| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া অনুবাদ উপন্যাস: অর্থ (পর্ব-৩০) । ধ্রুবজ্যোতি বরা

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি বরা পেশায় চিকিৎসক,অসমিয়া সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য লেখক ২৭ নভেম্বর ১৯৫৫ সনে শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন ।শ্রীবরা ছাত্র জীবনে অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন ।’কালান্তরর গদ্য’ ,’তেজর এন্ধার‘আরু’অর্থ’এই ত্রয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সনে ‘ কথা রত্নাকর’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাকি উপন্যাসগুলি ‘ভোক’,’লোহা’,’যাত্রিক আরু অন্যান্য’ ইত্যাদি।ইতিহাস বিষয়ক মূল‍্যবান বই ‘রুশমহাবিপ্লব’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’,’ফরাসি বিপ্লব’,’মোয়ামরীয়া বিদ্রোহ’।শ্রীবরার গল্প উপন্যাস হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা, মালয়ালাম এবং বড়ো ভাষায় অনূদিত হয়েছে।আকাডেমিক রিসার্চ জার্নাল’যাত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ।’ কালান্তরর গদ্য’ উপন্যাসের জন্য ২০০১ সনে অসম সাহিত্য সভার ‘ আম্বিকাগিরি রায়চৌধুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।শ্রীবরা অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি।


অনুবাদকের কথা

কালান্তর ট্রিলজির তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হল’অর্থ’। সশস্ত্র হিংসার পটভূমি এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ জীবনের দ্রুত অবক্ষয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার তাড়না এবং বেঁচে থাকার পথ অন্বেষণেই আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনী ভাগ গড়ে তুলেছে। সম্পূর্ণ পৃথক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে অসমের মানুষ কাটিয়ে আসা এক অস্থির সময়ের ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের অন্বেষণ চিরন্তন এবং সেই জন্যই লেখক মানুষ– কেবল মানুষের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারে।

এবার উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে এলাম।আশা করি ইরাবতীর পাঠকেরা এই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত অসাধারণ উপন্যাসটিকে সাদরে বরণ করে নেবে। নমস্কার।

বাসুদেব দাস,কলকাতা।


      রাতটা ছিল অন্ধকার।অন্ধকার এবং ঠান্ডা।

      হিমালয়ের ওপরে,সেই ছোট্ট বেছ ক্যাম্পটার সামনের বারান্দায় ,প্রাচীন ইটের স্টোভটির আগুনের উত্তাপ এবং আলোর সামনে,আমার নিজেকে অন্ধকার একটি সাগরে দিক হারিয়ে ভেসে যাওয়া একটি নৌকায় ঘুরে বেড়ানো বলে মনে হচ্ছিল।দেবদারু গাছগুলির পাতার মধ্যে বাতাসের এক মৃদু সোঁ সোঁ শব্দ হচ্ছিল,কিন্তু ঘরটার জন্য আমাদের গায়ে বাতাস লাগছিল না।অন্ধকার,বাতাসের শব্দ এবং আগুনের নাচতে থাকা আলোর জন্য নৌকায় উঠে বেড়ানোর ধারণাটা বেশি করে হয়েছিল।

      আর আমরা আস্তে আস্তে কথা বলছিলাম।

      আমরা আসলে কে—আমরা নিজে নিজেকে আর একে অপরকে প্রশ্ন করছিলাম।আমরা কে?তুমি কে?তুমি কে?

      এই ধরনের কথা-বার্তায় একটা পরিবেশ হয়েছিল এবং প্রশ্নটা অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছিল না।কমে আসা আগুনের আলোতে সামনে মাত্র আমরা দুজন।

      লোহার শলা দিয়ে খুঁচিয়ে আগুন জ্বালাচ্ছিলাম।শুকনো সরল কাঠের খড়িগুলি ফড়ফড় করে জ্বলে উঠছিল।

      আগুনের কিছু শিখা নাচতে নাচতে ওপরে উঠে এসেছিল—ধোঁয়া আর স্ফুলিঙ্গগুলি উড়ে গিয়ে চিমনিটাতে ঢুকেছিল।আগুনের উত্তাপ যেন বাইরের পাহাড়ি শীতকে ঠেলে দূরে পাঠিয়েছিল।স্টোভের চালাটার কাছে কম্বল গায়ে দিয়ে রামলাল শুয়ে আছে।আমাদের সঙ্গে কথা বলে সে একটা সময় শুয়ে পড়েছিল।আগুনের নাচতে থাকা আলোগুলি তার মুখের উঁচু-নিচুতে খেলা করছিল।খুব আরামে শুয়ে ছিল সে।সামান্য নাকের শব্দ হচ্ছিল।আগুনের উত্তাপ এবং রামলালের নাকের শব্দ পরিবেশটা নিবিড় করে তুলেছিল।

      আমরা আসলে কে সেই প্রশ্নের উত্তর আমরা নিজেরা নিজেকে দিতে চেষ্টা করেছিলাম।আমার বর্ণনা আমি তাকে দিয়েছিলাম।

      সে একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে।বাবা স্থানীয় কলেজের একজন শিক্ষক ছিলেন।এখন রিটায়ার্ড।মা একজন সাধারণ মহিলা—হাউস ওয়াইফ।ওদের আত্মীয়রাও একই,ওদের মতোই।কোনো বড়ো মানুষ,মানে সমাজের তথাকথিত বড়ো মানুষ  ওদের আত্মীয় স্বজনের ভেতরে নেই।কেবল অন্য অনেকের না থাকা জিনিস একটা ওদের ছিল।নগরে মোটামুটি বড়ো-সড়ো জায়গা নিয়ে একটা অসম টাইপের থাকা ঘর ছিল আর ছিল ছিল বাজারের কাছে এক টুকরো জমি।সেখানে দুটি পুরোনো টিনের ভাড়া ঘর ছিল।ভাড়াটিয়ারা অনেক বছর আগে দেওয়া ভাড়াই বছরের পরে বছর দিয়ে আসছিল—এক পয়সাও বাড়ায় নি…  …

      ‘আছে আছে,তার একটা ভাই আছে।দুটো ছেলে।ভাই ডাক্তারি পাশ করে এখন দিল্লিতে রেসিডেন্সি করছে এবং পোস্ট গ্রাজুয়েট সিটের জন্য চেষ্টা করছে।‘

      ‘গুয়াহাটির স্কুল,কলেজে পড়ার সময় সে খুব সাধারণ ছেলে ছিল–মধ্যমানের বা তারও নিচে বলা যেতে পারে।ক্রিকেট খেলে,গান শুনে খুশি হওয়া,বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আড্ডা মাারতে পছন্দ করা,বাইরের বই পড়তে পছন্দ করা একটা সাধারণ ছেলে।তার হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করার খুব ইচ্ছা ছিল,কিন্তু গুয়াহাটিতে বাড়ি হওয়ার ফলে সে হোস্টেলে থাকার সুযোগ পেল না।ভাই কিন্তু মেডিকেল পড়ার জন্য হোস্টেলে থাকার সুযোগ পেল।সে সেই সুবিধা পেলেই হোস্টেলের বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাত।

      ‘কী বই?সে জিজ্ঞেস করেছিল।

      ‘গল্প,উপন্যাস সব ধরনের বই।

      অসমিয়া ,ইংরেজি ,বাংলা যা পায় ।’ বিশেষ কোনো বাছ বিচার ছিল না। পড়ে অন্যের সঙ্গে কথা বলে সে সাহিত্য টাহিত্যের বিষয়ে বেশ কিছু কথা জানতে পেরেছিল। ভালো খারাপ অল্প বিচার করতে শিখেছিল— সমাজ সাহিত্য রাজনীতির বিষয়ে কিছু কথা জেনে ছিল।

      ‘ সাহিত্য সমাজ রাজনীতি ! রাজনীতিতে আগ্রহ ছিল নাকি তার?’

      ‘ প্রচুর।’

      ‘রাজনীতি করেছিল নাকি সে?’

      ‘ করেছিল ,করেছিল। কলেজের ছাত্র রাজনীতিতে সে পুরোদমে নেমে পড়েছিল। কিন্তু সব সময় অন্যের জন্য, নিজে নেতা হওয়ার জন্য নয়। সব সময় একটা নীতির পক্ষে দাঁড়াতে সে পছন্দ করত। কিন্তু একটা কথা, রাজনীতির মধ্যে থাকলেও নেতা টেতা হয়ে রাজনীতিতে জড়িত হয়ে পড়ার তার কোনো ইচ্ছা ছিল না।

      ‘কেন? কেন ছিল না?’

      ‘ রাজনীতি বলতে সে বুঝত কিছু নীতি এবং সেইসবের রূপায়ণের কার্যসূচি। বাস্তবে যা থাকে না— ছিলনা।’

      ‘ বাস্তবে কী ছিল?’

      ‘ সহজ আবেগ, নীতিহীন কৌশল এবং অন্তহীন সুবিধাবাদ।

      আমরা কিছুক্ষণ নীরব  ছিলাম।

      স্টোভের উনুনে সরল কাঠগুলি জ্বলে শেষ হয়ে এসেছিল।

      ‘ একটি সাধারণ ছেলে, একটা রাজনীতিতে আগ্রহী কিন্তু অনিশ্চিত ছেলে…  …

হয়তো একটু ভয়াতুর…   …’

      ‘ ভয়ের চেয়ে লজ্জা পাওয়ার আশঙ্কা বেশি হয়তো’

      ‘ একটা নয় ,আসলে সে। তার মানে অনেকগুলি ছেলে’ 

অনেকগুলি–একটা অন্যটিতে গিয়ে ঢুকে মিশে যায়— একটা ভয় পাওয়া ছেলে, একটা মানসিকভাবে চিকিৎসা নেবার প্রয়োজন থাকা ছেলে, একটা লোভী ছেলে– পয়সার লোভ— ক্ষমতার। ।জীবনে লক্ষ্যবিহীন ছেলে। হ্যাঁ জীবনের লক্ষ্য হারিয়ে ফেলা ছেলে।

      ‘ কেন?’

‘ কেন মানে? কীসের লক্ষ্য? লক্ষ্যের কি নিশ্চয়তা আছে? থাকে কি?’

  সে কেবল মাথা নাড়ল।

         এই ধরনের বহুকিছু  মিলেএকটা আমি হয়— তাই কীভাবে বলবে কোনটা আসলে আমি। সবকিছু মিলেই আমি — আমরা।

‘ আসলে কি জান— এই— এই মুহূর্তে আমি যা — সেটাই সত্য।’ মেয়েটি বলল ।

আমরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।

          রাত অনেক হয়েছিল। হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখি চারটা বাঁচতে চলেছে। ভোর হতে চলেছে। স্টোভটার আগুনটা জায়গাটাকে আলোকিত  করে রেখেছে। বাইরের কুয়াশা গুলি ঘন হয়ে উঠেছে । কালো অন্ধকারগুলি যেন দৃশ্য পটের পরিসীমায় জমাট বেঁধে  রয়েছে।

 হঠাৎ সেই কুয়াশা এবং অন্ধকারের মধ্যে একজোড়া চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।

 ‘ওটা কি? মেয়েটি জিজ্ঞেস করল। চোখের ঝলকানিটা সেও দেখেছিল।

 আমার বুকটা হঠাৎ ধপ ধপ করে উঠল। চিতাবাঘ? চিতাবাঘ নাকি? পাহাড়ের এই অঞ্চলে মাঝেমধ্যে চিতাবাঘ বের হয় বলে শোনা যায়। আমরা এভাবে বাইরে বসে থাকাটা ঠিক হয়নি। আমি ধড়মড়  করে বসা থেকে উঠে দাঁড়াতে যেতেই চোখ জ্বলজ্বল করতে থাকা জন্তুটা এগিয়ে এল। আলোর বৃত্তে সে চলে এল। 

‘কুকুর,’ আমার কণ্ঠস্বরে স্বস্তির সুর ফুটে উঠল।

 ‘কোথাকার কুকুর? এত রাতে! পাগল নয় তো? দেখলে কেমন ভয় হয় ।’

 কুকুর-টা যেন আমি আগে কোথাও দেখেছি! হ্যাঁ ,পরিচিত কুকুরটা। কুকুরটা এবার কাছে চলে এল। রামলালদের কাছে গিয়ে শুঁকে দেখল তারপর সে পাশে বসে শুয়ে পড়ল ।

‘রামলালের কুকুর,’আমার মনে পড়ল তখন।‘রামলাল ডিউটিতে আসার সময় সে বোধহয় বাড়িতে ছিল না। এখন খুঁজে খুঁজে এসে উপস্থিত হয়েছে।এমনিতে সঙ্গে আসে।’ 

মালিকের পাশে কুকুর-টা ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল।

আমরা দুজনেই একসঙ্গে হেসে উঠলাম।

‘ক্ষুধা পেয়েছে,’ মেয়েটি হঠাৎ বলল।

‘আরও এক কাপ কফির জল বসিয়ে দাও । ভেতরে নিশ্চয় রুটি বিস্কুট কিছু আছে। আমি নিয়ে আসছি। 

‘দাঁড়াও, দাঁড়াও একা যাবে না, আমিও যাচ্ছি। মেয়েটি একা বাইরে থাকতেচাইল না ।

আমরা দুজনে ভেতরে গিয়ে অফিস ঘরে রাখা পাউরুটি মাখন এবং বিস্কুট আনলাম।কেটলিতে কফির জল বসিয়ে দিলাম।মেয়েটি ঠান্ডায় পাথরের মতো শক্ত হয়ে যাওয়া মাখনের প্যাকেটটা আগুনের কাছে গলার জন্য রাখল।স্লাইস রুটি গুলি আগুনে  সেঁকতে  লাগল।আমি ডিম ভেঙ্গে অমলেট বানাতে লাগলাম।খাবার তৈরি করার শব্দে কুকুরটা জেগে উঠল। সে শুয়ে থাকা থেকে উঠে বসল এবং খাবার জিনিসের প্রতি সতৃষ্ণ  নয়নে দেখতে লাগল।তার মালিক রামলাল কম্বল গায়ে দিয়ে তখনও গভীর ঘুমে ।


আরো পড়ুন: অর্থ (পর্ব-২৯) । ধ্রুবজ্যোতি বরা


মাখন লাগানো সেঁকা দুটি ওমলেট এবং কফি দিয়ে যখন আমরা ব্রেকফাস্ট করে উঠলাম তখন পাঁচটা বাজতে চলেছে।দিগ্বলয়ে হয়তো সকালের প্রথম আলো উঁকি দিচ্ছে কারণ গাঢ় কুয়াশা গুলি বেশি সাদা এবং অর্ধস্বচ্ছ  হতে শুরু করেছে ।রুটি ডিম দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে কুকুর-টাও এবার মালিককে ছেড়ে কুয়াশার মধ্য দিয়ে পার হয়ে গেল এবং গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল।

      শুয়ে উঠে খেয়েদেয়ে এখন সে ডিউটি করছে।

      মেয়েটি আগুনে সেঁকে সেঁকে প্রায় কালো করে ফেলা মচমচে মাখন মাখানো রুটি টুকরা ইঁদুরে খাবার মতো ছোটো ছোটো করে কামড়ে কামড়ে খাচ্ছিল। মাঝেমধ্যে কফির পেয়ালায় সে মুখ দিচ্ছিল।অমলেটটা তখনও আধা খাওয়া অবস্থায় রয়েছে।নিজের অজান্তে আমার এত ক্ষুধা পেয়েছিল যে খাওয়ার বস্তুটা আগে পেয়ে নিজের ভাগটা দ্রুত খেয়ে শেষ করেছিলাম। মেয়েটির খাবার জন্য অপেক্ষা,বা সে খেয়েছে কিনাখেয়াল করিনি ।এখন নিজের কথা ভেবে মনে মনে লজ্জা হল।

      ‘তোমার কফি ঠান্ডা হয়ে গেল। গরম আরও এক কাপ দেব নাকি?অমলেট খাও।

      মেয়েটি লাগবে না বলে মাথা নাড়ল। আমি কিন্তু তার কাপের অবশিষ্ট কফিটুকু ঢেলে দিয়ে পুনরায় দু কাপ কফি নতুন করে ঢাললাম।নতুন দু কাপ কফি খেয়ে শেষ  করতে করতে বেশ আলো হয়ে গেল। রামলাল ঘুম থেকেউঠে আড়মোড়া ভেঙ্গে রাম রাম সাহেব বলল।তারপরে সে তখনই জায়গাটা পরিষ্কার করতে শুরু করল।      সকালের সোনালি একফালি কোমল রোদ দূরের পাহাড়টার দেবদারু গাছগুলির সামনে এসে পড়ল।আমি তাকে সেদিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললাম,চল হেঁটে আসি।ভালো লাগবে।’

      ‘ইস,মুখ হাত ধুই নি।’

      ‘তাড়াতাড়ি ধুয়ে নাও।’

      সে বসা থেকে ভেতরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল।

      ‘গরম জলের কেটলিটা নিয়ে যাও।বালতির জল বোধহয় বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে।’মেয়েটি কিছুই না বলে কেটলিটা নিয়ে ভেতরে গেল।আমিও দ্রুত দাঁত মেজে মুখটা ধুয়ে নিলাম।সে কাপড় চোপড় ঠিক-ঠাক করে মুখ-হাত ধুয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।নীল উলের টুপিটার জায়গায় সে একটা লাল টুপি পরেছে।ক্রিম ঘষা মুখটা চকচক করছে।রাতে ঘুমোয়নি যদিও তার চোখজোড়া উজ্জ্বল।তাকে দেখে বললাম,‘চল যাই।’

      কুয়াশার মধ্য দিয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম।রামলালের কুকুরটাও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে এল।ধোঁয়ার মতো কুয়াশার মধ্যে দেবদারু গাছগুলি আধা ঢুকে,আধা বেরিয়ে অস্পষ্ট হয়ে আছে।পাহাড়ের কিছু পিঠে আশ্চর্যজনকভাবে কুয়াশা নেই,সেই পিঠগুলিতে সকালের রোদ পড়ে ঝলমল করছে।কোথাও কুয়াশার আবরণের ওপরে দেবদারু গাছের সামনের দিকটা বেরিয়ে আছে আর সেখানে রোদ পড়ছে।ধোঁয়ার সাগরে গাছগুলি ভেসে থাকার মতো মনে হল।

      আমরা কিছুদূর হেঁটে এসে রাস্তার পাশের একটা পাথরের ওপরে বসলাম।লাল কাপড় পরা বৌদ্ধ লামারা কুয়াশা এবং রোদের মধ্য দিয়ে গ্রামে যাচ্ছে।কিছুটা দূরে একটা ছোটো বৌ্দ্ধবিহার আছে।সেখানথেকে সকালবেলা লামারা গ্রামে রুটি কিনতে আসে।গোল গোল বলের মতো যবধানের একধরনের রুটি বানায় গ্রামটিতে।সকালের আহারের জন্য লামারা রুটি এবং তরি-তরকারিকিনে নেয়।পুণ্যপ্রত্যাশী গ্রামের মানুষ কখনও ভিক্ষুকদের এটা-ওটা জিনিস কিনে দেয়,মূলত নিজের খেতে উৎপন্ন হওয়া গোমধান,শাক-সব্জি,ফল আদি।গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই বৌ্দ্ধ ধর্মাবলম্বী।দুই একঘর হিন্দুও আছে রামলালদের মতো।

      ‘এই বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের কথা আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে।’মেয়েটি বলল।

      ‘এর পরে তো আমরা মেকলডগঞ্জে যাব।সেখানে তো তোমরা দুদিন থাকবে বোধহয়।সেখানেই এই ভিক্ষুকদের বিষয়ে সমস্ত জানতে পারবে।’

      ‘মেকলডগঞ্জে?আমরা যে আসার সময় প্রবেশ করেছিলাম?’

      ‘ও,সেখানেই দালাই লামা থাকে।’

      ‘এত ছোটো শহর।অবশ্য ভালোভাবে দেখাই হল না।বিকেলে পৌছলাম,আমরা দুজনেই একসঙ্গে হেসে উঠলাম।

      ‘ফিরে যাবার সময় ভালোভাবে দেখবে।’

      বৌদ্ধ ভিক্ষুণীরা থাকে না সেখানে? পথে দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।

      ‘থাকে। অনেক আছে। অনেক কষ্টে থাকে। পুরো শহরটা তিব্বতি শরণার্থীতে ভর্তি।’

      ‘এই ভিক্ষুণীদেরবিষয়ে আমার জানতে ইচ্ছা করে।’

      আমি বললাম যে মেকলডগঞ্জে থাকলে সে সমস্ত কিছু জানতে পারবে। তিব্বতি ভিক্ষু- ভিক্ষুণীরা খুব বন্ধু ভাবাপন্ন লোক। ওরা সহজেই মানুষকে আপন করে নেয়। আমরা পাথরে বসে অনেকক্ষণ কথা বলতে থাকলাম। এক সময় সে বলল,’চল যাই। ঘুম পাচ্ছে। সকালবেলাটা এখন শুয়ে পড়ি চল। এখন তো আর ভয় লাগছে না।’আমরা পথ থেকে উঠে বাড়ির দিকে রওনা হলাম। কুয়াশার পর্দা ততক্ষণে অনেকখানি কেটে গেছে।

      নানীকে আমরা আজ ব্রেকফাস্ট বানাতে হবে না একেবারে ভাত বানিয়ে নিলেই হবে বলে নিজের নিজের বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আহা কী ঘুম পেল! একটা বাজার পরে নানী ভাত খাবার জন্য জাগিয়ে দেওয়ায় ঘুম ভাঙল। তখনও বিছানা থেকে উঠে আসার ইচ্ছা করছিল না। সারাটা রাত আগুনের পাশে বসে কথা বলে সকালবেলা এত দেরি করে ঘুম থেকে উঠাটা নানী পছন্দ করেনি। ঘুম থেকে উঠার পরেও মানুষটা একা একা গজ গজ করছিল।

      নানী করে রাখা গরম জল দিয়ে হাত পা ধুয়ে আমাদের দেহ-মনের অলসতা দূর হয়েছিল। তারপরে ডিম আলুর তরকারি দিয়ে গরম ভাত  খেতে খুব ভালো লেগেছিল। ভাত খেয়ে পুনরায় যেন বিছানায় শুয়ে পড়ব সেরকম মনে হচ্ছিল। কিন্তু বিছানায় না শুয়ে আমরা পুনরায় স্টোভটার কাছে বসলাম। ইতিমধ্যে আকাশে মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল। ধোঁয়ার মতো মেঘ নিচ থেকে বেয়ে বেয়ে উপরে উঠে এসেছিল। আমরা বসে থাকা ঘরটার চার সীমানা, স্টোভটার কাছের খোলা বারান্দাটা কুয়াশার মতো পাতলা হয়ে ঘিরে ধরে ছিল। অত্যন্ত মিহি গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। এখানকার আবহাওয়া এরকমই। হঠাৎ মেঘ হওয়ায় বৃষ্টি হয়ে ঠান্ডা পড়ে যায়, আবার ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে মেঘ সরে গিয়ে ফটফটে রোদ উঠে। স্টোভটার কাছে বসে আমরা কথা বলতে থাকলাম। বৃষ্টি বন্ধ হয়ে এখন আবহাওয়া ভালো হলে ওকে তিন কিলোমিটার দূরে এক সুন্দর দৃশ্য দেখাতে নিয়ে যাব বলে রাখলাম।

      আমরা আগেই ফেলে আসা কথার জের টেনে সে পুনরায় আরম্ভ করল’আন্দোলনের কথা বলতো। আমি খুব একটা জানিনা।’

      ‘কথাগুলি তখন ভালোভাবে বুঝতে পারিনি। আমরা স্কুল কলেজে পড়ার সময় আন্দোলন একেবারে তুঙ্গে উঠেছিল। আমরা পড়াশোনা করা স্কুল এবং কলেজ দুটিই আন্দোলনের ঘাঁটি ছিল। বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীআন্দোলনের স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল। আমরা তো ছোটোই ছিলাম। বড়ো বড়ো মানুষও মাতাল হয়ে পড়েছিল। মুষ্টিমেয় একাংশ মানুষ এবং ছাত্র-ছাত্রী এর বিরোধিতা করেছিল। তাদের বেশিরভাগই বামপন্থী ছিল। বিরোধিতার মূল্যওতাদের দিতে হয়েছিল। তাদের একঘরে করা হয়েছিল, প্রথমে অঘোষিতভাবে, তারপরে সামাজিকভাবে। জায়গায় জায়গায় মারপিট করা হয়েছিল। কোথাও কোথাও এই ধরনের বিরোধীকে হত্যা করা হয়েছিল।’

      ‘হত্যা করা হয়েছিল?’তার চোখ জোড়া বড়ো বড়ো হয়ে উঠল।

      ‘একটা ঘটনা আমি জানি। একজন বামপন্থী ছাত্রনেতাকে মায়ের চোখের সামনে যাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।’

      মেয়েটি হাত দুইটি দিয়ে মুখটা ঢেকে ফেলেছিল।

      ‘বামপন্থীদেরও যে একেবারে দোষ ছিল না তা নয়,’আমি বললাম। ‘সাধারণ মানুষ, ছাত্রদের আবেগকে তারা বুঝতে চেষ্টা করেনি। বরঞ্চ নেতাদের কথায় অন্ধভাবে বিরোধিতা আরম্ভ করেছিল। কিন্তু, ওদের সাহস ছিল ।সেটা মানতে হবে।’

      ‘তুমিও তাদের সঙ্গে ছিলে নাকি? মেয়েটি জিজ্ঞেস করেছিল।

      ‘ওহো ছিলাম না ।নিজের মতামতের পক্ষে সাহসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কষ্ট এবং বিপদের সম্মুখীন হওয়ার জন্য মনে মনে তাদের প্রশংসা করেছিলাম। কথাবার্তাও বলেছিলাম। কিন্তু সমর্থন করতে পারিনি কারণ তাদের স্থিতিও সব সময় উচিত এবং শুদ্ধ বলে মনে হচ্ছিল না আমার। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদেরও সমর্থন করতে পারছিলাম না—হয়তো তাদের আবেগ সর্বস্বতার জন্যই।’

      সে তন্ময় হয়ে আমার লেকচার শুনে যাচ্ছিল।

      ‘আসলে আমরা দুটি শিবিরের মধ্যে ঝুলতে থাকা ত্রিশঙ্কুর মতো ছিলাম।’

‘তোমাদের মতো কত জন ছিল?’ 

      ‘একেবারে হয়তো কম ছিল না কিন্তু আমরা সংগঠিত ছিলাম না। আর একটি মজার কথা আমার মনে হয়েছিল।আসলে তখনই মনে করেছিলাম না পরে ভেবে বের করেছিলাম বলতে পারছি না ।কথাটা হল যে আন্দোলনের জোয়ারে ভাটা পড়লেই আমাদের শিবিরের সংখ্যা বৃ্দ্ধি পেয়েছিল এবং আন্দোলনের সক্রিয় কার্যসূচি আরম্ভ হলে আমাদের সংখ্যা কমে এসেছিল।’

      সে বলল এই সমস্ত কথা সে জানত না। হয়তো বিদেশ চলে যাবার জন্যই। তার আগেও সে বাইরে পড়াশোনা করেছিল। সে জিজ্ঞেস করেছিল,’তোমরা কি করছিলে?’

      ‘আমরা? আমরা হয়ে পড়েছিলাম পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মেলাতে না পারা, মিলতে না পারা অসন্তুষ্ট একদল মানুষ।’মেয়েটি জিজ্ঞেস করল কতটা অসন্তুষ্ট? আমি বললাম খুবই অসন্তুষ্ট। বললাম সেই যে অসন্তুষ্টি শুরু হল, তা চলতেই থাকল। খুব কম বয়সেই আমি অত্যন্ত পরিচিত হয়ে পড়লাম। কেবল নেগেটিভকে দেখা হল, কেবল সমালোচনা করতে শিখলাম। আর সেই ধরনের অসন্তুষ্ট মানুষের সঙ্গেই দেখা হল। অধ্যাপক উকিল ডাক্তার সাংবাদিক লেখক কবি–এই ধরনের একদল মানুষের একটা বড়ো চক্র গড়ে উঠল। আমরা প্রত্যেকের দোষ দেখলাম, সমালোচনা করলাম ,কেউ কিছু ভালো কথা  বললে মতলব রয়েছে বলে বা দেখানোর জন্য বলছে বলে ভাবলাম। মেয়েটি বলল আমি নিজেকে অতি কঠোরভাবে বিচার করছি। আমি বললাম–হয়তো হতে পারে, কিন্তু এটাও সত্যি যে আমাদের দলের ডাক্তার ডাক্তারি করতে থাকল, উকিল ওকালতি চালিয়ে গেল, অধ্যাপক অধ্যাপনা করে গেল, কিন্তু আমরা যে কয়েকটি ছোটো ছাত্র ছিলাম, আমরাই পড়াশোনা বাদ দিলাম। আমাদেরই কিছু হল না।

      ‘এই দোদুল্যমান, অসন্তুষ্ট ,পরিচিত মানুষটিই বোধ করি আমার অন্য একটি পরিচয়।’ওকে বললাম, সে কিছু বলল না। দূরের দিকে শূন্যভাবে তাকিয়ে থেকে সে যেন কোনো চিন্তায় ডুবে গেল।

      ‘আমার সঙ্গে একটি ছেলে ছিল বুঝেছ,’আমি কথা বলতে শুরু করলাম।’তার নাম রমেন। আমরা স্কুলের সহপাঠী ছিলাম। শৈশব থেকেই সে বড়ো প্র্যাকটিক্যাল। আন্দোলনের কাজকর্মে সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আন্দোলনের পরে হওয়া নির্বাচনে যখন ছাত্রনেতারা সরকার বানিয়ে মন্ত্রী হয়েছিল, তখন সেই সুযোগ বুঝে বিজনেস করতে শুরু করেছিল। সে আমাকে প্রায়ই বলতো’…  …’

      ‘কী বলেছিল সে?’

      বলেছিল ,একেবারে বুদ্ধিজীবী হয়ে পড়েছিস। এসব বাদ দে। একসঙ্গে বিজনেস করি আয়।’

      ‘তুমি কী বলেছিলে?’

      ‘তাকে কিছুটা কঠোরভাবে খোঁচা মেরে বলেছিলাম, বিজনেস? বিজনেস না দালালি? সে তখন ছোটোখাটো সাপ্লাইয়ের সঙ্গে নতুন করে হওয়া মন্ত্রীদের সঙ্গে থাকা পরিচিতির সুযোগে এটা ওটা  দালালি আরম্ভ করেছিল।’

      ‘সে তখন কী বলেছিল?’

      ‘বলেছিল —দালালি বলে হাসবি না। পৃথিবীর অর্ধেক বিজনেসই হল দালালি।’

      সে একজন মানুষের নাম বলেছিল,’তোরা প্রত্যেকে তাকে মাটির দালাল বলে হাসিস। আমেরিকায় হলে রিয়েল এস্টেট এজেন্ট বলে মানুষটাকে সম্মান করত।’মেয়েটি বলল যে মানুষটাকে সেও জানে এবং রমেন সত্যি কথাই বলেছিল। আমি বললাম যে সেই সব কথা আমি তখনই উড়িয়ে দিয়েছিলাম। রমেন নিজে আমার সঙ্গে যোগাযোগ না রাখলে এবং আমি বোধহয় নিজেও রাখতাম না। অন্য অনেক বন্ধুর মতো সেও হারিয়ে যেত।

      এক ঝাঁক মুষলধারে বৃষ্টি দেওয়ার পরে আকাশটা তখন ফটফটে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। তখন তিনটা বাজে। আমি তাড়া লাগালাম,

      ‘চল উঠ।এভাবে এখানে বসে থেকে কথা বললে হবে না। তোমাকে দেখাতে চাওয়া জায়গাটা এখন গেলেই দেখাতে পারব।’

      অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেন সে উঠে দাঁড়াল।

      তিন কিলোমিটার যেতে হবে বলেছিলে না?’

      ‘যাবার সময় নেমে যেতে হবে,অসুবিধা নেই,আসার সময় উঠতে হবে।

‘ অনেক দূর।’ সে বলল। আজকেই কেন যেতে হবে?’

      ‘ আজ এখন আবহাওয়াটা এত সুন্দর হয়েছে দেখ। বৃষ্টির পরে ঝকঝকে এবং পরিষ্কার। যে জায়গায় তোমাকে নিয়ে যেতে চাইছি বৃষ্টি হওয়ার পরেই সেখানে যেতে হয়।’

      ‘ সত্যিই সেরকম কোনো কথা আছে কি?’

      ‘আছে ।সত্যিই আছে। গেলে নিজেই বুঝতে পারবে।’

      সে  এবার যাবার জন্য প্রস্তুত হল।

       ঘোড়ায় করে যাবে নাকি? আমি হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যাওয়ায় তাকে জিজ্ঞেস করলাম।

       ‘ঘোড়ায়?’

       গ্রামে ঘোড়া পাওয়া যেতে পারে। চল খোঁজ করি।এই সময় পাওয়া উচিত।

       ঘোড়ায় উঠে যাবার জন্য সে আনন্দের সঙ্গে সম্মতি জানাল। এবার তার আগ্রহটা বেশি হল। মেয়েদের ঘোড়ায় উঠার আগ্রহ সাধারণত দেখা যায় না। আমরা প্রায় দৌড়ে যাবার মতো করে  গ্রামটায় পৌঁছে গেলাম। দ্রুত যাবার জন্য আমরা হাঁপিয়ে পড়লাম।এই পাহাড়ি ঘোড়া গুলি মাল এবং যাত্রী দুটোই বহন করে। জিনের দুই পাশে দুটো বস্তার ব্যাগ ঝুলিয়ে তাতে বালু ,পাথর ,সিমেন্ট, শস্য, কাঠ ,সমস্ত কিছু বহন করা হয়। ছোটোখাটো হলেও জোর থাকা ঘোড়া ।আমরা দুটো ঘোড়ায় করে যাব। এবং মালিক খচ্চরে করে যাবে। মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে একা ঘোড়ায় উঠে যেতেআমার ভয় হল।

      ঘোড়া প্রস্তুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি দৌড়ে এসে ঘোড়াটার সেডেলে পা রেখে  দক্ষ সওয়ারির মতো উঠে বসল।বাঁ হাতে লাগাম ধরে সামনের দিকে হেলে ডান হাতে রেকাবটা ডান পায়ে ঢুকিয়ে নিল।

       ‘এক্সপার্ট দেখছি’ আমি বললাম।

            সে একটু হাসল। কিছুই বলল না।

      কদমে কদম মিলিয়ে আমরা যেতে আরম্ভ করলাম। পথটা ক্রমশ নিচের দিকে নেমে গেছে। জিনে নিজের শরীরটা পেছনদিকে হেলিয়ে রেকাবে চাপ দিয়ে বসতে হয়। আর বদমাশ ঘোড়া দুটি এত বিশাল রাস্তা থাকা সত্ত্বেও পথের মাঝখান দিয়ে না দিয়ে খাড়াইয়ের পাশ দিয়ে যায়।। সেটাই ওদের স্বভাব ।নিচের দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যাবার উপক্রম হয়। খচ্চরটা মাঝ রাস্তা দিয়ে অবলীলাক্রমে লেজ নাড়িয়ে চলছে ।পিঠে সওয়ার হয়ে যাওয়া মালিকটা ঘুমিয়ে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে ।আমাদের পেছনে ফেলে টুকটুক করে সে অনেক দূরে চলে গেল।

       পথে আমরা দেবদারু গাছের  একটা জঙ্গল  পেয়েছিলাম।জঙ্গলের মাঝে ছায়া ছিল, অন্ধকার ছিল। আমরা যেন অন্ধকার রাজ্যের মাঝখান দিয়ে যাচ্ছিলাম ।গাছের ফাঁক দিয়ে যতদূরের পাহাড় দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল সেখানে রোদ ঝলমল করছিল। বন্ধ ঘর থেকে জানালা দিয়ে আমরা যেন দূরের দৃশ্য দেখছিলাম।

       এইবার ছোটো বড়ো পাথর বেরিয়ে থাকা সবুজ ঢালু ঘাস একটার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম ।নীল নীল উঁচু পাহাড়গুলি চারপাশ দিয়ে আকাশের দিকে উঠে গেছে। এই ধরনের সুন্দর জায়গা সাধারণত ফোটোতে দেখা যায়।আমরা এতক্ষন প্রায় কথাবার্তা না বলেই আসছিলাম ।মেয়েটি যেন কিছু চিন্তা করছিল বলে মনে হচ্ছিল। লাল টুপির নিচ দিয়ে তার চুলগুলির সামনেটা বেরিয়ে বাতাসে নাচছিল। চোখে  চোখ পড়লেই সে হেসে ফেলে বলল, ‘তোমার কথাই ভাবছিলাম।’

       ‘আমার কথা কী ভাবছিলে?’

       ‘ইন্টেলেকচুয়াল হওয়ার পরে কী হল?’

       ‘ও,সেই কথা ।আমি হাসলাম।। ইন্টেলেকচুয়াল হলে যা হয় তাই হল। প্রত্যেককে সমালোচনা করলাম এবং কবি লেখক আর্টিস্ট এই জাতীয় এক দলের সঙ্গে মিশে গেলাম।’

       ‘নিজে কিছু লিখেছিলি কি?

       ‘লিখেছিলাম ।তখনই এক বছর খুব লিখেছি। বিভিন্ন কাগজে লিটিল ম্যাগাজিনে।

       ‘কীলিখেছিলে?’

      ‘প্রবন্ধ, টিপ্পনী এইসব।বেশ ক্ষুরধার সমালোচনা করেছিলাম ।আর সেই গুলি সম্পাদক ছাপিয়ে ছিল। নতুন নতুন সাপ্তাহিক, দৈনিক কাগজ, ম্যাগাজিন বের করার ঢেউ এসেছিল তখন।

      ‘তারপরে?

       ‘একটা সময় লেখা ছেড়ে দিলাম।’

       ‘কিন্তু কেন?

      ‘অর্থ খুঁজে পেলাম না। সমসাময়িক ভাষ্য লেখাটা আত্ম তুষ্টিছাড়া কিছু নয়। নিজের ভালো লাগে কিন্তু কেউ বিশেষ গুরুত্ব  দেয় না বলে মনে হল তাতে আমার লেখাগুলি সব সময় পরিপক্ক ছিল না এবং তোমার সামনে স্বীকার করতে লজ্জা নেই উদ্দেশ্য সব সময় সৎ ছিল না।।

       ‘তুমি একটা বড় কথা বললে।’

       ‘বড়ো ছোটো বলতে পারিনা। কিন্তু লেখার আরেকটা ফল হয়েছিল। আমরা যেহেতু নতুন করে ক্ষমতায় আসা এবং বামপন্থী তথা বিরোধী শিবির উভয়কে কঠোর সমালোচনা করেছিলাম কেউ আমাদের পছন্দ করত না এবং বিশ্বাস করত না। সমালোচনা মানুষ কখন ও বিশেষ করে রাজনীতি করা মানুষ কখন ও মুক্তমনে গ্রহণ করতে পারেনা ।আর আমরা, আমি বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছিলাম ।নিঃসঙ্গ হওয়াটা বড়ো দুঃখজনক কথা বুঝেছ। সত্যিই দুঃখজনক।

       ঘোড়ায় যেতে থাকার সময় আমি বলা কথাগুলি সে ভালো করে শুনছিল কিনা  বলতে পারি না। কিন্তু স্বগতোক্তির  মতো আমি কথাগুলো বলে যাচ্ছিলাম।  হয়তো নিজেকেই বলছিলাম ।নিজেকে তো এই সমস্ত কথা কখন ও বলিনি এতদিন।

      ‘আমরা কত অসৎ ছিলাম দেখ। যেহেতু আঞ্চলিক দলের রাজ্য সরকার আমরা পছন্দ করতাম না; নেতাদের আমাদের উপর আস্থা ছিল না, পাত্তাও দিত না। তাই জ্বলে- পুড়ে আমরা আন্ডারগ্রাউন্ডের সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতিকে অধিক প্রাধান্য দিয়ে তুলে ধরেছিলাম।

       ‘তুমি এইসব সত্যিই বলছ?’সে আমার কথা বোধ হয়মন দিয়ে শুনছিল।

আসলে এই কথাগুলি সত্যি জান, মেনে নাওআর না নেও।

      আমরা একদিকে ঢালু শিলাময় পাহাড় দিয়ে নেমে এসে পুনরায় সাঁচী এবং দেবদারু গাছের ঝোপের মধ্যে প্রবেশ করলাম। ঘোড়ার মালিক অপেক্ষা করছে। মালিক বলল, ‘এই রাস্তাটা ঘোড়া থেকে নেমে হেঁটে যাওয়া যাক। আমরা ঘোড়া থেকে নেমে পড়লাম।  জিনে বসে পা এবং কোমর অবশ হয়ে আসছিল।পা দুটি সোজা করে পুনরায় হাঁটতে শুরু করলাম। ঘোড়া দুটি এবং খচ্চরটা মালিক সমজে নিল।

       ‘তুমি কি কবিতা লিখতে? মেয়েটি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

      ‘লিখিনি।’  লিখেছি বলে তাকে বলতে ইচ্ছা করল না।

 ‘কেন লেখনি?’

       এই সময়ে আমরা রাস্তার মোড়টা  ঘুরলাম। সামনে বেরিয়ে পড়ল একটা সবুজ খাড়া পাহাড়। গভীর নীল সবুজ পাহাড়টার খাড়াই পিঠ থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ছে ছোটো বড়ো সহস্র জলপ্রপাত।। পাথরের উপরে জল পড়ে কুয়াশার মতো ধোঁয়া বের হচ্ছে। একটা হড় হড়  শব্দ বাতাসে ভেসে ভেসে আসছে। সহস্র ধারায় যেন হিমালয় চোখের জল ফেলছে। পথের পাশে বিজলী বাঁশে ঝুলিয়ে রাখা হালকাবৌদ্ধ প্রার্থনা পতাকা গুলি পত পত করে উড়ছে। আমরা মুগ্ধ নয়নে অপলক ভাবে তাকিয়ে রইলাম সেই সুন্দর দৃশ্যের দিকে। চোখের কোনে মনে হল মেয়েটি চশমা খুলে চোখের জল মুছছে।তাকে বললাম, ‘এই কবিতার সামনে আর তুমি কি কবিতা লিখবে বল?

      ‘কিন্তু এই কবিতায় তো মানুষ নেই,’ সে বলল। ‘মানুষের স্থিতি না থাকাকবিতা হয় নাকি?’

      ‘আছে মানুষ আছে,’ তাকে বললাম। ‘এই প্রার্থনার পতাকা গুলি দেখ ।আদিম প্রকৃতির সৌন্দর্য আর বিশালতাকে মুগ্ধ এবং আতঙ্কিত মানুষ অনুভব করছে এবং সম্মান জানাচ্ছে পতাকার এই নিঃশব্দ প্রার্থনায়…   …’ 

 

 

 

 ।                                                                            

 

 

 

 

 

 































 

 

 

 

 

     

     

 

 

     

     

 




error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত