজ্জ্বল হতে থাকে।  

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত