| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গদ্য: মিমোসা .. আমার জলছবি । মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

“বন্ধু হারালে দুনিয়াটা খাঁ খাঁ করে/ভেঙে যায় গ্ৰাম,নদীও
শুকনো ধু ধু/খেলার বয়স পেরোলেও একা ঘরে/বারবার দেখি বন্ধুর মুখ শুধু”

মাধ্যমিক পরীক্ষার শেষ দিন।সেকেন্ড হাফের আধঘন্টা তখনও বাকি। বন্ধুরা (বন্ধু মানে আমাদের ব্যাচের শিশিরকণা, বারতা, শ্রাবনী,রীতা।পড়ি গার্লসে, ছেলে বন্ধু বলতে পাশের বাড়ির নাড়ু আর খোকন আমার চাইতে বছর তিনের ছোট, ঘুড়ি ওড়ানোর সময় ধরতাই দেয় ওরা আর ভুল হলেই ধমক খায়)যার যার যা পেপার জমা দিয়ে করিডোরে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। বারতা র্হেঁকে বলল এবার ক্ষ্যামা দে মা, অনেক নিকেচিস! নিকুচি করেছে বলে আমিও উঠে দাঁড়ালাম।

গার্ড দিচ্ছিলেন যিনি,এতই অবাক হলেন যে প্রথমে রাগতেই ভুলে গেলেন। তোমার না ম্যাথ আ্যডিশনাল? হ্যা স্যার,ইয়ে আর মিলছে না অংক। সম্বিত ফিরে পেয়ে কড়া তর্জনী ফের নির্দিষ্ট বেঞ্চ দেখিয়ে দিল।যাও রিভাইস দাও। ঘন্টা না পড়া অবধি কোনও ম্যাথ পেপার আমি জমা নেবো না।

অগত্যা বেঞ্চে বসে করুণ চোখে বন্ধুদের দিকে তাকালাম। ঝকঝকে সব মুখে বুদ্ধি আর শয়তানি একইরকম চকচক করছে।কেউ কেউ হাতঘড়ি (মাধ্যমিক দেবার সুবাদে সব্বাই মা বা দিদির ঘড়ি পরে এসেছে,আমার হাতেও মায়ের ঘড়ি বাঁধা) দেখিয়ে ইশারায় বলতে লাগলো স্বপ্নপুরী হলে চারটে-সাতটা শো শুরু হয়ে গেছে।

ঘন্টা পড়তেই ছুট ছুট।দাদামনি গেছিল আনতে আমায়। দানি দানি,দে না পাঁচ টাকা,ভ্যাবাচাকা দাদামনির কাছ থেকে পাঁচ টাকা হাতিয়ে পরীক্ষা ভালো হ-য়ে-ছে-এ.. সিনেমা-য় যাচ্ছিইই বলে স্কুলড্রেসেই আমরা দেড়ঘন্টা হয়ে যাওয়া সিনেমা দেখতে ছুটি।  

আমরা কজন বড় হয়ে গেছি।কিছুতো করতেই হবে বড়দের মতো। সিনেমা শেষে শ্রাবনী বুদ্ধি দিল,কফি হাউস। তখন মান্না দের “কফি হাউসের সেই আড্ডাটা” গান আমাদের মুখে মুখে ফেরে। আমি আবার শিস দিয়ে গানটা তোলার চেষ্টায় আছি। প্রস্তাবটা লুফে নিলাম।এটাও বড়দের মতো কাজ। আমাদের ছোট্ট মফস্বলে কফিহাউস নেইতো কী, আমরা গম্ভীর মুখে শবরী মিষ্টান্ন ভান্ডারে ঢুকে গেলাম।

দোকানের মালিক বিকাশদা খুব চেনে আমাদের।কানের গোড়ায় হাত এগিয়ে আসে। আ্যই দোকানে এলি যে! তোদের না পরীক্ষা চলছে? শেষ!শেষ! আমরা হাত ঝাড়তে থাকি। জীবনের যাবতীয় পরীক্ষাই যেন শেষ করে ফেলেছি এমনই হাবভাবে বিকাশদাও হাসে। বিকাশদার চা- সিঙারা খেয়ে কণাদের বাড়িতে লুকিয়ে প্রথম সিগারেট।বাড়ি ফিরি লাফাতে লাফাতে।দাদামনিকে রুদ্ধশ্বাসে শোনাই প্রথম দেখা হিন্দি সিনেমা ‘ক্রান্তি’র আধখানা গল্প। আরে দূর ওই পাতি সিগারেট কেউ খায়? গোপনে আমাদের ফেলুদার ব্র্যান্ড খাবার চমকদার উত্তেজনা দাদামনি একেবারে নস্যাৎ করে দেয়। তবু বড় হয়ে ওঠার সেই আমাদের প্রথম ধাপ।
        

পরদিন থেকে মা জবরদস্তি আমাকে এনগেজড রাখার চেষ্টা করে।বইয়ে মলাট দে,ক্যাটালগ বানা রোজ সকালে। দুপুরে চার্লস ডিকেন্স অনুবাদ করবি খানিকটে করে। সন্ধেবেলা আমি  দেখব বলে টলে মা নিশ্চিন্ত হয়ে স্কুলে চলে যায় আর আমি গ্যাস বুকিং,ইলেকট্রিক বা টেলিফোন বিল জমা দেবার নানারকম দায়িত্ব লুফে নিই আর টোটো করে ঘুরি পাঁচজন। ভরদুপুরে বোসেদের আমবাগান, নীলকুঠি,সুধাস্মৃতি লাইব্রেরির তেঁতুল আর মস্ত মেহগনির ছায়াপথে, শান্ত বিকেলে ইচ্ছামতীর জলমাখা বাতাসে ভেসে আসে জেলে ডিঙির “সজনী লো দেখে যা উথালি পাথালি হলো মন..”। আমিও ওলো সই.. গুনগুন করতে করতে মাথায় ক্ষ্যাপামির ক্যারাপোকা নড়ে ওঠে।ডি লা গ্রান্ডি !চ’ সই পাতাই।টেনিদা ফেলুদা রেখে   তখন  বিভূতিভূষণ, রবিঠাকুর খুব পড়ছি। ফলে আমি সিঁদুর টোকাটুকি খেলার মত চোখের বালি,মৌরিফুল, গঙ্গাজল এইসব নাম সাজেস্ট করতে থাকি। গঙ্গাজলটা বাদ দে কণা বলে, শুনলেই ঘাটের মড়া মনে আসে।সামনেই ইচ্ছামতী বইছে, তার কথাটাও ভাব একবার। একঝাঁক পাখির মতো খোলামাঠে উড়ে যায় আমাদের ঠা ঠা হাসি। রীতা ঠোঁট ফোলায় নিজের নাম নিয়ে।এঃ বিচ্ছিরি এই মোস্ট কমন  আমার নামটা কে যে রাখলো মাইরি। দাঁড়া দাঁড়া, আমি ব্যবস্থা করছি। তুই এতদিন রীতি থেকে রীতা ছিলিসতো। এখন থেকে তুই ঋতা।ঋতু হইতে জাত নারী। এবার বল খুশি? কিন্তু সার্টিফিকেটেতো রীতাই থাকবে,সংশয় যেতে চায় না ওর। তুই কি সার্টিফিকেট কপালে সেঁটে ঘুরবি নাকি?আর ইংরেজি বানানতো একই থাকছে,সমস্যা কী? এতো সুন্দর করে মেরামত করলাম নামখানা তবু মন উঠছে না মা?কণা হেঁকে ওঠে,চল, খাওয়া! আমরা সবাই হই হই করে  ওর ঘাড় ভেঙে ঘটিগরম খেতে উঠে পড়ি।পরের দিনের কর্মসূচি ঠিক হয় কবে কে গলায় দড়ি দিয়েছিল বলে যে গাছের আম কেউ খায় না,সেটা থেকেই আম পেড়ে খাবো,খাইও..!
         

বন্ধুরা মিলে দাদারা দৃষ্টি বলে ছোট পত্রিকা করত। তাতে ছেলেমানুষ কবিতা লেখা ছাড়া আর কিছুই পারতাম না। আমাদের পথে আনার জন্য ছোড়দা মেডিক্যাল কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে ঠিক করে এবার  অনুলিখন সংখ্যা হবে। চাষী,ভ্যানওলা,মাঝি,জেলে সকলের কাছে যাও,সবার জীবনের গল্প শোনো আর লিখে ফ্যালো অনুলিখন। আমরা পাঁচজন বড়দের সাথে ট্রেনে ট্রেনে ফেরি করি সেই পত্রিকা। ওদের শেখানো বুলি তোতাপাখির মতো কপচাই।অন্যরকম গল্প এনেছি আমরা। খুব ইচ্ছে আপনারা সবাই পড়ুন।মাত্র দুটাকা দাম! ঝলমলে কিশোর মুখ দেখে  দুম করে কিনেও ফ্যালে কেউ কেউ। আমরা একসাথে গেয়ে উঠি “নাম তার ছিল জন হেনরি” অথবা পল রোবসনের গান। ট্রেনের কামরাতেই একদিন শুনলাম রেজাল্ট বেরিয়েছে। যেহেতু ছোড়দাই চালাতো আমাদের, বললো এখন জানার দরকার নেই।কাজ শেষ করে বিকেলে দেখা যাবে।কে কোনটায় ফেল করে মরেছে কেজানে। এখন মড়াকান্না জুড়লে সব কাজ পন্ড! ছুটিটা আর ক’ঘন্টা বেড়ে যাওয়াতেই খুশি হয়ে উঠি আমরা। সারাদিন ট্রেনে ঘুরে শেয়ালদা স্টেশনেই বড়দের কেউ রেজাল্ট দেখতে গেল।
           

শিশিরকণা ফার্স্ট ডিভিশন,বারতা,ঋতা, শ্রাবনী সেকেন্ড ডিভিশন আর সবার থেকে একটু বেশি নাম্বার পেয়ে ওদের হুল্লোড়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গেলাম। জড়িয়ে ধরলো ওরা। এমন চেঁচামেচি আর নাচতে লাগলো যেন পাঁচজন মিলেই পেয়েছি,জিতে গেছি দারুন কিছু। যা হয় এরপর। ওরা দল বেঁধে গেল আর্টসে।আর কিছু নাম্বার বেশি পাবার শাস্তিস্বরূপ সাইন্সে নির্বাসন হোল আমার। তখন অবশ্য নতুন স্কুল, নতুন কোচিং, নতুন নতুন রঙিন বন্ধুরা একটু একটু করে সরিয়ে দিচ্ছে পুরোনোদের।শাদা কালো থেকে সিপিয়ারঙ হয়ে যাচ্ছে আমার চোখের বালি,মৌরীফুল, ইচ্ছামতীরা। তখন খুব ভোরবেলা নদীর ধারে বাঁটুল স্যারের কাছে কেমিস্ট্রি পড়তে যাই অসীম,দিব্য, সবুজদের সঙ্গে। কনকনে ঠান্ডায় হাত জমে যায় বলে সাইকেল থামিয়ে হাত সেঁকে নিই পথের ধারে  খড়ি জ্বেলে আগুন পোয়ানো মানুষদের সাথে বসে।ফিরি ঝগড়া করতে করতে।মান্না দে ভালো না কিশোরকুমার এইসব।
         

তারও পর এইচ.এস. জয়েন্টের বেমক্কা ঝড় উড়িয়ে নিয়ে ফেললো ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে।আরো রঙে শব্দে চকমকির ফুলকিতে ঝলসে গেল আমার আধা গ্ৰামীন চোখ। ছটফটে তারা অন্তর্মুখী আর লাজুক হয়ে উঠল। জোর জবরদস্তি করে বাবা আমায় ডাক্তারি পড়তে পাঠিয়েছে। ভালবেসে আমি কক্ষনো তা পড়িনি। কাজেকাজেই ব্যাপক মন খারাপ আমায় ছায়ার মত জড়িয়ে থাকত। নাগরিক যান্ত্রিক জীবন,ব্যস্ত সময়, পড়াশুনোর ব্যাপক চাপের মধ্যেই ভিড় করে এল নতুন মুখ,হাত বাড়ালো। কৃষ্ণকলি,নিবেদিতা,স্বাগতা,পর্ণা হস্টেলের বন্ধু।একসঙ্গে ডরমেটরিতে থাকা সিনিয়র দিদিদের অল্পস্বল্প রাগিং,মিডিয়াম চেঞ্জ,আ্যনাটমির ভয় ভয় ডিসেকশন, একইরকম সমস্যাগুলো কাছাকাছি নিয়ে আসে আমাদের। সে বয়সটাও এমন, সহজেই ভাগ করে নেওয়া যায় একে অন্যের টিফিন,বাড়ির জন্য মনকেমন রাত জেগে ফিজিওলজি পড়ার ফাঁকে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে দৌড়ে চারতলার ছাদে উঠে হ্যালোজেন রঙমাখা সেই অঝোর জল।
       

ডেস্কলাররাও জুটে গেল। মৌমিতা কল্লোল,সুজাতা,অরূপ। আমি ছিলাম নেহাতই ভিজে বেড়াল টাইপ এবং খুব ভালো শ্রোতাও। ক্যান্টিন বা হস্টেলের ছাদে অথবা কলেজের সিঁড়িতে আ্যই মণিদীপা ইদিক আয় বলে পাকড়াও করে হেভি কেলো হয়েছে বুঝলি, জানি তুই লিক করবি না বলেই কোনো ভগ্ন হৃদয়ের করুণ কাহিনি এবং তক্ষুনি তার ধন্বন্তরি কোনো হাতে গরম সমাধান না বার করলে তার এক্সামতরণীর ভরাডুবি যে আসন্ন এমন হুমকিও আমায় শুনে ফেলতেই হতো।নিজের ব্যাচ আর জুনিয়রদের কত কিসসাই যে মন দিয়ে শুনতে হয়েছিল। কী নিয়ে এক তক্কে শরণ্যাকে বলেছিলাম, খোলা আকাশের তলায়  দাঁড়িয়ে শ্বাস নিবি।কোন কম্মে শুনি? লাঙসের ক্ষমতা আর মনের পরিধি দুইই তোর বাড়া খুব দরকার। বড় হবে।দুম করে পিঠে কিল আর বেঞ্চ বাজিয়ে কৃষ্ণকলির গেয়ে ওঠা..আমার প্রতিবাদের ভাষা.. আমার প্রতিরোধের আগুন…!
     

ভারি মেডিক্যাল বুকস, আরও ভারি পরীক্ষাগুলোর মধ্যেই রঙিন মুহূর্তগুলোকে যতটা ঝোলায়,ডায়রিতে, বুকে ভরে নেওয়া যায় আর কি। আ্যনাটমি প্রাকটিক্যালের আগে নিয়মমাফিক লুকিয়ে ডিসেক্টেড বডি দেখে আসতে গেলাম আমরা। সুপ্রভ বডির নার্ভ ভেসলস চেনাচ্ছিল তাড়াতাড়ি করে কেননা ডোম সময় দিয়েছেন আধঘন্টা। গোটা হলটা অন্ধকার।ঘোলাটে বাল্বের আলোয় শুধু পরীক্ষা নেওয়ার বডিটাই যা দেখা যাচ্ছে।
       

অর্ক হঠাৎ করে বললো ধর বডিটা এখন আস্তে উঠে বসল। উরে মাগো বলে অর্ণা লাফিয়ে পড়ল অখিলের ঘাড়ে আর অখিল টাল সামলে দারুন বিরক্ত গলায় বলল চীনের প্রাচীর ভেবেছিস নাকি রে?অত ভয় পেলে বেরো এখান থেকে। পরীক্ষার আগে ভালো মানুষ মুকুল সবাইকে নিয়ম করে চিয়ার আপ করতো। ভালো করে দিস কেউ টেনশান করবিনা ইত্যাদির উত্তরে গৌরব হেঁকে উঠল একশবার টেনশান করব।কার চোদ্দপুরুষের তাতে কী রে?ভয় ভুলে হেসে ফেললো সবাই। ফার্স্ট এম.বি.বি.এসের ভাইভা দেওয়ার আগে আমি চেঁচাই,আ্যই অরূপ,বাপির নামটা লিখে আমার আ্যপ্রনের পকেটে ভরে দেতো।কেন রে?না মানে হল থেকে বেরিয়েতো ভুলে যাবো!অরূপ কিসব বিড়বিড় করে হাতটা ঘোরায় মাথার চারপাশে তারপর একটা ফুঁ দিয়ে বলে যা এবার, এক্সটারনালের বাপের সাধ্যি নেই তোকে ফেল করায়।ডোন্ট মাইন্ড, এক্সটারনালের পিতৃদেবও কি পরীক্ষা নিতে এসেছেন? বন্ধুরা হ্যা হ্যা করে হাসতে থাকে, আমি ঢুকে যাই ভাইভা দিতে। এতসবের মধ্যেও কিন্তু ঋতা ছিল পাশে পাশে।গ্ৰাজুয়েশনের পর গান শিখতে আসতো কলকাতায়। মাঝে মাঝেই আমার হস্টেলে থেকে যেত। রাত জেগে গল্প করতাম।প্রায়ই একটা নীলচে বিষন্নতা ঘিরে থাকতো ওর মুখ।যাকে ভালোবাসতো তার বাড়ির অমত থাকায় নিজে মহোৎসাহে বিয়ে দিয়েছে সে ছেলের। খুব ভালো সাজাতে পারতো বলে শ্রী -ফুল-আলপনার বরণডালা মায় ফুলশয্যার কনেকে পর্যন্ত নিজের হাতে সাজিয়ে দিয়ে এসে আমার বুকে মুখ রেখে ভেসে গিয়েছিল গোপন কান্নায়।
       

বাড়ি থেকে কত কী যে নিয়ে আসতো,হিটারে রান্না বসিয়ে দিতো আমার রুমে। তুই এলে হস্টেলটা কেমন বাড়ি বাড়ি হয়ে যায়। শুনে ওর চোখের তারায় নীলাভ দিনরাত্তির মমতা হয়ে ঝরে পড়ত। নতুন বন্ধুর গল্প বললো একবার এসে।পোড়ামুখী!ফের তুই প্রেমে পড়েছিস? শুনে ভারি লাজুক হাসছিল ও। ভালবাসার মায়াবী আলোমাখা সে মুখ দেখে বললাম হাঁদারাম!কে বলে তুই সুন্দর নোস?মিনু, তোর এই পারফিউমটার গন্ধটা ব্যাপক।নিবি এটা? উঁহু! নতুন একটা কিনে দিবি। আচ্ছা। দ্বিতীয়বার বিশ্বাস ভাঙাটা ও নিতে পারেনি।বড্ড বেশি নাজুক ছিল আমার কিশোরবেলার মিমোসা।টাচ-মি-নট লতার মতোই নুয়ে যেত আঘাত পেলে। চিঠি লিখলো আমায়, এমন কিছু নেই তোদের ডাক্তারিতে যাতে পৃথিবী থেকে চুপচাপ চলে যাওয়া যায়? উত্তরে লিখলাম,প্রাণ বাঁচানোই আমাদের কাজ বুদ্ধুরাম। তোর জন্য অনেক ভালবাসা আর আদর রাখা আছে। নিয়ে যাস।ঋতা লিখলো, বাড়ি আয় মিনু, ওকে একটু বোঝা। হাউসস্টাফশিপে ছুটি মিলছিল না আমার। অবশ্য বুঝতেও পারিনি দারুণ পুড়ছিল ও।এতটাই সে দহন,যে এক সকালে সারা শরীর কেরোসিনে ভিজিয়ে দেশলাই জ্বেলেও চুপ করে নাকি দাঁড়িয়ে ছিল ও। কতটা আগুন বুকে জমলে অমন বোবা হয়ে যায় মানুষ? ওর বোন পাগলের মত দরজা ধাক্কিয়েছে। চিৎকার করে সবাইকে ডেকেছে।ও কোনো আওয়াজ করেনি অথচ হসপিটালে যাওয়ার পথেও নাকি জ্ঞান ছিল ওর।অত কোমল,অত সহনশীল লাজুক সেই মেয়ে এতটা জেদি আর কঠিন হোল কোন অভিমানে? ওর চলে যাওয়া জানলাম যেদিন,ওর জন্য কিনে রাখা,চুর্ণী, পারফিউম,আরও টুকিটাকি কাবার্ড থেকে বার করে ছুঁড়ে দিলাম হস্টেলের জানলা দিয়ে। কাজ করতে পারছিলাম না। বাড়ি গেলাম ওদের।মাসি জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদলো। সে বিলাপের মধ্যে শুধু “মিনুর কাছে যাবো”ছাড়া আর কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না। বড় করে বাঁধানো ওর মালাপরা ছবিটার দিকে আমি তাকিয়েই থাকলাম।যেন ওটাই আমার কাজ।
      

জন্মান্তর মানি না।বিয়েও হয়নি তখন আমার। তবু মনে মনে বলছিলাম, আর একবার আসবি ঋতা? আমার মেয়ে হয়ে জন্মাবি বেশ। এবার তোকে ঠিকঠাক বাঁচতে শেখাবো। মসরঙা জলছবি হয়ে আমার দিন-মাস-বছর সব ঋতুতেই মিশে রইলো সেই মেয়ে। হাউসস্টাফশিফ শেষ করে কোঠারি হসপিটালে ঢুকেছি বছরখানেক পর। দেখি ফেডেড জিনস, রঙচটা টিশার্ট  খুব ছোট করে ছাঁটা চুলে বালকের মতো এক মুখ কারো সাথে মেশে না। লিফট বন্ধ থাকলে সিঁড়ি দিয়ে সটান ছতলায় উঠে যায়। রাউন্ড দেবার সময় সিস্টারকেও ডাকতে চায় না। পেশেন্টর ড্রিপ চালাতে কী একটা প্রবলেম হচ্ছিল ওর। ইভনিং রাউন্ড ছিল আমার। বললাম হেল্প করব? নো থ্যাঙ্কস বলেও যখন পারলোনা, আবার হাত বাড়ালাম। এবার হেলপটা নিল কিন্তু ধন্যবাদ বলেই চলে গেল। জেদ চাপলো।কেন ও এতটা দলছুট,জানবোই।
     

বন্ধমুঠি খুললো আস্তে আস্তে।ও বীণা।নয় ভাইবোন। অসম্ভব দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে করে পৌঁছেছে এখানে।বাবা নেই এটাই বলেছিল প্রথমে।পরে জেনেছি দারুন ঘৃণায় বাবাকে মৃত বলতো ও।কোঠারির জুনিয়র ডাক্তাররাও বেশ নাক উঁচু টাইপ।এই যেমন ডিনার টেবিলে পারমিতা বললো,কী করে টলারেট করিস মণিদীপা? ভীষণ গাঁইয়াতো!আমিওতো গাঁইয়া রে,হেসে বলি সমস্যা নেই, কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে যায় লংস্কার্ট। ছোট থেকে নিশ্চই অনেক না -এর সঙ্গে বীণার দেখা হয়েছে। নিজেকে তাই একটু অস্পষ্ট রাখতেই পছন্দ করতো সে।কোঠারির দুটো বছর বীণা কিন্তু ফাঁকা সময়গুলো ভরে দিয়েছিল।ডিউটিআওয়ার্স শেষ হলে ন্যাশনাল লাইব্রেরির সামনের বাগান বা আলিপুরের রাস্তায় রাস্তায় কত যে হেঁটেছি দুজন।দ্যাখ দ্যাখ নাগকেশর বিনু,ম্যাগনোলিয়া ওটা।স্বর্ণচাপার পাশেই সোঁদাল ফুটেছে কত। রাতে দশতলায়  হস্টেলের জানলার কাঁচ সরিয়ে দিলে আকাশ ঢুকে যেত ঘরে। আলো নিভিয়ে মাউথঅর্গানে  সুর তুলতো বিনু। আমি গেয়ে উঠতাম … তোমার খোলা হাওয়া..
     

জন্মদিনে শরৎ রচনাবলী কিনে লিখলো…বন্ধুত্ব কথাটার সঙ্গে দেখা হয়নি বহুদিন। শব্দটাকে ভুলতে বসেছি যখন,তখন যার সঙ্গে দেখা..। একটা ছোট্ট কাফেতে ট্রিট দিলাম ওকে।পাগলি বাজালো ইয়ে দোস্তি…। একটা ভালো মাউথ অর্গান কিনে দিসতো। কোথায় পাওয়া যায়? নিউমার্কেট বা কলেজস্ট্রিট খুঁজবি। আচ্ছা। ছুটি নিয়ে কিছুদিন একটা হেলথ সেন্টারে কন্টাক্ট সার্ভিসে ইন্টারভিউ এবং জয়েন করা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। যোগাযোগ ছিল না বিনুর সাথে। একদিন ওর খোঁজ নিতে গিয়ে শুনি ভোপাল চলে গেছে ও। ঠিকানা দিয়ে যায়নি।দেবার মতো কেউ অবশ্য ছিলও না। একটা পারফিউমের শিশি, একটা মাউথ অর্গান হারিয়ে গেল আমার জীবন থেকে কিংবা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকলো,যেন কোনোদিনও ছাড়বে না আমায়। জানি উজানে ফেরে না কখনো নদী।খেয়ালি,ব্যাকুল বয়ে যায় ছলোছলো উৎস থেকে, হ্যা মোহনারই দিকে। তাতে মেশে আরও কতো সহস্র জলধারা। আমার নদীতেও আলোর টানে প্রাণের চলার নিয়মে মিশে গেছে অজস্র মুখ। কোনখান থেকে আজ এক আঁজলা জল তুলে বলবো এটা তুই ঋতা।এটা বিনু। নিবেদিতা, কৃষ্ণকলি,কল্লোল বা প্রলয়। মিশে গেছে। মিশে আছে ওরা আমারই নির্মাণে, আমারই বুকে বসত করা নিবিড় সব ছায়ামানুষ।
         

আসলে প্রতিটি সম্পর্কের মধ্যেই ভাঙনের ভয় নিয়ে পেন্সিল স্কেচের মতো রোগা এক সাঁকো হাওয়ায় হাওয়ায় আনমনে দোল খায়।যার দুপারেই ভালবাসা আর মায়া স্মৃতিময় একাকার হয়ে থাকে।কার কাছে যাবো তবে? পথে যেতে দেখি জলের ধারে ছোট ছোট ঘাসফুল। ফিরোজা, নীলচে,মভ,হায়াসিন্থ কত রঙ হয়ে ফুটে আছে প্রাণ নির্জনে।কার অপেক্ষায়? ফিসফিস করে বলি ওদের.. “বন্ধু! কী খবর বল। কতদিন দেখা হয়নি.…”!

                                 
                                
বিশেষ কথা:
ঋতা,অসীম, খোকন…এই মৃত বন্ধুদের ছাড়া সব নামই পাল্টে দিয়েছি আমি
কাউকে আঘাত করার জন্য আমি লিখি না। 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত