| 19 এপ্রিল 2024
Categories
পাঠ প্রতিক্রিয়া

পাঠ প্রতিক্রিয়া: আবছায়া বর্তমান সময়ের আখ্যান । শৌনক দত্ত

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

সিরাজুল ইসলামের শুভ জন্মতিথিতে ইরাবতী পরিবারের অজস্র শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।

বারো-চৌদ্দ শ বছর আগে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ বৌদ্ধ সহজিয়া সাধন পদ্ধতির সংগীত হিসেবে রচিত হলেও সেখানে খিদে-দারিদ্র্য আর চুরি-ডাকাতিসহ সামাজিক অন্যান্য অঘটনের কথা কিছু কম নেই।

বাংলা উপন্যাসের সৃষ্টিলগ্ন থেকে বিকাশের ক্রমবর্ধমান ধারায় নাগরিক জীবন ও তার নানারকম গভীর অসঙ্গতির ছবি বঙ্কিমচন্দ্রের “রজনী’’ থেকে রবীন্দ্রনাথের “চোখের বালি’’ ও শরৎচন্দ্রের “গৃহদাহের’’ সহ অনেক উপন্যাসে। দেশভাগের পরবর্তী  বাংলা মূলধারার গল্প-উপন্যাস মধ্যবিত্তর সাহিত্য। মূলধারা বলতে বলছি শহরকেন্দ্রিক প্রকাশনা। যাঁরা লিখছেন তাঁরাও মনে হয় আর্থিক দিক দিয়ে এবং সামাজিক দিকে দিয়ে মধ্যবিত্ত সমাজের লোক। কাজেই তাঁরা লিখছেন সে সমাজ নিয়ে। ষাট-সত্তরের আগে এই ক্যানভাসে অনেক বেশি বৈচিত্র্য পেয়েছি। বিভূতিভূষণে পেয়েছি, তারাশংকরে পেয়েছি। বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ে কিছুটা হলেও বিহারের বাঙালির ছবি পেয়েছি, হয়ত শরদিন্দুতেও। কিন্তু বাংলা মূলধারা ক্রমশঃ শহর-কেন্দ্রিক হতে আরম্ভ করল, এবং উধাও হতে আরম্ভ করল বৈচিত্র্যও। ব্যতিক্রমও আছে মহাশ্বেতা দেবী ব্যাতিক্রম। বেশির ভাগ সৃষ্টিসফল বাংলা গল্প-উপন্যাস নিম্নবর্গের মানুষকে নিয়েই। এমনকি বাংলা সাহিত্যের মানসিকতায় অমোচনীয় মধ্যবিত্তপনা থাকলেও সফল কাহিনি-গদ্যে বেশির ভাগ সময় ওই নিম্নবিত্ত-জীবন মধ্যবিত্ত চোখ দিয়ে দেখা। কিন্তু সত্যিকার মধ্যবিত্ত-জীবন নিয়ে সফল লেখা সেই তুলনায় কম। এর একটি-দুটি আনুমানিক অস্পষ্ট কারণ চিহ্নিত করা যায়। রুশ বিপ্লব, বাংলায় কমিউনিস্ট রাজনীতির উত্থান, কমিউনিস্টবিরোধী শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটি অংশের গান্ধীবাদের প্রতি সমর্থন ও তা দিয়ে উঁচু-নিচু ভেদ ঘোচানোর চেষ্টা, আর দুটো বিশ্বযুদ্ধসহ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ; এবং বিভিন্ন আন্দোলন, যেখানে জনগণকে সম্পৃক্তকরণ একটি বিষয় ছিল। লেখক তাঁর সর্বত্রগামী চোখ দিয়ে সর্বস্তরের মানুষ আর গোটা দেশকেই (এখানে বাংলা) দেখতে চাইতেন, অভীষ্ট—স্বদেশ সন্ধান। তাই ওই সন্ধানে নিম্নবর্গের দিকে না তাকিয়ে পুরোপুরি ভুখা-নাঙ্গা খাক হয়ে যাওয়া স্বদেশকে কোনোভাবে বুঝে ওঠা যাচ্ছিল না।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নগরায়ণ এবং নাগরিক জীবনের ক্রমবর্ধমান প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তার জীবন প্রণালী ও রুচির পরিবর্তন হতে থাকে। জীবনের নানাবিধ অনুষঙ্গ যেমন প্রেম-ভালোবাসা, নর-নারীর জটিল মানসিক ও দৈহিক সম্পর্ক এবং অন্যান্য মূল্যবোধের পরিবর্তনকে আত্মস্থ করে ঔপন্যাসিক তাঁর সূক্ষ্ম দৃষ্টিকোণ থেকে নাগরিক সমাজে ব্যক্তির প্রথাগত পথের বিপরীতমুখী হবার প্রবণতা ও তা থেকে পারিবারিক জীবনে দ্বন্দ্ব সংঘাতের উন্মেষ এবং সর্বোপরি ব্যক্তি চৈতন্যের অতল গহ্বরে টানাপোড়েনে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তারই কুশলী উপস্থাপন দেখতে পাই সিরাজুল ইসলামের আবছায়া উপন্যাসে।

কথাসাহিত্যিক সিরাজুল ইসলামের অন্বেষণ মানব মনের অতল। আবছায়া উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে মূলত আশার মনোজগৎকে কেন্দ্র করে। বাবার মৃত্যুর পরে একটু একটু করে অসুস্থ হয়ে পড়ে আশা। নিজের অসুস্থতা, মায়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা দূরত্ব আর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ মিলিয়ে তার উপলব্ধি হয়- এই সমাজে একজন একা মেয়ের পক্ষে সম্মানের সাথে টিকে থাকা কঠিন। রোগের তীব্রতা বাড়লে ফনী ডাক্তারের পরামর্শক্রমে আশা ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যেখানে আশার না পাওয়া ভালবাসার মানুষ কামরান থাকে। মফস্সল শহর গাইবান্ধার পাট চুকিয়ে আশা চলে আসে ঢাকায় কামরান ও রুবিনার সংসারে। নাগরিক রুচির সঙ্গে সঙ্গে আর্থ-সামাজিক বিকাশের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত না-হলে মানুষের প্রেম-সম্পর্কও যে বাধাগ্রস্ত হয় তা আবার দেখালেন সিরাজুল। ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে উপন্যাসের কাহিনি। প্রকৃত অসুস্থতা? আশার অসুখকে ঔপন্যাসিক রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন এ উপন্যাসে। প্রকৃতপক্ষে, এ অসুখ আমাদের সমাজে, রাজনীতিতে, পরিবারে, সর্বক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। আবছায়া নামের মতোই অস্পষ্ট রয়ে যায় উপন্যাসের চরিত্রগুলির চাওয়া-পাওয়াগুলো। প্রত্যেকটি চরিত্র যেন নিজের চারপাশে একটা দেয়াল তুলে রেখেছে। তারা প্রত্যেকেই বহন করে চলেছে বর্তমানের ঘুণধরা সমাজ-ব্যবস্থার ভার।

আশার নাগরিক জীবনে নিরন্তর শূন্য থেকে শূন্যতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে শেষে সকল প্রথানুগত্যের বিরুদ্ধাচারণের মাধ্যমে দীর্ঘদহন ও যন্ত্রণার মাঝসমুদ্র পেরিয়ে আত্মঅনুসন্ধানের উপকূলে উপনীত হবার কাহিনী আবছায়া। মফস্বল শহর গাইবান্ধার জীবন থেকে ঢাকার নাগরিক জীবনের টানাপোড়েন ও জটিলতাকে সুনিপুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। এই ঔপন্যাসিকের জীবনদৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রত্যয় লক্ষ করা যায় এই উপন্যাসে। সিরাজুল ইসলামের এই উপন্যাস পড়তে পড়তে মনে হতেই পারে সমকালীন জীবন ও সংগ্রামকে সাহিত্যের শব্দস্রোতে ধারণ করাই সিরাজুলের শিল্প-অভিযাত্রার মৌল অন্বিষ্ট। এ ক্ষেত্রে শ্রেণি-অবস্থা ও শ্রেণিসংগ্রাম-চেতনা প্রায়শই শিল্পিতা পায় তাঁর ঔপন্যাসিক বয়ানে,তাঁর শিল্প-আখ্যানে। এই উপন্যাসে অনেকগুলো চরিত্র থাকলেও আশা কামরান ও রুবিনা চরিত্রকে লেখক বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন এবং এই তিনটি চরিত্রই চায় নিদিষ্ট গন্তব্য পৌঁছতে যেন আমাদের প্রতিটি জনজীবনের প্রতিনিধি তারা। চরিত্রগুলোর ডিটেইলিংয়ের সাথে সাবলীল ভাষার ব্যবহার উপন্যাসটিকে গতি দিয়েছে।


আরো পড়ুন: পাঠ প্রতিক্রিয়া: ‘শিশিযাপন’ পাঠান্তে । সাদিয়া সুলতানা


সিরাজুল ইসলামের আবছায়া পড়তে পড়তে শওকত আলীর লেখা মনে পড়ছিল।  শওকত আলীর প্রতিটি লেখায় দেখা যায় ব্যাপক চিন্তা, প্রতিচিন্তার মধ্য থেকে তিনি সাহিত্যের বন্ধুর পথে যাত্রা করেন এবং কথাসাহিত্যের মধ্য দিয়েই তিনি তার ভাবনা তুলে ধরেন। সিরাজুল ইসলামের লেখা আপাত দৃষ্টিতে সরল মনে হলেও বুননের গভীরে যে ব্যাপক চিন্তা ও প্রতিচিন্তা থাকে তা চরিত্রের ভাবনায় ও সংলাপে খুব সচেতনভাবে তিনি প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখেন। ব্যক্তিজীবনের সংগ্রাম-সংকটের ছায়া, গ্রাম ও শহরকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন এবং সংগ্রামশীলতা কিংবা সামষ্টিক জীবনে সামাজিক-রাজনৈতিক যে প্রভাব পড়েছে, তা উপন্যাসে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সিরাজুলের দক্ষতা অসামান্য। একই সময় তিনি উপন্যাস-গল্প রচনার একটি স্বাতন্ত্র্য ভাষা গড়ে তুলেছেন সফলভাবে; যে ভাষা সহজেই সাধারণ পাঠককে আকর্ষণ করে। 

আবছায়া উপন্যাসটি শেষ হলে আনমনেই মনে হতে পারে নগরায়নের থাবা গ্রামকেও টেনে আনছে তার লালসার কাছে। কিংবা ছড়িয়ে দিচ্ছে তার লালসার লালা। ফলে নগর ও গ্রামের মানুষের মধ্যে আজ চাহিদার প্রভেদরেখা দ্রুতই সঙ্কুচিত হচ্ছে। গ্রামনির্ভর অর্থনীতি ও সমাজ-সংস্কৃতি ভেঙে মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও সমাজ-সংস্কৃতিতে রূপ নিচ্ছে। চারপাশের মানুষগুলো বদলে যাচ্ছে দ্রুত। মানুষের মনোজগৎ এখন জটিল, দ্বন্দ্ব সংঘাতময়, লোভ ও রিরংসাতাড়িত। গোটা বইটি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট যতটা স্থান করে নিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি জায়গা করে নিয়েছে ব্যক্তিক সংকট, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, দ্বন্দ্বময় জটিল মনোজগৎ- যা কেবলই বিচ্ছিন্নতাবোধ ও নৈঃসঙ্গ্য যাতনায় ভারাক্রান্ত। আর সেইদিক থেকে দেখলে আবছায়া সফল একটি সমসাময়িক সময়ের চিরচেনা আখ্যান।

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত