irabotee.com,কড়ি

ইরাবতী ইতিহাস: কড়ি কাহিনি । জয়ন্ত ভট্টাচার্য

Reading Time: 4 minutes

কড়ি এক ধরণের মৃত সামুদ্রিক শামুকের (বৈজ্ঞানিক নাম: সাইপ্রিয়া মনেটা) খোল, যা মূলত ভারত মহাসাগরে পাওয়া যায়। এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে মধ্যযুগে কড়ি বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হত। সাধারণাব্দের ষোড়শ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপ এবং আফ্রিকার মধ্যে যে দাস ব্যবসা চলত, তার একটা বড় অংশ হত কড়ির মাধ্যমে। প্রায় দুই সহস্রাব্দ ধরে কড়ি বাংলায় বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ, বাংলা বা তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কড়ি পাওয়া যায় না, মালদ্বীপ থেকে ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপথে কড়ি বাংলায় আমদানি করা হত। চতুর্দশ শতকের মরক্কোর পর্যটক ইবন বতুতা মালদ্বীপ ভ্রমণের সময় দেখেছেন, মালদ্বীপের অধিবাসীরা কড়ির বিনিময়ে বাংলা থেকে আমদানি করা চাল কিনতেন। ষোড়শ শতকের শেষদিক থেকে পর্তুগিজ বণিকরা ভারত মহাসাগরে বাণিজ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করার পর মুখ্যত পর্তুগিজরাই বাংলায় কড়ি আমদানি করত।

প্রাচীন বাংলায় বিনিময় মাধ্যম হিসাবে কড়ির প্রচলন কবে শুরু হয়েছিল তা বলা কঠিন। সম্ভবত প্রাচীন যুগে, কাশ্মীর থেকে অসম পর্যন্ত সমস্ত উত্তর ও পূর্ব ভারতে কড়ি মুদ্রা হিসাবে ব্যবহৃত হত। কড়ি নিয়ে বাংলার প্রবাদ ও প্রবচন, যেমন, ‘ফেলো কড়ি, মাখো তেল’ এবং এককড়ি, দুকড়ি, তিনকড়ি, পাঁচকড়ি বা সাতকড়ি নামগুলি আজও বাংলায় মুদ্রা হিসাবে কড়ির গুরুত্বের সাক্ষ্য বহন করছে। অষ্টম শতকে পাল রাজবংশের রাজত্বকালে বাংলায় সোনার মুদ্রা প্রায় অবলুপ্ত হয়, রূপো ও তামার মুদ্রার কিছু প্রচলন তখনও ছিল। নবম শতকের মাঝামাঝি আরব বণিক সুলেইমান তাঁর ‘সিলসিলাত উত-তাওয়ারিখ’ গ্রন্থে জানিয়েছেন, সেই সময় কড়িই ছিল বাংলায় বাণিজ্যের একমাত্র মাধ্যম, বাংলার প্রধান মুদ্রা। সেন রাজবংশের আমলে বাংলার অধিকাংশ অঞ্চলে একমাত্র কড়ি ছাড়া আর কোনও বিনিময় মাধ্যমের অস্তিত্ব ছিল বলে মনে হয় না। অবশ্য, প্রায় একই সময়ে বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলবর্তী অঞ্চলে চন্দ্র বংশীয় রাজাদের শাসনাধীন হরিকেল রাজ্যে রূপোর মুদ্রার বহুল প্রচলন ছিল।

সেন যুগের একাধিক তাম্রশাসনে ‘পুরাণ’ ও ‘কপর্দক পুরাণ’ নামের মুদ্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। এইসব মুদ্রার কোনও অস্তিত্ব আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সংস্কৃত ‘কপর্দক’ শব্দটি থেকে বাংলা কড়ি শব্দটির উৎপত্তি। খুব সম্ভবত, ‘পুরাণ’ ও ‘কপর্দক পুরাণ’ এই দুই রৌপ্যমুদ্রার নাম শুধু গণনার প্রযোজনে ব্যবহৃত হত, বাস্তবে বিনিময় হত কড়ির মাধ্যমে। মিনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর ‘তবকাত-ই-নাসিরি’ (১২৫৯ সাধারণাব্দ) গ্রন্থে লিখেছেন, লক্ষ্মণসেনের আমলে রূপোর মুদ্রার বদলে কড়ি ব্যবহৃত হত এবং লক্ষ্মণসেন ১ লক্ষ কড়ির কমে কোনও দান করতেন না।

গণিতবিদ ভাস্করাচার্য, তাঁর ১১৫০ সাধারণাব্দে লেখা ‘লীলাবতী’ (১.২) গ্রন্থে তৎকালীন বিভিন্ন মুদ্রার মধ্যে বিনিময় হার সম্বন্ধে জানিয়েছেন:

“বরাটকানাং দশকদ্বয়ং যৎ সা কাকিণী তাশ্চ পণশ্চতস্রঃ।

তে ষোড়শ দ্রম্ম ইহাবগম্যো দ্রম্মৈস্তথা ষোড়শভিশ্চ নিষ্কঃ।।”

অর্থাৎ, ২০ বরাটক (কড়ি) = ১ কাকিণী; ৪ কাকিণী = ১ পণ; ১৬ পণ = ১ দ্রম্ম; ১৬ দ্রম্ম = ১ নিষ্ক। কাকিণী তামার মুদ্রা, পণ ও দ্রম্ম রৌপ্যমুদ্রা এবং নিষ্ক স্বর্ণমুদ্রা। অনুমান করা যায়, ‘লীলাবতী’ গ্রন্থে ১ রৌপ্যমুদ্রার (দ্রম্ম) মূল্য ১২৮০ কড়ি বলে যে উল্লেখ করা হয়েছে, তা সম্ভবত ঐ সময়কার বা তার আগেকার মূল্য।

সেনযুগে কেন সোনা, রূপা ও তামার মুদ্রা বাংলা থেকে বিলুপ্ত হল আর কড়ি একমাত্র বিনিময় মাধ্যমে পরিণত হল? আধুনিক গবেষকদের মধ্যে অনেকের অনুমান, এই সময় বাংলার সমুদ্রপথে বৈদেশিক বাণিজ্য হ্রাসের ফলে সোনা ও রূপার মুদ্রার অভাব দেখা দিয়েছিল। এই অনুমান সম্ভবত সঠিক নয়। কারণ কড়ি ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যের সূত্রেই বাংলায় আসত। কোন কোন আধুনিক গবেষক আবার অনুমান করেন কড়ির ব্যাপক প্রচলনের মূল কারণ, এই সময় বাংলার বাণিজ্যের সিংহভাগ ছিল বর্তমান চিনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে, আর এই বাণিজ্যের মাধ্যম ছিল কড়ি, যা কিনা এই দুই স্থানেই মুদ্রা হিসাবে ব্যবহৃত হত।


আরো পড়ুন: ইরাবতী ইতিহাস: জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা । জয়ন্ত ভট্টাচার্য


বখতিয়ার খলজির আক্রমণে বাংলায় সেন বংশের রাজত্বের অবসানের পর থেকে মুঘল অধিকার পর্যন্ত প্রায় চার শতক (১২০৫ – ১৫৩৮ সাধারণাব্দ) বহিরাগত ও স্থানীয় সুলতানরা বাংলা শাসন করেন। এই সময় খাদ মেশান রূপার মুদ্রা টঙ্কার (এই ‘টঙ্কা’ থেকেই আধুনিক বাংলা ভাষায় ‘টাকা’ এসেছে) প্রথমে স্বল্প ও পরে ব্যাপক প্রচলন হলেও সাধারণ প্রজাদের বিনিময় মাধ্যম হিসাবে কড়ির ব্যবহার সমানভাবে চলতে থাকে। বাংলায় রূপো পাওয়া যায় না। সুলতানি আমলে প্রধানত বর্তমান মিয়ানমার ও চিনের ইউনান প্রদেশ থেকে বাংলায় রূপো আমদানি করা হত।এই কালপর্বের বাংলায় সোনা ও তামার মুদ্রার ব্যবহার প্রায় ছিল না বললেই চলে। বাংলার স্বাধীন সুলতান গিয়াস-উদ্দিন আজম শাহের (রাজত্বকাল ১৩৮৯ – ১৪১০ সাধারণাব্দ) রাজত্বকালে আগত চিনের মিং রাজবংশের দূত মা হুয়ানের বর্ণনা অনুযায়ী, তৎকালীন বাংলায় বৃহৎ বাণিজ্যিক লেনদেনের জন্য রূপোর টঙ্কার ব্যবহার হত আর খুচরো ক্রয়বিক্রয়ের জন্য ব্যবহার হত কড়ি। ১৫৩৮ সাধারণাব্দে শের শাহ সুরি বাংলা জয় করেন। ১৫৪২ সাধারণাব্দে শের শাহ সুরি নতুন বিশুদ্ধ রূপার মুদ্রা ‘রূপয়া’ চালু করেন। ১৫৭৬ সাধারণাব্দে মুঘল বাদশাহ আকবরের সেনা আফগান শাসক দাউদ শাহ করনানিকে পরাস্ত করে বাংলা জয় করে।মুঘল আমলে সোনা, রূপো ও তামার মুদ্রার প্রচলন বাড়লেও কড়ির প্রচলন বন্ধ হয়নি। ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত স্থানীয় বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে কড়ির ব্যবহার হয়েছে। সুলতানি আমল,আফগান শাসন, মুঘল আমল, নবাবী আমল, এমনকি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালের সূচনাকাল পর্যন্ত বাংলায় ভূমিরাজস্ব মুদ্রার বদলে কড়িতে দেওয়া যেত। এই সময়, বাংলায় যাঁরা দস্তুরি নিয়ে কড়ির সঙ্গে সোনা বা রূপোর মুদ্রার বিনিময় করতেন তাঁদের বলা হত ‘পোতদার’ বা ‘পোদ্দার’।

বাংলায় সুলতানি আমল, আফগান শাসন, মুঘল আমল, নবাবী আমল ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে কড়ির সঙ্গে রূপোর মুদ্রার সম্পর্ক ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে। ষোড়শ শতকে রঘুনন্দন ভট্টাচার্য তাঁর ‘প্রায়শ্চিত্ততত্ত্ব’ (৫৯) গ্রন্থে জানিয়েছেন:   

“অশীতিভির্বরাটকৈঃ পণ ইত্যভিধীয়তে।

তৈঃ ষোড়শৈ পুরাণং স্যাৎ রজতং সপ্তভিস্তু তৈঃ।।”

অর্থাৎ, ৮০ বরাটক (কড়ি) = ১ পণ; ১৬ পণ = ১ পুরাণ; ৭ পুরাণ = ১ রজত। এক কথায় ১ রজত = ৮৯৬০ কড়ি। বাস্তবেও এই সময় বাংলার রৌপ্যমুদ্রা টঙ্কার মূল্য এর প্রায় কাছাকাছি ছিল। ষোড়শ শতকের শুরুতে ১ টঙ্কার মূল্য ছিল ৯০০০ কড়ি। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি ১ টঙ্কার মূল্য বেড়ে হয় ৯৬০০ কড়ি। ষোড়শ শতকের শেষে আবু’ল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে ওড়িশার তৎকালীন প্রচলিত মুদ্রাগুলির মধ্যে যে বিনিময় মূল্যের উল্লেখ করেছেন, তা হল, ৪ কড়ি = ১ গন্ডা; ৫ গন্ডা = ১ বুড়ি; ৪ বুড়ি = ১ পণ; ১৬ বা ২০ পণ = ১ কাহন এবং ১০ কাহন = ১ রূপয়া (মুঘল রৌপ্যমুদ্রা)। অর্থাৎ, এই সময় মুঘলদের প্রচলিত ১ রূপয়ার মূল্য ছিল ১২৮০০ বা ১৬০০০ কড়ি।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অষ্টাদশ শতকের শেষদিক থেকেই পূর্ব ভারতে কড়ির বদলে তামার মুদ্রার প্রচলনের সূত্রপাত করে। ১৮৩৩ সাধারণাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা ও অন্য অধিকারভুক্ত এলাকায় নিজেদের মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করে। ১৮৩৩ সালের ৭ নম্বর রেগুলেশন অনুযায়ী নতুন মুদ্রিত রূপোর মুদ্রা এক ‘কলকাতা রুপি’র (টাকা) অন্য প্রচলিত মুদ্রার নিরিখে যে মূল্য নির্ধারিত হয়েছিল তা হল, ৪ কড়ি = ১ গণ্ডা; ২০ গণ্ডা = ১ পণ; ৫ পণ = ১ আনা; ১৬ আনা = ১ রুপি। অতএব, এই সময়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১ রুপির মূল্য নির্ধারিত হয় ৬৪০০ কড়ি। ১৮৪৫ সাধারণাব্দে ১ রুপির মূল্য বেড়ে হয় ৬৫০০ কড়ি। তামার মুদ্রার ব্যাপক প্রচলনের ফলে ঊনবিংশ শতকের শেষে বাংলায় মুদ্রা হিসাবে কড়ির ব্যবহার প্রায় লুপ্ত হয়।

তথ্যসূত্র:

১. Bhattasali, N.K., ‘Coins and Chronology of the Early Independent Sultans of Bengal.,’ Cambridge: W. Heffer & Sons, p. 170, 1922

২. Deyell, John S. Living without Silver, ‘The Monetary History of Early Medieval North India,’ New Delhi: Oxford University Press, p. 62, 237, 1990

৩. Deyell, John S., ‘Cowries and coins: The dual monetary system of the Bengal Sultanate’ in The Indian Economic and Social History Review. Volume 47, Issue 1. New Delhi: SAGE Publications, p.63-106, 2010

৪. Jarrett, H.S, ‘Ain-i-Akbari of Abul Fazl-i-‘Allami’ Vol. II, Calcutta: The Asiatic Society. p. 138-139, 1993, 1948 (tr.)

৫. Prinsep, J., ‘Useful Tables Forming An Appendix to the Journal of the Asiatic Society,’ Part 1. Calcutta: The Baptist Mission Press. p. 1, 1834

৬. রায়, নীহাররঞ্জন বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদিপর্ব. কলকাতা: দে’জপাবলিশিং. পৃ. ১৬০-১৬৫, ১৯৯৩

৭. Yang, Bin, ‘The Rise and Fall of Cowrie Shells: The Asian Story, Journal of World History, Vol. 22, No. 1. Honolulu: University of Hawaii Press, p.1-25, 2011

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>