Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,উপনিবেশী

ধারাবাহিক: উত্তর উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য (পর্ব-৩) । ফয়েজ আলম

Reading Time: 3 minutes

পশ্চিমারা শাসন শোষণের স্বার্থে, উপনিবেশ কায়েম রাখার স্বার্থে যেজ্ঞানভাষ্য তৈরি করেছে তাতে উপনিবেশিতদের মানসিকভাবে দাসে পরিণত করেছে। মনোজগতের এই উপনিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই উত্তর উপনিবেশী ভাবচর্চা জরুরি। উপনিবেশ স্বাধীন হওয়ার পর উপনিবেশক সংস্কৃতির প্রভাব বহাল থাকে স্বাধীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে, যাকে বলা হয় উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতি। এই প্রভাব কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটাই হলো বি-উপনিবেশায়ন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার পর এখন আত্ম-উদবোধন ও প্রতিরোধ সংগ্রাম মূলত উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতির বিরুদ্ধে, সাংস্কৃতিক ও ভাবাধিপত্যের নিরবচ্ছিন্ন কিন্তু অসম উপস্থিতি ছুড়ে ফেলার জন্য। এর শুরু সাংস্কৃতিক ক্রিয়াশীলতায়, বোধ ও ভাবের সংগ্রামে। উত্তর উপনিবেশবাদ নিয়ে আরো গভীরভাবে জানতে ইরাবতীর ধারাবাহিক ফয়েজ আলমের উত্তর উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য লেখাটির আজ থাকছে পর্ব-৩।


উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতি

উত্তর-উপনিবেশবাদী তৎপরতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ হলো উত্তর উপনিবেশী পরিস্থিতি শনাক্ত করা, এক অর্থে তা কাজের প্রথম ধাপও। স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে শুরু করে জনজীবন পর্যন্ত উপনিবেশী সংস্কৃতির প্রভাব অনেকখানি অক্ষুন্ন থেকে যায়। উপনিবেশী বিন্যাসের মধ্যে আবর্তিত এ-অবস্থাকেই বলা হচ্ছে উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতি।

ফ্রান্ৎজ ফানোর লেখালেখির একটা বড় অংশ জুড়ে আছে উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতির প্রসঙ্গ। ফানো লিখেছেন উপনিবেশী শাসনের মধ্যে বেঁচে থেকে। উপনিবেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোন পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে  সে-প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে এসেছে তার লেখায়। উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতি বলতে আমরা বুঝব প্রাক্তন উপনিবেশের সেই সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবস্থা, যা উপনিবেশউ শাসনের প্রভাবে গড়ে উঠে বহাল রয়ে গেছে। ওখানে উপনিবেশের মানুষদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির উপাদান বিকৃত-দমিত; জাতির মেলবন্দী চৈতন্যে রয়ে গেছে প্রাক্তন উপনিবেশকদের চিন্তভাবনা ও সংস্কৃতির প্রভাব এবং তাদের তুলনায় হীনমন্যতার বোধ। সাইকো-অ্যানালিস্ট ফানো বলেন, উপনিবেশী শাসনের কারণে উপনিবেশক এবং উপনিবেশিত-উভয়ের মধ্যেই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আসে। উপনিবেশকদের সচেতন চেষ্টায় স্থানীয়দের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ক্ষয় হতে হতে একসময়ে বিলীন হয়ে যায় অথবা মরে যায়। উপনিবেশিতের সাংস্কৃতিক শিকড়ের মৃত্যু ও সমাধি তার মনে জন্ম দেয় একরকম হীনমন্যতা বোধের’ (ফানো ১৯৬৭; ১৮)। ক্যারিবীয় অঞ্চলে কার্নিভালের সময়ে কালো দাসেরা সাদা মুখোশ ব্যবহারের অনুমতি পেত এবং তা ব্যবহার করে তাদের সাদা প্রভুদের নকল হয়ে উঠত। ফানো বলেন, সাদা মুখোশ পরে কালো দাসদের সাদা হয়ে ওঠার এই প্রবণতা অধিকাংশ কালো মানুষের মধ্যে প্রবল। তারা কেবলই তাদের সাদা প্রভুদের মতো হয়ে উঠতে চায়। এটি হলো উপনিবেশী প্রভাবে নুয়ে পড়া মনের একটা ধরন। এজন্যই সৌন্দর্যের সঙ্গে এখনো জড়িয়ে আছে ফর্সা হওয়ার প্রায়-অলঙ্ঘনীয় শর্ত। পৃথিবীর সকল কালো মানুষ আজও ফর্সা হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ওষুধ-রূপচর্চা আর বিজ্ঞাপনের পেছনে ব্যয় হচ্ছে শত শত কোটি ডলার।

ফানো উপনিবেশিতের মনের এ-পতনকে উপনিবেশের ফল হিসেবে চিহ্নিত করেন। উপনিবেশিতের মনে উপনিবেশী সংস্কৃতির প্রতি এই যে টান ও শ্রদ্ধাবোধ এবং নিজ সংস্কৃতি নিয়ে হীনমন্যতাবোধ, যা চিহ্নিত করেন ফানো, তা উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতির নিয়ামক-প্রবণতা হিসেবে তাত্ত্বিক গ্রহণযোগ্যতা পায়। এই মনস্ততাত্ত্বিক প্রভাব দূরীকরণের প্রশ্নেই বিউপনিবেশনের (Decolonization) প্রস্তাবনা। তাই উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্বে ফানোর পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণ খুবই তাৎপর্যময়। উপনিবেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর সেদেশের সামগ্রিক অবক্ষয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর দায় স্বীকার করেন না ফানো, বরং তিনি অভিযুক্ত করেন উপনিবেশী শক্তিকেই :

যে-পরিস্থিতির জন্য পশ্চিমা দেশগুলো আমাদের দোষারোপ করে আমাদের উচিত সেগুলোকে সোজা অস্বীকার করা। উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ, যখন তাদের পতাকা নামিয়ে পুলিশবাহিনী গুটিয়ে নিয়ে চলে যায় তখনো, তাদের পাওনা পরিশোধ করেনি। অনুন্নত বিশ্বে পুঁজিবাদী সভ্যতা শত শত বছর ধরে স্রেফ ক্রিমিনালের আচরণ করেছে। (ফানো ১৯৬৮; ১০১)।

ফানোকে বোঝার জন্য আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার। ফানো লিখেছেন উপনিবেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই। মূলত তিনি তার কালের বিশ্লেষণ হাজির করেছেন এবং ভবিষ্যৎ সময়ের সম্ভাব্য অবস্থার ওপর মন্তব্য করেছেন। এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁর দূরদৃষ্টির ফল, যার সূত্রগুলো তার কালেই বিকশিত ছিল। ফানো দি রেচেড অব দি আর্থে বলেন, স্থানীয় অবিকশিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য উপনিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না, যুদ্ধ করে উপনিবেশকের জায়গায় নিজেরা বসার জন্য। ফলে তারা আরেকরকম উপনিবেশকই হয়ে ওঠে। রেচেড অব দি আর্থ মূলত রাজনৈতিক প্রবণতার বিশ্লেষণ। এ-গ্রন্থে নয়া উপনিবেশবাদ সম্পর্কে ইঙ্গিতময় ভবিষ্যদ্বাণী আছে।


আরো পড়ুন: ধারাবাহিক: উত্তর উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য (পর্ব-২) । ফয়েজ আলম


উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতির পেছনে আছে উপনিবেশের প্রভাব। উপনিবেশের প্রভাব ও উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতির মিশ্রিত অবস্থার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আমরা এভাবে তুলে ধরতে পারি :

* স্থানীয় সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বা আংশিক বিলুপ্তি। স্থানীয় সংস্কৃতির টিকে থাকা বৈশিষ্ট্যগুলোর অবমূল্যায়ন; ওগুলোকে নিকৃষ্টরূপে দেখার প্রবণতা।

* আত্মপরিচয় সম্পর্কে উপনিবেশিতের হীনমন্যতাবোধ।

* পশ্চিম-পুব, প্রথম বিশ্ব-দ্বিতীয় বিশ্ব-তৃতীয় বিশ্ব ইত্যাদি আধিপত্যশীল বিভাজনের ধারণা। স্থানীয়দের সাংস্কৃতিক, সামাজিক পরিচয় বা বৈশিষ্ট্য নির্দেশক সাধারণীকরণ ও ছাঁচ তৈরিকরণ। যেমন প্রাচ্যের মানুষ অলস, এশীয়রা নিয়তিবাদী, এশীয় সমাজব্যবস্থা স্বৈরতান্ত্রিক।

* উপনিবেশী প্রশাসকদের অনুকরণে উপনিবেশিতদের মধ্যে বুর্জোয়া শ্রেণির উত্থান। উপনিবেশগুলো স্বাধীন হওয়ার পর এরা সাদা  প্রভুদের অনুকরণে স্থানীয় প্রভুতে পরিণত হয়। এরা প্রভুর মর্যাদা পরিপূর্ণভাবে ভোগ করার জন্য উপনিবেশী প্রভুদের অনুকরণে পশ্চিমা সংস্কৃতির চর্চা করে, তা আত্মস্থ করে এবং তাকে ঊর্ধ্বে তুলে রাখে।

* এবং উপরে বর্ণিত কারণসমূহের ফলে প্রাক্তন উপনিবেশগুলোয় প্রচুর সংঘাতমুখী অভ্যন্তরীণ পকেট ও অবিশ্বস্থ গ্রুপসংবলিত সমস্যাগ্রস্ত সমাজের বিকাশ। উপনিবেশের দীর্ঘকালীন প্রভাব এবং উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ পশ্চিমা সকল কিছুকেই প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা এবং কোথাও কোথাও ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিকসহ নানা ধরনের মৌলবাদী প্রবণতার বিস্তার, যার মূলে হয়তো থাকে, উপনিবেশী অতীতের অপরিশুদ্ধিতা থেকে নিজেদের সংস্কৃতিকে শুদ্ধ করার আকাঙ্ক্ষা।

আমি উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতির কয়েকটি দিক মাত্র উল্লেখ করলাম। খুঁটিনাটি বিবরণসংবলিত পূর্ণ তালিকাটি বিশাল হওয়ার কথা। এখানে আরো কয়েকটা জিজ্ঞাসা উঠে আসে। যেমন কোন অবস্থা বা উপাদানগুলো উপনিবেশী প্রভাবরূপে চিহ্নিত করবো আমরা? কোন মানদন্ডে এই মার্কা লাগানোর কাজটা চলবে, অর্থাৎ তুলনাটা কিসের সঙ্গে হবে? এবং চিহ্ন দেওয়া হয়ে গেলে আমরা কি তা বর্জন করব বলা যায় নীরবে বর্জনের প্রক্রিয়া শুরু করব, নাকি আমাদের মতো করে বদলে নেবো? কাজের  বেলায় এগুলোই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হয়ে দেখা দিতে পারে। বি-উপনিবেশনের প্রসঙ্গে এসব জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজে দেখা যাক।

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>