Site icon ইরাবতী

ধারাবাহিক: উত্তর উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য (পর্ব-১) । ফয়েজ আলম

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,উত্তর-উপনিবেশী
Reading Time: 5 minutes

পশ্চিমারা শাসন শোষণের স্বার্থে, উপনিবেশ কায়েম রাখার স্বার্থে যেজ্ঞানভাষ্য তৈরি করেছে তাতে উপনিবেশিতদের মানসিকভাবে দাসে পরিণত করেছে। মনোজগতের এই উপনিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই উত্তর উপনিবেশী ভাবচর্চা জরুরি। উপনিবেশ স্বাধীন হওয়ার পর উপনিবেশক সংস্কৃতির প্রভাব বহাল থাকে স্বাধীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে, যাকে বলা হয় উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতি। এই প্রভাব কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটাই হলো বি-উপনিবেশায়ন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার পর এখন আত্ম-উদবোধন ও প্রতিরোধ সংগ্রাম মূলত উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতির বিরুদ্ধে, সাংস্কৃতিক ও ভাবাধিপত্যের নিরবচ্ছিন্ন কিন্তু অসম উপস্থিতি ছুড়ে ফেলার জন্য। এর শুরু সাংস্কৃতিক ক্রিয়াশীলতায়, বোধ ও ভাবের সংগ্রামে। উত্তর উপনিবেশবাদ নিয়ে আরো গভীরভাবে জানতে ইরাবতীর ধারাবাহিক ফয়েজ আলমের উত্তর উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য লেখাটির আজ থাকছে পর্ব-১।


মানব সভ্যতার গত শ’চারেক বছরের ইতিহাসে উপনিবেশ ও উপনিবেশী প্রভাব খুবই বিস্তৃত ও সক্রিয় এক প্রপঞ্চ। গোটা জ্ঞানকান্ডের নানা ডালেনালে এর চাপ চোখে পড়ার মতো ঝলঝলে ও গভীর। এর আগেও শক্তির বলে এক দেশ আরেক দেশ দখল করেছে, সেখানে বসত করেছে। তবে শাসনব্যবস্থা, সমাজ, সংস্কৃতি, জ্ঞান–সবদিক থেকে অনেকগুলো মানবগোষ্ঠীকে এমন রাক্ষসের মতো গিলে ফেলার প্রচেষ্টা এর আগে আর হয়নি। ষোলো-সতেরো শতক থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সর্বমাত্রিক আগ্রাসন ও আধিপত্যের ধরনই আলাদা, তার প্রভাবও ভয়াবহ; বিশেষ করে জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে।

তবে মানুষের চিন্তাধারায় পশ্চিমের মাতব্বরির সূচনা উপনিবেশ-প্রতিষ্ঠার পূর্বে, উপনিবেশায়নের (Colonization) একরকম প্ররোচনাও এর মধ্যে ছিল। তখন থেকে সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, চিত্রকলা, ভাষাবিজ্ঞান, সমাজবিদ্যা-সর্বত্র পশ্চিমের জ্ঞানগুরুরা দাপটের সঙ্গে তত্ত্ব দিয়েছেন, তত্ত্ব ভেঙেছেন, আবার আধভাঙা তত্ত্বের ওপর খাড়া করেছেন নতুন তত্ত্বের বহুতল দালান। এইরকম আধিপত্যের মধ্যে গত কয়েক দশকে গুরুতর একটা পরিবর্তন এসেছে। উত্তর-উপনিবেশী মন এখন নানা দিক থেকে উপনিবেশের ছাপগুলো পরীক্ষা করে দেখতে আগ্রহী। সে যাচাই করতে চায় তার অন্তরে-বাহিরে উপনিবেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও ধরণ। প্রাক্তন উপনিবেশের পন্ডিতেরা এখন পশ্চিমে বসে ওদের জ্ঞানজগতের আধিপত্যে হস্তক্ষেপ করছেন, ওখানে খাড়া করতে চাইছেন এককালের উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর নিজস্ব স্বর ও ভঙ্গিমা। এই হস্তক্ষেপ-চেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্ব ‘উত্তর-উপনিবেশবাদ’ (Postcolonialism), ‘উত্তর-উপনিবেশী অধ্যয়ন’ (Postcolonial Study) প্রভৃতি পরিচয়ে এ-মুহুর্তে খুবই আলোচিত ও বলশালী। উত্তর-উপনিবেশবাদ সম্পর্কে প্রথম কথা, এটি গজিয়েছে পশ্চিমা জ্ঞান-শৃঙ্খলের আধিপত্য অস্বীকার করে, এর প্রধান তাত্ত্বিকেরাও প্রাক্তন উপনিবেশের মানুষ।

উত্তর-উপনিবেশবাদ উপনিবেশের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ এবং উপনিবেশের প্রভাব নির্বীজ করার লক্ষ্যে উদ্ভূত সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চা ও আন্দোলন। উপনিবেশী শাসকদের উদ্যোগে-সমর্থনে পরিচালিত স্বার্থসংশ্লিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানচর্চার কারণে বিভিন্ন দেশ ও জাতির ঐতিহ্য-অভিজ্ঞতা, ভাবনার জগৎ ও তার চর্চার ক্ষেত্রে যেসব নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত ও দূর করা এবং আধিপত্যমুক্ত জ্ঞানচর্চার পথ খুলে দেওয়ার কিছু তাত্ত্বিক প্রণোদনা ও উপায় এবং একরকম আন্দোলন বলা যেতে পারে উত্তর-উপনিবেশবাদকে। চরিত্রের দিক থেকে এটি একটি পাল্টা জ্ঞানভাষ্য (Counter Discourse)।

উপনিবেশ-প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কোনো-না-কোনো রূপে প্রকাশ পেয়েছে প্রতিরোধের মনোবৃত্তি। চাপে-পড়া জনগোষ্ঠী তাদের সুবিধাজনক মাধ্যম ও কায়দায় উপনিবেশের সাংস্কৃতিক প্রভাব প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এ-যাবৎ প্রায় সব উপনিবেশই রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করেছে, কিন্তু সেখানে বিদেশী শাসনের প্রভাব শেষ হয়নি। উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর জ্ঞানজগৎ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও দৈনন্দিন চর্চায় উপনিবেশী প্রথা-পদ্ধতির উপস্থিতি এখনো অব্যাহত। কাজেই বলা উচিত, উপনিবেশ-প্রতিষ্ঠার পর থেকেই উত্তর-উপনিবেশী প্রতিরোধ-চেষ্টার সূচনা, এখনো তা চলছে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন দেশগুলোয় বহাল উপনিবেশী প্রভাবের বিরুদ্ধে।

এ নিয়ে তর্ক আছে। অনেকে মনে করেন, উপনিবেশগুলো স্বাধীন হওয়ার পর তার সমাজ ও সংস্কৃতিতে যেসব উপনিবেশী প্রভাব রয়ে গেছে, সেগুলো চিহ্নিত ও দূর করার মনোভঙ্গি ও কৌশলটাই হলো উত্তর-উপনিবেশবাদ। এক্ষেত্রে এ-তত্ত্ব মূলত উপনিবেশী শাসন থেকে স্বাধীনতা-অর্জনের পরের ব্যাপার হয়ে দাড়ায়।

এ-জাতীয় ধারণা উত্তর-উপনিবেশী তত্ত্বকে আগাম খাটো করে, আবার শেকড় থেকে আলাদা করে এর জোরও কমিয়ে দেয়। এ-কথা সত্যি যে, গত শতকের সত্তর-আশির দশকেই উত্তর-উপনিবেশবাদ তাত্ত্বিক রূপ পায় এবং মূলত (এখন স্বাধীন) প্রাক্তন উপনিবেশগুলোর জ্ঞানজগৎ ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক তৎপরতায় টিকে-থাকা উপনিবেশী প্রভাব নিষ্ক্রিয় করাই এর প্রধান লক্ষ। কিন্তু মনে রাখা দরকার, কোনো দেশেই রাতারাতি উপনিবেশী ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়নি। তা ঘটেছে ধীরে ধীরে এবং দীর্ঘ সময়ে ধরে। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রথমে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভাবনার জগতে আশ্রয় নিয়ে সে-প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বাসে, চর্চায়, কর্মে। তাই শুরুতে ওই চিন্তার জগতে ঢুকতে হবে, ওখানকার উপনিবেশী বিন্যাসগুলো উলটে দিতে হবে, নিষ্ক্রিয় করতে হবে। এ-তত্ত্বেও বড় কাজ হলো উপনিবেশকালে গড়ে ওঠা বিশাল জ্ঞানভান্ডারকে খুলে ধরে তার ভেতরের রাজনীতি খোলাসা করে দেখিয়ে দেওয়া যে, উপনিবেশী জাতিগুলো কীভাবে কিছু একতরফা ধারণা ভিত্তি করে উপনিবেশের জনগোষ্ঠীকে প্রথমে ‘আন’ (other) হিসেবে ধার্য করেছে এবং নিজেদের থেকে আলাদা করে নিজেদেরকে উৎকৃষ্ট এবং এদেরকে নিকৃষ্টরূপে চিত্রিত করেছে। উপনিবেশী শাসনের ছত্রছায়ায় শিল্প, সাহিত্য, ইতিহাস, ভাষাবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে রচিত হয়েছে বিপুলসংখ্যক গ্রন্থ। মূলত এই জ্ঞানভাষ্যই উপনিবেশের মানুষকে প্রতিষ্ঠা করেছে ‘আনরূপে; জ্ঞান ও চর্চার জগতে ‘আনকে ধার্য করেছে নিকৃষ্ট বলে; সম্রাজ্যের মানদণ্ডে সৃষ্টি করেছে কেন্দ্র-প্রান্তের ধারণা। অর্থাৎ উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতির মধ্যে যাকে বলছি উপনিবেশী প্রভাব, তার প্রায় পুরোটাই ওই জ্ঞানভাণ্ডারের সৃষ্টি। তা নিষ্ক্রিয় করতে হলে হানা দিতে হবে ওই জ্ঞানভাষ্যে। এ হলো কাজের জায়গার কথা।

এরপর আসে পদ্ধতিগত কিছু ব্যাপার। উত্তর-উপনিবেশবাদেও ব্যবহার্য কিছূ কৌশল বিকশিত হয়েছে উপনিবেশি কালেই। অনেক দেশে উপনিবেশ-প্রতিষ্ঠার মুহুর্ত থেকে ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চার মধ্যে নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধের মনোভঙ্গি; যত দুর্বল বা বিচ্ছিন্ন হোক, এর অস্তিত্ব অস্বীকার করার নয়। কাজেই, উত্তর-উপনিবেশবাদের প্ররোচক পরিস্থিতি এবং চর্চা ও লেখালেখির ইতিহাস বেশ পুরানা, যদিও তখন এর কোনো নাম ছিল না (অ্যাশক্রফট ১৯৯৯; ১, ১১৭)। এইসব প্রবনতা ও চর্চা আরো কিছূ সাম্প্রতিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও কৌশলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উত্তর-উপনিবেশবাদ নামে সংগঠিত তাত্ত্বিক রূপ নেয় গত কয়েক দশকে। বোঝাই যায় সময়-সম্পর্কিত বিরোধটা খুব জটিল নয়। উত্তর-উপনিবেশী তত্ত্ব উদ্ভবের ইতিহাস গত কয়েক দশকে সীমিত রেখে তার কাজের জায়গা ও কালিক সীমানা উপনিবেশী শাসনের সূচনা পর্যন্ত বাড়িয়ে নিলেই চলে।


আরো পড়ুন: ইরাবতীর মুখোমুখি উত্তরউপনিবেশি তাত্ত্বিক কবি ফয়েজ আলম


আবার, অনেকে মনে করতে পারেন, এ-তত্ত্ব হয়তো উত্তরাধুনিকতারই (Postmodernism) একটি অভিঘাত। এর কিছু কারণও রয়েছে। ইউরোপের কেন্দ্রমুখী সংস্কৃতি বিনির্মাণের যে-প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করি উত্তরাধুনিকতায়, কেউ কেউ তার সঙ্গে সাদৃশ্য খ্ুজে নিতে পারেন উপনিবেশী জ্ঞানভাষ্যের কেন্দ্র-প্রান্ত বিন্যাস ভাঙার উত্তর-উপনিবেশী প্রচেষ্টার সঙ্গে। আবার অনেক ইউরোপীয় তাত্ত্বিকের লেখা যেমন লাঁকার পর্যবেক্ষণ, দেরিদার বিনির্মাণ, ফুকোর কিছু বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত উত্তরাধুনিক তাত্ত্বিকদের কাছে যেমন, তেমনি কোনো কোনো উত্তর-উপনিবেশী চিন্তকের নিকটও কাজের জিনিস বলে মনে হয়। কিন্তু উপনিবেশী প্রভাব মোচন বা নয়া-উপনিবেশী আগ্রাসন প্রতিরোধের কোনো তাগিদ বা লক্ষণ উত্তরাধুনিকতায় চিহ্নিত করা যায় না। অনেকে তো বলেছেনও যে, উত্তরাধুনিকতা মূলত পশ্চিমা জ্ঞানভাষ্যেরই (Discourse) একটি রূপান্তরিত পর্ব, যা প্রাক্তন-উপনিবেশগুলোর ওপর কিছু-না-কিছু আধিপত্যশীল প্রভাব ফেলেছে। সেক্ষেত্রে স্বীকার করে নিতে হয় যে, সম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির ভিত্ থেকে উদ্ভুত এক তরঙ্গের প্রভাব হিসাবেই উত্তরাধুনিকতাকে বিচার করতে হবে। এবং তাহলে উত্তরাধুনিকতাও উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্বের বি-উপনিবেশনের (Decolonization) লক্ষ্যে পরিণত হবে।

উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্বের কাজের পরিধি কেবল উপনিবেশী প্রভাবের মধ্যে সীমিত নয়। এখন বিশ্বায়নের নামে আর্থ-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মধ্য দিয়ে যে নয়াউপনিবেশায়ন (Neocolonization) চলছে পৃথিবীজুড়ে, এ-তত্ত্ব তাকেও চর্চার অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। উত্তর-উপনিবেশী তত্ত্বের উৎস যাদের লেখাজোকা তার মধ্যে ফ্রান্ৎজ ফানোর লেখায় নয়া-উপনিবেশবাদ বিকাশের ব্যাপারে পরিষ্কার ইঙ্গিতও আছে। আসলে উপনিবেশী প্রভাব নয়া-উপনিবেশবাদ বিস্তারের সহায়ক এক পরিস্থিতি।

কাজের ক্ষেত্র ও উদ্দেশ্য বিচার করলে উত্তর-উপনিবেশবাদের সীমনা কেবল বাড়তেই থাকবে। উপনিবেশী শিক্ষা ও জ্ঞান সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সকল বিষয়েই প্রভাব ফেলেছে, তার কিছুটা সুফলপ্রদও ছিল হয়তো। তবে বেশির ভাগই কোনো-না-কোনোভাবে নেতিবাচক। তাহলে সাহিত্য, দর্শন, রাজনীতি, সমাজবিদ্যা, ইতিহাস, ধর্মচর্চা, অর্থনীতি, শিল্পকলাসহ বহু বিষয়ই তার আওতায় এসে যায়।

সীমিত পটভূমিতে উত্তর-উপনিবেশবাদের পরিচয় দেওয়া যায় এভাবে: এ-তত্ত্ব প্রাক্তন বা বর্তমান উপনিবেশে রচিত সাহিত্য পাঠ করা ও লেখার উপায় নিয়ে কাজ করে; সেই সাহিত্যে উপনিবেশকের (Colonizer) সংস্কৃতি কীভাবে উপনিবেশিতের (Colonized) ঐতিহ্য, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে বিকৃত করে এবং উপনিবেশিতদের নিকৃষ্ট হিসেবে চিত্রিত করে, তা পুঙ্খনাপুঙ্খ চিহ্নিত করতে চায়। এককালের উপনিবেশিত জনগোষ্ঠী এখন তার রচিত সাহিত্য যেভাবে (ওই বিকৃতি এড়িয়ে) তার আত্মতা খাড়া করতে চায় এবং তার অতীত ঐতিহ্যের পটভূমিতে অতীতকে নিজের জিনিস বলে দাবি করে, তা বুঝে দেখা এবং যথাযথ উপায়ে জোরদার করাও এ-তত্ত্বের জরুরি কাজ। এছাড়া, এ-তত্ত্ব সীমানা বাড়িয়ে খোদ উপনিবেশকের নিজ দেশে রচিত সেসব সাহিত্যেও হস্তক্ষেপ করতে আগ্রহী, যেগুলো ধর্মেকর্মে উপনিবেশবাদের সাফাই-গীত।

এক অর্থে এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদকে উত্তর-উপনিবেশবাদের তাত্ত্বিক পীর বলা যেতে পারে, বিশেষত তার অরিয়েন্টালিজম গ্রন্থের কারণে। এ-গ্রন্থে সাঈদ পশ্চিমের বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনা ঘেঁটে দেখান কীভাবে উপনিবেশী জ্ঞানচর্চা উপনিবেশিতের সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা এবং বাস্তবতাকে বিকৃত করে, এমনকি মুছে ফেলে; আর এর মধ্য দিয়েই উপনিবেশিতদের চিহ্নিত করে নিকৃষ্ট ‘আন’রূপে। এই যে নিকৃষ্ট, অসভ্য, নিয়ন্ত্রণযোগ্য ‘আন’রূপে চিত্রিত করার প্রবনতা, একসময়ে তা-ই পরিণত হয় জ্ঞানচর্চার ধরনে। ক্রমে এই জ্ঞান সংক্রামক পদ্ধতিতে সৃষ্টি করে আরো জ্ঞান ও ভবিষ্যৎ জ্ঞানচর্চার ধারা। উপনিবেশ-প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় প্ররোচনাও এর মধ্যে নিহিত ছিল। এটাই উত্তর-উপনিবেশী তত্ত্বের গোড়ার কথা। উপনিবেশকেরা কেবল উপনিবেশী জ্ঞানভাষ্যের মূল্য আরোপ করেই বসে থাকেনি, বরং নিজেদেরকে আদর্শ মানুষ হিসেবে প্রচার করে স্থানীয়দের উদ্বুদ্ধ করেছে, যেন এরাও ইউরোপীয়দের মতো হওয়ার চেষ্টা করে। এটিই মানুষের বিশ্বজনীনতার (Universality) ধারণা। অর্থাৎ পশ্চিমা জ্ঞানভাষ্য মানুষের এমন একটি বিশ্বজনীন আদর্শ রূপ নির্মাণ ও প্রচার করেছে, যা আসলে ইউরোপের আদর্শ মানুষের প্রতিবিম্ব। আত্মপরিচয় নিয়ে হীনমন্যতার শিকার স্থানীয়রা স্বাভাবিকভাবেই ওই আদর্শ মানুষ হয়ে ওঠার আকাঙ্খা লালন করে। উপনিবেশের জ্ঞানজগতে এইসব উপনিবেশী বিন্যাস নিষ্ক্রিয় করা (বা উলটে দেওয়া) উত্তর-উপনিবেশী অধ্যয়নের লক্ষ্য। উপনিবেশী প্রভাবের ধরন এবং সেসব নিষ্ক্রিয় করার কিছু পদ্ধতিগত দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় সাঈদের অরিয়েন্টালিজম ও কালচার অ্যান্ড ইম্পিরিয়ালিজম গ্রন্থে।

Exit mobile version