| 19 এপ্রিল 2024
Categories
শারদ সংখ্যা’২২

শারদ সংখ্যা গল্প: খিদে । আদিমা মজুমদার

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

জীবনে কত কিছুই তার করা হয়ে ওঠেনি।কেউ তাকে ভালোবাসে না,সেও কাউকে ভালোবাসতে পারেনি শুধু কয়েকটা অবলা প্রাণী বিড়াল ছাড়া।বিজয়া দশমীর বিসর্জনের দিন মা-বাবা দুজনের সলীল সমাধি হয়। জল দেখলে সে আঁতকে ওঠে।জলের অপর নাম জীবন,মৃদুল বলে জলের অপর নাম মরণ।দিশেহারা মৃদুল ফাটকবাজারেই বাবার দেখানো পথ ধরে।শুঁটকি কারবার করে। তার চারটি মেয়ে বিড়াল ও একটি পুরুষ বিড়াল আছে। বিয়ে নামক প্রহসনে জড়ায়নি সে। বিড়ালের সহবাস দৃশ্য তাকে খুব বেশি আনন্দ দেয়। বিছানার চারদিকে তারা বিচরণ করে, খায় দায় আর ঘুমায়। শুঁটকির মাথা তাদের প্রিয় খাদ্য।
মৃদুল আগে ভেটেনারি গুদামে চতুর্থ শ্রেণীর কন্ট্রাকচুয়াল চাকরি করতো।
গরু-মহিষের খুদকুঁড়ো রাখা গুদাম ভর্তি ইঁদুর, বস্তা সব কেটে ফেলে। ইঁদুর মারার জন্য বিষ মাখিয়ে ভাত, বিষ বিস্কুট দিয়েছে কিন্তু একটাও ইঁদুর মরতে দেখা যায়নি।
কাচুমাচু হয়ে বড়বাবুকে সে ঘটনাটি জানায়। বাবু বলেন ইঁদুরের গলায় ঘন্টা বাধতে পারলে আর উপদ্রব করবে না।কত রাত যে ঘুমায় নি, ইঁদুর ধরে ঘন্টা বাধবে বলে । ইঁদুর বিড়ালের খেলা নিয়ে সুখেই ছিল সে। সব সময় তার বিড়ালের চিন্তা ।নিজে না খেয়ে বিড়ালকে সে খাওয়াবেই।
তার কলিগ জয়ী বলল এক কাজ কর,দুটো বিড়াল নিয়ে আয় দেখবে আর ইদুর থাকবে না, মেরে ফেলবে সব। মৃদুল বলে- চারটি বিড়াল আছে…
— ওহ, তোমার মতন হিজড়া।
মৃদুল দুঃখ পায় জয়ীর কথায়।
একদিন রাতে সে দেখে, চোখ লাল লাল করে ইঁদুর বিড়ালের দিকে চেয়ে আছে, যেন বলছে ‘আর তোদের ভয় পাইনা ‘সেদিন পাল্টে গেছে।কে শিকার আর কে শিকারি বুঝা যাচ্ছেনা। সুযোগ বুঝে বিড়াল ইঁদুরকে ধরার চেষ্টা করে কিন্তু বিফল হয়।
এই অতিমারির সময় মৃদুলকে তার ডিপার্টমেন্ট থেকে ছাঁটাই করে দেয়া হয়। তবু সে পড়ে থাকে একটি পরিত্যক্ত অন্ধকার কোয়ার্টারে। অফিসের সব কাজ বিনা মাইনেতে করে। শুঁটকি কারবারে তার যথেষ্ট লাভ ছিল, বিড়ালসহ তার এক পেট চলে যেতো কোনো রকম ।
মাঝে মাঝে রাতে জোনাকি পোকা ধরে খেলতো মৃদুল। জয়ী তাকে জিজ্ঞেস করলে বলে- তাদের পাছায় আলো জ্বলে, দেখতে ভালো লাগে।
লকডাউনে বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মৃদুলের বিড়ালগুলো পড়েছে বেশি বিপদে। শুঁটকি ছাড়া তারা ভাত খায় না। ক্ষুধায় মৃদুলকে খুবলে খাবে এমন অবস্থা। ‘ভেটেরিনারি ডিপার্টমেন্ট একটা! সরকার তা উঠিয়ে দিলেই পারতো। তা না করে আমাকে ছাঁটাই করলো। তিন হাজার টাকায় কতটা প্রানী আমরা বাঁচতাম।’ প্রায় সগদোক্তি করে মৃদুল। বিড়ালের উপর রাগ করে বলতে থাকে – ‘তোমরাও আমার মতো বোকা হলে, যাও বলছি ধরে আনো ইঁদুর, আজ আমি ভাজা করে খাবো।
পেছনের বারান্দায় মাথাটি দুই হাঁটুর মধ্যে লুকিয়ে বসে থাকে মৃদুল, হঠাৎ তার পায়ে কে যেন সুড়সুড়ি দেয়, মাথা তুলে দেখে তার চারটি মেয়ে বিড়াল ইঁদুর মেরে তার সম্মুখে রেখেছে পুরুষ বিড়ালটি চোখ বুজে মৃদুলের পাশে বসে থাকে যেন তার ছোটভাই। মৃদুল খুশিতে নেচে ওঠে। তার বাচ্চাদের খাওয়া হয়ে গেছে।ইঁদুরগুলো পুড়ে লবন দিয়ে পাঁচ প্রাণী পেট ভরে খায়। অপার শান্তিতে সে আজ ঘুমাবে।শালা ক্ষিদের জ্বালা যারা অনুভব করতে পারে না, তারা এই গল্প পড়বে না বলে দিলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত