Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,কুন্তী

শারদ সংখ্যা উপন্যাস: যাদব-কন্যা । শকুন্তলা চৌধুরী 

Reading Time: 85 minutes

                 ভূমিকা                                             

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য-সভায় আজকে একটা নতুন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে ঠিক হয়ে আছে, এবং পড়বি তো পড়্ এই মাসের সাহিত্যসভার বিষয় নির্বাচনের দায়িত্ব পড়েছে কলাপীর ওপর। সব সদস্যর ওপরেই পালা করে একবার এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু এই মাসের শেষে কলাপীর দিদির বিয়ে। তার মধ্যে এই ঝামেলা কারুর ভাল লাগে? ও চেষ্টা করেছিল ঋতমের সঙ্গে পাল্টে নেওয়ার – ঋতম্ পরিচালনা করুক্ এই মাসে, সামনের মাসে ওর জায়গায় কলাপী নাহয় বিষয় নির্বাচন করে দেবে। কিন্তু ঋতম্ কিছুতেই রাজী হল না। ওর মতে, তাহলে নাকি ‘সিকোয়েন্স’ নষ্ট হয়ে যাবে! ওদের সভায় বিষয় নির্বাচনেরও একটা নিয়ম আছে – একবার প্রাচীন ও একবার আধুনিক বিষয় নিয়ে লেখা হয়। এইমাসের বিষয় ‘মহাভারতের সত্যাণ্বেষ’ আর ঋতমের বিষয় ‘কর্পোরেট দুনিয়ার স্বরূপ’। দুটোকে কখনো অদলবদল করা যায়? আর বিষয় যে নির্বাচন করবে, তার তো শুধু একটাই দায়িত্ব – কবিতার ছন্দে বিষয়টিকে গুটিয়ে এনে, লেখার একটা সূত্র ধরিয়ে দেওয়া। এবার ঐ বিষয়ের ওপর একমাসের মধ্যে আসল লেখাটি তো লিখে আনতে হবে আগের মাসের পরিচালককে – অর্থাৎ পর্ণাকে! পর্ণা পরের সাহিত্যসভায় কলাপীর নির্বাচিত বিষয়ের ওপর, নিজের কল্পনা মিশিয়ে, একটি লেখা লিখে আনবে। তাহলে কলাপীর চিন্তা কিসের? ….

কলাপী আর কথা না বাড়িয়ে চলে এল। বাংলা ওর সাবজেক্ট, মহাভারত ওর গুলে খাওয়া আর কবিতার ছন্দে ওর ভালই হাত। তাই দিন সাতেকের মধ্যেই ও নির্বাচন করে ফেলল বিষয় – কুন্তী। মহাভারতের জটিল আবর্তের পেছনে, প্রায় অবগুন্ঠনে ঢাকা, একটি ‘আন্ডার-রেটেড’ চরিত্র যার প্রকৃত মূল্যায়ণ আজও হয়েছে কিনা সন্দেহ। যাদব-বংশজাত এই পুরনারীকে কি আমরা পুরো চিনি? তাঁর এবং মাদ্রীর গর্ভজাত ছয়টি পুত্রের বিজ্ঞানসম্মত জন্মরহস্য কি আমরা পুরো জানি? সমাজকে কতটা অস্বীকার করেছিলেন তিনি? কত বাধা তিনি ঠাণ্ডা মাথায়, ধৈর্য ও বুদ্ধির জোরে এবং একক দৃঢ়তায় কাটিয়ে গিয়েছিলেন? আপাত নম্রতার পেছনে কিভাবে তৈরী হল বজ্রের মত কঠিন একটি চরিত্র? কে তৈরী করল তাঁকে – সমাজ, তাঁর নিজের জীবন নাকি তাঁর উচ্চাকাঙ্খা? বনের মাঝে স্বামী পাণ্ডু ও সতীন মাদ্রীর অকস্মাৎ মৃত্যুর পেছনে কি কোন রহস্য ঢাকা আছে? সবটাই কি ছিল এক প্রাচীন “গেম অফ্ থ্রোনস্” যেখানে হস্তিনাপুর সাম্রাজ্যের সিংহাসনে শেষপর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হল ‘ব্রাত্য’ যাদবকূলের রক্ত? মহাভারতের ইঙ্গিতময় পদাবলীর পেছনে, আসল সত্যটা কি?

কলাপী পেয়ে গেল সত্যাণ্বেষের সূত্র – কবিতার ছন্দে তৈরী হল নির্বাচিত বিষয়। বাকীটা করবে পর্ণা।…

কুন্তী, তুমি কি শুধু রাজবধূ, শুধু রাজমাতা ছিলে?
নাকি নেপথ্যে, যাদবকন্যা, ইতিহাস রচেছিলে?
কুরুযুগ শুধু দ্রৌপদী আর গান্ধারীদের নয়-
নিজের শর্তে, জীবনযুদ্ধ বিনম্র দৃঢ়তায়
একা লড়েছিলে। কৌরব শুধু ক্ষমতাবিহীন দম্ভ-
তুমি বুঝেছিলে পাঞ্চজন্যে যুদ্ধের শুভারম্ভ।
সূর্যমন্ত্রে দীক্ষিতা তুমি – কৌরব রাজকূলে,
ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধরাজ্যে, বিধিলিপি হয়ে এলে!
জীবন দিয়েছে বঞ্চনা আর অপবাদে ভরা থালি –
‘ত্যাজ্য’ পুত্র…‘পান্ডুর’ স্বামী…সতীত্বে অঙ্গুলি…
বালক পঞ্চ ‘পাণ্ডব’ নিয়ে তবু তুমি ফিরে এলে।
নতমস্তকে শুভ্রবস্ত্রে করজোড়ে কিনে নিলে
জীবনের কিছু কঠিন সময়, অমূল্য কিছু ধন-
বিদুর-ভীষ্ম-সভাপরিষদ, রাজ্যের বন্টন।
তুমি জেনেছিলে জ্ঞাতিশত্রুতা মূল থেকে কাটে গাছ-
ত্রিনয়নে দেখে, পাঞ্চালী তাই করে দিলে ভাগ পাঁচ।
তেরো বছরের সুদীর্ঘ কাল…বিদুরভবনে একা…
বিবেকের আলো প্রকট করেছে কুরুকলঙ্কটীকা…
হস্তিনাপুর ভুলতে পারেনি কুলবধূ লাঞ্ছনা-
ভুলতে দাওনি, গৃহত্যাগী তুমি, পাণ্ডবেদের মা!
শেষ পরিচয়ে কর্ণকে শুধু করলে শস্ত্রহীন-
‘ষষ্ঠপুত্র’ পথ ছেড়ে দিল মেটাতে মাতৃঋণ।
হৃদয় কাঁপেনি – চোখ ফেলেছিল শুধু একফোঁটা জল।
পৃথিবী দেখল যুধিষ্ঠিরের মাতা তুমি – অবিচল।
অর্জুন, সে-ও তোমারই অংশ…..নিশানায় চোখ স্থির –
পাণ্ডব নয়, কৌন্তেয় ওরা- মাতৃভক্ত বীর।
অনাথ পঞ্চ বালকের ভার কাঁধে নিয়ে তুমি একা
পথ থেকে পথ পার হয়েছিলে- নিশানা সামনে রাখা…
কেউ তা দ্যাখেনি। কিম্বা দেখেছে একজন, যার সখ্যে
নির্ভর করে একদিন তুমি পৌঁছলে শেষ লক্ষ্যে।
তারপর?….তুমি রাজমাতা থেকে কুরুকূলবধূ হয়ে
বাণপ্রস্থে, অন্ধরাজার অন্ধপত্নী নিয়ে।
শকুনির হাসি ঘৃণ্য অশুচি রাজদরবারে ঘোরে-
কুন্তী, তোমার শেষ হাসি আজও ঢাকা অন্তঃপুরে।
 

পরের মাসের সাহিত্যসভাতে পঠিত হল পর্ণার হাতে তৈরী তথ্য-সমৃদ্ধ একটি লেখা; যেখানে পর্ণা মহাভারতের ঘটনাবলীকে অগ্রাহ্য না করেও, নিজের সৃজনশক্তি দিয়ে ভরাট করার চেষ্টা করেছে সেই ফাঁকগুলো যেগুলো মহাভারতকার ইচ্ছে করেই ফাঁকা রেখেছিলেন বা ইঙ্গিত মাত্র দিয়ে থেমে গিয়েছিলেন।

 

১  মথুরা

প্রাচীন ভারতবর্ষের অতি প্রাচীন একটি আদিবাসী সম্প্রদায় হল যাদববংশ। এদের মধ্যে দুটি প্রধান শাখা ছিল, বৃষ্ণি এবং অন্ধক।যাদব সম্প্রদায়ের মধ্যে নেতা নির্বাচন করার প্রথা ছিল, বংশানুক্রমিক রাজত্ব প্রচলিত ছিল না – অর্থাৎ রাজতন্ত্রের বদলে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিল যদুবংশীয়রা।

গাঙ্গেয় সমতলের মথুরা প্রদেশে ছিল বৃষ্ণি সম্প্রদায়ের যাদবকূলাধিপতি শুরসেনার রাজত্ব, যা পরে “শুরসেনা মহাজনপদ” নামেও পরিচিতি পায়।

অন্ধক সম্প্রদায়ের নেতা উগ্রসেনের রাজত্ব ছিল মথুরাপ্রদেশের আরেক অংশে।

উগ্রসেনের কন্যা দেবকীর সঙ্গে শুরসেনার পুত্র বসুদেবের বিবাহ হয়।

উগ্রসেনের পুত্র কংস পরবর্তীকালে নিজের ভগ্নী ও ভগ্নীপতি (দেবকী এবং বসুদেব) এবং পিতা উগ্রসেনকে  কারাগারে বন্দী করে নেতৃত্ব নিজের হাতে নিয়ে নেন।

দেবকীপুত্র বাসুদেব কৃষ্ণ, অত্যাচারী কংসকে হত্যা করে উগ্রসেনকে পুনর্বাসিত করেন এবং মহাভারতের যুদ্ধে একটি বিশেষ  ভূমিকা নেন। কিন্তু সে অনেক পরের কথা। আমরা শুরু করব গোড়ার থেকে।

তৎকালীন ভারতবর্ষের মহাপরাক্রমশালী ষোলটি মহাজনপদের একটি ছিল শুরসেনা মহাজনপদ।

শুরসেনার পত্নী ছিলেন নাগকন্যা মরিসা।

মরিসা ও শুরসেনার ছিল দশটি পুত্র এবং পাঁচটি কন্যা। জ্যেষ্ঠা কন্যা পৃথা। তারপরে শ্রুতদেবা, শ্রুতকীর্তি, শ্রুতশ্রবা (শিশুপালের মাতা) এবং রাজাধিদেবী। জ্যেষ্ঠপুত্র বসুদেব। তারপর দেবভোগ, দেবশ্রবা, অনাকা, সৃঞ্জয়, শ্যামক, কঙ্ক, শমীক, ব্যৎসক এবং ব্রক।

পৃথা রূপে, গুণে, বুদ্ধিমত্তায় অতুলনীয়া। এ হেন হীরের টুকরো সন্তান, পুত্র হলে হয়তো সসম্মানে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হতেন। কিন্তু পৃথার ভাগ্যে তা হল না।

শুরসেনার সম্পর্কিত (পিসতুতো) ভাই, সন্তানহীন মহারাজ কুন্তীভোজ, পৃথাকে দত্তক চাইলেন।

কন্যাসন্তান তো পরগৃহে যাওয়ার জন্যেই – দত্তা। শুরসেনা রাজী হয়ে গেলেন। পৃথার মত সেখানে অপাংক্তেয়, অর্থহীন।

অতএব এক শুভদিনে পৃথা, মথুরা রাজ্য ছেড়ে রওয়ানা হলেন অশ্বনদীতীরস্থ কুন্তীরাজ্যের (বর্তমান বুন্দেলখণ্ডের) দিকে। ভাইবোন, পরমপ্রিয় ভ্রাতা বসুদেব, মা মরিসা, মথুরার রাজপ্রাসাদ, বাগান, অলিন্দ, খেলার ঘরটি – সব, সব  পড়ে রইল পিছনে।

তাঁর নতুন নামকরণ হল কুন্তী – মহারাজ কুন্তীভোজের পালিতা কন্যা। যদিও পরবর্তীকালে কুন্তীভোজের নিজের সন্তান হয়, পৃথা কিন্তু কুন্তী হয়েই থেকে যান-মথুরায় আর তাঁর ফেরা হয়নি।  এই কাহিনীর শুরু তার একটু আগে-পৃথা তখনও মথুরাপুরীর শোভা বর্ধন করছে।

“বড়দিদি, ও বড়দিদি…..শোন না…..আমার পায়েলটা কোথায় পড়ে গেল খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি একটু দেখবে?” শ্রুতকীর্তির কথা শুনে দাঁড়িয়ে গেল পৃথা, হাতে তার ফুলের সাজি, সিক্ত চুল হাঁটু ছাড়িয়ে নেমেছে। স্নান সেরে বাগান থেকে ফুল নিয়ে মায়ের পূজোর ঘরে যাচ্ছিল, এমনসময় পিছন থেকে ডাক। পৃথা হাসিমুখে বোনের দিকে তাকিয়ে বলল – “তুই কবে বড় হবি, শ্রুতি?” তারপর এগিয়ে গেল বাগানের কোণায়, যেখানে কদমতলায় খেলতে গিয়ে শ্রুতি রোজই কিছু না কিছু হারিয়ে আসে।

শুরসেনার অপূর্ব সুন্দর বাগান – পলিমাটির উদারতায় ফুলে ফলে ভরা, নন্দনকাননের চেয়ে তার শোভা খুব কম নয়। আর সেই উদ্যানের শোভা বাড়িয়ে তোলে পৃথা – প্রতিটি লতাপাতায় তার হাতের ছাপ, সবকটি বৃক্ষ তাকে চেনে, কোকিলেরা গান গেয়ে তাকে ডেকে আনে। এই বাগানের সবকটি ফুলের মধ্যে সেও যেন আরেকটি ফুল। শূরসেনার নয়নের মণি, মা মরিসার বুকের মাণিক, যাদবকুমারী পৃথা।

শ্রুতকীর্তিকে ছাড়িয়ে এগোতে না এগোতে দেবশ্রবা ডেকে উঠল – “বড়দিদি, একটু ধর না – ছিলাটা বাঁধব।”

বড়দিদির বিব্রত মুখ দেখে এবার এগিয়ে এল বসুদেব। বলল – “আমি ধরছি, তুমি যাও।”

পৃথা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল – “হ্যাঁ ভাই, আমি তাহলে যাই – মা অপেক্ষা করছেন পূজোর ঘরে।”

মরিসা সত্যিই অপেক্ষা করছিলেন। পৃথাকে দেখে হেসে বললেন – “আজ দেরী হল যে ?!”

লজ্জিত পৃথা তাড়াতাড়ি ফুলগুলো এগিয়ে দিতে দিতে বলল – “শ্রুতির পায়েল…….”

মরিসা হেসে বললেন – “বড়দিদিকে ছাড়া যে কারুর চলে না, শ্বশুরবাড়ী গেলে কি হবে?”

পৃথা মায়ের পাশে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল – “আমি কোথাও যাব না, মা।”

মরিসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হেসে বললেন – “মেয়েজন্ম যে পরগৃহে যাওয়ারই জন্যে!”

পৃথার মনে হাজার প্রশ্ন জেগে উঠল, কিন্তু স্বভাব-বিনীত পৃথা কিছু বলল না।

পূজার শেষে হাতে প্রসাদের থালা নিয়ে অন্তঃপুরের দিকে পা বাড়াল পৃথা।

ছুটে এল ভাই কঙ্ক – “বড় লাড্ডুটা কিন্তু আজ আমার বড়দিদি, তুমি বলেছিলে!”

– “নিশ্চয়ই ভাই, এই নাও।”

পৃথা তার হাতে লাড্ডু তুলে দিতে না দিতে ছুটে এল ছোট বোন শ্রুতশ্রবা, জেদী গলায় বলল -“না, ওটা আমার! আমায় দিতেই হবে!”

পৃথা বোনের মাথায় হাত রেখে বলল -“ছিঃ! অন্যের জিনিসে চোখ দিতে নেই – তুমি এটা নাও। আর প্রসাদ তো ভগবানের আশীর্বাদ – তার আবার ছোট-বড়ো হয় নাকি? চল, তারচেয়ে আমরা বাগানে গিয়ে আজ ময়ূরকে পায়েলটা পরিয়ে দিয়ে আসি! তাহলে খুব মজা হবে – ও যেখানেই যাবে আমরা ঠিক ওর পেছন পেছন চলে যাব!”  শ্রুতশ্রবা আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল।

এমনসময় দাসী এসে দাঁড়াল, বলল -“পিতা বিশ্রামকক্ষে আপনাকে স্মরণ করেছেন।”

পৃথা বলল- “আমি যাচ্ছি এখুনি, তুই বরং তাহলে শ্রুবির সঙ্গে গিয়ে ময়ূরের পায়ে পায়েলটা পরিয়ে আসবি?…..তার আগে একটা কাজ কর্, এই থালা নিয়ে যা – সবাইকে প্রসাদ দিয়ে আয়, তুইও নিবি কিন্তু।” দাসী হাসিমুখে মাথা নেড়ে চলে গেল।

নম্র ব্যবহার আর মিষ্টি কথার জন্য পৃথাকে সবাই ভালোবাসে।

পৃথা পিতার বিশ্রামকক্ষে এসে দেখল মা সেখানে আগেই বসে আছেন। পৃথাকে দেখে শূরসেনা সস্নেহে হাত বাড়িয়ে দিলেন। পৃথা এসে বসল শুরসেনার পায়ের কাছে।

পিতা বললেন- “পৃথা, কুন্তীরাজ্য থেকে সংবাদ এসেছে মহারাজ কুন্তীভোজ মথুরায় আসছেন। সম্পর্কে সে আমার জ্ঞাতি ভাই বটে, কিন্তু শৌর্যে পরাক্রমে কুন্তীরাজ্য আমাদের অনেক ওপরে। সে হঠাৎ আমার জনপদে পদার্পণ করছে কেন তা ঠিক বুঝতে পারছিনা, কিন্তু তার পরিচর্যার যেন কোন ত্রুটি না ঘটে! তোমার মা তো আছেনই, আমি চাই যে তুমিও মিষ্ট কথায় কুন্তীভোজকে খুশী রাখ।”

পৃথা মায়ের চিন্তিত মুখের দিকে একবার তাকিয়ে, মাথা নেড়ে সায় দিল।

তারপর পিতার দিকে তাকিয়ে বলল – “বাবা, আমাদের ময়ূরটা বড়ো একা হয়ে গেছে- ওর একজন খেলার সাথী চাই। তুমি কাউকে বলবে আরেকটা ময়ূর নিয়ে আসতে?”

শূরসেনা পৃথার মাথায় হাত বুলিয়ে অন্যমনস্কভাবে বললেন -“নিশ্চয়ই বলব, মা!”

খুশী হয়ে পৃথা উঠে দাঁড়িয়ে বলল -“আমি তাহলে যাই, বাবা?”

শূরসেনা বললেন- “এস, মা!”

তিনদিনের দিন, অপরাহ্নে, মহাসমারোহে মহারাজ কুন্তীভোজের বাহিনী মথুরার রাজপ্রাসাদে এসে উঠল। পৃথা ছাদের অলিন্দে দাঁড়িয়ে বসুদেবের তীর ধনুক পরিষ্কার করা দেখছিল।

লোকজন সব ঢুকে গেলে পৃথা ভাইয়ের দিকে ঘুরে বলল- “মহারাজ কুন্তীভোজ কেন হঠাৎ এলেন বল্ তো? জানিস্ কিছু?”

বসুদেব তীরের ফলাটা ঘসতে ঘসতে বলল – “মহারাজ নাকি দত্তক নিতে এসেছেন- ওনার কোনো সন্তান নেই তো, তাই। উনি নাকি শুনেছেন মথুরায় সবাই রূপবান আর গুণবান, তাই।”

পৃথা অবাক হয়ে গেল- “দত্তক নিতে? কাকে?”

বসুদেব বলল- “তা জানি না। আমি বাবার থেকে ওনার বড় ধনুকটা আনতে গিয়েছিলাম সকালে, তখন শুনলাম বাবা দেওয়ানমশাইকে বলছেন যে ‘আপনি কথা বলুন – আমার পুত্রদের আমি দত্তক দিতে পারব না কুন্তীভোজকে- চতুর্দিকে শত্রু, যুদ্ধের আয়োজন! সন্তানহীনের কাছে পুত্র-কন্যা সব সমান!’ তাতেই বুঝলাম।”

পৃথা স্থির হয়ে গেল, পলকহীন।

‘সন্তানহীনের কাছে পুত্র-কন্যা সব সমান’…..আর সন্তানবতের কাছে? সেখানে বুঝি পুত্র অমূল্য? আর কন্যা?

পরদিন সকালে স্নান সেরে যথারীতি পূজোর ঘরে গেল পৃথা। আজ সেখানে মরিসা নেই, পুরোহিত পূজো করছেন। দাসী এসে জানাল যে মা মরিসা অতিথিদের পরিচর্যায় ব্যস্ত, পৃথাও যেন পূজো শেষে বেশ পরিবর্তন করে সেখানে যায়।

পৃথা অন্দরমহলের পূর্বকোণে পিতার কক্ষে প্রবেশ করে দেখল, মা মরিসা সযত্নে খাবার পরিবেশন করছেন পিতা আর মহারাজ কুন্তীভোজকে।

পৃথাকে দেখে শুরসেনা সাগ্রহে তার পরিচয় করিয়ে দিলেন মহারাজ কুন্তীভোজের সঙ্গে – পৃথা প্রণাম করে নতজানু হয়ে বসল।

কুন্তীভোজ খুশী হয়ে বললেন – “বাঃ, মেয়ে তোমার পরমাসুন্দরী- ভুল শুনিনি!”

শুরসেনা হেসে বললেন – “গুণেও কম না। মথুরা রাজবাড়ীর অতিথি সৎকারের ভার পৃথার ওপরে – কেউ একটা ত্রুটি ধরতে পারবে না!”

কেন জানি, পৃথার আজ এই প্রশংসার কথাগুলো ভালো লাগছিল না।

ও উঠে দাঁড়াল, ঘর থেকে বেরিয়ে বাগানে এল যেখানে শ্রুতি খেলছে কদমতলায়। তারপর মাঠের দিকে এগিয়ে গেল যেখানে বসুদেব ভাইয়েদের সাথে মল্লযুদ্ধ করছে।

তার ঠিক দুদিন পরে, আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথাকে দত্তক নিলেন মহারাজ কুন্তীভোজ।

তার নতুন নাম হল কুন্তী।

আর তার তিনদিনের মাথায় কুন্তীরাজ্যের ধ্বজাধারী রথে বসে, চিরদিনের জন্য মথুরা ছেড়ে চলে গেল পৃথা। পিতা, মাতা, ভাই, বোন, দাস, দাসী – সবার চোখে জল।

জল নেই শুধু পৃথার চোখে।

সে সারা রাস্তা কেবলই ভাবতে ভাবতে গেল যে ‘সঙ্গী ছাড়া ময়ূরটার কি হবে?’

 

২ কুন্তীরাজ্য

দেখতে দেখতে চারপাশের সবুজ পাল্টে যেতে থাকল, মাটি হয়ে উঠল ধূসর।

রথের পর্দা সরিয়ে মাঝে মাঝে বাইরে তাকিয়ে দেখছে পৃথা। প্রকৃতি যে এত শুষ্ক হতে পারে, তা আগে জানা ছিল না পৃথার।

কিই বা জানা ছিল তার? কতটুকুই বা দেখেছে পৃথা, কিই বা জেনেছে পৃথিবীর, মথুরার সুরক্ষিত পুরীর ভেতর থেকে! মাত্র সাত  দিনের মধ্যে যে জীবনটাই পাল্টে যেতে পারে, তাই কি জানত পৃথা আগে?

“জানা আর চেনার এই তো সবে শুরু!” নিজেকেই নিজে বলল পৃথা, আর অস্তাচলের সূর্যের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে  প্রণাম করল।

মনে মনে বলল – “হে সূর্যদেবতা, তুমি আদি অকৃত্রিম সর্বকালের সর্বদেশের সর্বজনের – তুমি মথুরায়ও যা, কুন্তীরাজ্যেও তা।পিতা-মাতার চরণচ্যুত আমি, ভাই-বোনেদের সাহচর্য বিচ্ছিন্ন আমি, আজ থেকে তোমার শরণ নিলাম। গৃহদেবতা আজ আমার হাতের সেবা আর চোখের দৃষ্টির বাইরে। আজ থেকে তুমিই আমাকে পথ দেখাও – সকাল-সন্ধ্যে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে, তোমার আলোয় যেন আমি পথ দেখতে পাই। যে পথ শ্রেয়, সেই পথে যেন নির্ভয়ে এগিয়ে যেতে পারি। যা অন্ধকার কালিমাময়, তাকে যেন ভেঙে টুকরো করে দেওয়ার সাহস রাখতে পারি। তোমার তেজে যেন চোখের জল শুকিয়ে নিয়ে দিক-দিশারী আলো জ্বেলে নিতে পারি। তুমি যেমন মৌন তপস্বীর মতো পক্ষপাতহীন কঠিন নিয়মানুবর্তীতায় নিজের কক্ষপথে সারা পৃথিবীকে আলো দান করতে করতে যাও, আর দিনের শেষে সারা আকাশ পরিক্রমা করে নিঃশব্দে দিগন্তে বিলীন হয়ে যাও – আমিও যেন সেই মন্ত্রে আজ থেকে দীক্ষিত হতে পারি, হে ভাস্কর!”

একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল পৃথা। চমক ভাঙলো দুন্দুভির আওয়াজে।

বাইরে তাকিয়ে দেখল – দূরে দেখা যাচ্ছে কুন্তীরাজ্যের তোরণ। মহারাজের আগমন সূচনায় সেখানে বেজে উঠেছে দুন্দুভি, জ্বলে উঠেছে আলো।

সহচরী রম্ভা এসে নগর প্রবেশের আগে রাজকুমারীর কেশ পরিচর্যার এবং প্রসাধনের অনুমতি চাইল। মথুরা ছাড়ার আগে পিতা-মাতা মথুরাপুরীর বাসিন্দা এই সহচরীটিকে সঙ্গে দিয়ে দিয়েছিলেন।

“জয় মহারাজ কুন্তীভোজের জয়!”……“জয় মহারাজ কুন্তীভোজের জয়!” জয়ধ্বনির মধ্যে দিয়ে রথ এসে কুন্তীনগরে প্রবেশ করল। চতুর্দিক আলোয় আলোময় – ‘সে কি মহারাজের আগমনে, না কুন্তীরাজ্য সর্বদাই এমন সজ্জিত থাকে?’- মনে মনে ভাবল পৃথা।

দেখতে দেখতে রথ এসে রাজপুরীর সামনে থামল। দাসী বলে গিয়েছিল পৃথা যেন রথেই অপেক্ষা করে, যতক্ষণ না অন্তঃপুরিকারা তাকে নিতে আসে।

বেশীক্ষণ অবশ্য বসে থাকতে হল না। উলু আর শঙ্খধ্বনির মধ্যে এক বর্ষীয়সী এসে আহ্বান জানালেন- “রাজকুমারী কুন্তীর জয় হোক – কুন্তীরাজ্যে স্বাগত!”

চমকে উঠেছিল পৃথা এক মুহূর্তের জন্যে, পরক্ষণেই সামলে নিল- তাকেই ডাকা হচ্ছে! আজ থেকে তার নাম কুন্তী! বহুদূর থেকে যেন অস্পষ্ট ভেসে এল কাদের গলা – “বড়দিদি…..পৃথা মা……মথুরাকুমারী…..”

নাঃ! আর ঐসব ভাববে না সে!

নিজেকে সামলে নিয়ে হাসিমুখে রথ থেকে নেমে এল মহারাজ কুন্তীভোজের পরমাসুন্দরী কন্যা রাজকুমারী কুন্তী। মুগ্ধদৃষ্টি আর পুষ্পবৃষ্টির মধ্যে, শামিয়ানার ভেতর দিয়ে, উঠল এসে রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে।

দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে – সবদিক দিয়েই এই প্রাসাদ মথুরাপুরীর তুলনায় অনেক বড়ো। ঘনায়মান অন্ধকারে সব ভালো করে দেখা না গেলেও, বুঝতে অসুবিধা হল না যে শুধু উদ্যানটুকুর মধ্যেই প্রায় দুটো মথুরাপুরী ঢুকে যেতে পারে। রাজকুমারী কুন্তীর ঘরটিও দৈর্ঘ্যে প্রস্থে তদনুরূপ। ঘরের মধ্যস্থলে সুবিশাল চন্দনকাঠের পালঙ্ক, চতুর্দিকে ঝোলানো রেশমের ঝালর। সামনের অলিন্দ থেকে চোখে পড়ে প্রশস্ত উদ্যান। অলিন্দের এককোণে রূপার খাঁচায় একটি কাকাতুয়া – অচেনা আগন্তুক দেখে “কে রে? কে রে?” বলে ডেকে উঠল।

দুজন দাসী ঘরের দুদিক থেকে এগিয়ে এল কুন্তীর পরিচর্যায়।

একটু ইতস্তত করে কুন্তী বলল -“মহারাজ?”

অপেক্ষাকৃত বয়স্ক দাসীটি বলল – “মহারাজ ওনার মহলে বিশ্রাম করছেন। আগামী কয়েকদিন হোলি উৎসবের জন্য রাজবাড়ীতে অনেক আয়োজন – তাই ব্যস্ত আছেন। একটু ফুরসত পেলেই উনি দেখা করবেন আপনার সাথে। আমাকে বলেছেন আপনার সঙ্গে সঙ্গে থাকতে আর আপনাকে বলেছেন কোন প্রয়োজন হলে জানাতে।….. আপনার খাবার নিয়ে আসি, রাজকুমারী?”

“হ্যাঁ, আন।” বলে ঘরের চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল কুন্তী।

এতোবড়ো একটা ঘরে তাহলে সে একা ঘুমোবে? রম্ভার থাকার ব্যবস্থা স্থির হয়েছে পাশের ছোট ঘরটিতে।

মনে এল মথুরাপুরীর শয়নকক্ষে পরপর পাঁচটি শয্যা পাতা – বড়দিদির পাশের পালঙ্কে কে শোবে এই বিবাদ  বন্ধ করার জন্য মা মরিসা দেবী নিয়ম করে দিয়েছিলেন যে বড়দিদি শোবে মধ্যিখানের পালঙ্কে আর তার দুইপাশে দুইবোন একদিন, আর দুইবোন তার পরের দিন।……আজ কি মধ্যিখানের পালঙ্কটি খালি পড়ে আছে?

ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল – মুখ ঘুরিয়ে দেখল কমবয়সী দাসীটি একদৃষ্টে তার দিকে  চেয়ে আছে, চোখাচোখি হতেই সলজ্জে মুখ ঘুরিয়ে নিল। কুন্তী হাসিমুখে বলল – “তোমার নাম কি?”

মেয়েটি নতদৃষ্টিতে বলল – “কঙ্কা।”

“বাঃ! ভারী সুন্দর নাম তো।” কুন্তী হাসিমুখে মেয়েটির সঙ্গে গল্প করতে শুরু করল।

ইতিমধ্যে বয়স্কা দাসীটি, বৎসা, খাবারের থালা নিয়ে ঘরে ঢুকল। পথের পরিশ্রমে আর মনের ক্লান্তিতে কুন্তীর খাওয়ার যে খুব ইচ্ছে ছিল তা নয় – সামান্য কিছু মুখে দিয়ে বসন পরিবর্তন করে সে শুয়ে পড়ল।

ঘুমের মধ্যে কুন্তী ফিরে গেল মথুরাপ্রদেশে – দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল পৃথাকে…..শ্রুতিকে কদমফুল দিয়ে কানের দুল বানিয়ে দিচ্ছে……শ্রুবির কেশবিন্যাস করে স্বর্ণচাঁপার ফুল লাগিয়ে দিচ্ছে…..মালিকে ডেকে সরোবর থেকে পদ্মফুল তুলে দিতে বলছে,  পূজায় লাগবে…..বসুদেবের সঙ্গে অলিন্দে দাঁড়িয়ে গল্প করছে……আর ময়ূরটা, ময়ূরটা কোথায় গেল?…..সবাই ওর নাচ দেখতে চায়, ওর পালক কুড়িয়ে এনে ঘর সাজায় আর ওর যে একটা খেলার সাথী লাগবে সেটা কেউ জানে না?……বাবা মা কেউ কোথাও নেই…..পৃথা কাউকে দেখতে পাচ্ছে না…..সবাই লুকিয়ে পড়েছে……

প্রথম সূর্যের আলো চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল কুন্তীর – অনেকদিনের অভ্যাস। হাতজোড় করে ঈশ্বরকে প্রণাম জানিয়ে অলিন্দে গিয়ে দাঁড়াল।

পূবমুখী অলিন্দ দিয়ে সূর্যদেব তার দাক্ষিণ্য ঢেলে দিলেন কুন্তীর সর্বাঙ্গে। ভক্তিভরে সূর্যপ্রণাম করে ঘরে এল কুন্তী। ডেকে তুলল সহচরী রম্ভাকে – তার স্নানের সরঞ্জাম লাগবে। স্নানঘর কঙ্কা আগেই দেখিয়ে দিয়েছিল।

বৎসা যতক্ষণে কুন্তীর খোঁজে এল, ততক্ষণে কুন্তীর স্নান সেরে পট্টবস্ত্র পরা হয়ে গেছে।

বৎসাকে দেখে হেসে বলল- “পূজোর ঘর কোথায়? আর, পূজোর ফুল কোন বাগান থেকে তুলব?”

বৎসা একটু অবাক হয়ে বলল-“পূজার ফুল? সে তো মালী এনে দেবে!…..এই বাগান মথুরাপুরীর মতো নয় রাজকুমারী, এতো বড় বাগানে আপনি ফুল তুলতে যেতে পারবেন না। মালী ভোরে ফুল এনে দেয় মন্দিরে, পুরোহিত এসে নিত্যপূজা করে যান। মন্দির প্রাসাদের অন্যপ্রান্তে, বাহিরমহলের কাছে। ওখানে বড় উৎসব ছাড়া রাজপরিবারের কেউ যান না – আপনি কি করে যাবেন?….মহারাজের মহলে শক্তিমায়ের মূর্তি রাখা আছে, আপনি সেখানে যাবেন প্রণাম করতে?”

কুন্তী একটু থেমে থেকে বলল – “আচ্ছা, যাব নাহয় একদিন!”

প্রাতঃরাশ সেরে কুন্তী অলিন্দে এসে দাঁড়াল। কিছু কাজ নেই হাতে…..এমন দিন ভাবা যায়?

তোতাপাখী আবার ডেকে উঠল – “কে রে? কে রে?”

কুন্তীর মুখে একচিলতে হাসি ভেসে উঠে মিলিয়ে গেল। সমস্ত কুন্তীরাজ্য যেন তাকে দেখে বলছে -“কে রে? তোকে তো চিনি না!”

রম্ভা কোথায় গেল? পাশের ঘরে প্রবেশ করে কুন্তী দেখে রম্ভা মন দিয়ে কি যেন লিখছে।

রাজকুমারীকে দেখে বলল – “কাউকে দিয়ে এই লিপি মথুরাতে পাঠানোর চেষ্টা করছি – তুমি কিছু বার্তা দেবে, রাজকুমারি?”

-“নাঃ! তুই খবর নিয়ে জানাস সবাই কেমন আছে – আমার শ্রুতি আর বসুদেব…..”  কুন্তী অন্যমনস্কভাবে বলে, বেরিয়ে গেল।

ঘরে এসে কঙ্কাকে জিগেস করল – “আচ্ছা, এখানে কোথাও হাঁটার জায়গা নেই? সূর্যাস্ত দেখা যায়না?”

কঙ্কা বলল – “কেন থাকবে না রাজকুমারি? এই অন্দরমহল দিয়ে রাস্তা চলে গেছে সোজা অশ্বনদীর তীরে। বিকেলে হাঁটতে যাবেন? ভারী সুন্দর সূর্যাস্ত দেখা যায়!”

কুন্তী ঘাড় নেড়ে সায় দিল।

বৎসা এসে জানাল যে মহারাজ কুন্তীভোজ রাজকুমারীকে স্মরণ করেছেন।

বৎসার পেছন পেছন কুন্তী এল মহারাজের মহলে, ওনার নিজস্ব বিশ্রামগৃহে।

কুন্তীভোজ সস্নেহে কুন্তীকে বসতে বলে জিগেস করলেন-“কুন্তীরাজ্য তোমার কেমন লাগছে, মা? কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো?”

কুন্তী হেসে বলল- “খুব ভালো লাগছে।”

মহারাজ খুশী হলেন।

নানা কথার পর কুন্তী যখন চলে আসবে ভাবছে, তখন মহারাজ বললেন -“মা, তোমাকে তো বলা হয়নি – দোলপূর্ণিমায় রাজবাড়ীতে বিরাট উৎসব! অনেক অতিথি আসছেন, তারমধ্যে বেশ কয়েকজন সন্ন্যাসীও থাকবেন। ওনাদের যত্নের ভার কিন্তু তোমার ওপরে, মা।”

“বেশ তো!” বলে কুন্তী উঠে দাঁড়াল – “আমি বৎসার থেকে সব জেনে নেব – আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।”

কুন্তীভোজ এবারে নিশ্চিন্ত হয়ে আহারে মন দিলেন।

কুন্তী, রম্ভা, কঙ্কা আর রাজবাড়ীর দুই দাসী, একটু দূরে দুজন পাহারাদার – বিকেলের পড়ন্ত রোদে হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছল  অশ্বনদীতীরে।

গত একমাস ধরে কুন্তী আর কঙ্কাই আসছিল। দোল উৎসবের ভিড়ে, অতিথি পরিচর্যায় ব্যস্ত প্রাসাদবাসী কেউ লক্ষ্য করেনি যে অতিথিসেবার ফাঁকে রোজ একবার রাজকুমারী সান্ধ্যপ্রণাম করতে বেরিয়ে যান।

এখন উৎসব শেষ। অতিথি সন্ন্যাসী সবাই মহারাজ কুন্তীভোজের ধন্যি ধন্যি করে ফিরে গেছেন, রাজকুমারী কুন্তীর রূপ-গুণের প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ। এবার সবাই যার যার কাজে মন দিয়েছে।

কুন্তীর অভ্যসের কথা জানতে পেরে, বৎসা কঙ্কাকে ভর্ৎসনা করে আরও দাসী আর পাহারাদার সঙ্গে দিয়ে দিয়েছে- রাজকুমারী অরক্ষিত সান্ধ্যভ্রমণে যাবেন, সে কখনো হয়?

বসন্তের মৃদু হাওয়া বইছে, পলাশফুলে ভরে গেছে সামনের কটা গাছ।

পাতার আড়াল থেকে কুহু কুহু ডেকে কোকিলটা পাগল হয়ে যাচ্ছে!

আনন্দ না বেদনা – কিসের ভারে যে কুন্তীর বুকটা ভারী হয়ে উঠেছে সে নিজেই জানে না!

অন্যমনস্কের মতো সাথীদের পিছনে ফেলে খানিকটা এগিয়ে গেল কুন্তী একা…..নদীর ধারে গিয়ে আজ  সূর্যদেবকে সান্ধ্যপ্রণাম জানাবে সে।

অকস্মাৎ, নদী থেকে তীর ধরে উপরে উঠে এলেন কান্তিমান দীর্ঘাঙ্গ কমন্ডুলধারী এক ঋষিবর – যেন সাক্ষাৎ সূর্যদেবতা কুন্তীর পূজা নিতে এসেছেন। বিহ্বল কুন্তী এক পা পিছিয়ে এল। উজ্জ্বলকান্তি ঋষি পূর্ণদৃষ্টি রাখলেন কুন্তীর পদ্মপলাশ চোখে, তারপর মৃদু হেসে নদীতীর ধরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

“ইনি কে? কে ইনি?” ভাবতে ভাবতেই কুন্তী দেখল রম্ভা আর কঙ্কা এসে পৌঁছেছে।

– “রাজকুমারী আজ এতো দ্রুত হাঁটছেন যে আমরা পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছি না!” রম্ভা বলল হাসতে হাসতে।

রাত্রে শয্যায় শুয়েও বারবার কুন্তীর মনে পড়তে লাগল সেই দিব্যকান্তি ব্রাক্ষণকে আর তাঁর তীক্ষ্ণ উজ্জ্বল দৃষ্টিকে। কে উনি? কেন তিনি অমন করে চাইলেন এই যাদবকন্যার দিকে! উনি কি কুন্তীকে চেনেন? ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল জানে না, ঘুমের মধ্যেও ফিরে ফিরে এল সেই চোখের দৃষ্টি!

ঘুম থেকে উঠতে বোধহয় আজ একটু দেরীই হয়েছিল কুন্তীর – সূর্য প্রণাম করে এসে দেখে আজ কঙ্কা নিয়ে এসেছে প্রাতঃরাশ।

কুন্তী হেসে বলল – “বৎসা নেই বুঝি?”

কঙ্কা বলল – “আছে রাজকুমারী, সে আজ খুব ব্যস্ত। মহারাণীমা ডেকে পাঠিয়েছেন তাকে – ওখানে আজ যজ্ঞি রান্না হবে, দুর্বাসা মুনি এসেছেন যে!”

“মহর্ষি দুর্বাসা? হঠাৎ?” কুন্তী অবাক হয়ে গেল। যদিও সে কখনো দেখেনি তাঁকে, কিন্তু সবার মুখে শুনে শুনে তারও একটা ভয়জড়িত সম্ভ্রম তৈরী হয়েছিল মহর্ষি দুর্বাসার জন্যে।

“হ্যাঁ রাজকুমারী, উনি খুব ভোরবেলায় রাজপ্রাসাদের সিংহদ্বারে এসে দাঁড়িয়েছিলেন – কেউ জানত না। মহারাজ খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেছেন….আর এখন রাজবাড়ীতে সবাই ব্যস্ত যাতে ওনার যত্নের কোনো ত্রুটি না হয়!….সবাই বলছে উনি নাকি কু্ন্তীরাজ্যে কিছুদিন আতিথ্য গ্রহণ করবেন, মহারাজ সরোবরের ধারের শ্বেতমহল সাজানোর আজ্ঞা দিয়েছেন।….দুর্বাসা মুনি নাকি বলেছেন যে উনি দাসী-চাকরের হাতের সেবা নেবেন না, রাজবাড়ীর এমন লোক গিয়ে ওনাকে সেবা করবে, যে সদা সচেতন থাকবে মুনিবরের প্রয়োজন মেটাতে।….কে জানে মহারাজ কাকে আজ্ঞা করবেন যেতে!”

“কাকে আর, এই মথুরাকুমারীকে ছাড়া?….এসে থেকে অতিথিসৎকারই তো করে চলেছে মহারাজের দত্তক কন্যা কুন্তী!” মনে  মনে বলতে বলতে গিয়ে অলিন্দে দাঁড়াল কুন্তী।

আনমনে তাকিয়ে রইল দূর দিগন্তের দিকে।

অশ্বনদী পার হয়ে, কোন পথ প্রান্তর পেরিয়ে মথুরারাজ্য — কে জানে?

দত্তক পিতার আজ্ঞা পালন করে পরেরদিনই শ্বেতমহলে এসে উঠল কুন্তী – মহর্ষির নাকি এমনই ইচ্ছা।

উনি দিবারাত্র সাধন পূজন করেন – রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরে ক্ষুধার্ত বোধ করলে তাঁকে খাদ্য পরিবেশনের জন্য কাউকে নিকটে থাকতে হবে।

রম্ভাও সঙ্গে এসেছে, তার স্থান নির্দিষ্ট হয়েছে মহলের আরেক প্রান্তে। কুন্তী রয়েছে মহর্ষির ঘরের কাছাকাছি। শুরু হল কুন্তীর পরীক্ষা – এই পরীক্ষায় তাকে উত্তীর্ণ হতেই হবে, মহারাজ কুন্তীভোজ বারবার বলে দিয়েছেন।

সেই উজ্জ্বলকান্তি ঋষি এখন তার চোখের সামনে, আর মনের ভিতরে সহস্র সাবধানবাণী- মহর্ষি দুর্বাসার কোপানলে কেই বা পড়তে চায়?…..

রূপে গুণে ষড়ৈশ্বর্যশালিনী কুন্তী কিন্তু সেই পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হল- মহর্ষি তৃপ্ত হয়ে কুন্তীকে বরপ্রদান করে কুন্তীরাজ্য ত্যাগ করে গেলেন।

মহারাজ কুন্তীভোজ এতই খুশী হলেন যে, কুন্তীর ইচ্ছায় মহর্ষি চলে গেলেও তাকে শ্বেতমহলে থাকার অনুমতি দিলেন।

সরোবরের সোপানে বসে কুন্তীর নির্জন অপরাহ্ণগুলো এখন অনায়াসে কেটে যায়।

নির্জনতা আর এখন কুন্তীর কাছে নতুন নয়, বরং আকাঙ্খিত।

শ্রান্ত কুন্তী এমনই একটি নিভৃত আলয় খুঁজছিল, প্রাসাদের কোলাহলের বাইরে।

সব নিয়ম, অনুশাসন আর আজ্ঞার বাইরে। কতদিন যেন সে নিজের সঙ্গে নিজে মুখোমুখি বসেনি!

রম্ভার সঙ্গে কঙ্কাও এখন আছে তাকে সাহচর্য দিতে, আর প্রাসাদের থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস ও বার্তা সরবরাহ করতে।

অপরাহ্নে রম্ভা বসে সেদিন কুন্তীর কেশবিন্যাস করতে করতে বলল-“রাজকুমারি, শরীরের যত্ন নাও – কি চেহারা হয়েছে, তাকিয়ে দেখেছ আয়নায়? চোখের নীচে কালি….এমন সোনার বরণ….মথুরাপুরীর ঘরটার জন্যে বুঝি মন কেমন করছে?”

কুন্তী মৃদু হেসে বলল -“কোন ঘর রে, রম্ভা?….মথুরাপুরী? না রে, সে তো আমি ভুলেই গেছি প্রায়…..মেয়েদের আবার ঘর থাকে নাকি কোনো? তারা চিরকালের দত্তা….চিরদিন ঘর খুঁজে ফেরে!”

কঙ্কা এসে দাঁড়াল এইসময়, কেশর দেওয়া সরবত নিয়ে রাজকুমারীর জন্যে।

কুন্তী হেসে হাত বাড়িয়ে বলল- “দে,…কিছু বলবি?”

কঙ্কা উত্তেজিত হয়ে বলল -“রাজকুমারি, আমি এখুনি রাণীমার মহল থেকে আসছি….সেখানে খুব ধুমধাম…..মহারাজ সবাইকে পারিতোষিক দিচ্ছেন….এই যে আমার….”

কুন্তী হেসে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল- “আচ্ছা, তুই পারিতোষিক পেয়েছিস সে তো বুঝলাম – কিন্তু ‘কেন’ সেটা তো বলবি?!”

কঙ্কা বলল – “রাণীমা অন্তঃসত্ত্বা যে…..!”

“রাণীমা অন্তঃসত্ত্বা?” রম্ভা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল – কুন্তীভোজের অন্দরমহলের খবর সে বিশেষ রাখে না। “এখন তাই নাচগান হবে প্রাসাদে – আমি যাব, রাজকুমারি?” কঙ্কা জিগেস করল।

অন্যমনস্ক কুন্তী বলল – “যা।”

রম্ভা বিরক্ত হয়ে বলল- “মহারাজের তবে অমন সাততাড়াতাড়ি দত্তক নেওয়ার কি পড়েছিল বাপু?…ঘরছাড়া করল আমাদের….যত্তোসব!”

কুন্তী সে কথায় কান না দিয়ে আস্তে আস্তে বলল- “আমিও অন্তঃসত্ত্বা!”

চমকে উঠল রম্ভা – “কি বললে, রাজকুমারি?…”

“শুনলি তো, কি বললাম!” বলে উঠে দাঁড়িয়ে ধীরপায়ে শ্বেতমহলের ভেতরে ঢুকে গেল কুন্তী।

আর রম্ভা বসে রইল সরোবরের সোপানে, স্তব্ধ মূর্তির মতো। তবে কি ঋষি দুর্বাসা….?

পরদিন সকালে বেশ ভালো করে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে রম্ভা কথাটা পাড়ল – হাজার হোক তার একটা দায়িত্ব আছে, শুরসেনা আর মরিসা শুনলে কি বলবেন?

সরোবর-সোপানে বসে কুন্তীর গাত্রমার্জনা করতে করতে রম্ভা আস্তে করে বলল-“কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে তো রাজকুমারি, বেশী দেরী হলে….সবার কানে কথা গেলে…..”

রম্ভাকে থামিয়ে দিয়ে কুন্তী বলে উঠল – “তুই ঐসব নিয়ে চিন্তা করিসনা, আমার সব ভাবা হয়ে গেছে।”

রম্ভা একটু থতোমতো খেয়ে গেল, ফের সামলে নিয়ে বলল -“কি ভেবেছ, রাজকুমারি? সমাজ তো মানবে না…..সে দিনকাল তো আর নেই!”

“সমাজ কি তোকে খাইয়ে পরিয়ে রাখছে?” -গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল কুন্তী।

রম্ভাও হাল ছাড়ার পাত্রী নয়, বলল – “কিন্তু মহারাজ কুন্তীভোজ তো রাখছেন? তিনি কি মেনে নেবেন?”

কুন্তী বলল -“দুর্বাসাকে খুশী করার পারিতোষিক হিসাবে, এক বৎসরের বাসস্থান হিসাবে আমি শ্বেতমহল চেয়ে নিয়েছি মহারাজের থেকে। এই একবৎসর, এই শ্বেতমহল আমার – এখানে আমার ইচ্ছায় কেউ বাধা দিতে আসবে না, কেউ আমাকে চলে যেতে বলবে না!….তারপর? তারপর এই বিরাট দেশে কত মুনি ঋষির তপোবন আছে – কোথাও কি আমার ঠাঁই হবে না? আমি নাহয় সেখানেই চলে যাব তাকে বুকে চেপে, যে এই পৃথিবীতে আমার একমাত্র আপনজন।….মহারাজ কুন্তীভোজের আমাকে আর প্রয়োজন হবে না – তাঁর ঘরে সন্তান আসছে! যাগযজ্ঞ আর ঋষিদের আশীর্বাদের ফলপ্রাপ্তি হয়ে গেছে – আমার কাজ এখানে শেষ। আর তুই? তোকে আমি মুক্তি দেব – তুই মথুরা চলে যাস!”

রম্ভা কেঁদে ফেলল -“রাজকুমারি, তোমাকে ছেড়ে আমি কোথায় যাব? আমি কি আমার জন্যে বলছি? আমি বলছি তোমার জন্যেই….মহারাজ কুন্তীভোজ নয় চুপ করে রইলেন, তুমি তাঁকে দুর্বাসার কোপ থেকে রক্ষা করেছ।….কিন্তু রাজমহিষী? তিনি তো….”

উদাস গলায় কুন্তী বলল -“কার কার কথা ভাববি তুই, আর কার কার ভয়ে থাকবি?…যে প্রাসাদে থাকার দিন এখন হাতে গোণা, সেই প্রাসাদে কে কী বলছে সে নিয়ে আর মাথা নাহয় না-ই বা ঘামালি!”

রম্ভা কুন্তীকে চেনে, সে বুঝল আর কথা বাড়ান বৃথা – কুন্তীর নির্ণয় পাল্টাবে না।

কিন্তু মাথা না ঘামিয়েই বা সে থাকে কি করে? সন্তানকে নাহয় জন্ম দিল কুন্তী, কিন্তু সেই সন্তানের জন্যে রাজপ্রসাদ ছেড়ে মথুরার আদরের দুলালীকে পথে নামতে হবে, আর রম্ভা চেয়ে চেয়ে দেখবে? তা হতেই পারে না। রম্ভা ঠিক করল তাকেই কিছু একটা করতে হবে!

কিন্তু সে তো এখানে কাউকেই চেনে না, চেনার চেষ্টাও করেনি কখনো – মথুরা ছেড়ে আসার হতাশা আর  রাগ সে মেটাত কুন্তীরাজ্যকে দুহাতে ঠেলে সরিয়ে রেখে।

রাজকুমারী তাকে অনেক বুঝিয়েছে ভাগ্যকে মেনে নিতে, কিন্তু আজ পর্যন্ত রম্ভা কুন্তীরাজ্য বা রাজপ্রাসাদের কাউকে আপন করে নিতে পারেনি।….তবে এখন কি হবে? কার কাছে সাহায্য চাইবে?….

কঙ্কা! হ্যাঁ, কঙ্কাই হবে ঠিক লোক। রাজকুমারীকে সে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে – কে বাসে না?

বৎসা, তাদের সান্ধ্যভ্রমণের যে দুজন পাহারাদার ছিল তারা, সবাই…সবাই ভালোবাসে রাজকুমারী কুন্তীকে। তবে এদের মধ্যে কঙ্কা একটু বিশেষ – সে খুবই বুদ্ধিমতী, বিশ্বাসী আর রাজকুমারী-অন্ত প্রাণ! তাকেই কাজে লাগাতে হবে।

দিন যেতে থাকে নিজের মনে। কুন্তী এখন আর শ্বেতমহলের বাইরে যায় না। জানলা দিয়ে উদাসমনে সরোবরের দিকে তাকিয়ে থাকে। শ্বেতমহলে এখন শুধু রম্ভা, কঙ্কা আর বৎসা ছাড়া আর কারুর প্রবেশাধিকার নেই। আর সেই দুজন রক্ষক, ভট্ট আর দ্রুম, রয়েছে শ্বেতমহলের বহির্দ্বারে – অবাঞ্ছিত লোকের প্রবেশ নিষেধ।

রম্ভা আজও গেছে প্রাসাদে মহারাজ কুন্তীভোজের সঙ্গে কথা বলতে, সঙ্গে বৎসা।

কঙ্কা বসে আছে কুন্তীর কাছে।

মহারাজ বলে দিয়েছেন যে কুন্তীর তপোবনে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কুন্তীর সসম্মানে থাকার ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন। স্বয়ংবর ডাকবেন, কুন্তীর মতো রূপসী গুণবতীর জন্যে তিনি এমন রাজপুত্র এনে দেবেন যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কুন্তী এবং কুন্তীরাজ্য গৌরবাণ্বিত হবে – শুধু, বিনিময়ে কুন্তীকে তার সন্তান ত্যাগ করতে হবে।

রম্ভা কুন্তীকে বুঝিয়েছে যে এই সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা। মথুরাপুরীর রাস্তা যখন বন্ধ, তখন মহারাজ কুন্তীভোজের কথা শুনে চলাই ভালো নয় কি? একা এই পৃথিবীতে, অনিশ্চিতের পথে, চলা যায় না!

এই কানীন সন্তানকে ত্যাগ করা ছাড়া কুন্তীর সামনে কোনো পথ খোলা নেই! তবে সেই সন্তান যাতে ঠিকভাবে সন্তানস্নেহে পালিত হয় সে ব্যবস্থাও হয়ে যাবে, বৎসা বলেছে।

কুন্তী চুপ করে থেকেছে। দেহ তার দিন দিন ক্ষীণবল হচ্ছে, মনেরও আর জোর নেই তর্ক করার। বৎসা ধাত্রীবিদ্যায় পারদর্শী, সেই দেখাশোনা করছে কুন্তীর।…

সবই হল, যেমনটি রম্ভা বলেছিল। সূর্যের মতো উজ্জ্বল শিশুপুত্রটিকে ক্ষণিক বুকে চেপে ধরেই ছেড়ে দিতে হল। কিন্তু তার গায়ে রইল বিশেষ অলঙ্কার, যা দেখে পরিণত বয়সেও তাকে চিনতে তার মায়ের কোনো ভুল না হয়! চোখের জল মুছে কুন্তী বলল – “পারলে তোমার মা’কে ক্ষমা করে দিও।”

ডালা ভাসল জলে, পৌঁছল নির্দিষ্ট স্থানে। হস্তিনাপুরবাসী অধিরথ, কুন্তীরাজ্যে যার নিত্য আসা-যাওয়া, সে আর তার স্ত্রী রাধা কোলে তুলে নিল কর্ণকে।

তারপর বহু ধুমধাম করে হল কুন্তীর স্বয়ংবর – মালা যে কাকে পরাতে হবে সে তো কুন্তীর আগেই জানা ছিল।

যন্ত্রচালিতের মতো সে মালা পরাল।

স্বয়ংবরসভায় মহারাজ পাণ্ডুর হাস্যমণ্ডিত গর্বিত মুখ যেমন কুন্তীর নজর এড়াল না, তেমনি নজর এড়াল না আনুষ্ঠানিক বিবাহোৎসবে হস্তিনাপুরের সব কূলপুরুষদের অনুপস্থিতি, যাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মহারাজ কুন্তীভোজ নিজেকে গৌরবাণ্বিত মনে করছেন!

বিবাহ অনুষ্ঠানে মথুরা থেকে এসেছিল ভ্রাতা বসুদেব – কুন্তীকে হাতে ধরে হস্তিনাপুরের রথে তুলে দিল সে।

কুরুকূলের গরিমা এবং অহমিকার সামনে যাদবকূলের কন্যার রূপ-গুণ যে নগন্য, এটা বোধহয় মহারাজ কুন্তীভোজ ভেবে দেখেননি। বা দেখলেও, ভেবেছেন পাত্র স্বয়ং যখন রূপে মোহিত তখন বাকীরা আর কি করতে পারে?

কুন্তী কিন্তু সাবধান হয়ে গেল – সে জানে যে জীবন সরলরেখা নয়। সে এও জানে যে রূপের মোহ কাটতে অধিকাংশ পুরুষমানুষেরই বেশীদিন লাগে না। আর গুণ? মেয়েমানুষের গুণের মর্যাদা দ্যায় এমন পুরুষ তো আজ পর্যন্ত চোখে পড়ল না, তাই হস্তিনাপুরেও যে চোখে পড়বে এমন ভরসা নেই! অতএব, নিজেকে প্রস্তুত রাখা ভালো।

বিবাহ শেষে হস্তিনাপুরের রথে চেপে মহারাণী কুন্তী ত্যাগ করে গেলেন কুন্তীরাজ্য, সঙ্গে রম্ভা।

কঙ্কা কেঁদে ভাসাল, কুন্তীর চোখে কিন্তু আজও জল নেই!

 

৩ হস্তিনাপুর

এতটা পথ যে কোথা দিয়ে কেটে গেল, যেন বোঝাই গেল না।

মহারাজ পাণ্ডু বারবার খোঁজ নিয়েছেন কিছু লাগবে কিনা, দাসদাসীরা ত্রস্ত হয়ে থেকেছে মহারাণীর পরিচর্যায়, রম্ভা উৎসুক চোখে অপেক্ষায় থেকেছে কতক্ষণে হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে পৌঁছবে, আর মহারাণী কুন্তী শুধু নির্বাক বসে ভেবে গেছেন – ভাগ্য কোন পথ থেকে তাঁকে কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে, আর কেনই বা নিয়ে যাচ্ছে!

এই যাত্রাকে আজ আর তাঁর উদ্দেশ্যবিহীন বলে মনে হচ্ছে না। ঘর খুঁজতে খুঁজতে মথুরা থেকে কুন্তীরাজ্য আর কুন্তীরাজ্য থেকে হস্তিনাপুরে পৌঁছনোর পেছনে যেন ঈশ্বরের কোনো ইঙ্গিত আছে।

যাদবকন্যা পৃথার জগত ছিল শুধু শুরসেনার মহলটুকু। সেই জগত থেকে তুলে এনে মহারাজ কুন্তীভোজ তাঁকে পরিচিতি দিলেন কুন্তীরাজ্যের অতিথি যত ঋষি-মহাঋষি-রাজন্যবর্গের কাছে। আর আজ হস্তিনাপুরের রূপবতী মহারাণী কুন্তীর জয়ধ্বনিতে আকাশ  বাতাস ভরে গেছে – কুরুবংশের সুবিশাল তোরণ তাঁর সামনে ! ঘর বসিয়ে নোঙর ফেলতে হবে এখানেই! ময়ূরের পায়ে পায়েল পরানোর চেয়ে অনেক বড়ো খেলায় সামিল হতে হবে – ঘরকে ধরতে হবে শক্তহাতে!

পুষ্পবৃষ্টির মধ্যে দিয়ে, লাল মখমল বিছানো চাঁদোয়া ঢাকা পথ ধরে, মহারাজ পাণ্ডুর পিছনে পিছনে হস্তিনাপুর রাজপ্রাসাদের  অন্দরমহলে এসে পৌঁছলেন মহারাণী কুন্তী।

শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির মধ্যে, অন্তঃপুরিকারা বরণ করল অন্দরমহলের নতুন কর্ত্রীকে।

শ্বশ্রুমাতাদ্বয়, অম্বিকা এবং অম্বালিকা, অখণ্ড সৌভাগ্যবতী হওয়ার আশীর্বাদ দিয়ে তাঁর সর্বাঙ্গ ভরিয়ে দিলেন মহামূল্য অলঙ্কারে-কাশীরাজ্যের বিশেষ কারিগরের হাতে তৈরী, অপূর্ব শৈলীর গহনা সব।

তাঁদের বিষন্ন চেহারা যেন বলে দিচ্ছিল যে এই অলঙ্কারেরা তাঁদের জন্যে এখন শুধু ক্ষণিকের স্মৃতি, যাকে তাঁরা ভুলতে চান।

এরপর ধীরপায়ে প্রবেশ করলেন শ্বশ্রঠাকুর্মাতা সত্যবতী, যাঁর রূপ, যৌবন এবং বুদ্ধিমত্তার গল্প কুন্তীর শোনা ছিল। বৈধব্য তাঁকে ম্লান করতে পারেনি, কোনো বিষাদ যেন তাঁকে কোনোদিন ছুঁতে পারেনি।

কুন্তীর সামনে এসে হাসিুখে তিনি তাঁকে নিরীক্ষণ করলেন কিছুক্ষণ, তারপর হাতের ইঙ্গিতে দাসীকে ডাকলেন। থালায় একটি বাক্স নিয়ে দাসী মাথা নীচু করে এসে দাঁড়াল।

বাক্স খুলে হীরকখচিত একটি রত্নমুকুট বার করে তিনি কুন্তীর শিরে পরিয়ে দিয়ে বললেন- “আজ এই মুকুট তার যোগ্য স্থান পেল। মহারাণী কুন্তী, এই রাজকূল আর রাজবংশ রক্ষার ভার আমি আজ থেকে তোমার শিরে অর্পণ করলাম। আমি জানি তুমিই এর যোগ্য মর্যাদা দিতে পারবে!….অখণ্ড সৌভাগ্যবতী হওয়ার আশীর্বাদ আমি তোমায় দেব না, তুমি যেন কুরুবংশকে সবরকম পতন থেকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পার, এই আমার আশীর্বাদ আর এই আমার প্রার্থনা।”

কুন্তী নত হয়ে তাঁকে প্রণাম করলেন, সত্যবতী তাঁকে বুকে টেনে নিয়ে আশীর্বাদ করলেন।

আচার শেষ হলে, কক্ষ খালি হলে, কুন্তী এসে বসলেন পালঙ্কে – সঙ্গে রম্ভা।

কুন্তীকে পাখার বাতাস করতে করতে উচ্ছ্বসিত রম্ভা বলল- “রাজকুমারি, তুমি আজ হস্তিনাপুরের পাটরাণী! আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে সে তোমাকে কি বলব।…..বলেছিলাম না যে মহারাজ কুন্তীভোজের কথামতো চলে দেখ….” পুরোটা আর শেষ করল না রম্ভা – ঐসব পুরোনো স্মৃতি না ঘাঁটাই ভালো!

কুন্তী কোনো উত্তর দিলেন না, তিনি ভাবছেন অন্য কথা।

হস্তিনাপুরে আসার আগে, মহারাজ কুন্তীভোজ তাঁকে কুরুবংশের ইতিহাস সবিশেষ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।

তাই পরিচয় না থাকলেও, সবাইকেই মনে হচ্ছিল যেন চেনা! কিন্তু দেখতে পেলেন না একজনকে, যাঁকে দেখার জন্যে তিনি  উৎসুক হয়ে ছিলেন – ভাসুর ধৃতরাষ্ট্রর পত্নী, গান্ধারকন্যা গান্ধারী!

তাত ভীষ্মের ব্যবস্থাপনা এবং দৌত্যের সূত্র ধরে, শ্বশ্রুমাতাদের মত গান্ধারীও এসে উঠেছিলেন হস্তিনাপুরে। বিবাহ করেছিলেন এক কুরুকুমারকে যাঁকে তিনি কোনোদিন চোখে দেখেননি।

স্বামী জন্মান্ধ বলে স্বেচ্ছায় নিজের দৃষ্টি পর্দাবৃত করেছেন তিনি চিরদিনের মতো!

গান্ধারীর আনুগত্য এবং ধর্মবোধ তাঁকে এটাই করতে বলেছিল, তিনি ভাবেননি যে তাঁর দৃষ্টি তাঁর স্বামীর অন্ধত্বের পরিপূরকও  হতে পারত!

কুন্তীর খুব ইচ্ছে করছিল গান্ধারীকে দেখতে, কিন্তু তিনি এলেন না।

প্রাসাদের আরেক প্রান্তে গান্ধারী তখন স্বামী ধৃতরাষ্ট্রর সঙ্গে আলাপরতা।

গান্ধারী বললেন – “স্বামি, কুন্তী হস্তিনাপুরের পাটরাণী। তার সঙ্গে গিয়ে দেখা করা আমার কর্তব্য!”

ধৃতরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ গলায় বললেন -“গান্ধারি, আর কতো কর্তব্যের পরীক্ষা দিতে হবে আমাদের বল? পাণ্ডু আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা, অথচ বিদুরের কথা শুনে ঠাকুমা সত্যবতী আর তাত ভীষ্ম রাজমুকুট তুলে দিলেন পাণ্ডুর মাথায়……কেন, না আমি জন্মান্ধ! তুমি সম্পর্কে কুন্তীর জ্যেষ্ঠা, কূলগরিমায় কুন্তীর অনেক ওপরে, অথচ তোমায় মাথা নীচু করতে হবে কুন্তীর কাছে…কেন, তোমার কি অপরাধ?”

গান্ধারী বললেন- “স্বামি, অপরাধ কারুর নয়। কিন্তু ভাগ্যকে মেনে নিয়ে কর্তব্যের পথে চলাই জীবনের রীতি, অন্যথায় অশান্তি এমনকি সর্বনাশ হতে পারে! আপনি জ্ঞানী, সর্বশাস্ত্র পাঠ করেছেন – আপনাকে আমি কি আর বোঝাব?….”

ধৃতরাষ্ট্র বললেন -“ভ্রাতা পাণ্ডু তো কিছুদিন অপেক্ষা করতে পারত? আমার বিবাহের সঙ্গে সঙ্গেই তাকে নিজে স্বয়ংবরসভায় গিয়ে যাদবকূলের কন্যাকে বিবাহ করে মহারাণী করে নিয়ে আসতে হবে? কেন? কিছুদিন ধৈর্য ধরলে তো তাত ভীষ্ম উপযুক্ত বংশে পাণ্ডুরও বিবাহের ব্যবস্থা করতেন! কিন্তু পাণ্ডু অপেক্ষা করল না…..কেন বল তো গান্ধারি? সে কি চায় আমার আগে তার পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করুক? না না…..তা যেন না হয় গান্ধারি…..যে সিংহাসন আমি হারিয়েছি, সেই সিংহাসন যেন আমার পুত্র ফিরিয়ে আনতে পারে পাণ্ডুর পুত্রর থেকে….!”

এমনসময় দাসী এসে জানাল যে দ্বারে অপেক্ষারতা, সাক্ষাৎপ্রার্থী, মহারাণী কুন্তী।

গান্ধারী কুন্তীকে আনার আজ্ঞা দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। পাটরাণীকে অভ্যর্থনা করতে এগিয়ে এলেন।

হস্তিনাপুরে আজ কুন্তীর দ্বিতীয় দিন।

প্রাত্যহিক স্নান এবং সূর্যপ্রণাম সেরে কুন্তী তাঁর কক্ষে প্রবেশ করতে, দাসী জানাল যে মহারাজ পাণ্ডু আসছেন।

“এই সময়ে?…..” প্রশ্নটা মনের থেকে মুখে আসার আগেই বলিষ্ঠ পায়ে ঘরে ঢুকলেন হস্তিনাপুর নরেশ পাণ্ডু, দাসী নত হয়ে প্রণাম জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সদ্যস্নাতা কুন্তীর অপরূপ মুখশ্রীর দিকে মুগ্ধদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পাণ্ডু বললেন-“শত্রুর জাল কেটে বেরোতে পারি, কিন্তু এই রূপের জাল কেটে কি করে বেরোই মহারাণি?”

স্মিত হেসে কুন্তী বললেন -“হস্তিনাপুর নরেশ মহারাজ পাণ্ডুকে আটকাতে পারে এমন জাল কি কোথাও আছে জগতে? শুনলাম কাল মহারাজ দিগ্বিজয়ে বেরোচ্ছেন….আজ তবে এই সামান্যা কুন্তী মহারাজের সেবা করে ধন্য হোক!”

মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাণ্ডু বললেন -“কথা ছিল তাই, কিন্তু অপেক্ষা করা গেল না…..পশ্চিম সীমানায় বিদ্রোহ শুরু হয়েছে, তাত ভীষ্ম বললেন যে আমাকে আজই রওয়ানা হতে হবে। তাই বিদায় নিতে এলাম!”

কুন্তীর আশাহত মুখের দিকে তাকিয়ে পাণ্ডু হেসে বললেন -“তবে কথা দিচ্ছি, ফিরে এসেই তোমার সেবা নিতে আসব মহারাণি – ঠাকুর্মাতা সত্যবতী নির্দেশ জারী করেছেন যে এবার ঘরে বসতে হবে, আগে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রদান করে তবে পরবর্তী যুদ্ধে যাওয়া!”

কুন্তী হেসে বললেন -“ঠাকুর্মাতা দিদি গান্ধারীকে কেন বলছেন না? দিদি বড়ো….”

পাণ্ডু তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন -“আমার পুত্র বসবে সিংহাসনে, তার প্রস্তুতি চাই আগে – অন্যেকে কেন বলবেন ঠাকুর্মাতা?”

পাণ্ডুর গর্বিত, প্রত্যয়ী,আত্মাভিমানী মুখের দিকে তাকিয়ে কুন্তী আর কথা বাড়ালেন না।

পাণ্ডুকে বিদায় দিয়ে অলিন্দে এসে বসলেন কুন্তী।

হস্তিনাপুরের এই বিশাল প্রাসাদ এখনো তাঁর কাছে নতুন। কোথাও যেতে গেলে দাসীকে ডাকতে হবে।

রম্ভাও যে কোথায় গেল?! চিঠি লিখছে বোধহয়।

তার একটি মনের মানুষ আছে মথুরায়, রম্ভার ইচ্ছে যে কুন্তী মহারাজকে বলে তাকে হস্তিনাপুরে একটা কাজ দিয়ে দেন। তাকে প্রতি সপ্তাহে চিঠি না লিখলে রম্ভার চলে না, সেও উত্তরে মথুরা নগরীর সব খবর পাঠায় রম্ভাকে।

কুন্তী ভাবলেন যে মহারাজ ফিরে এলে বলতে হবে – কতদিন আর রম্ভা এইভাবে তার সঙ্গে সঙ্গে থাকবে! এবার রম্ভারও বিবাহ দিতে হবে। রম্ভার পাণিপ্রার্থীর জন্য একটা কাজ নিশ্চয়ই জোগাড় করে দিতে পারবেন মহারাজ!

একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন, দাসী এসে নিবেদন করল যে মহামন্ত্রী বিদুর তাঁর সাক্ষাতপ্রার্থী। মহামন্ত্রী বিদুর? হ্যাঁ, মহারাজ কুন্তীভোজ বলেছিলেন বটে – মহারাজের সৎ ভাই, অশেষ জ্ঞানী এবং ধার্মিক।

মহামন্ত্রীকে ভেতরে নিয়ে আসার আজ্ঞা দিয়ে কুন্তী ঘরে এসে বসলেন।

বিদুর এসে অভিবাদন করলেন, প্রত্যাভিবাদন করে কুন্তী তাঁকে বসতে বললেন।

হাসিমুখে দুজনেই কিছুক্ষণ দুজনকে পর্যবেক্ষণ করলেন।

বিদুর বললেন – “আমি যা প্রত্যাশা করেছিলাম, মহারাণী তার চেয়েও অধিক যোগ্যা!”

কুন্তী বললেন – “আমি যা আশা করেছিলাম, আপনি তা একেবারেই নন!”

বিদুর হাসিমুখে বললেন – “অর্থাৎ?”

কুন্তী বললেন -“অর্থাৎ আপনি হস্তিনাপুর রাজবাড়ীর উচ্চ ধ্বজা উড়িয়ে চলেন না এবং আপনি মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখতে জানেন – কোন কিছুর প্রতিভূ হিসাবে নয়! আপনি মহারাজের ভাই হলেও, আপনাকে দেখে আমার না মনে পড়ছে জ্যেষ্ঠভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্রকে না মনে পড়ছে মহারাজ পাণ্ডুকে – আপনিই আপনার নিজের পরিচয়।”

বিদুর বললেন – “আপনি হয়তো জানেন না মহারাণি, আমি রাজবাড়ীর বাসিন্দা নই। শহরে আমার নিজস্ব একটি ছোট বাড়ী আছে, রাজ্যের মন্ত্রী হিসাবে কিছু বেতন পাই – আমার চলে যায়।”

কুন্তী বললেন- “আপনি মহারাজের ভ্রাতা, রাজপরিবারের সদস্য – এতোবড়ো রাজপ্রাসাদে না থেকে আপনি…..”

বিদুর হেসে বললেন-“সৎ ভ্রাতা…..আমি দাসীপুত্র, মাতা পরিশ্রমী আমার জন্মদাত্রী…..আমার স্থান সিংহাসনের অনেক নীচে…..আমার স্বস্থানে আমি খুশী মহারাণি!”

কুন্তী বললেন -“জীবন যাকে যে স্থান দ্যায় তাতে খুশী থাকা মহত্ত্বের লক্ষণ – আপনি মহৎ! হস্তিনাপুর রাজপ্রাসাদের দুর্ভাগ্য যে আপনার মতো মহামতি জ্ঞানী ব্যক্তি এই প্রাসাদের থেকে দূরে সরে আছেন। হস্তিনাপুর যদি বংশপরিচয় পেরিয়ে ব্যক্তিপরিচয় দেখতে না পায়, তবে তা রাজকূলের দূরদৃষ্টির অভাব!”

বিদুর বললেন -“গরিমা আমাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে রাখে মহারাণি, আর উচ্চাকাঙ্খা আবৃত করে শুভাশুভ বোধ — তবু সেটাই মনুষ্যধর্ম! এই প্রাসাদও তার ব্যতিক্রম নয়। আপনি বুদ্ধিমতী, স্থিতপ্রজ্ঞা, ধৈর্যশীলা – আমার স্থির বিশ্বাস যে আপনি এই রাজকূলের সমতা রক্ষা করবেন। ক্ষুদ্র আবেগ বা অভিমান আপনাকে বিচলিত করতে পারবেনা, রাজকূল তার পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড দিয়ে আপনাকে বেঁধে রাখতে পারবেনা।….যদি অনুমতি দেন তাহলে আবার আসব – বলব আমার কথা আর শুনব আপনার কথা। আজ আসি, জ্যেষ্ঠভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্র ডেকে পাঠিয়েছেন। জানেন বোধহয়, মহারাজের অনুপস্থিতিতে উনি রাজ্য চালাচ্ছেন?”

কুন্তী বললেন – “উনি কি তাতে অসন্তুষ্ট….মহারাজ তো প্রায়ই বাইরে যান?”

বিদুর বললেন – “অসন্তুষ্ট? একেবারেই না! উনি খুবই খুশী ক’দিনের রাজ্যভার পেয়ে।আমাকে ডাকেন মন্ত্রী বলে, আমি সাধ্যমতো পরামর্শ দিই। তবে ওনার শ্যালক আছেন, গান্ধারকুমার শকুনি – তাঁর পরামর্শই উনি বেশী শোনেন।” অভিবাদন করে বেরিয়ে গেলেন বিদুর।

অন্যমনস্কভাবে হাতের কঙ্কণ নাড়াচাড়া করতে করতে, কুন্তী ভাবতে লাগলেন মহারাজ পাণ্ডুর কথাগুলো।“আমার পুত্র বসবে সিংহাসনে….” কি অসম্ভব দৃঢ়তায় কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন মহারাজ, যেন ভাগ্যকে হাতের মুঠোয় বেঁধে কথা বলছেন!

কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র? তাঁর চাপা উচ্চাকাঙ্খায় যুক্ত হয়েছে শ্যালক শকুনির ইন্ধন……মহারাজ পাণ্ডু কি তা দেখতে পাচ্ছেন?

মহারাজের অনুপস্থিতিতে অনেকদিন কেটে গেল।

মহারাণী কুন্তী আস্তে আস্তে পরিচিত হচ্ছেন রাজবাড়ীর সঙ্গে আর রাজবাড়ীর মানুষজনের সঙ্গে। মহারাজ পাণ্ডু স্বেচ্ছায় স্বয়ংবরসভায় গিয়ে কুন্তীকে বিবাহ করেছেন বলেই হোক্ বা বংশগরিমায় যাদবকূল গান্ধারকূল এবং কুরুকূলের নীচে বলেই হোক্ – এই বংশের ধ্বজাধারীরা যেন এই বিবাহে ঠিক খুশী নয় বলে তাঁর মনে হয়।

কিছু কথা যেন আলোচিত হয় যা তিনি সব জানতে পারেন না…..রম্ভার কাছে কিছু আভাস পান, নিজেও কিছু বোঝেন। বিচলিত হওয়া তাঁর স্বভাব নয় তাই বিচলিত হননা, ভাবেন ‘জীবন কবেই বা সহজ? সব মেনে নিয়ে সহজ হওয়ার প্রচেষ্টাই জীবন।’

ঠাকুর্মাতা সত্যবতী হয়তো বা কিঞ্চিৎ ব্যতিক্রম – তিনি কূল দেখেন না, গুণ দেখেন। তবে তিনি কুরু রাজপরিবারের জটিল রাজনীতিরই একজন, তার বাইরে নন। আর তাঁর পরম আজ্ঞাবহ হচ্ছেন তাত ভীষ্ম, যিনি জ্যেষ্ঠ হয়েও রাজসিংহাসন ছেড়ে অকৃতদার থাকার শপথ নিয়েছিলেন সত্যবতী-পুত্র বিচিত্রবীর্যের পথ নিষ্কণ্টক করতে। শপথ আর আনুগত্যের বিনিময়ে যিনি কুরুরাজসভায় তাঁর বিশেষ আসনটি পেয়েছেন।

আর আছেন তাত ভীষ্মের স্নেহচ্ছায়ায় পালিত, স্পষ্টবক্তা বিদুর – সখ্যে, জ্ঞানে, বুদ্ধিতে, বিশ্বাসে তিনি যে কখন কুন্তীর পরম নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছেন তা বোধহয় দুজনের কেউই বুঝে উঠতে পারেননি।

সেদিনও অপরাহ্ণে বিদুর সাক্ষাৎপ্রার্থী শুনে কুন্তী আগ্রহের সঙ্গে কক্ষে এসে বসলেন।

বিদুর অভিবাদন করে বসলেন, কিন্তু অন্যদিনের মতো সঙ্গে সঙ্গে কথা শুরু করলেন না – একটু যেন অন্যমনস্ক। কুন্তী হেসে বললেন – “আজ আমার মুখর দেবরের মুখে যে ‘রা’

নেই – ব্যাপার কি?”

বিদুর বললেন – “মহারাজ কাল এসে পৌঁছবেন, মদ্রদেশ থেকে সোজা হস্তিনাপুর ফিরছেন।”

“ভারী সুখবর” – কুন্তী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন।

বিদুর বললেন -“আমি তাত ভীষ্ম আর ভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে দেখা করে ফিরছি – মহারাজের অভ্যর্থনার জন্যে তোরণ তৈরী করতে হবে আজ রাতের মধ্যে….দিগ্বিজয় করে আসছেন মহারাজ পাণ্ডু। সব দেশ হস্তিনাপুরের প্রাধান্য মেনে নিয়েছে, উপঢৌকন দিয়েছে বিবিধ! আর মদ্ররাজ শল্য…..”

  • “মদ্ররাজ শল্য….কী?……তুমি কি কিছু বলতে দ্বিধা করছ, বিদুর?” উদ্বিগ্নস্বরে উচ্চারণ করলেন কুন্তী।
  • “মদ্ররাজ তাঁর ভগিনী মাদ্রীকে দান করেছেন, মহারাজ তাঁকে নিয়েই ফিরছেন।” মাথা নীচু করে বললেন বিদুর।

শীতল কঠিন স্তব্ধতা যেন গ্রাস করল দুজনকে। …..কয়েক মুহূর্ত মাত্র!

তারপরেই কুন্তী হেসে বললেন – “আমি অন্তঃপুরিকাদের তৈরী থাকতে বলব।”

বিদুর চমকে চোখ তুলে তাকালেন – “মহারাণি, আমি…..”

কুন্তী বললেন – “তুমি জানতে না আগে, আমি জানি বিদুর – তোমায় বলতে হবে না। আর জানলেই বা কী করতে পারতে তুমি বা কী করতে পারতাম আমি, বল?……কুরুবংশ তার যোগ্য কূলের রাণী আনছে, আমরা এ’ রাজ্যের প্রজা – আমাদেরও তো উৎসবে অংশ নিতে হবে!”

বিদুর বললেন – “মহারাণীর চোখে জল…..”

কুন্তী অঞ্চলপ্রান্তে চোখ মুছে নিয়ে আবার হাসলেন-“এ’ চোখের জলের খবর জানলে শুধু তুমি – আর যেন কেউ জানতে না পারে! কোনদিন যেন কেউ আর কুন্তীর চোখের জল দেখতে না পায়, তুমি এই প্রার্থনা কর বিদুর!”

বিদুর বললেন -“মহারাণি, আজ আপনার পরীক্ষা…সবদিক সামলে কর্তব্যের পথে যারা চলতে চায় হয়তো সারাজীবনটাই তাদের জন্য পরীক্ষা…সম্মুখের পথ দুর্গম…কিন্তু জয়ী যে হতেই হবে…হস্তিনাপুরের ভবিষ্যৎ কিন্তু আপনারই হাতে…..অন্য কেউ, সে যেই হোক না কেন, এই ভার নিতে পারবেনা…..কুরুকূলের ঔদ্ধত্য নয়, আপনার আদর্শ আর ধৈর্যই তৈরী করবে হস্তিনাপুর সিংহাসনের যোগ্য উত্তরসূরীকে….!”

কুন্তী ধীরপায়ে গিয়ে গবাক্ষে দাঁড়ালেন।

বিদুর বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

বেশ কিছুদিন হয়ে গেল, মহারাজ পাণ্ডু তাঁর দুই রাণীকে নিয়ে হস্তিনাপুর ছেড়ে বনমধ্যস্থ বিশ্রামবাটিকায় অবস্থান করছেন।পাণ্ডুর অনুপস্থিতিতে ধৃতরাষ্ট্র আনন্দের সঙ্গে রাজ্য চালাচ্ছেন।

যুদ্ধান্তে মাদ্রীকে নিয়ে রাজবাড়ীতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাকুর্মাতা সত্যবতী ‘বিশ্রাম’ নিতে আজ্ঞা দিয়েছিলেন – মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে যুদ্ধ ছাড়াও আরেকটি বড় কর্তব্য আছে এবং সেটি হল হস্তিনাপুরকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রদান করা!

কিন্তু মাসাধিক কাল গত হলেও সেই পূণ্যকর্মটি কোনো অজ্ঞাতকারণে এখনো সমাধা হয়নি, এদিকে হস্তিনাপুরে ফেরার ডাক এসেছে।

ইতিমধ্যে ঘটল অঘটন। মহারাজ পাণ্ডু শিকারজ্ঞানে ঋষি কিন্দমকে মিথুনরত অবস্থায় হত্যা করলেন এবং অভিশাপগ্রস্ত হলেন বলে জানা যায় – যার ফল স্বরূপ, পাণ্ডু স্ত্রী সঙ্গমে লিপ্ত হলেই হবে প্রাণনাশ!

অতএব, হস্তিনাপুরে ফিরে এসেই আবার বনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন পাণ্ডু, প্রায়শ্চিত্তের অভিপ্রায়ে। সঙ্গে রইলেন কুন্তী এবং মাদ্রী। রাজ্য রইল ধৃতরাষ্ট্রের হাতে, দীর্ঘদিনের জন্য। ইতিহাস মোড় নিল এখানেই।

হস্তিনাপুর শুধু পাণ্ডুর অপরাধ এবং প্রায়শ্চিত্তের ইচ্ছায় পুনশ্চ বনগমনটুকুই জানল, অভিশাপের কথা জানলেন কুন্তী এবং  মাদ্রী।

মহামন্ত্রী বিদুরের পরামর্শ মতো, তপোবন-অধ্যুষিত শতশৃঙ্গ পর্বতের নিকটস্থ বনে পাণ্ডুর বিশ্রামবাটিকা তৈরী হয়েছে।সেইখানেই দুই রাণী-সহ আশ্রয় নিয়েছেন বনবাসী পাণ্ডু।

সেইদিন প্রাতে মাদ্রী জল আনতে গেলে, পাণ্ডু এসে বসলেন কুন্তীর কাছে।

তারপর একটু ইতস্তত করে বললেন – “কুন্তী, তুমি তো জান আমার অক্ষমতার কথা। কিন্তু পুত্র আমার চাই – হস্তিনাপুরের উত্তরাধিকারী হবে পাণ্ডব, আর কেউ নয়। তুমি কিছু ব্যবস্থা কর।”

কুন্তী বললেন – “কিইবা ব্যবস্থা করব?….আপনি মাদ্রীকে বলেছেন?”

পাণ্ডু বললেন – “মাদ্রী ছেলেমানুষ, আমি যা বলব সে তাই করবে।কিন্তু ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে – তোমার বুদ্ধি দিয়ে তুমি নিশ্চিত একটা উপায় বার করতে পারবে, মহারাণি!”

কুন্তী একটু হেসে বললেন -“মহারাজ নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে এটা প্রাচীন বৈদিক যুগ নয় – নারী আজ অন্তঃপুরে বন্দী, পুরুষের শাসনাধীন। পুরুষ যেদিন থেকে নারীর ভাগ্য নির্ধারণ করার নির্ণয় নিয়েছে, সেদিন থেকে নারীর স্বাধীনতা লুপ্ত হয়েছে- ক্ষেত্রজ সন্তান এখন সমাজে আর গ্রহণীয় নয়।”

পাণ্ডু বললেন – “কুন্তী, এই বনে কে কার সন্তান সেকথা জানবে শুধু পাখি আর গাছগাছালিরা – তুমি কেন চিন্তা করছ?”

কুন্তী বললেন – “চিন্তা করছি, কারণ আপনি যা চাইছেন তা সহজ নয়।….আপনি শুধু পুত্রই চান, কন্যা নয়। আর ক্ষেত্রজ সঙ্গমের সংখ্যা শাস্ত্রে বেঁধে দেওয়া আছে। বারবার এই নিয়োগপ্রথা অবলম্বন করা সম্ভব নয়। প্রতিটি মিলনেই পুত্র ধারণ করার একটি উপায় আমি জানি, কিন্তু….”

ব্যাকুল পাণ্ডু কুন্তীকে থামিয়ে দিয়ে বললেন -“আর কোনো কিন্তু নয়! তোমার যদি সে উপায় জানা থাকে, তবে তুমি মাদ্রীকেও শিখিয়ে দাও সেই গুপ্ত পন্থা। আর তারপর তোমরা দুজনে মিলে আমাকে উপহার দাও পুত্রসন্তান।”

ধীরস্বরে কুন্তী বললেন – “ধৈর্য ধরুন মহারাজ! যে গুপ্তপন্থা আমার জানা আছে, তা’ গুপ্ত এবং শুধু আমারই। সেই পন্থা কাউকে শিখিয়ে দেওয়ার নয়।….আর ক্ষেত্রজ সন্তানই যদি আপনার অভিপ্রেত হয় তবে সেই সন্তানের বীজ চয়ন করব আমি নিজের ইচ্ছা অনুসারে, নির্দিষ্ট তিথিতে – তবেই আপনি পুত্রসন্তান লাভ করবেন, নচেৎ নয়।”

ব্যাকুল পাণ্ডু বললেন – “তাই কর, কিন্তু যা করবে দ্রুত কর।”

কুটির থেকে বেরিয়ে মাদ্রীর খোঁজে চললেন পাণ্ডু।

কুন্তী বসে চিন্তা করতে লাগলেন – পরামর্শের জন্য বিদুরকে চাই।

দিনদুয়েক বাদে নদী থেকে জল আনতে যাচ্ছিলেন কুন্তী, পথে দেখা হল পাণ্ডুর সাথে – চিন্তিত মুখে এক বৃক্ষতলে বসে তিনি যেন কুন্তীরই অপেক্ষায় ছিলেন।

গতকাল হস্তিনাপুরের রথ এসেছিল রাজবাড়ীর বার্তা নিয়ে, ফেরত গেছে বনের সমাচার নিয়ে।

ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে দাসীপুত্র যুযুৎসু ছাড়াও, গান্ধারী জন্ম দিয়েছেন এক কন্যার – দুঃশলা।

ঠাকুর্মাতা সত্যবতী ব্যাকুল হয়ে আছেন সস্ত্রীক পাণ্ডুর বিরহে, অপেক্ষায় আছেন কবে জন্ম নেবে কুরুবংশের উত্তরাধিকারী।

কুন্তীকে দেখে পাণ্ডু বললেন -“কুন্তী, আর তো দেরী করা চলেনা!….সিংহাসনের উত্তরাধিকারী দিতেই হবে….যে আমার নাম বহন করে নিয়ে যাবে ইতিহাসের পাতায়…..পাণ্ডব! তুমি তো সব জান…..কবে সেই দিন আসবে বল! আমার হাতে আর সময় নেই কুন্তী……”

কুন্তী বললেন -“আমার ওপর ভরসা রাখুন মহারাজ! আমি কাল সারথির হাতে বিদুরকে চিঠি পাঠিয়েছি, তাকে এখানে আসতে বলেছি। সে কয়েকদিনের মধ্যেই এসে পৌঁছবে – তার সঙ্গে পরামর্শ করে এগোনোই ভালো। বিদুরের চেয়ে বড় শুভাকাঙ্খী আমাদের আর কেউ নেই, তার চেয়ে মহৎ চরিত্রও এ’ রাজ্যে পাওয়া মুস্কিল – মহাঋষি বেদব্যাসের অনন্য সৃষ্টি বিদুর, তাকে দিয়েই হবে শুভসূচনা।…শতশৃঙ্গ পর্বত আর এই বন, শ্রেষ্ঠ থেকে শ্রেষ্ঠতম ঋষিদের পাদস্পর্শে ধন্য – তাঁরা কেউ বলশালী, কেউ কৌশলী, কেউ বা রূপবান। তাঁদের আশ্রম দূরে হলেও, খুব দূরে নয়। তাঁদের আশীর্বাদ নিয়েই জন্ম হবে আপনার পুত্রসন্তানদের।….হস্তিনাপুরের যোগ্য উত্তরসূরী আমি দিয়ে যাব মহারাজ – কুরুকূল এবং আপনার কাছে এ’ আমার অঙ্গীকার।”

সেই উদ্ধতশির, অভিমানী পাণ্ডু এখন অতীতের স্মৃতি। সর্বঅর্থে তিনি এখন পরনির্ভরশীল।

শুধু অসহায় চোখে একবার কুন্তীর দিকে তাকালেন তিনি -“আর মাদ্রী?….আমি জানি যে সে তোমার সঙ্গে প্রতিকূল ব্যবহার করেছে…..আমি জানি যে সে তোমার বংশকে গবাদি পশুর পালক বলেছে…কিন্তু তোমার মন অনেক বড়ো কুন্তী….তুমি চাইলে তবেই সে মা হতে পারবে….! ”

কুন্তীর ঠোঁটে একটু মৃদু হাসি ভেসে উঠে মিলিয়ে গেল -“মহারাজ, মাদ্রীকে যখন আমি আমার জীবনের সবকিছুরই ভাগ দিয়েছি, তখন সন্তানসুখ থেকে তাকে আমি বঞ্চিত করব বলে কি আপনার মনে হয়? আমি বড়ো, সে ছোট। আমার অধিকার আমি পাব, তার অধিকার সে পাবে – এর অন্যথা হবে না। …আপনি অযথা চিন্তায় স্বাস্থ্যহানি করবেন না, আমার ওপর যখন ভার দিয়েছেন তখন নিশ্চিন্ত থাকুন! উপযুক্ত বীজ থেকেই জন্মায় মহীরুহ – আমিই খুঁজে আনব উপযুক্ত বীজ। অচিরেই আপনার ঘর আলো করে আসবে পাণ্ডব – আমি তাদের বড় করে তুলব নিজের হাতে, কুরুকূলের বীরত্বের সঙ্গে তাদের শেখাব যাদবকূলের নম্রতা, ধৈর্য আর বিনয়। এদের নাম লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায় – চন্দ্রবংশীয় কুরুকূলোদ্ভব বলে নয়, সর্বগুণসম্পন্ন দেবপ্রিয় পাণ্ডব বলে। তারা শুধু অস্ত্র দিয়ে রাজ্য জয় করবে না, বুদ্ধি দিয়ে হৃদয় জয় করবে!….আপনি শুধু দর্শক হয়ে অপেক্ষায় থাকুন।”

কুন্তী কলস তুলে দৃঢ় পায়ে নদীর দিকে হাঁটা দিলেন, পাণ্ডু নীরবে তাকিয়ে রইলেন কুন্তীর গমনপথের দিকে।

বিদুর যথাসময়ে এসে পৌঁছলেন বনে। পাণ্ডু এবং মাদ্রীর সাথে দেখা হল বনপথে। অভিবাদন এবং কুশল বিনিময় করে বিদুর এলেন বনমধ্যস্থ কুটিরে, যেখানে একাকিনী কুন্তী তাঁর অপেক্ষায় বসে আছেন।

রূপবতী, বুদ্ধিমতী, বিদুরের সখী, কুন্তী। যিনি বিদুরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বনস্থ অতিথিশালায় পাঁচদিন থেকে যাওয়ার জন্য।

শুধু সেই একবারই না, কুন্তীর ডাকে সাড়া দিয়ে বনের আবাসে বারবার এসেছেন বিদুর। যাতায়াতের পথে শতশৃঙ্গ পর্বতের মহাঋষিদের আশ্রমে থেমে গেছেন, আবাহন করেছেন তাঁদের বনস্থ কুটিরে।

কুন্তী জন্ম দিয়েছেন যুধিষ্ঠিরের – ধর্মপালনে যে বিদুরের প্রতিচ্ছবি।

এক এক করে এসেছে বলশালী ভীম, প্রিয়দর্শী অর্জুন – একেকজন একেক গুণের আধার, যেন বীজ বেছে বেছে ফোটানো ফুল।

তারপর এল মাদ্রীর পালা – দু’টি সন্তানের মা হলেন তিনি। নকুল এবং সহদেবও গুণে এবং বীরত্বে কম না, কিন্তু যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুনের সমকক্ষ নয় – না সংখ্যায়, না গুণের তুলনায়।

মাদ্রীপুত্রদের জন্য ছিল কনিষ্ঠের আদর, কুন্তীপুত্রদের জন্য ছিল জ্যেষ্ঠের অগ্রভাগ – জগৎ।

পাণ্ডুপুত্র – পাণ্ডব। পঞ্চপাণ্ডব। পাণ্ডু খালি পুত্রই চান – কন্যা নয়। আর কুন্তীই পারেন তাঁর এই ইচ্ছা পূরণ করতে। কুন্তীই নির্ধারণ করেন তিথি এবং বীজ, তিনিই করেন আবাহনের ব্যবস্থা।…

পাণ্ডু আবার এসে বসলেন কুন্তীর কাছে -“কুন্তী, ভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্রের এত পুত্র! পাণ্ডুপুত্র কেন কেবল পাঁচজন হবে?…কুন্তী, তুমি আবার আবাহন কর সুন্দর বীজের – আরও পুত্র দাও আমাকে।”

কুন্তী দৃঢ়স্বরে বললেন – “তা হয় না, মহারাজ। ধর্মে বারণ আছে। তিনবারের অধিক বীজ আবাহন করে আমি স্বৈরিণী নাম নিতে পারব না। আপনি বললেও না।”

পাণ্ডু ক্ষীণস্বরে বললেন – “কিন্তু মাদ্রী? তার তো শুধু দুই পুত্র…..সে কেন….”

তাঁকে থামিয়ে দিয়ে কুন্তী বললেন- “দুই সন্তানই যথেষ্ট তার জন্য, মহারাজ। সে বনপথে আনন্দে ঘুরে বেড়ায়, পাঁচ সন্তানকে মানুষ করি আমি।…আর শত দুঃশীল পুত্রের চেয়ে পাঁচ সুশীল পুত্র হাজারগুণে শ্রেয়। আমি এদের সর্বশ্রেষ্ঠ চন্দ্রবংশীয় রাজকুমার বানিয়ে তুলব – পাঁচ আঙুলের শক্ত মুঠি। আর পুত্রে কাজ নেই।”

পাণ্ডু আর কিছু বলতে পারলেন না।

কুরুকূলে যখন তৈরী হচ্ছে এক যুগান্তকারী নাটকের প্রেক্ষাপট, ঠিক তখনই হস্তিনাপুর থেকে কিছু দূরে অবস্থিত মথুরাপ্রদেশ তৈরী হচ্ছে সেই নাটকের মহানায়ককে অভ্যর্থনা করার জন্যে। বলা বাহূল্য যে সেই মহানায়ক আর কেউ নন, বসুদেবপুত্র যাদবকূলশিরোমণি ষোড়শগুণসম্পন্ন বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ — কুন্তীর ভ্রাতুষ্পুত্র।

পৃথাকে যেদিন শুরসেনা দান করেছিলেন কুন্তীভোজের কাছে, সেইদিন থেকে আজ পর্যন্ত যমুনা নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে।

বসুদেব স্ত্রী দেবকীসহ কারাগারে বন্দী হয়েছেন, শ্যালক কংসের হাতে।

অত্যাচারী পরাক্রমশালী কংসের হাতে এসেছে ক্ষমতা, কারাগারে বন্দী হয়েছেন কংসের পিতা উগ্রসেন। বসুদেব এবং দেবকীর সদ্যোজাত সন্তানদের একে একে হত্যা করেছে কংস…কিন্তু পারেনি হত্যা করতে শ্রীকৃষ্ণকে, যার হাত থেকে বাঁচার জন্য কংসের এতো পরিকল্পনা!

অতএব, যথা সময়ে, ভবিষ্যৎবাণী সত্য করে, শ্রীকৃষ্ণ অত্যাচারী কংসের হাত থেকে মথুরাবাসীকে উদ্ধার করলেন- মুক্ত করলেন মাতামহ উগ্রসেনকে, পিতা বসুদেবকে এবং মাতা দেবকীকে।

বৃন্দাবনকে কাঁদিয়ে, বাঁশী ছেড়ে, বলরামসহ শ্রীকৃষ্ণ গমন করলেন উজ্জয়িনী – গুরুগৃহে শিক্ষালাভের জন্য।

ইতিমধ্যে কুন্তীও তাঁর প্রতিশ্রুতি পালন করে পাণ্ডুকে উপহার দিলেন পাঁচটি পুত্রসন্তান।

হস্তিনাপুরে গান্ধারীও জন্ম দিলেন পুত্রের – কিন্তু জ্যেষ্ঠ কৌন্তেয় যুধিষ্ঠির জন্ম নিলেন গান্ধারীর জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্যোধনের আগে!

পাণ্ডু এতে যারপরনাই আনন্দিত – কুন্তী তাঁকে এনে দিয়েছেন ভাগ্যের দান……সিংহাসনের উত্তরাধিকারী! নিশ্চিন্ত তিনি- এত নিশ্চিন্তে যেন বহুদিন সময় কাটাননি মহারাজ পাণ্ডু।…

তিনি যে ভাগ্যবতী, এ’ কথা কুন্তী বহুবার শুনেছেন।

ভাগ্য তাঁর হাত ধরে এসেছিল শুরসেনা মহাজনপদে, সুখ-শান্তি-ঐশ্বর্যে ভরে উঠেছিল জনপদ। ভাগ্য এসেছিল কুন্তীরাজ্যে- মহারাজ কুন্তীভোজ বলেন যে কুন্তীর চরণস্পর্শেই তাঁর রাজপ্রাসাদ শিশুর কলকাকলিতে মুখর হতে পেরেছে। আর আজ কৃতজ্ঞ পাণ্ডুও একই কথা বলেন – কুন্তীই তাঁকে এনে দিয়েছেন সিংহাসনের উত্তরাধিকারী, দিয়েছেন পাঁচ পুত্র!

তবু কোথায় যেন সৌভাগ্যের গোলাপের সঙ্গে তিক্ততার কাঁটা ফুটে থাকে – যাঁদের কুন্তী সৌভাগ্য এনে দিয়েছেন, তাঁরা তাঁকে কি দিয়েছেন?…পিতা শুরসেনা তাঁকে দান করে দিয়েছিলেন পরাক্রান্ত জ্ঞাতিভাইকে খুশী রাখতে। মহারাজ কুন্তীভোজ তাঁর সৌকুমার্যকে শুধু ব্যবহার করেছেন ঋষিসেবায়। আর স্বামী পাণ্ডু? কুন্তীর বিবাহের চেলি গায়ের থেকে নামার আগেই তিনি পাড়ি দিয়েছেন উচ্চবংশের রাজকন্যাকে বিবাহ করে আনতে।…পাণ্ডু আর মাদ্রীর এই অর্থহীন লাস্যময় দিনযাপনের মাঝে কুন্তীর জন্য আজও কোন আসন পাতা আছে কি? পাণ্ডুর হাতে জীবনের ভার ছেড়ে দিলে বঞ্চনা ছাড়া কুন্তী কি আর কিছু পাবেন? কে জানে নারীমোহে মত্ত পাণ্ডু একদিন তাঁর পুত্রদের সরিয়ে মাদ্রীর পুত্রদের অগ্রাধিকার দেবেন কিনা! পাণ্ডুর কাছে কি তিনি পক্ষপাতহীন জ্যেষ্ঠের অধিকার আশা করতে পারেন?…তারপরেই ভাবেন, না – কেউ তাঁকে কিছু দেবে এই আশায় তিনি থাকবেন না। নিজের পথ নিজেকেই তৈরী করতে হয় এবং হবে।…

সৌভাগ্যবতী পৃথা, সর্বজয়ী পৃথা…..কিন্তু বিনাযুদ্ধে কোনো জয় তার হাতে আসবেনা…..এমন কি একটা যেন বলেছিলেন মথুরার জ্যোতিষ!

কুন্তীর মনে তাই অনেক চিন্তার জাল। তিনি ভাল করে জানেন কুরু রাজপ্রাসাদ এবং কুরুবংশের রাজনীতিকে। তিনি জানেন যে ক্ষেত্রজ পুত্র সমাজে প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। তিনি জানেন যে তাঁর ক্ষেত্রজ পুত্রের সিংহাসন লাভের আশা দুরাশা না হলেও, পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। পুত্রদের গুণ ও যোগ্যতার ওপরেই নির্ভর করবে তাদের ভবিষ্যৎ – তাদের গড়ে তুলতে হবে কুরু ঔদ্ধত্যের ঠিক বিপরীত মেরুতে। তাদের জীবনের প্রথম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বছরকে ভরে তুলতে হবে চরিত্রগঠনের কাজে, কুরুকূলের সব প্রভাবের বাইরে রেখে। তারপর আসবে রাজকূলের শিক্ষা – ক্ষাত্রতেজ আর রাজনীতি।

কুরুকূলের দরকার শুধু উত্তরাধিকারী, কিন্তু কুন্তী চান মানুষ গড়তে – যে মানুষ উত্তরাধিকারের যোগ্য।

কুন্তী তাই শুধু পুত্রের জন্ম দিয়েই ক্ষান্ত নন। পাণ্ডু আর মাদ্রী ঘুরে বেড়ান বনে বনে। আর কুন্তী ছেলেদের শেখান সহবত, ধৈর্য; শোনান ধর্মের কথা।

বিদুর দেখা করতে আসেন প্রায়ই, কুন্তী তাঁকে বলেন ছেলেদের নীতিশিক্ষা দিতে।

সেদিনও  রন্ধনশেষে কুন্তী গাছের তলায় বসে পঞ্চপাণ্ডবকে গল্প বলছিলেন।

গল্প শেষ হলে, যুধিষ্ঠির বললেন – “মা, তুমি শিখিয়েছ যে গুরুজনদের সম্মান দিতে হয় আর কনিষ্ঠদের স্নেহ। তবে বিদুর কাকা আমাকে ‘প্রণাম যুবরাজ’ বলে সম্বোধন করেন কেন? উনি তো আমার পিতার সমান – আমার খারাপ লাগে।”

কুন্তী বললেন – “তুমি কেন ওনাকে জিজ্ঞেস কর না?”

যুধিষ্ঠির বললেন-“করেছিলাম, উনি বললেন যে ‘যার যার নিজের স্থান সদাসর্বদা খেয়াল রেখে চলতে হয়, অন্যথায় সর্বনাশ হতে পারে। দাসীপুত্রকে দাসীপুত্রের জায়গায় থাকতে হয়, যুবরাজকে যুবরাজের

জায়গায়।’ “

কুন্তী বললেন – “তোমাদের বিদুর কাকার মতো জ্ঞানী ব্যক্তি দাসীপুত্র না রাণীপুত্র – এ’ প্রশ্ন তো ওঠাই উচিত নয়…..কারণ মানুষের পরিচয় জন্মে নয়, কর্মে। কিন্তু তবুও সংসারে নানা কথা ওঠে। তাই নিজের জায়গা সবার বুঝে চলা উচিত, গণ্ডী না পেরোনোই ভালো।”

অর্জুন বললেন – “ভ্রাতাশ্রী কি হস্তিনাপুরের যুবরাজ?”

কুন্তী হেসে বললেন-“মহারাজ পাণ্ডু যদি হন হস্তিনাপুরের রাজা, আর যুধিষ্ঠির যদি হয় তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র – তাহলে যুবরাজ কে হল, বল?”

অর্জুন বললেন-“তাহলে আমরা হস্তিনাপুরে যাচ্ছি না কেন? ওখানে গেলে আমি তীর ধনুক চালাতে শিখব – এখানে তো কেউ নেই আমাকে শেখানোর।”

ভীম বললেন – “রোজ কতো ভালো রান্না খেতে পারব, রোজ ক্ষীর খেতে পারব – চল না, মা, হস্তিনাপুর যাই আমরা সবাই!”

কুন্তী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন – “সময় হলেই যাব। ধৈর্য ধর। জীবন তার নিজের গতিতে আর ঈশ্বরের নিয়মে চলে – তোমার আমার ইচ্ছেতে সেই পথ তো পাল্টাবে না, তাই জীবনের পথ পাল্টাতে চেয়ে অশান্তি ডেকে আনতে নেই।…..জীবনে যখন যে অবস্থাতেই পড় না কেন, ভাগ্যকে মেনে নেবে আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, অপেক্ষায় থাকবে দিনবদলের। আজ আমাদের বনবাসের সময়, তাই বনবাসই আমাদের শ্রেয়। এখানকার খাদ্যই আমাদের শ্রেয়।….প্রকৃতির থেকেও কতকিছু শেখার আছে – সেইসব শিখে নাও, পরে আর সুযোগ নাও পেতে পার। মাটির থেকে সহ্য করতে শেখ, গাছের থেকে ছায়া দিতে শেখ, নদীর থেকে শেখ আনন্দে বয়ে যেতে। তারপর যখন হস্তিনাপুর যাওয়ার সময় আসবে – তখন সেখানে যাবে, সেখানকার খাদ্য খাবে আর সেখানকার শিক্ষা নেবে।”

পাঁচভাইও উঠে দাঁড়াল, কুন্তীর পিছনে পিছনে কুটিরে প্রবেশ করল।

আজ বহুদিন পরে, কুন্তী আমন্ত্রণ জানালেন ভ্রাতা বসুদেবকে তাঁদের অরণ্যস্থিত বাসগৃহে। এতদিনে বুঝি সময় হল ভাইবোনে মিলিত হওয়ার! কত কথা বলার আছে, আছে কত কী শোনার!….

বসুদেবের রথ এসে থামল কুন্তীর দোরগোড়ায়, ভাই-বোনে মিলন হল।

কিন্তু, ভাগ্যের খেলায় ইতিহাস আবার মোড় নিল! ….কিম্বা হয়তো সবটাই ভাগ্যের খেলা নয়!

যে যুগে সহমরণ প্রথা শুরুই হয়নি ভারতবর্ষে, যে বংশে কোনো বিধবা নারী কোনদিন স্বামীর চিতায় ওঠেননি, সেই যুগে কুরুকূলের মাদ্রীর সহমরণ কেমন যেন চমকে দেয় পাঠককে। ঋষি কিন্দমের অভিশাপই যদি কারণ হয়, তবে তো সঙ্গমরত অবস্থায় পাণ্ডু ও মাদ্রী দু’জনেরই একসাথে মৃত্যু হওয়ার কথা – সহমরণের প্রয়োজন কি?…এর উত্তর মেলেনি। রক্ষকহীন বনবাসে সেই যুগল মৃত্যু তাই রহস্যে ঘেরা হয়েই থেকে গেল – হস্তিনাপুরের কাছেও আর মাদ্রীর ভ্রাতা শল্যের কাছেও। তাই কি মাতা অম্বালিকা কুন্তীর হস্তিনাপুর আগমনের পর, কুন্তীর কাছে পাণ্ডুর মৃত্যুর জন্য উত্তর দাবী করেছিলেন? তাই কি মহারাজ শল্য কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে পাণ্ডবের বিপক্ষে, দুর্যোধনের হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন?….

সত্য যাই হোক্, মহাভারত বলে শ্বেতবস্ত্রপরিহিতা কুন্তী বালক পঞ্চপাণ্ডবকে নিয়ে পাণ্ডু আর মাদ্রীর চিতা সাজালেন আত্মীয় পরিজনহীন সেই নির্জন বনে – সঙ্গে শুধু বসুদেব!

পাণ্ডুর সৎকার ক্রিয়াদি সম্পন্ন হওয়ার পর, বসুদেব ফিরে গেলেন মথুরায়।

শতশৃঙ্গ পর্বতের ঋষিবৃন্দ কুন্তী এবং পাণ্ডবদের নিয়ে রওয়ানা হলেন হস্তিনাপুরের পথে।

যাঁদের আশীর্বাদে পাণ্ডবের জন্ম, তাঁরা ছাড়া আর কে যাবেন হস্তিনাপুরে পাণ্ডবের ‘পাণ্ডবত্ত্বের’ প্রমাণ দাখিল করতে? পাণ্ডুর বনবাস এবং সন্তানদের নিয়ে যে নানা কথা আলোচিত হয় হস্তিনাপুরে, কুন্তী সে’ খবর পেয়েছেন। ধৃতরাষ্ট্রের কুটিল বুদ্ধি এবং রাজনীতির কথাও জানতেন কুন্তী। কিন্তু, তার সঙ্গে এটাও তাঁর জানা ছিল যে মহামান্য ঋষিদের কথা হস্তিনাপুর ঠেলতে পারবে না, তাত ভীষ্ম ঠেলতে দেবেন না।

অতএব বনবাসের দিন শেষ – এবারে হস্তিনাপুরের উত্তরসূরীদের হস্তিনাপুরে নিয়ে যেতে হবে। বনচারী বালকদের দিতে হবে রাজকূলের এবং রাজনীতির শিক্ষা। অতীত পড়ে রইল পিছনে – মাতা কুন্তী দৃঢ় হাতে ধরলেন হাল, ভবিষ্যতের গন্তব্য অভিমুখে।

 

৪  রাজনীতি

প্রাসাদের এক প্রান্তে এখন কুন্তীর বাস, পঞ্চপাণ্ডবকে নিয়ে।

ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারী থাকেন রাজমহলে – যেখানে আগে থাকতেন পাণ্ডু এবং কুন্তী।

এই প্রাসাদ এখন কুন্তীর কাছে অজানা এক ফাঁদ।

রম্ভা নিজের সংসারে, কেউ এমন নেই যে তাঁকে অন্দরমহলের খবর এনে দেবে।

কিছুদিন আগে রম্ভা একবার দেখা করতে এসেছিল, কুন্তী তাকে বলেছেন যে সে যেন তার স্বামীর মারফত মথুরায় খবর পাঠায় – বসুদেব বা শ্রীকৃষ্ণ, কেউ একজন যেন হস্তিনাপুরে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। চিঠি দিয়েছেন তিনি রম্ভার হাতে।

যদিও জানেন যে কৃষ্ণ এখন অতি ব্যস্ত….ধর্মের সঙ্গে অধর্মের লড়াই চিরকালের, এবং সে লড়াই সুদীর্ঘ….ধর্মের জয় যেমন  সুনিশ্চিত, তেমনই সুকঠিন সেই জয়ের পথ!

জরাসন্ধের সঙ্গে শেষ যুদ্ধ এখনো বাকী – কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ ভাবছেন মানুষের কথা, যুদ্ধক্লান্ত নাগরিকদের কথা…..! তিনি তো কংস বা জরাসন্ধ নন, তিনি যে মোহন বাঁশীরও বাদক! শুধু যুদ্ধ নয়, তিনি যে সত্যম শিবম সুন্দরম তিনেরই পূজারী! তাই তিনি ভাবছেন যাদবকূলের কথা, ভাবছেন মথুরা থেকে যাদবকূলকে নিয়ে দ্বারকায় সরে যাওয়ার কথা।

কুন্তী জানেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের জন্য অনেক কাজ অপেক্ষা করে আছে; তবে তিনি এও জানেন যে শ্রীকৃষ্ণ হস্তিনাপুরকে  উপেক্ষা করবেন না, কুন্তীর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি আসবেনই!

ভীমকে যেদিন বিষপান করানো হয়েছিল, সেদিনের কথা ভাবলে কুন্তী আজো শিউরে ওঠেন।

সেদিনই তিনি হস্তিনাপুর ছাড়ার আর্জি পাঠিয়েছিলেন তাত ভীষ্মের কাছে, বিদুরের মারফত। আর কার কাছে যাবেন? সিংহাসনে আসীন অন্ধ রাজা তো ন্যায়দানে অক্ষম!

ভীষ্ম কিন্তু সেই আর্জি শুনলেন না – পাণ্ডবদের ছেড়ে দিতে তিনি নারাজ! তাত ভীষ্ম কথা দিলেন যে তিনি মহারাজের সঙ্গে  কথা বলবেন যাতে কুন্তী এবং পাণ্ডবের নিরাপত্তা ব্যাহত না হয়।

যদিও সেই ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি হয়নি, কিন্তু ভয় তো যায় না! প্রতিপদে শঙ্কা, প্রতিক্ষণে শত্রুতার আঁচ!

দুর্যোধন বড়ো হয়ে উঠেছে অন্ধ পিতার অভিযোগ, আর সিংহাসন হারানোর বেদনার কথা শুনে।

গান্ধারী অনেক বুঝিয়েছেন ধৃতরাষ্ট্রকে, অনেকবার বলেছেন নাবালক পুত্রদের সামনে এই আলোচনা না করতে – কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি।

তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাতুল শকুনির অধর্মাচরণের শিক্ষা।

শকুনি মনে করেন যে গান্ধারীর সঙ্গে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের বিবাহ দেওয়াটা ভীষ্ম তথা কুরুকূলের অন্যায় হয়েছিল এবং এই অন্যায়ের একমাত্র প্রতিকার হবে গান্ধারীর জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্যোধন সিংহাসনে বসলে – যেন তেন প্রকারেণ। অতএব গান্ধার ছেড়ে তিনি হস্তিনাপুরে বসে আছেন দুর্যোধনের রাজ্যাভিষেক দেখবেন বলে।

দুর্যোধন স্বভাবত কলহপ্রিয় এবং জটিল মনের অধিকারী।

তদুপরি পিতা এবং মাতুলের যৌথ প্রভাবে তার মনে বেড়ে উঠেছে বিষবৃক্ষ – তাতে শুধু ফল ধরার অপেক্ষা।

কুন্তী ছেলেদের বারবার বুঝিয়েছেন – নম্র হয়ে, সতর্ক হয়ে, দিন কিনে নেওয়া ছাড়া যখন আর উপায় নেই তখন তারা যেন ক্রোধ সম্বরণ করে। তাদের জীবনের লক্ষ্য অনেক বড় – ক্ষুদ্র আবেগের বশবর্তী হয়ে যেন তারা সেই পথ থেকে সরে না যায়। ভুলেও যেন তারা আর কোন ফাঁদে পা না দ্যায়! নিজেদের যেন তৈরী করে তারা জীবনের মহাযুদ্ধের জন্যে।  ধীর-স্থির জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যুধিষ্ঠিরকে যেন তারা বিনাপ্রশ্নে অনুসরণ করে!

মহামন্ত্রী বিদুর যুধিষ্ঠিরকে তৈরী করছেন ভবিষ্যতের জন্য।

তিনি কিশোর যুধিষ্ঠিরকে “প্রণাম যুবরাজ” ছাড়া সম্বোধন করেন না, এবং সদাসর্বদা উপদেশ দেন সাহসের সঙ্গে দুর্যোধনের  মুখোমুখি হতে। পৃথিবী শুধু সততায় পরিপূর্ণ নয় — হস্তিনাপুরের যুবরাজকে শুধু ধার্মিক এবং সৎ হলেই চলবে না, তাকে অন্যায় এবং অধর্মকে চেনার এবং মোকাবিলা করার শক্তি রাখতে হবে, অধর্মকে হারিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে জানতে হবে।

দুর্যোধনের দুরভিসন্ধি সদাসর্বদাই প্রকট। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র অবশ্য চতুর রাজনীতিবিদ এবং তাঁর মনের কথা বোঝা অত সহজ নয়। গান্ধারীকেও তিনি বলেননি তাঁর মনের কথা, তিনি শুধু যুবরাজ ঘোষণার দিনক্ষণ পেছিয়ে যাচ্ছেন আর আশায় আছেন যে  কোনো না কোনভাবে তাঁর পুত্র দুর্যোধনই শেষপর্যন্ত বসবে সিংহাসনে। শকুনি শুধুই একের পর এক ষড়যন্ত্রের জাল ফেলে যাচ্ছেন। আর বিদুর হয়ে আছেন সদাসতর্ক – পাণ্ডবকে ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচাতে।

… চাপা ক্রোধ বেড়ে চলল দুপক্ষের, অপেক্ষা শুধু একটা চরম মুহূর্তের! আর সেই চাপা আগুনের বহিঃপ্রকাশ ঘটল শস্ত্র শিক্ষান্তে আয়োজিত ক্রীড়াপ্রাঙ্গণে শস্ত্রশিক্ষা প্রদর্শনের দিন।

কুন্তীর মহলে আরতির থালা রক্ষিত।

অস্ত্রে, বর্মে সজ্জিত হয়ে পঞ্চপাণ্ডব এক এক করে এসে কুন্তীর পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন। কুন্তী মস্তক ছুঁয়ে চুম্বন করলেন, বিজয়ী হওয়ার আশীর্বাদ দিলেন।

কুন্তীর মনে পড়ল বিদুরের কথা…..দুদিন আগেই এসেছিলেন দেখা করতে……বারবার বলে গেছেন- “যুধিষ্ঠির এবং পাণ্ডবের কাছে এটি একটি বড় সুযোগ – সভাপরিষদ এবং রাজ্যবাসীদের দেখিয়ে দেওয়ার যে তারা শক্তি, সাহস, বীর্য এবং শস্ত্রপরীক্ষায় সর্বশ্রেষ্ঠ! যুধিষ্ঠির শুধু বয়সে জ্যেষ্ঠ নয়, জ্ঞানে-বিচারে-ব্যবহারেও শ্রেষ্ঠ! অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কর্তব্য রাজমুকুট যুবক যুধিষ্ঠিরের মাথায় পরিয়ে সিংহাসন ছেড়ে দেওয়া! ওনার কাজ ছিল মহারাজ পাণ্ডুর শূণ্যস্থানে কিছুদিনের জন্য রাজ্য চালানো – চিরদিনের জন্য নয়! সেই কাজ অনেকদিন শেষ হয়েছে – আর কিসের দেরী?”

আজ সেই পরীক্ষার দিন! পরীক্ষা তো শুধু পাণ্ডবের নয়, পরীক্ষা যেন কুন্তীরও – তাঁর ধৈর্য, সহনশীলতা, অনাথ পাঁচপুত্রের লালনপালন……তাঁর ব্যক্তিগত শিক্ষা…..সব, সবকিছুর পরীক্ষা আজ!

ক্রীড়াঙ্গণ লোকে পরিপূর্ণ। রাজপুত্রদের শস্ত্রশিক্ষার প্রদর্শনীতে সভাসদরা ছাড়াও এসেছে আরও দর্শক। আছেন গুরু কৃপাচার্য, গুরু দ্রোণাচার্য, গুরুপুত্র অশ্বত্থামা, তাত ভীষ্ম, মহামন্ত্রী বিদুর।

বিশেষ আসনে বসে আছেন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, মহারাণী গান্ধারী, শ্বেতবস্ত্রপরিহিতা প্রাক্তন মহারাণী কুন্তী।

কুন্তী ধীরস্বরে ক্রীড়ার বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন।

“এবারে প্রিয় দুর্যোধন আর ভীম আসছে – গদাযুদ্ধের ক্রীড়া!” বললেন কুন্তী।

গান্ধারী হেসে বললেন-“দু’জনেই কুশলী, দুজনেই একই গুরুর শিষ্য, দুজনেই আমার বড় প্রিয় – এ’ খেলার আর হারজিত কি, কুন্তী?”

কুন্তী কিন্তু সে হাসিতে যোগ দিতে পারলেন না। তিনি দেখছেন দুর্যোধনের হিংস্র দৃষ্টি আর ভীমের ক্রুদ্ধ মুখ – এরা কি ভুলে গেছে যে এটা ক্রীড়াপ্রদর্শনী মাত্র, যুদ্ধ নয়?……..চোখের নিমিষে ক্রীড়া হয়ে উঠল প্রাণঘাতী, মনে হতে লাগল যে একজন যেন আরেকজনের রক্তদর্শন না করে থামবে না!

কুন্তী মহারাজের কাছে খেলা থামানোর আর্জি করতে যাচ্ছিলেন – এমনসময় অশ্বথ্থামা এসে দুজনের মাঝে দাঁড়ালেন, বন্ধ হল ক্রীড়া! কুন্তী নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলেন।

এর পর আসছেন অর্জুন – ধনুর্বিদ্যার পারদর্শিতা দেখাতে। কৌরবদের শত ভাইয়ের কেউই ধনুর্বিদ্যায় অর্জুনের সমকক্ষ নয়! তাই অর্জুনের পারদর্শিতায় দর্শকমণ্ডলী অত্যন্ত খুশীর সঙ্গে হাততালি দিতে লাগল, যেমন হাততালি দিল তারা জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের ভল্ল প্রদর্শনে!

খেলা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, হঠাৎ দর্শকমণ্ডলী থেকে একটি সুদর্শন যুবক উঠে দাঁড়িয়ে অর্জুনকে ধনুর্বিদ্যায় আহ্বান জানাল! তার পরিচয় দিতে এগিয়ে এল সে ক্রীড়াঙ্গনের মাঝখানে, দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করল- “আমি অধিরথপুত্র কর্ণ, তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনকে ধনুর্যুদ্ধে আহ্বান জানাচ্ছি!”

দুর্যোধন এবং দুঃশাসন করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানাল।

অর্জুন এগিয়ে এসে সদর্পে ঘোষণা করল- “এটা রাজপুত্রদের ক্রীড়াঙ্গন আর আমি শুধু রাজপুত্রর সঙ্গেই যুদ্ধ করি…সুতপুত্রের সঙ্গে নয়!”

গুরু দ্রোণাচার্য সমর্থন করলেন অর্জুনের মত।

নতমস্তকে স্বস্থানে ফেরার জন্য পা বাড়াল কর্ণ, কিন্তু সবাইকে অবাক করে দুর্যোধন উঠে দাঁড়াল!

– “রাজ্য যদি অর্জুনের সঙ্গে লড়াই করার শর্ত হয়, তবে আমি আজ এই মুহুর্তে মিত্র কর্ণকে অঙ্গরাজ্য দান করলাম – এখুনি হোক তার রাজ্যাভিষেক আর তারপর হোক পরীক্ষা……কে শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ? অর্জুন না কর্ণ?”

আসন্ন সন্ধ্যার অজুহাতে সেদিনের প্রতিযোগিতা বন্ধ হল, কিন্তু উপস্থিত কারুর বুঝতে বাকী রইল না যে কর্ণার্জুনের যুদ্ধ বন্ধ  হল না – স্থগিত রইল মাত্র, কোনো এক অদেখা ভবিষ্যতের জন্য!

আর কুন্তী? তিনি তো অনেক আগেই জ্ঞান হারিয়েছেন কবচকুণ্ডলপরিহিত অধিরথ পুত্রের মুখোমুখি অর্জুনকে দেখে! তিনিও  বুঝেছেন যে অদৃষ্টের পরিহাসে একদিন কর্ণ আর অর্জুন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে মুখোমুখি দাঁড়াবে – ভবিষ্যতের সেই যুদ্ধ আটকানোর ক্ষমতা বোধহয় তাঁর নেই!!!…ক্লান্ত কুন্তীর আজ বড় প্রয়োজন ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রীকৃষ্ণকে! সাত্যকি হস্তিনাপুরে এসেছিল কিছুদিন আগে, তাঁর মারফত তিনি খবর পাঠিয়েছেন বসুদেব এবং শ্রীকৃষ্ণকে।

মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র রাজনীতিতে অত্যন্ত পারদর্শী – তিনি দুর্যোধন নন যাঁর অভিসন্ধি বুঝতে প্রতিপক্ষের বেশী সময় লাগে না। তিনি শুধু যুধিষ্ঠিরের যৌবরাজ্যে অভিষেকের দিন পিছিয়ে যাচ্ছিলেন আর মনে মনে আশা রাখছিলেন যে কোনভাবে শেষপর্যন্ত দুর্যোধনই বসবে সিংহাসনে। কিন্তু শস্ত্রশিক্ষা প্রদর্শনের পর, খুব বেশীদিন সেটা করা আর সম্ভব হল না।

বিদুরের সুপারিশে এবং ভীষ্ম তথা অন্যান্য সভাপরিষদদের সমর্থনে এবং যুধিষ্ঠিরের যোগ্যতা অস্বীকার করতে না পারায়,  মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত যুধিষ্ঠিরকে হস্তিনাপুরের যুবরাজ মনোনীত করলেন। কিন্তু দুর্যোধন এবং শকুনি যে সেটা মেনে নিলেন এমন নয়। তাঁরা শুধু চুপ করে রইলেন, কারণ শকুনি-নিযুক্ত গুপ্তচর সংবাদ এনেছে যে যুধিষ্ঠির এখন এতোটাই জনপ্রিয় যে তাঁর বদলে দুর্যোধনের অভিষেক করলে রাজ্যে প্রজাবিদ্রোহের সম্ভাবনা আছে – এমনকি সেনাবাহিনীও বিদ্রোহ করতে পারে। অতএব অন্য কিছু ভাবতে হবে।

বিদুরের কাছে সভার কিছু খবর পান কুন্তী, কিন্তু বিদুরও এখন প্রকাশ্যে সদা-সর্বদা আসতে পারেন না!

আজ বহুদিন পরে তিনি এসেছেন কুন্তীর মহলে, কারণ মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আর তাত ভীষ্ম আজ ব্যস্ত অতিথি সৎকারে। যুবরাজের অভিষেকে আসা কিছু বিশিষ্ট অতিথির সঙ্গে একান্তে দেখা করছেন ধৃতরাষ্ট্র, শকুনি, দুর্যোধন……কখনো বা সঙ্গে  থাকছেন ভীষ্ম। উদ্দেশ্য একটাই – ব্যক্তিগত রাজনীতির আদানপ্রদান, যার ব্যাপারী মূলত দুর্যোধন।

কুন্তী হাতজোড় করে অভিবাদন জানিয়ে বিদুরকে বসতে দিলেন।

বিদুর স্থানগ্রহণ করে বললেন – “দেবি, আপনাকে আমি আগেও সাবধান করেছিলাম – আবারও বলছি। পাণ্ডবদের নিয়ে আপনি আপাতত কিছুদিন হস্তিনাপুর থেকে দূরে থাকুন। বিপদ যে কখন কোথা দিয়ে আসবে, তার কোনো ঠিক নেই। আমি আপনাদের রক্ষা করতে পারব কিনা জানিনা। ভীমকে যেদিন বিষ খাওয়ানো হয়েছিল, সেদিনও আমি বা আপনি কিছুই করতে পারিনি। …আমার ক্ষমতা অতি সীমিত। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আমাকে সন্দেহ করেন – আপনার কাছে আমার আসাও আপনার বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রাসাদের ভেতরে এবং বাইরে আপনার ও আমার ওপর সদাসর্বদা নজর রাখছে মহারাজের বেতনভুক দাসদাসীরা। আজ মহারাজ, তাত ভীষ্ম এবং প্রাসাদের সবাই ব্যস্ত আছেন অতিথি সৎকারে, তাই আমি এলাম। যদি আপনাদের রক্ষা করতে হয় তাহলে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের কাছাকাছি থাকতে হবে আমাকে, কোনো সন্দেহের উদ্রেক না করে – নাহলে আমি কোনো খবর পাব না। আর আপনাকে যেতে হবে প্রাসাদের বাইরে, পঞ্চপুত্রসহ।”

কুন্তী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন- “কোথায় যাব বিদুর?….আমি তাত ভীষ্মের কাছে তো কবেই মিনতি করেছিলাম, কিন্তু উনি আমাদের যেতে দিতে নারাজ। বোধহয় তাতে রাজপরিবারের অসম্মান হবে? পাণ্ডুর বিধবা স্ত্রী এবং নাবালক পাঁচপুত্রকে হস্তিনাপুর পালন করতে পারল না, তাই? নাকি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আমাদের চোখের সামনে রাখতে চান, পাছে আড়ালে কিছু গড়ে ওঠে তাঁর অজান্তে?….কোনটা ঠিক বল তো বিদুর? যে রাজপরিবার আমার পুত্রদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারে না, সে রাজপরিবার কেন আমাদের জোর করে বেঁধে রাখছে হস্তিনাপুরের কারাগারে?”

বিদুর বললেন – “এর উত্তর আমার কাছে নেই, দেবি। আমি শুধু জানি যে দুর্যোধন তার হাত শক্ত করতে চাইছে। সূতপুত্র কর্ণকে অঙ্গরাজ্য দান করার কারণ একটাই – কর্ণ মহাবীর, একমাত্র সে-ই পারে অর্জুনের মুখোমুখি দাঁড়াতে। আপনি তো জানেন যে কবচকুণ্ডল পরিহিত অধিরথের এই পালিত পুত্র সাধারণ যোদ্ধা নন! দুর্যোধন ভবিষ্যতের জন্য তৈরী হচ্ছে, আপনাকেও তৈরী হতে হবে। আর এই প্রাসাদে থেকে আপনি না পারবেন তৈরী হতে, না পারবেন নিজেদের রক্ষা করতে।…

আপনাদের যে শহরের বাইরে ভ্রমণের পরিকল্পনা হচ্ছিল, সেটা হয়তো আপনাকে সুযোগ করে দেবে প্রাসাদের বাইরে গিয়ে তৈরী হওয়ার।….কোথায় আপনারা যাবেন আমি এখনো সঠিক জানিনা, মহারাজ একবার বলছিলেন যে বারণাবত নগরীতে উনি হয়তো ব্যবস্থা করবেন সুরক্ষিত বিশ্রামগৃহের…..সেখানে তখন পশুপতি উৎসবও চলবে…..প্রজারা খুশী হবে তাদের যুবরাজকে পেয়ে….তাত ভীষ্ম এখনো পুরো সম্মত নন আপনাদের যেতে দিতে….কিন্তু আমার মনে হয় এই ভ্রমণ আপনাকে একটা সুযোগ এনে দিতে পারে, দেবি! যুধিষ্ঠির এবং পাণ্ডব এখন বয়ঃপ্রাপ্ত, জ্ঞানপ্রাপ্ত – এইবার তাদের উপযুক্ত বংশে বিবাহ দিন। আত্মীয়তাই হচ্ছে শক্তি! যত পারেন শক্তি বাড়ান। আপনার পুত্রদের যোগ্য বধূ আপনি স্থির করুন, তাত ভীষ্ম বা ভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্রের জন্যে অপেক্ষা করবেন না!”

কুন্তী- “বিদুর, পঞ্চপাণ্ডব আজ এক মুষ্টিবদ্ধ হাত যার শক্তির কাছে কৌরবকে মাথা নীচু করতেই হবে – ভয় হয় বিবাহের সূত্র ধরে এই ঐক্যে না ফাটল ধরে! তখন কি আর তারা আমার কথা শুনে এক থাকবে? মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি নেবে? নাকি, যে যার স্ত্রীর সাহচর্যে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের ভিক্ষান্নে সন্তুষ্ট হয়ে দিন কাটাবে?….”

বিদুর – “দেবি, বিবাহ মানেই কন্যাকে ঘরে আনা নয়!….”

কুন্তী -“বহুরাজ্যে যেমন বিবাহিতা কন্যা ঘরে রেখে দেওয়ার রীতি আছে, তেমনি অনেক শক্তিশালী রাজ্য আছে যারা সেই রীতি মানেনা – স্বয়ংবরা কন্যাকে শ্বশ্রুকূলে বিদায় করাই তাদের রীতি!”

বিদুর – “সময় এলে সে সমস্যারও সমাধান পাওয়া যাবে।আপনি বাসুদেব কৃষ্ণের সঙ্গে কথা বলুন – তিনি সব শক্তিশালী রাজ্যের নীতি জানেন, বহু রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা!…..কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হস্তিনাপুর থেকে বেরিয়ে পড়া….বারণাবত….”

কুন্তী বললেন- “মহারাজের প্রতিশ্রুত সুরক্ষায় আমার এখন বিশ্বাসের চেয়ে অবিশ্বাস বেশী, বিদুর! কে জানে আবার কোন বিপদের জাল পাতা থাকবে বারণাবতে মহারাজের ‘সুরক্ষিত বিশ্রামগৃহে’!”

বিদুর বললেন- “সন্দেহ যে আমারও নেই তা’ নয় – কিন্তু সেই ভয়ে পেছিয়ে গেলে তো চলবে না! এই হস্তিনাপুরেই কি আপনার পুত্রেরা সুরক্ষিত?….আপনি মন প্রস্তুত করুন ভ্রমণে যাওয়ার – বাকী সবকিছু আমার ওপর ছেড়ে দিন। আমি তাই বলতেই এসেছিলাম আজ! কোথায় আপনাদের থাকার ব্যবস্থা হচ্ছে জেনে, আপনাদের রক্ষার ব্যবস্থা আমি নিজে করব – রাজকর্মচারী ছাড়াও আমার বিশ্বস্ত কিছু লোক আছে! আমি লোক মারফত আপনাদের সঙ্গে সেইস্থানে যোগাযোগ করব – প্রয়োজনে বাসুদেব কৃষ্ণকে সংবাদ দেব!….আজ তবে আমি আসি।” অভিবাদন করে বেরিয়ে গেলেন বিদুর।

কুন্তী পঞ্চপাণ্ডবকে ডেকে পাঠালেন, গভীর রাত্রে। খুলে বললেন বিদুরের আশঙ্কা এবং পরামর্শের কথা।

ভীম বললেন – “মা, যদি অনুমতি দাও তো দুর্যোধনের খেলা আমি একদিনে শেষ করতে পারি…..চাইলে আজরাতেই।….”

কুন্তী বললেন- “ধৈর্য ধরতে শেখ ভীম, ক্ষণিক ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তোমার প্রবল শক্তির অপচয় কর না – তাকে বাঁচিয়ে রাখ যথাসময়ে ব্যবহারের জন্য।….মনে রেখ দুর্যোধন একা নয় – সবকটি ভাই ছাড়াও তার সঙ্গে আছে মাতুল শকুনি, আছে প্রবল পরাক্রান্ত কর্ণ, আছে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সব বেতনভুক কর্মচারী!”

গর্জে উঠলেন অর্জুন – “সুতপুত্র কর্ণকে আমি দেখে নেব, মা!”

কুন্তী শান্ত গলায় বললেন- “বীর অর্জুন যেদিন অন্যসব বীরদের শ্রদ্ধা করতে শিখবে, সেদিন সে কুরুকূলের সীমা ছাড়িয়ে মহাবীর হয়ে উঠবে…..প্রতিপক্ষের শক্তির মাপ করতে জানা যুদ্ধজয়ের প্রথম পদক্ষেপ। মনে রেখ, কুরুকূলের চেয়ে ছোটকূলে জন্মালেই কেউ ছোট যোদ্ধা হয়ে যায়না বা বুদ্ধিতে কম হয়না!”

যুধিষ্ঠির এতক্ষণে কথা বললেন- “মা, বিদুরকাকা আমাদের পিতা সমান। তিনি অত্যন্ত জ্ঞানী এবং সদাসর্বদা আমাদের মঙ্গলাকাঙ্খী। তিনি যা বলছেন ভেবেই বলছেন। তুমি যাত্রার তোড়জোড় কর। আমি কাল মহারাজের সঙ্গে কথা বলে, যাওয়ার দিন ঠিক করে নেব।”

বারণাবতের গৃহটি সুসজ্জিত। মহারাজের অনুমতিতে, দুর্যোধনের ইচ্ছায় এবং মন্ত্রী পুরোচনের তত্ত্বাবধানে বিশেষ ভাবে তৈরী হয়েছে কুন্তীসহ পাণ্ডবভ্রাতাদের বিশ্রামগৃহ।

অপরাহ্নে কুন্তী এবং পঞ্চপাণ্ডব সেখানে এসে পৌঁছলেন।

নকুল বললেন – “যাক্, ক’দিন একটু নিশ্চিন্তে থাকা যাবে….!”

যুধিষ্ঠির চিন্তিত মুখে বললেন- “বোধহয় না…..বিদুরকাকা আমাকে যা ইঙ্গিত দিলেন, তাতে মনে হয় সাবধানে চোখকান খুলে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে!”

অর্জুন সহদেবকে সঙ্গে নিয়ে চতুর্দিক পর্যবেক্ষণ করতে বেরিয়েছিলেন, ফিরে এসে বললেন- “লোকালয় আছে, তবে খুব কাছে নয়। গাছপালা চতুর্দিকে….বন বলাই ভালো। লুকিয়ে থাকার জন্যে আদর্শ কিন্তু বিপদ এলে কেউ জানতেও পারবে না!”

ইতিমধ্যে ভীম এসে ঢুকলেন একটি অজ্ঞাতপরিচয় লোককে নিয়ে। কুন্তীর জিজ্ঞাসু মুখের দিকে তাকিয়ে ভীম বললেন – “নদীর পথে দেখা হল….বিদুরকাকা পাঠিয়েছেন একে….মাটির তলা দিয়ে সুড়ঙ্গ কাটার জন্য….।”

যুধিষ্ঠির এগিয়ে গেলেন কথা বলার জন্য।

লোকটিকে জিগেস করে জানলেন যে এই প্রাসাদটি লাক্ষা এবং অন্যান্য দাহ্যবস্তু দিয়ে তৈরী করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অমাবস্যার রাত্রে, কুন্তী এবং পাণ্ডব যখন নিদ্রিত থাকবেন, তখন পুরোচন প্রাসাদে আগুন লাগিয়ে দেবে যাতে তাঁদের সবার আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয়। বিদুরের মতে, এর থেকে বাঁচার উপায় হচ্ছে নিরাপদ জায়গা দিয়ে সুড়ঙ্গ কেটে বহুদূরে গিয়ে ওঠা এবং নদী পার হয়ে অন্যস্থানে চলে যাওয়া।

যুধিষ্ঠির লোকটিকে প্রাসাদের ভেতরের একটি কক্ষে নিয়ে গেলেন যেখানে দাসদাসীর প্রবেশ নিষেধ – এখানে যদি সুড়ঙ্গের একটি মুখ শুরু হয়, তাহলে কেউ টের পাবে না এবং নির্দিষ্ট দিনে তাঁরা চুপিসাড়ে সুড়ঙ্গপথে বেরিয়ে যেতে পারবেন।

লোকটি প্রণাম করে তখনকার মত চলে গেল। সেদিন রাতে শুরু হবে খননকার্য।

ভীম বললেন- “যতদিন না সুড়ঙ্গ তৈরী হচ্ছে, আমি রাত জেগে পাহারা দেব – পুরোচনের সাধ্য হবে না দুর্যোধনের আজ্ঞা পালন করার!”

যুধিষ্ঠির বললেন – “নির্দিষ্ট দিনের আগেই আমাদের সুড়ঙ্গপথে বেরিয়ে যেতে হবে…..তার আগে অবধি সাবধানে থাকতে হবে।”

কুন্তী বললেন- “আর যাওয়ার সময় এই গৃহকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে যেতে হবে……সবাই যেন ভাবে আমরা মৃত!…..কেউ যেন আমাদের পিছু ধাওয়া না করে!”

যুধিষ্ঠির বললেন – “আমরাই আগুন লাগিয়ে যাব?”

কুন্তী বললেন- “হ্যাঁ।….আর শোন, সেই যে পুরোচনের চেনা নিষাদ পরিবারটি সেইদিন কথা বলে গেল, তাদের পাঁচভাইকে তুমি অমাবস্যার আগের দিন রাত্রে নিমন্ত্রণ কর – বল, তাদের মা’কেও যেন নিয়ে আসে। পুরোচনকেও সেদিন নিমন্ত্রণ কর, আর বিশেষ মদিরার ব্যবস্থা রেখ।”

হস্তিনাপুর রাজপ্রাসাদে বসেছে পাশাখেলার আসর। মামা শকুনি, দুর্যোধন, দুঃশাসন এবং কর্ণ। শকুনি দান ফেলে অট্টহাসি হাসলেন – “এই গেল যুধিষ্ঠিরের মাথা আর অর্জুনের গলা…..সামাল ভাই!”

কর্ণ বললেন – “ক্ষমা করবেন মামা, চাতুরীতে শত্রুকে পরাজিত করা ক্ষত্রিয়ের কাজ নয়!”

শকুনি বললেন – “যেন তেন প্রকারেণ শত্রুকে পরাজিত করাই ক্ষত্রিয়ের কাজ, কি বল ভাগ্নে?”

দুর্যোধন বললেন – “অবশ্যই! কবে পাণ্ডবের সৎকার করে হাত ধোব সেই অপেক্ষায় আছি – তোমার তাতে আপত্তি আছে বন্ধু?”

কর্ণ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন- “বন্ধু, পাণ্ডবের বিরুদ্ধে তোমার সঙ্গে লড়াই করব বলেই এসেছি আমি – কিন্তু আমি শুধু সামনে থেকেই যুদ্ধ করতে জানি। পেছন থেকে যুদ্ধ করতে আমি জানি না, ক্ষমা কর আমায়!”

শকুনি কর্ণর হাত ধরে তাকে বসিয়ে দিলেন, বললেন- “জতুগৃহ যদি ঠিকমতো জ্বলে, তাহলে সামনে পেছন কোথাও থেকেই আর যুদ্ধ করতে হবে না।…..শুধু পর্যাপ্ত কাঠ যোগাড় করে রাখতে হবে দাহকার্যের জন্য – যাবে নাকি, অঙ্গরাজ?” মিলিত অট্টহাস্যে ঘর ভরে গেল। কর্ণও যোগ দিলেন হাস্য-পরিহাসে।

ইতিমধ্যে অন্তঃপুরে চঞ্চল হয়ে উঠলেন ধার্মিক গান্ধারী।

মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে ডেকে বললেন- “মহারাজ, কুন্তী আর পাণ্ডবরা কবে ফিরবে?…. দুর্যোধন বলল ‘পাণ্ডবদের ছেড়ে এখন নিজের শতপুত্র নিয়ে খুশী থাক’….কেন?…..কেন নটরাজ মহাশিব স্বপ্নে জ্বলন্ত গৃহ দেখালেন আমায়? এ’সব কিসের লক্ষণ?…..দুর্যোধনের মহলে আজ কিসের উৎসব?!….”

ধৃতরাষ্ট্র বললেন- “তুমি কি তোমার শতপুত্র নিয়ে খুশী নও? কেন তুমি বারবার দুর্যোধনকে অবিশ্বাস কর? কেন তুমি তাকে নিজের পথে চলতে দাও না? সে তো ঠিকই বলছে – যুবরাজ….”

গান্ধারী বাধা দিয়ে বললেন- “সে নির্ণয় তো আগেই হয়ে গেছে মহারাজ! আপনি ভ্রাতা পাণ্ডুর হয়ে রাজ্য চালাচ্ছিলেন, পুত্রেরা সব নাবালক ছিল। কিন্তু এখন তারা সাবালক এবং যুবরাজ যুধিষ্ঠির দুর্যোধনের জ্যেষ্ঠ!”

ধৃতরাষ্ট্র বললেন- “যুধিষ্ঠির জ্যেষ্ঠ কারণ তুমি যথাসময়ে আমাকে পুত্রসন্তান দিতে পারনি গান্ধারী, তাই! নারীর কাজ অন্দরমহলে,  সে কাজে তুমি ব্যর্থ হয়েছ। এখন পুরুষের কাজে বাধা দিতে এস না!…..আমি জানি কার আসল অধিকার এই সিংহাসনে! কুন্তী যতই ধূর্ত হোক না কেন, সে আমাকে বোকা বানাতে পারবেনা! যুধিষ্ঠির যদি পাণ্ডুর পুত্রই না হয়, তো সিংহাসনে তার কিসের দাবী?”

গান্ধারী ব্যথিত কণ্ঠে বললেন – “আপনি বা ভ্রাতা পাণ্ডুও তো মহারাজ বিচিত্রবীর্যের পুত্র নন…..যুধিষ্ঠির যোগ্য, শ্রেষ্ঠ। ঈশ্বর তাই দুর্যোধনের আগে তাকে পৃথিবীতে এনেছেন – আমি তাই বিশ্বাস করি!”

ধৃ্তরাষ্ট্র বললেন- “আমাদের যুগে নিয়োগ প্রথা চলত, তাই বলে এখন দুর্যোধন বংশধর থাকতে কেন ক্ষেত্রজ সন্তান সিংহাসনে বসবে? আর যোগ্যতা? ঐসব যাদবকূলে চলে – যোগ্যতা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক উপায়ে নেতা নির্বাচন! এটা কুরুকূল – এখানে রাজতন্ত্র….রাজার ছেলে রাজা হবে……কুন্তীর চালাকি এখানে খাটবেনা, সে যতই তাত ভীষ্ম আর বিদুর পাণ্ডবদের প্রশংসা করুন না কেন!”

দূত এসে প্রণাম করে দাঁড়াল। বারণাবত থেকে দুঃসংবাদ এসেছে – অকস্মাৎ আগুন লেগে বিশ্রামগৃহ ভস্মীভূত হয়ে গেছে। পঞ্চপাণ্ডব এবং কুন্তী মৃত বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

৫ পটভূমি

অন্ধকার কঠিন সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে পথ, ঘন অমাবস্যার রাত – মশালের আলো তাকে কিছুটা মাত্র সুগম করেছে। অতিকষ্টে আরেক প্রান্তে এসে পৌঁছলেন কুন্তীসহ পঞ্চপাণ্ডব।

সেখানে অপেক্ষায় ছিল বিদুরপ্রেরিত নৌকা এবং মাঝি – সবাই উঠে বসলেন তাতে। আবার অনিশ্চিতের পথে পাড়ি! যত দূরে সম্ভব চলে যেতে হবে এখান থেকে – বিদুরের এমনই নির্দেশ।

নদী পার হয়ে পায়ে হাঁটা পথ….অবশেষে একটি পরিত্যক্ত কুটিরের সামনে নিয়ে এল বিদুরের লোকটি, তারপর প্রণাম করে  নিঃশব্দে বিদায় নিল। পূব আকাশে তখন সবে আলো ফুটছে।

রাতজাগা পথের ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত কুন্তী ও পঞ্চপাণ্ডব কুটিরে এসে বসলেন।

বারণাবত ছাড়ার আগে কিছু ফলমূল সঙ্গে এনেছিলেন, আর নদী পার হওয়ার সময় জল। তাই দিয়ে ক্ষুধাতৃষ্ণা মিটিয়ে, মাটিতেই আঁচল এবং উত্তরীয় বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন সবাই….একটু বিশ্রাম দরকার!

ঘুম থেকে উঠে পরবর্তী পরিকল্পনা স্থির করতে হবে। বিদুর বলেছেন ব্রাহ্মণ বেশ ধরে আপাতত আত্মগোপন করে থাকতে – বেশভূষাও পাঠিয়েছেন।

সূর্যদেবকে প্রাতঃপ্রণাম জানিয়ে কুটিরের সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ালেন কুন্তী।

একটু দূরে ভীম একটা ভগ্ন গাছের গুঁড়িকে ছিন্নভিন্ন করতে ব্যস্ত- কালও সারারাত সে না ঘুমিয়ে পাহারা দিয়েছে বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু মুখে ক্লান্তির চেয়ে বেশী হতাশা আর ক্রোধ।

কুন্তীর ভেতরেও চলছে তোলপাড়।

একে একে কুটির থেকে বার হয়ে এলেন যুধিষ্ঠির, অর্জুন, নকুল, সহদেব।

কারুর মুখে কথা নেই। ক’দিন আগেই যুধিষ্ঠিরের অভিষেক হয়েছিল, আর আজ পঞ্চপাণ্ডব মাতা কুন্তীসহ লুকিয়ে বেড়াচ্ছেন – ভাগ্যের এই নিদারুণ পরিহাসে সবাই যেন মূক হয়ে গেছেন!

কুন্তী নিজেকে সামলে নিলেন – পথ কঠিন, কিন্তু দিশা হারালে চলবেনা!

যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন- “ভীম যদি সব কাঠ আজই কেটে ফেলে, তাহলে কাল কি করবে বল তো? তার চেয়ে বরং ওকে ডেকে আন, সবাই বসে একটু কথা বলা যাক্।….নকুল, ঘরের মধ্যে ফল আছে – নিয়ে এস। আজ আমরা পাখীদের গান শুনতে শুনতে এখানে বসে খাব, আর তোমাদের কৃষ্ণের কথা বলব।….তাকে তোমরা সবাই এখনো দেখনি, কিন্তু শীগগিরই দেখবে।….তার জীবনের যুদ্ধের কথা যদি শোন, তাহলে এই যুদ্ধ তোমাদের কাছে কিছুই মনে হবে না….! আমরা তো সবাই তবু একসঙ্গে আছি – সে জন্ম নিয়েছিল কারাগারে আর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই বঞ্চিত হয়েছিল পিতামাতার সঙ্গ থেকে।….তবু কিন্তু সে হারেনি, তার মুখের হাসিও বন্ধ হয়নি!…..ধৈর্য ধর, জীবনে সমস্যা থাকবেই – তার মোকাবিলা করতে করতে শক্তি বাড়িয়ে তোল! হাস, আনন্দ কর আর শত্রুজয়ের পথ খোঁজ।…..সহনশীলতা, নম্রতা আর ধৈর্য হচ্ছে বড় অস্ত্র – ধনুক, গদা বা ভল্লর চেয়ে কম শক্তিশালী নয়!”…

একস্থান থেকে আরেকস্থানে ভ্রমণ করতে করতে বেশ কিছুদিন কেটে গেল।

জটাজূটধারী শ্বেতবস্ত্র পরিহিত পঞ্চপাণ্ডবকে দেখলে এখন ব্রাহ্মণ ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।

তবু সাবধানের মার নেই! এক জায়গায় বেশীদিন তাঁরা থাকেন না – বনের মধ্যে কুটির বেঁধে বাস করেন, লোকচক্ষুর অন্তরালে!

কুন্তী রন্ধন শেষ করে সেদিনও রোজের মতো বাইরে এসে বসেছেন। ছেলেরাও সব ফিরে এসেছে, ভীম ছাড়া। কুন্তী যুধিষ্ঠিরকে জিগেস করলেন – “ভীম কোনদিকে গেছে আজ? এত দেরী হচ্ছে কেন?”

যুধিষ্ঠির উত্তর দিতে যাবেন, এমন সময়ে একটি মেয়ে এসে কুন্তীকে নমস্কার করে হাতজোড় করে দাঁড়াল।

কুন্তী মুখ তুলে তাকালেন। মেয়েটি বলল – “দেবি, আমি হিড়িম্বা। আপনার পুত্র ভীম এখন আমার ভাই হিড়িম্বর সঙ্গে যুদ্ধরত। আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী আমার ভাইয়ের আচরণের জন্যে! কিন্তু আমার ভাইয়ের দোষে আমাকে দোষী করবেন না, এই আমার মিনতি! আমি আপনার পুত্র ভীমকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক। আমার ভাইয়ের এতে মত নেই, সে চাইছে আপনার পুত্রকে হত্যা করতে। আপনার পুত্রও বোধহয় রাক্ষসকূলের কন্যাকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক নয় – কিন্তু আমি আপনার পুত্রের বলবান শরীর এবং সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহার দেখে তার প্রেমে পড়ে গেছি। সে অতি বলবান এবং সে আমার ভাইকে যুদ্ধে হারিয়ে মাটিতে ফেলেছে আমি দেখে এসেছি…..যুদ্ধজয় করে সে এল বলে!….আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে আপনি যদি এই বিবাহে সম্মতি দেন তাহলে আমার বীর সন্তান আপনার পরিবারের জন্য জীবনপণ করবে, আমিও যথাসাধ্য আপনার ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করব!” এই বলে মেয়েটি নতমুখে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে রইল।

কুন্তী অর্জুনকে আদেশ করলেন নির্দিষ্ট পথে এগিয়ে গিয়ে ভীমের খোঁজ নিতে।

কুন্তীর মনে পড়ল বিদুর কি বলেছিলেন – বৈবাহিক সম্পর্কই শক্তি…..পুত্রদের বিবাহ দিতে হবে। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। রাক্ষসকূলের যুদ্ধকৌশল অভিনব – সাধারণ মানবীয় যুদ্ধকৌশলে তাদের পরাস্ত করা কঠিন। এই শক্তি ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে।

কুন্তী মেয়েটিকে হাতে ধরে পাশে বসালেন। তারপর বললেন – “তোমার মিষ্ট কথা এবং মুখশ্রী দেখে মনে হয় তুমি রাক্ষসকূলশ্রেষ্ঠা! শাস্ত্রে বলেছে ‘স্ত্রীরত্নং দুষ্কুলাদপি!’ …তুমি হয়তো জান না যে আমার পাঁচপুত্র এক মহাযুদ্ধের জন্য তৈরী হচ্ছে- আজ তারা এখানে আছে, কাল চলে যাবে অন্যজায়গায়। এই অবস্থায় তোমাকে বিয়ে করে ভীম কিন্তু দীর্ঘদিন তোমার সঙ্গে থাকতে পারবেনা, বৎসারান্তে তাকে চলে যেতে হবে অন্যস্থানে। তাতে যদি তুমি রাজী থাক, তাহলে আমি নিশ্চয়ই ভীমকে বলব তোমার কথা এবং তোমার প্রতিশ্রুতির কথা!”

হিড়িম্বা বলল- “দেবি, আমি বৎসরকালের মধ্যে পুত্রমুখ দর্শন করিয়ে আপনার ছেলেকে আপনার কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেব – এ আপনার কাছে রাক্ষসী হিড়িম্বার প্রতিজ্ঞা!”…

দিন কাটে নিজের মনে। কুন্তী ও পাণ্ডব ভ্রমণ করেন একস্থান থেকে আরেকস্থানে – একস্থানে দীর্ঘদিন থাকা নিরাপদ নয়।

বিদুর এবং বসুদেব ও শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে চর মারফত নিয়মিত যোগাযোগ আছে কুন্তীর- পত্রে নির্দেশ আসে পরবর্তী গন্তব্যস্থলের, পরবর্তী কর্মের পরিকল্পনার।

ভীম এবং হিড়িম্বার পুত্র ঘটোৎকচের জন্মের পর কিছুদিন কেটে গেছে।

ভীম ফিরে এসেছেন পরিবারের কাছে।

ঘুরতে ঘুরতে তাঁরা এসেছিলেন একচক্রনগরে, সেখানে বকাসুর ভীমের হাতে নিহত হয়েছে।

তারপর আবার আরেকস্থানে – কুন্তী এবং পঞ্চপাণ্ডব ঘুরতে ঘুরতে বর্তমানে পাঞ্চালদেশের সীমান্তে এসে পৌঁছেছেন।

পাঞ্চালরাজ ধ্রুপদের কন্যা পাঞ্চালীর স্বয়ংবর বসছে – খবর পাওয়া গেছে তার আর মাত্র দুদিন বাকী।

কুন্তী তাঁর পঞ্চপুত্রকে আদেশ করেছেন সভায় যেতে – স্বয়ংবরসভার শর্তটি যে অর্জুনকে মনে রেখেই তৈরী, সে তো আর কারুর বলার অপেক্ষা রাখে না!

অর্জুন, আর বড়োজোর কর্ণ – এছাড়া তৎকালীন ভারতবর্ষে আর কে ছিলেন যিনি জলে প্রতিবিম্ব দেখে, ঘূর্ণমান চক্রের ভেতর  দিয়ে তীর চালিয়ে মৎস্যের চক্ষু বিদ্ধ করতে পারেন?

শ্রীকৃষ্ণ? কিন্তু তিনি তো স্বয়ংবরে অংশ নেবেন না – পাঞ্চাল রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর বিশেষ মিত্রতা, অন্দরমহল এবং  বহির্সভায় তাঁর সমান সম্মান, পাঞ্চালী তাঁর বিশেষ সখী।

তিনি নিজে পাঞ্চালীর পাণিপ্রার্থী নন, কিন্তু অর্জুন যেন লক্ষ্যভেদে সফল হয় – এই তাঁর ইচ্ছা।

এমন শক্তিশালী রাজ্যের সঙ্গে মিত্রতা করার এই তো সুযোগ পাণ্ডবের!

মহারাজ ধ্রুপদও বিশ্বাস করেন যে অর্জুন তাঁর কন্যার উপযুক্ত স্বামী – অর্জুনের মতো বীরকে তিনি স্বপক্ষে রাখতে চান।

তাই বহু আলোচনার পর স্থির হয়েছে স্বয়ংবরসভার শর্তটি।

শ্রীকৃষ্ণ জানিয়েছেন যে তিনিও উপস্থিত থাকবেন সেখানে – পাঞ্চালীর স্বয়ংবরসভায় তাঁর জন্যে নির্দিষ্ট আছে বিশিষ্ট স্থান, স্বামী নির্বাচনে তাঁর মতামতের ওপর নির্ভর করছেন পাঞ্চালী!

শ্রীকৃষ্ণই তাঁকে ইঙ্গিত করবেন সঠিক প্রার্থী এলে – নীচকূলজাত কোন বীর অংশ নিতে চাইলে, শ্রীকৃষ্ণই ইঙ্গিতে জানাবেন  আপত্তি।

স্বয়ংবরের নির্দিষ্ট দিনে পঞ্চপাণ্ডব ব্রাক্ষণের বেশে তৈরী হলেন পাঞ্চালরাজসভায় পৌঁছনোর জন্য।

অনেকটা পথ, পায়ে হেঁটে যেতে হবে।

তাই ভোর হতে না হতেই মাতা কুন্তীকে প্রণাম করে, পাঁচভাই নামলেন পথে।

কুন্তী রইলেন অপেক্ষায় – কৃষ্ণের রথ স্বয়ংবরসভায় যাওয়ার আগে তাঁর দুয়ারে একবার থামবে।

ব্যাকুল নয়নে ভ্রাতুষ্পুত্রের পথ চেয়ে বসে আছেন তিনি।

অনেক প্রশ্ন, অনেক চিন্তা মন ছেয়ে আছে – কৃষ্ণ ছাড়া কে পথ দেখাবে?

পাঞ্চালরাজ্যের সঙ্গে মিত্রতা করার এতোবড়ো সুযোগ যে ছাড়া চলে না, তা কুন্তী জানেন।

ভয় শুধু এই যে, হিতে বিপরীত না হয়!

অর্জুন না হয় লক্ষ্যভেদ করে জিতে নিল পাঞ্চালীকে, কিন্তু তারপর?

পাঞ্চালরাজ্যে স্বয়ংবরা কন্যাকে স্বামীগৃহে বিদায় দেওয়াই কূলরীতি – পিতৃগৃহে পাঞ্চালীকে রেখে দেওয়া যাবেনা। পাঞ্চালী হিড়িম্বা নয়। এই বনবাসে পাঞ্চালীকে এনে তুলবেন….

অর্জুন যদি তারপর মহারাজ পাণ্ডুর মতো নারীর মোহে জগত ভুলে যায়!

তৃষিত, বঞ্চিত আর চারটি পুরুষের সামনে তার মত্ত প্রেমলীলায় রাশ টানবে কে?

মহাবলী অর্জুনের রাশ কি তখন থাকবে কুন্তীর হাতে, না পাঞ্চালীর হাতে?

হাতের মুঠো থেকে শক্তিশালী একটি আঙ্গুল যদি আলগা হয়ে যায়?

রূপসী নারী যদি এই বনবাসে পাঁচভাইয়ের মধ্যে বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়!……

– “কোনো চিন্তার কারণ নেই, পিসীমা! বধূকে বরণ করার ব্যবস্থা কর – সব ঠিক হয়ে যাবে!”

চমকে উঠলেন কুন্তী – শ্রীকৃষ্ণ যে কখন হাসিমুখে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন, তা তিনি খেয়ালই করেননি।

চোখে জল আর মুখে হাসি নিয়ে তিনি সাদরে ভ্রাতুষ্পুত্রকে বসালেন। খুলে বললেন তাঁর সব প্রশ্ন এবং চিন্তার কথা- জীবনের বৃহৎ লক্ষ্যে পৌঁছতে যে হবেই…..কুন্তী কিছুতেই পুত্রদের লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে দিতে পারেন না….এতো দিনের সাধনা বৃথা হতে দিতে পারেন না!

তাঁর পুত্ররা কি এ’সব ভাবে?

কৃষ্ণ ছাড়া আর কাকে তিনি বলবেন, আর কেই বা দেবে উত্তর!

যাদবকূলের বুদ্ধিমত্তা সুপ্রসিদ্ধ, রাজনীতি এবং সমাজনীতির সাম-দাম-দণ্ড-ভেদ শ্রীকৃষ্ণের নখাগ্রে – তিনি ছাড়া আর কে করতে পারেন কুন্তীর সমস্যার সমাধান?

আলোচনা শেষে নিশ্চিন্ত কুন্তীকে কুটিরে রেখে, হাসিমুখে রথে উঠে বসলেন শ্রীকৃষ্ণ।

রথ ছুটল পাঞ্চাল রাজবাড়ীর দিকে – সখী পাঞ্চালী অপেক্ষায় আছেন, স্বামী নির্বাচনে শ্রীকৃষ্ণের মত চাই।

কুটিরে কুন্তী অপেক্ষায় রইলেন পুত্রদের।

কৃষ্ণের সাহচর্যে আর পরামর্শে মনে এসেছে নতুন উদ্যম।মাতৃভক্ত পুত্রদের একত্রে রেখে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে তাঁকেই – ক্ষুদ্র আবেগকে পিষে ফেলতে হবে বৃহত্তর স্বার্থের জন্যে।

ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠিত করতে হবে – অনেক বলিদান দিয়ে তবে আসবে সেইদিন!

ঐক্য, উদ্যম, বীরত্ব আর কৌশল – এই শুধু লক্ষ্য হবে আজ থেকে। কৃষ্ণ আছেন, ভয় কিসের?

তাই হল। পাঁচভাই এবং পাঞ্চালী মাথা পেতে নিলেন কুন্তীর মুখনিঃসৃত বাণী – কৃষ্ণ রইলেন সহায়।

তিনি সবার সহায়, পাঞ্চালীরও। পাঞ্চালীর যে ছিল সর্বগুণসম্পন্ন স্বামীর প্রার্থনা….এক স্বামীতে কি মেলে অত গুণ! পাঁচপতিকে বরণ করে পাঞ্চালী পাবেন পাটরাণীর সম্মান, বসবেন যুধিষ্ঠিরের বামপার্শ্বে, থাকবেন প্রধানা মহিষী হয়ে। পাঁচভাইয়ের আর সব স্ত্রী পরে, আগে পাঞ্চালী!…..

অর্জুনের জীবনের লক্ষ্য অনেক বড়ো…..সেই লক্ষ্যভেদে সে শুধু দেখে পাখীর চোখ….বাকী সব তুচ্ছ। ভাতৃ ঐক্যের কাছে সব মূল্যহীন….নারীও…..অগ্নির মতো রূপে যেন পতঙ্গের মতো পুড়ে না যায় বীরত্ব….নষ্ট না হয় ভাতৃভাব!

নৌকা যেন না ডোবে – কুন্তী শক্ত হাতে ধরে আছেন হাল, সামনে রয়েছেন ধ্রুবতারার মতো ভ্রাতুষ্পুত্র কৃষ্ণ।

এদিকে ব্যর্থমনোরথ দুর্যোধন আর অপমানিত কর্ণের সুমুখ দিয়ে গিয়ে পাঞ্চালী যখন মালা পরালেন এক সুদর্শন ব্রাহ্মণের গলায়, সভায় তখনই শুরু হয়েছিল কানাকানি – কে এই মহাবলী?

মহারাজ ধ্রুপদের মনেও জেগেছিল প্রশ্ন, পুত্রকে পাঠালেন তিনি খবর সংগ্রহের জন্য। ধৃষ্টদ্যুম্ন গোপনে পিছু নিলেন পাঞ্চালীসহ পাঁচ ভ্রাতার।..

এরপর আর কিছুই গোপন রইল না – পাণ্ডবেরা করলেন আত্মপ্রকাশ।

ধৃতরাষ্ট্র সংবাদ পেয়ে পাণ্ডবকে আমন্ত্রণ জানালেন হস্তিনাপুরে।

কুন্তী বললেন – “সেই ভয়ঙ্কর কারাগৃহে, আবার…?”

কৃষ্ণ হেসে বললেন – “যুদ্ধক্ষেত্রে না গিয়ে তো যুদ্ধ জয় করা যাবে না – হস্তিনাপুরে যেতে হবেই। তবে সেখানে থাকতে নাও হতে পারে। আমার মনে হয় না যে পাণ্ডবদের ফিরে আসার খবরে দুর্যোধন বা মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র কেউই খুব খুশী, তারমধ্যে রাজ্যে কানাঘুষো শুরু হয়েছে জতুগৃহ নিয়ে – মহামতি বিদুরের লোকজনরা কেউ মুখ বন্ধ করে বসে নেই, সুতরাং ষড়যন্ত্রের কথা প্রকাশ পেয়ে গেছে। সেইক্ষেত্রে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র না পারবেন পাণ্ডবকে অগ্রাহ্য করতে, না পারবেন দুর্যোধনকে বাধ্য করতে পাণ্ডবের দাবী মেনে নিতে। তিনি জনপ্রিয় পাণ্ডবকে হস্তিনাপুরে এখন রাখতে চাইবেন বলে আমার মনে হয়না।…..দেখা যাক!”

শ্রীকৃষ্ণের কথাই ঠিক প্রমাণিত হল।

ভীষ্ম, বিদুর এবং শ্রীকৃষ্ণের মধ্যস্থতায় রাজ্য হল বিভাজিত — দুর্যোধন রইলেন হস্তিনাপুরে, পঞ্চপাণ্ডব চললেন খাণ্ডবপ্রস্থে।

বিদুর এবং শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে পরামর্শ করে, কুন্তী রয়ে গেলেন হস্তিনাপুর প্রাসাদে – ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারীর কাছাকাছি। খাণ্ডবপ্রস্থ এখনও বসবাসের উপযুক্ত নয় – অন্তঃপুরিকাদের জন্য উপযুক্ত বাসস্থান তৈরী হলে তবেই তাঁরা যাবেন সেখানে। আপাতত খাণ্ডবপ্রস্থে যাবেন শুধু পঞ্চপাণ্ডব আর শ্রীকৃষ্ণ।

ছেলেরা দূরে – তারা সুরক্ষিত। কুন্তীর তাই আর হস্তিনাপুরে থাকতে ভয়ের কারণ নেই – এতে বরং রাজপ্রাসাদের হালচাল বুঝতে সুবিধা হবে।

অন্দরমহলের দাসীরা আজও কুন্তীর প্রতি অনুরক্ত – তাদের চেয়ে বড়ো সংবাদবাহক আর কোথাও নেই।

পঞ্চপাণ্ডবকে নিয়ে খাণ্ডবপ্রস্থে রওয়ানা হওয়ার আগে, শ্রীকৃষ্ণ এলেন কুন্তীর সঙ্গে দেখা করতে।

শ্রীকৃষ্ণ বললেন – “পিসীমা, তোমার ছেলেদের সামনে এখন অনেক কাজ। খাণ্ডবপ্রস্থকে ইন্দ্রপ্রস্থ বানিয়ে তুলতে হবে। বৈবাহিক জাল ছড়িয়ে দিতে হবে যতদূর পারা যায়।…..ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। আমার মনে হয় যে রাজ্যবিভাজন করতে আপাতত মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র বাধ্য হয়েছেন, কিন্তু রাজনীতির চাল এখানেই থেমে থাকবে না। শেষ বোঝাপড়ার দিন খুব দূরে নয়।….তুমি রাজপ্রাসাদের হাওয়া বোঝার চেষ্টা কর, আর প্রাসাদবাসীকে পাণ্ডবপক্ষে আনার চেষ্টা কর। আমি তোমার ছেলেদের বিবাহের বন্দোবস্ত করব বিভিন্ন রাজ্যে – রাজনীতিতে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”

কুন্তী বললেন – “নিশ্চয়ই। শুধু ভয় হয় যে বিবাহের সূত্র ধরে পাঁচভাইয়ের ঐক্যে না ফাটল ধরে!”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “এখন তো তারা বনে নেই আর তারা তৃষ্ণার্তও নয় – সবাইকেই নিজেদের ইচ্ছেমতো প্রেয়সী খুঁজে নিতে দাও, তাতেই ভালো হবে। চিন্তার কারণ নেই – আমি তাদের উপযুক্ত পরামর্শ দেব যাতে পুরোনো সম্পর্ক না ভেঙেও নতুন সম্পর্ক তৈরী করা যায়।……ছেলেদের ঐক্যে যাতে ফাটল না ধরে সে বিষয়ে আমি সতর্ক থাকব – তবে অর্জুনের দিকে একটু বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।”

কুন্তী বললেন – ”ঠিক বুঝলাম না!”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন – “পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে অর্জুন সর্বশ্রেষ্ঠ বীর, তার প্রাপ্য তাকে দিতে হবে। ভ্রাতাশ্রী যুধিষ্ঠির ধার্মিক এবং সাত্ত্বিক – কিন্তু অর্জুন হল সূক্ষ্ম অনুভূতিসম্পন্ন এবং রাজসিক। রাজা হওয়ার সব গুণ তার মধ্যে আছে, পাঞ্চালীকে জিতে আনার ক্ষমতাও শুধু তারই আছে। কিন্তু সে রাজা হবে না – শুধু ভ্রাতা যুধিষ্ঠিরের রাজসিংহাসন রক্ষা করবে। পাঞ্চালীকেও সে একা পাবে না, বাকী ভাইদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হবে।…….তার যেন এমন মনে নাহয় যে, তার বীরত্বকে শুধু ভ্রাতাশ্রী যুধিষ্ঠিরের সিংহাসনপ্রাপ্তির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।”

কুন্তী বললেন – “তোমার মতে, কি করা উচিত?”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “তাকে যদি এইরকম আশ্বাস দেওয়া যায় যে ভ্রাতা যুধিষ্ঠিরের পর তার বংশধরেরাই সিংহাসনে বসবে, ভ্রাতা যুধিষ্ঠিরের বংশধরেরা নয়, তাহলে ভারসাম্য বজায় থাকবে বলে আমার মনে হয়…..অবশ্যই যোগ্য বংশধর হতে হবে, যোগ্য কূলের পাত্রীর গর্ভজাত সন্তান হতে হবে!”

কুন্তী বললেন- “কিন্তু সে কি করে হবে, কৃষ্ণ? শর্ত অনুযায়ী পাঞ্চালী সর্বপ্রথম গর্ভে ধারণ করবে যুধিষ্ঠিরের সন্তান, তারপর ভীমের সন্তান, তারপর অর্জুনের…..জ্যেষ্ঠের কোনো ত্রুটি না থাকলে কনিষ্ঠ সন্তান তো সিংহাসনের অধিকার পাবে না!”

শ্রীকৃষ্ণ হেসে বললেন- “পিসীমা, পাঞ্চালী ছাড়াও তো অন্য স্ত্রী থাকতে পারে অর্জুনের – তাই না? আর সেই স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেওয়া অর্জুনের সন্তান তো বংশের যোগ্য জ্যেষ্ঠতম উত্তরাধিকারী হতে পারে! ভ্রাতা যুধিষ্ঠিরের সন্তানের আগেও তো আসতে পারে সেই সন্তান! … খাণ্ডবপ্রস্থকে ইন্দ্রপ্রস্থ বানিয়ে তোলা একদিনের কাজ নয়- অর্থাৎ  পাণ্ডবের সঙ্গে পাঞ্চালীর বৈবাহিকজীবন শুরু হতে এখনও অনেক দেরী আছে। ইতিমধ্যে…”

কুন্তী বললেন – “তুমি কি কারুর কথা ভাবছ? দ্রুত কোনো বিবাহ….অন্যত্র কোথাও গিয়ে?”

শ্রীকৃষ্ণ হেসে বললেন – “যাদবকূলকে তোমার যোগ্য কূল বলে মনে হয় তো?…সুভদ্রা?”

কুন্তী হেসে বললেন – “অবশ্যই!”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন – “তবে আর চিন্তা কিসের!….আমার মনে হয় না এতে ভ্রাতা যুধিষ্ঠির বা ভ্রাতা ভীমের কোনো আপত্তি হবে বলে। ঘটোৎকচ বংশে জ্যেষ্ঠ হলেও, সে রাক্ষসকূলের – ভ্রাতা ভীম জানেন যে ঘটোৎকচ চন্দ্রবংশের সিংহাসনে বসতে পারে না। সুতরাং অর্জুনের যদি শীঘ্র পুত্রপ্রাপ্তি হয় এবং সেই পুত্র যদি ভ্রাতা যুধিষ্ঠিরের পুত্রের আগে জন্মায়, তবে ভ্রাতা যুধিষ্ঠির নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে সহমত হবেন – তাঁর মন স্বচ্ছ জলের মতো পরিস্কার।”

কুন্তী বললেন – “আর পাঞ্চালী? সে পাটরাণী…..”

শ্রীকৃষ্ণ হেসে বললেন- “সে আমি দেখব সময় এলে – তবে আমার মন বলছে যে যাদবকূলের মিশ্রণেই ভবিষ্যতে চন্দ্রবংশের চন্দ্রিমা বাড়বে।….এখন বিদায় দাও।”

কুন্তী আশীর্বাদ করে শ্রীকৃষ্ণকে বিদায় দিলেন।

শ্রীকৃষ্ণ-সহ পঞ্চপাণ্ডব পৌঁছলেন তাঁদের নতুন রাজ্য খাণ্ডবপ্রস্থে, সেই রুক্ষভূমিকে বাসযোগ্য করে তুলতে – প্রাসাদ গড়ে তুলতে। শ্রীকৃষ্ণের সহযোগিতায় ধূসর সেই খাণ্ডবপ্রস্থ ধীরে ধীরে হয়ে উঠলো অতুলনীয় ইন্দ্রপ্রস্থ – কর্মভূমিতে কর্মযোগে ডুবে গেলেন  পঞ্চপাণ্ডব।

শ্রীকৃষ্ণের কাছে শিখলেন জীবনের সারমর্ম – অভিযোগ নয়, অনুতাপ নয়!

শুধু কর্ম করে যাওয়াই শ্রেষ্ঠ মানুষের পরিচয়।

বেশ কয়েকবছর কেটে গেল।

যুধিষ্ঠিরের রাজ্য হয়ে উঠল সমৃদ্ধ।

পাণ্ডবের বাহুবলে চতুর্দিক সুরক্ষিত। প্রতিবেশী রাজারা মেনে নিয়েছেন যুধিষ্ঠিরের আধিপত্য।

ভীম দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত করেছেন মগধের রাজা, কংসের শ্বশুর এবং যাদবকূলের শত্রু, জরাসন্ধকে।

কুন্তী আর শ্রীকৃষ্ণের যৌথ প্রচেষ্টায় বৈবাহিক জাল ছড়িয়ে গেছে উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমের বহু রাজ্যে—  কাশী, শিবি, মণিপুর, নাগলোক, এমনকি দ্বারকাতেও – অর্জুন বিবাহ করেছেন শ্রীকৃষ্ণর বোন সুভদ্রাকে। মধুচন্দ্রিমা কাটিয়ে, অন্তঃসত্ত্বা সুভদ্রাকে দ্বারকাতে রেখে, অর্জুন ফিরে গেছেন।…

আর পাঞ্চালী?

তাঁর অগ্নির মতো রূপ ও তেজ নিয়ে  তিনি থেকে গেছেন প্রধানা মহিষী হয়ে, সাংবিধানিক প্রধান হয়ে- সম্মানীয়া কিন্তু  ক্ষমতাহীন।

এক এবং অদ্বিতীয়া হয়ে থাকার সৌভাগ্য তাঁর আর হল না- পঞ্চস্বামীর এক স্বামীরও তিনি একমাত্র বধূ নন। ক্ষমতার সুতো তাঁর হাতে নেই।

সুভদ্রাকে নিয়ে তো রীতিমতা ঈর্ষায় ভুগেছেন পাঞ্চালী, কিন্তু কি করবেন! শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়ভাষিণী সুদর্শনা বোনকে এবং তাঁর  পুত্র অভিমন্যুকে তিনি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন – শ্রীকৃষ্ণ যে পরম মিত্র, পরম সখা!

পাঞ্চালীর সম্বল ছিল আগুনের মতো রূপ আর আগুনের মতো অভিমান – বাইরের জগতে একদিন তা কুরুক্ষেত্রের ঝড়  তুললেও, অন্দরমহলের রাজনীতিতে তা কোনো কাজেই আসেনি।

তাঁর পঞ্চস্বামী বশে ছিলেন কুন্তীর, যাঁর চরিত্র ছিল শীতল জলের মতো।

পাণ্ডব আশ্রয় নিয়েছিলেন কুন্তীর ভ্রাতুষ্পুত্র মার্গদর্শী শ্রীকৃষ্ণের বটবৃক্ষতলে, পাঞ্চালীর আঁচলের ছায়ায় নয়।

মহারাজ যুধিষ্ঠির এবারে আয়োজন করলেন এক বিশাল যজ্ঞের — সসম্মানে আমন্ত্রণ জানালেন সব রাজা-রাজড়াদের।

যজ্ঞে নিমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে বিশিষ্ট হলেন দুর্যোধন, তিনি হস্তিনাপুর নরেশের প্রতিভূ হয়ে এসেছেন।

তাঁর সঙ্গে এসেছেন কুরুজ্যেষ্ঠ ভীষ্ম।

যজ্ঞ শেষে, যুধিষ্ঠির এবং পঞ্চপাণ্ডবকে ইন্দ্রপ্রস্থে সুপ্রতিষ্ঠিত দেখে, শ্রীকৃষ্ণ অবশেষে রওয়ানা হলেন দ্বারকার পথে। মাতা কুন্তী রইলেন সেখানে, ছেলেদের অনুরোধে।

দুর্যোধনও যুধিষ্ঠিরের অতিথি হয়ে থেকে গেলেন কয়েকদিনের জন্যে।

প্রথম থেকেই রাজ্যবিভাজনের নির্ণয়ে দুর্যোধন ছিলেন অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। ইন্দ্রপ্রস্থে এসে দুর্যোধনের অসন্তোষ আরও বাড়ল- এইরকম রাজপ্রাসাদ বানিয়েছে পাণ্ডব?

হস্তিনাপুরের প্রাসাদ যে এর কাছে কতো তুচ্ছ, এই কথা ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক দুর্যোধন পিছল খেয়ে ভূপতিত হলেন। সামলে ওঠার আগেই তাঁর কানে এল পরিহাসের তীক্ষ্ণ হাসি – “অন্ধ বাবার অন্ধ ছেলে!”

মুখ তুলে দেখলেন – দ্রৌপদী!….অভিমানী পাঞ্চালীর এতো সাহস?? এতোদূর স্পর্ধ

দুর্যোধনের জটিল মনে ঈর্ষার সঙ্গে এবার যুক্ত হল ক্রোধ – সেই আগুন নেভার নয়।

দুর্যোধনকে বিদায় দিয়ে যুধিষ্ঠির চিন্তিত মুখে পাটরাণী দ্রৌপদীর কক্ষে প্রবেশ করলেন।

অভ্যর্থনা জানিয়ে দ্রৌপদী বললেন- “সব কুশল তো, মহারাজ? এতবড়ো যজ্ঞ করলেন, সবাই আপনার জয়গান গাইছে- তবু আপনি চিন্তিত….কেন?”

যুধিষ্ঠির বললেন- “পাঞ্চালি, দুর্যোধনকে ঐ কথা বলা তোমার উচিত হয়নি। তুমি শুধু দুর্যোধনকে নয়, অপমান করেছ মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকেও।”

দ্রৌপদী বললেন – “আমি খুবই লজ্জিত, মহারাজ। দুর্যোধনের রূঢ় দাম্ভিক ব্যবহার দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে ছিলাম, হঠাৎ পতনে নিজেকে সামলাতে পারিনি।”

যুধিষ্ঠির বললেন – “জয়ের সময়ই নিজেকে সামলানোর প্রয়োজন বেশী। জয়ীর ব্যবহার হবে মার্জিত, উদ্ধত নয়। সেখানেই প্রকৃত মনুষ্যত্বের পরিচয়!….দুর্যোধন এই অপমান ভুলবে না। সে আমার ছোটভাই, তাকে আমি ভালো চিনি। সে নিজের ভুল সর্বদা ক্ষমা করে চলে, অন্যের ভুল কদাপি নয়।”

নতনেত্রে দ্রৌপদী বললেন – “আমি মহারাজের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।”

যুধিষ্ঠির বললেন- “কিছু অপরাধের ক্ষমা নেই – আছে শুধু প্রায়শ্চিত্ত।…ভবিষ্যৎ কোন প্রায়শ্চিত্ত তুলে রাখল এই ঘটনার জন্য তা’ শুধু মহাকালই জানেন!”

চিন্তিত যুধিষ্ঠির কক্ষ ত্যাগ করলেন।

ক’দিন পরেই হস্তিনাপুর থেকে এল আমন্ত্রণ — দ্যুতক্রীড়া!

মহারাজ দুর্যোধন মহারাজ যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে পাশা খেলতে চান।

আশা এই যে মহারাজ যুধিষ্ঠির এই উপলক্ষ্যে সপরিবারে হস্তিনাপুরে আগমন করে বাধিত করবেন….ইত্যাদি ইত্যাদি।

হস্তিনাপুরের বার্তাবহকে বিশ্রামগৃহে পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে মহারাজ যুধিষ্ঠির এলেন অন্তঃপুরে।

দাসী এসে খবর দিল রাজমাতা কুন্তী সাক্ষাৎপ্রার্থী।

যুধিষ্ঠির উঠে দাঁড়িয়ে বললেন – “মা, আমায় ডাকলে আমি চলে যেতাম…..”

কুন্তী যুধিষ্ঠিরের প্রণাম গ্রহণ করে আসন গ্রহণ করলেন।

তারপর চিন্তিত মুখে বললেন – “হস্তিনাপুরের দূতকে তুমি ফিরিয়ে দাও,এ’ পাশাখেলায় আমার সম্মতি নেই।”

যুধিষ্ঠির বললেন – “ক্ষত্রিয়ের পক্ষে এই আমন্ত্রণ অস্বীকার করা যে অসম্ভব!”

কুন্তী বললেন- “শুধু কি তাই, না তোমার পাশাখেলার আসক্তি তোমাকে বলছে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতে?….ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির, তোমার কোনো কর্মে দোষ ধরার সাধ্য বোধহয় জগতে কারো নেই। তুমি নিজগুণে আমার শেখানো, গুরুদেবের শেখানো ধর্মের অনেক ওপরে উঠে গেছ। তোমার মনন এই পৃথিবীর ধুলোর অনেক ওপর দিয়ে চলে।….শুধু এই একটা….এই একটা আসক্তি যদি তুমি ছাড়তে পারতে!”

যুধিষ্ঠির বললেন- “মা, বন্ধুত্বপূর্ণ পাশাখেলা, নিজের ছোটভাইয়ের সাথে- তুমি এ’ নিয়ে এতো ভাবছ কেন?….তাছাড়া রাজ্যবিভাজন নিয়ে যে একটা তিক্ততা তৈরী হয়েছে, এই তো সুযোগ তাকে মেটাবার! দুইরাজ্যে শত্রুতা না বাড়িয়ে বন্ধুত্ব বাড়ান হবে রাজনীতির ক্ষেত্রে এক বড় পদক্ষেপ।”

কুন্তী বললেন – “রাজনীতি আমিও কিছু জানি যুধিষ্ঠির….রাজপুত্র নাই বা হলাম! জীবন আমাকে যা শিখিয়েছে, সেই পাঠ কম নয়।….দুর্যোধন তোমাকে ‘ভাই’ ভাবে না, আমাদের কাউকে সে আত্মীয় ভাবে না। আমি হস্তিনাপুরের প্রাসাদে কিছুদিন কাটিয়ে সেকথা আরো ভালো করে বুঝেছি। রাজ্যবিভাজনে দুর্যোধনের মত ছিল না – সে এবং গান্ধার নরেশ অত্যন্ত ক্ষিপ্ত তোমাদের এই রাজ্যপ্রাপ্তিতে। তার ওপর এখান থেকে সে ফিরেছে ক্রুদ্ধ এবং বিদ্বেষভাবাপন্ন মন নিয়ে…..পাঞ্চালীর অভিমান ভাঙতে এবং তোমাদের রাজ্যহারা করতে সে অনেকদূর যেতে পারে….আহত সাপ বড়ো ভয়ঙ্কর!….তার সঙ্গে আছে গান্ধারনরেশ শকুনি, যার পাশাখেলার চাতুরীর কথা সর্বজনবিদিত।…..তুমি কৃষ্ণের মত নিয়েছ?”

যুধিষ্ঠির বললেন – “সে তো এখন দ্বারকাতে, মা। চিঠি পাঠিয়ে তার মত নেওয়া পর্যন্ত তো হস্তিনাপুরের দূতকে বসিয়ে রাখা যাবে না! আর খেলা হবে দুর্যোধনের সঙ্গে, মামা শকুনির সঙ্গে নয়। তুমি চিন্তা কর না।”

কুন্তী আর কিছু না ব’লে উঠে দাঁড়ালেন, কিন্তু তাঁর মুখ বলে দিচ্ছিল যে মন তাঁর চিন্তাভারাক্রান্ত।

…যজ্ঞ করে মহারাজ যুধিষ্ঠির খ্যাতি পেলেন, পেলেন সম্মান। তবু শেষরক্ষা হল কি?

নিয়তির হাতে দ্রৌপদী, যুধিষ্ঠির, দুর্যোধন সবাই পুতুল মাত্র।

কুন্তী নিয়তিকে আটকাবেন কেমন করে?

আর শ্রীকৃষ্ণ? তিনি তো এ’সবের বাইরে।

তিনি শুধু সত্যের সঙ্গে।

কর্মের গতি তিনি রোধ করেন না – তিনি শুধু রক্ষা করেন ধর্মকে।

 

৬ পাশাখেলা

বিদুরের বাসভবনে, অন্দরমহলের অলিন্দে, বিষণ্ণ কুন্তী বসে ছিলেন।

দৃষ্টি সমুখে, কিন্তু কিছুই যেন দেখছেন না।

চোখের ওপর দিয়ে জলছবির মতো ভেসে যাচ্ছে কত কী — শুরসেনার প্রাসাদে ক্রীড়ারত পৃথা, বসুদেব, শ্রুতি……কুন্তীরাজ্যের সুবিশাল প্রাসাদ, ঋষিসেবা, কর্ণ…..স্বয়ংবর, মহারাজ পাণ্ডু, হস্তিনাপুর, বনবাস…..আবার হস্তিনাপুর, আবার বনবাস…..ইন্দ্রপ্রস্থের ক্ষণিক সুখস্মৃতি…..পাশাখেলা, দ্রৌপদীর আর্তচিৎকার আর সভাগৃহের অশ্লীল হাসি, পুরুষত্বহীন ক্লীব কুরুপুরুষদের মাঝে বিদুর আর বিকর্ণের নিষ্ফল প্রতিবাদ…..

চমক ভাঙল বিদুরের পদশব্দে। কুন্তী অঞ্চলপ্রান্তে চোখ মুছে ঘুরে বসলেন।

আসন গ্রহণ করে বিদুর বললেন – “মহারাণি, আপনি ভেঙে পড়লে কি করে চলবে?”

কুন্তী বললেন- “বিদুর, ‘মহারাণী’ বলে তুমি আমাকে আর অপমান কর না।…..আমি চিরকালের ভিখারিনী – এক দ্বার থেকে আরেক দ্বারে ঠোক্কর খেতে খেতে আজ তোমার দ্বারে এসে উঠেছি, তোমার দয়ায় জীবন নির্বাহ করছি।”

বিদুর বললেন- “মহারাণি, এ’কথা বলে আপনি আমায় অপমান করছেন – আপনি জানেন যে আপনার পদধূলি পেয়ে বিদুরের ক্ষুদ্র আলয় ধন্য হয়ে গেছে। আপনি জানেন আপনাকে এতটুকু সাহায্য করতে পারলে বিদুর নিজেকে ধন্য মনে করে। আপনি জানেন বিদুরের কাছে আপনি চিরদিনের মহারাণী – যেদিন হস্তিনাপুরে আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি জানি যে শুধু আপনিই ‘মহারাণী’ নামের যোগ্য। আপনার কৃপা পেয়ে এই ব্রাত্য বিদুরের জীবন ধন্য হয়ে গেছে – তার কি কোনো দাম নেই? শুধু রাজ্য হারানোর বেদনাই সব?”

কুন্তীর মুখে ফুটে উঠল মৃদু হাসি- “বিদুর, কে বলে যে ‘দাম নেই’? আমার মূল্যহীন জীবনকে যে এতোবড়ো মূল্য দিয়েছে, সে আমার কাছে অমূল্য – তুমি কি তা জান না? নাহলে যে আমি এখানে আসতামই না বিদুর, ছেলেদের সঙ্গে বনেই চলে যেতাম!”

বিদুর বললেন – “তবে বিষণ্ণতা ত্যাগ করুন মহারাণি! বনবাস আর অজ্ঞাতবাস দেখতে দেখতে কেটে যাবে। আমি বলছি, এই তেরোবছর দ্রৌপদী, যুধিষ্ঠির এবং পাণ্ডবকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেবে – আপনার আঁচলের ছায়া থেকে বেরিয়ে তাদের রৌদ্রতাপ সয়ে নিতে হবে। সেই তাপে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়ে তারা ফিরে আসবে। আপনি অনেক যুদ্ধ করেছেন তাদের জন্য, এবারে তাদের যুদ্ধ তারা করুক আর আপনি একটু বিশ্রাম করুন।….পাণ্ডবপুত্ররা বড়ো হয়ে উঠছে পাঞ্চালরাজের তত্ত্বাবধানে, বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের তত্ত্বাবধানে, মণিপুররাজের তত্ত্বাবধানে, পুত্রী হিড়িম্বার তত্ত্বাবধানে – চিন্তা কিসের? এরা একেকজন মহাবীর তৈরী হবে – যে রাজ্য গেছে তার দশগুণ ফিরে আসবে।”

 কুন্তী বললেন – “শুধু রাজ্য নয়, বিদুর। সম্মান!…..পাঞ্চালীর আর্তচিৎকার আমাকে আজও নিদ্রাহারা করে রাখে। এই কি তার প্রাপ্য ছিল? এইজন্যই কি তাকে পরম সমাদরে বরণ করে ঘরে তুলেছিলাম একদিন?” বিদুর বললেন – “মহারাণি, কার যে কি প্রাপ্য তা’ জানেন শুধু বিধাতাপুরুষ আর ঠিকও করেন তিনিই। তিনি মঙ্গলময়, অধর্মের বিনাশকারী – আপনি তাঁর ওপর সব ছেড়ে দিন।”

কুন্তী বললেন – “কৃষ্ণ থাকলে…..”

বিদুর বললেন – “দেবি, শ্রীকৃষ্ণ আছেন সদাসর্বদা পাণ্ডবের সঙ্গে। তিনি বনে গিয়েছেন – পাঞ্চালী ও পঞ্চপাণ্ডব তাঁর সাহচর্যে ও পরামর্শে নতুন উদ্যমে সঠিক রাস্তায় চলছে আমি খবর পেয়েছি। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।তেরো বছর পরে পাণ্ডব ফিরে আসবে অপ্রতিহত শক্তি নিয়ে, জয় সেদিন সুনিশ্চিত হবেই।”

কুন্তী বললেন- “বিদুর, তুমি কি সত্যিই মনে কর যে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, বা দুর্যোধন, তেরো বছর পরে পাণ্ডবদের রাজ্য ফিরিয়ে দেবে? আমার মনে কিন্তু সে আশা একেবারেই নেই।”

বিদুর বললেন- “যদি মিত্রভাবে রাজ্য ফিরে না পায়, তবে যুদ্ধ করে রাজ্য নেবার ক্ষমতা রাখে পাণ্ডব।”

কুন্তী বললেন- “সে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী, বিদুর। আমি দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে, এক মহাযুদ্ধ আসন্নপ্রায়…..তুমি আমি তাকে আটকাতে পারব না।”

বিদুর বললেন – “দেবি, মহাকালের গতি রোধ করার সাধ্য আমাদের নেই – সে চেষ্টাও বাতুলতা। তাই অপেক্ষাই শ্রেয়!”

কুন্তী বললেন- “অপেক্ষা ছাড়া কুরুকূলের রাজবধূদের আর করারই বা আছে কি? কে শুনছে তাদের কথা? কুরুকূলবধূরা যদি অস্ত্র ধরতে পারত, তাহলে সেদিন নপুংসকে ভরা পাশাখেলাঘরে রক্তপাত হয়ে যেত, বিদুর।…মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রর কথা ছেড়েই দিলাম – কিন্তু দ্রোণাচার্য? কৃপাচার্য? পরম শ্রদ্ধাস্পদ তাত ভীষ্ম? ওনাদের সবার বিবেক কি বাঁধা পড়ে গেছে রাজ কোষাগারের মাসোহারায়? তাই পরম নিশ্চিন্তে বসে তাঁরা কন্যাসম পাঞ্চালীর বস্ত্রহরণ দেখছিলেন?! ধিক্ এই রাজবংশে, বিদুর! ধিক্ এদের শিক্ষায়! ভাগ্যিস তুমি ব্রাত্য, ভাগ্যিস তুমি কুরুপ্রাসাদ-বহির্ভূত! ধন্য মাতা পরিশ্রমী, যাঁর শিক্ষায় তুমি বড়ো হয়েছ, বিদুর।”

বিদুর বললেন- “দেবি, পুরোনো কথা মনে করে অযথা নিজেকে কষ্ট দেবেন না।”

কুন্তী বললেন- “পুরোনো কথারাই যে আজ আমার সঙ্গী, বিদুর!…..জান বিদুর, পুত্রদের আমি অনেক নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা দিয়েছিলাম – ভিত শক্ত নাহলে কি আর প্রাসাদ গড়া যায়? সেই শতশৃঙ্গ পর্বতের সানুদেশের ছোট্ট কুটির – কী শান্তি ছিল সেখানে! মহারাজ পাণ্ডু আর মাদ্রী ঘুরে বেড়াতেন বনে বনে, পাঁচটি ছেলে থাকত আমার কোল জুড়ে। তাদের আমি শিখিয়েছিলাম সহবত, ভদ্রতা, ধৈর্য, সংযম। শিখিয়েছিলাম ভাতৃভাব আর ঐক্য, যা তাদের সবচেয়ে বড়ো শক্তি। সদাসর্বদা জ্যেষ্ঠের মর্যাদা রেখে, যুধিষ্ঠিরের কথা মেনে চলেছে চারটি ভাই। যুধিষ্ঠির বুঝত সব – আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম যে আমার অবর্তমানেও সে পারবে ছোটভাইদের খুশী রেখে, একসঙ্গে বেঁধে রাখতে। নকুল-সহদেবের স্নেহ-ভালোবাসা-আদরে সে কোনদিন কম পড়তে দেবে না। ভীম-অর্জুনের প্রাপ্যে সে কোনদিন কম পড়তে দেবে না।….আমার সেই সর্বজ্ঞানী ধার্মিক যুধিষ্ঠির এ’ কি করে বসল? তার পাশাখেলার আসক্তি আমাকে চিরদিন ভয়ভীত করে রেখেছে, কিন্তু সে কি শুনল আমার বারণ? ধার্মিক যুধিষ্ঠির কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে পাশা খেলে গেল সর্বস্ব বাজী রেখে! রাজ্য হারিয়েও তার জ্ঞান হল না – সে বাজী রাখল ভাইদের, বাজী রাখল স্ত্রীকে! …একেই কি বলে নিয়তি?”

বিদুর বললেন- “দেবি, পুত্র যুধিষ্ঠিরকে ক্ষমা করে দিন – সে মানুষমাত্র, ভগবান নয়।….আর নিয়তিকে খণ্ডন করার ক্ষমতা মানুষের নেই।”

কুন্তী বললেন- “ভাগ্যিস ঈশ্বর নারীকে ক্ষমা করার আর ভালোবাসার সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছিলেন! তাই কতো পিতা, কতো স্বামী, কতো পুত্র, কতো রাজপুরুষ নারীর জীবন তছনছ করেও ক্ষমা পেয়ে যায়!…..কিন্তু কুরুকূল শুধু নারীর ক্ষমা দেখেছে, নারীর শক্তি আর রোষ তাদের এখনো দেখতে বাকী আছে, বিদুর!”

বিদুর নতমস্তকে চুপ করে রইলেন।

নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন কুন্তী।

প্রিয় দেবরের  দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন- “বহুদিন হস্তিনাপুরের প্রজাদের দেখিনি, ব্যবস্থা করা যাবে? একবার তাহলে রাজপ্রাসাদ হয়ে দিদি গান্ধারীর সঙ্গে দেখা করে আসতাম।”

বিদুর হেসে বললেন- “আমিও তাই বলি….প্রজাদের দর্শনসুখ থেকে বঞ্চিত করবেন না। প্রিয় মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে তারা না-ই দেখতে পেল, প্রিয় মহারাণী কুন্তীকে দেখলেও তাদের মনে পড়বে যুধিষ্ঠিরকে, পাণ্ডবকে, দ্রৌপদীকে!…..কালই ব্যবস্থা করছি, দেবি।”

কুন্তী বললেন – “মহাকালের মন্দিরে একবার পূজো দিতে যাব, বিদুর – ঐ সঙ্গে সেই ব্যবস্থাও কর তাহলে।” বিদুর বললেন- “মহাকালের মন্দির তো শহরের আরেক প্রান্তে, রাজপ্রাসাদ থেকে অনেক দূরে। কালই যাবেন?”

কুন্তী বললেন – “ক্ষতি কি? পূজো দিয়ে রাজপ্রাসাদে যাব – সারা শহরটাই ঘোরা হয়ে যাবে।”

বিদুর বললেন- “পূজোর আগে তো আপনি জলস্পর্শ করবেন না….তবে কি রাজপ্রাসাদে বলে রাখব আপনার জন্য জলপানের ব্যবস্থা রাখতে?”

কুন্তী বললেন- “মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের প্রাসাদে আমি আর জলস্পর্শ করব না, বিদুর। তুমি বৃথা চিন্তা কর না, আমি সায়াহ্ণের আগেই ফিরে আসব। ফিরে এসে আহার করব।”

বিদুর বললেন – “আপনার শরীর….”

কুন্তী বললেন- “আমার শরীর ঠিক আছে, বিদুর।….আমার ছেলেরা কতো কষ্ট করছে, রাজনন্দিনী পাঞ্চালী বনে বনে ঘুরছে, আর আমি এইটুকু করতে পারব না? ক’ঘন্টার অনাহারে আমার কিছুই হবে না – এ’ আমাদের সবার তপস্যা, বিদুর।”

“যথা আজ্ঞা!” বলে অভিবাদন করে বিদুর নিষ্ক্রান্ত হলেন।

পরদিন প্রাতে পূজার সামগ্রী হাতে নিয়ে শুভ্র পট্টবস্ত্র-পরিহিতা কুন্তী উঠলেন রথে।

পূর্বাজ্ঞা অনুযায়ী, রথ চলল শহর ছাড়িয়ে মহাকালের মন্দিরের দিকে।

সেই প্রিয় পথ, সেই প্রিয় শহর, সেই সন্তানসম প্রিয় প্রজাগণ…..

রাস্তায় প্রজারা জয়ধ্বনি দিতে দিতে চলল – ‘জয় মহারাণী কুন্তীর জয়’…..’জয় মহারাজ যুধিষ্ঠিরের জয়’…..

‘জয় সতী-মা দ্রৌপদীর জয়’…..’জয় পাণ্ডবের জয়’…..

রথ থেকে নেমে এসে কুন্তী নতমস্তকে করজোড়ে জনতাকে অভিবাদন জানালেন, দু’ফোঁটা অশ্রু নেমে এল তাঁর চিবুক বেয়ে।

উত্তেজিত জনতা চিৎকার করে উঠল- ‘বিচার চাই…বিচার চাই’…..’সিংহাসনে মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে চাই’….’ন্যায় চাই….ন্যায় চাই’…..’জতুগৃহ চলবে না’….’পাশাখেলা চলবে না’….’নারীর অপমান রাজ্যের অপমান’…..‘ধর্মরাজ্য চাই’…..’বিচার চাই’…..

কুন্তী মন্দিরের সোপানে পা রাখলেন, চোখের জলের মধ্যে দিয়ে আবছা হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে।

কুন্তীর আগমনের সংবাদে মন্দির আজ জনশূণ্য করে রাখা হয়েছে।

পূজা শেষে, চরণামৃত পান করে, কুন্তী পুরোহিতকে প্রণাম জানালেন।

বৃদ্ধ পুরোহিত আশীর্বচন দিয়ে বললেন- “সুখানি দুখানি চ চক্রবৎ পরিবর্তন্তে! রাতের পর প্রকৃতির নিয়মে ভোর আসবেই, তাই দুশ্চিন্তা বৃথা।”

কুন্তী বললেন- “আপনার তো অবিদিত কিছুই নেই – কুন্তীরাজ্য থেকে হস্তিনাপুরে পা দিয়ে অবধি তো খালি দুর্যোগই চলছে…..সেই মেঘলা আকাশে দিন রাতের বিচার কি করে করি, বলুন!”

পুরোহিত হেসে বললেন- “আপনি সর্বজয়া – বিপদ আপনার সামনে আসবে, কিন্তু আপনিই পারবেন সেই দুর্যোগ কেটে জয়ী হয়ে বেরিয়ে আসতে।”

কুন্তী দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। আগেও শুনেছেন এই ভবিষ্যৎ-বাণী।

দীর্ঘ সোপান বেয়ে নেমে এসে কুন্তী যখন আবার রথে উঠলেন, সূর্য তখন মধ্যগগনে।

রথ এবার ছুটল হস্তিনাপুর রাজপ্রাসাদের দিকে।

প্রজাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে মাঝে মাঝে থেমে, অভিবাদন নিতে নিতে, কুন্তী এসে পৌঁছলেন রাজপ্রাসাদে। পরিচারিকা অভিবাদন করে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল অন্দরমহলে, গান্ধারীর কক্ষে।

সংবাদ আগেই দেওয়া ছিল।

যদিও কুন্তী গান্ধারীর সাক্ষাৎপ্রার্থী বলে বিদুর সংবাদ পাঠিয়েছিলেন, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র এসে গান্ধারীর কক্ষে বসে রইলেন কুন্তীর আসার অপেক্ষায়।

ইন্দ্রপ্রস্থ দুর্যোধনের হস্তগত হওয়ার পরেও ধৃতরাষ্ট্রের চিন্তা কমেনি, বরং বেড়েছে।

চিন্তিত মুখে ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীকে বললেন- “কুন্তী যদি রাজপ্রাসাদে না-ই থাকবে, তাহলে তার এই দর্শনে আসার দরকার কি? সেকি তোমায় দর্শন করতে আসছে, না হস্তিনাপুরবাসীকে দর্শন দিতে আসছে?!”

গান্ধারী বললেন – “কুন্তীর পুত্রবধূ এবং পুত্রদের সঙ্গে আপনার পুত্ররা যে ব্যবহার করেছে তাতে কুন্তীর হস্তিনাপুর রাজপ্রাসাদে না থাকাই তো স্বাভাবিক, মহারাজ!”

ধৃতরাষ্ট্র বললেন – “আমার পুত্ররা?……দুর্যোধন, দুঃশাসন কি তোমার পুত্র নয়?”

গান্ধারী বললেন- “তাও ভালো যে মহারাজ জানেন তাঁর শতপুত্রের মধ্যে কারা দুষ্কৃতকারী, যদিও দুষ্কৃতির শাস্তি দিতে মহারাজ অক্ষম!…..দুর্ভাগ্যবশত আমি তাদের কোনোদিন গর্ভে ধরেছিলাম, কিন্তু তাদের পুত্র বলতে আমি লজ্জা পাই!”

ধৃতরাষ্ট্র প্রসঙ্গ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন – “কিন্তু তোমার সঙ্গে কুন্তীর কি প্রয়োজন?…..কেন সে আসে?”

গান্ধারী বললেন- “এক ভগিনীর সঙ্গে আরেক ভগিনীর যে প্রয়োজন, তার সঙ্গে আমারও সেই প্রয়োজন মহারাজ। বিধির বিধানে আমরা দুজনেই কুরু-রাজবংশের সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা পড়ে গেছি, চোখের সামনে শত অনাচার দেখতে বাধ্য হচ্ছি- আমাদের হাত-পা বাঁধা, কিন্তু মন বাঁধা নয়। সেখানে হস্তিনাপুরের রাজনীতি প্রবেশ করতে পারেনি। সেই মন দিয়ে আমরা আজও একজন আরেকজনকে বুঝি, ছুঁয়ে থাকি।…..আপনি সেকথা বুঝবেন না, মহারাজ!”

পরিচারিকা এসে কুন্তীর আগমনবার্তা ঘোষণা করল।

গান্ধারী উঠে দাঁড়িয়ে কুন্তীকে অভ্যর্থনা এবং আলিঙ্গন করলেন। কুন্তী  ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীকে অভিবাদন করে আসন গ্রহণ করলেন। পরিচারিকা জলপান নিয়ে এসে দাঁড়াল।

গান্ধারী বললেন- “বেলা দুপুর গড়িয়ে গেল কুন্তী, আগে মুখে কিছু দিয়ে নাও।”

কুন্তী করজোড়ে বললেন- “না দিদি, মহাকালের মন্দিরে পূজা দিয়ে আসছি – ফিরে গিয়ে একেবারে সায়াহ্ণে ফলাহার করব।”

গান্ধারী বললেন – “মহাকালের মন্দির? সে তো বহুদূর, কুন্তী! এই গরমে এতোদূর…..একটু শরবত?”

কুন্তী বললেন – “না, দিদি!”

গান্ধারী আর কিছু বললেন না।

একটুক্ষণ নীরব থেকে বললেন- “কুন্তী, জিগেস করতেও লজ্জা পাই…..তবু ভরসা রাখি যে তুমি আমায় ভুল বুঝবে না, তাই জিগেস করছি…..কেমন আছে আমার যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব?….কেমন আছ তুমি?…..কেমন আছে পাঞ্চালী?….তাদের কথা ভেবে আমার মুখে অন্ন ওঠে না, কুন্তী…..রাতে আসে না নিদ্রা!”

কুন্তী বললেন- “তাদের কর্মের ভোগ তারা ভুগছে, দিদি। তুমি বৃথা চিন্তায় শরীরপাত কর না।….এখানে সব কুশল তো? বহুদিন তোমার চরণ দর্শন করিনি তাই আজ মনে হল….।”

এবারে ধৃতরাষ্ট্র মুখ খুললেন- “কুন্তী, দিদির চরণ দর্শনেই যদি তোমার মন তো রাজপ্রাসাদ ছেড়ে গেলে কেন? ভ্রাতা পাণ্ডুর স্ত্রীকে স্থান দেওয়ার জন্য হস্তিনাপুরের সমস্ত অনুরোধ অগ্রাহ্য করে তুমি বিদুরের বাড়ী গিয়ে উঠলে – কেন? দেশবাসী কি ভাববে তোমার মনে হল না একবারও? নাকি দেশবাসীর কাছে তুমি আমাকে দোষী করতে চাও?…..এটা ভুল না কুন্তী, যে যুধিষ্ঠির স্বেচ্ছায় পাশা খেলতে এসেছিল – সে স্বেচ্ছায় তার সর্বস্ব পণ করেছিল!”

কুন্তী শান্তমুখে বললেন – “বিদুরের গৃহে আমি পরম শান্তিতে আছি, মহারাজ।….কে যে কি করেছিল সেতো আজ ইতিহাস।আমার পুত্ররা আর আপনার পুত্ররা যা করেছে তা’ তাদেরই কর্ম, ফলও তাদেরই। আপনি কেন তা নিয়ে ব্যস্ত হচ্ছেন আর আমাকেই বা কেন এতো প্রশ্ন করছেন, মহারাজ? আপনাকে তো আমি এতোদিনে একবারের জন্য এই প্রশ্নও করিনি যে আপনি রাজসিংহাসনে বসে কূলবধূ পাঞ্চালীর অপমানে চুপ থাকলেন কিভাবে?….পাঞ্চালীর আর্তকান্না এখনও এই প্রাসাদের দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ঘুরছে – আমি কি করে এইখানে কাটাব সুদীর্ঘ তেরো বছর, আমার পুত্রবধূ এবং পুত্রদের ছাড়া?”

ধৃতরাষ্ট্র কিছু বলার আগেই গান্ধারী বললেন- “কুন্তী, আমার আশীর্বাদ আছে তোমার পুত্রবধূ এবং পুত্রদের সঙ্গে – তারা নিরাপদে ফিরে আসবে। ধর্মের জয় হবে!”

কুন্তী অভিবাদন জানিয়ে বিদায় নিলেন।

ধৃতরাষ্ট্র একাকী এসে বসলেন নির্জন সভাগৃহে।

দাসী এসে জানাল যে গুপ্তচর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সাক্ষাৎপ্রার্থী।

ধৃতরাষ্ট্র তাকে ভিতরে আসার আজ্ঞা দিলেন।

চর এসে প্রণাম করে নিবেদন করল কুন্তীর শহরভ্রমণ কথা।

ধৃতরাষ্ট্র বললেন – “প্রজারা কেউ কুন্তীকে দেখেছে?”

চর বলল – “হ্যাঁ মহারাজ। প্রজাদের একটি দল পূর্বতন রাণীমার জয়ধ্বনি দিতে দিতে রথের পিছু পিছু মন্দির অবধি গিয়েছে, আমি ছিলাম তাদের সঙ্গে।”

ধৃতরাষ্ট্র বললেন – “আর কিছু?”

চর বলল – “প্রজারা বিচার চাইছিল…..পঞ্চপাণ্ডবের জয়ধ্বনি দিচ্ছিল…..”

ধৃতরাষ্ট্র বললেন – “আচ্ছা, তুমি যাও।”

গুপ্তচরকে বিদায় দিয়ে, সভাগৃহ থেকে ধৃতরাষ্ট্র এলেন তাত ভীষ্মের মহলে।

পরিচারিকাকে কক্ষের বাইরে যেতে আদেশ করে ধৃতরাষ্ট্র বললেন – “আমি বড়ই চিন্তিত, তাতশ্রী!”

ভীষ্ম বললেন – “অখণ্ড রাজ্য এখন দুর্যোধনের হাতে – আর কিসের চিন্তা, মহারাজ?”

ধৃতরাষ্ট্র বললেন – “চিন্তা কুন্তীকে নিয়ে, চিন্তা প্রজাদের নিয়ে।….কুন্তী রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে চলে গেছে, এ’কথা প্রজারা জানে।কুন্তী মাঝে মাঝেই শহর-দর্শনে বেরিয়ে প্রজাদের সঙ্গে দেখা করে….এইভাবে চললে একটা বিদ্রোহ অসম্ভব নয়। বিদুরকে কতোবার বলেছি যে সে যেন তার অক্ষমতা জানিয়ে কুন্তীকে রাজপ্রাসাদে পাঠিয়ে দেয়, কিন্তু সে আমার মন্ত্রী হয়েও আমার কথা শোনে না…..আমি কি করি, তাতশ্রী?” ভীষ্ম বললেন – ”মহারাজ, আপনি বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন করছেন। কুন্তী কদাচিৎ মন্দির বা অন্যস্থানে যায়, প্রজাদের তাকে দেখতে পাওয়া তো স্বাভাবিক। আর কুন্তী রাজপ্রাসাদে থাকতে না চাইলে বিদুর কেন সেই ইচ্ছাকে অসম্মান করবে?…..আপনি অযথা চিন্তা করবেন না। বিদুরের মতো জ্ঞানী, ধার্মিক লোককে মন্ত্রী পেয়ে কুরুরাজসভা ধন্য হয়ে গেছে – তাকে সসম্মানে সঙ্গে রাখুন।”

চিন্তিত ধৃতরাষ্ট্র অন্দরমহলে এসে বসলেন।

গান্ধারীকে বললেন – “তাতশ্রী, বিদুর, এরা আমার সভায় থাকলেও, মনে মনে সবাই আছে পাণ্ডবের সঙ্গে। কেউ দেখতে চাইছে না যে কুন্তী কি করছে – কুন্তী অত্যন্ত চতুর, তাকে আমি পাণ্ডবের চেয়ে বেশী ভয় পাই। প্রজাদের স্মৃতি স্বল্প – বিশেষ করে রাজপরিবারে ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা, যা তাদের জীবনকে কোনোভাবে প্রভাবিত করে না, সেটা ভুলতে তাদের বেশীদিন লাগে না। কিন্তু কুন্তী তাদের ভুলতে দিচ্ছে না – বারবার প্রজাদের দর্শন দিয়ে সে তাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে কি হয়েছিল পাণ্ডবের সঙ্গে, কি হয়েছিল দ্রৌপদীর সঙ্গে।”

গান্ধারী বললেন- “মহারাজ, বিনা দোষে যে নিজের স্ত্রীকে অপমানিত হতে দেখেও মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়, বিনা দোষে যে রাজ্য হারিয়ে বনবাসে যায় – সব সৎ লোকই থাকে তার দিকে। যারা মুখে বলছে না, তারাও মনে জানে যে দুর্যোধন দুরাচারী, পাপী, অসৎ….!”

ধৃতরাষ্ট্র কাতরস্বরে বললেন – “না, গান্ধারী না! তুমি মা হয়ে পুত্রকে অভিশাপ দিও না!”

গান্ধারী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন – “মহারাজ, অভিশাপ আমি সেদিনও দিইনি আজও দিচ্ছি না। কিন্তু শাস্তি তার প্রাপ্য ছিল – যে শাস্তি তাকে আপনি দেননি। আপনি কি মনে করেন যে আপনি ক্ষমা করলে ঈশ্বরও তাকে ক্ষমা করে দেবেন?…..তাহলে তো ধর্ম বৃথা!”

করতালি দিয়ে পরিচারিকাকে ডাকলেন গান্ধারী এবং পরিচারিকার হাত ধরে কক্ষ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন।

একাকী চিন্তিত ধৃতরাষ্ট্র করতলে মাথা রেখে বসে রইলেন।

 

 ৭ প্রতীক্ষা

কুন্তী এবং বিদুর-জায়া সুলভা মধ্যাহ্ণভোজনের আয়োজন করে অপেক্ষায় বসে আছেন – অন্যদিন এইসময়ে বিদুর আহার করতে চলে আসেন,কিন্তু আজ তিনি বহির্মহল থেকে এখনও অন্দরে আসেননি।

সুলভা বললেন – “দিদি, আপনি আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবেন? আপনি খেয়ে নিন।”

কুন্তী বললেন – “আরেকটু দেখি….ঐ তো…”

সুলভা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন – বিদুর আসছেন।

হাত-মুখ প্রক্ষালন করে আসনে এসে বসলেন বিদুর।

সুলভা বললেন – “আজ এতো দেরী হল?”

বিদুর বললেন – “কুম্ভক এসেছিল।”

কুন্তী বললেন – “রম্ভা ভালো আছে তো?…কুম্ভকের কি সমাচার?”

বিদুর মুখে গ্রাস নিয়ে বললেন- “রম্ভা ভালো, পরিবারের সবাই ভালো।….কুম্ভক বলল যে সেইদিন যারা মহারাণীর রথের সঙ্গে সঙ্গে মহাকালের মন্দির অবধি গিয়েছিল, তাদের মধ্যে ভক্ত প্রজারা ছাড়াও নাকি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের কিছু গুপ্তচরও ছিল। এটা একটু চিন্তার কথা, পরের বার মহারাণীর সঙ্গে কয়েকজন লাঠিয়াল দিতে হবে।”

কুন্তী হেসে বললেন- “থাক্ না গুপ্তচর – তাতে তুমি এতো চিন্তিত হচ্ছো কেন, বিদুর? লাঠিয়ালের কথাই বা ভাবছ কেন? আমি তো আর সিংহাসনের দাবীদার না, যে আমাকে মেরে ফেললে সুবিধে হবে!”

বিদুর বললেন – “মহারাণি, কিছুই বলা যায় না। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র সদাই শঙ্কিত – আপনাকে নিয়ে তাঁর অনেকরকম চিন্তা। আমাকে বহুবার বলেছেন যে আমি যেন আপনাকে রাজপ্রাসাদে গিয়ে থাকতে বলি।”

কুন্তী বললেন – “যাতে তাঁর চোখের সমুখে তেরোবছরের কারাবাস সম্পন্ন হয় আমার?….”

বিদুর চিন্তিত মুখে বললেন- “কতকটা তাই….আপনার বুদ্ধিকে তিনি ভয় পান। তিনি জানেন যে পঞ্চপাণ্ডবের মেরুদণ্ড আপনি, শক্তির মূল আপনি, পথনির্ধারক আপনি।….বাসুদেব কৃষ্ণ মহারাজের হাতের বাইরে, আপনাকে যদি…”

কুন্তী হেসে বললেন- “পাপীর মনে সদাই শঙ্কা!…মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের ভাবনা তাঁকে ভাবতে দাও, তুমি নিশ্চিন্ত থাক – আমি পরেরবার লাঠিয়াল নিয়েই যাব।”

বিদুর বললেন – “হ্যাঁ, আমি কুম্ভককে তাই বলেছি। সে বলেছে যে পরেরবার আপনি যখন বেরোবেন, তাকে যেন দিন সাতেক আগে খবর দেওয়া হয় – সে অনেক বেশী লোক নিয়ে নিজেও থাকবে মহারাণীর রথের সাথে। এবারে একদিন মাত্র সময় পাওয়ায় সে পুরো আয়োজন করতে পারেনি।”

মহারাজ পাণ্ডু তাঁর রাজত্বকালে রম্ভার প্রেমিক, মথুরার কুম্ভককে হস্তিনাপুরে চাকরি এবং বসতবাড়ী দিয়ে  গিয়েছিলেন। রম্ভাকে বিবাহ করে কুম্ভক বহুবছর হলো হস্তিনাপুরেই বসবাস করছে।

সময়ের খেলায় কুন্তী এবং পাণ্ডু ও পঞ্চপাণ্ডব হস্তিনাপুর থেকে বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলেও, কুম্ভক ও তার পরিবার একনিষ্ঠতার সঙ্গে কুন্তীর প্রতি তাদের কর্তব্য পালন করে গেছে – বিদুরের সে অত্যন্ত আস্থাভাজন। হস্তিনাপুরের প্রজাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াও, প্রয়োজন মতো কুম্ভক ও তার ছেলেরা মথুরায় বসুদেবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। এখনও শ্রীকৃষ্ণকে কোনো খবর পাঠাতে হলে বিদুর ডেকে পাঠান কুম্ভককে।

রাজ কারাগৃহে পরিদর্শকের চাকরি ছাড়াও, শহরে কুম্ভকের দু’টি দোকান আছে – দুই ছেলে চালায় দোকানদুটি। বিক্রিবাটা ভালোই হয়। দোকানে নানাধরণের লোকসমাগম লেগেই থাকে – সেখান থেকে নানারকম খবর পান বিদুর, কুম্ভকের  মারফত। কুম্ভক তাই বিদুরের বাসগৃহে প্রায়শই গমনাগমন করে থাকে।

আজও যেমন সে জানিয়ে গেল গুপ্তচরের সংবাদ।

পাশাখেলা এবং পাণ্ডবের বনবাসের পর ধৃতরাষ্ট্র, দুর্যোধন এবং শকুনির ওপর প্রজারা অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়েছিল – কিন্তু চতুর রাজনীতির প্রয়োগ করে হস্তিনাপুর রাজপ্রাসাদ এখন তাদের মত ঘোরানোর জন্য উঠেপড়ে  লেগেছে।

গত শীতে গরীব প্রজাদের কম্বল বিতরণ করা হয়েছিল, এটা বিদুর জানতে পেরেছিলেন – যদিও দান করার আগে রাজ্যের মন্ত্রী হিসাবে তাঁর মতামত কেউ জানতে চায়নি। কিন্তু স্বল্প-বৃষ্টির কারণ দেখিয়ে এই গ্রীষ্মে যে প্রতিটি কৃষক পরিবারকে কিছু শস্য আর নগদ টাকা দেওয়া হচ্ছে, সেটা তিনি একেবারেই জানতেন না। কৃষকেরা কেউ তাদের আর্জি নিয়ে রাজসভায় উপস্থিত হয়নি, রাজবাড়ী থেকে বিশেষ দূত গিয়ে দুর্যোধনের নাম করে এই সাহায্য পৌঁছে দিচ্ছে ঘরে ঘরে। কুম্ভকের কাছ থেকেই এই সংবাদ পেলেন বিদুর। এবং এই সংবাদ যে তাঁর কাছ থেকে সযত্নে গোপন করা হয়েছে, তাও তিনি বুঝতে পারলেন।

মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র বিদুরকে বিশ্বাস করেন না, আত্মীয় বলেও ভাবেন না – বিদুর তা জানেন।

যখন কুরুসভায় দ্রৌপদীর অপমানের প্রতিবাদে মুখর বিদুরকে দুর্যোধন ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে অপমান  করেছিলেন, ধৃতরাষ্ট্র তখন দুর্যোধনকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছিলেন রাজ্যের ‘মন্ত্রী’কে অপমান করা থেকে, পূজণীয় কাকাকে অপমান করা থেকে নয়! বিদুর তা’ ভোলেন নি।

অন্ধ রাজার ধর্মহীন রাজপাট……এই রাজকার্যে আর বিদুরের রুচি নেই – পড়ে আছেন শুধু কুন্তীর মুখ চেয়ে,  যুধিষ্ঠিরের মুখ চেয়ে, পাণ্ডবের মুখ চেয়ে। রাজপ্রাসাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে তবু কিছু খবর পাবেন, তাত ভীষ্মের সঙ্গে কথা হবে – নাহলে কোনো খবরই পাবেন না।

তেরো বছর তাই এইভাবেই কাটাতে হবে – মহারাণী কুন্তীর ভাষায় ‘এ’ আমাদের সবার তপস্যা’!

সেই তপস্যাই করে যাচ্ছেন বিদুর প্রাণপণে, দাঁতে দাঁত চেপে।

তেরো বছরের পর যে যুদ্ধ আসন্ন, সে সম্বন্ধে কুন্তীর মতো বিদুরও নিশ্চিত।

সেই যুদ্ধই মুক্তি দেবে বিদুরকে, কুন্তীকে, পাণ্ডবদের এবং অন্য যাঁরা দিন বদলের অপেক্ষায় তপস্যারত  তাঁদের সকলকে। সেই আশাতেই দিন গোণা।

দিনের পর মাস আর মাসের পর বছর ঘুরতে থাকে – বনবাসের বারো বছর কেটে গেল।

শ্রীকৃষ্ণের সহায়তায় জীবনের কঠিন এক অধ্যায় পার করে, পাণ্ডব অজ্ঞাতবাস নিলেন মৎস্যদেশে।

আজন্ম ক্ষাত্রধর্মে অভ্যস্ত, বড়োজোর ব্রাহ্মণবেশে ভিক্ষা নিতে শেখা, পঞ্চপাণ্ডব এবং দ্রৌপদী সাধারণ  নাগরিকের মতো দয়া প্রার্থনা করে পরিচারক-পরিচারিকার বেশে লুকিয়ে রইলেন মৎস্যরাজ্যের রাজধানীতে।

সহ্য করতে শিখলেন পরিচারকজীবনের গ্লানি, পরাধীনতার দৈন্য – যার স্বাদ এর আগে, এমনকি এই বারোবছরেও, পেতে হয়নি।

কুন্তীর মাথার চুল ধূসর হল।

পাণ্ডবপুত্ররা পূর্ণবয়স্ক হল।

শ্রীকৃষ্ণের কূটনীতি এবং বুদ্ধিমত্তায় ভারতবর্ষের এক বৃহদংশ গোপনে যুধিষ্ঠির তথা পাণ্ডবের সাহায্যে দাঁড়ানোর নির্ণয় নিল। বৈবাহিক সম্পর্কের জাল ছড়িয়ে গেল বহুদূর, এ’ছাড়াও রইলো বন্ধুত্বের আবেদন।

পটভূমি তৈরী – অপেক্ষা শুধু অজ্ঞাতবাস শেষ হওয়ার।

বিদুর এখনও কুরুরাজসভায় যান, তাত ভীষ্মের সঙ্গে আলাপচারিতায় দুজনেরই মনের গ্লানি দূর হয়।

সেদিনও রাজকর্ম শেষে বিদুর এলেন ভীষ্মের মহলে।

ভীষ্মকে অভিবাদন করে বিদুর বললেন- “আপনার শরীর ভালো তো? আপনাকে আজ সভায় খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।”

ভীষ্ম বললেন-“বিদুর, আমি সত্যিই বড়ো ক্লান্ত – শরীরে ও মনে।এবার ছুটি চাই….পরম বিশ্রামের অপেক্ষায় আছি।”

বিদুর বললেন- “তাতশ্রী, আপনার মুখে এ’ কথা সাজে না। শুধু আপনার পূণ্যেই কুরুবংশ এখনও টিকে আছে।”

ভীষ্ম বললেন- “পূণ্য?….তুমি আমাকে আর লজ্জা দিও না, বিদুর! যেদিন কুরুসভায় পাশাখেলা আর দ্রৌপদীর অপমান হল, সেইদিন থেকে কুরুবংশ ডুবে গেছে পাপে – পূণ্য কোথায় দেখছ তুমি?….আমিও রয়ে গেছি সেই পাপেরই অংশ হয়ে, যতক্ষণ না ভরাডুবি হয়।”

বিদুর বললেন – “কিন্তু আপনি তো ইচ্ছে করলেই যে কোনদিন এর থেকে মুক্তি পেতে পারেন, তাতশ্রী!”

ভীষ্ম বললেন – “না বিদুর, এই প্রতিদিনের নরকযন্ত্রণাই আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। মুক্তি পাব সেদিন, যেদিন প্রায়শ্চিত্ত শেষ হবে….যেদিন কুরুসিংহাসন সুরক্ষিত হবে। তার আগে আমার মুক্তি নেই, আমি বচনবদ্ধ।”

বিদুর বললেন- “আপনি কুরুসিংহাসন রক্ষায় বচনবদ্ধ – আপনি সে প্রতিজ্ঞা পালন করে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আর দুর্যোধনের পক্ষে রাজ্য রক্ষা করেছেন এতদিন। দুর্যোধন অখণ্ড রাজ্য নিয়ে সুরক্ষিত – আর কিসের অপেক্ষা?”

ভীষ্ম বললেন- “বিদুর, তুমি কি জান না যে কুরুসিংহাসন আজও সুরক্ষিত নয়? কুরু রাজমুকুট আজও অপেক্ষায় আছে যোগ্যতম শিরের? কুরুলক্ষ্মী আজ রোরুদ্যমানা?…শান্তি কই কুরুরাজ্যে? যুদ্ধের দামামা বাজল বলে!”

বিদুর বললেন- “তাতশ্রী, সেই যুদ্ধ যদি অবশ্যম্ভাবী তবে দেরী কিসের? ধর্ম আপনার অপেক্ষায়, ইতিহাস আপনার অপেক্ষায়।”

ভীষ্ম উঠে দাঁড়িয়ে কক্ষের মধ্যে পায়চারী করলেন কিছুক্ষণ। বাতায়নের পাশে গিয়ে সুদূর দিগন্তে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন।

তারপর বিদুরের উৎসুক মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন- “এই বৃদ্ধ তাতশ্রী আজ নতুন ইতিহাস তৈরী করতে অক্ষম, বিদুর।….একদিন, প্রথম যৌবনে, ভাবতাম ভাগ্য আমার হাতের মুঠোয় আর পৃথিবী পায়ের তলায়!

দ্বিধা, দ্বন্দ্ব কাকে বলে জানতাম না। পরাজয় মানতে জানতাম না।….সেইদিন আজ আর নেই।

মাতা সত্যবতী আর পিতা শান্তনুকে যেদিন বচন দিয়েছিলাম, সেইদিন থেকে আমার আত্মা আর দেহ পৃথক হয়ে গেছে – আমি জেনেছি আমি ভাগ্যের হাতে পুতুল, ভাগ্য আমার হাতে নয়। পৃথিবী, জয়পরাজয় – কিছুই আমার হাতে নয়।…..দেহ আমার আজও বচনবদ্ধ, আর আত্মা বেদনাবিদ্ধ।

দেহের আনুগত্য রক্ষিত হস্তিনাপুর রাজসিংহাসনের জন্য – সে সিংহাসনে যদি মর্কটও বসে, তবুও ভীষ্ম তাতে প্রতিবাদ করবে না। সব অনাচার সহ্য করেও, কুরুরাজকে সাহায্য করে যাবে ভীষ্ম।

আর আত্মার প্রার্থনা রক্ষিত ধর্মের জন্য, ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য – সে প্রার্থনা পূরণের পথে ভীষ্ম কোনদিন বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না। সব বচন রক্ষা করেও, ধর্মের পথ কণ্টকমুক্ত করে যাবে ভীষ্ম।

….এই আমার নিয়তি, বিদুর।

বিচিত্রবীর্য থেকে দুর্যোধন – যোগ্যতা অযোগ্যতার বিচার না করে, ন্যায় অন্যায়ের প্রশ্ন না তুলে, সেবা করে গেছি….শুধু সেবাতেই আমার অধিকার, প্রতিবাদে নয়।

আমি শুধু কুরুরাজের আজ্ঞাবহ দাস – পথপ্রদর্শক কুরুজ্যেষ্ঠ নই।

কিন্তু বিদুর তুমি স্বাধীন, তুমি বচনবদ্ধ নও, তুমি জ্ঞানী। আমি জানি, তুমি ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে – আমার আশীর্বাদ রইল।…ধর্মের জয় এনে, আমার আত্মাকে দেহের খাঁচা থেকে মুক্তি দাও।”

ভীষ্মর গলায় যে বেদনা ছিল, তা স্পর্শ করল বিদুরকে।

কিছুক্ষণ নতমস্তকে বসে থেকে, আর কিছু না বলে, বিদুর বিদায় নিলেন ভীষ্মকে অভিবাদন জানিয়ে।

অত্যন্ত অন্যমনস্কভাবে সেদিন গৃহে ফিরলেন বিদুর। মনটা তাঁরও ভারাক্রান্ত হয়ে গেছে। তাত ভীষ্মকে এতো হতাশ, এতো বিষণ্ণ, আগে কোনদিন দেখেননি তিনি।

কুন্তী লক্ষ্য করলেন বিদুরের এই অন্যমনস্কতা।

দাসী জল নিয়ে এল। সে ফিরে গেলে, কুন্তী জিগেস করলেন – “বিদুর, রাজপ্রাসাদে সব কুশল তো?”

বিদুর বললেন – “তাতশ্রীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম আজ – উনি বড়ো ক্লান্ত, বিষণ্ণ!….”

কুন্তী বললেন -“উনি তো বহুদিন ধরেই মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আর দুর্যোধনকে রাজ্য চালাতে দেখে আসছেন – নতুন কিছু…?”

বিদুর বললেন- “মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, দুর্যোধন, গান্ধারনরেশ শকুনি – এদের সঙ্গে, এদের আজ্ঞাবহ হয়ে, প্রতিদিনের রাজকার্য চালিয়ে যাওয়া যে কত কঠিন তা আমি জানি। আমি তবু কার্য শেষে বাড়ী এসে মুক্তবাতাসে নিঃশ্বাস নিই। তাতশ্রীর জন্য কী আছে? ওনার আত্মা অপমানিত কিন্তু দেহ বচনবদ্ধ! কি দুঃসহ এই কারাবাস!”

কুন্তী বললেন – “কিন্তু উনি নিজেই তো এই নির্ণয় নিয়েছেন, বিদুর!”

বিদুর বললেন – “দেবি, তাইজন্যেই তো এ’ আরও অসহনীয়!”

কুন্তী বললেন- “জানি না, বিদুর – তুমি তাঁকে আজন্ম চেন, তুমি হয়তো ভাল বুঝবে।….আমি তাতশ্রীকে চিনেছি মহারাজ পাণ্ডুর স্ত্রী হয়ে হস্তিনাপুরে পা রাখার পর। আমাকে, আমার বংশকে, তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই আমার বিবাহের কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি মদ্রদেশে সম্বন্ধ করেন মহারাজ পাণ্ডুর। রাজপরিবারের সব বিবাহে, সব রাজনীতিতে, তিনি মহারাণী সত্যবতীর বা মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের প্রতিভূ হয়ে সক্রিয়, স্বেচ্ছায় বিরাজমান। আমি জানি না এ’ তাঁর রাজপ্রাসাদে নিজের স্থান সুদৃঢ় রাখার উপায় কিনা – তবে আমার কাছে তিনি কুরুবংশের রাজপ্রতিনিধি ছাড়া আর কোনোভাবেই প্রতিভাত হননি কোনোদিন।কুরুরাজবংশের কর্মের সঙ্গে, হস্তিনাপুরের ভালো-মন্দ নির্ণয়ের সঙ্গে তিনি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত – তিনি আলাদা নন। নিজেকে তিনি হস্তিনাপুর প্রাসাদের রাজনীতির উর্দ্ধে রাখার চেষ্টা করেননি কখনও, চরমতম বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়েও না – তাই আজকে উনি ক্লান্ত কেন এটা বুঝতে আমি অক্ষম, বিদুর।”

বিদুর বললেন – “উনি যে বচনবদ্ধ, দেবি!….যে স্বাধীনতা আমার আছে, সে স্বাধীনতা ওনার নেই।”

কুন্তী বললেন – “কোনটা বড়ো, বিদুর? কোনো এক সুদূর অতীতে নেওয়া এক শপথ, নাকি আজকের বংশধরদের কাছে সত্য এবং ধর্মের নজির তুলে ধরা? যাঁদের কাছে তাতশ্রী বচন দিয়েছিলেন, মহারাজ শান্তনু আর মহারাণী সত্যবতী, তাঁরা আজ কেউ নেই। কিন্তু আমরা সবাই তো এখানেই আছি! আজকের ধর্মযুদ্ধের একদিকে দাঁড়িয়ে যুধিষ্ঠির আর আরেকদিকে দুর্যোধন – দুজনেই তাতশ্রীর পৌত্র। তাতশ্রী যদি দুর্যোধনের দিকে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি স্বেচ্ছায় জেনেবুঝেই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”

বিদুর বললেন- ”দেবি, কুরুকূল যেদিন তার যোগ্যতম উত্তরাধিকারী দেবব্রতকে সিংহাসন ত্যাগ করালো ক্ষুদ্র স্বার্থের কারণে…..যেদিন কনিষ্ঠ সৎ-ভ্রাতা বিচিত্রবীর্যের বংশজদের পথ নিষ্কণ্টক করার জন্য দেবব্রত হলেন সর্বত্যাগী অকৃতদার ভীষ্ম…..যেদিন প্রথমবার কুরুবংশের অযোগ্য উত্তরাধিকারীরা ঋজু ভীষ্মকে তাদের আজ্ঞার নীচে মাথা নীচু করতে বাধ্য করার ধৃষ্টতা দেখাল…..যেদিন কুরুরাজপ্রাসাদ মহাবীর ভীষ্মকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা শুরু করল আনুগত্যের শপথে বেঁধে – সেইদিন থেকে শুরু হল কুরুবংশের পতন আর ভীষ্মের নীরবতা। আমি জানি এই নীরবতা শতকথার চেয়ে বাঙ্ময় – দুঃখ এই যে কুরুরাজপ্রাসাদ এই কথা বোঝে না বা বোঝার চেষ্টা করে না।….আজ আমাদের মতো তাতশ্রীও মহাকালের  অপেক্ষায় দিন গুণছেন – তাতেই তাঁর মুক্তি!”

কুন্তী বললেন- “কুরু রাজপরিবারের হীরা ফেলে আঁচলে কাঁচ বাঁধার এই যে চিরকালীন প্রবণতা, এর দাম একদিন দিতেই হবে হস্তিনাপুরকে।”

বিদুর বললেন – “অহমিকায় দৃষ্টি আবদ্ধ থাকলে বোধহয় এই হয়।”

কুন্তী বললেন- “…কিন্তু বিদুর, তাতশ্রীর আনুগত্য হস্তিনাপুরের সিংহাসনের প্রতি, কোনো ব্যক্তির প্রতি নয়। আর যে যুদ্ধের অপেক্ষায় আমরা দিন গুণছি, সেই যুদ্ধের শেষেই নির্ণীত হবে যে হস্তিনাপুরের সিংহাসন কার! এই অবস্থায় দুর্যোধনের হয়ে যুদ্ধ করাটাও কি তাতশ্রীর কর্তব্যের মধ্যে পড়ে?”

বিদুর বললেন- “দেবি, আমি যা বুঝেছি তা হল এই – উত্তরাধিকারের প্রশ্নে যে লড়াই, সেই লড়াই দুর্যোধন ও যুধিষ্ঠিরের; কিন্তু মহারাজ পাণ্ডুর অবর্তমানে সিংহাসনের ওপর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের অধিকার নিয়ে যদি প্রশ্ন না থাকে আর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র যদি তাত ভীষ্মকে আজ্ঞা করেন দুর্যোধনের হয়ে কৌরবপক্ষে যুদ্ধ করতে, তাহলে তাতশ্রী সেই যুদ্ধ করবেনই।”

কুন্তী বললেন – “অধর্মের হাতে শৌর্য, বীর্য, যোগ্যতার কী ভীষণ অপচয়!….”

বিদুর বললেন- “কিন্তু সবটাই অপচয় নয়, দেবি! স্বপক্ষে যুদ্ধ করা হাজার সৈনিকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বিপক্ষে অনিচ্ছায় যুদ্ধ করা এক মহারথী, যাঁর মন পাণ্ডবের দিকে কিন্তু শরীর কৌরবের দিকে।….আমি তাতশ্রীকে খুব ভালো করে জানি – উনি চান যে কুরুবংশের উত্তরাধিকারী হিসাবে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসুক ধার্মিক যুধিষ্ঠির, কিন্তু মুখ খুলে সেকথা বলতে তিনি অক্ষম। তাতশ্রীর আসল যন্ত্রণার কারণ এটাই। এই অক্ষমতাই ওনাকে কুরে কুরে শেষ করে দিচ্ছে আর এই অক্ষমতার কারণেই পাণ্ডবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাতশ্রী থাকবেন কৌরবপক্ষে, কিন্তু থাকবেন শক্তিহীন হয়ে।”

কুন্তী বললেন – “আর দ্রোণাচার্য? কৃপাচার্য?”

বিদুর বললেন – “ধরে নেওয়া ভালো যে ওনারা দুর্যোধনের পক্ষেই যুদ্ধ করবেন আর পূর্ণ শক্তিতে যুদ্ধ করবেন।…কুরুরাজের বেতনভোগী কোনো কর্মচারীরাই মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের আজ্ঞা উপেক্ষা করতে পারবেন না, তবে কৌরবের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য আচার্যদের শুধু সেটাই একমাত্র কারণ নয়।…দ্রোণাচার্য এই তেরোবছর ধরে ইন্দ্রপ্রস্থ সামলাচ্ছেন….সেও রাজনীতির আরেক চাল। তাছাড়া, পাঞ্চালরাজের সঙ্গে আত্মীয়তা পাণ্ডবের পক্ষে লাভজনক হবে – মহারাজ ধ্রুপদ সসৈন্যে যোগ দেবেন যুদ্ধে, পাণ্ডবের পক্ষে; কিন্তু তার মানে হবে এই যে দ্রোণাচার্য তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুতাকে ঝালিয়ে নেবেন মহারাজ ধ্রুপদের বিরুদ্ধে এবং সঙ্গে থাকবেন শ্যালক কৃপাচার্য। অতএব আচার্যদ্বয় তাঁদের সর্বশক্তি নিয়ে ধ্রুপদ তথা পাণ্ডবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নামবেন, এটা ধরে নেওয়াই ভালো।”

কুন্তী বললেন- “বিদুর, তুমিও তো কুরুরাজের বেতনভোগী কর্মচারী – তোমাকে যদি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আজ্ঞা করেন…?”

বিদুর বললেন- “কেন বৃথা চিন্তা করছেন, দেবি? আমার ওপর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের কোনো আজ্ঞা চলবে না – কারণ যুদ্ধের আগেই আমি রাজকর্মে ইস্তফা দেব।”

কুন্তী বললেন- “ক্ষমতার-গদীতে-বসা হস্তিনাপুর যত সহজে রথী-মহারথীদের নিজের পক্ষে টেনে আনতে পারবে, তেরো বছর বনবাসে-অজ্ঞাতবাসে ঘোরা আমার কপর্দকহীন পুত্ররা তো তা পারবে না! কি করে তারা যুদ্ধে কৌরবের সঙ্গে পাল্লা দেবে, বিদুর?”

বিদুর বললেন- “দেবি, আপনার পুত্রেরা কপর্দকহীন হয়ে বনে ঘুরছে, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বনে নেই এবং তিনি হাত গুটিয়ে বসে নেই। তাঁর উদ্যোগে ভারতবর্ষের রাজন্যবর্গের এক বৃহদংশ পাণ্ডবের সমর্থনে দাঁড়াবে – আপনি এ’ বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।….এছাড়া আছে মহারাজ পাণ্ডুর সময় থেকে গড়ে তোলা তিনপুরুষের বৈবাহিক সম্পর্ক – সেও সংখ্যায় কম নয়।”

কুন্তী বললেন – “সব বৈবাহিক পরিবারই যে পাণ্ডবের দিকে দাঁড়াবে, আমার এমন ভরসা নেই। মদ্ররাজ শল্য কি করবেন তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে – মাদ্রীর মৃত্যুর পর থেকেই তিনি…..”

বিদুর বললেন – “তিনি যদি নাও থাকেন, তাতেই বা কী? আরও বহু রাজা আছেন।…..দেখাই যাক না কি হয়। আর মহাবলী পাণ্ডব একাই একশো, সঙ্গে আছেন যাদবকূলশিরোমণি শ্রীকৃষ্ণ। ভয় কিসের?”

কুন্তী বললেন- “কর্ণ যদি কৌরবের সঙ্গে না থেকে পাণ্ডবের সঙ্গে থাকত….”

বিদুর বললেন- “কর্ণ মহাবীর, কিন্তু গ্রহণ-লাগা সূর্যে সেই তেজ কোথায়?…”

কুন্তী বললেন- “গ্রহণই বটে!…. কর্ণ কিনা করল নারীকে অপমান?!”

বিদুর বললেন- “ঐ যে – ঋণ! তাতশ্রীর মতো কর্ণও হস্তিনাপুর সিংহাসনের সঙ্গে আবদ্ধ, শপথ নাহোক ঋণের বন্ধনে।আর হস্তিনাপুরের সিংহাসনে আজ আসীন মূর্তিমান অধর্ম। সেই ছায়া পড়েছে তাত ভীষ্ম, মহাবীর কর্ণ সবার ওপরে।”

কুন্তী বললেন- “ঋণও নিতে হয় মহাজন বুঝে, মহাবীর কর্ণ সে কথা ভুলে গেল!….কিন্তু কোনো ঋণ তাকে বাধ্য করেনি কুরুরাজসভায় বসে পাঞ্চালীকে অপমান করতে – কর্ণ তা করেছে স্বেচ্ছায়। আত্মাভিমান তার বুদ্ধিকে ভ্রষ্ট করেছে, বিদুর। তার ধর্মাধর্ম জ্ঞান লোপ পেয়েছে!”

বিদুর বললেন- “অসৎ সঙ্গে ধর্মনাশ…..কৌরবপক্ষে আর যেই থাক, ধর্ম নেই। আর অন্তিমে ধর্মের জয় হবেই।”

কুন্তী বললেন – “কবে হবে সেই জয়, বিদুর? সময় যে আর কাটে না!”

বিদুর বললেন- “সময় পরিপূর্ণ না হলে কিছুই হয় না, দেবি। অপেক্ষা করা ছাড়া এই মুহূর্তে আমাদের আর করণীয় কিছু নেই।”

কুন্তী বললেন- “জানি না বিদুর….কবে হবে এই অপেক্ষার শেষ – তোমার, আমার, পাণ্ডবের, পাঞ্চালীর, তাতশ্রীর…”

বিদুর বললেন- “অপেক্ষার ফল সদাই মধুর হয়।…কুরুরাজপ্রাসাদ জয়ের গর্বে ভোগের পঙ্কে ডুবে অলস, অসচেতন হয়ে যাক – আর দুঃখে জ্বলে তপস্যার আগুনে পুড়ে, শক্ত হাতিয়ার হয়ে ফিরে আসুক পাণ্ডব। তারপর হবে আসল পাশাখেলা। আর সেইদিনের পাশাখেলায় জয়ী হবে পুত্র যুধিষ্ঠির – সে আমি আজই দেখতে পাচ্ছি…. আকাশের গায়ে রক্তাক্ষরে লেখা বিধির বিধান।”

অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বসে রইলেন বিদুর আর কুন্তী।

বিদুর কুন্তীকে ঠিকই বলেছিলেন – যাদবকূলশিরোমণি শ্রীকৃষ্ণ সত্যিই এই তেরো বছর দ্বারকায় বসে দিন গুণে কাটাননি। তাঁর পরামর্শ এবং দৌত্যের ফলে, পাণ্ডব আজ কপর্দকহীন হয়েও বলশালী। অস্ত্র-শস্ত্র, সৈন্য, শক্তিশালী রাজন্যবর্গের সমর্থন – সব আছে পাণ্ডবপক্ষে, অপেক্ষা শুধু অজ্ঞাতবাস শেষ হওয়ার।

তেরোবছর পূর্ণহয়েছে, পাণ্ডবের আত্মপ্রকাশের সময় আসন্ন – কুন্তীর মতোই, অপেক্ষায় শ্রীকৃষ্ণও।

সেইদিন প্রভাতে অন্দরমহলে সুভদ্রার কক্ষের দ্বারে এসে দাঁড়ালেন শ্রীকৃষ্ণ।

সুভদ্রা হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন তাঁকে।

শ্রীকৃষ্ণ বললেন – “বীরপুত্রকে নিতে এসেছি, বীরমাতার অনুমতি চাই।”

সুভদ্রা হেসে বললেন – “অভিমন্যু তার মাতুলের কথাই শিরোধার্য বলে জানে….কিন্তু যাবে কোথায়?”

শ্রীকৃষ্ণও হাসলেন, বললেন – “আপাতত মৎস্যদেশ, তারপর মহাকাল যেদিকে নিয়ে যাবে….”

সুভদ্রা জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন।

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “প্রিয় ভগিনি, অভিমন্যুর যে বিবাহের সময় হল – সে খেয়াল আছে?….এদিকে অর্জুনসহ পাণ্ডবভ্রাতারাও অজ্ঞাতবাস শেষ করে আপাতত মৎস্যদেশে বিরাটরাজের আতিথ্য গ্রহণ করছেন। পিতাপুত্রে সাক্ষাৎ হওয়ার এই তো সময়! বিরাটপুত্রী উত্তরা অর্জুনের অত্যন্ত স্নেহভাজন – এর চেয়ে যোগ্য কন্যা অভিমন্যুর জন্য আর কোথাও পাওয়া যাবে না। অতএব শুভস্য শীঘ্রম্!”

সুভদ্রা বললেন- “এইটুকু বুঝলাম, কিন্তু তারপরে? মহাকালের পথই বা কি, আর সেখানে যাওয়ার এত তাড়াই বা কিসের?”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “বিবাহ শুভকাজ, আর শুভকাজে দেরী করতে নেই।…তাছাড়া আমার এইমুহূর্তে বিরাটরাজ্যে, পাণ্ডবের পাশে, পৌঁছনো দরকার। দুর্যোধন যথারীতি ওজর তুলেছে – অজ্ঞাতবাস শেষ হওয়ার আগেই নাকি সে অর্জুনকে চিনে ফেলেছে। এই অজুহাতে সে পাণ্ডবদের আবার বনে পাঠিয়ে, অখণ্ডরাজ্য ভোগ করতে চায়।….আলোচনার দ্বারা যদি মীমাংসায় আসা যায় তো ভালো, নাহলে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী।….”

সুভদ্রা শ্রীকৃষ্ণকে প্রণাম করে বললেন- “যুদ্ধ ক্ষাত্রধর্ম। এই পরম প্রয়োজনের দিনে অভিমন্যু যেন তার পিতার পাশে দাঁড়াতে পারে, এই আমার প্রার্থনা। যেখানে প্রয়োজন তুমি নিয়ে যাও তাকে।”

শ্রীকৃষ্ণ সুভদ্রার মাথায় হাত রেখে বললেন- “এই দিনটির জন্যই তাকে আমি এতদিন ধরে তৈরী করেছি, ভগিনি।…অভিমন্যুর নাম লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়, তার উত্তরপুরুষই বয়ে নিয়ে যাবে পাণ্ডবের ধ্বজা…যাদবকূলের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পাণ্ডবকূলের শৌর্যের মিলনই মহাকালের ইচ্ছা।……কিন্তু শুধু তাকে নয়, যেতে হবে তোমাকেও ভগ্নি – পুত্রের বিবাহ যে! আমি, তুমি, দাদা বলরাম – সবাই যাব। পাঞ্চালীর পঞ্চপুত্র যাবে, ধ্রুপদরাজ আসছেন – সঙ্গে রাজকুমার ধৃষ্টদ্যুম্ন আর রাজকুমার শিখণ্ডী।…মহোৎসবের সঙ্গে সঙ্গে হবে মহাসম্মেলন।”

শ্রীকৃষ্ণ, ভ্রাতা বলরাম, ভগিনী সুভদ্রা, এবং পাণ্ডবপুত্রদের নিয়ে উপস্থিত হলেন মৎস্যরাজ্যে।

পাঞ্চালরাজ ছাড়াও, আরো বহু রাজা-রাজড়া নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন বিরাটনগরীতে।

অতঃপর শুভদিনে বিরাটরাজ-তনয়া উত্তরার সঙ্গে অর্জুন এবং সুভদ্রার পুত্র অভিমন্যুর বিবাহ হয়ে গেল।

বিরাটরাজ্য এবং রাজ্যে উপস্থিত সকল অতিথি উৎসবে মেতে রইলেন।

যুধিষ্ঠিরের আমন্ত্রণলিপি যদিও পৌঁছেছিল হস্তিনাপুরে, কুরুকূলের কোনো প্রতিনিধিই অভিমন্যু-উত্তরার বিবাহ অনুষ্ঠানে যোগদান করতে আসেননি।

বিবাহ শেষে, মৎস্যদেশের বিরাটনগরীতে বসল মন্ত্রণাসভা।

পাণ্ডব এবং বিরাটরাজ ছাড়াও, শ্রীকৃষ্ণের আহ্বানে ভারতবর্ষের নানা স্থান থেকে উপস্থিত হয়েছেন পাণ্ডব ও যাদবকূলের শুভাকাঙ্খী বহু রাজা-মহারাজা।

দুর্যোধন পাণ্ডবকে রাজ্য ফিরিয়ে দিতে নারাজ – অতএব, বৃহদাংশের মতে, যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

এঁদের মধ্যে শিখণ্ডীও একজন – যিনি যুদ্ধের জন্যে অধীর প্রতীক্ষায় আছেন।

জন্ম-জন্মান্তরের ঋণ শোধ দিতে হবে – ভীষ্ম যে হস্তিনাপুরের পক্ষে যুদ্ধে নামবেন  সে তো নিশ্চিত…..আর তিনি যে শিখণ্ডীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবেন না তাও নিশ্চিত!

অন্যদিকে মহারাজ ধ্রুপদ এবং রাজকুমার ধৃষ্টদ্যুম্ন ভোলেননি কুরুসভায় তেরোবছর আগে ঘটে যাওয়া সেই অঘটন – পাঞ্চালীর অপমানের বদলা নেওয়ার জন্য তাঁরা প্রহর গুণছেন।

অন্তঃপুরে মুক্তকেশী দ্রৌপদী – অপমানে পাথর হয়ে আছেন।

খোলাচুল বাঁধবেন তিনি, কিন্তু তার আগে হবে রক্তস্নান!

ভীম তাঁর প্রতিজ্ঞাপূরণের জন্য উদগ্রীব – দুর্যোধন আর দুঃশাসনকে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেই দেখতে চান, অন্য কোথাও নয়।

পাঞ্চালীর প্রতি ‘সূতপুত্র’ কর্ণের সেই উক্তি মনে আছে অর্জুনের, আর মনে আছে তাঁর নিজের শপথ।

নকুল, সহদেব – প্রত্যেকের মনে আবেগের ওঠাপড়া….রাজসভা….পাশাখেলা…..পাঞ্চালী….শকুনি….তাঁদের  নিজেদের নেওয়া ভীষণ শপথ…..।

কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ জানতেন যে এই যুদ্ধ সাধারণ যুদ্ধ নয় – যুদ্ধ হলে, এই যুদ্ধ হবে মহাযুদ্ধ।

দোষীদের সঙ্গে বহু নির্দোষীর রক্তও ঝরবে সেই মহাযুদ্ধে।

বেতনভোগী বহু সৈনিকের প্রাণ যাবে, যাদের কাছে দুর্যোধন এবং যুধিষ্ঠিরের উত্তরাধিকারের প্রশ্ন অর্থহীন!…..

ব্যক্তিগত আবেগের টানাপোড়েনে এতগুলো জীবনের মূল্য নির্ধারিত হতে দিতে পারেন না তিনি।

তাই যুদ্ধের আগে একবার মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রর সঙ্গে কথা বলে দেখতে হবে – দৌত্য!

শ্রীকৃষ্ণের কথায় সহমত হলেন যুধিষ্ঠির – যুদ্ধ শেষ পথ, তার আগে হস্তিনাপুরে দূত পাঠানো উচিত।

ধ্রুপদরাজের পুরোহিত হস্তিনাপুরে গেলেন যুধিষ্ঠিরের বার্তা নিয়ে – তেরোবছর শেষ, অতএব যুধিষ্ঠির ইন্দ্রপ্রস্থ ফেরত নিতে প্রস্তুত।

কিন্তু ব্যর্থ হল সেই দৌত্য।

অহঙ্কারী দুর্যোধন আর মোহান্ধ ধৃতরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্খা কোনো সমঝোতার রাস্তায় গেল না।

দূত ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেন বিরাটনগরীতে, যেখানে অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ সব রথী-মহারথীরা।

খবর শুনে সবাই হয়ে উঠলেন অসহিষ্ণু – যুদ্ধ, যুদ্ধই এর একমাত্র উত্তর।

উত্তেজনার স্রোতে বাঁধ দিলেন শ্রীকৃষ্ণ।

সখী পাঞ্চালীকেও মৃদু ভর্ৎসনায় তিনি মনে করিয়ে দিলেন যে ‘যুদ্ধের নির্ণয় এতো সহজ নয়, পাঞ্চালীর খোলা চুলই শুধু নির্ণয়ের একমাত্র সূত্র নয়’!

যুধিষ্ঠিরকে নীরব দেখে, শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মত জানতে চাইলেন।

যুধিষ্ঠির ধীরস্বরে বললেন – “কৃষ্ণ, যুদ্ধ ছাড়া কি তাহলে আর পথ নেই?”

ভীম উত্তেজিত হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে হাত তুলে থামিয়ে দিলেন।

তারপর যুধিষ্ঠিরের দিকে ফিরে বললেন- “পথ হয়তো আছে – দুর্যোধন বলবে ‘পাণ্ডবদের পুনরায় বনবাসই একমাত্র পথ’…..মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র যে অন্য কিছু বলবেন তা মনে হয় না….তবু…..আমি নিজে একবার হস্তিনাপুরে গিয়ে কথা বলতে পারি…..কুরুরাজসভায় পিতামহ ভীষ্ম এবং অন্যদের সম্মুখে প্রস্তাব রাখতে পারি….ইন্দ্রপ্রস্থ না হোক্, রাজ্যের সামান্য অংশও যদি ছাড়তে রাজী হয় হস্তিনাপুর…..।”

যুধিষ্ঠির বললেন- “তবে তাই কর, কৃষ্ণ।….এতোবড়ো যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একবার সন্ধির প্রস্তাব করেই দেখা যাক্ না। আমার স্থির বিশ্বাস যে পিতামহ ভীষ্ম শান্তির প্রস্তাবে সহমত হবেন।”

তাই স্থির হল – ইচ্ছায় হোক্ বা অনিচ্ছায় হোক্, সভার আর সবাই একমত হলেন।

অভিমন্যু এবং উত্তরাকে মধুচন্দ্রিমার আশীর্বাদ দিয়ে, শ্রীকৃষ্ণ রওয়ানা হলেন হস্তিনাপুরের পথে। পাণ্ডব, পাঞ্চালী, বিরাটরাজ এবং উপস্থিত রাজন্যবর্গ শ্রীকৃষ্ণের দৌত্যের ফল জানার অপেক্ষায় রইলেন।

 

৮. সংগ্রাম

 

অস্থির ভীষ্ম নিজের কক্ষে পদচারণা করছিলেন, বিদুর এসে প্রণাম করলেন।

তারপর বললেন- “তাতশ্রী, বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ আসছেন শান্তিপ্রস্তাব নিয়ে – হয়তো কোনো উপায় হবে….আপনি চিন্তা করবেন না।”

ভীষ্ম বললেন – “বিদুর, তুমি জান যে শ্রীকৃষ্ণ আসছেন বলে যুদ্ধ বন্ধ হবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। যুদ্ধ যারা বন্ধ করতে পারত – ধৃতরাষ্ট্র এবং দুর্যোধন, তারা যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা না করে পাণ্ডবের ক্রোধানলে কেবল আহুতি দিয়ে গেছে। শুধুমাত্র যুধিষ্ঠির এবং শ্রীকৃষ্ণের জন্যই যুদ্ধ এখনও শুরু হয়নি – নাহলে আরও আগেই শুরু হয়ে যেত।…সে কথাই জানাতে আসছেন শ্রীকৃষ্ণ – ইতিহাসে লেখা থাকবে যে পাণ্ডবপক্ষ যুদ্ধ রদ করার জন্য শেষ চেষ্টা করেছিল, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণকে দূত করে হস্তিনাপুরে পাঠিয়েছিল, কিন্তু কৌরব তাদের জেদ ছাড়েনি।”

বিদুর বললেন- “তাতশ্রী, সবই যদি জানেন তাহলে কেন বোঝাচ্ছেন না মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে? কেন তাঁকে বলছেন না যে তিনি সর্বনাশের পথে যাচ্ছেন? যে জয়ের স্বপ্ন তিনি দেখছেন, সেই জয় তাঁর ভাগ্যে নেই!….আমার কথা তিনি শোনেন না, কিন্তু আপনি তো বলতে পারেন?!”

ভীষ্ম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- “সে কারুর কথাই শোনে না বিদুর, দুর্যোধনের কথা ছাড়া।…..আজ আমি আরও ভালোভাবে বুঝছি কেন তুমি বলেছিলে যে ‘অন্ধ প্রতিবন্ধীর সিংহাসনে বসা অনুচিত’! অন্ধ রাজা কারুর ওপর নির্ভরশীল না হয়ে রাজ্য চালাতে পারে না, আর যার ওপর নির্ভর করবে সে যদি সৎ এবং ধার্মিক না হয়….”

বিদুর বললেন- “কিন্তু মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র বোধহয় সেটা আজও বোঝেন না….কোনো সৎ পরামর্শই তো উনি শোনেন না আমার!”

ভীষ্ম বললেন- “শোনা না-শোনা তার ওপর, কিন্তু বলা তোমার কাজ – তুমি সেই কাজ যথাযথভাবেই পালন করেছ।…..কিন্তু হস্তিনাপুরের ভাগ্য দেখ, বিদুর! সেই অন্ধরাজা সিংহাসন অধিকার করে বসল, সেই সে পরনির্ভরশীল হল, সেই অন্ধ পুত্রমোহে রাজ্যের সর্বনাশ ডেকে আনল!”

বিদুর চুপ করে রইলেন।

ঘরের হাওয়া ভারী হয়ে উঠল ভীষ্ম আর বিদুরের মিলিত দীর্ঘনিঃশ্বাসে।

কিছুক্ষণ থেমে থেকে ভীষ্ম আবার বললেন- “বিদুর, অন্ধত্ব বড় দুঃখের। আমি সবসময় ধৃতরাষ্ট্রের এই দুঃখে সমব্যথী হতে চেয়েছি, তাকে বুঝতে চেয়েছি। কিন্তু আজ…!

আজ সে ভেতর-বাইরে দু’দিকে অন্ধ হয়ে গেছে বিদুর, তাই তার কষ্ট আজ তাকে ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। আমি কার ব্যথায় সমব্যথী হব, বল? দেশের, না ধৃতরাষ্ট্রের?…..

সে নিজের, পরিবারের, দেশের সর্বনাশ ডেকে আনছে। গান্ধারীকেও টেনে নিয়ে চলেছে সেই শ্মশানে, যে শ্মশান একদিন ভরে যাবে তার পুত্রদের মৃতদেহে! তবু তার চৈতন্য নেই!”

বিদুর এগিয়ে এলেন, ভীষ্মর হাত ধরে তাকে বসিয়ে দিলেন।

তারপর শান্তস্বরে বললেন – “তাতশ্রী, ভবিতব্যকে খণ্ডানোর ক্ষমতা আমাদের কারও নেই। আপনারও না, আমারও না।……আপনি নিজেকে বিচলিত হতে দেবেন না, এই আমার প্রার্থনা। এই রাজপ্রাসাদে এখন আপনিই তো শুধু একজন কুরুপুরুষ যিনি ধর্মকে ধরে রেখেছেন – আপনি অস্থির হলে যে রাজলক্ষ্মী প্রাসাদ ছেড়ে চলে যাবেন! সে তো হতে দেওয়া যায় না!”

ভীষ্ম বললেন- “বিদুর, তুমি বোধহয় ভুলে গেছ যে কুরুরাজলক্ষ্মী এই প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেছেন আজ তেরোবছর হল।”

বিদুর মাথা নীচু করে বসে রইলেন।

তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন – “আপনি বিশ্রাম গ্রহণ করুন, আমি এখন আসি।”

শ্রীকৃষ্ণের রথ এসে পৌঁছল হস্তিনাপুরের প্রান্তে।

অনেক বুঝিয়ে, বিদুর এবং ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্রকে নিরস্ত করেছেন শ্রীকৃষ্ণকে মহামূল্য ভেট পাঠানোর থেকে। বুঝিয়েছেন যে শ্রীকৃষ্ণকে উৎকোচে বশ করা যায় না – দুর্যোধনের সেই দুর্বুদ্ধি যেন ধৃতরাষ্ট্র গ্রহণ না করেন।

বিদুরের সঙ্গে সভাগৃহে পা রাখলেন শ্রীকৃষ্ণ, কুরুরাজের লৌকিক উপহার এবং অভিনন্দন গ্রহণ করলেন।

কিন্তু প্রত্যাখ্যান করলেন দুর্যোধনের আতিথেয়তা, সুস্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিলেন যে তিনি শুধু ধর্মের সঙ্গেই থাকেন এবং অধার্মিক দুর্যোধনের বন্ধুত্ব স্বীকার করতে তিনি অক্ষম।

ক্রুদ্ধ দুর্যোধনকে উপেক্ষা করে, শ্রীকৃষ্ণ মহামতি বিদুরের বাসস্থানে থাকার বাসনা প্রকাশ করলেন – যেখানে তেরোবছর ধরে সুদীর্ঘ প্রতীক্ষায় আছেন পিসীমা কুন্তী। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বিদুর সেই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন – তাঁর আলয় ধন্য হয়ে যাবে শ্রীকৃষ্ণকে অতিথি হিসাবে পেলে।

বিদুর-ভবনে বার্তা পৌঁছল – কিছুক্ষণের মধ্যেই যদুকূলপতি শ্রীকৃষ্ণকে সাথে নিয়ে বিদুর এসে পৌঁছচ্ছেন, শ্রীকৃষ্ণ এখানেই আতিথ্য গ্রহণ করবেন। সুলভা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, কুন্তী উতলা।

সুলভা বললেন- “দিদি, কি দিয়ে যদুকূলপতিকে আতিথ্যে বরণ করি?…আমাদের এই ক্ষুদ্র কুটির…সামান্য আয়োজন….কি দেব তাঁর পাদপদ্মে?”

কুন্তী বললেন- “সুলভা, সে তো সব জেনেই আসছে – তুমি চিন্তা কর না। জগতের সব ধন একদিকে, আর সে একদিকে – তাকে দেওয়ার কিই বা আছে, ভালোবাসা ছাড়া?…..আমার কৃষ্ণ!” গলা ধরে এল, কুন্তী চোখে আঁচল চাপা দিলেন।

সুলভা বললেন – “দিদি, তুমি শান্ত হয়ে বস – আমি ওদিকে যোগাড় দেখি।”

কুন্তী কিন্তু আজ আর কিছুতেই চোখের জল সামলাতে পারছেন না।

কি হল তাঁর? কৃষ্ণ আসছেন শুনে কেন তিনি শান্ত থাকতে পারছেন না!

এতদিনের স্থৈর্য, এতদিনের সহিষ্ণুতা – সব যেন ভেসে যাচ্ছে জোয়ারের জলে!

বুকের মধ্যে আবেগের ওঠাপড়া। কত যুগ ধরে জমিয়ে রাখা যত কথা সব যেন আজ তিনি কৃষ্ণকে বলে হাল্কা হবেন – আর ধৈর্য ধরতে পারছেন না।

পাছে সবার কাছে ধরা পড়ে যান, কুন্তী নিজের ঘরে গিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলেন।

যথাসময়ে শ্রীকৃষ্ণ এসে পৌঁছলেন।

সুলভা করজোড়ে অভ্যর্থনা করে ভিতরে নিয়ে এলেন শ্রীকৃষ্ণকে।

সুলভার আতিথ্য গ্রহণ করে, আলাপচারিতা সেরে, শ্রীকৃষ্ণ এলেন কুন্তীর সঙ্গে দেখা করতে।

বিদুর সুলভাকে ঈঙ্গিত করলেন – দূর থেকে কুন্তীর কক্ষ দেখিয়ে দিয়ে, সুলভা আর বিদুর চলে গেলেন। আজ তাঁদের একান্তে কথা বলার দিন – যাদবকন্যা কুন্তী আর যাদবকূলপতি শ্রীকৃষ্ণের।

বিদুর আর সুলভা রইলেন দূরে।

শ্রীকৃষ্ণ সামনে এসে  দাঁড়াতেই, অশ্রুর বাঁধ ভেঙে পড়ল কুন্তীর। কৃষ্ণর হাতদুটি ধরে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়লেন সর্বংসহা কুন্তী – মুখ দিয়ে একটি শব্দও বার করতে পারলেন না। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে কাঁদতে দিলেন – এ’ চোখের জল না জানি কত যুগ ধরে জমে আছে! আজ অবধি জীবনে কারুর কাছে এই জল ফেলার অবকাশ পাননি কুন্তী। আজ পরিণতবয়স্ক এই ভ্রাতুষ্পুত্র যেন তাঁর পিতা, মাতা, সখী, স্বামী, সবার অভাব পূরণ করে সামনে এসে দাঁড়ালেন। পুত্রসম কৃষ্ণ, কুন্তীর আহত মনকে আশ্রয় দিলেন নীরব চোখের ভাষায়।

একটু সামলে নিয়ে চোখ মুছে হাসলেন কুন্তী।

বললেন – “কতদিন পরে মন একজনকে পেল চোখের জল নামাতে, কৃষ্ণ! কোথায় ছিলে তুমি এতদিন?”

শ্রীকৃষ্ণ হাসলেন – “কতদিন পিসীমা?”

কুন্তী বললেন – “কতদিন? সত্যিই তো!….আমি ভুলেই গেছি কতদিন……কতবছর….কতযুগ!..তুমি তখন কোথায় কৃষ্ণ…..পিতা আমাকে দান করে দিলেন…..কেন বল তো?…..কোন অপরাধে বল তো, আমি সেই কিশোরী বয়সেই মা-বাবার ক্রোড়চ্যুত হয়ে, মথুরাচ্যুত হয়ে…..কোন্ অপরিচিত কুন্তীরাজ্যে…..সাধু সন্ন্যাসী অতিথিসেবা করে…..কিছু বোঝার আগেই…..কেন? বসুদেব, শ্রুতি, সবাই রইল মথুরায় – শুধু আমি….দত্তা হয়ে চললাম বৃন্তচ্যুত ফুলের মতো। আমাকে কেউ জিজ্ঞাসাও করল না? আমি কি দান করবার জিনিস? কন্যাসন্তান কি এতোই অকিঞ্চিৎকর?….বল তুমি?”

শ্রীকৃষ্ণ কুন্তীর হাতদুটি ধরলেন। বললেন – “পিসিমা…..”

কুন্তী বললেন – “না কৃষ্ণ, আজ আমায় বলতে দাও। এ’ শুধু সেই দিনের পুরোনো কথা নয়, এ’ আমার সারাজীবনের কথা! আজ আমি যা’, তার কথা। আমার যুদ্ধের কথা।…একলা আমাকে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দিল সবাই, কিছুই জানতাম না তখন কৃষ্ণ – কিন্তু বাধ্য হলাম জানতে, বাধ্য হলাম যুদ্ধ শিখতে! বাঁচতে হবে তো?……কর্ণকে ভাসিয়ে দিতে হল জলে…..সে অপরাধের কি ক্ষমা আছে?….তুমি আমার পুত্রসম – তবু লজ্জা বিসর্জন দিয়ে তোমায় আজ বলছি কৃষ্ণ – কেউ জানে না, পাণ্ডবও না, কর্ণ আমার প্রথম সন্তান। তার জন্ম হয়েছিল আমার বিবাহের আগে, কুন্তীরাজ্যে। সমাজ বড়ো কঠিন….অসহায় শিশুটিকে ক্রোড়চ্যুত করা ছাড়া সেদিন আমার কোনো উপায় ছিল না।…..আমার পাশে সেদিন কেউ ছিল না সাহায্য করার জন্য…..অথচ আমি অনাথ ছিলাম না কৃষ্ণ! মথুরানগরী, পিতা শুরসেনা, মাতা মরিসা, কে কোথায় সেদিন?…..শুধু নিজের বুদ্ধি সম্বল….আর দাস-দাসীবৃন্দ…অধিরথ আর রাধা, কর্ণকে নিজের ক্রোড়ে তুলে নিয়েছিল…..আমি চিরকৃতজ্ঞ তাদের কাছে!…..আর আজ দেখ, দৈবের খেলায় কর্ণ আর অর্জুন দু’দিকে দাঁড়িয়ে অস্ত্রে শাণ দিচ্ছে – অথচ আমার কিছু করার নেই…..কেন, বল তো? কেন এমন হল?….কর্ণকে আমি নিজের হাতে মানুষ করতে পারিনি – এ’ দুঃখ আমার কোনদিন যাবে না! অসৎসঙ্গে থেকে সে যা যা অপরাধ করেছে, সব কিছুর দাগ মুছে গেলেও মহাসতী পাঞ্চালীকে অপমান করার কি কোনো ক্ষমা আছে? দুর্যোধনের প্রতি কোনো ঋণ তাকে বাধ্য করেনি সেই কাজ করতে – সে তা করেছে স্বেচ্ছায়!…কেন সে কোনদিন নিজের অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকল না? কেন সে নিজেকে অধিরথের পালিত পুত্র বলে মেনে নিয়ে জীবন কাটাল না? তুমিও তো নন্দগ্রামে পালিত হয়েছ কৃষ্ণ….কতদিন সেখানে গরু চরিয়ে বাঁশী বাজিয়ে কাটিয়েছ….তুমি তো অভিযোগ করনি! আমি তো কত কমবয়সে কুন্তীরাজ্যে এসে অতিথিসেবা করেছি আর দিনবদলের অপেক্ষায় থেকেছি – আমি তো ঝড় তুলিনি!….তবে কর্ণ কেন পারল না? আমি যদি তাকে মানুষ করতে পারতাম, তবে কি সে এমন হত?……তারপর দেখ, স্বয়ংবর…..মহারাজ পাণ্ডু…..চিররুগ্ন…..তবু তাঁকে নিয়েই থাকতাম…..কিন্তু তিনি…..শল্যবংশের মেয়ে বিয়ে করে আনলেন….এই যাদবকূলের মেয়ের সঙ্গে বিয়ের তখন ক’দিনই বা পূর্ণ হয়েছে….তাতশ্রী ভীষ্ম ঠিক করলেন অন্য বিয়ে!….আমরা নাকি যাদব, গবাদি পশুর পালক, নীচু বংশ – চন্দ্রবংশ, কুরুকূল নাকি অনেক ওপরে!….হস্তিনাপুর রাজপ্রাসাদের যত রাজনীতি….মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের যত কুটিলতা আর অন্যায়, শকুনির যত কপটতা আর দুঃশাসন-দুর্যোধনের যত অসভ্যতা….সব সহ্য করে, প্রতিদিন যুদ্ধ করে, পাঁচটি অনাথ শিশুকে বাঁচিয়ে রেখে….বড়ো করে তুলে…..চিরদিন কাঁটার মুকুট পরে থাকা, ভিক্ষান্নে প্রতিপালিত তোমার পিসীমা, যাদবকন্যা পৃথা, মহারাজ পাণ্ডুর স্ত্রী আর মহাবীর পাণ্ডবের মাতা কুন্তী, আজ মুখ খুলেছে – তাকে বলতে দাও, কৃষ্ণ!” দু’হাতে মুখ ঢেকে আবার কেঁদে ফেললেন কুন্তী।                                                                     

শ্রীকৃষ্ণ পরম মমতায় পিসিমার হাতদু’টি ধরে বসে রইলেন – যেন তিনি পিতা, সান্ত্বনা দিচ্ছেন আহত ক্ষতবিক্ষত কন্যাকে।                                                                                                                     

কুন্তী একটু থেমে আবার বললেন – “তুমি ভাবতে পার কৃষ্ণ, সেই কিশোরী পৃথা যে সরল বিশ্বাসে বেড়ে উঠেছিল মথুরাকে নিজের ভেবে, তাকে মথুরা কী নির্মমভাবে ছিঁড়ে ফেলে ছুঁড়ে দিয়েছিল অজানা অন্ধকারে! তার সমস্ত সরলতা আর বিশ্বাসকে দু’পায়ে মাড়িয়ে নষ্ট করেছে পৃথিবী।….খুব কম বয়সেই আমি শিখে গিয়েছিলাম যে পৃথিবী আমাকে ব্যবহার করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে – আমার সরলতা, আমার সৌন্দর্য, আমার সৌজন্য, আমার কোমলতা, সব…সব যেন তাদের ভোগের বস্তু! ভোগ করা হয়ে গেলে, ছুঁড়ে ফেলে দেবে। আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে হয় তুমি অন্যকে ব্যবহার কর, নয়তো নিজে ব্যবহৃত হও – এই জীবনের রীতি। আমি শিখে গিয়েছিলাম শক্ত হতে। শিখে গিয়েছিলাম আবেগ বর্জন করে বাস্তববাদী হতে।…আবেগের পুঁজি বেঁধে, আর সেজেগুজে পুরুষের মন মাতিয়ে, কি পায় মেয়েরা – বল? পুরুষ তো যেদিন খুশী তাকে ছেড়ে আরেকজনের পেছনে দৌড়বে – নারী পড়ে থাকবে তার সন্তান গর্ভে ধরে। না, এই জীবন আমি মানতে রাজী ছিলাম না কৃষ্ণ। আমি বুঝেছিলাম যে আবেগের কোনো মূল্য নেই পৃথিবীতে, কিন্তু ক্ষমতার আছে। ক্ষমতাই আসল শক্তি! নারী কি শুধু গর্ভধারণের জন্য? যে সন্তানকে সে ধারণ করছে, তার ওপর নারীরই তো পূর্ণ অধিকার থাকা উচিত! সন্তানই তো ক্ষমতার উৎস।….আমি নিজের হাতে রাশ ধরার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম সেদিন, যেদিন কর্ণ আমার গর্ভে এল।….সেই নয়মাস আমাকে পরিণত করেছে, পৃথিবীকে চিনতে শিখিয়েছে। যে অপরিণত কিশোরী একদিন হঠাৎ গর্ভবতী হয়ে গিয়েছিল, আর যে পরিণত মা তার প্রথম পুত্রসন্তানকে সুরক্ষিত করে জলে ভাসিয়েছিল – তারা দু’জন বাইরে এক হলেও, ভেতরে দুই আলাদা মানুষ। আমি বদলে গিয়েছিলাম, বদলাতে বাধ্য হয়েছিলাম – এছাড়া আমার উপায় কি ছিল, বল?…….তারপর হস্তিনাপুর। মহারাজ পাণ্ডু যখন আমার বিবাহের কয়েকদিনের মধ্যে, তাতশ্রীর কথায় মাদ্রীকে বিয়ে করে আনলেন, সেইদিন আমি চোখের জল মুছে আমার ভেতরের সব আবেগকে নিঃশেষে হত্যা করেছিলাম। এই রাজপরিবার না গ্রহণ করেছিল আমায় মনের থেকে, না দিয়েছিল সম্মান আমার বংশকে। আমি যুদ্ধ করে গেছি একা……..আর মনে মনে ভেবেছি যে যাদের আজ ব্রাত্য বলে ঠেলে রেখেছে এই পরিবার, তাদের সন্তান যদি একদিন যোগ্যতা আর উত্তরাধিকারের জোরে এই সিংহাসনে বসে – তবে কেমন হয়? অঙ্গীকার করেছি যে কুরুকূলের এই ঔদ্ধত্যের জবাব দিতেই হবে – যোগ্যতার জোরে আমার সন্তানকে একদিন এই সিংহাসনে বসাব, যেমন যাদবকূল তাদের নেতা নির্বাচন করে যোগ্যতা দিয়ে। মথুরা থেকে কুন্তীরাজ্য আর কুন্তীরাজ্য থেকে হস্তিনাপুর – দেখলাম সব! বুঝলাম নারীর কোনো দাম নেই, দাম শুধু পুত্রের আর ক্ষমতার। এই রাজপরিবারেও সেই একই খেলা। সেই পুত্রপ্রাপ্তির আকাঙ্খা আর ক্ষমতার লড়াই। …ভারতবর্ষে নারী মাতৃরূপে পূজিতা, বণিতারূপে নয় – সন্তান মাতাকে পূজা করে, স্বামী স্ত্রীকে নয়। তাই স্বামীর কাছে কিছু পাওয়ার আশা না করে, পুত্রদের আমি তৈরী করেছি নিজের হাতে। তাদের মধ্যে দিয়েছি সেই বীজ যা তাদের পৌঁছে দেবে ক্ষমতার শীর্ষে। যে পুত্রসন্তানদের জন্ম দিলাম, তারা আমার – সর্বতোভাবে আমার। ক্ষমতার শিখরে তাদের আমিই পৌঁছে দেব, অন্য কারুর প্রয়োজন নেই।….মহারাজ পাণ্ডুর মৃত্যুর পর হস্তিনাপুরে ফিরে এলাম শুধু সেইজন্য – যোগ্য উত্তরাধিকারীকে সিংহাসনে বসানোর জন্য…..পুত্রদের জন্য। পাঁচটি পিতৃহীন বালককে নিয়ে একাকিনী আমি……রাজপ্রাসাদে পদে পদে অপমান, ষড়যন্ত্র সব সহ্য করেছি – হার মানিনি। নিজেকে আর ব্যবহৃত হতে দিইনি।…ভাগ্যিস বিদুর ছিল – তারও তো লক্ষ্য একই……যুধিষ্ঠির যাতে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসে, ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।……তারপর এলে তুমি কৃষ্ণ, আমাদের সবার পরিত্রাতা! কিন্তু তার আগে যে কত রুক্ষ্ম পথ আমাকে পার হতে হয়েছে!…”                                                                                                                            শ্রীকৃষ্ণ হাসলেন, তারপর ধীরস্বরে বললেন – “কোনো যুদ্ধ বৃথা নয় জীবনে, কোনো তপস্যা ফলহীন নয়, পিসীমা!…তোমার তপস্যার ফলও আগতপ্রায়।….যেমন জন্ম দিয়েই শুধু কেউ ব্রাক্ষণ বা ক্ষত্রিয় হয়না, কর্মে হয়, ঠিক তেমনি গুণহীন রাজার দুর্বৃত্ত পুত্রও শুধু জন্মসূত্রে যুবরাজ হতে পারেনা। জন্মগত অধিকারের দিন শেষ হয়ে আসছে।…….কুরুকূলের উদ্ধত কাঁধে জমেছে অনেক ভার – কুরুজ্যেষ্ঠ ভীষ্মের শপথ আর তার পরিণতি, মহামতি বিদুরের অপমান, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের স্বার্থপর উচ্চাকাঙ্খা, দুর্যোধন-দুঃশাসনের পাপ, রাজকুমারী অম্বার অভিশাপ, মহারাণী গান্ধারীর চোখের জল, প্রতিবাদী রাজমাতা কুন্তীর নির্ণয়, কূলবধূ পাঞ্চালীর বস্ত্রহরণ….। আর পাণ্ডবের ঝুলিতে আছে যাদবকূলের বুদ্ধি, নম্রতা, শৌর্য, বীর্য, ধৈর্য, তেরোবছরের তপস্যা আর মাতা কুন্তীর মার্গদর্শন।….কুরুকূলের অহঙ্কার আর অভিমানের দিন শেষ – যাদবকন্যার গর্ভজাত যুধিষ্ঠির একদিন শাসন করবে এই হস্তিনাপুর।মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র হাতজোড় করে দাঁড়াবেন যুধিষ্ঠিরের সামনে।….শুধু তাই নয়, আগামী পৃথিবী শিক্ষা নেবে এই মহাযুদ্ধ থেকে, যাতে এমন ভুল আর না হয়!…. যাতে কোনো ভীষ্ম আর কোনদিন কোনো ধৃতরাষ্ট্রে নিজের পিতার প্রতিচ্ছবি না দেখে, যাতে রাজপুত্র বলে কোনো দুর্যোধন নারীর অপমান করে পার না পেয়ে যায়, যাতে শুধু শান্তনুর বংশধর বলে কোনো বিচিত্রবীর্য না আর কোনদিন সিংহাসনে বসে!…..বংশপরম্পরায় রাজা হওয়ার নিয়ম আগামী যুগে আর থাকবে না, গুণের বিচারে গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত হবে শাসক – যেমন যাদবকূলে হয়ে আসছে বহুদিন ধরে!…..নতুন পথ তৈরী হচ্ছে, তাতে তোমারও অবদান রইল, পিসীমা!…আর কর্ণ – সময় হয়েছে তাকে তার জন্মপরিচয় জানানোর, অধর্ম থেকে ধর্মযুদ্ধের পথে নিয়ে আসার। জন্মদাত্রী মা হিসাবে এ’ দায়িত্ব তোমারও। এই সঙ্কটের সামনে দাঁড়িয়ে, সমাজ কি বলবে তা ভাবার প্রয়োজন নেই।”

“যুদ্ধ কি তবে নিশ্চিত, কৃষ্ণ?” চোখ মুছে বললেন কুন্তী।

“কেন, তুমি যুদ্ধ চাও না?” শ্রীকৃষ্ণ হেসে বললেন।

কুন্তী বললেন – “যুদ্ধ মানে তো শুধু কৌরব আর পাণ্ডব নয় – যুদ্ধে প্রাণ যায় কতো দুঃস্থ সৈন্যের যাদের কাছে যুধিষ্ঠির আর দুর্যোধনের তফাত অজানা, যারা শুধু পয়সার জন্য সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়েছে।যুদ্ধের প্রভাব পড়ে কত নিরপরাধ বালক-বালিকা-নারীর ওপর….কত সংসার অনাথ হয়ে যায়, নিঃস্ব হয়ে যায়….তার ওপর…..”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন – “তার ওপর কি, পিসিমা?”

কুন্তী বললেন – “….দুর্যোধন যেমনই হোক, কি করে ভুলি যে সেও এক মায়ের সন্তান….দিদির সন্তান?”

শ্রীকৃষ্ণ মৃদু হেসে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন কুন্তীর মুখের দিকে- “পিসিমা, তুমি কি তবে দুর্যোধন আর দুঃশাসনকে ক্ষমা করে দিয়েছ?”

কুন্তী বললেন- “কি করে ভুলব….এতোগুলো বছর….পাঞ্চালীর আর্তনাদ….ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের আনত শির….মহাবলী ভীমের নিরুপায় ক্রোধ….গাণ্ডীবধারী অর্জুনের অপমানিত মুখ!….কিন্তু অপরাধ করল কেউ, আর শাস্তি সবার – কেন বল তো?” কুন্তী দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন।

শ্রীকৃষ্ণ বললেন – “এই ‘কেন’র কোনো উত্তর নেই, পিসিমা। কর্মের স্রোতকে কেউ রুদ্ধ করতে পারেনা, আমিও না। এখন শুধু কর্মফলের অপেক্ষা।…তুমি পুত্রদের শিবিরে চল আমার সঙ্গে।”

কুন্তী বললেন- “না, কৃষ্ণ! আমি কোথাও যাব না। এই মহাযুদ্ধে সবাই যে যার মতো যুদ্ধ করবে, আমার যুদ্ধ এখানে – এই হস্তিনাপুরে, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আর মহারাণী গান্ধারীর সঙ্গে। বিদুরও আছে এখানে। কতদিন ধরে সুখে-দুঃখে এই হস্তিনাপুর আমার কর্মভূমি – আজ কোথায় কোন্ অজানা রাজ্যে পুত্রদর্শন করতে যাব? তা হয় না। আমি বরং এখানেই মঙ্গল আরতির থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব, সমস্ত হস্তিনাপুর-বাসীর সঙ্গে, দ্রৌপদীসহ বিজয়ী পাণ্ডবকে বরণ করার জন্য।” কুন্তী ধীরে ধীরে উঠে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন।

“তবে তাই হোক্, পিসিমা।…বল, পাণ্ডবের জন্য তোমার কি বার্তা নিয়ে যাব আমি?” শ্রীকৃষ্ণ বললেন। “ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরকে বল যে রাজমাতা কুন্তী আজ পরগৃহবাসী, পরান্নে প্রতিপালিতা।….তাকে বল যে রাজ্য  উদ্ধার করে মা, ভাই, স্ত্রীর সম্মান পুনরুদ্ধার করা তার ধর্ম – সে যেন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের মিষ্ট কথায় সে ধর্ম ভুলে না যায়।…..পাণ্ডবকে বল যে যেইদিনের অপেক্ষায় ক্ষত্রিয়াণী পুত্রের জন্ম দেয়, সেইদিন এসে গেছে!” মাথা উঁচু করে বললেন কুন্তী। “যথা আজ্ঞা!” বলে শ্রীকৃষ্ণ বেরিয়ে এলেন।

শ্রীকৃষ্ণ জানতেন, যেমন বিদুরও জানতেন, এই দৌত্যও ব্যর্থ হবে। দুর্যোধনের উদ্ধত অহংকার এককণা জমিও ছেড়ে দেবে না। তাই হল।

শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবের হয়ে মাত্র পাঁচখানি গ্রামও নিতে রাজী ছিলেন, কিন্তু দুর্যোধন সূচ্যগ্র মেদিনীও বিনা যুদ্ধে দিতে রাজী নয়। “অজ্ঞাত-কূল-জাত বিনা পিতায় জন্ম নেওয়া” পাঁচ ভাইয়ের কোনো অধিকারই মানতে রাজী নয় দুর্যোধন — মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের নীরব সমর্থনও সেইদিকে; ভীষ্ম, কৃপ আর দ্রোণ শুধু নীরব দর্শক। উপরন্তু শ্রীকৃষ্ণকে বন্দী করার চেষ্টা হল কৌরব রাজসভায়। সে চেষ্টা ব্যর্থ হল। কিন্তু স্থিরনিশ্চিত হয়ে গেল মহাযুদ্ধ – অপেক্ষা শুধু সময়ের। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র উপেক্ষা করলেন হিতৈষীদের সাবধানবাণী। ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ ভারাক্রান্ত মনে তৈরী হলেন পাণ্ডবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য।

হস্তিনাপুর ছেড়ে যাওয়ার আগে বিদুরের বাসভবনে শ্রীকৃষ্ণ আবার মিলিত হলেন কুন্তী আর বিদুরের সঙ্গে।

বিদুর বললেন- “কবে আবার দেখা হবে জানি না, বাসুদেব!…..এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধের শেষে কার সঙ্গে যে দেখা হবে, আর কার সঙ্গে যে হবে না তাও জানি না!”

শ্রীকৃষ্ণ হাসলেন, তারপর বললেন – “মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আদেশ করলে কুরুক্ষেত্রেই দেখা হবে…..”

কুন্তী বললেন – “বিদুর তো পদত্যাগ করবে মন্ত্রীর পদ থেকে।”

বিদুর বললেন – “হ্যাঁ বাসুদেব, আপনার অপেক্ষায় ছিলাম। সবই যখন নিশ্চিত হয়ে গেছে তখন আর দেরী করার প্রয়োজন নেই। রাজপ্রাসাদে আমার আর কোনো কাজ নেই। আপনি রওয়ানা হওয়ার পর, আমি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের কাছে গিয়ে মহামন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে আসব। কাল থেকে আমি আর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের বেতনভুক কর্মচারী নই।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “আগাম অভিনন্দন!….তবে কাজ এখনও বাকী আছে। প্রাসাদেই যখন যাবেন, একবার কথা বলে আসবেন পিতামহ ভীষ্মর সঙ্গে, আচার্যদ্বয়ের সঙ্গে – পাণ্ডব এঁদের সকলেরই বড়ো প্রিয়!”

বিদুর বললেন – “নিশ্চয়ই বলব। শুধু এঁরা কেন, যেখানে যত মহৎ আত্মা বীর আছেন – সবার দরজায় কড়া নেড়ে দেখব…..এই ধর্মযুদ্ধে কে দাঁড়াবেন পাণ্ডবের সঙ্গে!”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “সেই হবে এখন সবচেয়ে বড়ো কাজ। দুর্যোধনও বসে নেই, সেও চেষ্টা করবে যেন তেন প্রকারেণ শক্তি বাড়ানোর।”

কুন্তী বললেন – “আচার্যদ্বয় এবং তাত ভীষ্ম দুর্যোধনের পক্ষেই যুদ্ধ করবেন বলে মনে হয় না কি?”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “সম্ভবত…..তবু চেষ্টায় ক্ষতি কি? এ’ যুগের মহাবীরদের অনেককেই দুর্যোধন তার শিবিরে একত্র করে ফেলেছে, যেটা একটু চিন্তার কারণ!….কর্ণকে যদি কোনভাবে….আমি চেষ্টা করব, পিসীমা চেষ্টা করবেন, আপনিও চেষ্টা করবেন মহাত্মা বিদুর…..গঙ্গাপুত্র ভীষ্মর সঙ্গে এই বিষয়ে একবার কথা বলবেন!”

বিদুর বললেন – “যথা আজ্ঞা!”

কুন্তী নিরুত্তরে মাথা নীচু করে বসে রইলেন।

শ্রীকৃষ্ণ বিদায় নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

বিদুর সঙ্গে এলেন, শ্রীকৃষ্ণকে রথে তুলে দিতে।

কিন্তু রথে ওঠার আগেই, সামনে থেকে আরেকটি রথ এসে থামল বিদুরের দরজায়।

রথ থেকে নেমে এলেন অঙ্গরাজ কর্ণ।

শ্রীকৃষ্ণের সামনে এসে করজোড়ে বললেন- “বাসুদেব, মিত্র দুর্যোধনের ব্যবহারে আমি অত্যন্ত লজ্জিত – রাজসভায় আপনার সঙ্গে সে যা ব্যবহার করেছে তা’ নিন্দনীয়। আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।”

শ্রীকৃষ্ণ হাসলেন, তারপর বললেন- “প্রিয় কর্ণ, যদি তোমার হাতে সময় থাকে, তাহলে আমার রথে আমার সঙ্গে কিছুদূর চল!”

কর্ণ স্বীকৃত হলেন।

কর্ণকে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের রথ এসে থামল শহরের প্রান্তে একটি নির্জন জায়গায়।

রথ থেকে নেমে শ্রীকৃষ্ণ কর্ণকে নিয়ে এলেন পথপার্শ্বে, যেখানে দীর্ঘ মহীরুহরা রচনা করেছে স্নিগ্ধ ছায়া।

“তুমি বোধহয় ভাবছ যে কেন তোমাকে নিয়ে আমি এখানে এলাম?” শ্রীকৃষ্ণ বললেন।

কর্ণ বললেন- “অন্য কেউ হলে অবাক হতাম, কিন্তু বাসুদেব কৃষ্ণ যা করেন ভেবে করেন, তাই আমি অপেক্ষায় আছি….।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “আমিও আগে জানতাম না যে আজকে এইখানে তোমার সঙ্গে এই কথা আলোচনা করব, কিন্তু সুযোগ যখন এল তখন কথাটা বলে নেওয়াই ভালো।”

কর্ণ জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইলেন।

একটু থেমে থেকে, শ্রীকৃষ্ণ বললেন – “কর্ণ, তুমি তোমার পরিচয় জানতে চাও না?”

কর্ণ বললেন- “চাইলেই বা জানতে পারব কি করে?…..কতদিন কতরাত ঘুমোতে পারিনি বাসুদেব, অপমানের জ্বালায় জ্বলেছি, মনে হয়েছে আমি সুতপূত্র না, মনে হয়েছে যেন অবগুণ্ঠনে ঢাকা কার মুখ আমি আবছা দেখতে পাচ্ছি….আমার জন্মদাত্রী, কিন্তু তারপর আবার সব মিলিয়ে গেছে অন্ধকারে।”

“তুমি সুতপুত্র না, কর্ণ। তুমি উচ্চবংশজাত…তুমি ক্ষত্রিয়।” – ধীরস্বরে বললেন শ্রীকৃষ্ণ।

বিস্মিত কর্ণ শুধু বললেন – “আমি ক্ষত্রিয়?!”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “শুধু ক্ষত্রিয় না, তুমি পরম ক্ষত্রিয়- অতি উচ্চবংশে জন্ম তোমার। অতি আদরণীয়া সেই নারী, যিনি তোমার জন্ম দিয়েছেন।”

কর্ণ বললেন – “আমি কতবার ভেবেছি যে তিনি বোধহয় কোনো সম্ভ্রান্ত নারী, সমাজের ভয়ে পরিত্যাগ করেছেন আমায়….. নিশ্চয়ই কোনো নদীতীরে তাঁর বাস, সেই জলে আমাকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন…”

“তোমার অনুমান নির্ভুল, কর্ণ।….তোমাকে পরিত্যাগ করা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না।” শ্রীকৃষ্ণ ধীরস্বরে বললেন।

“কিন্তু….কিন্তু বাসুদেব – আপনি কি করে জানলেন আমার জন্মকথা? আপনি কি আমার জন্মদাত্রীকে চেনেন?” ব্যাকুল কর্ণ জিজ্ঞাসা করলেন।

“চিনি কর্ণ, খুব ভালো করে চিনি।…..তুমিও তাঁকে জান।” শ্রীকৃষ্ণ বললেন।

কর্ণ বললেন – “তবে বলুন, কে তিনি? কে আমার জন্মদাত্রী?”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন – “পাণ্ডবজননী মহিয়সী কুন্তী – তুমি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র।যুধিষ্ঠির,ভীম,অর্জুন তোমার ভাই।”

কর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন দিগন্তের দিকে চোখ মেলে। বিধাতার এ’ কি পরিহাস!

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “তুমি জ্যেষ্ঠ কৌন্তেয় কর্ণ, রাজ্যে তোমার প্রথম অধিকার।…তুমি জ্ঞানী, তুমি সৎ, তুমি ধার্মিক – তুমি দুর্যোধনের শিবিরে কেন? তুমি আমার সঙ্গে চল – মাতা পাবে, ভ্রাতা পাবে। পঞ্চপাণ্ডব পৃথিবী জয় করে তোমার পদতলে এনে দেবে। তুমি বসবে সিংহাসনে – তোমায় সেবা করবে যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব।”

কর্ণ এবারে মুখ খুললেন।

শ্রীকৃষ্ণের দিকে ফিরে বললেন- “আমার জন্মদাত্রীকে আমি প্রণাম জানাই। পাঁচপুত্র নিয়ে তিনি তো ভালোই আছেন, আজ হঠাৎ তাঁর এই ত্যাজ্যপুত্রকে মনে পড়ল কেন?…..আমার মাতা রাধা, যাঁর কোলে আমি আজও আমার সব সুখ-দুঃখ জমা করি….যাঁর নামে আমায় জগত জানে – রাধেয়। এতদিন বাদে, এই মহাযুদ্ধের সম্মুখে দাঁড়িয়ে, কি করব আমি অন্য মাতা নিয়ে?”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “তুমি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হয়ে অন্য ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে? না কর্ণ, তা হয় না। তুমি চলে এস পাণ্ডবশিবিরে – তোমার জন্য রাজসিংহাসন পাতা থাকবে।”

কর্ণ বললেন- “অনেক দেরী হয়ে গেছে বাসুদেব।….যেদিন আমার কেউ ছিল না, সেদিন দুর্যোধন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল – আমায় অঙ্গদেশের রাজমুকুট পরিয়েছিল। আজ যখন দুর্যোধনের আমাকে প্রয়োজন, আমার শক্তিকে প্রয়োজন – তখন তাকে ছেড়ে গিয়ে আমি অধর্ম করতে পারব না।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “দুর্যোধন নিজেই তো মূর্তিমান অধর্ম! এমনও তো হতে পারে যে সে তোমাকে অঙ্গদেশের রাজা করেছে এইজন্যে যাতে সে তোমাকে ব্যবহার করতে পারে অর্জুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে?”

কর্ণ বললেন- “তাও যদি হয়, তবু ঋণ নিয়েছি আমি- শোধও দিতে হবে আমাকেই। যে কথা ঋণ নেওয়ার সময় ভাবিনি, সে কথা ভাবার অধিকার আজ আর আমার নেই।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “ভালো করে ভেবে দেখ, কর্ণ! একদিকে সারা জগৎ, ধর্ম, মাতা, ভ্রাতা – আরেকদিকে অধর্ম আর বদনাম। সারাজীবন সৎ কাজ করে, কেন বদনামের ভাগী হবে?”

কর্ণ বললেন- “কোথায় ভ্রাতা, কোথায় মাতা?….এতদিনের বিদ্বেষ ভুলে আমি আর অর্জুন কি আজ পরস্পরকে আলিঙ্গন করতে পারি?….যে কারণে আমার জন্মদাত্রী আমাকে ত্যাগ করেছিলেন, সে কারণ কি আজও উপস্থিত নেই?…..না বাসুদেব, যা হয় না তার আলোচনা বৃথা। আজ এতদিন পরে, আমার জন্মরহস্য উন্মোচন করে আপনি আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছেন – আমাকে যে পাণ্ডবের বিরুদ্ধে লড়তে হবেই তাতে কোনো ভুল নেই। তাই এ’ আলোচনা থাক — যা এতদিন গোপন ছিল, তা’ আজও গোপনেই থাক।”

শ্রীকৃষ্ণ আর কথা বাড়ালেন না।

পরস্পরকে অভিবাদন করে, যে যার রথে উঠলেন – দুই রথ ছুটল দু’দিকে।

কর্ণ যখন হস্তিনাপুর প্রাসাদে দুর্যোধনের কক্ষে এসে পৌঁছলেন, সেখানে তখন দুর্যোধনের সঙ্গে উপস্থিত  আছেন দুঃশাসন এবং মাতুল শকুনি। কৌরবপক্ষের সেনাপতি নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা চলছে।

দুর্যোধনের যদিও ইচ্ছা যে কর্ণকে এই দায়িত্ব দেওয়া হোক, শকুনি তাঁকে বোঝাচ্ছেন যে রাজনীতি তথা  কূটনীতির দিক দিয়ে সেটা ঠিক হবে না – পিতামহ ভীষ্মকেই এই দায়িত্ব দেওয়া উচিত কাজ হবে।

কর্ণও দুর্যোধনকে একই কথা বললেন – তিনি জানেন যে সূতপুত্রের অধীনে যুদ্ধ করতে অনেক রথী-মহারথীরাই আপত্তি করবেন। অনেক বাগ্-বিতণ্ডার পর তাই ঠিক হল। সবাই চললেন ভীষ্মের কাছে।

ভীষ্ম তখন নিজের কক্ষে, বিদুরের সঙ্গে।

বিদুর কথা বলতে এসেছেন যুদ্ধ নিয়ে — কর্ণকে নিয়ে, মহামন্ত্রী পদ থেকে তাঁর ইস্তফা দেওয়া নিয়ে।

অনেকক্ষণ কথা হল।

দাসী এসে জানাল দ্রোণাচার্য এবং কৃপাচার্য দর্শনপ্রার্থী।

বিদুর বিদায় নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

দ্রোণাচার্য এবং কৃপাচার্য কক্ষে প্রবেশ করলেন।

ভীষ্ম বললেন – “বিদুর, তোমার রাস্তা খোলা আছে, তুমি চলে যেতে পারছ। আমিও যদি পারতাম!”

বিদুর বললেন -“তাতশ্রী, রাস্তা সবার জন্য খোলা আছে…..তাই নয় কি?”

ভীষ্ম বললেন – “না বিদুর, নেই।….আমি এই সিংহাসন রক্ষায় বচনবদ্ধ – আমার রাস্তা খোলা নেই।”

বিদুর ফিরে তাকালেন আচার্যদ্বয়ের দিকে। তাঁরা মাথা নাড়লেন, চোখ নীচু।

দ্রোণাচার্য বললেন – “মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ হয়ে, দুর্যোধনের পক্ষে যুদ্ধ করাই আমাদের নিয়তি!”

বিদুর বললেন- “ভালো, তবে তাই হোক্! এই যুদ্ধ যে যার ধর্ম অনুসারে করবে, আর আমি এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে – তাই আমি থাকব দূরে, নিজের কক্ষে দরজা বন্ধ করে!…..প্রণাম তাতশ্রী, প্রণাম আচার্য দ্রোণ, প্রণাম আচার্য কৃপ!”

দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ভীষ্ম বললেন- “যাওয়ার আগে ভাল করে একবার সব দেখে যাও বিদুর – আবার যখন আসবে, তখন হয়তো সব পাল্টে যাবে!”

প্রণাম করে বেরিয়ে আসছিলেন বিদুর, থেমে গেলেন সপারিষদ দুর্যোধনকে প্রবেশ করতে দেখে।

দুর্যোধন এসে প্রণাম করে দাঁড়ালেন, ভীষ্মকে প্রধান সেনাপতি হওয়ার অনুরোধ জানালেন।

ভীষ্ম বললেন – “আচার্যেরা থাকতে আমি কেন?”

কিন্তু তাঁর সে আপত্তি টিকল না। স্বয়ং আচার্যদ্বয় চান যে সেনাপতিত্বে থাকুন কুরুজ্যেষ্ঠ ভীষ্ম।

ভীষ্ম বললেন- “আমি সেনাপতি হব, কিন্তু আমার কিছু শর্ত আছে যা আমি এখনই বলে রাখছি।

আমি পঞ্চপাণ্ডবের কাউকে হত্যা করব না, আর আমি যতদিন সেনাপতি থাকব ততদিন সুতপুত্র কর্ণ কৌরবপক্ষে যুদ্ধ করতে পারবে না।”

দুর্যোধনের মুখ ক্রোধে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। মামা শকুনি তাঁকে ঈঙ্গিত করলেন শান্ত থাকতে।

কর্ণ বললেন- “মিত্র দুর্যোধন, মহাবীর ভীষ্মকে তোমার প্রয়োজন – তুমি সব শর্ত মেনে নাও। যদি সময় আসে, তোমার পক্ষে যুদ্ধ আমি করবই একদিন!….আজ আসি, আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে এখানে।”

কর্ণ বার হয়ে এলেন কক্ষ থেকে।

কর্ণর পিছনে বেরিয়ে এলেন বিদুর – তাঁর মন কিছুটা নিশ্চিন্ত, কর্ণ আর অর্জুনের যুদ্ধ আপাতত ঠেকানো  গেছে। বিদুর এবারে চললেন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের কাছে, মহামন্ত্রী পদ থেকে নিয়মমাফিক পদত্যাগ করতে।

মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র একাই বসে ছিলেন তাঁর নির্জন কক্ষে।

বিদুরের পদশব্দে সচকিত হয়ে উঠলেন।

বললেন – “আজ কি কঠোর বাক্য এনেছ বিদুর, আমার জন্য?”

বিদুর বললেন- “মহারাজ, যে অঙ্গ কষ্ট দেয় তাকে ছেদন করতে বলেন শল্যচিকিৎসকরা। আজ আমি নিজেই নিজেকে আপনার সভা থেকে ছিন্ন করলাম – আমি মহামন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করছি।”

ধৃতরাষ্ট্র বললেন – “তুমি তাহলে শেষ পর্যন্ত এই ভ্রাতাকে ত্যাগ করলে, বিদুর?”

বিদুর বললেন – “ভ্রাতাশ্রী, আমি যদি আপনাকে ত্যাগ করতে পারতাম…..হস্তিনাপুরকে ত্যাগ করতে পারতাম, তবে কবেই চলে যেতাম সব ছেড়ে। আমি তা’ করতে পারিনি এতদিন। কিন্তু যে মহাযুদ্ধ আজ আসন্ন, আমি সর্বোতোভাবে এর বিরুদ্ধে। তাই হস্তিনাপুরের মহামন্ত্রী পদে ইস্তফা দেওয়াই এখন আমার পক্ষে উচিত কাজ।”

ধৃতরাষ্ট্রর নির্জন কক্ষ আরো অন্ধকার করে দিয়ে, বিদুর বিদায় নিলেন কুরু রাজপ্রাসাদ থেকে।

বাড়ী এসে দেখলেন সুলভা চিন্তিত মুখে বসে আছে।

বিদুরকে দেখে বললেন – “দিদি ঘরে চুপচাপ বসে আছেন, কিছু খাননি এখনও।”

বিদুর বললেন – “হস্তিনাপুরের শুভচিন্তকরা আজ কেউ ভালো নেই, সুলভা।…..চল, গিয়ে দেখি।”

কুন্তীকে সম্ভাষণ করে বিদুর বললেন – “এইভাবে বসে থেকে কোনো লাভ নেই, দেবী!”

কুন্তী বললেন – “তবে কি করব, বল বিদুর?”

বিদুর বললেন – “প্রার্থনা করুন…..পাণ্ডবের জয়ের জন্য প্রার্থনা করুন দেবী!”

কুন্তী বললেন- “তবে কি আমি গান্ধারীপুত্রদের মৃত্যু কামনা করব? সে কি অন্যায় হবে না!….এ’ কেমন ধর্মসঙ্কট, বল তুমি?”

বিদুর বললেন- “গান্ধারীপুত্ররা অধর্মের সঙ্গে আছে, দেবী — ধর্মের জয় আর অধর্মের পরাজয় চাওয়ার মধ্যে অন্যায় কিছু নেই। কার মৃত্যু হবে আর কার মৃত্যু হবে না, সেটা দেখা আমাদের কাজ নয়!”

কুন্তী মুখ তুলে তাকালেন বিদুরের দিকে, কিছুটা যেন মন শান্ত হল বিদুরের কথা শুনে।

ধীরপায়ে পূজাগৃহের দিকে এগোলেন কুন্তী।

প্রাত্যহিক স্নান সেরে, নদীতীরে সূর্যপ্রণাম করে, উঠে আসছিলেন কর্ণ- ভোরের আবছা আলোয় মনে হল যেন বৃক্ষতলে কে দাঁড়িয়ে আছেন।

ভালো করে তাকিয়ে দেখে মনে হল কোনো রমণী, সাজপোশাক দেখে মনে হয় সম্ভ্রান্ত ঘরের।

বহুলোকেই এইসময় আসে কর্ণর কাছে কিছু প্রার্থনা করতে – কর্ণ কাউকে ফেরান না।

তেমনই কেউ ভেবে, কর্ণ বললেন – “বলুন দেবি, আমার কাছে আপনার কি প্রয়োজন?”

অবগুন্ঠন আরেকটু টেনে নিয়ে রমণী বললেন – “আমি কিছু চাইতে এসেছি, আশা করি প্রার্থনা পূরণ হবে!”

কর্ণ বললেন- “যাঁরা আসেন আমার কাছে, সবাই কিছু চাইতেই আসেন।….কিন্তু আপনার দ্বিধা দেখে মনে হচ্ছে আপনি চাইতে অভ্যস্ত নন। নিঃসঙ্কোচে বলুন – আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব প্রার্থনা পূরণের।”

রমণী বললেন – “আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি, পাণ্ডবপক্ষে।”

আশ্চর্য হয়ে কর্ণ বললেন- “গত দু’দিনে দু’বার এই কথা শুনলাম। গতকাল বাসুদেব কৃষ্ণ উৎকোচ দিতে চাইলেন, আর আজ…”

তাঁকে থামিয়ে দিয়ে রমণী বললেন – “উৎকোচ নয় বৎস, তোমার অধিকার!…..তুমি সূতপুত্র না, তুমি ক্ষত্রিয়। তোমার জন্মদাত্রী বাধ্য হয়েছিলেন জন্মের পর তোমায় ত্যাগ করতে…।”

কর্ণ বললেন – “আপনি কি করে জানলেন যে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন?”

রমণী মুখের অবগুণ্ঠন সরিয়ে দিয়ে বললেন – “কারণ, আমিই তোমার সেই মাতা কর্ণ – পাণ্ডবজননী কুন্তী!”

কর্ণ বললেন- “প্রণাম মাতা! আমি জানি না আপনি কি কারণে বাধ্য হয়েছিলেন সদ্যোজাত একটি শিশুকে ত্যাগ করতে, কিন্তু সমাজের ভয়ই যদি এর কারণ হয়ে থাকে তাহলে সে সমাজ তো আজও আছে!…..রাধেয় আমি, মাতা রাধাই আমার পরম পূজ্যা। আজ যুদ্ধের প্রাক্কালে পাণ্ডবজননী হঠাৎ কেন আমাকে ক্রোড়ে নিতে চাইছেন?”

কুন্তী বললেন- “বৎস, মনের তিক্ততা একবার পরিত্যাগ করে ভেবে দেখ – যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব তোমার ভাই। তুমি জ্যেষ্ঠ কৌন্তেয়, সিংহাসনে তোমার অগ্রাধিকার। তুমি কি এই যুদ্ধে তোমার ভাইদের হত্যা করতে চাও?”

কর্ণ বললেন- “আমি জানি যে আপনি আমাকে নিতে আসেননি, আপনি পাণ্ডবের প্রাণভিক্ষা করতে এসেছেন – আপনি অর্জুনের ঢাল হয়ে এসেছেন!…..আপনি আজ যা করলেন তা সমস্ত অন্যায়ের সীমা ছাড়িয়ে গেল! নিহিত স্বার্থের জন্য আপনি মাতৃমমতার ছলনা আশ্রয় করলেন?”

কুন্তী বললেন – “পুত্র….”

কর্ণ বললেন- “থাক্, আজ এতদিন বাদে আমাকে আর পুত্র সম্ভাষণ নাই বা করলেন।….আমি দুঃখিত যে আপনার প্রার্থনা আমি পূরণ করতে পারলাম না – দুর্যোধন আমার মিত্র, সে আমাকে সম্মান দিয়েছে। আজ বিপদের দিনে তাকে ফেলে আমি পাণ্ডবপক্ষে যোগ দিতে পারব না।…..তবে আপনাকে আমি খালি হাতে ফেরাব না। চার পাণ্ডবের প্রাণভিক্ষা আমি দিলাম, বাদ রইল অর্জুন। অর্জুনের সঙ্গে আমার শেষ যুদ্ধ আসন্ন। আমার মাথায় আছে গুরুর অভিশাপ – আছে ব্রাক্ষণের অভিশাপ। আমার কবচকুণ্ডল নেই – অর্জুনের পক্ষ নিয়ে ইন্দ্র সেই কবচকুণ্ডল আগেই নিয়ে গেছেন। তবু আমি যুদ্ধ করব। যুদ্ধের শেষে হয় আমি থাকব, নয় অর্জুন থাকবে – জগতের কাছে আপনার পুত্রের সংখ্যা পাঁচই থাকবে।….প্রণাম!”

বিলীয়মান কর্ণের ছায়ার দিকে তাকিয়ে হাত তুললেন কুন্তী, মনে মনে বললেন- “আমার মাতৃবৎসল পাঁচপুত্রের আমি ঢাল – তুমি ভুল বলনি। আমি বেঁচে থাকতে দুর্যোধনের দুরভিসন্ধি হস্তিনাপুরের সিংহাসন ছুঁতে পারবেনা। শেষ হয়ে যাবে কুরুশিবির আর দুর্যোধনের যত সহচর….তুমি কেন সেই দলে, কৌন্তেয় কর্ণ? তুমি দীর্ঘজীবি হও পুত্র, এও আমার প্রার্থনা – কিন্তু দুর্ভাগ্য তোমার, যে তুমি তা বুঝলে না!”

পূজা শেষে নিজের ঘরে এসে বসেছেন কুন্তী, এমনসময় দুর্যোধন এসে প্রণাম করলেন তাঁকে।

কুন্তী বললেন – “দুর্যোধন, তুমি?….দীর্ঘজীবি হও।”

দুর্যোধন বললেন- “কুরুক্ষেত্রে রওয়ানা হওয়ার আগে প্রণাম করতে এলাম ছোট-মা, বিজয়ী হওয়ার আশীর্বাদ চাই।”

কুন্তীর মুখে ফুটে উঠল দুর্জ্ঞেয় হাসি। বললেন – “সেই আশীর্বাদ কি তোমার মায়ের থেকে নাওনি?”

দুর্যোধন বললেন – “মা এই আশীর্বাদ দেবেন, যদি আপনি এই আশীর্বাদ আগে দেন।”

কুন্তী বললেন – “আর তাতশ্রী? আচার্যদ্বয়?”

দুর্যোধন বললেন- “তাঁরা আমার হয়ে যুদ্ধ করছেন, তাঁরা কি করে আশীর্বাদ দেবেন?”

কুন্তী বললেন- “তোমার ছোটমায়ের ঝুলিতে তোমার জন্য এই আশীর্বাদ নেই, দুর্যোধন।তাই তোমাকে দীর্ঘজীবি হওয়ার আশীর্বাদ দিলাম। কিন্তু জানিনা, আমার এই আশীর্বাদের কবচও তোমাকে পাণ্ডবের বাণের থেকে রক্ষা করতে পারবে কিনা!”

কুন্তীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, দুর্যোধন এলেন রাজভবনে, মাতা গান্ধারীর কাছে।

কিন্তু ধার্মিক গান্ধারীর কাছ থেকেও তিনি বিজয়ী হওয়ার আশীর্বাদ পেলেন না- “দীর্ঘজীবি হও” ছাড়া গান্ধারী আর কিছুই বলতে পারলেন না।

অতএব দুর্যোধন যুদ্ধক্ষেত্রে রওয়ানা দিলেন – বিজয়ী হওয়ার আশীর্বাদ ছাড়াই।

পূজোর ঘরে এসে গান্ধারী লুটিয়ে পড়লেন মহাদেবের পায়ে – ছেলেকে বিজয়ী হওয়ার আশীর্বাদ দিতে না পারা মায়ের বেদনা শুধু ঈশ্বরই জানেন!

কিছুক্ষণ বাদেই কুন্তী এলেন রাজপ্রাসাদে – গান্ধারীর কাছে।

গান্ধারী ব্যাকুল আলিঙ্গনে বাঁধলেন কুন্তীকে, বললেন – “এতদিনে দিদিকে মনে পড়ল?”

কুন্তী বললেন – “মনে রোজই পড়ে দিদি, কিন্তু আজ আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি।”

গান্ধারী বললেন – “কিসের ক্ষমা, কুন্তী?”

কুন্তী বললেন- “দিদি, আমি দুর্যোধনকে বিজয়ী হওয়ার আশীর্বাদ দিতে পারেননি, তাই ক্ষমা চাইছি- কিন্তু দীর্ঘজীবি হওয়ার আশীর্বাদ দিয়েছি।”

গান্ধারী বললেন- “দুর্যোধনকে বিজয়ী হওয়ার আশীর্বাদ দিলে অনর্থ হয়ে যেত, কুন্তী!…..তাকে দীর্ঘজীবি হওয়ার আশীর্বাদ দিয়ে তুমি আমাকে চিরঋণী করে রাখলে।”

কুন্তীর মুখে ফুটে উঠল হাসি, নিশ্চিন্ত হয়ে তিনি গৃহে ফিরলেন। ধার্মিক গান্ধারীর অভিশাপ যেন তাঁকে বা তাঁর পুত্রদের স্পর্শ করতে না পারে, এই বিষয়ে সদা-সচেতন কুন্তী।

যুদ্ধ শুরুর আগের সেই রাত, শান্তির শেষ রাত। কারুর চোখে ঘুম নেই।

নববিবাহিত অভিমন্যু চিঠি লিখছেন উত্তরাকে।

সৈনিকেরা বসে ভাবছে ঘরের কথা।

দ্রৌপদী উপলব্য নগরীতে থাকতে না পেরে চলে এসেছেন কুরুক্ষেত্রে – ভীম হাতে দুঃশাসনের রক্ত নিয়ে কি করে অতদূর যাবেন? আর চুলে সে রক্ত না লাগালে দ্রৌপদী চুল বাঁধবেন কিকরে?

শ্রীকৃষ্ণ আবার দেখা করলেন কর্ণর সাথে। আহ্বান জানালেন পাণ্ডবশিবিরে এসে যুদ্ধ দেখার – ভীষ্ম তো কর্ণকে যুদ্ধ করতে অনুমতি দেননি, সুতরাং দর্শক হয়ে তিনি এদিকে এসে বসুন। কিন্তু কর্ণ এলেন না – মহাসতী দ্রৌপদী যে শিবিরে এসে রয়েছেন সেখানে পা রাখার অধিকার তো কর্ণ সেই দ্যুতক্রীড়াগৃহেই হারিয়ে ফেলেছেন….।

অর্জুনকে সংহত হয়ে মা দুর্গার পূজা করতে বললেন শ্রীকৃষ্ণ, মা দুর্গার রক্ষাকবচ যাতে তাঁকে কর্ণের বাণ থেকে রক্ষা করে — অর্জুন তাই করলেন।

কুরুজ্যেষ্ঠ কৌরবসেনাপতি ভীষ্মের নেতৃত্বে যুদ্ধের নিয়মাবলী ঠিক হয়ে গেল – পদাতিক পদাতিকের সঙ্গে, রথী রথীর সঙ্গে, মহারথী মহারথীর সঙ্গে, এবং অতিরথী অতিরথীর সঙ্গে যুদ্ধ করবে। নারী, পলায়নপর, আত্মসমর্পণকারী এবং শস্ত্রহীন কারুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা চলবে না। এক যোদ্ধাকে দল বেঁধে একাধিক যোদ্ধা আক্রমণ করতে পারবে না। সূর্যোদয়ের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু এবং সূর্যাস্তের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হবে। দিনের শেষে দুই শিবিরের যোদ্ধারা প্রীতিপূর্ণ আবহাওয়ায় মেলামেশা করতে পারবে।

পাণ্ডবপক্ষের সেনাপতি, দ্রৌপদীর ভাই ধৃষ্টদ্যুম্ন বললেন- “কুরুজ্যেষ্ঠ ভীষ্মের সব নিয়ম আমরা মেনে নিলাম, আশা করি কৌরবপক্ষের সকলে এই নিয়ম মানবে?”

ভীষ্ম বললেন – “আর তোমাদের পক্ষে?”

ধৃষ্টদ্যুম্ন বললেন- “আমরা প্রথমে কোনো নিয়ম ভাঙব না। কিন্তু কৌরবপক্ষের কেউ যদি কোনো নিয়ম ভাঙে, তাহলে তারপর কি হবে আমি সে বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারব না।”

পারস্পরিক সৌজন্য বিনিময়ের পর পাণ্ডবপক্ষ বিদায় নিলেন ভীষ্মের শিবির থেকে।

আর মাত্র কয়েকঘন্টা – সূর্যোদয়ের অপেক্ষা!

তারপরেই শুরু হবে ভারতবর্ষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো যুদ্ধ।

 

 ৯.কুরুক্ষেত্র 

 

ব্যাসদেবের-কৃপায়-দিব্যদৃষ্টিপ্রাপ্ত সঞ্জয় রইলেন হস্তিনাপুর রাজপ্রাসাদে — তাঁর মুখ থেকে যুদ্ধের খবর পান মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, মহারাণী গান্ধারী আর বাকী প্রাসাদবাসী। সংবাদ এসে পৌঁছায় বিদুরভবনেও, যেখানে পাণ্ডবজননী কুন্তী রাত্রি অবসানের অপেক্ষায় অধীর হয়ে আছেন। বিদুর যুদ্ধ করবেন না আগেই বলে দিয়েছিলেন। বলরাম আর রুক্মীও (রুক্মিনীর ভ্রাতা) যুদ্ধে অংশ নেননি। এছাড়া উত্তর-দক্ষিণ, রাজা-প্রজা ভারতবর্ষের প্রায় সবাই আজ কুরুক্ষেত্রে। আর যারা কুরুক্ষেত্রে নেই, তাঁরা আরো বড়ো যুদ্ধে সামিল – তাঁরা অস্থির, ব্যাকুল প্রতীক্ষার প্রহর গুণছেন। কী ভীষণ সেই প্রতীক্ষা!

যুদ্ধের প্রথম দশদিন কেটে গেল। দু’পক্ষেই প্রচুর সৈন্য হতাহত হলেও, কোনো পক্ষেরই সন্তোলন নষ্ট হয়নি।

যুদ্ধ চলছে, কতদিনে শেষ হবে জানা নেই।

যুধিষ্ঠিরের শিবিরে বসেছে আলোচনা সভা।

শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন- “ভ্রাতাশ্রী, আপনি বরং পিতামহ ভীষ্মর কাছে গিয়ে ওনার আশীর্বাদ ফিরিয়ে দিয়ে আসুন। পিতামহ আপনাকে বিজয়ী হওয়ার আশীর্বাদ তো দিয়েছেন, কিন্তু আপনার আর আপনার বিজয়ের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং তিনি। তিনি কৌরবসেনার সেনাপতি আর তিনি ইচ্ছামৃত্যুর বরপ্রাপ্ত — এমতাবস্থায় পাণ্ডবের জয়ের পথ কি?…..ওনাকেই বলুন বিজয়ের উপায় বলে দিতে, নয়তো আশীর্বাদ ফিরিয়ে নিতে। সঙ্গে অর্জুনকেও নিয়ে যান, অর্জুন পিতামহের বড়ো প্রিয়।”

ক্লান্ত ভীষ্ম যেন শ্রীকৃষ্ণের এই ঈঙ্গিতটুকুর অপেক্ষাতেই ছিলেন। পুনর্জন্ম নেওয়া শিখণ্ডীরূপিণী অম্বাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে প্রিয় অর্জুন মুক্তি দিক তাঁকে – এ’ বোধহয় তাঁরও ইচ্ছা ছিল। ইচ্ছামৃত্যুর ঢাল পরে, এই ধর্মযুদ্ধে দুর্যোধনের ধ্বজতলে যুদ্ধ করতে করতে, তিনি ক্লান্ত আর বিষন্ন হয়ে পড়েছিলেন –

শিখণ্ডী-রূপী অর্জুনের ঢাল এনে দিল সমতা, এনে দিল ভীষ্মের মুক্তি। এবার রইল শুধু শরশয্যায় শুয়ে প্রতীক্ষার প্রায়শ্চিত্ত।রইল এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করার শাস্তি। রইল পুত্র-পৌত্র-প্রপৌত্রের মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপনের দুরূহ কর্ম। হস্তিনাপুরের সিংহাসন সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিদায় নিতে অক্ষম — আজ বোধহয় তাঁর বহুযুগ আগে নেওয়া শপথের ভার যথাযথভাবে অনুভব করলেন ভীষ্ম নিজে।

এই শরশয্যা শুধু ভীষ্মের পতন ছিল না, এর সঙ্গে পতন হল নিয়ম শৃঙ্খলা নৈতিকতারও। এর আগেও যে যুদ্ধের নিয়মে একটু আধটু ব্যতিক্রম হয়নি তা নয়, হয়েছে – দু’পক্ষই ভেঙেছেন নিয়ম, করেছেন চতুরতা।

কিন্তু এরপর যা শুরু হল, তা’ ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। আশা শুধু একটাই – দিন হবে, আলো ফুটবে, ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

হস্তিনাপুরে, বিদুর ভেঙে পড়লেন ভীষ্মের শরশয্যার খবর শুনে।

বিদুরের মনে তাত ভীষ্মের জন্য পাতা ছিল এক বিশেষ আসন – দাসীপুত্র বিদুরকে নিজের মানসপুত্র জ্ঞানে শিক্ষা, ধর্ম আর প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে দিয়েছেন ভীষ্ম। সদাসর্বদা তাঁকে নিজের কাছে রেখে সম্মানের আসন দিয়েছেন। আজ ধৃতরাষ্ট্র আর দুর্যোধনের উচ্চাকাঙ্খার দাম দিতে সেই শ্বেতশুভ্র তাতশ্রী কুরুক্ষেত্রের ধুলোয় শয্যা পেতেছেন, এটা মেনে নেওয়া বিদুরের পক্ষে বড় কষ্টের।

কিন্তু কঠোর সত্য সেটাই।

কুন্তী বললেন – “বিদুর, তুমি তাতশ্রীর সঙ্গে দেখা করতে যাবে না?”

বিদুর বললেন- “না! শ্বেতবস্ত্র পরিহিত, ঋজু, তাতশ্রীর যে ছবি আমার মনে আছে আমি তাকে নষ্ট করতে চাইনা, মহারাণি! শরশয্যায় শায়িত তাতশ্রীকে আমি দেখতে চাইনা।”

কুন্তী বললেন- “কিন্তু আমি যেতে চাই বিদুর…….আমাকে যেতেই হবে। তাতশ্রীকে প্রণাম করে আমি ওখানেই থেকে যাব যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত। অর্জুন খুবই আবেগপ্রবণ – জানি না তাতশ্রীর এই শরশয্যা সে কিভাবে নিয়েছে। আবেগের মুখে পড়ে সে দিশাহারা হয়ে যায়। ছোট থেকে আমি তাদের শিখিয়েছিলাম যে ‘আগে চিন্তা করে তারপর কাজ করবে, কাজ করতে শুরু করার মুখে বা কাজটা শুরু করে দিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে বসবে না।’…..কিন্তু সে তা করতে পারে না প্রায়শই – যুধিষ্ঠির যত স্থিতধী, অর্জুন তা’ নয়। তাছাড়া, তাতশ্রীর অবর্তমানে যুদ্ধের নামে যে কুরুক্ষেত্রে কি চলবে জানা নেই – গান্ধারনরেশ শকুনি বা দুর্যোধন, কেউই ধার্মিক নয়। তাদের সঙ্গে আছে কর্ণ – তাতশ্রী সেনাপতি থাকাকালীন সে যুদ্ধ করতে পারেনি, কিন্তু এখন সে সর্বশক্তি নিয়ে যুদ্ধে নামবে পাণ্ডব এবং অর্জুনের বিরুদ্ধে।…..আমাকে গিয়ে ছেলেদের পাশে একবার দাঁড়াতেই হবে, তাদের মনোবল বাড়াতে হবে।”

বিদুর বললেন- “ঠিকই বলেছেন, দেবি! আপনার যাওয়া উচিত।….কিন্তু আপনি একা যাবেন? খুব কম দূরত্ব তো নয়!”

কুন্তী বললেন- “দেখি, একবার রাজপ্রাসাদে যাব। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র হয়তো যাবেন না, কিন্তু দিদি যদি তাতশ্রীকে প্রণাম করতে চান তাহলে দু’জনে একসঙ্গে যাব।”

কুন্তী রাজপ্রাসাদে এসে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের বিশ্রামকক্ষে গেলেন, যেখানে ধৃতরাষ্ট্র আর গান্ধারী বসে যুদ্ধের কথাই আলোচনা করছিলেন।

গান্ধারী বললেন- “এখনও সময় আছে মহারাজ, তাতশ্রীকে সামনে রেখে সন্ধি করে নিন।…..সর্বনাশকে আমন্ত্রণ করে আনবেন না।”

ধৃতরাষ্ট্র বললেন – “সন্ধির রাস্তা ছেড়ে অনেকদূর চলে এসেছি গান্ধারী, এখন সন্ধির আলোচনা বৃথা।”

কুন্তী এসে প্রণাম করে দাঁড়ালেন,বললেন- “তাতশ্রীর জন্য শোকজ্ঞাপন করতে এসেছি, দিদি। তাঁকে একবার প্রণাম করতে চাই।”

ধৃতরাষ্ট্র বললেন- “কুন্তী, আজ তোমার ছেলে অর্জুনের জন্য তাতশ্রীর এই অবস্থা — দু’টুকরো জমির জন্য কিনা তোমার ছেলেরা তাতশ্রীকে শরশয্যায় শোওয়াল? এটা কি উচিত কাজ হয়েছে?….অর্জুন তো যুদ্ধ করতেই চাইছিল না প্রথমে – কিন্তু তোমার ভ্রাতুষ্পুত্র কৃষ্ণ তাকে কর্মযোগের কথা বলে উস্কে দিল।……আর আজ কি হল, দেখ – ইতিহাস লিখবে যে অর্জুনের কাঁধে পিতামহ ভীষ্মের শব!”

গান্ধারী বললেন- “মহারাজ, কার কাঁধে যে তাতশ্রীর শব তা’ আমরা সবাই জানি।…..আপনি বরং অন্য কথা ভাবুন। কুরুক্ষেত্রে চলুন – তাতশ্রীকে প্রণাম করে বাসুদেব কৃষ্ণের সাথে কথা বলুন। বলুন যুদ্ধ বন্ধ করতে – তিনি চাইলেই যুদ্ধ বন্ধ হবে।”

ধৃতরাষ্ট্র বললেন – “এখন আর তা’ সম্ভব নয়।…..তোমরা দু’জন যদি চাও তো তাতশ্রীর কাছে যাও। তাঁকে প্রণাম কর আর বল যে যুদ্ধের সময়ে রাজার রাজ্য ত্যাগ করা উচিত নয় – তা নাহলে আমিও যেতাম তাঁর চরণদর্শনে।”

ভারাক্রান্ত মনে কুন্তী ফিরে এলেন বিদুরভবনে।

বিদুর বললেন – “কি হল, দেবি? কুরুক্ষেত্রে যাচ্ছেন না?”

কুন্তী বললেন – “কাল রওয়ানা হব, দিদি আর আমি।”

বিদুর বললেন – “তাহলে?……”

কুন্তী বললেন- “মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনকে আড়াল করে সব দোষ পাণ্ডবের ওপরে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আজ কত বছর হল – এর কি কোনো শেষ নেই, বিদুর?”

বিদুর বললেন- “না, ধরে নিন শেষ নেই। মহারাজ জানেন যে শুধু দুর্যোধন নয়, দোষী সবচেয়ে বেশী তিনি নিজে – তাইজন্যেই তিনি পাণ্ডবকে দোষ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আপনার সেকথা কানে তোলারও দরকার নেই, মাথায় নেওয়ারও দরকার নেই।”

কুন্তী বললেন- “কি করে কান বন্ধ করে রাখি, বল?…..আজ মহারাজ বললেন যে ইতিহাস নাকি বলবে অর্জুনের কাঁধে পিতামহ ভীষ্মের শব……সামান্য একটু জমির জন্য নাকি আমার ছেলেরা এটা করল আর কৃষ্ণ তাদের ইন্ধন যোগাল।…..আমি তো একদিনের জন্যও ভুলিনি যে আমি কুরুকূলের বধূ, আমি তো সব কর্তব্য পালন করে গেছি চিরদিন, আমি তো কোনদিন হস্তিনাপুরের ওপরে আমার নিজের ছেলেদের স্বার্থ রাখিনি, শান্তির জন্য খাণ্ডবপ্রস্থও তো একদিন স্বীকার করে নিয়েছিলাম – তবু, তবু….আর কত কথা শুনতে হবে কুরুকূলের কাছে আমায়? আজ তো শুধু হস্তিনাপুরের জমির জন্য যুদ্ধ নয় – আজ যুদ্ধ ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য, আজ যুদ্ধ সব নারীর সম্মানের জন্য পাঞ্চালী যাদের শুধু প্রতিভূ মাত্র!”

বিদুর একটু হাসলেন, তারপর বললেন – “দু’টুকরো জমিই যদি হবে, তাহলে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র কেন ছেড়ে দিলেন না? বাসুদেব কৃষ্ণ তো পাঁচখানা গ্রাম নিতেও রাজী ছিলেন — পাণ্ডব মেনেও নিত শ্রীকৃষ্ণের নির্ণয়, শান্তির জন্য। আমি জানি, আপনিও মেনে নিতেন। কিন্তু মানলেন না তিনি, যিনি এই যুদ্ধ আটকাতে পারতেন কিন্তু আটকাননি – স্বয়ং মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র।…..আর বাসুদেব কৃষ্ণ কাউকে ইন্ধন যোগান না, তিনি সবাইকে ধর্মপথে রাখার চেষ্টা করেন। অর্জুনের বুদ্ধিভ্রংশ হয়েছিল অসময়ে। যে অর্জুন যুদ্ধের জন্য উতলা হয়েছিল, সে সঙ্কটের সময় গাণ্ডীব ত্যাগ করে বসে পড়ল — বাসুদেব তাকে বোঝাবেন না?….আপনি ঐসব নিয়ে চিন্তা করবেন না দেবি, মহারাজ এবং দুর্যোধন সর্বদাই অন্যকে দোষ দেয় – নিজেকে কদাপি নয়।”

কুন্তী বললেন – “অর্জুন যদি এ’কথা শোনে তাহলে সে আরও ভেঙে পড়বে।……আমার পুত্রেরা মুনি-ঋষির মতো – সরল, বিনয়ী এবং ধার্মিক। তপোবনে তারা জন্মেছে, বহু যত্নে তাদের ধর্মশিক্ষা, সহবতশিক্ষা দিয়েছি। হস্তিনাপুরে এসে তারা রাজনীতি দেখেছে, রাজবাড়ীর হালচাল শিখেছে – কিন্তু কূটনীতিতে তারা পারদর্শী নয়। দুর্যোধনের, গান্ধার নরেশের, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের চাল বোঝার ক্ষমতা তাদের নেই, বিদুর। তাই সদাই ভয় হয়….।”

বিদুর বললেন – “তার জন্যই তো আছেন আপনি, আছেন বাসুদেব কৃষ্ণ – পাণ্ডবের মার্গদর্শনের জন্য। বাসুদেব স্বয়ং যেখানে অর্জুনের রথের সারথি সেখানে চিন্তার কোনো কারণ নেই – রাজনীতি এবং কুটনীতিতে তিনি আজ ভারতবর্ষে সর্বশ্রেষ্ঠ, আর তিনি ধর্মের ধ্বজাধারী। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র বা দুর্যোধনের মতো, বাসুদেব কৃষ্ণ স্বার্থের জন্য কূটনীতি করেন না – তিনি যা করেন সবই ধর্মের জন্য। সুতরাং তিনি যেখানে, জয় সেখানে।……আপনি চিন্তা করবেন না। বিশ্রাম নিন, কাল ভোরে আপনাদের বেরোতে হবে।”

কুন্তী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন – “তুমি একটা কাজ করবে, বিদুর?”

বিদুর বললেন – “বলুন।”

কুন্তী বললেন- “তুমি কাউকে দিয়ে হিড়িম্বার কাছে খবর পাঠাও।…..এই যুদ্ধের খবর তার কাছে পৌঁছনো দরকার। ভীম আর হিড়িম্বার পুত্র ঘটোৎকচ শুনেছি দানবিক যুদ্ধে বিশেষ পারদর্শী। আর দানবিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে সাধারণ অস্ত্র বিশেষ কাজে আসে না – পাণ্ডবের জন্য সেটা সুবিধাজনক হতে পারে।…..হিড়িম্বা যেন খবর পাওয়া মাত্র, যত শীঘ্র সম্ভব, পুত্রকে সোজা কুরুক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেয়, ভীম এবং পাণ্ডবের সাহায্যার্থে।”

বিদুর বললেন- “অবশ্যই, আমি কালই লোক পাঠাচ্ছি।…..যুদ্ধের আলোচনাসভায়, তালেগোলে, কারুর তো মনেই পড়েনি তার কথা!”

পরদিন কুন্তী আর গান্ধারী রওয়ানা হলেন কুরুক্ষেত্রের পথে।

আশঙ্কাকুল দুই মাতা — একজনের সম্বল চোখের জল, আরেকজনের সম্বল বুদ্ধি।

এক মাতার অশ্রুসজল আবেদন তাঁর অবাধ্য-অধার্মিক পুত্রদের কানে ঢুকলেও হৃদয়ে প্রবেশ করে না।

আরেক মাতার দৃঢ় পরামর্শ তাঁর বাধ্য-ধার্মিক পুত্ররা মাথায় তুলে নেন।

আজ কিন্তু দুই মাতাই সমান ব্যাকুল – কারণ তাঁদের সমস্ত পূজা, প্রার্থনা, আবেদন, শুভকামনা, পরামর্শের শেষেও, পরিণতি যে কি হবে তা কারুরই জানা নেই।

চিন্তা চলছে দ্রুতগতি, কিন্তু রথ নয়।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় পরিচারকরা তাঁবু ফেললেন একস্থানে – কুরুক্ষেত্র এখনও কিছু দূর।

কি যেন এক অস্থিরতায় কুন্তী আজ কিছুতেই চোখের পাতা এক করতে পারছেন না।

গান্ধীরী এসে বসলেন পাশে, বললেন – “ঘুমোওনি, কুন্তী?”

কুন্তী বললেন – “কিছুতেই ঘুম আসছেনা আজ, দিদি। কেন জানি চোখে জল চলে আসছে।”

গান্ধারী বললেন – “আমার চোখে আর জলও নেই।…..ক’জন পুত্রের মৃত্যুতে আর কাঁদব, বল? আমার জীবিত পুত্রের সংখ্যা তো রোজই কমছে!”

কুন্তী বললেন- “আজ বোধহয় কুরুক্ষেত্রে কিছু অঘটন ঘটেছে, দিদি!”

গান্ধারী বললেন- “কুরুক্ষেত্রে অঘটন ছাড়া আর কি ঘটবে?”

দু’জনের কেউই তখনও জানেন না, আন্দাজও করতে পারেননি, যে সেইদিন প্রবল যুদ্ধের পর সাত মহারথীর হাতে নিহত হয়েছেন অস্ত্রবিহীন বালক অভিমন্যু। প্রবল পরাক্রান্ত অভিমন্যু চক্রব্যুহ ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করেন, কিন্তু ব্যুহমুখে দাঁড়িয়ে জয়দ্রথ আটকে দেন যুধিষ্ঠির, ভীম, নকুল, সহদেব এবং পাণ্ডবসেনাকে। শ্রীকৃষ্ণসহ অর্জুনকে তখন যুদ্ধক্ষেত্রের আরেক প্রান্তে ব্যস্ত রেখেছে কৌরবসেনা। সুতরাং অভিমন্যুর সাহায্যার্থে কেউ আসতে পারলেন না। তৎসত্ত্বেও বীরবিক্রমে যুদ্ধ করলেন অভিমন্যু। কেউ তার সাথে একক যুদ্ধে এঁটে উঠতে পারলেন না। শেষে হরিণশাবককে যেমন ঘিরে ধরে হত্যা করে নেকড়ের পাল, সেইভাবেই অভিমন্যুকে ঘিরে ধরে হত্যা করলেন দ্রোণাচার্য সমেত কৌরবপক্ষের সাত মহারথী।

আপাতদৃষ্টিতে এই মৃত্যুর ক্ষত পাণ্ডবপক্ষের হলেও, এর ফল হল সুদূরপ্রসারী – কৌরবের জন্যও।

যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে – যে নিয়ম তৈরী করেছিলেন কুরুজ্যেষ্ঠ ভীষ্ম, একজনের সঙ্গে একজন যুদ্ধ করবে – সেই নিয়ম ভেঙে, কৌরবপক্ষ খুলে দিল নিয়মের সব বাঁধন।

যে দ্বিধা তখনও, গীতা শোনার পরও, আলগা করে ধরে রেখেছিল অর্জুনের হাত- সেই দ্বিধা উড়ে গেল প্রবল ঝড়ে। অর্জুন হয়ে উঠলেন জোয়ারের স্রোতের মতো দুর্দমণীয়।

হস্তিনাপুরে বসে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রও অনুভব করলেন যে এই হত্যার দাম খুব বেশী করেই দিতে হবে কৌরবকে।

পরবর্তী অধ্যায়ে জয়দ্রথ, দ্রোণাচার্য, কর্ণ, দুঃশাসন, দুর্যোধনের মৃত্যু আর তাই পৃথিবীকে অবাক করে না —  যুদ্ধের বাকী পাঁচদিন ছিল তেরোদিনের দিন অভিমন্যু হত্যার আবেগচালিত পরিণতি। নিয়মভঙ্গের খেলা। যুদ্ধ নয়, হত্যা।

কিন্তু সেসব পরের কথা। আগে দেখা যাক কুন্তী আর গান্ধারীর কুরুক্ষেত্রে পৌঁছানর পর কি ঘটল।

কুন্তী কিন্তু পুত্রদের শিবিরে গিয়ে উঠলেন না।

গান্ধারীর সঙ্গে সঙ্গে তাঁরও থাকার ব্যবস্থা হল কৌরবপক্ষের দিকের একটি শিবিরে।

পাণ্ডব দিনের শেষে কৌরব শিবিরে এলেন – গান্ধারীকে প্রণাম করে তাঁরা এলেন কুন্তীকে প্রণাম করতে।

সুদীর্ঘ তেরোবছর পর কুন্তীর দেখা হল পাঁচপুত্রের সঙ্গে। স্থিতধী কুন্তীর কোলে ক্লান্ত শির নামিয়ে দিলেন নকুল আর সহদেব। যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন ঘন হয়ে এসে বসলেন কুন্তীর চারপাশে – তাঁর শান্ত, দৃঢ় মুখের দিকে তাকিয়ে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করলেন ধর্মযুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার।

কৌরবমাতা গান্ধারী যখন পুত্র দুর্যোধনকে বৃথা অনুরোধ করছেন সন্ধি করতে, মাতা কুন্তী তখন সস্নেহে তাঁর পুত্রদের আশীর্বাদ করছেন – সাবধান করছেন যুদ্ধের নানা বিষয়ে।

দ্রৌপদীও আসতে চেয়েছিলেন প্রণাম করতে, কিন্তু কুন্তী বারণ করলেন তাঁকে কৌরবশিবিরের সীমানায় আসতে।

পুত্ররা বিদায় নিলে, দুই মাতা চললেন তাত ভীষ্মর সঙ্গে দেখা করতে।

তাত ভীষ্ম আশীর্বচন উচ্চারণ করে হেসে বললেন- “কুন্তী, তোমার ছেলে আজ আমার হাত মাটিতে গেঁথে দিয়েছে, তাই হাত তুলে তোমার শির স্পর্শ করতে পারলাম না।…..কিন্তু এই প্রতিটি ক্ষত আমাকে আনন্দে ভরে দিচ্ছে – এই আমার সারাজীবনের অর্জিত ফল।”

কুন্তী বললেন – “তাতশ্রী, আপনাকে এইভাবে দেখতে হবে তা কোনদিন ভাবিনি।”

ভীষ্ম বললেন- “এ’ আমার আর হস্তিনাপুরের কর্মফল – তুমি দুঃখ কর না। শুধু অপেক্ষায় আছি কবে হস্তিনাপুর সুরক্ষিত হবে, সেইদিন আমার মুক্তি।”

গান্ধারী বললেন- “তাতশ্রী, এই যুদ্ধের জন্য আমি বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণকে কোনদিন ক্ষমা করব না। বাসুদেব চাইলে এই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারতেন!”

ভীষ্ম বললেন- “বাসুদেব ত্রিকালজ্ঞ পুরুষ, তিনি জানেন যে এই যুদ্ধের লক্ষ্য অনেক বড়ো।… ধর্মযুদ্ধে কে বীরগতি প্রাপ্ত হল তাই নিয়ে শোক করা চলে না পুত্রী, কাউকে দোষীও করা চলে না।”

কুন্তী বললেন – “কিন্তু আমরা কেউ তো বাসুদেব নই – আমরা শুধু মাতা, তাতশ্রী!”

ক্লান্ত ভীষ্মকে রণক্ষেত্রে রেখে গান্ধারী আর কুন্তী ফিরলেন শিবিরে।

কুন্তীর শিবিরে প্রতীক্ষায় ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ।

পারস্পরিক সৌজন্য বিনিময়ের পর দুজনে এসে বসলেন।

কুন্তী বললেন – “কৃষ্ণ, তাতশ্রীর পর কৌরবপক্ষ যেভাবে যুদ্ধ করছে তাতে তো কোনোই নিয়ম শৃঙ্খলা নেই। কর্ণও এখন যুদ্ধ করতে নেমেছে। অর্জুনের জন্য খুবই চিন্তায় আছি।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “অভিমন্যু হত্যা বুঝিয়ে দিয়েছে যে কৌরবপক্ষ আর কোনো নিয়ম মানবে না। সুতরাং পাণ্ডবকেও তাই করতে হবে – নাহলে বিজয়শ্রীর আশীর্বাদ পাওয়া অসম্ভব…..আর ধর্মযুদ্ধে জয়ী হতে হবে ধর্মকেই।”

কুন্তী বললেন – “তুমি ছেলেদের বুঝিয়ে বল।..অর্জুনকে নিয়েই আমার বেশী চিন্তা – সে বড়ো আবেগপ্রবণ!”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “অভিমন্যুর মৃত্যুর পর সে মন দিয়ে যুদ্ধ করবে বলেই মনে হয়, পিসীমা।…..আমি অর্জুনের রথকে সামলে রাখছি, কিন্তু খুব বেশীদিন তা সম্ভব নয়। শীঘ্রই মুখোমুখি হবে কর্ণ এবং অর্জুন। কর্ণের কাছে অমোঘ দিব্যাস্ত্র আছে, যাকে সে একবারই ব্যবহার করতে পারবে কিন্তু তার লক্ষ্য হবে অব্যর্থ। আর কর্ণ সেটা বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে অর্জুনের জন্য।”

চিন্তিত কুন্তী বললেন- “আমি আসার আগে হিড়িম্বাকে খবর পাঠিয়ে এসেছি ঘটোৎকচকে এখানে পাঠাতে।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “ঘটোৎকচের আগমন যুদ্ধের গতি ঘুরিয়ে দিতে পারে।”

কুন্তী বললেন – “কৃষ্ণ, তোমার ওপরেও দিদি গান্ধারী এবং মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র খুশী নন। তাঁরা বলেন যে তুমি না চাইলে এই যুদ্ধ হত না, কিন্তু তুমিই যুদ্ধ চেয়েছ। ভয় হয় তোমাকে….”

শ্রীকৃষ্ণ হেসে বললেন – “আমি ধর্ম চেয়েছি, আর ধর্মস্থাপনার জন্য এই যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল। যাঁরা ধর্মের পথে আছেন, তাঁরা সেকথা জানেন এবং আমার প্রদর্শিত পথে চলেন। যাঁরা ধর্মের তত্ত্ব ভুলে গেছেন, তাঁরা সবকিছুই ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির নিরিখে মাপেন। আমাকে কে কি বললেন তা’ নিয়ে চিন্তা কর না, কারণ আমি একেবারেই চিন্তিত নই। তুমিও নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাও – ধর্মের জয় হবেই।”

শ্রীকৃষ্ণের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে কুন্তী খানিকটা নিশ্চিন্ত হলেন।

তাঁর পাঁচপুত্রই মহাবীর, অর্জুনের তো তুলনাই নেই। বলশালী ভীমের সঙ্গেও শক্তিতে পেরে ওঠা কঠিন। ধার্মিক যুধিষ্ঠির শুধু বীর এবং সৎ নয়, সে কঠিন সঙ্কটের সময়েও স্থিতধী। নকুল এবং সহদেবের বীরত্বও কম নয়।

তবু, কুন্তী জানেন যে শ্রীকৃষ্ণ সহায় না থাকলে এই যুদ্ধ জেতা অসম্ভব।

শুধু শক্তি যুদ্ধ জেতায় না – যুদ্ধ জেতায় বুদ্ধি।

বীরত্ব তো কৌরবপক্ষেরও কম নয় – কিন্তু যুদ্ধ জেতার জন্য শুধু সেটাই সব না।

পাণ্ডব এবং কৌরব দু’পক্ষেই আছে হস্তিনাপুরের রাজগুরুদের দেওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্রশিক্ষা।

কিন্তু পাণ্ডবপক্ষে এছাড়াও আছে বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য, কূটনীতি, ধর্ম আর নীতিজ্ঞান- যার প্রায় সবটাই যাদবকূলের অবদান। কিছুটা হয়তো প্রাপ্ত বিদুরের শিক্ষা থেকে বা বাল্যকালের তপোবনের শিক্ষা থেকে – বাকীটা প্রাপ্ত মাতা কুন্তী এবং সখা শ্রীকৃষ্ণের থেকে।

এই ঋণ শুধু পাণ্ডবের নয়, এই ঋণ থেকে যাবে হস্তিনাপুরের – চিরদিন!

অন্ধকার থেকে আলোয় পৌঁছনোর ঋণ, অধর্ম থেকে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার ঋণ।

পরদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল সাঙ্ঘাতিক যুদ্ধ। যুদ্ধের আজ চতুর্দশ দিন।

আগের দিন নিহত হয়েছেন অভিমন্যু – তাঁর মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে সর্বসমক্ষে অর্জুন শপথ নিয়েছেন যে পরেরদিন যুদ্ধে তিনি হত্যা করবেন সিন্ধু-নরেশ জয়দ্রথকে, অন্যথায় নিজের প্রাণ দেবেন অগ্নি-আহুতি।

বলা বাহুল্য যে সমস্ত কৌরবসেনা আজ রক্ষা করছে দুর্যোধনের ভগ্নিপতি জয়দ্রথকে।

হস্তিনাপুরে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আশায় আছেন……সূর্যাস্তের মধ্যে যদি অর্জুন তাঁর প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে না পারেন, তাহলে অর্জুনের মৃত্যু আর জয়দ্রথের জীবন নিশ্চিত- আর তারপর অর্জুন-বিহীন পাণ্ডবসেনাকে হারানো কৌরবের পক্ষে হবে অতীব সোজা।

কিন্তু ঈশ্বর আছেন ধর্মের পক্ষে, তাই কৌরবপক্ষকে নিরাশ হতে হল।

সূর্যের ক্ষণিক আড়ালকে সূর্যাস্ত ভেবে, উল্লসিত জয়দ্রথ অসতর্ক হয়ে এগিয়ে এলেন। মুহূর্তের মধ্যে সূর্যদেব পুনঃপ্রকাশিত হলেন এবং অর্জুনের বাণে নিহত হলেন জয়দ্রথ।

‘ধর্মের জয় হবেই’  শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন – সেই জয় এনে দিতে তিনি বদ্ধপরিকর।

এরপর যুদ্ধ হয়ে উঠল ভয়ঙ্কর।

আশাহত, ক্রুদ্ধ কৌরবপক্ষ লড়াই করে চলল প্রবল পরাক্রান্ত পাণ্ডবের সঙ্গে।

ইতিমধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন ঘটোৎকচ, তাঁর দানবীয় যুদ্ধকৌশল নিয়ে।

কৌরবপক্ষের লক্ষ লক্ষ সেনা মুহূর্তের মধ্যে নিঃশেষিত হয়ে গেল ঘটোৎকচের আক্রমণে।

কোনো অস্ত্রেই ঘটোৎকচকে কাবু করতে না পেরে, দুর্যোধন কর্ণকে তাঁর দিব্যাস্ত্র চালাতে বললেন।

কবচ কুণ্ডলহীন কর্ণের কাছে ঐ দিব্যাস্ত্রই তখন অর্জুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শেষ অস্ত্র, শেষ ভরসা – কর্ণ চাইছেন ঘটোৎকচের ওপর প্রয়োগ না করে ঐ অস্ত্র বাঁচিয়ে রাখতে অর্জুনের জন্য।

কিন্তু দুর্যোধনের কথায়, শেষ পর্যন্ত কর্ণ বাধ্য হলেন ঘটোৎকচের ওপর দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ করতে।

ঘটোৎকচের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সুরক্ষিত হয়ে গেলেন অর্জুন – কারণ ঐ অস্ত্র শুধু একবারই প্রয়োগ করা যায়।

প্রতিটি দিন এরপর হয়ে উঠল ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্করতর।

আকাশ কালো হয়ে রইল যুদ্ধের ধুলোয়, মাটি লাল হয়ে রইল অবিরাম রক্তপ্রবাহে।

আর সেই অন্ধকারে একে একে নিহত হলেন শকুনি, দ্রোণাচার্য, দুঃশাসন আর দুই পক্ষের শত-সহস্র নিরীহ সৈন্যের দল।

সত্যনিষ্ঠ যুধিষ্ঠির অনায়াসে মাথায় তুলে নিলেন দ্রোণবধের প্রাক্কালে উচ্চারিত সেই এক মিথ্যার ভার- “অশ্বত্থামা হত….ইতি গজ।”

শ্রীকৃষ্ণের মতোই, ধার্মিক যুধিষ্ঠিরও জানতেন যে ধর্মের জয় আজ অতি প্রয়োজন – তার জন্য যে কোনো দাম দিতে প্রস্তুত থাকতেই হবে। তাঁর আজীবন সত্যভাষণের সুনামের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ধর্মের পথ সুগম করা – সব বাধাকে সেই পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া।

বাস্তববাদী কিন্তু ধার্মিক যুধিষ্ঠির মনে পড়িয়ে দেন মহাত্মা বিদুরকে – যাঁর প্রখর বাস্তববুদ্ধি বারবার রক্ষা  করেছে পাণ্ডবদের। কোনো আবেগ কোনোদিন বিদুরকে হস্তিনাপুরের সিংহাসনের সঙ্গে আটকে ফেলতে পারেনি, যেমন ভীষ্মকে আটকে ফেলেছিল।

সেইদিক দিয়ে রাজনীতিতে বিদুর ভীষ্মের চেয়েও ভারী। যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে যুধিষ্ঠির ভারী অর্জুনের চেয়ে। আবেগকে পাশে সরিয়ে রেখে নির্ণয় নিতে জানতেন বিদুর, জানতেন যুধিষ্ঠির।

দ্রোণাচার্য বধের পরেরদিনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল দুঃশাসনের মৃত্যুতে।

বচনবদ্ধ ভীম দুঃশাসনের বুক চিরে রক্তপান করলেন, দুঃশাসনের যে হাত পাঞ্চালীর কেশ ছুঁয়েছিল সেই হাত কেটে ফেলে দিলেন। তারপর নিহত দুঃশাসনের শব রণক্ষেত্রে রেখে, অঞ্জলি ভরে দুঃশাসনের রক্ত নিয়ে ভীম এলেন পাণ্ডবশিবিরে -যেখানে অপমানিত কেশ খুলে আজ তেরোবছর ধরে প্রতীক্ষায় আছেন পাঞ্চালী। পরম তৃপ্তিতে সেই রক্ত চুলে লাগালেন পাঞ্চালী।

একদিকে হল ক্ষোভের উপশম, আরেকদিকে বেড়ে উঠল ক্রোধ – কৌরবপক্ষ অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল দুঃশাসনের এই মৃত্যুতে। স্বয়ং ধৃতরাষ্ট্রের ক্রোধ ছাপিয়ে গেল তাঁর পুত্রশোককে – ভীমকে তিনি ক্ষমা করবেন না ঘোষণা করলেন।

ক্রুদ্ধ দুর্যোধন কর্ণকে বললেন – “আমি পাণ্ডবের মৃতদেহ দেখতে চাই, বন্ধু!”

কর্ণ বললেন- “চিন্তা কর না বন্ধু, কাল আমি অর্জুনের সঙ্গে মহাসংগ্রামে নামব।….হয় তার শেষ, নাহলে আমার শেষ!”

নিজের শিবিরে এসে চিন্তামগ্ন হয়ে গেলেন কর্ণ।

শত শত বিক্ষিপ্ত চিন্তাধারা আজ তাঁর মনোযোগ ভ্রষ্ট করছে।

প্রথমে শ্রীকৃষ্ণ, তারপরে স্বয়ং মাতা কুন্তী, আর শেষে শরশয্যায় শায়িত পিতামহ ভীষ্ম তাঁকে বলেছেন যে  পাণ্ডব তাঁর ভাই। অর্জুন তাঁর কনিষ্ঠ ভাই।

কর্ণ খুশী হয়েছেন নিজের জন্মবৃত্তান্ত জেনে, নিজেকে ক্ষত্রিয় জেনে। কিন্তু মনে মনে দুর্বল হয়েছেন নিজের ভাইয়েদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে।

সেই দুর্বল মন নিয়েই তিনি কাল অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধে নামবেন।

এছাড়া কর্ণ আজ আর কি করতে পারেন!

অনেক অনেক দেরী হয়ে গেছে – দুর্যোধনকে তিনি ছাড়তে পারবেন না।

ছাড়তে তিনি চানও না – এই জীবনেই তিনি দুর্যোধনের ঋণ থেকে মুক্ত হতে চান। এই ঋণের ভার তিনি পরজন্মে টেনে নিয়ে যেতে চান না। কৌরবসভায় পাঞ্চালীকে অকারণে অপমান করে যে অন্যায় তিনি করেছেন, এই জন্মেই তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে অধর্মের পক্ষে নিজের জীবন দিয়ে।

ভাইয়ের বিরুদ্ধে, দুর্যোধনের পক্ষে, যুদ্ধ করে যদি তিনি বীরগতিও প্রাপ্ত হন্, তবু তিনি নিশ্চিন্তে হবেন এই  জেনে যে তিনি ঋণমুক্ত।

তাঁর সামনে আছে গুরু পরশুরামের অভিশাপ – জীবনের কঠিন যুদ্ধের সময়ে তিনি বিস্মৃত হবেন যুদ্ধবিদ্যা।

তাঁর পিছনে আছে ব্রক্ষশাপ – জীবনের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের সময় তাঁর রথের চাকা মাটিতে বসে যাবে।

তাঁর সঙ্গে আছে কৌরবপক্ষে বসে দ্যুতক্রীড়া ভবনের দুষ্কর্ম – সতী পাঞ্চালীকে কুকথা বলার অপরাধ।

তবু যুদ্ধ করতে ভীত নন মহাবীর কর্ণ – এগিয়ে গিয়ে তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চান।

এই যুদ্ধই তাঁর জীবনের শেষ যুদ্ধ – কর্ণ যেন আকাশলিখন দেখতে পাচ্ছেন।

আধো তন্দ্রার ঘোরে তিনি দেখছেন গুরু পরশুরামকে, দেখতে পাচ্ছেন সেই ক্রুদ্ধ ব্রাক্ষণকে, দেখতে  পাচ্ছেন কবচ-কুণ্ডল প্রার্থী ইন্দ্রকে…….দেখছেন অস্ত্রহীন যুদ্ধক্লান্ত পরিজনহীন মৃত্যুমুখী একক কর্ণকে।

অকস্মাৎ কিসের শব্দে কর্ণর তন্দ্রা ভেঙে গেল।

চোখ খুলে শিবিরের আবছা আলোয় দেখলেন সামনে দাঁড়িয়ে কুন্তী।

“আপনি…..?” বিস্মিত কর্ণ উঠে বসলেন।

“হ্যাঁ বৎস, আমি তো কৌরব শিবিরেই আছি গত কয়েকদিন ধরে।….তুমি আসবে না জানি, তাই আজ আমিই এলাম তোমার কাছে।” কুন্তী বললেন।

কর্ণ বললেন- “আপনি না এলেও পারতেন। আমার শপথ আমার মনে আছে – চার পাণ্ডবকে আমি জীবনদান দিয়েছি, ফেরত নেব না সেই দান। আর অর্জুনের সঙ্গে কাল হবে আমার শেষ সংগ্রাম।….প্রণাম মাতা।” কুন্তীর চরণ ছুঁয়ে প্রণাম করলেন কর্ণ।

কুন্তী বললেন- “দীর্ঘজীবি হও।…….কিন্তু পুত্র, আমি তোমাকে আর অর্জুনকে দু’জনকেই জীবিত দেখতে চাই – শুধু একজনকে নয়!”

কর্ণ হাতজোড় করে শুধু বললেন – “তা’ হওয়ার নয়।”

নির্বাক কুন্তী ধীরপদে কর্ণর শিবির থেকে বেরিয়ে এলেন, রাতের অন্ধকার ঢেকে দিল তাঁকে।

নিদ্রাহীন কর্ণ শয্যায় শুয়ে রইলেন।

স্বপ্নে করেছেন গুরুপ্রণাম, এখন করলেন মাতঃপ্রণাম।

এবার শুধু ভোরের প্রতীক্ষা।

সপ্তদশ দিনের শেষে যুদ্ধক্ষেত্রে এসে কুন্তী তাঁর শেষ উপহার দিলেন কর্ণকে- সর্বসমক্ষে প্রকাশ করলেন নিহত কর্ণের মাতৃপরিচয়।

বিস্মিত অর্জুন বললেন – “সুতপু…..বীর কর্ণ আমাদের বড়োভাই?”

কুন্তী বললেন – “হ্যাঁ, পুত্র।…..যুধিষ্ঠির, বড়ো ভ্রাতার শেষকৃত্যের ব্যবস্থা কর।”

যুধিষ্ঠির বললেন – “অবশ্য মাতা। কিন্তু আজ আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে? এই কথা এতদিন গোপনে রেখে, তুমি আমাদের ভ্রাতৃহত্যার দিকে ঠেলে দিলে কেন?……”

কুন্তী বললেন- “আমার বলার উপায় ছিল না……সমাজ…যুদ্ধ…যুদ্ধে তোমরা একে অপরের বিপরীতে….আমি কি বলতাম, কখনই বা বলতাম!”

যুধিষ্ঠির বললেন- “মা – যুদ্ধে আমরা একে অপরের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছি বলেই, তোমার আমাদের জানানো উচিত ছিল মহাবীর কর্ণের সত্য পরিচয়। আমাদের যুদ্ধ দুর্যোধনের সঙ্গে, মহাবীর কর্ণের সঙ্গে নয় – তাঁকে আমাদের হত্যা করার দরকার ছিল না!…..তোমার এই নীরবতার কারণে আজ আমাদের ভ্রাতৃহত্যার ভার মাথায় তুলে নিতে হল। তাই আমি অভিশাপ দিচ্ছি – আজ থেকে, কোনদিন যেন নারীজাতি কোনো কথা গোপন করতে না পারে, সেই শক্তি যেন তাদের আর না থাকে – এই আমার অভিশাপ!”

কুন্তী নতমস্তকে বসে রইলেন, আর মনে মনে বললেন- “ঠিক সেইজন্যই আমি তোমাদের বলিনি বৎস – আমি জানতাম যে কর্ণর প্রকৃত পরিচয় পেলে আবেগ এবং নীতির বশবর্তী হয়ে তোমরা ভাইয়েরা কর্ণকে হত্যা করতে না। কিন্তু কর্ণ অর্জুনকে হত্যা করার চেষ্টা করত এবং ধর্মযুদ্ধ জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত।…..আমার এই নীরবতার প্রয়োজন ছিল ধর্মের পথ সুগম করার জন্য।”

ধীরপদে কুন্তী ফিরে এলেন শিবিরে। তাঁর কাজ এখানে শেষ।

তিনি এখন ফিরে যেতে চান হস্তিনাপুরে।

বিজয়ী পাণ্ডবকে বরণ করার জন্য তৈরী হতে হবে রাজ্যকে।

পুরোনো দিনকে পথ ছেড়ে দিতে হবে নতুনের জন্য।

শ্রীকৃষ্ণকে ডেকে পাঠালেন কুন্তী।

তারপর বললেন – “আমি কাল ভোরেই হস্তিনাপুর চলে যাচ্ছি, কৃষ্ণ।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “আমরাও আসছি খুব শীঘ্রই, যুদ্ধ শেষের আর বিলম্ব নেই।…..কৌরবপক্ষে জীবিত সেনা আর নেই বললেই চলে। যারাও ছিল….আহত, ভগ্ন মনোবল…..সব চলে যাচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে। দূর থেকে তাদের মশালের আলো দেখা যাচ্ছে।….দুর্যোধনও আহত। আর আছেন কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা আর কৃতবর্মা।”

কুন্তী বললেন- “যুদ্ধ শেষের পরেও আছে যুদ্ধ, আছেন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আর দিদি গান্ধারী – পুত্রশোকে পাগল হয়ে তাঁরা যে কি করবেন জানি না।….আমি হস্তিনাপুরে পৌঁছে বিদুরকে বলব মহর্ষি বেদব্যাসকে খবর পাঠাতে। তিনিই এখন একমাত্র যিনি সামলাতে পারবেন মহারাজকে, দিদিকে।….এই তো সময় আমাদের বাণপ্রস্থ নেওয়ার। হস্তিনাপুরে আমাদের সবার কাজ শেষ – আমার, দিদির, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের। এখন নতুনের জন্য রাস্তা ছেড়ে দিতে হবে আমাদের।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “আমিও তাই মনে করি। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের এবং মহারাণী গান্ধারীর হস্তিনাপুরে আর কোনো কাজ বাকী নেই।….”

কুন্তী বললেন- “আমি আজ আর কারুর সঙ্গে দেখা করছি না, কৃষ্ণ। কাল, আমি চলে গেলে, তুমি সবাইকে বলে দিও আমার প্রস্থানের কথা।…..দিদি এখনও রইলেন এখানে, থাকুন। দিদি রওয়ানা হওয়ার একদিন বা দু’দিন পরে তুমি এস পাণ্ডবকে নিয়ে – ততদিনে মহর্ষি ব্যাসদেব পৌঁছে যাবেন হস্তিনাপুরে।”

“যথা আজ্ঞা!” বলে বিদায় নিলেন শ্রীকৃষ্ণ আর ভাবতে ভাবতে গেলেন, কি ভাবে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারীর ক্রোধের দিশা পরিবর্তন করিয়ে দেওয়া যায় পাণ্ডবের দিক থেকে।

কর্ণর মৃত্যু ছিল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষ হওয়ার সংকেত – এরপর যা বাকী রইল তা’ শুধু অহমিকার ব্যর্থ  আস্ফালন আর প্রথাগত আত্মসমর্পণ।

শ্রীকৃষ্ণকে গান্ধারীর অভিশাপ, গান্ধারীর পূণ্য দৃষ্টি দিয়ে দুর্যোধনকে কবচ পরানোর ব্যর্থ চেষ্টা, গদাযুদ্ধে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ, বলরামের ক্রোধ এবং পরিশেষে প্রস্থান – সবই হয়ে রইল সেই শেষ অঙ্কের ব্যর্থ প্রচেষ্টার অঙ্গ।

শ্রীকৃষ্ণের সক্রিয় সহযোগিতায় যুদ্ধ শেষ হল, অষ্টাদশ দিনের শেষে, দুর্যোধনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে।

কিন্তু পূর্ণাহুতি তখনও হয়নি।

বিজয়ের রাত্রে, গোপনে পাণ্ডবশিবিরে ঢুকে, পাণ্ডবজ্ঞানে পাঞ্চালীর পাঁচ পুত্রকে হত্যা করলেন অশ্বত্থামা। তারপর প্রায়শ্চিত্তের অভিপ্রায়ে তপোবনমুখী হলেন।

শ্রীকৃষ্ণ এইরকম কিছুই একটা আশঙ্কা করেছিলেন, তাই পঞ্চপাণ্ডবকে বিজয়ের রাত্রে তিনি তাঁদের নির্দিষ্ট শিবির থেকে অন্যত্র সরিয়ে দিয়েছিলেন। পরিবর্তে সেখানে রাত্রিযাপন করছিলেন পাঞ্চালীর পঞ্চপুত্র।…স্বভাবতই মনে প্রশ্ন আসে যে বিপদের আশঙ্কা সত্ত্বেও, পাঞ্চালীর পুত্রদের কেন সেই রাত্রে বিপদসঙ্কুল ঐ বিশেষ শিবিরে শুতে দেওয়া হল? রাজনীতিতে, একজনকে বাঁচাতে আরেকজনকে বলি দেওয়া অবশ্য নতুন  কিছু নয় – কিন্তু তাই বলে পাঞ্চালীর পঞ্চপুত্র? একি পরিকল্পিত, না অসাবধানতা! এর কোন স্পষ্ট উত্তর কিন্তু মহাভারতের পাতায় মেলে না।

যাই হোক্, এই ঘটনায় বেঁচে গেলেন পাণ্ডব আর নিহত হলেন পাঞ্চালীর পাঁচ সন্তান – কুরু সিংহাসনের উত্তরাধিকারী বলতে শুধু রয়ে গেল উত্তরার গর্ভস্থ পুত্র।…

পাঞ্চালী ক্রোধাগ্নি এবার ধাবিত হল অশ্বত্থামার প্রতি – তাঁকে শান্ত করতে শ্রীকৃষ্ণ এবং পাণ্ডব অশ্বত্থামার পিছু নিলেন, পৌঁছলেন ঋষি বেদব্যাসের তপোবনে।

সেইখানে হল শেষ যুদ্ধ।

ক্রুর অশ্বত্থামা, প্রতিশোধস্পৃহায়, দিব্যাস্ত্র ঘুরিয়ে দিলেন উত্তরার গর্ভের দিকে।

ক্রুদ্ধ শ্রীকৃষ্ণ অশ্বত্থামার মাথার মণি কেড়ে নিয়ে, তাঁকে অভিশাপ দিলেন যে শিরে এই যশহীনতার ক্ষত  নিয়ে সৃষ্টির শেষ দিন পর্যন্ত অশ্বত্থামা ঘুরে বেড়াবেন মুক্তিহীন পথে।

এরপর শ্রীকৃষ্ণ আর পঞ্চপাণ্ডব দ্রুত ফিরলেন উত্তরার কাছে – শ্রীকৃষ্ণের সক্রিয় সহযোগিতায় শিশুটির প্রাণ  রক্ষা পেল।

উত্তরার গর্ভজাত, বীর অভিমন্যুর পুত্র, পরীক্ষিত রয়ে গেল পাণ্ডবের পরে সিংহাসনের একমাত্র জীবিত উত্তরাধিকারী হিসাবে।

এবার ফেরার পালা।

ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রকে প্রণাম জানিয়ে সংসারের দিকে মুখ ফেরানোর পালা, যা’ বাকী রইল তাকে সামলানোর পালা। হস্তিনাপুরের সিংহাসন সুরক্ষিত করে, পিতামহ ভীষ্মকে দেহের বন্ধন থেকে মুক্তি দেওয়ার পালা।

শুধু পাণ্ডবের নয়, এ’ গুরুদায়িত্ব শ্রীকৃষ্ণেরও।

 

  ১০. বাণপ্রস্থ

কুরুক্ষেত্র থেকে ক্লান্ত কুন্তী এসে পৌঁছলেন হস্তিনাপুরে, বিদুরভবনে।

বিদুর স্বাগত জানালেন তাঁকে, তারপর প্রশ্ন করলেন – “যুদ্ধক্ষেত্রে সব কুশল তো?”

দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে কুন্তী বললেন – “রক্তগঙ্গা বিদুর, রক্তগঙ্গা বইছে সেখানে।…..”

বিদুর বললেন – “খবর পেলাম কর্ণের মৃত্যুর।…..”

কুন্তী ধীরে ধীরে বললেন- “ভবিতব্যকে কে এড়াবে?…..কর্ণকে পাণ্ডবপক্ষে চলে আসতে বলেছিলাম আমি, বলেছিল কৃষ্ণ, এমনকি তাতশ্রীও বলেছিলেন শরশয্যায় শুয়ে – কিন্তু সে আটকে রইল অভিমান আর ঋণের জালে।….আগের রাত্রে তার সঙ্গে আবার দেখা করেছিলাম আমি, তার প্রাণ বাঁচাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তবুও সে এল না। তার চোখে সেদিন আমি দেখেছিলাম এক অদ্ভুত দৃষ্টি – যেন সে জেনে গেছে তার ভবিতব্য, জেনেশুনেই যেন সে এগিয়ে যাচ্ছে সেই পরিণতির দিকে।….সারাজীবন সে নিজের তৈরী আগুনে নিজে জ্বলেছে, নিজের ভাগ্যকে মেনে না নিয়ে তার সঙ্গে অহেতুক লড়াই করে শক্তিক্ষয় করেছে – বিধির বিধান মেনে নিয়ে সময়ের অপেক্ষায় থাকেনি। নিজেকে সে জড়িয়ে ফেলেছিল দুর্যোধনের সঙ্গে – ঋণ নেওয়ার আগে মহাজন দেখে নেয়নি, জীবন চলে গেল তার শুধু ঋণ শোধ দিতে আর দুর্যোধনকে খুশী রাখতে।….সবাই যে যার নিজের যুদ্ধ করে বিদুর, হয়তো এই ছিল তার যুদ্ধ – হয়তো সে ভেবেছিল যে এই তার প্রায়শ্চিত্ত পাঞ্চালীকে অপমান করার!….অন্যায় তো সে করেছিল, আমি মা হয়েও তো তা অস্বীকার করতে পারিনা।”

বিদুর বললেন – “গতকাল রাতে দুর্যোধন মারা গেছে…..আপনি তখন পথে।…..যুদ্ধ শেষ।”

কুন্তী বললেন- “এ’ তো হওয়ারই ছিল।…..দিদিরও ফিরে আসার সময় হল। তারপর আসবে কৃষ্ণ আর পাণ্ডব।…..তুমি মহর্ষি ব্যাসদেবকে আনতে লোক পাঠাও, বিদুর। তিনি ছাড়া কেই বা সামলাবে মহারাজ আর দিদিকে? পুত্রশোকে পাগল হয়ে, কিছু না করে বসেন ওনারা!”

বিদুর বললেন- “আমি আজই খবর পাঠাচ্ছি মহর্ষিকে আসার জন্য।….মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র শোকতপ্ত তো বটেই কিন্তু ক্রুদ্ধও হয়ে আছেন খুব। পাণ্ডব পৌঁছনোর আগে ওনাদের সামলাতে হবে।”

কুন্তী বললেন- “বিদুর, তুমিও একবার যেও মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলতে – ওনার মনের গতি বুঝতে।…..ভয় হয় পাছে ক্রোধের বশে অভিশাপ না দিয়ে বসেন পাণ্ডব আর পাঞ্চালীকে। আজ বহুদিন পরে তারা ঘরে ফিরছে বিদুর – একটু শান্তি তাদের প্রাপ্য।”

বিদুর বললেন – “অবশ্যই যাব, আপনি চিন্তা করবেন না।”

কুন্তী বললেন- “চিন্তা না করে যে উপায় নেই।…..মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র বলেছেন ভীমকে ক্ষমা করবেন না, দিদি বলেছেন কৃষ্ণকে ক্ষমা করবেন না…..দোষও করবে কৌরব, ক্রোধও করবে কৌরব!….আমি তো পাণ্ডবের বনবাসের পর, পাঞ্চালীর অপমানের পর, তাদের কাউকে অভিশাপ দিইনি?!…..আমি তো বলিনি যে দুর্যোধনকে ক্ষমা করব না…..মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে ক্ষমা করব না?!”

বিদুর বললেন – “তাই আপনি জয়ী, দেবি!….তাই আপনি আজ হস্তিনাপুরের সবচেয়ে সুযোগ্য রাজমাতা।”

একটুক্ষণ থেমে থেকে কুন্তী বললেন- “কিসের জয়, বিদুর?…..তুমি যদি একবার গিয়ে কুরুক্ষেত্রে দাঁড়াতে, একবার তাতশ্রীর শরশয্যা দেখতে, একবার দিদি গান্ধারীর আর উত্তরার কান্না দেখতে, তাহলে তোমারও বোধহয় মনে হত – কিসের জয় আর কিসের পরাজয়? এসবের অর্থ কি? সবশেষে কি এল হাতে?”

বিদুর বললেন- “দেবি, সবশেষে হাতে এল ধর্ম। এই তো সবচেয়ে বড়ো পাওয়া – কোনো দাম না দিয়ে কি কিছু পাওয়া যায়?”

কুন্তী বললেন – “জানি না, বিদুর।…কিন্তু আমি বড়ো ক্লান্ত।সংসারের বোঝা জমতে জমতে হয়েছে ভারী।ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, জমেছে কিছু ভুল। এবারে চাই প্রায়শ্চিত্ত।…মহর্ষিকে বলে বাণপ্রস্থের ব্যবস্থা করে দাও।”

বিদুর বললেন- “ক্লান্ত আমিও।…..মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আর মহারাণী গান্ধারীও শোকসন্তপ্ত। বাণপ্রস্থে যাওয়ার সময় আগত — আমি বলব মহর্ষিকে।”

কুন্তী বললেন – “তুমি কেন যাবে, বিদুর? মহারাজ যুধিষ্ঠিরের আজ বড়ো প্রয়োজন তোমাকে। আমার ছেলেরা যতদিন কাটিয়েছে হস্তিনাপুরে বা খাণ্ডবপ্রস্থে, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশীদিন কাটিয়েছে তপোবনে, বনবাসে, অজ্ঞাতবাসে। রাজনীতির জ্ঞান তাদের সীমিত – আর কৃষ্ণও দ্বারকা ছেড়ে চিরদিন হস্তিনাপুরে থাকতে পারবে না। এই অবস্থায় তুমিই একমাত্র পার পাণ্ডবের পথপ্রদর্শক হতে, তাদের বিচক্ষণ করে তুলতে। তুমিই পার তাদের প্রজার হিতার্থে, রাজ্যের কল্যাণার্থে, নিষ্কাম মঙ্লময় রাজধর্মে দীক্ষিত করতে – তারা তোমার কথা কাটবে না বিদুর, আমি তোমায় কথা দিচ্ছি।”

বিদুর বললেন – “পাণ্ডব যে আমায় অপমান করবে না, বা আমার কথা ফেলবে না, তা আমি জানি। কিন্তু এই ভার আমি একা আর কাঁধে তুলতে পারব না, দেবি – আমার আর সে শক্তি নেই।”

কুন্তী বললেন- “কিন্তু আমাকে তো যেতেই হবে, বিদুর। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র এবং দিদি গান্ধারীর জন্য রাজপ্রাসাদ ছেড়ে যাওয়াই ভালো এখন। আর এই বৃদ্ধাবস্থায় তাঁদের একা ছেড়ে দেওয়াও ঠিক হবে না। বনে তো আর দাসদাসী থাকবে না তাঁদের সেবা করার জন্য, দৃষ্টিহীন দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ভার আমাকেই নিতে হবে। আমার পুত্রদের হাতে তাঁদের বংশনাশ হয়েছে – এই হয়তো আমার প্রায়শ্চিত্ত!”

বিদুর বললেন- “দেবি, প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে আমাকেও – মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের বেতনভোগী কর্মচারী হয়েও আমি মনে মনে তাঁর বিপক্ষে আর পাণ্ডবের পক্ষে ছিলাম। তাঁকে আমি সৎ পরামর্শ দিয়েছি, কিন্তু তিনি যখন সেই পরামর্শ গ্রহণ করেননি তখন আমি পাণ্ডবেরই জয় চেয়েছি মনেপ্রাণে।….তাই প্রায়শ্চিত্তের কথা যদি বলেন তো আমাদের সবাইকেই যেতে হবে বাণপ্রস্থে — কিন্তু ‘কবে’ সেটাই প্রশ্ন। যুধিষ্ঠির আসুক, বাসুদেব কৃষ্ণ কি বলেন দেখা যাক্ – তারপর নাহয় দিনক্ষণের নির্ণয় নেওয়া যাবে।”

বিদুরের কথায় সম্মতি জানিয়ে কুন্তী উঠে দাঁড়ালেন, নিজের বিশ্রামকক্ষের দিকে এগোলেন।

পরদিন রাজপ্রাসাদ থেকে সূচনা এসে পৌঁছল – মহারাণী গান্ধারী কুরুক্ষেত্র থেকে হস্তিনাপুরে এসে পৌঁছেছেন। রাজপ্রাসাদের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারীর পুত্রশোক জ্ঞাপনে।

বিদুর এসে কুন্তীকে বললেন- “আমাদের একবার রাজপ্রাসাদে যেতে হবে – আমাকে মহারাজের কাছে এবং আপনাকে মহারাণী গান্ধারীর কাছে।”

কুন্তী বললেন- “মহর্ষি কবে এসে পৌঁছচ্ছেন, বিদুর?”

বিদুর বললেন- “বাসুদেব সহ পঞ্চপাণ্ডব এসে পৌঁছবেন আগামীকাল, মহর্ষিও প্রায় তখনই এসে পৌঁছবেন।”

কুন্তী বললেন- “তবে আমরাও সেইরকম সময়েই রাজপ্রাসাদে যাব। যদি চাও তো নগরপ্রবেশের আগে একবার মিলিত হয়ে নেওয়া যায় কৃষ্ণের সঙ্গে এবং মহর্ষির সঙ্গে, তারপর সেইভাবে নির্ণয় নেওয়া যায়।”

বিদুর বললেন- “মহর্ষির সঙ্গে বাসুদেবের কথা হয়ে গেছে — অশ্বত্থামার পিছু নিয়ে মহর্ষির আশ্রমে পৌঁছেছিলেন বাসুদেব সহ পাণ্ডব, সেখানে অশ্বত্থামার প্রসঙ্গ ছাড়াও রাজ্য হস্তান্তরিত করা এবং তৎসংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় নিয়ে মহর্ষির সঙ্গে আলোচনা করেছেন বাসুদেব।…..সুতরাং বাসুদেব যা বলবেন সেইভাবে এগোলেই হবে। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর এবং যুধিষ্ঠিরের অভিষেক হয়ে গেলে, প্রজাদের মনেও আস্তে আস্তে শান্তির প্রলেপ পড়বে, রাজ্যে স্থিতিশীলতা আসবে। সেইটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।”

কুন্তী বললেন – “তবে কৃষ্ণের পরামর্শের অপেক্ষাতেই থাকি।”

বিদুর বললেন- “আমি কাল প্রাতে গিয়ে নগরের বাইরের উদ্যানবাটিকায় অপেক্ষা করব পাণ্ডব এবং বাসুদেবের জন্য। যা কথা হবে, ফিরে এসে আপনাকে জানাব এবং সেইমতো নির্ণয় নেব।….রাজবাড়ীর দু’জন কর্মচারীকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে বলেছেন বাসুদেব, আমি দু’জন বিশ্বস্ত লোককে বলে রেখেছি।”

কুন্তী বললেন – “ঠিক আছে, আমি তোমার ফেরার অপেক্ষায় থাকব।”

পরদিন খুব ভোরে উঠে তৈরী হয়ে নিলেন বিদুর।

রথ প্রস্তুত, রাজবাড়ীর দুজন বিশ্বস্ত কর্মচারীও উপস্থিত।

রথ ছুটল নগর ছাড়িয়ে উদ্যানবাটিকার দিকে।

নগরের প্রান্তে এই বিশ্রামগৃহটি বড়ো মনোরম।

উদ্যান-ভরা ফুল আর কৃত্রিম সরোবরে জলকেলী করা হংসযুগলদের দেখে মনে হয় না যে পৃথিবীতে কোনও অশান্তি আছে। মনে হয় না যে মাত্র দু’দিন আগেই শেষ হয়েছে এই রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে এক মহাযুদ্ধ।

মনে হয়না যে এই রাজ্যের অধিকাংশ নারী আজ পতিহীন, অধিকাংশ শিশু-বালক-বালিকা আজ অনাথ। মনে হয়না যে শুধু এই রাজ্যের উত্তরাধিকার সুরক্ষিত করার জন্য ভারতবর্ষের বহু রাজ্য আজ উত্তরাধিকারীহীন হয়ে গেছে – পাঞ্চাল, মদ্র, মৎস্যদেশ….সিংহাসন রিক্ত পড়ে আছে সবার।

সরোবরের পাশে বসে বিদুর ভাবছিলেন যে, ঈশ্বরের কি লীলা! একদিকে ধ্বংসের খেলা, তো আরেকদিকে প্রকৃতির শান্তিপ্রলেপ।…..চাকার ঘর্ষণের আওয়াজে মুখ তুলে তাকালেন – বাসুদেব এবং পঞ্চপাণ্ডবের রথ প্রবেশ করছে উদ্যানবাটিকায়। পিছনের পথে দেখা যাচ্ছে পরিশিষ্ট সৈন্যের দল আর জিনিষপত্রের সামগ্রী বয়ে আনা শকট ও কর্মচারীদের সারি।

বিদুর এগিয়ে গিয়ে অভিবাদন জানালেন বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণকে, আলিঙ্গন করলেন যুধিষ্ঠিরসহ পাঁচভাইকে।

তেরো বছরের অদর্শনের পর, সেই দ্যুতক্রীড়াসভার পর, এই প্রথম সাক্ষাৎ পাণ্ডবের সঙ্গে যাঁরা তাঁর পুত্র সমান- তিনিও তাঁদের কাছে পিতার স্বরূপ। চোখ ভিজে উঠল বিদুরের।

বিদুর শ্রীকৃষ্ণকে বললেন – “বাসুদেব, এখন কি করণীয় বলুন। রাজপ্রাসাদে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র এবং মহারাণী গান্ধারী শোকাকুল, ক্রুদ্ধ – তাঁদের প্রথমে শান্ত না করে, ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা তোলাই যাবে না।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “জানি।….এও জানি যে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র মুখে কোনো অভিশাপ দেবেন না, কিন্তু তিনি পাণ্ডবের বিশেষত ভীমের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারেন। উল্টোদিকে মহারাণী গান্ধারী মনে করছেন যে এই মহাযুদ্ধে তিনি একাই পুত্রশোক পেয়েছেন, আর কেউ পাননি, এবং তাঁর অধার্মিক পুত্ররা নিজের ইচ্ছায় এই যুদ্ধ করতে গেলেও তাদের বাঁচানোর দায় বোধহয় আমার বা পাণ্ডবের ওপর ছিল – সুতরাং অভিশাপ দেওয়ায় তাঁর এখন অধিকার আছে! আমাকে তিনি একবার অভিশাপ দিয়েছেন কিন্তু পাণ্ডবকেও অভিশাপ দিতে পারেন, যেটা না হলেই ভালো হয়।….সুতরাং মহর্ষি ব্যাসদেব গিয়ে আগে মহারাণী গান্ধারীকে বোঝান, তারপরে পিসীমা নাহয় পাঁচভাইকে নিয়ে তাঁর আশীর্বাদ নিতে যাবেন- ভ্রাতাশ্রী যুধিষ্ঠির তখন মেজ ভ্রাতাশ্রী ভীমের হয়ে ক্ষমা চেয়ে নেবেন। মহর্ষি যে কোনো মুহূর্তে পৌঁছবেন হস্তিনাপুর রাজপ্রাসাদে – মহারাণী গান্ধারী ধার্মিক, তিনি ব্যাসদেবের কথা মানবেন বলেই আমার বিশ্বাস।”

বিদুর বললেন – “আর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র?”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “তিনি দুর্বলহৃদয় পাপাত্মা – নিজের ত্রুটি সম্বন্ধে অবহিত। আপনি সেখানে প্রথম যান কথা বলতে। তাঁকে বলুন যে তিনি অন্যায় করেছেন এবং তাঁর ফল পেয়েছেন। এখন তাঁর প্রধান কর্তব্য হচ্ছে পাণ্ডবকে স্বাগত জানানো এবং ভ্রাতা যুধিষ্ঠিরের হাতে সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে বাণপ্রস্থে চলে যাওয়া।…..কিন্তু চিরকাল অধর্মকে আঁকড়ে ধরে রাখা মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র তাতেও পুরো মানবেন বলে মনে হয়না – তাই মেজ ভ্রাতাশ্রী ভীমকে নিয়ে আমি একটু চিন্তিত আছি। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র অত্যন্ত বলশালী, শুধু বাহুর পেষণে তিনি হত্যা করতে পারেন যে কোনো মানুষকে।….তাই মেজ ভ্রাতাশ্রীর প্রথমে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের কাছে না এগোনোই ভাল। কুরুক্ষেত্র থেকে একটি লোহার মূর্তি বানিয়ে এনেছি – দৈর্ঘে প্রস্থে মেজ ভ্রাতাশ্রীর অনুরূপ। আপনি যদি রাজবাড়ীর কর্মচারীদের দিয়ে গোপনে সেটি সভাগৃহে, যেখানে পাণ্ডব মহারাজকে প্রণাম করতে যাবে, সেখানে রাখার ব্যবস্থা করেন তাহলে খুব ভালো হয়।…..তারপর অবস্থা বুঝে আমি ইঙ্গিত করব।”

বিদুর বললেন- “যথা আজ্ঞা। আমি দু’জন বিশ্বস্ত কর্মচারী সঙ্গেই এনেছি, তারা মূর্তিটি যথাস্থানে রেখে দেবে।…আমি তাহলে এখন আসি। মহারাণী কুন্তীকে ঘটনার সূচনা দিয়ে আমি সোজা চলে যাব রাজপ্রাসাদে, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলতে। আপনারা কিছুক্ষণ এখানে বিশ্রাম করে, তারপর নগরে প্রবেশ করুন।আমার বাসস্থান হয়ে, মহারাণী কুন্তীকে নিয়ে, আপনারা রাজপ্রাসাদের দিকে এগোন। ততক্ষণে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র এবং মহারাণী গান্ধারীর সঙ্গে প্রাথমিক আলাপ হয়ে যাবে আমার এবং মহর্ষি ব্যাসদেবের।”

শ্রীকৃষ্ণ সম্মত হলেন।

মহাত্মা বিদুর রথে উঠে প্রস্থান করলেন।

বিদুর-ভবনে অপেক্ষায় ছিলেন কুন্তী।

তাঁকে বিদুর বিশদ জানালেন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন, তারপর রওয়ানা হলেন রাজবাড়ীর দিকে।

নিজেকে তৈরী করতে লাগলেন এক কঠিন আলাপের জন্য, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে।

শ্রীকৃষ্ণ তো ঠিকই বলেছেন- অনেক অন্যায় করেছেন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবের সঙ্গে। তাঁদের খাণ্ডবপ্রস্থ দিয়েও হল না – ফেরত নিলেন সেই রাজ্য ক্রীড়াচ্ছলে। নির্বাক বসে দেখলেন কূলবধূর অপমান। তেরোবছর পরেও পাণ্ডবকে ফিরিয়ে দিলেন না সামান্যতম জমি। নিজের পুত্রদের বড়ো করলেন অধর্মের শিক্ষা আর অন্যায় লোভ দিয়ে। আজ তিনি নিজের প্রাপ্য ফিরে পেয়েছেন ঈশ্বরের হাতে – কাউকে তিনি দোষ দিতে পারেন না নিজেকে ছাড়া। তাঁর আজ রাজ্য ছেড়ে বনে যাওয়াই উচিত – সিংহাসন আর রাজপ্রাসাদের মোহ তাঁকে ছাড়তে হবেই।

বহুদিন পরে রাজপ্রাসাদে ঢুকলেন বিদুর- যুদ্ধের আগে রাজমন্ত্রীর কার্য থেকে পদত্যাগ করে যাওয়ার পর,  আজ এই প্রথম।

রাজকর্মচারীদের আজ্ঞা দিলেন লৌহমূর্তিটি পিছনের দরজা দিয়ে নিয়ে গিয়ে সভাগৃহে রাখতে।

খোঁজ নিয়ে জানলেন যে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র ও মহারাণী গান্ধারী যাঁর যাঁর নিজস্ব বিশ্রামকক্ষে আছেন।

কিছুক্ষণ আগেই মহর্ষি বেদব্যাস এসেছেন রাজভবনে — তিনি মহারাণী গান্ধারীর সঙ্গে কথা বলছেন।

নিজেকে প্রস্তুত করে, বিদুর এগিয়ে গেলেন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের বিশ্রামকক্ষের দিকে। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে, তারপর তাঁকে নিয়ে যেতে হবে সভাগৃহে পাণ্ডবকে অভ্যর্থনা করার জন্য।

মহর্ষি বেদব্যাস তখন গান্ধারীকে বোঝাচ্ছেন, নিরস্ত করছেন তাঁকে পাণ্ডবদের অভিশাপ দেওয়া থেকে।

কুন্তী ভোজ্যবস্তু সাজিয়ে, নিজে প্রস্তুত হয়ে, সবেমাত্র বহির্কক্ষে এসে বসেছেন – বাইরে শব্দ হল রথের চাকার। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবেশ করলেন শ্রীকৃষ্ণসহ পঞ্চপাণ্ডব।

পিছনে আসছে পাঞ্চালীসহ পুরনারীদের রথ।

মাতা কুন্তী আরতি করলেন, আশীর্বাদ করলেন আর আলিঙ্গন করলেন বিজয়ী পাঁচপুত্রকে – তাঁর মুখে হাসি চোখে জল।

যত দাম দিয়েই পাওয়া যাক না কেন, বিজয় তো বিজয়-ই।

আলো ফোটার এই শুভক্ষণে, অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া জীবনের কথা ভেবে তো লাভ নেই।

শুভচিন্তা আর আলোকমুখী যাত্রাই জীবনের মূল কথা।

চোখের জল মুছে কুন্তী তাকালেন শ্রীকৃষ্ণের দিকে।

বললেন- “তোমায় আশীর্বাদ দেওয়ার ক্ষমতা কি আমার আছে, কৃষ্ণ? যদি থাকে, তাহলে বলি তুমি দীর্ঘজীবি হও, সুখী হও, ধর্মের বিজয়রথে তুমি সদা সারথি থাক…..আর….জন্ম জন্ম তুমি আমার কাছে এসে এইভাবে আমাকে চিরঋণী করে রাখ।”

শ্রীকৃষ্ণ হেসে বললেন- “শুধু আশীর্বাদে তো পেট ভরবে না! তোমার পাঁচ ছেলের কথা জানিনা, আমার কিন্তু বড্ড খিদে পেয়েছে – ক্ষীর বানিয়েছ?”

কুন্তী হাসতে হাসতে খাবার পরিবেশন করতে গেলেন, বললেন – “সব খাবার তৈরী, ক্ষীরও। সবাই হাতমুখ ধুয়ে এস।”

খাওয়া শেষে সবাই এসে বসলেন।

কুন্তী বললেন- “আমরা কি রাজবাড়ীর দিকে যাব এবারে?……ভালোয় ভালোয় সব মিটে গেলেই, আমার ছুটি। সংসারের ভার আর বইতে পারছিনা, এবার বাণপ্রস্থ নেব।”

অর্জুন বললেন – “মা, তুমি…..”

তাঁকে থামিয়ে দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “পিসীমা তো ঠিকই বলেছেন, পার্থ! অতীত সরে না গেলে বর্তমান জায়গা পাবে কি করে? এতদিন পিসীমা সামলেছেন সব, এবারে সামলাবে পাঞ্চালী।”

কুন্তী বললেন- “বিদুরও যেতে চাইছে বাণপ্রস্থে, সম্ভবত মহর্ষিও একই কথা বলছেন মহারাজকে আর দিদিকে।…..আমরা হস্তিনাপুরের অতীত, আমাদের সবাইকে এখন শিকড় ছিঁড়ে বেরোতেই হবে।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “কিন্তু মহাত্মা বিদুরের এখন রাজসভায় থাকা খুবই প্রয়োজন- বাস্তব দিক দিয়েও, রাজনীতির দিক দিয়েও। প্রতিবেশী রাজ্য এবং এই রাজ্যের প্রজাদের কাছে মহাত্মা বিদুরের উপস্থিতি প্রমাণ করবে যে পাণ্ডব অতীতের সঙ্গে সব সম্পর্ক নষ্ট করেনি – তারা ভালোটুকু নিয়ে, খারাপটুকু ফেলে দিয়েছে।তাছাড়া রাজ্যচালনার কাজে মহাত্মা বিদুরের পরামর্শ জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাশ্রীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হবে, অন্তত আগামী কয়েক বছর।”

কুন্তী বললেন- “আমি সেকথা বলেছিলাম বিদুরকে — সে বলছে যে এই ভার একা কাঁধে নেওয়ার মতো শক্তি তার আর নেই।….কিন্তু আমাকে তো যেতেই হবে – একা বনে দৃষ্টিহীন মহারাজ আর দিদিকে তো আমি ছেড়ে দিতে পারি না, আমাকেই তাঁদের দেখাশোনা করতে হবে, কৃষ্ণ।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “অবশ্যই! কিন্তু তোমরা সবাই যদি কয়েকবছর পরে যাও, তাহলে তো কারুর কোনো ক্ষতি নেই! তপোবন তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না!…আর পিসীমা, তোমারও কিছু প্রাপ্য আছে আজ এতদিন বাদে এত সংগ্রামের পর- নিশ্চিন্তে কিছুদিন রাজসুখ ভোগ কর তুমি, তারপর বাণপ্রস্থের কথা ভেব। তোমার পাঁচ ছেলেকে এবার সুযোগ দাও তাদের মাতাকে একটু সেবা করার, সুখে রাখার!”

যুধিষ্ঠির বললেন- “হ্যাঁ মা, তোমার সারাজীবন কেটেছে তপস্যায় – আমাদের নিরাপদে রাখতে, আমাদের শিক্ষা দিতে, আমাদের সামলে রাখতে, আমাদের জন্য সবকিছু সুরক্ষিত করতে, তুমি বনবাসে আর পরগৃহবাসে কাটিয়েছ বছরের পর বছর। আজ তুমি নিজের অধিকারে নিজের অন্নে রাজমাতা হওয়ার সুখ উপভোগ কর, মা। তারপর বাণপ্রস্থের কথা ভেব।”

কুন্তী বললেন – “কিন্তু মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের আর হস্তিনাপুরে থাকা উচিত হবে কি?”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন – “হয়তো এটা উত্তম পন্থা না, কিন্তু সবদিক বিচার করে দেখতে গেলে এ’ছাড়া আর উপায় কি?…আর বিষদন্তহীন সর্পকে তুমি বনেই ছেড়ে দাও, কি ঘরেই রাখ, তফাত খুব বেশী কিছু নেই। ভূতপূর্ব মহারাজ এবং মহারাণী থাকবেন পাণ্ডবের আতিথ্যে, পাণ্ডব-নিযুক্ত কর্মচারী এবং দাসদাসী দ্বারা পরিবৃত হয়ে, রাজসভা এবং বহির্জগতের সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে। রাজবাড়ীর চেনা পরিবেশে থাকবেন, পুরোনো স্মৃতি সঙ্গী করে – এও তো একরকমের কারাবাস! বাহ্যিক আরামের কারাবাস।”

কুন্তী বললেন – “জানি না, দিদি আর মহারাজ প্রাসাদে থাকতে রাজী হবেন কিনা!”

শ্রীকৃষ্ণ হেসে বললেন- “খুব হবেন….খুব হবেন! মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র চিরকাল আঁকড়ে ধরে আছেন এই প্রাসাদকে -সেই মোহবন্ধন কি অত সহজে কাটে? ভ্রাতা যুধিষ্ঠির আর পাটরাণী পাঞ্চালী একবার অনুরোধ করলেই মহারাজ থেকে যাবেন, অতএব মহারাণী গান্ধারীও পতিকে অনুসরণ করবেন।….চল, রাজপ্রাসাদে গিয়েই দেখা যাক্।”

রাজপ্রাসাদে পৌঁছে শ্রীকৃষ্ণ বললেন – “পিসীমা, আমি পাণ্ডবকে নিয়ে সভাগৃহে যাচ্ছি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে দেখা করতে। মহাত্মা বিদুরও সেখানেই আছেন।…..তুমি সোজা মহর্ষি বেদব্যাসের কক্ষে চলে যাও, সেখানেই প্রতীক্ষা কর। মহারাণী গান্ধারীর সঙ্গে কথা বলে, মহর্ষি ওনার জন্য নির্দিষ্ট কক্ষে আসবেন। তুমি ওনার চরণস্পর্শ করে, আমাদের প্রতীক্ষা কর। মহারাজের সঙ্গে কথা বলে, আমরা মহর্ষিকে প্রণাম করতে যাব – তারপর একত্রে মহারাণী গান্ধারীর সঙ্গে দেখা করতে যাব।”

কুন্তী স্বীকৃত হয়ে, প্রাসাদের অন্যপ্রান্তে পা বাড়ালেন।

মহর্ষি বেদব্যাস যখনই হস্তিনাপুরে আসেন, প্রাসাদের প্রান্তে তাঁর জন্য একটি কক্ষ সুরক্ষিত থাকে। এ’ নিয়ম চলে আসছে বহুযুগ ধরে। কুন্তী বহুবার এসেছেন সেই কক্ষে, মহর্ষিকে প্রণাম করতে। তাঁর সবই চেনা।

শ্রীকৃষ্ণ যখন পাণ্ডবকে নিয়ে সভাগৃহের দ্বারে পৌঁছলেন, বিদুর তখন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে সূচনা দিয়েছেন  পাণ্ডবের আগমনের এবং তাঁকে পরামর্শ দিয়েছেন চোখের জল মুছে ক্ষত্রিয়ের মতো এগিয়ে গিয়ে পরবর্তী হস্তিনাপুর নরেশ মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে অভ্যর্থনা জানাতে।

বাহ্যত নিজেকে সামলে নিয়ে, ভূতপূর্ব মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র অভিনন্দন এবং স্বাগত জানালেন যুধিষ্ঠিরকে।

যুধিষ্ঠির প্রণাম জানালেন, যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন করলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পিতাকে।

ধৃতরাষ্ট্র এবার আহ্বান জানালেন বাকী পাণ্ডবদের – এক এক করে যেন তাঁরা এসে আলিঙ্গন করেন তাঁদের জ্যেষ্ঠ পিতাশ্রীকে। যুধিষ্ঠিরের পর ভীম….

ভীম এগিয়ে গেলেন, প্রণাম করলেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের ইঙ্গিতে আলিঙ্গনের সময় এগিয়ে দিলেন তাঁর প্রতিরূপ সেই লৌহমূর্তিকে।

দৃষ্টিহীন ধৃতরাষ্ট্র ভীমজ্ঞানে বজ্রপেষণে নিষ্পিষ্ট করলেন সেই লৌহমূর্তিকে, তারপর ক্রন্দনে ভেঙে পড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন ভীমের মৃত্যুর জন্য, মৃত ভ্রাতা পাণ্ডুর কাছে।

শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে জানালেন যে ভীম জীবিত, ভগ্ন হয়েছে একটি লৌহমূর্তি।

বিস্মিত ধৃতরাষ্ট্র এই সংবাদে খুশী প্রকাশ ছাড়া আর কিইবা করতে পারেন?

নিজের যুক্তিহীন ক্রোধের নগ্ন এবং নীচ বহিঃপ্রকাশে লজ্জিত ধৃতরাষ্ট্র যে এখন ক্ষমতা হস্তান্তরে আর বাধা  সৃষ্টি করবেন না, এ’ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে পাণ্ডব-সহ বাসুদেব এগোলেন ব্যাসদেবের কক্ষের দিকে।

ব্যাসদেবের কাছ থেকে সন্তোষজনক সূচনা পেয়ে, কুন্তীসহ সবাই এসে দাঁড়ালেন গান্ধারীর কক্ষে।

কাজ এখানে অনেক সহজ করে দিয়ে গেছেন মহর্ষি ব্যাসদেব। গান্ধারী শোকসন্তপ্তা হলেও, ধার্মিক এবং দৃঢ়চেতা।

বচনবদ্ধ ভীমকে পুত্রহত্যার জন্য ক্ষমা করা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না।

ব্যাসদেব তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে সেই অশালীন দ্যুতক্রীড়াসভাতেই ভীম শপথ নিয়েছিলেন দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গের আর দুঃশাসনের রক্তপান করার – বেঁচে থাকতে সেই শপথ রক্ষা করা ছিল ভীমের ধর্ম। গান্ধারীপুত্রদের হত্যা করে ভীম নিজের শপথ রক্ষা করেছেন, ধর্মপালন করেছেন।

আর যুদ্ধ নিয়মাবলীর মর্যাদা রক্ষা? সে তো কেউই করেননি – তাহলে কি আর অস্ত্রহীন বালক অভিমন্যুর মৃতদেহের পাশে মত্ত জিঘাংসায় নৃত্য করত দুর্যোধন, দুঃশাসন?

গান্ধারী সামলে নিলেন নিজেকে, মেনে নিলেন নিয়তিকে।

যে দুরাচারী পুত্রেরা জীবিতাবস্থায় ধার্মিক মাতার উপদেশ অগ্রাহ্য করে গেছেন, শুধু অপত্যস্নেহ দিয়ে কিকরে সেই সন্তানদের বাঁচাবেন গান্ধারী? কাকেই বা দোষ দেবেন পুত্রদের এই পরিণামের জন্য – এ’তো তাঁদের নিজেদেরই কর্মফল! দোষ যদি কাউকে দিতে চান গান্ধারী, তবে সবচেয়ে দোষী বোধহয় তাঁর নিজের স্বামী মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, যিনি ধর্মহীন উচ্চাকাঙ্খা আর লোভের পথে ঠেলে দিয়েছিলেন তাঁদের পুত্রদের। তাই পাণ্ডবদের অভিশাপ দেওয়া গান্ধারীর উচিত নয়, কারণ ভুল পাত্রে ক্রোধ প্রদর্শনও অধর্মেরই সামিল।

একদিন যে প্রাসাদে অপমানিতা হয়েছিলেন পাঞ্চালী, যেখানে গান্ধারীর সনির্বন্ধ অনুরোধে কৌরবের জন্য  পুঞ্জীভুত অন্তনিঃসৃত অভিশাপকে জিহ্বার প্রান্তে চেপে রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন পাঞ্চালী, নিয়তির খেলায় সেই প্রাসাদে আজ বিজয়িনী পাঞ্চালীকে হাতে ধরে নিয়ে এলেন ভূতপূর্ব রাজমহিষী রিক্তক্রোড় গান্ধারী।

পাঞ্চালীর মুখ বন্ধ করলেও, নিয়তির হাত বন্ধ করতে পারেনি অপত্যস্নেহ — এই কি ধর্মের শিক্ষা?

যুধিষ্ঠির এবং পাঞ্চালীর অনুরোধে, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র বাণপ্রস্থে যাওয়া স্থগিত রাখলেন – সুতরাং গান্ধারী এবং  কুন্তীও। আপাতত সবাই কিছুদিন হস্তিনাপুরেই থাকবেন বলে স্থির হল – রাজপ্রাসাদে রাজআতিথ্য গ্রহণ করে। বিদুর সম্মত হলেন যুধিষ্ঠিরের সভায় মহামন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করতে।

এরপর খুব শীঘ্রই একটি শুভদিন দেখে, অখণ্ড হস্তিনাপুর-ইন্দ্রপ্রস্থের রাজা চন্দ্রবংশীয় চক্রবর্তী মহারাজ যুধিষ্ঠিরের রাজ্যাভিষেক সুসম্পন্ন হয়ে গেল। ভীম, অর্জুন, নকুল এবং সহদেব পেলেন গুরুত্বপূর্ণ পদ। বিদুর নিলেন মহামন্ত্রীর স্থান। ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়ের স্মৃতি হিসাবে, চিরদিনের জন্য শূণ্য রইলো সভাগৃহের সেই বিশেষ আসনগুলি – যে আসনে উজ্জ্বল তারকার মতো একদা বিরাজমান থাকতেন কুরুজ্যেষ্ঠ ভীষ্ম এবং দ্রোণাচার্য।

অভিষেকের দিন মহারাজ যুধিষ্ঠির যে ভাষণ দিলেন, আজ কলিযুগের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়েও তা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।

— “…ক্ষমতাপ্রাপ্তির পথ সদাই বন্ধুর, অনেক দাম দিয়ে হাতে আসে ক্ষমতা। কিন্তু ক্ষমতা হাতে আসার পর সেই বন্ধুর পথের তিক্ততা রাজাকে ভুলে যেতে হয়; কারণ তিক্ততার ওপর ভিত্তি করে নতুন কিছু, শুভ কিছু, গড়ে উঠতে পারে না। আর নতুনের পথে শুভযাত্রাই রাজার কর্তব্য, কর্মযোগ।…ক্ষমতাপ্রাপ্তির লড়াই ততক্ষণই ন্যায়সঙ্গত, যতক্ষণ রাজা কর্তব্য এবং ধর্মের পথে থেকে কর্মযোগ করছেন। রাজা যখনই রাষ্ট্রের কল্যাণের ওপরে ব্যাক্তিগত স্বার্থকে তুলে ধরবেন, যখনই প্রজার হিতের পরিবর্তে নিজের বা নিজের প্রিয়জনের হিতকে গুরুত্ব দেবেন, যখনই নারীর এবং দুর্বলের ওপর অত্যাচার করবেন বা হতে দেবেন, বা অন্য কোনো অধর্মাচরণ করবেন — তখনই রাজা রাজ্যশাসনের অধিকার হারাবেন এবং প্রজার অধিকার থাকবে সেই রাজাকে সরিয়ে অন্য রাজাকে নিয়ে আসার।…”

এই ভাষণে যত না আছে রাজতন্ত্র, তার চেয়ে অনেক বেশী আছে গণতন্ত্র।

এই দর্শন যত না চন্দ্রবংশের, তার চেয়ে অনেক বেশী যাদববংশের।

শ্রীকৃষ্ণ তথা যুধিষ্ঠির পত্তন করলেন এক নতুন যুগের, শোনালেন নতুন কথা — যে কথা চন্দ্রবংশের ইতিহাসে এর আগে কোনোদিন আর কেউ বলেননি।

শুধু ভাষণ নয়, যুধিষ্ঠির তথা পঞ্চপাণ্ডব করে দেখালেন। কর্মযোগের পথ ধরে, নিজেদের পুত্রশোক ভুলে, প্রতিষ্ঠিত করলেন ধর্মরাজ্য — যে রাজ্যে সবাই সহানুভূতি এবং সম্মানের অধিকারী, এমনকি ভূতপূর্ব মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রও।

নম্র বিনয়ে মহামতি বিদুরের কাছে নিলেন রাজনীতি এবং কূটনীতির পাঠ।

তৈরী করতে লাগলেন যাদবকন্যা সুভদ্রার গর্ভজাত অভিমন্যুর পুত্রকে, পরীক্ষিতকে, হস্তিনাপুর সিংহাসনের যোগ্য ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী হিসাবে — কারণ যোগ্যতাহীন রাজাকে সিংহাসনে বসানোর মতো অন্যায় আর কিছু হয় না প্রজাদের প্রতি।

রাজমাতা কুন্তী অত্যন্ত পরিতৃপ্তির সঙ্গে দেখলেন এবং উপভোগ করলেন সবকিছু — যা কিনা তাঁর শিক্ষার  ফল, তাঁরই তপস্যার ফল।

তারপর একদিন, বিদুর যখন রাজসভার কর্মশেষে গৃহে ফেরার জন্য তৈরী হচ্ছেন তখন ডেকে পাঠালেন  তাঁকে। কুন্তীর নিজস্ব পরিচারিকা এসে বিদুরকে নিয়ে গেল অন্দরমহলে।

রাজমাতা হয়েও কুন্তী প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রাসাদের বিলাসবহুল মহল- ফিরিয়ে দিয়েছেন যুধিষ্ঠিরের অনুরোধ। ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারীকে সেই মহল দিয়ে, কুন্তী আশ্রয় নিয়েছেন প্রাসাদের এক প্রান্তে— যেখানে একদিন তিনি স্বামীহারা হয়ে পাঁচপুত্র নিয়ে বন থেকে এসে উঠেছিলেন। সেই আজ তাঁর তীর্থ।

বিদুর এসে অভিবাদন করলেন।

কুন্তী প্রত্যাভিবাদন করে বসতে বললেন বিদুরকে।

তারপর বললেন – “কেমন চলছে রাজকার্য, বিদুর?”

বিদুর বললেন- “ঠিকই চলছে, দেবি। পুত্র যুধিষ্ঠির বুদ্ধিমান, জ্ঞানী, কুশলী এবং ধার্মিক। রাজনীতি এবং কূটনীতির জ্ঞানে তার যতটুকু শিক্ষার প্রয়োজন ছিল, ততটুকু আমি দিয়ে দিয়েছি তাকে। সে এখন রাজকার্যে অত্যন্ত পারদর্শী।”

কুন্তী বললেন – “আর রাজ্যের সীমানা? শত্রুরা….?”

বিদুর বললেন- “যে রাজ্যের সীমানা রক্ষা করে ভীম এবং অর্জুন, সেই রাজ্য আক্রমণ করতে কোন্ শত্রু সাহস করবে?…..তাছাড়া, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর তেমন শক্তিশালী শত্রু বা প্রতিপক্ষ আর নেই। সুতরাং রাজ্যসীমা সর্বতোভাবে নিরাপদ।”

কুন্তী দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন- “সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর শুধু শত্রু কেন, পুরুষের সংখ্যাই তো গেছে কমে! কে করবে যুদ্ধ?”

বিদুর বললেন – “হ্যাঁ, পুরুষের সংখ্যা কমে গিয়েছিল বটে, তবে প্রকৃতি ভারসাম্য ফিরিয়ে আনছেন ধীরে ধীরে।সেদিন যারা নাবালক ছিল, আজ তারা পূর্ণযুবা।…..হস্তিনাপুরের সৈন্যদলে প্রতিদিনই কেউ না কেউ নতুন নাম লেখাচ্ছে।”

কুন্তী বললেন – “আর পরীক্ষিতের শিক্ষা?”

বিদুর বললেন- “সেও ঠিকই চলছে, দেবি — চিন্তার কোনো কারণ নেই।”

কুন্তী একটু হেসে বললেন – “তবে আর দেরী কিসের, বিদুর?…..তুমি তো জান যে এই নির্ণয় তোমাকে আর আমাকেই নিতে হবে। ভ্রাতাশ্রী বা দিদি পারবেন না, আর আমার পুত্ররা চাইবেনা তোমাকে বা আমাকে ছাড়তে। কিন্তু বাঁধন কেটে আমাদের যে এবার বেরোতেই হবে, বিদুর।”

বিদুর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন, তারপর হেসে বললেন- “যথা আজ্ঞা।….আমিও ক’দিন ধরে ভাবছিলাম কিন্তু স্থির করে উঠতে পারছিলাম না। আপনি আজ স্থির করে দিলেন…যেমন চিরদিন জ্ঞান আর বুদ্ধি দিয়ে করে এসেছেন মার্গদর্শন!….শুধু হস্তিনাপুর নয়, আমরা সবাই আপনার কাছে ঋণী!”

কুন্তী বললেন- “কে যে কার কাছে ঋণী, তা ঈশ্বরই জানেন!….যাই হোক্, তুমি ব্যবস্থা করে ফেল বিদুর। আগামী মাসে শুভদিন আছে, সেইদিনই আমরা রওয়ানা হব। এখন কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। দিন সাতেকের মধ্যে, সব ব্যবস্থা করে আমাকে জানিও। আমি তারপর সময় সুযোগ বুঝে ছেলেদের এবং দিদিকে বলব।”

বিদুর সম্মতি জানিয়ে নিষ্ক্রান্ত হলেন।

কুন্তী উঠে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালেন।

কত স্মৃতি এই প্রাসাদে, কত স্মৃতি এই কক্ষে।

প্রত্যেকটা ইঁট যেন তাঁর দিকে তাকিয়ে বলছে – “মনে আছে….?”

প্রতিটি আসবাব যেন তাঁকে প্রশ্ন করছে – “আমাদের ত্যাগ করছ?….”

কুন্তী মনে মনে বললেন – “সব মনে আছে, সব। কিচ্ছু ভুলিনি।….কি করে ভুলব! এই তো আমার কর্মভূমি। এই তো সেই পূণ্যস্থান যেখান থেকে শুরু হয়েছিল আমার কর্মযোগ – ফল কি হবে না জেনে, না ভেবে, শুধু কর্ম করে যাওয়া।….রাজমহলে পাটরাণী হয়ে ক’দিন কাটানো তো ছিল স্বপ্ন! আর এইখানে ছিল আসল বাস্তব-এখানেই আমি বেঁচেছি, কর্ম করেছি।…..কিন্তু কর্মভূমিও একদিন ত্যাগ করার সময় আসে! আজ আমার সেই বাণপ্রস্থের দিন আগতপ্রায় – তোমরা সবাই আজ আমার ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে, হাসিমুখে, আমাকে আশীর্বাদ কর আর বিদায় দাও। বাণপ্রস্থ যেন আমার সফল হয়, তপস্যায় যেন প্রায়শ্চিত্ত পাই, অন্তে যেন মুক্তি আসে।”

ক’দিনের মধ্যই বিদুর জানালেন যে তপোবনের আয়োজন সব প্রস্তুত – শুধু দিনক্ষণ স্থির করার অপেক্ষা।

পরদিন অপরাহ্ণে কুন্তী গেলেন মহারাজ যুধিষ্ঠিরের মহলে।

যুধিষ্ঠির উঠে দাঁড়িয়ে বললেন – “মা, আমাকে কেন ডেকে পাঠালে না?”

কুন্তী হেসে বললেন – “কেন? আমি আসতে পারিনা?…..রাজমাতার এই বেশ, এই চাল, সব ফেলার সময় হল যে পুত্র! এবার পথের ধুলায় নেমে শুভ্রবেশে তাঁর স্তব করার দিন এসেছে – যাঁর করুণা ছাড়া জীবনের এই শেষ খেয়াটুকু পার হতে পারব না!”

যুধিষ্ঠির বললেন – “মা!….”

কুন্তী বললেন – “হ্যাঁ পুত্র! বাণপ্রস্থে যাওয়ার দিন স্থির করেছি আগামীমাসে – তুমি আপত্তি কর না। তুমি ধর্মের সারকথা জান, তুমি জান যে অন্তে এই পথই গৃহীর জন্য শ্রেয় – তাই তুমি খোলা মনে সম্মতি দাও যুধিষ্ঠির। তুমি ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব সবাইকে জানিও – তাদের ডেকে এন আমার কক্ষে। আমি সবাইকে আশীর্বাদ করব, সবার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাব।”

যুধিষ্ঠির অনেকক্ষণ মাথা নীচু করে বসে রইলেন।

তারপর বললেন – “যথা আজ্ঞা, মা।….সঙ্গে কি কাকাশ্রী, জ্যেষ্ঠ পিতাশ্রী আর বড়ো মা-ও যাবেন?”

কুন্তী বললেন – “সময় পার হয়ে গেলে পুরানো জীর্ণ বৃক্ষ কেটে ফেলতে হয়, নাহলে সে নতুন বৃক্ষের বৃদ্ধিতে বাধা দ্যায়।…..আমি আগামীকাল সকালে দিদির কাছে যাব। আমার বিশ্বাস তাঁরাও একসঙ্গেই রওয়ানা হবেন বাণপ্রস্থের পথে।”

যুধিষ্ঠির উঠে দাঁড়িয়ে কুন্তীর চরণস্পর্শ করলেন।

যুধিষ্ঠিরকে আশীর্বাদ করে, কুন্তী নিষ্ক্রান্ত হলেন।

পরদিন প্রত্যুষে, স্নান করে সূর্যপ্রণাম এবং পূজা সেরে, কুন্তী এলেন গান্ধারীর মহলে।

গান্ধারীর চরণস্পর্শ করে বললেন – “কেমন আছ, দিদি?”

গান্ধারী বললেন- “কেমন আর থাকব কুন্তী, বল! বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাই বেঁচে আছি।…..এই রাজপ্রাসাদ আর সেই প্রাসাদ নয় কুন্তী, যেখানে আমরা নতুন বধূ হয়ে এসেছিলাম- সংসার পেতেছিলাম। প্রতি পদক্ষেপ আমাকে এখন মনে করিয়ে দ্যায় যে এই প্রাসাদ কী ছিল আর কী হয়েছে!  প্রতিটি নিঃশ্বাস মিশে যায় তাদের অগুন্তি অশরীরি দীর্ঘশ্বাসে, যারা অতৃপ্তমনে অসময়ে বিদায় নিয়েছে।….”

কুন্তী বললেন- “দিদি, ঠিকই বলেছ – এই প্রাসাদে অনেক স্মৃতি। যে স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকাও কখনো কখনো দুর্ভার হয়ে যায়।….তাই ভাবছিলাম, এবারে তপোবনে যাই। বনের মুক্ত আকাশে, নির্মল বাতাসে, প্রকৃতি হয়তো সেই শান্তি ফিরিয়ে দেবেন যা আজ হস্তিনাপুরে বিরল। তুমি আর ভ্রাতাশ্রী হয়তো শান্তি পাবে সেখানে গেলে! আমি অনেকদিন প্রকৃতির কোলে, বনে পাহাড়ে কাটিয়েছি – সেখানে এক অন্যরকম শান্তি আছে, দিদি!”

গান্ধারী বললেন- “তপোবনে?”

কুন্তী বললেন- “হ্যাঁ দিদি।….সরল সাধারণ জীবন। রাজবেশহীন, রাজভৃত্যহীন, অহংকারহীন জীবন- সেই হবে আমাদের মুক্তির মার্গ। আমি থাকব তোমাদের সঙ্গে সদাসর্বদা, কোনো অসুবিধে হবে না। সঞ্জয়ও আমাদের সঙ্গে বাণপ্রস্থে যেতে চায়, বিদুর বলল। তাতে ভ্রাতাশ্রীরও সুবিধা হবে।”

গান্ধারী দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন – “তবে তাই চল কুন্তী। এখানে আর থাকতে পারছিনা।”

কুন্তী বললেন – “ঠিক আছে, দিদি। আমি আগামী মাসেই রওয়ানা হওয়ার সব ব্যবস্থা করে ফেলছি- তুমি ভ্রাতাশ্রীকে জানিয়ে রেখ।”

কুন্তী বিদায় নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

সব ব্যবস্থা হয়ে গেল, বাকী রইল শুধু পুত্রদের সঙ্গে একান্তে একবার বসা আর পাঞ্চালীর হাতে সব সমর্পণ করে যাওয়া।

তাও হয়ে গেল অবশেষে।……

পুত্রদের আবেগে বাঁধ দিলেন কুন্তী, তাঁদের বোঝালেন হিন্দুধর্মে চতুরাশ্রমের মর্ম।

বাল্যে ব্রক্ষচর্য বা শিক্ষাশ্রম, তারুণ্যে গৃহস্থী বা গার্হস্থ্যাশ্রম – আর তারপর বনগমন……বাণপ্রস্থ থেকে ঘোর তপস্যার মার্গ ধরে সর্বত্যাগী সন্ন্যাস। এইপথেই গৃহীর ধর্ম, গৃহীর মুক্তি।

অর্জুন বললেন – “মা, আর কিছুদিন থাক!”

কুন্তী বললেন – “না পুত্র, তা আর হয় না। সন্তান কখনোই পিতা-মাতাকে বিদায় দিতে প্রস্তুত থাকে না, তাহলে কি পিতা-মাতা চিরদিন থেকে যাবেন সংসারে?…..সব বয়সের একটা ধর্ম আছে। আমার যা বয়স, সেই বয়সের ধর্ম ত্যাগ – রাজপ্রাসাদের ভোগ নয়। সরল জীবনযাত্রা এবং তপস্যার দ্বারা দেহ-মনকে শুদ্ধ না করলে, মুক্তি আসে না। সংসারাশ্রমে জ্ঞানে-অজ্ঞানে বহু ভুল, বহু পাপ হয় আমাদের হাতে – তার প্রায়শ্চিত্ত দরকার, শুদ্ধি দরকার।”

সহদেব বললেন – “কিছু প্রয়োজনে, বা বিনা প্রয়োজনে, আমি কার কাছে এখন ছুটে যাব মা?”

কুন্তী বললেন- “স্ত্রীর কাছে যাবে, পুত্র!….যে সম্মান মা’কে দিয়ে বড়ো হয় পুত্র, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সেই সম্মান তার স্ত্রীকে দেওয়া উচিত। মা যেমন সযত্নে সন্তানকে বড়ো করে তোলেন বলে সদা আদরণীয়া, স্ত্রীও তেমনি তার শরীর-মন সর্বস্ব দিয়ে তোমার এবং সংসারের দেখভাল করছে বলে সেও পরম আদরণীয়া। মাকে সরিয়ে, স্ত্রীকে একদিন তার জায়গা দিতেই হয় – নাহলে তার প্রতি অবিচার করা হয়।”

নকুল বললেন – “আমাদের প্রতি তোমার কি উপদেশ, মা?”

কুন্তী বললেন – “পাঁচভাই সর্বদা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাঁচআঙুলের শক্তমুঠি হয়ে থাক – কেউ যেন সে মুঠি খুলতে না পারে।”

সহদেব বললেন – “আর?….”

কুন্তী বললেন – “ধর্মের আর সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ো না, তাহলে সদাই ঈশ্বর সহায় থাকবেন।”

ভীম বললেন – “আর?…..”

কুন্তী বললেন- “জীবন যখন যে অবস্থায়ই ফেলুক না কেন, ধৈর্যের সঙ্গে হাসিমুখে সেখানে থাকবে – যথাযথ সময় না এলে কিছুই হয়না, তাই সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে।….আর মনে রেখ, কিছুরই ‘অতি’ ভালো না। বাল্যকালে ক্ষীর খাওয়ার অতিরিক্ত আকাঙ্খায় তুমি বিষ খেয়েছিলে – সে শিক্ষা ভুলো না।”

অর্জুন বললেন – “আর?…..”

কুন্তী বললেন – “আবেগের বশে কোনও কাজ করবে না, বুদ্ধির বশে থেকে কাজ করবে। আর কাজ শুরু করার আগে ঠাণ্ডামাথায় চিন্তা করবে, কিন্তু পরে আর চিন্তা করবে না – দৃঢ়পদে এগিয়ে যাবে।”

যুধিষ্ঠির বললেন – “আর?…..”

কুন্তী বললেন- “তুমি রাজার কর্তব্য সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল, তাই নতুন কিছু বলার নেই – শুধু মনে রেখ যে প্রজারা রাজারও ওপরে, তোমার সব কাজের জন্য তুমি তাদের কাছে উত্তরদায়ী।….অপাত্রে অতি বিশ্বাস করে আর দ্যুতক্রীড়ার প্রতি অতি আকর্ষণে যৌবনে যে ভুল তুমি করেছিলে, সেই ভুল যেন এই বংশে কোনদিন কেউ আর না করে। আর মনে রেখ যে এখন থেকে এই পরিবারের তুমি প্রধান – একে ঐক্যবদ্ধ রাখা তোমার কাজ। জ্যেষ্ঠের কর্তব্য ভুলোনা। নিজের আগে তুমি ভাববে সহদেবের কথা, নকুলের কথা, অর্জুনের কথা, ভীমের কথা। ধর্মসংকটে পড়লে স্মরণ করবে কৃষ্ণকে।”

“যথা আজ্ঞা” বলে পাঁচভাই প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালেন।

এরপর পাঞ্চালীকে ডেকে পাঠালেন কুন্তী।

তাঁকে কাছে বসিয়ে বললেন- “আজ পঞ্চপাণ্ডবকে এবং এই বংশের মানমর্যাদাকে সর্বতোভাবে তোমার হাতে রেখে গেলাম, পাঞ্চালী। আমি জানি তুমি এই ভার নেওয়ার উপযুক্ত। মনের মধ্যে কোনো তিক্ততা, কোনো দ্বিধা রেখ না। এই রাজপরিবার তোমার সঙ্গে যা অন্যায় করেছে সব ভুলে যাও। আমার পুত্রদের কারণে যদি তোমার কখনো অপমান হয়ে থাকে – তাদের ক্ষমা করে দাও। আমি স্বয়ং তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী – আমার ব্যবহারে যদি কোনদিন দুঃখ পেয়ে থাক তাহলে সেকথা ভুলে যেও।….আজ এই রাজ্য তোমার, এই প্রাসাদ তোমার, এই পাণ্ডব তোমার — দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে, নিজজ্ঞানে তুমি এদের রক্ষা কর।”

পাঞ্চালী প্রণাম করে আশীর্বাদ ভিক্ষা করলেন।

এইসঙ্গে শেষ হল সংসারের প্রতি কুন্তীর যাবতীয় কর্তব্য।

নির্দিষ্ট দিনে রথ এসে দাঁড়াল রাজপ্রাসাদের সামনে — কুরুজ্যেষ্ঠদের তপোবনে রেখে আসার জন্য।

শ্বেতবস্ত্র পরিহিত, আভরণহীন, রাজপরিবারের পুরাতন সদস্যরা সবাই এসে দাঁড়ালেন রথের সামনে।

পাণ্ডব এবং পাঞ্চালী এগিয়ে এসে প্রণাম করলেন।

ধার্মিক সঞ্জয়ও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁদের সঙ্গে বাণপ্রস্থে যাওয়ার, ধৃতরাষ্ট্র তাঁরই হাত ধরে রথে উঠে বসলেন।

পশ্চাতে গান্ধারী, কুন্তী, বিদুর।

রথ এগিয়ে চলল।

পিছনে পড়ে রইল, সহস্র স্মৃতির ঝুলি নিয়ে, একদা কর্মভূমি হস্তিনাপুর।

 

১১ উপসংহার

 

ব্যাসদেবের সুনির্বাচিত তপোবন যেন সত্যিই শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দিল ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারীর জীবনে।

কুন্তী আছেন সদাসর্বদা গান্ধারীর পাশে, সঞ্জয় আছেন ধৃতরাষ্ট্রের সাহায্যার্থে।

দৃষ্টিহীনতার সঙ্গে দাস-দাসীর অভাব যেন কোনও অসুবিধার সৃষ্টি না করে তাঁদের এই নতুন জীবনে, সেই বিষয়ে সদাই সজাগ দৃষ্টি  রয়েছে কুন্তীর।

তপোবনের শান্ত সরল জীবনযাত্রায় ক্রমশঃ অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন ধৃতরাষ্ট্র আর গান্ধারী।

আজ ধৃতরাষ্ট্র হৃদয়ে অনুভব করেন গীতার সেই বাণীর যথার্থতা – তমো গুণজনিত কাজের ফল অজ্ঞান, রজো গুণজনিত কাজের ফল দুঃখ, আর সত্ত্ব গুণজনিত কাজের ফল আনন্দ।

অজ্ঞানতাবশতঃ, রাজসিকভাবে ভাবিত হয়ে, অন্তে দুঃখ ছাড়া আর কিই বা পেয়েছেন তিনি?

আজ তাই তাঁর শুধু প্রায়শ্চিত্বের প্রচেষ্টা, সত্ত্বভাবে নিজেকে ভাবিত করার প্রয়াস!

বছর কয়েক ঘুরে গেল।

বিদুর নির্ণয় নিলেন বনের গভীরে গিয়ে আহার-নিদ্রাহীন ঘোর তপস্যার।

কুন্তী বুঝলেন এ’ নির্ণয়ের অর্থ কি, এ’ তপস্যার পরিণাম কি।

তিনিও যদি পারতেন এ’ নির্ণয় নিতে!

কিন্তু তা’ হবার নয় – যতদিন বেঁচে আছেন ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারী, ততদিন তাঁদের দায়িত্ব নিতে হবে তাঁকেই…..কুন্তী তাঁদের পরিত্যাগ করে যেতে পারবেন না।

দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন তিনি – এক এক করে সবই ছাড়ার সময় আসছে।

চিরসখা বিদুরকেও হয়তো ছাড়তে হবে এবার।

খবর পেয়ে পাণ্ডব এলেন দেখা করতে।

হয়তো এই সাক্ষাতের জন্যই শেষ প্রতীক্ষায় ছিল বিদুরের অন্তরাত্মা।

যুধিষ্ঠির গিয়ে প্রণাম করলেন, পরমুহূর্তেই বিদুরের আত্মা মুক্তি নিল তাঁর প্রাণহীন দেহ থেকে।

কুন্তী শুধু তাকিয়ে রইলেন শূণ্য দৃষ্টি মেলে।

প্রেমাস্পদরা তাঁর জীবনে সদাসর্বদা ক্ষণিকের বিলাস হয়েই এসেছে – কারোর ওপরেই নির্ভর করতে পারেননি তিনি, শুধু বিদুর ছাড়া।

সবাই শুধু নিয়েছে, আর নিয়ে নিয়ে রিক্ত করেছে তাঁকে।

শুধু বিদুরই একজন, যে দিয়েছে।

পারস্পরিক নির্ভরতার, পারস্পরিক আদানপ্রদানের, পারস্পরিক সাহচর্যের এই যুগলজীবন তাহলে আজ সত্যিই শেষ হল?!

কিন্তু সন্ন্যাসের পথযাত্রীদের তো শোকজ্ঞাপন করতে নেই, তাই দিন চলতে লাগল একই নিয়মে।

শরীর যত জীর্ণ হচ্ছে, আত্মা ততই এগিয়ে যাচ্ছে পরম মুক্তির দিকে।

কুন্তী, গান্ধারী আর ধৃতরাষ্ট্র এখন গভীরতর বনে গিয়ে বেঁধেছেন তাঁদের পর্ণকুটির।

ক্ষুন্নিবৃত্তি হচ্ছে ফলমূল আর নিকটস্থ ঝর্ণার জলে।

এই বনে বন্যপ্রাণী নেই — সঙ্গী শুধু নির্বাক প্রকৃতি।

সেই গভীর নির্জনতা কদাচিৎ ভঙ্গ হয় কেবল পাখীর কূজনে আর ঈশ্বরের নামগানে।

অনন্ত আকাশের নীচে, অপরিমিত শান্তির আশ্রয়ে, মুক্তির প্রতীক্ষায় আকুল তিনটি প্রাণী করে যান ধ্যান আর নামজপ।

সেইদিন প্রাতে ঝর্ণার জলে স্নান করে উঠে আসছিলেন কুন্তী, গায়ে কিছু উড়ে এসে পড়ল।

ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন – মনে হল যেন ভস্ম।

কুন্তী বুঝতে পারলেন না যে কোথা থেকে এই ঘন জঙ্গলে ভস্ম উড়ে আসবে।

কুটিরে এসে ফল ধুয়ে খেতে দিলেন ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারীকে। নিজেও নিলেন।

তারপর, হাত ধরে খুব সাবধানে দু’জনকে ধরে এনে কুন্তী বসিয়ে দিলেন বাইরের আসনে – মুক্ত হাওয়ায়।

এখানে বসে তাঁরা ধ্যান করেন কিছুক্ষণের জন্য।

ধৃতরাষ্ট্র এখন অতিকষ্টে হাঁটেন, বেশীক্ষণ বসে থাকতে পারেন না।

কিছুক্ষণ পরেই তাঁকে কুন্তী রেখে দিয়ে এলেন শয্যায়।

গান্ধারী বসে রইলেন কুন্তীর সাথে, দুজনেই ধ্যানমগ্ন।

এইভাবে কিছুক্ষণ কাটার পর, গান্ধারী বললেন – “কুন্তী, একটু হাঁটতে যেতে ইচ্ছা করছে!”

কুন্তী বললেন – “দিদি, তুমি পারবে হাঁটতে?”

গান্ধারী বললেন – “চেষ্টা তো করি!”

কুন্তী অতি সাবধানে গান্ধারীর হাত ধরে তাঁকে কুটিরের সামনে নিয়ে এলেন।

কিছুক্ষণ হেঁটে দুজনে ফিরে এসে বসলেন আসনে।

ধৃতরাষ্ট্রর খাবার নিয়ে ঘরে এলেন কুন্তী।

তাঁকে খাইয়ে, নিজের আর গান্ধারীর খাবার নিয়ে এলেন কুন্তী।

আহার শেষ করে, দুজনে আবার বসলেন কুটিরের দাওয়ায়।

আস্তে আস্তে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এল।

কলকাকলিতে রাত্রিকে আবাহন জানিয়ে, একসময় পাখিরাও পড়ল ঘুমিয়ে।

চারদিকে এখন নিঃশব্দ — শুধু মুক্তিকামী দু’টি প্রাণ অন্ধকারে বসে রইলেন ধ্যানমগ্ন।

ধ্যানশেষে, পূর্ণ দুই চক্ষু মেলে আকাশে তাকালেন কুন্তী।

দ্বাদশীর চাঁদ আকাশের এককোণে আলো ছড়াচ্ছে – অন্ধকার তাতে কাটেনি।

কিন্তু, আকাশের পশ্চিম কোণে কিসের লাল আভা? যেন সূর্যোদয় হচ্ছে।

উঠে দাঁড়িয়ে দাওয়া থেকে নেমে এলেন কুন্তী।

এগিয়ে গিয়ে ভালো করে দেখার চেষ্টা করলেন।

একটু এগোতেই গায়ে কিসব উড়ে এসে পড়ল – হাত দিয়ে অনুভব করলেন কুন্তী।

এইরকমই তো কিছু সকালে গায়ে এসে পড়েছিল! ভস্ম।

স্থির হয়ে দাঁড়ালেন কুন্তী।

বাতাসের গতি অনুভব করার চেষ্টা করলেন – পশ্চিম দিক থেকে বইছে।

রাতের হাওয়া বয়ে আনছে ভস্ম – বনের পশ্চিমপ্রান্তে আগুন লেগেছে!

এখনও দূরে আছে, কিন্তু খুব দূরে নয়।

এই দাবানল থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হল যত শীঘ্র সম্ভব, যত দ্রুত সম্ভব, বনের পূর্বদিকে চলে যাওয়া।

ফিরে এসে দাওয়ায় বসলেন কুন্তী – গান্ধারীর দিকে তাকালেন। গান্ধারী কিছুই জানেন না এখনও।

পাশে বসে গান্ধারীর হাত ধরলেন কুন্তী, বললেন – “ক্লান্ত লাগছে, দিদি?”

গান্ধারী বললেন – “হ্যাঁ, কুন্তী। বেশীক্ষণ বসতে পারি না আজকাল, চল শুতে যাই।….তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম, কোথায় গিয়েছিলে তুমি?”

কুন্তী বললেন – “কোথাও না, একটু এগিয়ে দেখছিলাম যে আকাশ এত লাল হয়ে আছে কেন!”

গান্ধারী বললেন – “আকাশ লাল হয়ে আছে বুঝি?”

কুন্তী বললেন – “হ্যাঁ দিদি, মনে হচ্ছে বনের পশ্চিমপ্রান্তে আগুন লেগেছে।”

গান্ধারী বললেন – “আগুন?….সে কি? কি হবে, কুন্তী?”

কুন্তী বললেন- “এখনও একটু দূরে আছে।….পূবদিকে চলে যেতে পারলে ভালো, কিন্তু খুব দ্রুত যেতে না পারলে আগুন ধরে ফেলবে আমাদের।”

গান্ধারী বললেন- “দ্রুত? কি করে যাব তাই তো জানিনা, কুন্তী! তোমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাশ্রী তো হাঁটতেই পারবেন না! আমিও দ্রুত হাঁটতে পারিনা। এই ঘন বনে কোন লোকজনও নেই যে সাহায্য করবে!…..কিন্তু তুমি তো দৃষ্টিহীন নও কুন্তী, তুমি তো দ্রুত হাঁটতে পার! তুমি চলে যাও এখান থেকে – পালিয়ে যাও যত তাড়াতাড়ি পার! আমাদের জন্য তুমি কেন প্রাণ দেবে, কুন্তী? এতদিন তুমি আমাদের অনেক সেবা করেছ, আর নয়! এবার তুমি যাও।”

কুন্তী হাসলেন।

তারপর ধীরস্বরে বললেন – “কোথায় যাব, দিদি? আমৃত্যু তোমাদের সেবা করব, শপথ করেছি।তাছাড়া, মৃত্যুকে বরণ করব বলে এই বনে এসে তপস্যা করছি – আর আজ মৃত্যুকে দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাব জীবনকে বরণ করতে?! না দিদি, তা হয় না। জীবনের পাট আমরা চুকিয়ে দিয়ে এসেছি। তাই মৃত্যু আজ যে রূপেই আসুক না কেন, দু’হাত বাড়িয়ে তাকে আলিঙ্গন করে নেব।

….চল, এইক্ষণে আমরাও আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে বিদুরের মতো ঘোর তপস্যা শুরু করি। যদি আমাদের তপস্যার জোর থাকে, তাহলে আগুন আমাদের ধরতে পারবে না – তার আগেই আমরা মৃত্যুকে ধরে ফেলব, আর তারপর আমাদের দেহের যথাবিহিত অগ্নিসৎকার হয়ে যাবে। আর তা নাহলে, আগুন এসে আমাদের ধরবে – সেও ঠিক আছে, অগ্নিশুদ্ধ হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব।

যাই হোক্ না কেন দিদি, ঈশ্বরের ইচ্ছা জেনে নিজেদের সমর্পণ করে দেব।”

গান্ধারী বললেন – “তবে তাই হোক্!…….

ধন্য তুমি, কুন্তী!….যেদিন আমাদের সব ছিল – ক্ষমতা, লোকবল, রাজ্য, পরিবার – সেদিন তুমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করে আমাদের ছেড়ে, রাজপ্রাসাদ ছেড়ে, চলে গিয়েছিলে। আর আজ যখন আমরা সহায়সম্বলহীন, কপর্দকহীন, অশক্ত, তখন তুমিই একমাত্র আমাদের পাশে রইলে।……আমার পুত্র দুর্যোধনকে জনহীন প্রান্তরে মৃত্যুর মুখে একা রেখে চলে গিয়েছিল তোমার পুত্রেরা – তার মৃত্যু হওয়া অবধি অপেক্ষা করেনি, তার সৎকারের কথাও ভাবেনি। তুমিও আজ আমাদের মৃত্যুর মুখে ফেলে চলে যেতে পারতে – কেউ তোমায় দোষ দিত না। কিন্তু তুমি রয়ে গেলে! যে ভ্রাতাশ্রী আর দিদি তোমার পুত্রদের অন্যায় ছাড়া আর কিছু দ্যায়নি, তাদের হাত শেষ মুহূর্ত অবধি ধরে থাকবে বলে তুমি রয়ে গেলে।….তোমার তুল্য কুরুকূলে আর কেউ নেই – না পুরুষ, না নারী। আজ মানছি যে তুমি একমেবাদ্বিতীয়ম্।……

তোমার জন্য, শুধু তোমারই জন্য আজ তোমার পুত্রদের আমি সর্বতোভাবে ক্ষমা করে দিলাম। তারা সুখী হোক্, পৃথিবী ভোগ করুক!”

কুন্তী হাতজোড় করে কপালে ঠেকালেন — ওঁম্ তৎ সৎ!

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>