| 16 এপ্রিল 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া অনুবাদ উপন্যাস: অর্থ (পর্ব-১৬) । ধ্রুবজ্যোতি বরা

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি বরা পেশায়  চিকিৎসক,অসমিয়া সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য লেখক ২৭ নভেম্বর ১৯৫৫ সনে শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন ।শ্রীবরা ছাত্র জীবনে অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন ।’কালান্তরর গদ্য’ ,’তেজর এন্ধার‘আরু’অর্থ’এই ত্রয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সনে ‘ কথা রত্নাকর’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাকি উপন্যাসগুলি ‘ভোক’,’লোহা’,’যাত্রিক আরু অন্যান্য’ ইত্যাদি।ইতিহাস বিষয়ক মূল‍্যবান বই ‘রুশমহাবিপ্লব’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’,’ফরাসি বিপ্লব’,’মোয়ামরীয়া বিদ্রোহ’।শ্রীবরার গল্প উপন্যাস হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা, মালয়ালাম এবং বড়ো ভাষায় অনূদিত হয়েছে।আকাডেমিক রিসার্চ জার্নাল’যাত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ।’ কালান্তরর গদ্য’ উপন্যাসের জন্য ২০০১ সনে অসম সাহিত্য সভার ‘ আম্বিকাগিরি রায়চৌধুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।শ্রীবরা অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি।


অনুবাদকের কথা

কালান্তর ট্রিলজির তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হল’অর্থ’। সশস্ত্র হিংসার পটভূমি এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ জীবনের দ্রুত অবক্ষয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার তাড়না এবং বেঁচে থাকার পথ অন্বেষণেই আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনী ভাগ গড়ে তুলেছে। সম্পূর্ণ পৃথক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে অসমের মানুষ কাটিয়ে আসা এক অস্থির সময়ের ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের অন্বেষণ চিরন্তন এবং সেই জন্যই লেখক মানুষ– কেবল মানুষের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারে।

এবার উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে এলাম।আশা করি ইরাবতীর পাঠকেরা এই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত অসাধারণ উপন্যাসটিকে সাদরে বরণ করে নেবে ।নমস্কার।

বাসুদেব দাস,কলকাতা।


 

আশ্চর্যকর!

 সত্যিই আশ্চর্যকর।

চোখের সামনে এত বড়ো ইমারত একটা গড়ে উঠেছে!

মাটির ভেতর থেকে লম্বা লম্বা পাইলের ওপরে পা রেখে এই বিশাল ইমারতটার ভিত্তি উঠেছে। অথচ এই সেদিন, মাত্র এই সেদিনই এখানে কাজ আরম্ভ করা হয়েছিল। সত্যিই আশ্চর্য লাগে কথাটা। প্রতিদিন দেখার মতো আজও শ্ৰীমান আশ্চর্য হয়ে বাড়িটার দিকে তাকাল।

এই সেদিন মাত্র সে আর রমেন আর্কিটেক্ট কে এই জায়গায় নিয়ে এসেছিল।

তার সংকোচ হয়েছিল। ভাড়াটিয়ারা যদি অসুবিধা করে, বাধা দেয় আর সেরকম করলে তো রমেন একটা গন্ডগোল লাগাবেই। মারপিট ও করতে পারে। তখন ব্যাপারটা খারাপ হবে।না, কিন্তু সে ভয় করার মতো কিছুই হল না। বাঙালি ভাড়াটিয়াটি নিজে থেকেই বেরিয়ে এসেছিল। তাকে, রমেনকে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ডেকে দোকানের ভেতর বসাল।

‘আপনি এসেছেন ভালোই হয়েছে,’ রমেনকে সে বলল।’ আপনার সঙ্গে আমাদের স্যারের বড় ছেলেও এসেছে।’

‘আমরা আর্কিটেক্ট নিয়ে এসেছি, তিনি মাপ-জোক করে ডিজাইন বানাবেন।’ রমেন বলল।

‘খুব ভালো হয়েছে, খুব ভালো হয়েছে,’ শ্ৰীমানকে অবাক করে ভাড়াটিয়াটি বলে উঠল ‘চারপাশে এত বড়োবড়ো দালান উঠে  যাচ্ছে। এখানে ও হওয়া ভালো। এই পুরোনো ঘরগুলি আর দেখতে ভালো লাগছে না।’ 

কথাটা শুনে শ্রীমানের বেশ রাগ হল। শালা, এত বছর এত কম ভাড়া দিয়ে এখানে বসে মজা করলি। এখানেই, এই ভাঙ্গা ঘরগুলিতে ব্যাবসা করে বড়োহলি, ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে আমেরিকায় গেল‐এখন আর পুরোনো ঘরগুলি দেখতে ভালো লাগছেনা!

মানুষটা কিছুটা কাছে চলে এসেছিল।

রমেন এবং শ্রীমানের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,’ আপনারা কোনো চিন্তা করবেন না। আমি আপনাদের সম্পূর্ণ সাহায্য করব।’ আর্কিটেক্টকে দেখিয়ে বলেছিল,’ ইনি তো মাপ-জোক নেবেন। আমি ছেলে দিয়ে দিচ্ছি। সমস্ত মাপ-জোক নিয়ে নিন।’ দোকানের কর্মচারী দুটিকে তিনি আর্কিটেক্টের সঙ্গে ফিতা ধরে মাপ-জোক করতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। একটা পেড বের করে আর্কিটেক্ট মাটির টুকরোটার, সামনের রাস্তাটার স্কেচ আঁকতে  আরম্ভ করে দিয়েছিল। ইস মাত্র সেদিনের ঘটনা ছিল এটা।

মানুষগুলি মাপ-জোক নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ার পরে মানুষটা শ্রীমান এবং রমেনের কাছে চলে এসে ফিসফিস করে বলেছিল;

‘ আমরা বাঙালি সাহা‐বংশানুক্ৰমে আমরা ব্যবসা করে আসছি। ব্যাবসার কথা আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারি। এরকম এক টুকরো মাটি, পানবাজারের মতো জায়গায় এরকম এক টুকরো মাটি, সোনার খনি স্যার, একেবারে সোনার খনি।’ বাবার চেয়েও বয়সে বড়ো মানুষটা শ্রীমানকে স্যার বলে সম্বোধন করছিল।

‘আমার দিক থেকে আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে না,স্যার,’ লোকটা বলে চলেছিল।’ সব কাজেই আমি কো-অপারেট করব। আমাকে কিন্তু আপনাদের দেখতে হবে।” হবে, হবে’, রমেন সহজ ভাবে উত্তর দিয়েছিল।

‘আমরা বেপারী মানুষ, স্যার,’ লোকটা শ্রীমানের দিকে তাকিয়ে বলছিল,’ এত বছর আপনাদের ছত্রছায়াতেই আমরা ব্যবসা করে আসছি। আপনারা এখানে মার্কেট এবং ফ্ল্যাট বানাবেন, খুব ভালো কথা স্যার, খুব ভালো কথা। আমি আপনাদের সঙ্গে এখানেই থাকতে চাই। দোকানের স্পেস একটা এবং উপরে একটা ফ্ল্যাট আমরা কিনে নেব। পুরোনো মানুষ হিসেবে আমাদের দাম-টাম একটু কম করে নেবেন,স্যার। কাজ আরম্ভ করার আগেই আমরা এগ্রিমেন্ট করে এডভান্স দিয়ে দেব, স্যার।’

শ্ৰীমান তাজ্জব হয়ে গিয়েছিল।

‘আমাদের নামে দোকান  এবং ফ্ল্যাট বুকিং হয়ে গেল বলে ধরে নিন,স্যার।’

রমেন বলেছিল,’ হবে। আপনাকে কথা দিলাম। হয়ে যাবে।’

‘স্যার,’ লোকটা পুনরায় বলেছিল।’ ডিজাইন টিজাইন ঠিক হলে দাম-টামসবকিছু ঠিক হলে আমি আপনাদের বুকিং এর জন্য পার্টি ও জোগাড় করেদেব। পানবাজারে এই প্রপার্টিতে দোকান বা ফ্ল্যাট কেনার মানুষ সহজেই পাওয়া যাবে। দুই চার জন আমাকে এই জায়গায় কিছু বানাবে নাকি বলে জিজ্ঞাসাও করেছে। আমাদের স্ট্যান্ডার্ড  কমিশনটা দেবেন, স্যার।


আরো পড়ুন: অর্থ (পর্ব-১৫) । ধ্রুবজ্যোতি বরা


কী কমিশন কী কথা এইসব পরে রমেন ভালোভাবে বুঝিয়ে না বলা পর্যন্ত শ্রীমান বুঝতে পারেনি। আশ্চর্য! সাহা বাবু ব্যবসা কী আর কীভাবে হয় সে কথা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। পরেও প্রতিদিনই তিনি বিভিন্ন শলা পরামর্শ দিয়ে শ্রীমানকে  সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রথম দিন, ভাড়া ঘরটির অন্য প্রান্তে থাকা অসমিয়া দোকানিটার পরিবার ঘরের ভেতর থেকে ওদের কানে পড়ার মতো করে কথা শুনিয়েছিল। 

‘কোনোদিন একটা খোঁজখবর নেই, টিনের চাল দিয়ে জল পড়েপড়ে ঘরের ভেতরটা পচে গেছে, একবারও খবর নিতে ইচ্ছা হল না। সব ট্যাক্স ফ‍্যাক্স আমরাই দিয়ে আসছি। এখন মাটির মালিক হয়ে বিল্ডিং তৈরি করতে এসেছে। মহিলার কন্ঠস্বর অত্যন্ত কর্কশ।

তোমরা কুড়ি বছরের পুরোনো রেটে ভাড়া দিয়ে আসছ। সে কথা বলতে শ্রীমানের খুব ইচ্ছে করছিল যদিও মহিলার কর্কশ কণ্ঠস্বর শোনার পরে তার আর সাহস হয়নি।

রমেনও কিছু বলেনি। ‘অসভ্য সব,’ বিড়বিড় করে সে বলেছিল।’ এমনিতেই কি আর তোর স্বামীর নাক ঘুষি মেরে ভেঙ্গে দিতে হয়েছিল।’

আর্কিটেক্টের মাপ-জোক নেওয়া হয়ে গিয়েছিল। সবকিছু সামলে  নিয়ে সে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। গাড়িতে উঠার সময় শ্রীমানের মনে হয়েছিল যে একটা মোটরসাইকেল এসে দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছে। হেলমেট খুলে মোটরসাইকেলে ঝুলিয়ে রেখে একটা ছেলে দীর্ঘ পদক্ষেপে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করছে। বাঙালি দোকানটাতে নয়, অসমিয়া দোকানটাতে!’

কে?

কে? এত পরিচিত বলে মনে হচ্ছে। কে ছেলেটি?

কৌশিক, ও তো দেখছি কৌশিক!

সে এখানে কেন? কেন এসেছে। সেই কর্কশ কণ্ঠের মহিলাটি থাকা দোকানের ভেতরে, মানুষটার ঘরে সে কেন ঢুকেছে?

শ্রীমানের বুকটা ধড়ফড় করে উঠল।

তার মনে পড়ছিল অফিসের চৌকিদারটি বলা কথাগুলি– কৌশিক নাকি তার ওপরে রাগ করে রয়েছে।

এক অকারণ ভয় তাকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরেছিল।

চোখের সামনে প্রকাণ্ড ইমারতটা উঠছে। প্রতিদিনই মাটি থেকে উঁচু হতে আরম্ভ করেছে তার পিলার, বীম, লিন্টেলগুলি। অনেকগুলি ফ্ল্যাট আর দোকানের বুকিং ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে চলেছে আর নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো শ্রীমান কনস্ট্রাকশনের প্রতিটি কাজই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখতে শুরু করেছে।তার বাবাও মাঝেমধ্যে আসেন। তিনি নিজেও কমিশনে বুকিং করার কাজ নিয়েছেন এবং টোটো করে সারাদিন বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত মানুষের কাছে ফ্ল্যাট এবং দোকান বিক্রি করার চেষ্টা করছেন।

কথাটায় শ্রীমানের বেশ হাসি পায়।

বাবার ইচ্ছানুসারে নিচে দুটি দোকান এবং ওপরে দুটি ফ্ল্যাট ওদের কে দেওয়া ঠিক হয়েছে‌। ফ্ল্যাট গুলি ছোটো। প্রতিটি টেনেটুনে ১২০০ স্কোয়ার ফিটের মতো হবে। রমেন বলেছে ফ্ল্যাট গুলি মার্বেল টার্বেল লাগিয়ে সাজিয়ে দেবে। বাথরুমে নাকি জাকুরার ফিটিং লাগিয়ে দেবে। দোকান দুটিও ভাইয়ের চেম্বার এবং তার ফার্মেসি এই সবই বিনা খরচে সাজিয়ে গুছিয়ে দেবে। ছোটো হলে কী হবে, সুন্দর টেরেস থাকা পাঁচ মহলার ফ্ল্যাট হবে। টেরেসটা  ফ্রি। নগদ টাকার প্রসঙ্গটা উত্থাপনের আর সুযোগ হল না। কিন্তু কাজ দেখাশুনা করার জন্য তার একটা মোটা টাকা বেতনের বন্দোবস্ত হয়ে গেল।

তার কাগজটা নাকি এখনও বের হবে। অন্তত দিদি সেটাই বলে।

কিন্তু ওদের বেতন দেওয়াটাঅনিয়মিত হয়ে পড়েছে। শ্রীমানদেরও অফিসে যাওয়াটা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। ফ্ল্যাটের কাজে সে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে কাগজের অফিসে সে প্রায় না যাওয়ার মতো হয়েছিল। অঞ্জুদা বলার জন্যই সে মাঝে মধ্যে যেত। এডিটর স‍্যারও সময়মতো আসে না, সারাদিনে একবার মাত্র এসে পাক মেরে যায়। দিদির অবস্থাও একই। কাগজ বের করব বলে চকচকে অফিস ধীরে ধীরেমলিন হতে শুরু করেছে।

প্রিয়ম্বদা নাকি গত কয়েক মাস দিল্লিতে আছে। সেখানে কি যেন মাছ কমিউনিকেশনের কোর্স করছে এবং দিল্লিতে সংগঠিত প্রদর্শনগুলিতে নানা ধরনের কাজ করে। অফিসের ঠিকানায় সে তাকে পাঠানো ছোটো ছোটো কয়েকটি কার্ড পেয়েছে কিন্তু সে উত্তরে কিছুই পাঠায়নি।

শ্রীমান আজকাল অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ।

সকাল থেকে সন্ধ্যা মিস্ত্রিরা কাজ বন্ধ করা পর্যন্ত সে বিল্ডিং এর কাজে ব্যস্ত থাকে।

বাড়িটাকে দেখে প্রতিদিনই তার যেন  অবাক লাগে।

এখানটাতেই যে একসময় তাদের পুরোনো বাড়িটা ছিল সে কথা তার বিশ্বাস হতে চায় না।

একটা কালো হয়ে যাওয়া টিনের ঘর, পানবাজারের দালানগুলির মধ্যে সহজে চোখে পড়ে না। ভালোভাবে না তাকালে সেখানে যে একটা ঘর আছে বুঝতেই পারা যায় না। সামনে থাকা বেশ বড়োসড়ো দোকান দুটির মাঝখানের পথ দিয়ে যে পেছনদিকে যাওয়া যেতে পারে সেটা বুঝতেই পারা যায় না। সেই বাড়িটার জায়গায় এখন একটা বিশাল দালান উঠেছে। দিনের পর দিন ওটা  মাটির ভেতর থেকে ওপর দিকে মাথা তুলে  চলেছে। এখনও রাস্তা থেকেই ঠিকভাবে চোখে পড়ছে না। সামনের দিকে টিন এবং তরজার বেরা দিয়ে সাহা বাবু এবং বাকি দোকানির দোকান দুটি, সঙ্গে ওদের সাইট অফিস।

বাকি দোকানদার সহজে জায়গা ছাড়েনি। কর্কশ কণ্ঠের মানুষটার স্বামী মামলা করেছিল। সে একটা স্টে অর্ডার নিয়েছিল।

রমেন কথাটা জানতে পেরে অঞ্জুদার কাছে গিয়েছিল।

তারপরে কী হয়েছিল সেকথা বেশ কিছুদিন শ্রীমান জানতে পারেনি। কয়েকদিন পরে রমেন এসে হঠাৎ তাকে বলেছিল,’ ব্যাটা কেস তুলে নিয়েছে, বুঝতে পেরেছিস তো?’

‘ কেস তুলে নিয়েছে? কেন? কীভাবে করলি কাজটা?’

বিজ্ঞের মতো হাসি হেসে রমেন বলেছিল,’ জানিস তো প্রত্যেকেরই  প্রাণের মায়া আছে।’

শ্রীমানের বুকটা তখন আবার একবার ধড়ফড় করে উঠেছিল।

‘ বলতো, পুরো ব্যাপারটা খোলাখুলি বল,’ সে রমেনকে জোর করেছিল।

‘ সেদিন আমি যে গেলাম। ও বেটার কেস করার খবর পেয়ে আমি যে গেলাম, তোর মনে আছে তো? একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বেশ কায়দার সঙ্গে রমেন বলে যাচ্ছিল।’ আমি একেবারে গিয়ে অঞ্জুদার কাছে পৌঁছলাম। কথাটা ডিসকাস করলাম। পরেরদিন কেসের কাগজপত্র বের করা হল। উকিলের সঙ্গে দেখা করলাম এবং রাতের বেলা…   ….’

‘ রাতের বেলা কি?’

‘ কী আর হবে? বাপ-ছেলে দুটিকেইউঠিয়েনিয়ে এলাম।’

‘কী?’

‘ কী আর আছে এতে! অঞ্জুদা ছেলে পাঠিয়ে দিল। রাতের বেলা এসে বাপ-বেটা দুজনকেই উঠিয়ে নিল।’

‘ তারপরে? শ্ৰীমানের কণ্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে বের হল।

‘ তারপরে আর কী! বাপ-বেটা দুজনের হাত-পা বেঁধে একটা অন্ধকার ঘরে ফেলে রাখলাম। রাতের বেলা ছেলেকে কেউ কেউ উত্তম মধ্যম দিল । তার চিৎকার শুনে বাবার বোধোদয় ঘটল।’ 

শ্রীমানের শরীরে কাঁপুনি উঠে গেল।

সকালবেলা নিজে আমাদের সঙ্গে আমাদের উকিল বানিয়ে দেওয়া কাগজপত্র নিয়েগিয়ে নিজের উকিলের কাছে উপস্থিত হল এবং কেস উঠিয়ে নিল।

‘ কোনো আপত্তি করেনি?’

‘না। আপত্তি আর কী করবে। আমরা অফার দিলাম সাহাবাবুর মতো তুইও দোকান এবং ফ্ল্যাট কিনে নে। তোকে অসমিয়া বলে আরও একটু সস্তায় দেব। না হলে…   …..’

‘ না হলে কী?’ শ্রীমান প্রশ্ন করল।

তাকে বলা হল যে ছেলেকে মেরে এরকম জায়গায় পুঁতে রাখা হবে যে ডেড বডি কেউ খুঁজে পাবে না।’ রমেন কথাটা খুব সাধারণভাবে বলেছিল।

শ্রীমানের মুখ থেকে কথা নাই হয়ে গিয়েছিল। তার শরীরে কম্পন উঠেছিল। রমেন যখন এসে তাকে বাড়িতে নামিয়ে রেখে গিয়েছিল তখন সে প্রায় নেশাগ্রস্থ মানুষের মতো নড়বড় পায়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেছিল।

না ,সেদিন সে ভাত খেতে পারেনি।

তার ক্ষুধা নাই হয়ে গিয়েছিল। কোনো মতে সে তার রুমে প্রবেশ করে কাপড়চোপড় খুলেছিল। মা ভাত খাবার জন্য ডাকায় সে খেয়ে এসেছি বলে ফাঁকি দিয়েছিল। টেবিলের ওপরে রেখে দেওয়া জলের গ্লাসটা ঢক ঢক করে গলায় ঢেলে দিয়ে সে লাইটটা নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছিল। 

নিঃসার হয়ে পড়েছিল অনেকক্ষণ ।

ধীরে ধীরে ঘরের অন্ধকার হালকা হয়ে এসেছিল। ঘরের কোণে থাকা জিনিসপত্র গুলি চোখে পড়ছিল। আলো ছায়ার খেলা শুরু হয়েছিল এবং শ্রীমানের মনের ভেতরের ভয়টা ক্রমে ক্রমে বেড়ে আসতে শুরু করেছিল । তার মনে পড়ছিল ব্রহ্মপুত্রের তীরের সেই বালির খাদানটার কথা সেই হাঁ করে থাকা মানুষটার কথা । হঠাৎ তার এরকম মনে হচ্ছিল যে জ্যোৎস্না রাতে ব্রহ্মপুত্রের বালিতে এক ঝাঁক নীল বেগুনি রঙের ঝড় বইছে। শব্দ নেই !আশ্চর্য ধরনে শব্দ নেই ঝড়ের। হঠাৎ সে দেখল কুণ্ডলী পাকিয়ে আসা ঝড়ের মধ্যে একটা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া গ্যাস বেলুনের মতো একটি মুখ ভেসে আসছে ‐সেই মৃত মানুষটির মুখ।

সে ঘামছিল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠছিল।

তার মস্তিষ্কের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নীল বেগুনি ঝড় সমগ্র ঘরটার মধ্যে যেন ছড়িয়ে পড়েছিল। 

সে আর অপেক্ষা করতে পারেনি। বিছানা থেকে ধড়মড় করে উঠে সে ঘরের লাইটটা জ্বালিয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ এসে পড়া আলোতে তার এরকম মনে হচ্ছিল যেন ঘরটার কোণগুলি যেন নীল হলুদ ঝড়ের স্রোতগুলি অতি দ্রুত শুষে নিয়েছিল।

হাত বাড়িয়ে সে কর্ডলেস টেলিফোনটা সামনে এনেছিল। (ইতিমধ্যে রমেন তাকে যোগাযোগের সুবিধার জন্য একটা টেলিফোন কানেকশন করিয়ে দিয়েছিল কোনো একজন এমপির মাধ্যমে।)

সে রমেনকে ফোন করেছিল । 

রমেন বাড়ি পৌঁছে গেছে ।’কী হল? সে প্রশ্ন করেছিল।

‘আমাদের দোকানিটাকে কেসটা তুলে নেবার কথা বলার সময় কপালে পিস্তল লাগিয়ে ভয় দেখানো হয়েছিল কি?’

‘কী?’ রমেন আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করেছিল।

শ্ৰীমান প্রশ্নটা পুনরায় রিপিট করেছিল।

রমেন কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপরে সে উত্তর দিয়েছিল, ‘আমি ঠিক বলতে পারি না। আমি ছিলাম না ।কেন?’

‘না, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম,’শ্রীমানের গলায় যেন কিছু একটা আটকে ছিল। সামান্য দুটি কথা বলে সে ফোনটা রেখে দিয়েছিল।

তার ঘুম আসছিল না। আসলে লাইট নিভিয়ে ঘুমোতে তার ভয় করছিল। দুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা সেই পুরোনো ভয়টা তাকে বিবশ করে ফেলেছিল। সে ফোনের ডিরেক্টরিটা বের করে অনেকক্ষণ পর্যন্ত আর্কিটেক্ট, ইঞ্জিনিয়ার, সাপ্লায়ার এই মানুষগুলির সঙ্গে প্রজেক্টটি সম্পর্কে ফোনে কথা বলেছিল।

 

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত