| 20 এপ্রিল 2024
Categories
ধারাবাহিক

ধারাবাহিক: একাকিনী শেষের কথা (পর্ব-১) । রোহিণী ধর্মপাল

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট
মহাভারতে মাধবীর কথা আমরা জানি। যিনি প্রতিবার পুরুষ সংসর্গ করার পর আবার কুমারী হয়ে যেতেন। স্বয়ং সত্যবতীও তো সেই বরই পেয়েছিলেন পরাশর মুনির কাছে। কিশোরী সত্যবতীর মেঠো রূপে যখন মুগ্ধ হয়েছিলেন পরাশর, মাঝনদীতে  নৌকোটি নিয়ে যেতে বলেছিলেন মেঝেনি সত্যবতীকে, এবং উপগত হয়েছিলেন সেই অসহ্য সুন্দর কালো মেয়েটিতে, বলেছিলেন “তুমি আবার কুমারী হয়ে যাবে”। কুন্তী যখন পুরুষ-আকর্ষক মন্ত্রটি ব্যবহার করে সূর্যদেবকে ডাকলেন, সঙ্গম করলেন, কুন্তীও সেই একই সুবিধা পেলেন। দ্রৌপদীর ক্ষেত্রে বরটি ছিল যে প্রতিবার, প্রতিটি স্বামীর সঙ্গে মিলনের পর তিনি কুমারী হয়ে যাবেন। বোঝাই যায় যে সেই সময় এমন কোনও পদ্ধতি ছিল, যা যোনিদেশের সঙ্কোচনকে দৃঢ় রাখত। শরীরী আকর্ষণ একই রকম প্রগাঢ় হলে তবেই প্রেম দীর্ঘস্থায়ী হয়। দ্রৌপদী ভালো করেই জানতেন এই কথা। পাঁচ পাঁচটি স্বামীকে নিজের দিকে আকর্ষিত করে রেখে দেওয়ার অন্যতম হাতিয়ার ছিল তাঁর নিজের দেহের অমোঘ আহ্বান।
কৃষ্ণা দ্রৌপদী। আদতে এক জঙ্গুলে কন্যা। নগরের পরিশীলিত লজ্জারুণ ভীরু নারী নন। দৃপ্ত বাঘিনীর মতো বন্য হার না মানা নারী তিনি। এমন নারীর কাছেই তো পুরুষ পদানত হয়। দ্রৌপদীর আকর্ষণ এক লহমার জন্য নয়। সেই ঝড় তছনছ করে দেয় পুরুষের হৃদয় আর শরীর। আর ঠিক সেই কারণেই কৃষ্ণ সবসময়ই চেয়েছিলেন অর্জুন দ্রৌপদীর থেকে দূরে থাকুক। দ্রৌপদীর নেশা নয়, অর্জুন আসক্ত থাকুক অন্য নারীতে, যাতে প্রয়োজন হলেই তাকে অস্ত্রের চালনাতে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, আশেপাশে অর্জুন থাকলে দ্রৌপদী অন্য ভাইয়ের প্রতি মনোনিবেশ করতে পারবেন না। অর্জুনও মানুষের রক্ত মাংসের স্বাদ পাওয়া বাঘের মতো দ্রৌপদীর জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকবেন। ভাইয়ে ভাইয়ে বন্ধন হালকা হয়ে যাবে। এ কখনও হতে দেওয়া যায় না। তাই অর্জুনের একা বারো বছরের বনবাস সেরে ফেরার পথে উপোসী অর্জুনকে কৃষ্ণ দিলেন বোন সুভদ্রার টোপ।
 হ্যাঁ। টোপই তো। বনবাস শেষে অর্জুনকে দ্বারকাতে নেমন্তন্ন জানালেন তিনি। সেখান থেকে বন্ধুকে নিয়ে গেলেন রৈবতক পর্বতে। যেখানে যাদবদের উৎসব  চলছিল। সবাই রঙিন মেজাজে, পানীয় হাতে, ফুরফুরে হয়ে নাচ গান করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সেইখানেই আচমকাই সুভদ্রার সঙ্গে দেখা। অর্জুন জানতেনও না, তাঁর এমন একটি মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া সুন্দর পিসতুতো বোন আছে। কৃষ্ণ কে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, “কে এই পরমাসুন্দরী মেয়ে? একে দেখে তো আমার হৃৎ স্পন্দন দ্রুত হয়ে গেল”! কৃষ্ণ জানতেন অর্জুন সুভদ্রাতে আকৃষ্ট হবেনই। খানিক বুনো, লড়াকু মেয়েই অর্জুনের বেশি পছন্দ। উলূপীও নাগকন্যা। তীব্র আশ্লেষী। বরং চিত্রাঙ্গদা রাজপ্রাসাদে বড় হওয়া রাজকন্যা। দ্রৌপদীর সঙ্গে সমানতালে কাউকে সঙ্গত করতে গেলে তাঁকেও দ্রৌপদীর মতোই লড়াকু হতে হবে। সুভদ্রা অনেকটাই সেই রকম। রথ চালাতে জানেন। তলোয়ার ঘোরাতে পারেন। হাত যেমন কোমল সুরভিত, প্রয়োজন হলে তেমন কষিয়ে ধরতে পারে রথের রশি। দ্বারকার ঘোড়াগুলি যেন সুভদ্রাকে চেনে। ওঁর হাতে পড়লে রথ হাওয়ার বেগে উড়ে যায়। মন্দিরে পুজো দিতে যায় যখন, চন্দনের তিলক কেটে, ফুলের সাজি হাতে, অগুরুর গন্ধ মেখে, তখন সেই রূপের চমকে যেন প্রকৃতিও থমকে যায়। এমন মেয়ে ঠিক পারবে অর্জুনের মন থেকে দ্রৌপদীর প্রতি আকর্ষণকে আটকে দিতে। সুতরাং যেই মুহূর্তেই কৃষ্ণ বুঝলেন, অর্জুন মুগ্ধ হয়েছেন, তিনি উঠেপড়ে লাগলেন সব ব্যবস্থা করতে।
অর্জুন তবু স্বয়ংবরের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু কৃষ্ণ রাজি হলেন না কিছুতেই। বললেন, “বলা তো যায় না! যদি সুভদ্রা তোমার বদলে আর কাউকে পছন্দ করে ফেলে? তুমি যত সুন্দরই হও না কেন, এমনটা তো হতে পারে। তাই না? সুতরাং তোমার যখন বোনকে এতোই মনে ধরেছে, ঝুঁকি নেওয়ার দরকার কী? তাছাড়াও তুমি বীর। ক্ষত্রিয়। জোর করে কন্যাহরণে কেউ তোমার নিন্দা করবেন না। স ত্বমর্জুন! কল্যাণীং প্রসহ্য ভগিনীং মম। হর স্বয়ংবরে হ্যস্যাঃ কো বৈ বেদ চিকীর্ষিতম্”।। (অধ্যায় ২১২, শ্লোক ২৩, আদি পর্ব)
 কৃষ্ণ নিজেই বেছে দিলেন রথ। একটি সোনা দিয়ে মোড়া রথ প্রস্তুত হল। তাতে রাখা হল প্রচুর অস্ত্র।  বাছলেন দ্রুতগামী দুটি তেজিয়ান ঘোড়া, শৈব্য আর সুগ্রীব। অর্জুনকে বলেই দিলেন, “সুভদ্রাকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে হবে তোমাকে। দাদা বলরাম কখনোই মেনে নেবে না তোমাকে। আর তুমি এখনই দূত পাঠাও যুধিষ্ঠিরের কাছে। সুভদ্রাকে নিয়ে তুমি সোজা ইন্দ্রপ্রস্থে উঠবে। সেখানে যেন সুভদ্রার কোনও রকম অসুবিধে না হয়”। এমনকী, কবে কখন কোথা থেকে সুভদ্রাকে অপহরণ করবেন অর্জুন, সেও স্থির করে দিলেন তিনিই। কৃষ্ণের মনে শুধু একটাই চিন্তা, কৃষ্ণার অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ থেকে অর্জুনকে দূরে রাখতে হবে।

আরো পড়ুন: ধারাবাহিক: একাকিনী (পর্ব-১৬) । রোহিণী ধর্মপাল


দ্রৌপদী মনে মনে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। বারো বছর শেষ হতে চলেছে। অর্জুন ফিরলে কথাই হয়ে আছে যে তিনি থাকবেন এক বছর অর্জুনের সঙ্গে। দিন রাত যেন সেই স্বপ্নেই বিভোর হয়ে আছেন তিনি। হ্যাঁ। উলূপী আর চিত্রাঙ্গদার খবর তিনি জানেন। দুঃখ পেয়েছিলেন ঠিকই। রাগও হয়েছিল। কিন্তু নিজেকে বুঝিয়েছিলেন যে এই দুই নারীই পথে বিবর্জিতা। তারা অর্জুনের ক্ষণিকের সঙ্গী। এই দুজনকে নিয়ে তিনি ভাবেন না। তিনি জানেন অর্জুন যখন ফিরবেন, তাঁর দুই বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরবেন, অর্জুন সব ভুলে যাবেন। তিনিই একমাত্র হবেন অর্জুনের জীবনে। প্রতি দিন প্রতি মুহূর্তে গুনে যাচ্ছেন তিনি। অধীর হয়ে। তাঁর এই ব্যাকুলতা যে যুধিষ্ঠিরের চোখে পড়ছে, এবং তিনি ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ছেন, তা খেয়াল করার মতো অবস্থা তাঁর ছিল না।
যুধিষ্ঠির যখন শুনলেন দ্বারকা থেকে দূত এসেছে, তিনি সোৎসাহে উঠে দাঁড়ালেন। নিশ্চয়ই অর্জুনের খবর নিয়ে এসেছে দূত। দূত এসে আভূমি নত হয়ে চিঠি দিল যুধিষ্ঠিরের হাতে। খবরটি পড়ে যুধিষ্ঠির খানিক চুপ করে রইলেন। মনে মনে তাঁর খানিক অদ্ভুত আনন্দ হল। এই ভেবে যে দ্রৌপদী অর্জুনকে পাওয়ার জন্য যে অস্থির হয়ে আছেন, কোনও দিন তাঁদের জন্য সেই ব্যাকুলতা তো দেখেন নি! এবার অর্জুনের থেকে ধাক্কা খেলে যদি দ্রৌপদীর মন একটু টলে! চিঠিতে অর্জুন যুধিষ্ঠিরের অনুমতি চেয়েছিলেন। যুধিষ্ঠির সানন্দে অনুমতি দিলেন। তাঁর মনে তখন একটাই চিন্তা খেলা করছে যে এই মেয়েটি, সুভদ্রা, কৃষ্ণের বোন। সহজ মেয়ে নন। নিশ্চয়ই রূপে গুণে দ্রৌপদীর সমকক্ষ না হলেও কাছাকাছি। আর অর্জুন হবেন তাঁর একমাত্র। তিনিও অর্জুনের একমাত্র। ভাগ করে নেওয়া দ্রৌপদীর থেকে সুভদ্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অর্জুনের অনেক বেশি হবে। এইবার দ্রৌপদী বুঝবেন, যাঁর অপেক্ষায় তিনি বারবার যুধিষ্ঠিরের প্রেমকে খানিক হলেও অবহেলা করেছেন, তিনিই দ্রৌপদীর বদলে অন্য নারীতে আসক্ত। দ্রৌপদী ভেবেছিলেন অর্জুনও তাঁর মতোই অপেক্ষা করে আছেন তাঁকে কাছে পাওয়ার জন্য। তিনি ভেবেছিলেন অর্জুনের প্রতি তাঁর যে পক্ষপাত, তা তো স্বাভাবিক। অর্জুন তাঁর প্রথম প্রেম, অর্জুন তাঁর সবটা। অন্যরা তো পরে। তাঁরা নিশ্চয়ই বুঝবেন তাঁর মনের কথা। কিন্তু তিনি ভুল করেছিলেন একটা ক্ষেত্রেই। পুরুষও তো নারীর মতোই ঈর্ষুক, এই কথাটা খেয়াল করেননি। আসলে পুরুষকে তো ভাগ করে নিতে হয় না। পুরুষ সবসময়ই গোটাটা পান। সেরাটা পান। অন্য পুরুষের সঙ্গে স্ত্রীকে ভাগ করে নিতে হলে, সে যদি নিজের ভাইও হয়, পুরুষের মনে ঈর্ষা তৈরি হয়। যুধিষ্ঠিরেরও হয়েছিল। আর কৃষ্ণের ছিল অন্য উদ্দেশ্য। তিনি প্রথম থেকেই একটা পক্ষ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যাঁর প্রধান হবেন পঞ্চপাণ্ডব। তিনি হবেন তাঁদের মূল পরামর্শদাতা। দুর্যোধন থাকলে তা কখনও সম্ভব নয়। জরাসন্ধ তাঁর বহুদিনের শত্রু। দুর্যোধন জরাসন্ধ কর্ণ ভগদত্ত সোমদত্তের যে বিরাট শক্তিশালী গোষ্ঠী, তাকে ভাঙতে হবে। তার জন্য অর্জুন তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সেই অস্ত্রকে প্রেমের মায়ায় ভোঁতা হতে দিলে চলবে না।
তাছাড়া আরও কি কারণ ছিল না? দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় প্রথম যখন তাঁকে দেখলেন কৃষ্ণ?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত