| 19 মে 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য প্রবন্ধ: অধিক জীবনের খোঁজে কৃষ্ণা বসু । তৈমুর খান

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

অধিক জীবনের খোঁজে শিল্পসিদ্ধির কবি কৃষ্ণা বসু । তৈমুর খান

এক.

কবি কৃষ্ণা বসু নিজেই এক মহাকাব্য। তাঁর জীবনেই এসে বিশ্বের সমস্ত নারীর জীবন মিলিত হয়েছে। তাঁর নিজের জীবনকথার মধ্যে দিয়েই সমস্ত নারীর স্বপ্ন, সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা-পীড়নের কথা শুনতে পাই। মল্লিকা সেনগুপ্ত দূরে দাঁড়িয়ে যে নারীর জীবনকে দেখেছেন, ইতিহাস-পুরাণের নিরিখে তাদের দুঃখ-দুর্দশা-অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়েছেন; কৃষ্ণা বসু সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে সেইসব আবহমান নারীকে নিজের হৃদয়েই কথা বলতে শুনেছেন। কৃষ্ণা বসুর হাতে কলম দিয়ে তারাই যেন তাদের কথা লিখিয়ে নিয়েছেন। সেই সূত্রে কৃষ্ণা বসুর দৃষ্টিভঙ্গি subjective, কিন্তু মল্লিকা সেনগুপ্ত অনেকটাই objective. কিন্তু উভয়েই এক প্রশ্নের ভেতর দিয়ে যাত্রা করেছেন। পুরুষ-নারীর কেন এত বৈষম্য? পুরুষ শাসিত সমাজের সব কিছুই পুরুষের স্বপক্ষে, কেন? কেন নারীও মর্যাদা পাবে না ? কন্যাভ্রূণ হত্যা থেকে বধূহত্যা, ধর্ষণ সবকিছুরই প্রতিবাদ আছে। কুন্তী, দ্রৌপদী থেকে সীতা সকলেই উভয় কবির লেখায় উপস্থিত হয়েছেন। বাড়ির ঝি, স্কুলছাত্রী থেকে অসহায় নারী কেউই বাদ যাননি। একই পথের ভেতর দিয়ে গেলেও দুই কবি যে আলাদা শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে তা বলাই বাহুল্য।

   মল্লিকা যেখানে সম্পূর্ণ নারীকথাকেই শিল্প করতে চান, কৃষ্ণা সেখানে জীবনযাপনকেই শিল্প করতে চান। মল্লিকা লিখেছেন:

“শোনাতে এসেছি জনতার সভাকক্ষে

নারীর ভাষ্য কথামানবীর ভাষ্য”

   কৃষ্ণা বসু লিখেছেন:

“জীবনযাপন পদ্যে ফোটাই শিল্পে ধরি সবই”

কৃষ্ণা বসুর কবিতায় কথামানবীর কথাও আছে, আবার জীবনযাপনও আছে। একদিকে নারীজীবন, অন্যদিকে ব্যক্তিজীবন, সেইসঙ্গে সামাজিক জীবনও। তবু মনে হয় দুই স্রোত কোথাও মিশে গেছে, যে স্রোত ভারতীয় জীবনদর্শনের প্রেক্ষাপটে, ভারতীয় নারী হিসেবেই শেষ পর্যন্ত জেগে উঠেছে। কৃষ্ণা বসুর মধ্যে যেমন কিছুটা গ্রামকে পাই, মল্লিকার মধ্যে পাই নগরকে। তবু শান্ত সুস্থির নিরিবিলি উভয়েই চেয়েছেন। উভয়ের কবিতাতেই আছে “ঘরের যুদ্ধ, যুদ্ধ শেষের কান্না”—এক উত্তরণের, এক কল্যাণের আহ্বান।

দুই.

কৃষ্ণা বসু সুখের ভেতরেও অসুখের ঠিকানা লুকিয়ে থাকতে দেখেছেন। যেমন আলোর ভেতর অন্ধকার, বন্ধুর ভেতর শত্রু, ভালোবাসায় ঘৃণা—তেমনি লৌকিক জীবনেও নেমে আসে অলৌকিক, বাস্তবেও স্বপ্নের পদধ্বনি শোনা যায়। জীবনযাপনের ভেতর আত্মবিস্তৃতির নিরিখে কৈশোর যৌবনের নস্টালজিয়া বারবার জেগে ওঠে, তেমনি তার সঙ্গে থাকে এক ভবিষ্যতের অপেক্ষাও। সে অপেক্ষা কোনো শুভ সংবাদের, কোনো প্রেমের মহিমার অথবা কোনো নতুন পৃথিবীরও। কবি বিশ্বাস করেন ধ্বংসকামী শক্তিগুলি একদিন দূর হবে, তার বদলে ফিরে আসবে জীবনবাদী মানবিক পৃথিবী। স্মৃতিমেদুরতার সঙ্গে কবির বেড়ে ওঠাগুলি কবিতায় দৃশ্যপট তৈরি করে দেয়,সেখানে স্নেহপ্রবণ মায়ামমতায় ঘেরা এক পারিবারিক সংবাদও পেয়ে যাই কবিতাগুলিতে। যে শেকড় উত্তরাধিকারী হিসেবে খুঁজেছেন কবি, তাতে পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ও কাছের জনেরাই উঁকি দেয়। তাদের কাছ থেকেই তিনি জ্বালিয়ে নেন মানবিক আলোটি । ব্যক্তির মধ্যেই দেখতে পান জগৎকে, আবার জগতের মধ্যেই ব্যক্তিকে আলাদা করে চিনতে পারেন। বাংলার সমাজ, মানুষ, মানুষের স্বপ্ন, হাসি-কান্না, প্রবৃত্তির যাবতীয় প্রকাশ এবং লোকজ উপাদানগুলি তাঁর কবিতাকে ভরাট করেছে। নিজে সমৃদ্ধ হয়েই এনেছেন কবিতার সমৃদ্ধি। বণিক নগরের তীব্র আলোর ঝলকানির মাঝেও সুতানুটি গ্রামটিকে কবি খুঁজেছেন। সজনে গাছ, ঢেঁকি, সাদা বাছুর, শস্যক্ষেত, হেলেঞ্চার ঝাড় আর সেই সারল্য মাখা গ্রাম্য মানুষ —কবির মর্মচোখ কয়েকশো বছর পিছিয়ে গেছে তা খুঁজে পেতে। এখানেই কৃষ্ণা বসু আলাদা। শহরের মেকি জৌলুস তাঁকে বশ করতে পারেনি। আভিজাত্যের তকমা নিয়ে তিনি ভুলে যাননি তাঁর মফসসলকে। ইচ্ছে হলেই দেখে যান পিতার সেই প্রাচীন বাড়ি, জন্মভূমির সেই চিরচেনা প্রাকৃতিক পরিবেশকে। মাকড়সার জাল ভেদ করে সেই অন্ধকার গর্ভগৃহ কবির হৃদয়ে বার্তা পাঠায়। কবি ছুটে আসেন, পুরনো স্মৃতিতে ডুবে যান। তারপর এক সময় ছেড়েও যেতে হয়, তখন:

“পেছনে পেছনে তাড়া করে আসে অন্ধকার বাড়ি

হাহা জানালার পাল্লা, পুরোনো দরজায় ঘুণ,

ছেলেবেলাকার পোঁতা শিউলির শীর্ণ ডালপালা”

সবই এক মায়াময় প্রাচীন সভ্যতা, যেখানে কবির আত্মাটি ঘুরে বেড়ায়, বাবা-মা-র বিবাহের মঙ্গলচিহ্ন দ্যাখে। ফ্রক, ইজের, স্লেট-পেন্সিল সবই খুঁজে পায়। সুনসান দুপুরে শঙ্খচিলের ডাক, হাজামজা নদী ও সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ রমণী ‘মা’কে অনুভব করা যায়।

    তিনটি প্রশ্ন বারবার ভাবায় কৃষ্ণা বসুর সৃষ্টিরহস্যে। অধিক জীবনের খোঁজে তিনি তিনটি প্রশ্নের লক্ষ্যে হাঁটেন—

“কবে যাব?কবে যেতে পাব প্রেম থেকে অধিক প্রেমের দিকে?

শিল্প থেকে অধিক শিল্পের দিকে?

স্বপ্ন থেকে গূঢ় ঘন ক্ষীর স্বপ্নের দিকে?”

   ‘প্রেম থেকে অধিক প্রেম’ কথাটি যে আবহমান বৈশ্বিকচেতনায় নিষিক্ত এবং ‘স্বপ্ন থেকে গূঢ় ঘন ক্ষীর স্বপ্ন’ যে প্রবহমান জীবনীশক্তির পরিচয় জ্ঞাপক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু উভয় সদর্থক ক্রিয়াতেই আছে ব্যাপ্তির নিগূঢ়তা যা শৈল্পিকসিদ্ধির মধ্যেই সম্ভব। তাই ‘অধিক শিল্প’ কথাটিও প্রশ্নের মধ্যেই এনে উপস্থিত করেছেন কবি। জীবনও যদি একটা শিল্প হয়, তবে প্রেম-স্বপ্নও এক-একটি শিল্প। এই শিল্পেরই সমন্বয় দেখতে পাই কবিতায়। প্রেম বলতে শুধু ইন্দ্রিয়জ সুখকেই বোঝান না কবি, ‘স্বর্গীয় প্রেম’ না থাকলে ‘সম্পন্ন আলোকই’ বা কোথায়? কিন্তু এই স্বর্গীয় প্রেম তেমন ভাবে খুঁজে পাননি। যে প্রেমের মোমবাতি হয়ে পুড়েছেন, তা এই উপনিবেশের দেশে কেউ আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। কবি চিরদিনই নিঃসঙ্গ, একাকী, পুড়ে চলেছেন আজও:

“একা রিক্ত মোমবাতি জ্বলে,

রাত গাঢ় হয়,

মোমবাতিটির বুক বেয়ে

গরম ও লবণাক্ত অশ্রু পড়ে।”

    তখন কবির একান্ত হৃদয়ের কাছে পৌঁছে যাই, কতটা গভীর ও আত্মগত এই অনুতাপ তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। সভ্যতার দীপ্ত জৌলুসে তিনি হারিয়ে যান না, নিজের কাছেই ফিরে আসেন আর নিজেকেই পুড়িয়ে আলো দিয়ে চলেন নীরবে। যারা জানেন না, তাদের কাছে মনে হতে পারে—এ কোন্ কৃষ্ণা বসু? দার্শনিক হয়ে কখনো কখনো অনুভব করেন—

“নীরবতা ঢের বেশি সত্য কথা বলে”

তাই বেশি কথার মানুষও তিনি নন। সুসংহত, সংযত নিজস্বতায় এক সারল্য ও বিবেকী উচ্চারণে ‘সমারূঢ় বেদনায় তিরবিদ্ধ হয়ে থাকেন’। নিজেকে এইসব মানুষের ভিড়ে খোঁজেন যারা সমাজের নিচুতলার মানুষ, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। যারা অসহায় আবার সামাজিক মর্যাদাহীনও। কবির ‘আমি’ সেইসব মেয়েদের ‘আমি’তে প্রবেশ করে:

১) আমি জেলেদের মেয়ে জাল বুনি

২) আমি চাঁদ বণিকের ডিঙা

৩) প্রত্যেকের কাছে আমি নিজেকে অনেক নিচু করে ফের উঠে দাঁড়াতে চাই

৪) জন্মান্ধ রমণী আমি শব্দ ছাড়া আর কিছু জানিনি জীবনে

৫) প্রোষিতভর্তৃকা নারী আমি বহুদিন

৬)ভিতর থেকে ডাকছি আমি, তুমি শুনতে পাচ্ছো না?

৭) বিশ্ব পাল্টে গেছে দ্রুত, কেউ আর আমাকে চেনে না

৮) দুয়ার খুলে বাইরে এসে দাঁড়াই স্তব্ধ আমি

৯) আমার সমূহ যৌবনলগ্ন সার্কাসের তাঁবুর মতন টাঙিয়ে রেখেছি টানটান

১০) আমি ভালো নেই, কিছু মাত্র ভালো নেই।

১১) কালো মেয়ে আমি, তাই বলে ভালোবাসা, প্রেমে পড়া

১২) আমাকে পোছে না কেউ

আমি একা একা রাত জাগি

অদ্ভুত চাঁদের রাত জাগি।

১৩) আমার মাথাটি নয়  নাবাল চাষের উনো জমি

১৪) এই সুপ্রাচীন প্রতারক দেশ

আমি এর মাটিতে জন্মেছি?

১৫) আজকাল আমি মানুষজনের কথাকে ভয় পাই না, না বলা কথার ভঙ্গিকে ভয় পাই

১৬) উড়াল দিইনি, উড়তে শিখিনি, দাঁড়িয়ে বসা পাখি আমি,

উড়তে চেয়েছি, ভাসতে চেয়েছি, জানেন অন্তর্যামী

১৭) পৃথিবী চেয়ে আছে আমার মুখের দিকে, আমার ত্বকের দিকে, আমার কালো ভোমরা কেশ রাশির দিকে।

১৮) কেন আমি তামাটে মাটির ওপর জন্মালাম

তাম্র বর্ণ কষ্টের পুতলী মেয়ে ‘কৃষ্ণা’ নাম নিয়ে?

১৯) আমি শুধু জেনে যাই, আমার ভিতরে

এক বধির রয়েছে আমি টের পাই

২০) নিজের মধ্যে মরণ জিদ টের পেয়ে যাই শেষে

কবির stream of consciousness জেলেদের মেয়ে হয়ে, চাঁদ বণিকের প্রাচীন ডিঙা হয়ে, অন্ধ রমণী হয়ে, স্বামী বিচ্ছিন্ন রমণী হয়ে, ধর্ষিতা মেয়ে হয়ে, আবহমানের বিরহিণী হয়ে, সেবাদাসী হয়ে, কালো কুচ্ছিৎ মেয়ে হয়ে, আদিবাসী রমণী হয়ে এবং যেকোনো নারী হয়ে সেইসব বোধিতে পৌঁছে গেছে সহজেই। ধর্ষিতা, অত্যাচারিতা মৃত বালিকার স্বর যেমন তাঁর কবিতা, তেমনি আত্মহত্যাঅভিমুখীন নারীর ভাবনাও। তাঁর দৌড়ের মধ্যেই বেঁচে থাকার, বাঁচতে চাওয়ার নারীটিও জেগে ওঠে—

“দৌড়চ্ছে মেয়ে, পেছনে তাড়া করেছে সামন্ত সভ্যতা।”

‘সামন্ত সভ্যতা’ শুধু নারীকে পণ্য করেই দেখেছে, তাই আত্মজাগরণে এই দৌড় সীমাহীন। কাঁদতে কাঁদতে জীবন শুধু চলতে পারে না, এর শেষ কোথায়? এই প্রশ্নই অধিক জীবনের দিকে কবিকে ঠেলে দিয়েছে। যে জীবন নিয়ে কবি জন্মগ্রহণ করেছেন তা এক জীবনেই একই আয়ুর সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। তা হাজার হাজার বছর ধরে যুগে যুগে প্রবাহিত জীবন। হাজার হাজার মানুষীর মধ্যে প্রবাহিত তাদের সত্তার মিলিত রূপ। কবি তাকেই উপলব্ধি করেছেন। আত্মরসায়নের নিবিড় সংশ্লেষে তাদের এক একটি স্বরূপকে উদ্ঘাটন করেছেন কবিতায়। তাদের অভিমান, তাদের কষ্ট, তাদের নীরবে অশ্রু বিসর্জন, তাদের উত্তাপ সবই নিজ হৃদয়ে ধারণ করেছেন—বলেই তাঁর কবিতার উচ্চারণে কোথাও বিলাসিতা নেই, ছদ্মতা নেই। আছে প্রাণের সামীপ্য,আছে শ্রদ্ধার ব্যাপ্তি, আছে অতীত ঐতিহ্যের প্রতি আন্তরিক স্বীকৃতিও। সভ্যতার ইতিহাসে, মানবিক পৃথিবীর প্রতিষ্ঠায় তাঁর কবিতা শাশ্বতবোধির দরজায় সেই কারণেই করাঘাত করে।

       নিজের স্বরূপটি খুঁজে নেন কবি সব অস্পষ্টতার মধ্যেই। অযত্নলালিত গৃহসংসারে বড় নিঃসঙ্গ হয়ে যান। জন্মমাস নভেম্বরও পূর্ণতার কোনো ঠিকানা কবিকে দিতে পারে না। সঙ্গীহীন, একা, হিমজমা কাচের পাশে বসে থাকেন। জটিল সংসারের বারুদস্তূপ কখন জ্বলে উঠবে কে জানে! মায়াবী হাওয়ায় অবিশ্বাস ঘোরেফেরে।কবির অপেক্ষা দীর্ঘ হয়। বন্ধুত্বকেও আর তেমনভাবে স্পর্শ করতে পারেন না। সেখানেও ‘গূঢ় সাপ গুপ্ত শত্রুতা’য় বিরাজ করে। তখন কৈশোরের দিনগুলি মনের উঠোনে ফিরে আসে। রুটি-সেঁকা উনুনের পাশে কবির কিশোরবেলা বসে থাকে, পড়া করে, গল্প করে। বৃদ্ধ নিমগাছ দেখে কবির মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। এই ‘মনে পড়া’ ক্রিয়াটি সতত কবিকে চালিত করে। সর্বংসহা জননী শুধু কৃষ্ণা বসুর মা নন তখন, চিরন্তন মাতৃরূপেই সকলের কাছেই প্রতিভাত হন। ‘আমার’ সর্বনামটি বহুবচনত্ব পায়। কবি লেখেন:

“কিন্তু আমাদের মা আজও লন্ঠনের

মলিন আলোয় কাঁথা বুনে চলেছেন,

লাল নীল খয়েরি ফুলের ফোঁড়ে ফোঁড়ে

ভরে যাচ্ছে মায়ের গায়ের গন্ধমাখা

পুরোনো কাপড়, ভরে যাচ্ছে গেরস্থালি…”

    মায়ের গায়ের গন্ধমাখা পুরনো কাপড়ের গন্ধ আমরাও পাচ্ছি। আমাদের মায়েরও এমনি কাঁথা বোনা দেখতে পাচ্ছি—যদিও ঠিক মতো চিনতে পারি না আর, তবু গন্ধ তো পাই! এই কবিতা কি ভুলে যাওয়ার? আমরা আমাদের মাকে কি ভুলতে পেরেছি? কৃষ্ণা বসু জানেন ব্যক্তিহৃদয়েই বাস করে সমষ্টি। নিজের ছোট পৃথিবীতেই বৃহৎ জগৎ লুকিয়ে থাকে। সেইসব দৃশ্যপট , সেইসব চেতনা ও প্রবৃত্তিকেই তিনি কবিতা করে তোলেন। তাই তাঁর কবিতার ‘আমি’ এবং ‘আমরা’ সর্বনামে আমরা সকলেই মিশে যেতে পারি। ভালোবাসতে পারি, অন্তরে অনুভব করতে পারি, একক স্বরে বহু স্বরের উচ্চারণ টের পাই।

  তিন.

সমস্ত নারীরই বিরহ-বেদনা, দুঃখ-তাপ, মৃত্যু-যন্ত্রণা নিজ হৃদয়ে ধারণ করেই তিনি মহাকাব্যের আবহসংগীত রচনা করেছেন। যুগ-যুগান্তর ধরে চলে আসা তাঁর এই নির্মাণকলায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে যখন তিনি নারীকে শুধু বিদ্রোহিণী, স্বৈরিণী, পুরুষ-বিদ্বেষী করে না তুলে তাদের কল্যাণী, শুশ্রূষাময়ী, মমতাময়ী, প্রেয়সী ও জননী

 রূপে তুলে ধরেছেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে চিরদিনই অবহেলা ও অবজ্ঞা করা হয়। ভ্রূণহত্যা থেকে শুরু করে সদ্যোজাত কন্যার মুখে নুন দিয়ে, শস্যদানা দিয়েও মারা হয়। একা পেলে ধর্ষিতা হতে হয় মেয়েকে। শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে বিতাড়িতা হয়ে এলে বাপের বাড়িতেও জায়গা হয় না। ধর্ষিতা মেয়েকে হত্যা করে পুকুরের জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ঝি’র কাজ করতে আসা গ্রামের মেয়েটি বাড়িওলার ছেলের দ্বারা গর্ভবতী হলে কিছুই করার থাকে না। লাইনের ধারে রমণীর কাটা লাশ বিড়াল-কুকুরে খায়। স্বর্ণমুদ্রায় নারী বিক্রিও হয়। বৃদ্ধা মায়ের জন্য বৃদ্ধাবাস জোটে। কখনো পরিত্যক্তা হয়ে গ্রামেই থেকে বেঘোরে মৃত্যুবরণ করেন। মাটির মেয়ে শহরে এসে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতে থাকতে লজ্জিত ও বিবর্ণ হয়ে যায়। এইসব নারীর মিছিল দিনরাত সংসারে পোড়ে, কোথাও আন্তরিক স্পর্শ পায় না। ১৩ বছর বয়সে পুরুষের পাশবিক কামের শিকার হওয়া মেয়েটি সারাজীবন কী করবে? সেসব মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারও কবির ভাবনায় উঠে এসেছে। সব মিলিয়েই তাঁর কবিতা নারী জীবনের কতগুলো মৌলিক ও অমোঘ প্রশ্নের সম্মুখীন করে দেয়:

১) ‘পুরুষ’ শব্দের মানে ভয়ানক হবে

  সে জেনেছে তার এই সামান্য বয়সে।

২) মেয়েদের নিজের বাড়ি থাকে কোনোদিন?

৩) সভ্যতা আজো ততো সুসভ্য হয়নি!

৪)ধর্ষিতা যে মেয়ে কোন্ সুবিচার পায়?

৫)সদ্যোজাতের কী কোন সৎকার আছে?

৬) বল সর্বনাশী, কেন মজেছিলি সিন্দুর বিলাসে!

৭) স্বপ্নের ভিতর দিয়ে হেঁটে যায় নির্বোধ কৈশোর

৮) নিজেকে সিদ্ধ করে, নিজেকে যোগ্য করে, নুন ও মশলার সংশ্রবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেবে পাতে পাতে, কারো পাতে পড়বে তার হাত, কারো পাতে পেট ও মগজ, কারো জন্য তোলা থাকবে স্তব্ধ স্তন ও যোনি।

৯) পেরোতে পারি না এই গণ্ডি লক্ষ্মণের

   এভাবেই নারীর আর্তি বেজে উঠেছে, এখনো তা চলে আসছে সমানে পুরুষ শাসিত সমাজে। এই সমাজকেই কবি বলেছেন: ‘ওই অন্ধকার আমাদের সমাজ’। ম্লান নক্ষত্র হয়ে যতটুকু আলো দেওয়া যায়, সেই সামর্থ্য নিয়েই কবি কবিতার অস্ত্র তুলে নিয়েছেন হাতে। নিজের ভেতরে ‘কমলালেবুর মতো কোনো নারীর’ কেঁদে ওঠা শুনেছেন। অশ্রুলোভী হয়ে হাতও পেতেছেন। তীব্র অপমান বরণ করে নিয়েছেন। সেইসব উপলব্ধি থেকেই কবিতার নিবিষ্ট উচ্চারণ যা প্রাণের দোসর। সেইসব কবিতা থেকে সফল সুখী মানুষেরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তারা জীবনবীমার গল্প বোঝে, হাসিখুশি সুড়সুড়ি মাখা সিরিয়াল বোঝে, হর্ষদ মেহেতা বোঝে, কিন্তু কবিতা বোঝে না। কবি লেখেন:

“সুপ্রাচীন সুতীব্র আর্তিতে ভরা মায়াবী শিল্পের দিক থেকে

সম্পূর্ণ ফিরিয়ে পিঠ বেশ আছে সুসভ্য প্রজাতি।”

 কিন্তু কবি এই সুসভ্য প্রজাতির দলে পড়েন না, বলেই অনুভব করেন—

“জীবন আচ্ছন্নকরা বাঁশি বাজে যমুনা-পুলিনে।”

     এই জীবন আচ্ছন্নকরা বাঁশি যে মানবকৃষ্ণের বাঁশি, তার ব্যাপ্তি, গভীরতা, কালসীমাহীনতা এবং অমোঘতাকে লংঘন করা যায় না কবি তা বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর লেখায়।

     কিন্তু কৃষ্ণা বসু আশ্চর্য দক্ষতায় নারীর চিরন্তন মানবী রূপটি আবিষ্কার করেছেন যা অন্যকোনো নারী লেখিকার কলমে পাই না। পুরুষ দ্বারা অত্যাচারিতা, ধর্ষিতা, মৃতা নারীর মুখেও তার কল্যাণী রূপটি ম্লান হয়নি। পুরুষকে অভিশাপ দেয়নি সে, বরং প্রাণ দিয়েও প্রাণপ্রিয়কে সুখী ও পূর্ণ দেখতে  চেয়েছে। আসলে নারীর প্রেয়সী, জননী, সেবাময়ী প্রবৃত্তির যে মৃত্যু ঘটে না—কবি সে-কথাই বলতে চেয়েছেন। কবিতার কয়েকটি অংশ উল্লেখ করলে নারীর এই চিরন্তন আকুতির রূপটি উপলব্ধি করতে পারব—

১) দুঃখী রমণীর লাশ কাটা পড়ে আছে,

বিবর্ণ শাড়িতে তার এখনো লেগে আছে

শেষ শিশুটির মুখের গন্ধ,

মুঠিতে চেপে ধরা আশ্রয়ের নিশ্চিন্ত নির্ভর!

২) আবহমানের নারী, অপরূপা,সায় বণিকের মেয়ে,

প্রেমকে জাগাবি বলেই কলার মান্দাস বেয়ে বেয়ে

ভেসে যাবি কত দূর তুই?

৩) সাঁকোর কিনারে এসে আটকে আছে লাশ,

মেয়ে মানুষের লাশ;

আটকে আছে, বেরুতে পারছে না।

তার মুখ ফেরানো রয়েছে সন্তানের দিকে;

তার মুখ ফেরানো রয়েছে পুরুষের দিকে,

প্রহারে প্রহারে তাকে পর্যুদস্ত করে গেছে যে পুরুষ

তার মুখ ফেরানো রয়েছে তার দিকে।

    নারীর এই কোমল প্রবৃত্তি কখনো পাল্টায় না। প্রহার খেয়েও মুখ বুজে সহ্য করে থাকে তার ছেলেমেয়েদের জন্য। তাদের কে দেখবে? এই মমতাময়ী নারীর জন্য আমরা কখন আমাদের উদার করতে পারব? সব দোষ নারীদের ঘাড়ে চাপিয়ে পুরুষ নিশ্চিন্ত হতে চায়। রাম-রাবণের যুদ্ধ, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নাকি সীতা ও দ্রৌপদীর জন্যই ঘটেছিল। এমন ধারণা ভুল। কবি বলেন: “মহাযুদ্ধ হয়েছিল পুরুষের পৌরুষ বিস্ফারে, কে যে কত শক্তিমান, কার বাহুতে লুকানো আছে কতখানি বল” সেসব প্রদর্শন করতেই। নারী চিরদিনই পুরুষের কাছে তুচ্ছ। তাই পুরুষের মন জয় করতেই তার সারাজীবন কেটে যায়। তবু এই কাজে সাফল্য কি পাওয়া যায়? কবি লেখেন:

“কী খুঁজেছি, সার্থকতা কে দেবে কে বলো?

পুরুষতন্ত্র চক্ষু রাঙায়,ভিত্তি টলোমলো!”

   পুরুষতন্ত্র চক্ষু রাঙালে তো ভিত্তি কখনোই স্থির হতে পারে না, ফলে সম্পর্কও তৈরি হয় না প্রগাঢ় ভাবে । তখন ‘অনুচ্চারেই আলো ছড়ায় নিষ্কাশিত হেম।’ সারাজীবন ‘নিচু’ হয়েই থাকতে হয়, একটিবারও কিছুই বলা হয়ে ওঠে না। নারীজীবনের মর্মবাণী এভাবেই গভীরভাবে উঠে এসেছে কবিতায় সেই সতীদাহ যুগ থেকে আজকের নারীপণ্য যুগেও। কবি খোলাখুলি ভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন:

“সেইসব মেয়েদের কান্না রক্ত ঘাম

এই কলমে ভরেছি,—বলতে এসেছি।”

  সুতরাং জীবনযন্ত্রণার কথাতেই কবির কলম সচল। যুগ পাল্টালেও যন্ত্রণা পাল্টায়নি, মানুষ পাল্টালেও মানুষের প্রবৃত্তি পাল্টায়নি। তাই কবিরও মনে হয়েছে ‘নতুন কথা লেখা কঠিন’।


আরো পড়ুন: শারদ সংখ্যা গল্প: আমি ও তিনজন প্রেমিক । যশোধরা রায়চৌধুরী


    চার.

 

ছন্দোবদ্ধ পয়ার অক্ষরবৃত্তেই বেশিরভাগ কবিতা রচনা করেছেন কৃষ্ণা বসু। গদ্য রচনাতেও তাঁর নিজস্বতা চোখে পড়ার মতো। কবিতাকে ভালোবেসে তিনি আত্মার আত্মীয় করে তুলেছেন এই শিল্পটিকে। তাই কখনোই অবহেলা করেননি। আবার পূর্বপুরুষের সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যও তাঁর মধ্যে ছিল বলেই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই কবিতা এসে তাঁর হাতে ধরা দিয়েছে। কোনো কাব্যকেই আলাদা আলাদা ভাবে উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন, কারণ সমগ্র কবিকর্মেই একটা সাযুজ্য আছে। যে ভাবনা, যে জীবনদর্শন, যে ছন্দ, যে চেতনা নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন—তা তাঁর সমূহ সৃষ্টিতেই বিরাজ করছে। যেমন বিরাজ করছে গ্রাম ও শহর, আলো ও অন্ধকার, ব্যক্তি ও নৈর্ব্যক্তিক ভাবনা। অনবদ্য এক সারল্যের ঝিকিমিকি তাঁর কবিতার শব্দবোধে লেগে আছে। ছন্দের দোলুনির সঙ্গে ব্যঞ্জনার মেলবন্ধনে তা অপূর্ব সামঞ্জস্যপূর্ণ। ‘বারমাস্যা‘ লিখতে গিয়ে কবি প্রথমেই শুরু করেন:

“হাত জ্বলে যায়

       পা জ্বলে যায়

            ও বোশেখ তুই কি।

তুই কি আমার

        গত জন্মের

              নষ্ট ঠাকুর ঝি?”

তখন প্রাকৃতিক পরিবেশও মানুষের চরিত্রে কিভাবে ফুটে ওঠে বুঝতে অসুবিধা হয় না। কৃষ্ণা বসু যেন পরিবেশকেও কথা বলাতে পারেন, হাসাতে পারেন, কাঁদাতে পারেন। মানুষের প্রবৃত্তির সঙ্গে তার গভীর গভীরতর সম্পর্ক বেঁধে দিতে পারেন। তাঁর ক্ষীর-জ্যোৎস্না, ক্ষীর-প্রেম শব্দগুলি বড় প্রিয় বলেই কবিতায় ‘ক্ষীরের’ স্পর্শ ও স্বাদ দুটোই পায় পাঠক। আমাদের অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষাগুলি তৃষ্ণার্ত হলেই যেমন ঠান্ডা জলের প্রয়োজন হয়, তেমনি আমাদের স্বপ্নশূন্য হৃদয় রসদশূন্য সৈনিকের মতোই সুখাদ্য ক্ষীরের আহ্বান করে। কিন্তু কবির ‘ক্ষীর’ অপার্থিব রসদেপূর্ণ, স্রষ্টার মহিমায় ব্যঞ্জিত বস্তু—

“এখনো ক্ষীর হয়নি জমা ঠোঁটের কোণে লাল”

অথবা,

“দুধের বাটি থেকেই ঝরে ক্ষীরের মায়া খুব”

    আসলে সদর্থক জীবনকেই দেখেছেন বলে ঈশ্বর ও সৃষ্টিকে, সুন্দর ও শিবকে একই আসনে বসিয়েছেন কবি।

        কৃষ্ণা বসুর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি ভাবনা হল—এই সেবাদাসীর দেশে, এই নারী বিক্রির দেশে, এই দারিদ্র্য কালাহাণ্ডির দেশে প্রত্যেক রমণীর তিনি চেতনা ফেরাতে চান। চেতনার আলো ফেরানো সম্ভব একমাত্র শিক্ষার দ্বারা। তাই প্রত্যেকের হাতে তিনি শিক্ষার অস্ত্র তুলে দিতে চান। নিজেকে জানা, নিজেকে চেনার পথ তো এই শিক্ষাই। সেই কারণে কবিতাতেই এই মেসেজ তিনি দিতে চান—

“আমার এখানে আসবার কথা নয়

সংগোপনে তবু আমি এসেছি এখানে

সঙ্গে করে এনেছি শ্লেট-পেন্সিল,

ঈশ্বরচন্দ্রের লেখা বর্ণপরিচয়!”

এই বর্ণপরিচয়ই শেষকথা। আমাদের চেতনার কুসুমপ্রভাতে এই বইকেই যেন আমরা গ্রহণ করি। যারা লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখে ‘সিন্দুর বিলাসে মজেছে’ তাদের সিঁদুর যে রক্তাক্ত হয়ে প্রাণঘাতী হয়েছে ভালোবাসার পুরুষের হাতে তাও কবি দেখেছেন:

“বইখাতা, শ্লেট-পেন্সিল, বর্ণপরিচয় ফেলে রেখে

বল সর্বনাশী, কেন মজেছিলি সিন্দুর বিলাসে!”

সুতরাং শিক্ষা-ই সর্বাগ্রে প্রয়োজন। এই শিক্ষার মধ্যেই গড়ে ওঠে ‘নিজস্ব নির্মাণ’। সর্বদাই শিক্ষাকেই গ্রহণ করতে বলে বই-খাতা-শ্লেট-পেন্সিল এবং বর্ণপরিচয়কেই কবি ‘শ্রেষ্ঠদান’ বলে মনে করেন। কৃষ্ণা বসু এখানেও রবীন্দ্রনাথকে পাশে পেয়ে যান জ্ঞানের আলোক জ্বালাতে।

কৃষ্ণা বসু

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত