| 5 মার্চ 2024
Categories
কবিতা সাহিত্য

তৈমুর খানের গুচ্ছকবিতা

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট
 
 
 
ঢেঁকি
 
আমাদের ঢেঁকি এখনও ধান ভানে
জল কাদা বর্ষাকাল চিৎকার
পাড়াপ্রতিবেশীদের কলহবিবাদে
ঢেঁকিটি এখনও অবিরাম ওঠে নামে
 
ধানকল ধোঁয়া সভ্যজগৎ শহর
সব পেছনে ফেলে সনাতন ঢেঁকি
মুখ বুজে পড়ে থাকে, দাঁতে দাঁত চেপে
সভ্যতার অনেক চাল বের করে দেয়
 
যুবতীর আলতা পরা রাঙা পা দু’খানি
ঢেঁকিকে দোলায় এসে, শিবের গীত গেয়ে
রাত পার করে, তুষগুলি উড়িয়ে দেয়
কুলোর বাতাসে।
 
আমাদের ঢেঁকিছাঁটা দিন
কিছুটা কুয়াশা মেশালে সব অস্পষ্ট হয়ে যায়
ছবিগুলি ভেসে ওঠে স্মৃতির গভীর জলে
আমরা সীমানা এঁকে রাখি, বাহ্যত কৌশল
সব জানে আমাদের ঢেঁকি, নারদসমাচার…..
 
 
 
 
 
কুহকিনী
 
হাত দুটি পত্রপুষ্পশোভিত
অরণ্য থেকে আসে
বুকখানা নরম পাহাড়
মুখে চুম্বনের ঝরনা হাসে
তোমাকে নদী বলে ডাকি
নৌকা তোমার গান
সারারাত আমি হই মাঝি
শব্দতরঙ্গে অভিযান
অনুভূতির জ্যোৎস্নায়
শয্যা পেতে দেয় মরমিয়া
বোধের দরোজা দিয়ে ঢোকে
কিছু কিছু গূঢ় পরকীয়া
চুলগুলি উড়ে আসে
মোহিনী কাশের দ্বীপে ঢেউ
পাখির গুঞ্জনে শিঞ্জিনী
চুপিচুপি ডাক দেয় কেউ…..
 
 
 
 
বীর
 
দু একটি বীর যুদ্ধ থেকে ফেরে
তারপরে সব স্ট্যাচু হয়ে যায়
রাতের অন্ধকারে
 
ঘোড়া থেমে যায়
তরবারি শুধু প্রদর্শনী বোঝে
ইতিহাস থেকে অন্য ইতিহাসে
সভ্যতা আলো খোঁজে
 
এই রাস্তায় একটু দাঁড়িয়ে দেখি
স্ট্যাচুর মাথায় চাঁদ নামে নাকো
নামে কল্পনার পাখি
 
 
 
 
 
বসন্ত
 
দাঁড়ানো যাবে না পাশে
ইচ্ছেগুলি তবুও দাঁড়াতে চায়
রোজ একা একা বাঁশি বাজে
এমন নীরব বাঁশি কে এসে বাজায়?
 
রাষ্ট্রবাদী ঘোর তমসায়
সম্পর্কগুলি কোথায় হারাল?
কেবল মানব-ছায়ার গাছ
কেবল মানব-বাগান
এ ছাড়া আর কী থাকে আমাদের?
 
ঘরের দরজায় তুমি
আমিও দরজায়
মাঝখানে চেতনার রাস্তাগুলি
রাস্তায় নিরীহ আবেগ
আবেগের স্পর্শে জেগে ওঠে
অনুভূতির পাখিগুলি
 
যে কোনোদিন বসন্ত আনা যায়
যে কোনোদিন রঙিন সকাল
 
 
 
 
 
জল ঢেলে দাও মেঘ
 
সব আকাঙ্ক্ষা পোড়ালাম
এখন কোথায় ফেলব ছাই ?
মেঘ বার্তা দিয়ে গেছে ভাসিয়ে দেবে শব
এইসব ভোর আর ভোরের কলরব
 
দাঁড়িপাল্লা ফেলে দিয়েছি
রক্তে ব্যথা লুকিয়ে রাখিনি
শূন্য বলের মতো শুয়ে আছি
গড়ালেই গড়ে যাব যেদিকেই যাওয়া যায়
অথবা পেয়ে যাব যা কিছু পাওনা অভিশাপ
 
নীল কলেবর হরিণ ছুটে যাচ্ছে
সিংহনাদ যদিও ঘুমাচ্ছে স্মৃতির অরণ্য জুড়ে
বাতাস উড়িয়ে দিচ্ছে বাতাসি শিস
আমি তো তাকাইনি ফিরে ফিরে
নিভে যাওয়া আগুনেই খুঁজিনি সত্য শিব
 
জল ঢেলে দাও মেঘ, খুলে রাখো তোমার উষ্ণীশ
 
 
 
জেব্রা
 
ঘাস খেতে খেতে, ঘাস খেতে খেতে এই ঘাসজীবনে কখন জেব্রা হয়ে গেছি
 
চারিপাশে সার্কাস বসেছে
গ্যালারি ভর্তি হাসাহাসি
আর হাততালির ফোয়ারা
নিজের দিকেই তাকাতে পারছি না ।
ছুটব না হাঁটব ?
সোজা হব না তির্যক দাঁড়াব ?
মাথা উঁচু না মাথা নীচু ?
কী করব বুঝতে পারছি না ।
লাল নীল আলো জ্বলে উঠছে
হাতির বৃংহণ , ঘোড়ার হ্রেষা
আর বাঘের গর্জন আসছে
দু একটা জোকারের উল্লম্ফন
দেখতে দেখতে উদাস হয়ে গেছি ।
কী খেলা দেখাতে হবে আমাকে আজ ?
ভুলে গেছি, ভুলে গেছি, ভুলে গেছি সব !
 
 
 
 
বজ্রগর্ভ
 
এইসব কানাঘুষো মেঘ
বৃষ্টি দেয় না , শুধু বজ্রের আবেগ
মাখামাখি পীড়াপীড়ি সান্ধ্যঘুমে কাৎ
বাজার বসে না , তবু হয় বাজার মাৎ
কাননের ফুলগুলি কন্যাসম ফোটে
মাছিরা মৌমাছি হয়ে যায় মধু চেটে
হরতন রুইতন গানে পাড়াপ্রতিবেশী
শরম ত্যাগ করে কামুক সন্ন্যাসী
প্রস্থ মেপে , দৈর্ঘ্য মেপে গৃহ হয় ঘর
শামুক যন্ত্রণা থেকে নামে স্বয়ম্বর
জলকাদায় ভরা রাস্তা গুমোট প্রহর
কণ্ঠে তবু কণ্ঠ মেলায় কূজন কুহর
নিজের আস্তাবলে আজ নিজেই অবাধ্য
সিদ্ধি নেই , নিধি নেই , মূর্খের আরাধ্য
 
 
 
নির্বাসনের হুইসল
 
 
প্রেমের রাস্তা খুঁজতে খুঁজতে সন্ধে হয়ে এল
এই অন্ধকারে সব নির্জন গ্রাম্য স্টেশনে
আলো জ্বলে গেছে
 
কোনটা প্রেমের ট্রেন ? কোন দিকে যাবে ?
 
কেউই বলতে পারে না –
 
কোনও কোনও জানালায় কিশোরী রাই
কোনও কোনও জানালায় নিমাই সন্ন্যাসী
 
স্টেশনেই হয়তো আমার রাত কেটে যাবে
কেউ জিজ্ঞাসা করবে না কুশল
কেউ ভিক্ষা দেবে নাকো প্রেমে অন্ধ ভিখিরিকে
শুধু নির্বাসনের হুইসল বাজবে
 
ট্রেন চলে যাবে ছেড়ে
দূরে, বহুদূরে…..
 
 
 
 
 
 
আমি মানুষ হতে ভুলে যাচ্ছি
 
আমি দুধভাত খেতে চাইনি
তবু কেউ কেউ তোমরা বলেছ সুখসন্ধানী
 
আমি হাতের মুঠোয় নিতে চাইনি চোখঝলসানো রমণী
তবু কেউ কেউ তোমরা বলেছ সুযোগসন্ধানী
 
দুরুদুরু বুক কেঁপে উঠেছে আমার
চোখের সামনে উড়ে এসেছে মুঠো মুঠো ছাই
মানুষ মারার এত তরবারি কখনও দেখিনি আগে
অপমানকে তোমরা বসতে বলেছ
তার সামনে আমাকে ডেকে
 
কাদের হৃদয়ে এত ফণিমনসা জন্মায়?
এই সন্ধেবেলা আমি মানুষ হতে ভুলে যাচ্ছি
পৃথিবীটা ভাবছি শুধু একটি পান্থশালা !
 
 
 
 
ভয়
 
কোথায় বসাব ওকে? এত কম্পনের পর
কথা হারিয়ে গেছে; বিষণ্ণ ফ্যাকাসে মুখে
জমেছে আঁধার।
হাত নেই, পা নেই, নেইকো কুশল-সমাচার
তবুও এসেছে আজ!এপাড়া করছে তোলপাড়।
আমাদের মৃতদেহগুলি আমরা লুকাচ্ছি একে একে
আমাদের মরে-যাওয়াগুলি যেন কেউ না দ্যাখে।
সত্য-ন্যায়ের পুলিশ কে কোথায় আছে?
চারিপাশে অবিশ্বাস আমাদের ঘিরেছে।
কিছুতেই বেরনো যাচ্ছে না রাস্তায়
ভালোমানুষের মতো মুখ ঢেকে আছে ভয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত