| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: অমর লোকের প্রত্যাগত । মিলু শামস

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

চন্দ্রালোকের প্রথম আঘাত সয়ে যাওয়ার পর চারপাশ বেশ স্বচ্ছ লাগে। যে পথ দেখাচ্ছে সে চলছে আগে। অনেকটা অন্ধকে নির্ভরতা দেয়ার ভঙ্গিতে। এতকাল পর একা চলার জড়তা কাটিয়ে তার সঙ্গে হাঁটতে আমারও ভাল লাগে। সার বাধা বিপণি বিতান, এলোমেলো গলি পথ আর আধুনিক স্থাপত্যের দালানকোঠায় সাজানো এভিন্যু পেরিয়ে কিছুদূর এগোয় সে। বুঝতে পারি না কোথায় চলেছি। এ পথের মানচিত্র আমার জানা নেই। অন্ধের মতোই হাঁটছি। যেদিকে যাচ্ছে, যাচ্ছি পিছু পিছু। হঠাৎ হল্ট্ বলার মতো করে শক্ত পায়ে থামলে থতমত খেয়ে আমিও দাঁড়িয়ে পড়ি।
-এটাই
বলে সে।
-কী?
-আপনি যেখানে যাবেন বলে বেরিয়েছেন।
পায়ের পাতায় শেকড়ের টান অনুভব করলে বুঝতে পারি ঠিকই বলছে সে। এটাই।
অথচ কি বিভ্রান্তিকর পরিবর্তন!
একেবারে অচেনা যেন। নারকেল গাছগুলো নিজীর্ব। গুচ্ছ গুচ্ছ কাটা মাথা ঝুলছে পাতার ফাঁকে।
পুকুরের চারধারে এগুলো লাগিয়েছিলেন আমার বাবার বাবা। নারকেল গাছের ছায়া পুকুরের জল শীতল আর শেকড় মাটিকে শক্ত রাখবে বলে।
সত্যিই সারা বছর সুশীতল জল থাকত পুকুরে। ভাদ্রের দুপুরে পুকুরের জলে বাতাস কাঁপন তুলত আর কি এক মনোমুগ্ধকর ভঙ্গিতে দুলে উঠত আমাদের ঘর গেরস্তি। আমার মায়ের আদর আর আবেগ মেশানো ছিমছাম বসত ভিটায় বেড়ে উঠেছে আমাদের দুরন্ত কৈশর।
বর্ষায় তলিয়ে যাওয়া জলে আমরা যখন ভেলা ভাসাতাম তখন পুকুর আর আল ভেসে যাওয়া ফসলী ক্ষেতের জল আলাদা করে চেনা যেত না। থৈ থৈ জলে ভাসত গোটা গাঁ। রমিজ, অলকেশ, আলতাফ আর আমি গ্রামের পর গ্রাম দাপিয়ে বেড়াতাম।
এখন তেমন নেই। বাতাসের গতি আর জলশূন্য পুকুর দেখে ভাদ্র কি বৈশাখ বোঝার উপায় নেই। নারকেল পাতার ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়া ফোঁটা ফোঁটা রক্তে ভাসছে পুকুর, আল ভাসা ফসলী ক্ষেত, উঠোন, চৌকাঠ সব।
ঘরগুলো ভয়ানক বদলে গেছে। দখিনা বাতাস চলাচলের জন্য যে বাড়ির সুনাম আশপাশের দু’দশ তল্লাটে ছড়িয়ে পড়েছিল সেখানে ছোপ ছোপ গুমোট।
এক ঠায় ঘর উঠেছে উর্ধমুখে। ছায়ার মতো কিলবিল করছে তার অধিবাসীরা। অথচ কি আশ্চর্য কেউ কাউকে স্পর্শ করে না। প্রাচীন বটবৃক্ষের মতো আমি গিয়ে সামনে দাঁড়ালে তাদের বিস্মিত চোখ খানিক স্ফিত হয় তারপর যে যার মতো চলে যায়।
আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মুহূর্তে বিভ্রম জাগে সত্যিই কি এ আমার বসতভিটা?
দু’পায়ে শেকড়ের টান অনুভব করলে আবারও নিশ্চিত হই— হ্যাঁ এটাই।
এখানে, এইখানে জন্মেছিল আমার সন্তানেরা।
আমার স্ত্রী যেদিন প্রথম প্রসব করেছিলেন সেদিন আঙিনায় একটি কৃষ্ণচূড়া পুঁতেছিলাম। দ্বিতীয় প্রসবের সময় আরেকটি। তারপর আরেকটি। এভাবে গাছে গাছে ভরে গিয়েছিল আমাদের আঙিনা।
গনগনে দুপুরে গাছগুলোর লাল বর্ণ ফুল অগ্নিশিখার মতো জ্বলত। আমি আনন্দ আর উত্তেজনায় হারিয়ে যেতাম। আমার স্ত্রী বলতেন,
—দেখো, আমাদের সন্তানেরা একদিন এভাবে জ্বলে উঠবে। ঘরে ঘরে আগুন পৌঁছে দেবে।
সে কথা শুনে আমার বুক স্ফীত হতো। অমীমাংসিত স্বপ্নেরা ডালপালা ছড়াতে শুরু করলে আমি বিভোর হতাম সন্তানদের অনাগত ভবিষ্যত ভেবে।
সেই কৃষ্ণচূড়া বন আজ দেখি অন্যের দখলে।
সার সার মানুষ বনময় পাক খাচ্ছে। বোধহীন, ভাবলেশহীন। একদল জাদুকর জাদুকাঠির পরশ বুলিয়ে রূপকথার রাজকন্যার মতো অচেতন করে রেখেছে তাদের। তারা হাঁটছে চলছে যেন স্বপ্নের ঘোরে। আর জাদুকররা নতুন নতুন মায়াজাল ছড়িয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ছে।
ক’জন জাদুকর এক জায়গায় জারিগানের আসর বসিয়েছে। মাথায় ফেট্টি, গায়ে রঙিন জামা, পায়ে ঘুঙুর আর হাতে কারুকার্যময় ছড়ি। কোমর দুলিয়ে ছড়ি ঘুরিয়ে বয়াতি সুর ধরছে আর দোহাররা ‘আহা বেশ বেশ’ বলে ধুয়া তুলছে। বয়াতির শরীরী ভঙ্গিমা আর ছড়ি ঘোরানোর শৈল্পিক নৈপুণ্যে ছড়িটি থেকে থেকে এমন বাঙ্ময় হয়ে ওঠে যে আমি স্পষ্ট শুনতে পাই ওর কথা
‘জারি গানের আসরে এসে বয়াতির সুরে গলা মেলাও। নইলে…’
বাকিটুকু আর বলতে হয় না। এত নিখুঁত ভঙ্গিতে অবাধ্য দোহারের পিঠে তার নাচন শুরু হয়, চক্ষুষ্মান না হলে যা কেউ দেখতেই পাবে না।
পুরো আয়োজনে আমি মুগ্ধ অভিভূত বিস্মিত! পারফর্মিং আর্টে এরা এমন পারদর্শিতা অর্জন করেছে!
বিস্ময়ের আরও অনেক বাকি বুঝতে পারি বনের যেদিকে গাছগুলো অপেক্ষাকৃত বেশি ঘন সেখানে চোখ পড়তে। সুসজ্জিত জাদুকরের আরেকটি দল উন্মুক্ত মঞ্চে অভিনয় প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। অংশগ্রহণকারীদের পোশাক আশাকও জৌলুসপূর্ণ। বোঝা যায় এরা সবাই সম্পন্ন পরিবার থেকে এসেছে।
দারুণ কর্মপরিবেশ। হৈচৈ চেঁচামেচি নেই। শোরগোল করে এ ওর গায়ে হোঁচট খাচ্ছে না। বাধ্যানুগত শিক্ষার্থীর মতো পিনপতন নীরবতায় প্রশিক্ষকের প্রতিটি শব্দ, বডি ল্যাংগুয়েজ এমনকি এক শব্দ উচ্চারণের পর অন্য শব্দে যাওয়ার মাঝখানের বিরতিটুকুও অবিকল অনুকরণে আত্মস্থ করছে। রাজনৈতিক নাটকের পাইওনিয়ার এরভিন পিসকাটর বা বেরটোল্ড ব্রেখটে আগ্রহ নেই বরং স্তানিস্নাভস্কির নাট্য পদ্ধতির প্রতি ঝোঁক বেশি।

মুখে পিসকাটোর বা ব্রেখটের স্কুলের অনুসারী এবং এ দু’জনের তত্ত্বের সঙ্গে শাব্দিক ঐক্যের কথা বললেও মর্মবস্তুর দিক থেকে এরা পুরোপুরি ভিন্ন পথের। তবে হুবহু স্তানিসস্নাভস্কিও নয় সঙ্গে নিজস্ব পদ্ধতি মিশিয়ে ইম্প্রোভাইজেশনের নতুন এক ধারা প্রয়োগ করছে। মঞ্চে তাই পরিস্থিতি অনুযায়ী যে যার মতো অভিনয় করছে।
প্রথম দিকে কেউ কেউ নাকি ইম্প্রোভাইজেশনের তীব্রতা আড়াল করতে মুখোশ ব্যবহার করত। এখন ভয়ানক আত্মবিশ্বাসী হওয়ায় মুখোশের বালাই ত্যাগ করেছে। আরেকটি বিষয় এরা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ক্লাউন বা ভাঁড়ের ব্যবহার। এতো চমৎকারভাবে কাহিনীর মূল প্রবাহর সঙ্গে এদের ব্লেন্ড করেছে যার শৈল্পিক মান এক কথায় অসাধারণ। যেমন, চুরি ডাকাতি বা খুনের দৃশ্যে মূল চরিত্রদের কাজ শেষ হওয়া মাত্র বাদ্য বাজনা সহযোগে ভাঁড়েরা মঞ্চে নেমে পড়ে। যেমন মনোগ্রাহী তাদের বাচনভঙ্গি তেমনি আকর্ষণীয় সাজসজ্জা। দর্শকদের বিমোহিত হতে সময় লাগে না।
আমার খুব গোপালের কথা মনে পড়ে।
কৈশরে রমিজ অলকেশ আলতাফ আর আমি অকারণে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতাম। বানভাসি জলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুব সাঁতার খেলতাম। গোপালকেও সঙ্গে নিতাম। তবে গোপাল ভাঁড়ের সঙ্গে নামের মিল থাকায় আমাদের অলিখিত দলনেতা আলতাফ সব সময় দু’চার কথা শুনিয়ে ওকে সঙ্গী হওয়ার অনুমতি দিত। মশা তাড়ানোর ভঙ্গিতে দু’দিকে হাত নেড়ে বলত-
‘যা ভাগ্ কোনো ভাঁড়কে আমরা সঙ্গে নেই না।’
বেচারা গোপাল!
আজ আলতাফ থাকলে গোপাল ভাঁড়ের নামে ওর নাম হওয়ায় গর্বে ওর বুক ফুলে উঠতো।
গোপাল বায়োসস্কোপ দেখতে ভালবাসত খুব। ওর সঙ্গে আমরাও দেখতাম।
বায়োস্কোপ বাক্সের মোটা লাঠি ঘুরিয়ে বায়োস্কোপওয়ালা ‘কি চমৎকার দেখা গেল’ বলে সুরে সুরে একের পর এক দৃশ্যের বর্ণনা করত।
রানী ভিক্টোরিয়ার ছবি এলে বলত
মহারানী ভিক্টোরিয়া, বাঘের মতন চক্ষু দুইটা…’
বায়োস্কোপ শেষ হলে গোপাল বলত
‘রানী ভিক্টোরিয়ার চক্কু দুইটা বাঘের মতন ক্যানরে?’
‘বাঘের মতন দেইখাইতো ভিন দ্যাশে বইসা আমগো দ্যাশের ব্যাবাক কিছু পরিষ্কার দ্যাখবার পারে। তোর লাহান মার্বেল সাইজের চক্কু অইলে তো কিছুই দ্যাখবার পারতো না।’
গর্জে উঠতো আলতাফ।

কিন্তু আলতাফ যতই গর্জাক গোপাল দেখেছিল অনেক কিছু। তরুণ বয়সে অর্থনীতির তুখোড় ছাত্র গোপাল তত্ত্বের পরতে পরতে বাস্তবতার তীক্ষ্ন আলো ফেলে ঠিকই খুঁজে এনেছিল রানী ভিক্টোরিয়ার বাঘের মতো চোখের রহস্য। বায়োস্কোপ নয়, সত্যিকারের পুতুল নাচের সুতোর দেখা পেয়েছিল সে।
মনে মনে বলি- গোপাল, রানী ভিক্টোরিয়ারা এখন আর বায়োস্কোপে দেখা দেয় না রে! আমাদের বসত ভিটা এখন আরও বড় অদৃশ্য চোখের শক্ত বলয়ে বিদ্ধ।
কতকাল! আহা কতকাল হয়ে গেল! আমাদের স্বপ্নের বসতভিটায় এ কারা আসর জমিয়েছে?
অলকেশ, রমিজ, আলতাফ তোরা কোথায় রে!
হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে যাই কৈশোর যৌবনে।
—চলুন আপনার সময় শেষ।
পেছনে কর্কশ কণ্ঠস্বরে আবারও হল্ট বলার মতো করে থামি।
—কে?
—আমি।
পথপ্রদর্শকের কথায় চমকে উঠি। ভুলেই গিয়েছিলাম তার কথা। আমার সাত ফিট বাই তিন ফিট আবাসের কথা।
তাইতো, সময় শেষ। এবার সেই সাত ফিট বাই তিন ফিটে ফিরতে হবে আমায়।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত