| 3 মার্চ 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত প্রবন্ধ

আধুনিক যুগের জন্ম কাহিনি (পর্ব -৭)। হোমেন বরগোহাঞি

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস


 

বারো শতক পর্যন্ত ইউরোপে এরিস্টটলের বিষয়ে বিশেষ কেউ জানত না।তাঁর অমূল্য রচনাবলী কীভাবে ইউরোপের জ্ঞানপিপাসু পণ্ডিতদের হাতে গিয়েপড়ল সেটাও ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর কাহিনি।

     এরিস্টটলের ছাত্র মহাবীর আলেকজান্ডার বিশ্ববিজয় অভিযানে বের হয়ে ইজিপ্ট জয় করার পরে তিনি সেখানে তার নিজের নামে একটি নতুন নগর প্রতিষ্ঠা করেন।খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২ সনে স্থাপিত আলেকজান্দ্রিয়া নামের এই নগরটি ছিল প্রাচীন গ্রিক এবং ইহুদি সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র।আলেকজান্ডারের  মৃত্যুর পরে  ইজিপ্টের টলেমি বংশের গ্রিক রাজাদের রাজত্বকালেওআলেকজান্দ্রিয়া ছিল প্রাচীন জগতের একটি প্রধান জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র। সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং দুটি বৃহৎ রাজকীয় গ্রন্থাগার ছিল। সেই গ্রন্থাগারে বিভিন্ন বিষয়ের প্রায় সাত লক্ষ বই ছিল। সেই গ্রন্থাগারের জন্য গ্রিস থেকে অন্যান্য বইয়ের সঙ্গে এরিস্টটলের বইগুলিও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কালক্রমে সেই বইগুলির বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে যায় এবং চিরকালের জন্য হারিয়েযায়।

 পরের শতাব্দীগুলিতে বিভিন্ন আক্রমণকারীর হাত বদলে আলেকজান্দ্রিয়া অবশেষে ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে আরবদের দখলে আসে।সময়টা ছিল আরব সভ্যতার স্বর্ণযুগ।গ্রিকদের গৌরব-রবি তখন অস্তমিত। ইউরোপ তো ধর্মীয়গোঁড়ামিতে মানুষের প্রশ্নশীলতাকে স্তব্ধ করে রেখেছে। কিন্তু নতুন করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়াআরবরা তখন পৃথিবীর প্রধান রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আরম্ভ করে উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং কেন্দ্রীয়এশিয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা। এই রাজনৈতিক শক্তিকে অবলম্বন করে যে সমৃদ্ধিশালী আরব সভ্যতা গড়ে উঠল সেই আরব সভ্যতা ছিল পৃথিবীর সেই যুগের শ্রেষ্ঠ সভ্যতা। শিক্ষা- সাহিত্য-বিজ্ঞান-দর্শন-গণিত চিকিৎসা বিজ্ঞান, জ্ঞান চর্চার এই সমস্ত ক্ষেত্রে আরবরাই ছিল সে যুগের প্রধান নায়ক।৬৪২ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্দ্রিয়া আরবদের দখলে আসার পরে আরব পন্ডিত  তার বিশ্ব বিখ্যাত গ্রন্থাগারের সংগৃহীত হয়ে থাকা গ্রিক গ্রন্থ সমূহ অধ্যয়ন করতে এবং সঙ্গে সেই সব আরবিভাষায় অনুবাদ করতে শুরু করে। অবশ্য পন্ডিতদের অনুমান মতে আরব পন্ডিতরা নিজে বোধ হয়গ্রিক ভাষা জানতেন না। মাঝখানের শতাব্দীগুলোতে সিরিয়ান ভাষায় অনূদিত হওয়া গ্রিক গ্রন্থ গুলি অধ্যয়ন করে সেখান থেকে তারা সেইসব গ্রন্থ আরবিভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। 

৭১১ খ্রিস্টাব্দে আরব এবং মরক্কোরবারবের তথা মুররাএকত্রিত হয়ে স্পেন দখল করে।এইদখলকারীসেনাবাহিনীর ভেতরে মুররাইছিল সংখ্যায়বেশি; সেই জন্য স্পেনে প্রায় সাতশোবছর ধরে চলা মুসলমান শাসনের কালকে সাধারণত মুরের শাসন বলা হয়। কিন্তু তাদের নেতৃত্ব ছিল আরবদেরহাতে।এইআরবরা তাদের জ্ঞান ভান্ডার স্পেনে নিয়েযায় এবং ইউরোপীয়দের সেই জ্ঞান বিতরণ করে সভ্যতার ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা করে।

মুসলমান শাসনেরসময়স্পেনেজ্ঞানচর্চার দুটি বড়ো কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল একটি কর্ডোভায়,অন্যটি টলেডোতে।  কর্ডোভা বিখ্যাত হয়ে পড়েছিলচিকিৎসা বিজ্ঞানের চর্চা এবং অধ্যয়নের কেন্দ্র হিসেবে। এই আরব চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের রচনা ল্যাটিন ভাষায়অনূদিত হয়ে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়েপড়েছিল।জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চার ক্ষেত্রেও কর্ডোভারআরব পণ্ডিতরাই ছিলেন ইউরোপের শিক্ষক এবং প্রথম প্রদর্শক। 

গ্রিক বিজ্ঞানী টলেমি (৯০-১৬৮খ্রিষ্টাব্দ) এই মত প্রচার করেছিলেন যে পৃথিবী একটি স্থির  গ্রহ এবং এটিই হল সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র। ১৫১১ খ্রিস্টাব্দেকোপার্নিকাস এই মত ভুল বলে প্রমাণ না করা পর্যন্ত প্রায় এক হাজার বছর ধরে এই ভুল মতটাই চলে আসছিল। কিন্তু কর্ডোভার আরব পন্ডিতরাজ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চার ক্ষেত্রে এতটাইএগিয়েগিয়েছিলেন যে বিক্রজি নামের একজন আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানী কোপারনিকাসের জন্মের কয়েক শতাব্দীর আগেই টলেমির  মতের অভ্রান্ততা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।তাঁরা তখনই আলোক বৈজ্ঞানিক কাঁচ বা অপটিক গ্লাস এবং উড়তে পারা যন্ত্র নির্মাণ করেছিলেন। চোখের গঠন তথা দৃষ্টিশক্তির বিষয়েও আধুনিক বিজ্ঞান জানা বহু কথা আরব বিজ্ঞানীরা তখনই আবিষ্কার করেছিলেন। তাই এই কথায় আশ্চর্য হওয়ারমতো কিছু নেই যে সমগ্র ইউরোপের লোকদের জন্য কর্ডোভা পরিণত হয়েছিল পবিত্র তীর্থক্ষেত্রে।


আরো পড়ুন: আধুনিক যুগের জন্ম কাহিনি (পর্ব -৬)। হোমেন বরগোহাঞি


কর্ডোভার পতনের পরে জ্ঞান সাধনার কেন্দ্র হিসেবে কর্ডোভার স্থান গ্রহণ করল টলেডই। ইউরোপের প্রতিটি জায়গা থেকে পন্ডিতএবং বিদ্যার্থীরা এসে টলেডিতে সমবেত হয়েছিল এবং তারা আরবী ভাষার গ্রন্থ গুলি ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করে সমগ্র ইউরোপে একটি নতুন ভাব আন্দোলনের সূচনা করেছিল।এই আরবী ভাষার গ্রন্থ গুলির ভেতরে ছিল প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের এবং বিশেষ করে এরিস্টটলের অমর রচনাবলী। আরবী ভাষা থেকে ল‍্যাটিনেঅনূদিত হয়ে এরিস্টটলেররচনাবলী যখন বারো  শতকে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ল, তখন এই ইউরোপের মনের মধ্য দিয়েবিস্ময় এবং আনন্দের একটি বিদ্যুৎ-স্রোত বয়ে গেল। ইউরোপ প্রথমবারের জন্য এরিস্টটলকে আবিষ্কার করল এবং তার ফলে চিন্তা-চর্চারক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা হল। বলা বাহুল্য যে এরিস্টটলের সঙ্গে ইউরোপকে পরিচিত করে দেওয়ার সমস্ত কৃতিত্ব আরবদের প্রাপ্য । এই কথা প্রমাণ করে যে আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতায় আরবদের একটি বিরাট অবদান আছে। 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত