| 21 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ধারাবাহিক

ইরাবতী ধারাবাহিক: খোলা দরজা (পর্ব-২৩) । সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

গানের ক্লাসের হারমোনিয়ামটি বাক্সে রাখা থাকত।মাষ্টারমশাই ক্লাসে এলে একটু বড় চেহারার মেয়েরা সেটি বাক্স থেকে বার করে টেবিলে রাখত। আমরা বসতাম মেঝেতে পাতা  সতরঞ্চীতে।আমরা মানে যেকোন ক্লাসের একটি সেকসানের চল্লিশ জন মেয়ে।

মাষ্টারমশাই চোখে দেখতে পেতেন না বলে তাঁর একজন সহায়ক ছিল।তিনি এসে তাঁকে ক্লাসে বসিয়ে দিয়ে যেতেন। ঘন্টা বাজতে না বাজতেই আমরা লাইন করেই দৌড় দিতাম। কে সামনের সারিতে বসবে তাই নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা চলত।

মাষ্টারমশাইএর নিখুঁত আঙুল চালনায় হারমোনিয়াম বেজে উঠত গম্‌,গম্‌ করে।আমরা গাইতাম “আজি শুভদিনে পিতার ভবনে   অমৃতসদনে চলো যাই,”….।

ওই ক্লাস ছিল আমাদের মুক্তির বারান্দা। স্কুলের ব্যাকরণ,ভূগোল,অঙ্কর কচকচির মধ্যে মাস্টারমশাই আর হারমোনিয়ামের মেলবন্ধনে ওই মুক্তি ছড়িয়ে পড়ত ক্লাসের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরের উঠোনে,মাঠের ঘাসে ঘাসে।

“আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ,ঘাসে ঘাসে….।”

বলাবাহুল্য গানের ক্লাসের দিন খুব অসুবিধায় না পড়লে কেউ স্কুল কামাই করত না।

এখন মাঝেমাঝে মনে পড়ে সেই গানের ক্লাসের কথা।নিজেদের ক্লাস থেকে ওই ক্লাসে যাবার সময় আমাদের লাইন করতে হত।একদম প্রথমে দাঁড়ানোর জন্য ঠেলাঠেলি চলত।সবটাই একটা খেলার মত। ক্লাসের একটু আগেই লাইন ভেঙে জলস্রোতের মত আমরা ঢুকে পড়তাম ক্লাসে।হয়ত তারপরেই সমস্বরে গাইতাম, “ওই এলো এলো এলো রে দস্যুর দল,গর্জিয়া ওঠে যেন বন্যার জল…”

মাষ্টারমশায়ের কালো চশমার আড়ালে ঢাকা চোখদুটো কোনদিন দেখিনি।কিন্তু হারমোনিয়ামে ওনার হাতের দুরন্ত গতি দেখে মনে হয়েছে, কিকরে একদম না দেখে উনি হাতে ওইরকম ঝড় তোলেন?হারমোনিয়ামের রিডে সেই নির্ভুল আঙুলের সুর তোলা কি ভোলা যায়?

‘হারমোনিয়াম’ নামের একটা সিনেমা হয়েছিল।তাতে উৎপল দত্তকে দেখেছিলাম। সিনেমাটির সবকিছুই এখন আবছা আবছা মনে পড়ে। গভীরভাবে শুধু মনে আছে একটি হারমোনিয়ামের কথা,আর উৎপল দত্তের সেই বিখ্যাত হাসিমাখানো চাহনির কথা।

তখনকার বাংলা সিনেমায় মধ্যবিত্ত বাড়িতে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতেন নায়ক বা নায়িকা আর একটু উচ্চবিত্ত বাড়িতে তারাই আবার বড় পিয়ানো বাজিয়ে গানের সুর তুলতেন।রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে তানপুরায় সুর বেঁধে অনেকেই গাইতেন।উঁচুক্লাসে গানের পরীক্ষা দিতে গেলে তানপুরার ব্যবহার করতেই হত।সেসব মনে আছে।

কিন্তু হারমোনিয়ামের বদলে পিয়ানোর চলনের আধুনিকতা এই নজরে এলো।আমার এক দিদির গানের স্কুলের অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি একদম ছোট একটি মেয়ে খালি গলায় গান করল,আর তার মা গানের সঙ্গে পিয়ানো বাজালেন।না ওইরকম টেবিল পিয়ানো নয়।পিয়ানোটি ক্যাসিওর থেকে বড়,তবে হাতে করে বওয়া যায়।মেয়েটি নাকি পিয়ানোতেই গান গায়।



পরে সেই দিদির গানের ক্লাসে গিয়ে দেখি একটি ওইরকম পিয়ানো বসানো আছে।

আমি অবাক! “তুমি তো আগে হারমোনিয়ামে শেখাতে,এখন কি পিয়ানোতেই শেখাও?”

“কী করব? যে যুগে যা চলে।কাউকে কাউকে এভাবেই শেখাতে হয় বলে আমি শিখে নিয়েছি নিজে নিজে।”

আমার একটু হলেও চিন্তা হল।আমাদের সেই হারমোনিয়ামের স্বর্ণযুগ কী তাহলে শেষ হয়ে গেল?

আমাদের কনি পিসি ছিলেন বড়ই সুন্দরী।তার বিয়ের বাসরে আমাদের মত কুঁচো কাঁচার দল কিকরে যেন ঢুকে পড়েছিল।ঘুমে চোখ ঢুলু ঢুলু, তারই মধ্যে দেখি নতুন বর তার মিষ্টি সুরেলা গলায় গান ধরেছেন।একের পর এক শ্রদ্ধেয় রফি, কিশোর, মান্নাদের হিট গানগুলো করছেন তিনি।


আরো পড়ুন: খোলা দরজা (পর্ব-২২) । সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়


হারমোনিয়াম রয়েছে  কনে বউএর দখলে।তিনি হারমোনিয়ামে ভারী দক্ষ।তাই যেকোন গানের সুর অনুযায়ী অবলীলায় বাজিয়ে চলেছেন।কনি পিসি গাইলেন শেষ রাতে।ওনার গলায় নজরুল গীতি ভাল লাগত।

সেদিন হারমোনিয়াম বাজিয়ে শুরু করলেন, “মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর” গাইতে। আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম চোখ বুজে হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন।একের পর এক গানে বলাবাহুল্য কনের বাড়ির সুনাম রক্ষা করলেন তিনি।আর সেই নবদম্পতির সুরের বাঁধনে চিরকালের মত বাঁধা পড়লাম আমরাও।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত