| 30 মে 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

জীবনের উপমা এবং তুমুল ক্রিয়াপদ । তৈমুর খান 

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট
 
 
গৌরচন্দ্রিকা
 
একটা ঘুড়ি ওড়াচ্ছি। অনেক অনেক দূর উড়ে যাচ্ছে। মাঞ্জায় সুতো ছাড়ছি। আরও দূর আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে ঘুড়িটি। আর দেখা যাচ্ছে না। শুধু নীলাকাশ।
ঘুড়িটি ওড়াতে গিয়ে আমাকে দৃষ্টিসংযোগ, মননসংযোগ করতে হয়েছিল। ঘুড়িটি ওঠা-নামার তালে তালে সুতোয় ঢিল-টান দিতে হচ্ছিল। আর লক্ষ করছিলাম ঘুড়িটির দ্রুতগতি চলাচল। তারপর দৃষ্টিপথে ছোট হতে হতে একেবারে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।
      আমাদের প্রত্যেকেরই ঘুড়ির মতো জীবনের একটা আকাশ আছে। সেখানে আমরা উড়ছি। একটা কেন্দ্র থেকে মায়াসুতোর টানে উড়তে উড়তে আমাদের লীলা কখনো দৃষ্টিগোচর। কখনো অদৃশ্য।
    প্রত্যেক কবিই সংসার আর সংসারের বাইরে দুইদিকে দুটো পা দিয়ে দাঁড়ান। মাঝখানে সময়ের কোলাহল। দিনলিপির অনন্ত স্রোত। সংসার থেকে আসে দুঃখ-ধুলো, হতাশা-বিষাদ, আদিমতা-ক্রূরতা। ঘুড়ি তখন ক্রমশ নিম্নগামী। | পাক খেয়ে মাটিতে আছড়ে পড়তে চায়। কিন্তু মায়াসুতোর কেরামতিতে  আবার তা পাখা মেলে উড়তে চায়। আকাশের ডাকে যেতে চায়। এই হচ্ছে সংসারের বাইরে পা রাখা। যেখানে বাউলের সুর ছাপিয়ে ওঠে। যেখানে দৈনন্দিনের নশ্বর ছায়ারা সরে গিয়ে পরম নিভৃতির নিরাসক্তিতে জীবনচর্চা বৃহৎ মানবীয় ঐশ্বর্যে দ্রবীভূত। মৃত্যু-মালিন্যের ঊর্ধ্বে প্রেমের চিরন্তনতায় অবলীন হতে চায়। আকাশের অনেক উঁচুতে দৃশ্য থেকে অদৃশ্য জীবনের এই মর্মোপলব্ধি।
 
দার্শনিক প্রত্যয়
 
 প্রবৃত্তি আর আবেগের বাতাসে জীবনধর্মের ঐতিহ্য খুঁজে পেতে হয়। অথবা প্রাচীন সংস্কৃতির ভেতর থেকে উত্তরাধিকারের পর্যায়টি গঠিত হতে থাকে। কালধর্মের প্রবাহে সমাজনীতি, সভ্যতারীতি পাল্টায়, কিন্তু মৌলিক জীবনচেতনা অর্জিত হয় পরিশীলিত অনুশীলিত নানা মোড়কে। মানবরসায়নের বাহ্যিক ব্যত্যয় ঘটলেও নিহিত সত্তায় লেপ্টে থাকে জৈবিক বৈশিষ্ট্য। যাতে সৃষ্টির  দুর্মর টানের সঙ্গে আসঙ্গলিন্সার বাসনাটি প্রবল। এই থেকেই প্রেম। রতি বিভাবের সঞ্চারে জীবনের যাবতীয় বৈভব রচনা। সুতরাং জীবনদর্শনের সূত্রটি  ঘুড়ির মাঞ্জার মতো। সেটাই উৎস, সেখান থেকেই উদ্গত হয় খেলা। জীবনকে অনুভবের কত বৈচিত্র্য। কখনো নারী, সংসার, সন্তান নিয়ে ভোগের  কারাগার। কখনো ঈশ্বর, আত্মঈশ্বর অন্বেষণ। ত্যাগ-তিতিক্ষার আনন্দ। স্বাভাবিক ও বৈপরীত্যের, খাঁচা ও খাঁচার বাইরের এই টানাপোড়েন চলতে থাকে। এর মধ্যেই জমা হয় শূন্যতা, না-পাওয়ার হিসেব, ব্যর্থতা, অবদমন এবং অনাস্বাদিত প্রক্ষোভ। কবি তখন এক দার্শনিক প্রত্যয় অর্জন করেন। জীবনের পর্বান্তিক আকাশ থেকে একটা সময় নিরিখের বিহ্বল তমসা কেটে গেলে স্থিরতার দিকে ধাবিত হন। তাঁর নৈবেদ্যে অনেক অনেক বাসনার ক্ষরণ থেকে একটা মূল আলম্বনকে প্রত্যয়মুখী চাবিসূত্রে রূপ দেন—
‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয়।
অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়
লভিব মুক্তির স্বাদ।'(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) 
রবীন্দ্রনাথের ‘নৈবেদ্য’ তো দেহ-মনের লীলারসে জারিত আত্ম-অনুভবের একান্ত উচ্চারণ। নিজের ঈশ্বরকে আত্মনিবেদনের প্রাকৃমুহূর্তে আত্মজাগরণের সীমানায় দাঁড়ানো অখণ্ড সময়যাপন। খণ্ড খণ্ড কবিতায় তা প্রতিফলিত হলেও একই কেন্দ্রের টানে একই বিষয়মুখ সূচিত করে। সুতরাং মোহও মুক্তির সূচক, প্রেমও ভক্তির সোপান হয়ে তখন দর্শনের সীমানায় কবিকে দাঁড় করায়। জীবনের একটা পরিধি থেকে দীর্ঘপথের নীরব নিষণ্ণতায় নিয়ত হাঁটার এই প্রত্যয় যখন অভিজ্ঞতার ব্যাপ্তি এনে দেয়—তখনই দীর্ঘ কবিতার সার্থকতা।
    উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থও দেখেছিলেন মানবজীবনের ক্রমপর্যায় কীভাবে পাল্টে যায়। প্রকৃতির আনন্দময় রূপ পর্যবেক্ষণ করতে করতে একটা গভীর আত্মীয়তায় স্বপ্নের চিরন্তন ডাক শোনা যায়। কিন্তু এক সময় তা অপসৃত। মৃত্যুর করাল ছায়া নেমে আসে। বালক বয়সের যে চটুল স্বপ্নপিপাসার মাধুর্য। নিয়ে প্রকৃতিকে নিজের করে পাওয়া, তেমনি বয়ঃবৃদ্ধিতে নিঃস্ব, ফতুর হয়ে যাওয়া। তখনই কবি দার্শনিক, তখনই কবি লেখেন—
‘Ode on Intimations of Immortality’
আর সেখানেই জানান—
‘In the soothing thoughts that spring
Out of human suffering:
In the faith that looks through death,
In years that bring the philosophic mind.”
তখন যাতনার মাঝেও এই প্রত্যয় বা বিশ্বাস ফিরে পেতে চান একজন দার্শনিক, কবি। তখনই দীর্ঘকবিতা অভিজ্ঞতার স্থৈতিক রূপান্তরে তার নিজস্ব প্রজ্ঞায় আলোকিত হয়।
       এই কারণেই শুধু গল্প বা আখ্যান নয়, তার অন্তরালে প্রবহমান কবিজীবনের এক অন্বেষণ জীবনদর্শনের নির্বেদভেলায় ভেসে চলে। মোহমুক্তির খেলা তো সেখান থেকেই। ভোগ-ত্যাগের দ্বন্দ্বও নিরন্তর ক্ষত-বিক্ষত করে। আর এ-ভাবেই পর্ব-পর্বান্তরে এগিয়ে যেতে যেতে— অতীত-বর্তমান, বর্তমান-অতীত চিত্রকল্প হয়ে যায়। এক-একটা সিদ্ধান্ত এসে বসে, আবার ভেসেও যায়। সময় ক্ষেপণের বেহিসেবি চলাচলে জীবনের সূত্র থেকে স্মৃতিতর্পণের পথ বেয়ে কবি এসে পৌঁছান একই পথে। তখন ‘মহুকথা’ লেখার কবি জয় গোস্বামী নিজেকে বুঝতে পারেন—
‘বসন্ত সম্পূর্ণ হল আজ, এইখানে
এরই তো অপেক্ষা ছিল এতদিন? এরই?
কত ঘাত-প্রতিঘাত বয়ে
এসেছে সন্ন্যাসী গ্রীষ্ম লেখাহারা সর্বস্বান্ত
                                      প্রৌঢ় কবি হয়ে
আজ তাকে স্বাগত জানাতে কেন দেরি?
জাগো মাঠ। জাগো রৌদ্র। জাগো ধূলা।
খরা জাগো। জাগো লু বাতাস।
ওড়াও, পোড়াও, যাও তাকে দগ্ধ করো সসম্মানে
অন্তরীক্ষে বেজে ওঠে ভেরী!’
    অন্তরীক্ষে ভেরী বাজা তো একজন দার্শনিকই অনুভব করতে পারেন। মহুকথার সাম্রাজ্য থেকে গ্রীষ্মের দাহে পৌঁছানো কবি জীবন পর্যালোচনার নির্ভুল দার্শনিক।
 
বসন্তের মৃত্যুগান
 
প্রকৃত দীর্ঘকবিতা স্বপ্নচারিতার মধ্যে রচিত হলেও কিংবা চেতন মনের সক্রিয়তা বা অবচেতনের স্বয়ংক্রিয়তা থাকলেও এমন এক তীরভূমির খোঁজ চলে যেখানে দাঁড়ালে আমাদের উৎকলিত সমুদ্রের বেগবান পয়ঃরেখা তার তরঙ্গ বিক্ষেপে ভেজাতে পারে। ভাষা, অলংকার, ছন্দ এবং আঙ্গিকগত কৌশল যতই আলাদা হোক— তার soul অর্থাৎ The soul of poetry-কে আমরা স্পর্শ করতে পারি। দর্শন তো সেখানেই। কবি মঞ্জুষ দাশগুপ্ত প্রেমভাঙা তাপিত হৃদয়ের স্মৃতিমন্থনে নেমে আবেগসর্বস্ব অতীতকে আবেগহীন বর্তমান দিয়ে খণ্ডন করেছেন। বর্তমান কঠিন, ক্রূর, মেকি, ক্লোন জীবনের ছায়াপাতে হৃদয়হীন। কিন্তু বসন্ত?
     সে-তো সত্য, অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং দার্শনিক কবির প্রত্যয়বিমুগ্ধ উচ্চারণে  ‘বাসভূমি’-র আয়োজন দেখতে পাই। ক্ষণিকের প্রেম, হরিণীবিলাস সব মুছে গিয়ে চিরন্তন দাহের ভেতর বাজতে থাকে বসন্তের মৃত্যুগান—
 ‘মৃত্যুই চূড়ান্ত গান বসন্তের। ফুলের রেণুও জানে। গতকাল জেনেছি আগামী সময়। কতকাল। জীবনের রূপকথা তুমি। কুহক মৃত্যুর সঙ্গে বিনা শব্দে বিনিময় হয়। বসন্তের ছায়াজ্যোৎস্না গাছের তলায়। কোনো দেবযান আসে। হরিণের ভালোবাসা সেও ছিল না বসন্তফুলের গায়ে রাত শিশিরের মত নিতান্ত ক্ষণায়ু। কেউ কারো বাসভূমি কখনো জানে না— জানতেই পারে না। শুধু কিছু সুগন্ধের স্মৃতি। পোড়াধূপ অন্ধকার বনের ভিতরে পথ হারায়। ভগ্নস্তূপে বসন্তের মৃত্যুগান বাজে।’
      ভস্মস্তূপে বসন্তের মৃত্যুগান বাজা তো জয় গোস্বামীর অন্তরীক্ষে বেজে ওঠা ভেরীর মতোই। যে গ্রীষ্ম আসে রৌদ্র, ধুলো, খরার লু বাতাসে সেই গ্রীষ্ম তো আমাদের জীবনেও। যে প্রেম আমাদের হৃদয়কে অঙ্গার করে, সেই প্রেমও শিশিরের মতো ক্ষণায়ু। জীবনই চিরবসন্তের মৃত্যুগানে দার্শনিক হয়ে যায়। এই বসন্ত-গান কীট্সও খুঁজেছিলেন। জীবনের নিদাঘ দুঃসহ হয়ে উঠলে শরতের প্রকৃতিও কবিকে দ্বন্দ্বমুখর করে তুলেছিল। কিন্তু সংশয়ের পর মুহূর্তে আশ্বাসও জেগেছিল। বসন্তের সঙ্গীতসম্ভার যে নিহিত আছে হৃদয়ে তা কবিও জানতেন। তাই তিনি To Autumn কবিতায় লিখেছিলেন—
Where are the songs of spring? Ay, where are they?
Think not of them, thou hast thy music too,—’
 ‘বসন্তের মৃত্যুগান’ তখনই আমাদের চূড়ান্ত জীবনবাদী ঐশ্বর্যের নৈর্ব্যক্তিক সত্তায় সহজিয়া সুর তোলে—যা কালসীমায়, ব্যক্তিসীমায় খণ্ডিত হয় না। । যা মানব হৃদয়ের Intimations of Immortality.
 
Archetype Arts
 
প্রাচীন সাহিত্য-সংস্কৃতি, পুরাণ, বিশ্বাস, লোকাচার, সমাজসংসার, উপলব্ধি  আমাদের উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত হয়। প্রাচীন সভ্যতার উপর গড়ে ওঠে নতুন সভ্যতা। কিন্তু ইতিহাস, বোধ ও বোধির সমূহ আলোকচ্ছটা আমরা পাল্টাতে  পারি না। যে স্নায়ুসম্পৃক্তি আমাদের জাতিস্মর করে তা কিছুটা ভিন্নতর  অনুশীলনে প্রকাশিত হলেও মৌলিক টানে আসঙ্গলিপ্সা কামনার গলন থেকে  মুক্তি পাই না। এ-রকমই মানবচরিতনামা পর্যবেক্ষণ করলেন কবি মধুমঙ্গল বিশ্বাস। নিজেকে দেখলেন, অন্বেষণের সূক্ষ্মতায় ধরা পড়লেন উত্তরাধিকার  আর আদিমপ্রবাহের কাছে। যাকে আমরা বলতে পারি—প্রত্নপ্রতিমা বা Archetype Arts. স্যার জেন্স ফ্রেজার থেকে মড বডকিন, ফ্রাই, উইলসন  নাইট প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকেরা প্রত্নপ্রতিমা নিয়ে মানুষের আদিরূপের পরিচয় পেয়েছেন। মধুমঙ্গল বিশ্বাস ‘ভূমিদাস: অপার্থিব অরূপের অমেয় আশ্লেষ’ কবিতায় অতীন্দ্রিয়বাদীদের মতোই প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যে থেকে নিজেকে তুলে এনেছেন। আদিম সেই রূপের অন্বেষণে প্রতীক, খণ্ডচিত্র ও লোককাহিনির মধ্যে ঢুকে গেছেন। তাঁর ‘ভূমিদাস’ কথাটিতেই তা বেশি ইঙ্গিতবহ। কবিতায় তিনি উল্লেখ করেছেন—
‘এ জীবন ঋণগ্রস্ত।
ঋণের দ্রাঘিমা জুড়ে অমায়িক লীলা জেগে থাকে
শ্যামের বাঁশরি বাজে, খুলে যায় শারীরিক শাস্ত্রনিমগ্নতা
মেঘের কৌমার্য খেয়ে খলখল হেসে ওঠে অকৃতজ্ঞ বিধি।’
উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রত্যেকেই যে আমরা ঋণী এবং ঋণের দ্রাঘিমা । জুড়ে অমায়িক লীলায় নিজেদের চরিতার্থ খুঁজি— কবিতার পরবর্তী অংশে  তা স্পষ্ট। ‘শ্যাম’ পৌরাণিক মিথের আড়ালে আমরা নিজেদেরই শরীরী  আশ্লেষে আদিম ক্ষুধায় জেগে উঠি। মায়ায় ডুবে যাই। প্রকৃতি, ঈশ্বরও এরই সমার্থক। কবিও অনুভব করেছেন—
‘আমার সমৃদ্ধ শরীর কুমোরের চাকাটির কেন্দ্র হয়ে ওঠে 
আর আমি শর্তহীন আকারের দাসপাত্র হয়ে গৃহেগৃহে ঘরেঘরে শোভা পেতে থাকি।’
        ভূমিদাসের এখানেই সার্থকতা। মাঙ্গলিক লোকাচার থেকে অতীন্দ্রিয় ভালেবাসা এবং মানবিক মগ্নতায় গড়ে ওঠা স্বপ্নবালিকার বিভ্রম সবই নাগরিক জীবনাচারে মিশে থাকে—
‘হহৃদয়ে হহৃদয় মেশে, প্রতিদিন বর্ষা ঘনঘোর চাঁদে চাঁদে বোধিশঙ্খ রাত্রিবিভাজন’
অর্থাৎ Archetype শুধু বাইরের পরিণতিতে নয়, ভেতরেও এর কার্যক্রম সক্রিয় এবং স্বয়ংক্রিয় চালনায় প্রবাহিত। এই কারণেই হৃদয়ে হৃদয়—ওই যে জয় গোস্বামীর অন্তরীক্ষে বেজে ওঠা ভেরী এবং বর্ষা কামনা— ঠিক এখানেও ‘প্রতিদিন বর্ষা ঘরঘোর’ মহুকথারই বিনীত নির্মাণ। ‘চাঁদে চাঁদে বোধিশঙ্খ রাত্রিবিভাজন’—’বোধিশঙ্খ’ তো কাল-মহাকাল ব্যক্তি নিরপেক্ষ বোধের জৈবজাগরণ। সভ্যতার এক-একটি পর্বের উপলব্ধিতে চাঁদের লীলাও পাল্টায়,তখন রাতের রূপ বিভাজন ঘটে। কিন্তু ‘বোধিশঙ্খ’ আমাদের জীবনাসক্তির কার্যধারাকে অন্তঃস্রোতে প্রবহমান রাখে। কুমোরের চাকাটিই প্রাণউসের নিয়ন্ত্রণক। দার্শনিক উপলব্ধির উপমানটি ভেদ করলে অবলীলায় জীবন প্রক্রিয়ার এই রসায়ন খুব সাবলীলভাবে প্রতিপন্ন হয়।
 
Automatic Writing
 
Nonsense Poetry-এর মতো দীর্ঘকবিতা কখনো কখনো Automatic writing হতে পারে। স্বপ্নচালিত বা নেশাগ্রস্ত কবি ঘোরের মধ্যেও শব্দনৌকায় জীবনস্রোত পেরিয়ে যেতে চান। সৃষ্টির অদিমচেতনা বা primitive consciousness ঠিক এরকমই থাকে যাকে stream of unconsciousও বলা যেতে পারে। কবিতায় তখন শিল্প কতখানি আরোপিত তা বিচার্য নয়—শুধু একটা গতি অনবদ্য জড়তা ভাঙা শব্দমিছিলের বিচিত্র গান। যে গানে আমাদেরই অতীত, সভ্যতা, বিজ্ঞান, কামশাস্ত্র, ধর্মবিদ্যা, মহাজ্ঞান লুকিয়ে থাকে। দৈব-পর্যটনের মতো কোনও নৈশবেহাগের সান্দ্র বৈরাচারিতায় আমরা আত্মমুখ  ঢেকে ফেলি। পারিপার্শ্বিক গুঢ়ৈষা থেকে বিপন্ন অস্তিত্বের জৈবিক উত্থান-পতনে তার সমাধান ও সমাধি রচনা চলে। কবিতার এই নম্রধর্ম এবং গতিবাদ্য আধুনিক মননের একটি আশ্রয় ও অন্তিম কারু বলা চলে। কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যেও এর আলো-আঁধারি বিহার দেখা গেছে। বিশেষ করে আলফ্রেড টেনিশন, রবার্ট ব্রাউনিং এবং এসি.টি. কোলরিজ এই ধারায় কবিতা লিখেছেন। যেখানে Abnormal Psychology-এর কারণে কবিতাও Abnormally tall হয়ে গেছে। দু-একটি উদাহরণ নিলে এই গতিপ্রবাহকে আমরা অনুধাবন করতে পারব।
Coleridge-এর KUBLA KHAN একটি স্বপ্নদৃশ্যেরই অভিযাত্রা—যা খণ্ডিত এবং অসম্পূর্ণ। কবিতাটির এক জায়গায় কবি বলেছেন—
‘But oh! that deep romantic chasm which slanted
Down the green hill athwart a cedarn cover! 
A savage place! as holy and enchanted
As e’er beneath a waning moon was haunted
By woman waiting for her demon-lover!”
পাহাড়ের নিচে সুন্দর সবুজশোভিত গিরিখাতে এক আদিম ও রহস্যময় পরিবেশ রচিত হয়েছে। যেখানে মুগ্ধ আবেশে চাঁদের আলোকচ্ছটায় ডাকিনি প্রেমিকা তার প্রেমিকের সঙ্গে সকরুণ নাচ নেচে চলেছে। স্বপ্ন-বাস্তবের এই দৃশ্য দেখার জন্য একটা আলাদা চোখ চাই, এর ভাষাবোধ গড়ে তুলতে একটা আলাদা মনের দরকার। ভূতে পাওয়া কবিতার মতো বাংলা সাহিত্যেও বেশ কয়েকজন কবি এরকম কবিতা লিখেছেন। তাঁদের মধ্যে দু-একজন হলেন—পবিত্র মুখোপাধ্যায় (শবযাত্রা), কাঞ্চল চক্রবর্তী (স্বপ্নমায়াজাল)। বর্তমানে এই ধারায় বৈচিত্র্যও এসেছে অনেক। মূলগত বিষয়কে ঠিক রেখেই শব্দ, ভাষা এক প্রসঙ্গচ্যুতির মধ্যে দিয়ে আরও নতুন নতুন মিথের সাবলীল প্রয়োগ ঘটেছে।
          শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় দেখতে পাই একধরনের বিচ্ছিন্নতা ও অস্থিরতা, প্রশ্ন ও বিস্ময়। ‘এই বাংলাদেশে ওড়ে রক্তমাখা নিউজপেপার বসন্তের দিনে!’ কবিতার এক জায়গায় তিনি লিখেছেন—
 ‘রাজার বাড়িতে আজ ভোজসভা
                              তীর্থে প্রিয়নাম
তুমি না আড়াল থেকে জনতার, চাক্ষুষ রাজার! 
                            তুমি কোন পথে যাবে?
কার সংবৎসরের ধৈর্য নেবে? কোন অন্নকূট?
                                   তুমি ধর্ম-পুরোহিত’ 
ইতিহাস এবং বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিত থেকেই নিয়ত করিতার এই আমোঘ টান পর্যবেক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তি থেকেই উৎসারিত মানব-কেন্দ্রের জৈবসত্তা স্বীকৃত সংকেত সহায় আলো-অন্ধকার। শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই করিতার শেষ অংশে তাই বলেছেন—
‘দ্বার খোলে গুঢ়তার, দ্বার খোলে রহস্যবোধের
শুকতারা তুলে ধরে অন্ধকার কুড়ির চিবুক
                           —পছন্দ না হয়ে যায়! 
                          আরো পরিস্ফুটতর হবে।’
আমাদের কাছে আরও পরিস্ফুটতর হবে নির্জন-বাস্তবের বিষয়-বিমুখ স্তরে পৌঁছে আমরা উপলব্ধি করতে পারব ইতিহাস-পুরাণের মিথের ভেতর আদিকেন্দ্র জীবনের মহাযজ্ঞকে। বাল্মীকির মহাশ্লোক থেকে ঝরে পড়া শব্দ-মিথুনের মহাচক্রধাঁধায় নিজেরাও ঘুরে যাচ্ছি। জীবনরহস্যের কি কোনও রহস্যভেদ সম্ভব? কবি চিত্তরঞ্জন হীরা ‘অগ্রন্থিত সন্ধ্যানাম নিদ্রাগীতিকা’ কবিতায় শুধু একটা স্বয়ংযাপন গতিবাদই লক্ষ করেছেন। যার ক্রিয়ায় মনুষ্য সভ্যতার প্রক্ষিপ্ত উল্লাস বিরাজ করছে। একটা সময়-গোলকের মধ্যে যেন আমরা পরিচালিত ও পরিবেশিত হচ্ছি। লোকাচার, জীবনচর্চা শুধু শব্দানুষঙ্গে প্রতিফলিত এবং ব্যবহৃত। ধর্ম-কাম-মোক্ষ, ভোগাকাঙ্ক্ষা সব একই দ্রাঘিমায় অর্জিত এবং গ্রন্থিত। সে-সবই নিদ্রাগীতি—
প্রত্যহ আলো-আঁধারের উচ্চারণ— 
‘নিদ্রা নয় নিদ্রা নয় বৎসগণ লেখো প্রাত্যহিক
ত্রিকাল সেধেছে দিন নিদ্রার অতীত।
নিদ্রা নয় নিদ্রা নয় লেখো ধ্যান জৈবনিক
কে কার সৃষ্টি খায় ধ্বংসের অধিক।
ধ্বংস নয় ধ্বংস নয় নির্মাণের পথে
অগ্রন্থিত সন্ধ্যানাম স্বপ্নদ্বৈরথে।’
জৈবনিক ধ্যান এবং স্বপ্নদ্বৈরথে সন্ধ্যানাম জীবধর্মের ভেতর রহস্যময় আবেগ স্থাপন যা আদিম চেতনারই নামান্তর। তাই বারবার কবিতাটিতে ক্রৌঞ্চমিথুনের কথা আসে, ইতিহাসের কথা আসে। সামাজিক, রাষ্ট্রিক এবং নৈতিক সমূহ ঘেরাটোপের নীতি-নিয়মের ভেতর জীবনের ক্রমস্তর নিহিত হয়। জেগে ওঠা নিহিত হয়। চিত্তরঞ্জন সেই কবিই যিনি অন্বেষণের ভেতর দাঁড়িয়ে ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধারকে বাজিয়ে দেন।
error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত