| 16 এপ্রিল 2024
Categories
শারদ সংখ্যা’২২

শারদ সংখ্যা গল্প: বৃশ্চিকরাশি । শ্যামলী আচার্য

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

       কাঁকড়াবিছেটা দেখা মাত্র শিউরে উঠল ঋতম।

       নীলচে রঙ। ভীষণ প্রাণবন্ত। একটু বেভুল হয়ে চোখ পড়লে সত্যি মনে হতে বাধ্য।

       মেয়েটির উরুসন্ধিতে আঁকা। ট্যাটু। আগেও বেশ কয়েকবার মিলিত হয়েছে তারা। পরস্পরের শরীরে তারা পরিচিত। শরীরী খেলায় উরুসন্ধির দিকে চোখ পড়ে না সাধারণত। তাই বোধহয় ঋতম আগে লক্ষ্য করেনি।

       মেয়েটি ঋতমের প্রার্থিত সাড়া না পেয়ে চোখ তুলে তাকিয়ে বুঝতে পারে ও মন দিয়ে কাঁকড়াবিছেটাকে দেখছে।

       কোনও কথা না বলে ডান পা’টা এবার আস্তে আস্তে ভাঁজ করতে শুরু করে মেয়েটি। ঋতম তাকায়। চোখে চোখ।   

       “কী দেখছ?”

       “এটা ট্যাটু?”

       “তাছাড়া কী?”

       “এখানে?”

       “কেন? তোমার ভয় করছে?” মেয়েটি মুচকি হাসে। প্রগলভ নয়। ম্লান হাসি। ক্লান্তির।  

       উত্তর না দিয়ে ঋতম সামান্য উঠে আসে মেয়েটির নগ্ন শরীরের ওপর। গভীর নাভির ওপরে একটা ছোট্ট রিং। চকচক করে ওঠে আলো না পড়লেও। নাভিমূল থেকে সরু সুতোর মতো একচিলতে পথ উঠে গেছে স্তনের বিভাজিকায়। রোমে আঁকা পথ। ওই পথে তর্জনীর আলতো ছোঁয়া বুলিয়ে নিজের শরীরটাকে ধীরে ধীরে তুলে আনে ঋতম। মেয়েটি এত অল্প ছোঁয়ায় বিচলিত হয় না। ওর ঠোঁটে লেগে থাকে মৃদু হাসি। চোখে প্রশ্রয়। ঋতম ওর চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে দুটি আঙুল দিয়ে এবার ছুঁয়ে থাকে স্তনবৃন্ত। আলতো চাপে এবার মেয়েটি পাপড়ির মতো মেলে ধরবে ওর উত্তেজনা। নারীশরীরে এত গভীর সংবেদনশীল অংশ আর দুটি নেই।

       একটি বৃন্তে আঙুল রেখে অন্য বৃন্তটি মুখে পুরে দেয় ঋতম। ওর সময় নষ্ট করতে ইচ্ছে করে না। শুধু শরীরের চাহিদা নয়। কোথাও একটা চোরা টান। একে কি ভালোবাসা বলে? তা’ না হলে প্রতিবারই ঋতম ওকেই ডাকে কেন?   

       ঋতম কামুক নয়। এখনও অবিবাহিত ঋতম কখনও কারও কাছে যায় না। কখনও যায়নি। তার কোনও স্টেডি বান্ধবী নেই। সম্পর্কের গভীর বাঁধনের ব্যাপারে সে চিরকাল উদাসীন। ঋতম বিশ্বাস করে সে একজন আর্টিস্ট। সে শব্দছন্দ নিয়ে লোফালুফি করে, সে সাদা ক্যানভাসে রঙের পরে রঙ মিশিয়ে দিতে পারে কুশলী হাতে, সে ক্যামেরার ছিদ্রপথে অনায়াসে টেনে আনতে পারে মোহময় প্রকৃতি। কর্পোরেট জীবন তাকে সচ্ছলতা দিয়েছে। কিন্তু সৌন্দর্যের তথাকথিত বর্ণনায় যা কেউ দেখতে পায় না, তা’ ঋতম খুঁজে পায়।      

নিজে আর্টিস্ট বলেই এই মেয়েটিকে তার আলাদা মনে হয়েছে। দলছুট। মেয়েটি এসকর্ট ঠিকই। নিয়মিত হাই সোসাইটিতে ওঠাবসা। রেট বেশি। কিন্তু সহজলভ্য হয়ে পড়ে না। অল্পেই উত্তুঙ্গ উত্তেজনায় পৌঁছে দিয়ে ক্লান্ত করে দেয় না। অত্যন্ত দক্ষ। সংযত অথচ সাবলীল। পেশাদার অনেকেই। কিন্তু এত শিল্পসম্মত দক্ষতা অর্জন করা বড় সহজ কথা নয়।

মেয়েটিও তার কাছে একজন শিল্পী। তাকে তৈরিও করেছেন একজন বড় আর্টিস্ট। এত যত্নে ঈশ্বর কাউকে গড়েন না।   

ঋতম ওকে প্রথম দেখেছিল পার্ক স্ট্রিটের একটা বারে। ঋতম অপেক্ষা করছিল একজন ক্লায়েন্টের। দেরি দেখে একটা মকটেল নিয়ে বসেছিল চুপচাপ। ভর সন্ধেবেলা একা একা মদ গিলতে তার বিরক্ত লাগে।  

মেয়েটিকে তখনই সে দেখে। একা একটা পেগ নিয়ে চুপ করে বসেছিল বারস্টুলে। স্বচ্ছ কাচের পাত্রে সোনালী তরল। বোঝাই যাচ্ছিল ওয়েটাররা তাকে চেনে। সে’ও এই পরিবেশে তুমুল স্বচ্ছন্দ। মেয়েটিকে পাশ থেকে একঝলক দেখে ঋতম। দেখে ওর চিবুকের পাশ থেকে লম্বা গ্রীবার ওপর লুটিয়ে আছে খোলা চুল। স্ট্রেট। মাখনের মতো ত্বক। স্লিভলেস আঁটো পোশাকের মধ্যে শরীরের সমস্ত বাঁক বোঝানো রয়েছে নিপুণভাবে। চোখ সরানো মুশকিল।    


আরো পড়ুন: বিশেষ রচনা: চায়ের ইতিহাস । সুকন্যা দত্ত


কাউকে চোখ সরাতে দেবে না বলেই মেয়েটি প্রস্তুত থাকে সর্বদা। ঋতমের মুগ্ধ দৃষ্টি কয়েক মুহূর্ত গড়ানো মাত্রই তার দিকে তাকিয়ে মেয়েটি হেসে বলে, “হাই, আমি নাতাশা।”  

এরপরে ঋতম কী বলেছিল, মেয়েটি তাকে কেমন করে ডেকে নিয়ে আপ্যায়ণ করে, কীভাবে তারা দু’পেগ মদ শেষ করে পৌঁছে যায় নির্জন ঘরের উষ্ণতায়–  সেসব বিস্তারিত বর্ণনা ঋতমের মনে নেই। এত খুঁটিনাটি সে মনে রাখে না। এগুলো সম্পর্কের ভার। ঋতমের নারীসঙ্গ-অভিজ্ঞতা ব্যাচেলর জীবনে একেবারে নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই প্রথমদিনেই ঋতম দেখে ওর ঘাড়ের কাছে আঁকা রয়েছে একটি ছোট্ট প্রজাপতি।   

“আই লাভ ডুইং ট্যাটু।”

মেয়েটি, যে বলেছিল তার নাম নাতাশা, যেটা তার সত্যি পরিচয় নয়, সে ট্যাটু নিয়ে খুব চিন্তাভাবনা করে। প্রথমদিন তার ডিজাইনার লজাঁরি অভ্যস্ত হাতে খুলে পিঠ থেকে চুলের গুচ্ছ সরিয়ে দিতেই ঘাড়ের একটু নিচে প্রজাপতিটি চোখে পড়ে ঋতমের। অথচ চোখে পড়া উচিত ছিল তার উদ্ধত বর্তুলাকার দুটি স্তন, নিটোল জানু আর কটিদেশ। কিন্তু চুলের ছায়ায় ঢেকে রাখা প্রজাপতির টানা রেখাতেই দৃষ্টি আটকে যায় ঋতমের। প্রজাপতির ডানায় ঋতম মুগ্ধ তার আদরের আঙুল রাখতেই মেয়েটি বলেছিল, ট্যাটু তার প্যাশন। এবং আলতো করে বলেছিল, “আর যাই করো, ওখানে দাঁত বসিও না… ইট ইজ অ্যালাইভ। ও ব্যথা পাবে। প্লিজ!”

এই আশ্চর্য কথার পরে ঋতম কেমন সম্মোহিত হয়ে যায়। মেয়েটির ক্রমশ উন্মুক্ত শরীরের মধ্যে ও হাতড়ে বেড়ায় এক শিল্পীমনকে, যে অক্লেশে বলতে পারে, ওই প্রজাপতিটি জীবন্ত। বারে বারে শরীরে প্রবিষ্ট হতে হতেও সে ক্লান্ত হয় না একটুও। অ্যালাইভ। জীবন্ত। প্রাণ আছে। যন্ত্রণা ফুটিয়ে আঁকা ছবিতে এখনও প্রাণ আছে। মেয়েটির নির্মেদ তলপেটের কাছে নাভিতে আটকে থাকা রুপোলি রিঙে, ঘাড়ের প্রজাপতিতে সেদিন সারারাত স্খলিত হয়েছে ঋতম। স্বপ্নে, জাগরণে। তারপরেও টানা কয়েকদিন।  

ভাগ্যিস মেয়েটির ফোন নম্বর রেখে দিয়েছিল।

ওকে ডেকে নেওয়া যায়। ডাকলে ও আসে। একটু আগে জানাতে হয়। ওর অনেক কাস্টমার। যাদের ও তৃপ্ত করে। তাদের সময় দিয়ে রাখলে ঋতম তাদের পরে সুযোগ পায়। ঋতম হাঁকপাক করে না। অপেক্ষা করে। শিল্পীর জন্য শিল্পীর অপেক্ষা।

প্রজাপতির পরে একদিন সূর্য। সেটি হাতের কবজির কাছে। তীব্র উত্তেজনার মুহূর্তে মেয়েটির দুটি হাত ধরে রয়েছে ঋতমের দুটি কাঁধ, সেই সময়েই সূর্যের ট্যাটু আঁকা কবজির দিকে চোখ চলে যায় ঋতমের। শক্ত পুরুষাঙ্গ কখন শিথিল হয়ে পিছলে বেরিয়ে এসেছে আনন্দগহ্বর থেকে, সে নিজেই জানে না।

“এটা বেশ ভালো না?”

মেয়েটি একহাতে আঁকড়ে ধরে ওর কাঁধ। ঋতম ওর নগ্ন বুকের ওপর শুয়ে সেই কবজিটি তুলে নিয়েছে নিজের চোখের নাগালে।

“অপূর্ব।”

“ও আমাকে প্রোটেক্ট করে। আমি ফীল করেছি।”

ঋতমের পর পর কয়েকদিন স্বপ্নে হেসে বেড়ায় একটা রঙিন প্রজাপতি। সূর্যের আলো থেকে শক্তি শুষে নেয় সে। প্রাণবন্ত প্রজাপতির পাখায় সোনালি দুপুর-রোদের গন্ধ।  

কিন্তু আজ কাঁকড়াবিছেটাকে দেখে অস্বস্তি হল। ভয় করল ওর।

“এখানে এটা কেন আঁকলে?”

মেয়েটা ঋতমের মাথার পেছনদিকে হাত দিয়ে তাকে আকর্ষণ করে নিজের দিকে। টেনে নিয়ে তার ঠোঁটদুটি দিয়ে গভীর আশ্লেষে শুষে নিতে থাকে ঋতমের প্রশ্ন।

অস্ফুটে বলতে থাকে, “স্করপিয়ন। বৃশ্চিক রাশি। সেক্স সিন আর স্যালভেশন… একবার সে যাকে আঁকড়ে ধরে তার আর নিস্তার নেই… চূড়ান্ত পজেসিভ সে… বৃশ্চিকের হাত থেকে তোমার আর পালাবার পথ নেই।” 

মুখের মধ্যে মিশে যাওয়া উষ্ণ লালায় তার অব্যক্ত কথায় জড়িয়ে যায় ভালোবাসা।

যার হাত থেকে কারও নিস্তার নেই।   

 

 

 

     

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত