| 30 মে 2024
Categories
ইতিহাস

ইতিহাস: প্রাচীন ভারতীয় গণরাজ্য । সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

(১)

প্রাচীন ভারতের গণরাজ্য সংক্রান্ত বিষয়টিকে কয়েকটি ক্রমে ভাগ করে আলোচনা করা যায়। যেমন বিভিন্ন সময়ের গণরাজ্যের নাম, তাদের কাজ, গণরাজ্যের অবদান ও পতন।

গণ কথাটির উল্লেখ বহু প্রাচীন। ঋগ্বেদ থেকে অথর্ববেদ— বহুবারই আমরা গণ কথাটির উল্লেখ পাই। এর ব্যাখ্যা ঐতিহাসিকগন নানাভাবে করেছেন। ফ্লিট বলেছেন, এর দ্বারা স্বয়ংশাসিত উপজাতিকে বোঝায়। জয়সোয়ালের মতে গণ বলতে একের অধিক সংখ্যাকে বোঝায়। সে ক্ষেত্রে গণরাজ্য হল যেখানে একাধিক সংখ্যক লোকের শাসন জারি আছে। অর্থাৎ এটি হল অনেকটা সংসদের সমার্থক যেখান থেকে একাধিকের দ্বারা ওই নির্দিষ্ট উপজাতি ও ভূমির শাসন পরিচালিত হয়।

ঋগ্বেদে অন্তত চল্লিশ বার ও অথর্ব বেদে নয় বার গণ শব্দটির উল্লেখ আছে। গণের প্রধানদের গণরাজস্য বা গণপতি বলা হতো। জয়সোয়াল ঐতরেয় ব্রাহ্মণের একটি অংশ উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন যে, উত্তরকুরু ও উত্তরমদ্রের রাজ্য পরিচলন রীতিকে বলা হতো বৈরাজ্য। যার অর্থ রাজাহীন রাজ্য। আবার গণ সংক্রান্ত আলোচনায় সংঘ কথাটিও আসে। স্বভাবতই এই সংঘ শব্দের সঙ্গে তখনো কোনোপ্রকার ধর্মীয় যোগ স্থাপিত হয়নি। অনেকের মতে গণ ও সংঘ সমার্থক। আবার অনেকে বলেন কয়েকটি উপজাতীয় গণ মিলিত হয়ে একটি সংঘ গঠিত হতো। এছাড়া সংঘ, অভিজাততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বোঝাতেও ব্যবহৃত হতো (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বৈদিক সাহিত্যে আমরা সভা ও সমিতির নাম পাই। এই দুটি সংগঠন রাজাকে রাজ্যশাসন বিষয়ে পরামর্শ দিত, তবে ক্রমশ তাদের ক্ষমতা সংকুচিত হয়)।

বৈদিক সাহিত্যের পর এই বিষয়ে আলোচ্য গ্রন্থটি হল পাণিনির অষ্টাধ্যয়ী। এই বিখ্যাত বৈয়াকরণের জন্ম হয়েছিল দক্ষ গোত্রীয় উপজাতিতে, যারা কাবুল ও সিন্ধুর সঙ্গমে বাস করত। যেহেতু এটি ছিল একটি সংঘ সেহেতু পাণিনি প্রদত্ত তথ্য যথেষ্ট নির্ভর যোগ্য। পাণিনি স্পষ্ট ভাবে দু’ধরনের শাসনতান্ত্রিক রীতির কথা বলেছেন। রাজতান্ত্রিক- সেগুলিকে বলা হতো রাজ্য, আর গণ বা সংঘ- সেগুলিতে প্রজাতান্ত্রিক (মূলত গোষ্ঠীতান্ত্রিক) শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। পাণিনি তিনটি আয়ূধজীবী সংঘের উল্লেখ করেছেন। যথা-দমন্যদি, পার্শ্ববদি ও যৌধেয়াদি। এদের প্রত্যেকটির মধ্যে কয়েকটি করে বিভাগ/জনজাতি থাকতো। যেমন দমন্যদির মধ্যে ছিল ঔলাপি, ঔদকি, অচ্যুতানি, বিন্দু, কাকদন্তী ইত্যাদি। পার্শ্ববদির মধ্যে ছিল অসুর, অসনি, মরুৎ, রাক্ষস, শতবৎস, বসু ইত্যাদি। আর যৌধেয়াদির মধ্যে ছিল ভরত, ধরতেয়, সৌত্রেয়, ত্রিগর্ত, উশিনর, বারতেয় ও যৌধেয়। এই আয়ূধজীবী সংঘগুলি ছাড়াও পাণিনি অন্যান্য কয়েকটি গণের উল্লেখ করেছেন। সেইগুলির নাম, মুদ্রা এবং পরবর্তীকালের সাহিত্যেও পাওয়া যায়। যেমন বৃজি, অন্ধক, বৃষ্ণী, ভর্গ, ক্ষুদ্রক, মালব, মধুমন্ত, অশ্বায়ন ইত্যাদি।

বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যও এই বিষয়ে আলোকপাত করে। বুদ্ধের সময়ে গঙ্গা-যমুনা উপত্যকার ষোলোটি মহাজনপদের নাম পাওয়া যায়, যাদের বেশির ভাগই ছিল রাজতান্ত্রিক। ব্যতিক্রম কেবল বৃজি (লিচ্ছবী ও বৃজি সহ আটটি গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত) ও মল্ল। কিন্তু এর বাইরেও অনেকগুলি গণ রাজ্যের নাম বৌদ্ধ সাহিত্য থেকে পাওয়া যায় যেমন কপিলাবস্তুর শাক্য, সুমসুমার পাহাড়ের ভগ্গ, রামগামের কোলিয়, পিপ্পলিবনের মোরিয়, মিথিলার বিদেহ।

আলেকজান্ডারের আক্রমণের সমসাময়িক গ্রিক লেখকদের রচনা থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিমাংশের বেশ কিছু গণরাজ্যের নাম আমরা পাই। যেমন, নিসা, আড্রিয়াস্টাই, কথাইঅয়, সিবি, অক্সিড্রাকয়, আবাস্তনয় ইত্যাদি। মহাকাব্যে পাওয়া যায় দশার্ণ, শিবি, অম্বষ্ঠ, মালবের নাম। এই সময়ে পূর্বতন অন্ধক-বৃষ্ণিরা পাঁচটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যায়। যথা যাদব, কুকুর, ভোজ, অন্ধক ও বৃষ্ণি। অর্থশাস্ত্রে লিচ্ছবী, বৃজি, মল্লর উল্লেখ আছে। অশোকের পঞ্চম ও ত্রয়োদশ শিলালেখতে যেসব উপজাতীয় রাজ্যগুলির নাম আছে সেগুলি হল যোন, কম্বোজ, গান্ধার, পিতিনিক, নভক ও নভপন্তিক, ভোজ, অন্ধ্র ও পান্ড্য গণ। এগুলিকে ‘অরাজ বিষয়’ বলা হয়েছে। পতঞ্জলি ও কাত্যায়নে আরো যেসব নাম পাওয়া যায় সেগুলি হল-সালংকায়ন, অগ্ৰোদক, আভীর, পুলিন্দ ইত্যাদি।

আরো পরে, গুপ্ত যুগেও গণ রাজ্যগুলির উজ্জ্বল অস্তিত্ব বজায় ছিল। সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, উভয়ের মাতাই ছিলেন যথাক্রমে লিচ্ছবী ও যৌধেয় গোষ্ঠীর কন্যা। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে আমরা নয়টি উপজাতীয় গণরাজ্যের নামে পাই। এগুলি হল— মালব, অর্জুনায়ন, যৌধেয়, মদ্রক, আভীর, প্রার্জুন, সোনাকানিক, কাক ও খরপরিক।

এরপর থেকে গণরাজ্যের অস্তিত্ব ক্রমশই সঙ্কটাপন্ন হতে থাকে।

 

 


গণরাজ্যের
৫০০ সাধারণ পূর্বাব্দে উত্তর ও মধ্য ভারত

 


 

 

 

(২)

গণের শাসনপদ্ধতি কেমন ছিল, বিশেষ করে নির্বাচন কীভাবে হতো, তাই নিয়ে বহু প্রকার মতো রয়েছে। মনে হয় এই বিষয়ে সকলক্ষেত্রে কোনো একটিমাত্র পদ্ধতি মেনে চলা হতো এমন নয়। তাই সব মতামত গুলি সংক্ষেপে আলোচনা করা যায়।

ডক্টর জয়সোয়াল গণরাজ্যগুলিকে নির্বাচন পদ্ধতি ও শাসনকাজে অংশগ্রহণের ভিত্তিতে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন।

প্রথমত, পূর্ণ বা বিশুদ্ধ গণতন্ত্র, যেখানে সব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নির্বাচনে অংশ নিত ও শাসন বিষয়ে মতামত দিত।

দ্বিতীয়ত, নির্বাচন করা হতো অভিজাত বা বিশুদ্ধ কুলের লোকেদের মধ্যে থেকেই। তারাই শাসনকাজে অংশগ্রহণ করতে পারত।

তৃতীয়ত, অভিজাততন্ত্র ও গণতন্ত্রের মিশ্রণ, যেখানে অভিজাতদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও শাসনকাজে যোগ দিতে ও মতামত প্রদান করতে পারত।

ভান্ডারকরের মতে গণরাজ্য গুলি হতো দুই ধরনের। পূর্ণ গণতন্ত্র ও ক্ষত্রিয় পরিচালিত গণতন্ত্র যাকে অভিজাততন্ত্রই বলা চলে। এগুলির শাসন পদ্ধতি আবার দুই ধরনের হতে পারত— কেন্দ্রীভূত ও বিকেন্দ্রীভূত। কেন্দ্রীভূত শাসন যেগুলিতে চালু থাকতো সেগুলিকে বলা হতো নিগম (অবশ্য নিগম কথাটির ভিন্ন অর্থে ব্যবহারও দেখা যায়)।

এছাড়া গণের নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আরো কিছু মতামত জানা যায়। কয়েকটি গণে একমাত্র ক্ষত্রিয়রাই পরিচালকদের নির্বাচিত করত। কোথাও আবার কেবল পরিবার-প্রধানের নির্বাচনে অংশ নেবার অধিকার থাকত। এছাড়া সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নিজেদের শাসক নির্বাচনে অংশ নিত, এমনটাও তো প্রচলিত ছিল।

শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রেও বৈচিত্র ছিল। অনেক সময়ে আঞ্চলিক শাসনের ভার নির্বাচিত স্থানীয় পরিষদের ওপর ন্যস্ত হতো। বিপরীতে, পুরো গণের শাসনদায়িত্ব একটি কেন্দ্রীয় পরিষদ দ্বারা পরিচালিত হতো, এমনটাও দেখা যেত।

তবে এইসব বিভিন্নতা থাকলেও প্রতিটি গণরাজ্যে আইননির্মাতা ও শাসকরা আবশ্যিকভাবে হতেন নির্বাচিত প্রতিনিধি। এই প্রতিনিধিরা তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে সেনাপতি, কোষাধ্যক্ষ ও আরো নানা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত হতেন। মুখ্য প্রশাসককে বা প্রশাসকগণকে, গণপতি অথবা রাজন্য অভিধা দেওয়া হতো। রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি আলোচনার জন্য বা কোনো সিদ্ধান্ত নেবার জন্য প্রতি গণে একটি করে সান্থাগার (assembly hall) থাকতো। কখনো এমনও হতো যে ওইসব পদে বংশানুক্রমিকভাবে কেউ নিযুক্ত হলেন, কিন্তু সেই নিয়োগের ভিত্তিও ছিল, আবশ্যিক ভাবেই, নির্বাচন। আবার শাসক যদি নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হতেন তাহলে তার কাছ থেকে দায়িত্বভার নিয়ে নেওয়া হতো, এমন উদাহরণও আছে। এমনকি বহু গণরাজ্যে নির্দিষ্ট সময়ান্তরে নির্বাচনের রীতি ছিল। সেই নির্বাচন গোপন ও প্রকাশ্য দুইভাবেই সম্পন্ন হতে পারত।

সুতরাং গণরাজ্য গুলিতে, অন্তত প্রথমদিকে, শাসনকাজে জনগণের অংশগ্রহণের ও মতামতদানের যথেষ্ট সুযোগ ছিল।

কিন্তু এত কিছু সত্বেও সাধারণাব্দের ষষ্ঠ শতকের পরে, আমরা গণরাজ্যের অস্তিত্ব আর লক্ষ্য করি না। ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সময়কাল থেকে গুপ্তযুগ পর্যন্ত, প্রায় হাজার বছর ধরে টিঁকে থাকার পরেও, এরা কেন বিলুপ্ত হয়ে গেল, সেই প্রশ্ন মনে আসে।

 

(৩)

বস্তুত সাধারণাব্দের চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতকের মধ্যবর্তী সময়ই গণরাজ্যের ক্রমসমাপ্তির কাল। যে কারণগুলিকে এজন্য দায়ী করা হয়, সেগুলি এইরূপ—

 

১) একটি গণরাজ্যের মধ্যে অনেক সময়ই একাধিক উপজাতি থাকতো। এদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ পতনের অগ্রদূত ছিল। যেমন অন্ধ্র-বৃষ্ণিদের পরিণাম আমরা জানি।

২) গণরাজ্যগুলির মূল ক্ষমতা ক্রমশ একটি শ্রেণীর কুক্ষিগত হয়ে পড়ছিল। সেটি হল ক্ষত্রিয় বর্ণ। এরা সমাজের অন্যান্য মানুষদের আর নিজেদের সমকক্ষ বলে মনে করছিল না। এর ফলে বাকি সদস্যদের ওপর তাদের প্রভাববলয় ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়বে এটাই ছিল স্বাভাবিক।

৩) গণগুলিতে জাতিবর্ণ প্রথা এবং সেই প্রথা অনুযায়ী সামাজিক স্তরবিন্যাস ক্রমশই স্পষ্টতর হচ্ছিল, যা কিনা গণরাজ্যের আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। দ্বৈপ্য, দাস, কর্মকার এইসব শব্দের দ্বারা বোঝা যায় যে, সামাজিকভাবে কম মর্যাদা সম্পন্ন এবং অর্থকৌলিন্য বিহীন মানুষজন শাসকের ও সমাজের সমদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। ফলে গণের বিপদ যখন ঘনিয়ে আসতো তখন তারা কিছুটা উদাসীন থাকতো। অথচ প্রতি সদস্যের সক্রিয় সহযোগিতাই, বহিরাগত বিপদ থেকে একসময় গণকে বাঁচাতো।

৪) জাতিবর্ণের মতোই বিত্তবৈষম্যও দেখা যাচ্ছিল। যৌধেয়দের মধ্যেই কিছু বণিক অসম্ভব ধনী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত সম্পদ তারা গণের স্বার্থে নিয়োগ করতে রাজি ছিল না। অন্যদিকে বিত্তহীন শ্রেণীর সঙ্গে তাদের দূরত্ব এক ধরনের বিভেদ তৈরি করছিল।

৫) এদিকে যত বড়ো বড়ো সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, ততই সেইসব সাম্রাজ্যের আর্থিক শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কারণ তারা নতুন নতুন সম্পদের উৎস আহরণ করছিল যা গণরাজ্যের ছোট সীমার মধ্যে আর নতুন করে খুঁজে পাওয়া সম্ভব ছিল না। ফলে তারা অনেক সহজেই প্রজাদের অভাব অভিযোগের প্রতিকার করতে পারছিল। তাছাড়া ওই সম্পদের বলেই তারা গড়ে তুলছিল বিশাল ও বহু অস্ত্রে সজ্জিত সেনাদল।

৬) অন্য একটি মূলনীতিও লঙ্ঘিত হচ্ছিল। তা হল যোগ্য ব্যক্তি/ব্যক্তিদের নির্বাচনের রীতি। রাজতন্ত্রের মতোই এখানেও ক্রমশ বংশগত অধিকার মান্যতা পাচ্ছিল।

৭) গণের সংসদে আসীন ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল।

৮) এই অবস্থায় বড়ো বড়ো রাজ্যগুলির আগ্রাসনকে প্রতিহত করার ক্ষমতা গণরাজ্যের আর ছিল না। শুধু তাই নয়, কয়েকটি গণ একত্রিতও হতো যখন, তখন বড়ো রাজ্যগুলি ঐ শক্তিজোটে ভাঙন ধরাতো (উৎকোচ প্রদান দ্বারা বিশ্বাসঘাতক তৈরি করে, ভেদনীতি প্রয়োগ করে ইত্যাদি)।

আর এই সবকিছুর মিলিত ফল ছিল গণরাজ্যের বিলুপ্তি।

 

(৪)

 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গণের স্থায়ীত্বের যে শর্তগুলি একদা বুদ্ধদেব বৃজিদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, সেগুলি যদি তারা মেনে চলতে পারত, তাহলে ভারতের ইতিহাসে কোনো পরিবর্তন আসতো কিনা, তা জানতে ইচ্ছ করে।

 

মগধের হর্যঙ্ক বংশীয় রাজা বিম্বিসার ছিলেন বুদ্ধদেবের পরম ভক্ত। তাঁর পুত্র অজাতশত্রু প্রথমদিকে বুদ্ধ বিদ্বেষী ছিলেন। কিন্তু পরে সম্ভবত, পত্নী কাশীকন্যা বজিরার প্রভাবে বুদ্ধদেবের অনুগামী হন। এই সময়ে গণরাজ্যগুলির এক শক্তিজোটের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব শুরু হয়, যাদের নেতা ছিল বৃজি গণরাজ্য। অজাতশত্রু তাঁর মন্ত্রী বসসাকারকে বুদ্ধদেবের কাছে পাঠান জয়ের উপায় জানতে। বুদ্ধ সেই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে, শিষ্য আনন্দকে বলতে থাকেন যে, কী কী মেনে চললে বৃজি গণরাজ্য অটুট থাকবে, সেই নির্দেশ তিনি তাদের দিয়েছেন। সঙ্গে নির্দেশগুলিরও পুনরাবৃত্তি করেন—

 

বৃজিদের

 

১) প্রায়ই সভা করে, সবার মতকে গুরুত্ব দিয়ে রাজ্য চালাতে হবে।

২) সব কাজ সবাই মিলে একত্রিত হয়ে করতে হবে।

৩) তাদের নিজস্ব যে আইন আছে তাই মেনে সবাইকে চলতে হবে।

৪) গণবৃদ্ধদের পরামর্শ নিতে হবে, তা মানতে হবে এবং তাদের সম্মান করতে হবে।

৫) নারীদের মর্যাদা সব সময় রক্ষা করে চলতে হবে।

৬) সমস্ত মন্দিরগুলির যত্ন নিতে হবে।

৭) নিজেদের অঞ্চলভুক্ত গাছপালা ও পশুপাখিদের ওপর অত্যাচার করা যাবে না।

 

প্রথম ও দ্বিতীয় নির্দেশ দুটি এই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বাস্তবেই অজাতশত্রু ওই শক্তিজোটে যতদিন না ভাঙন ধরাতে পেরেছিলেন, ততদিন যুদ্ধে সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। একই সঙ্গে বুদ্ধের কূটনৈতিক জ্ঞানের পরিচয়ও এই ঘটনার মাধ্যমে পাওয়া যায়। তিনি রাজমন্ত্রীকে বিমুখ করেননি আবার জয়ের উপায়ও সরাসরি বলেননি।

 

 

এইবার, ভারতীয় রাজনীতি, সংস্কৃতিতে গণরাজ্যগুলির ভূমিকা ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করা যায়।

 

প্রথমত, গণরাজ্যগুলি যে প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক চালচিত্রে নিজেদের অবস্থান রক্ষায় অত্যন্ত সফল ছিল, তার প্রমাণ এদের দীর্ঘস্থায়িত্ব। আর, যেকোনো রাজনৈতিক-সামাজিক-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তাদের স্থায়িত্বকে নিশ্চিত করতে পারে তখনই, যখন তারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের অবস্থিতির সামঞ্জস্যবিধানে সক্ষম হয়, অর্থাৎ পরিবর্তন ও অস্তিত্বরক্ষা এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার কৌশল এরা রপ্ত করেছিল। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায়— উত্তরমদ্ররা ১৩০০ বছর, মালবরা ১০০০ বছর, যৌধেয়রা অন্ততপক্ষে ৮০০ বছর এবং লিচ্ছবীরা প্রায় একই সময় যাবৎ টিঁকে ছিল। এমন দীর্ঘস্থায়ী কোনো রাজবংশের নজির কিন্তু প্রাচীন ভারতে নেই।

 

দ্বিতীয়ত, গণের প্রতিটি সদস্যের সাম্য ও স্বাধীনতা রক্ষা করা ছিল গণরাজ্যের আবশ্যিক শর্ত, আগেও যা উল্লেখিত হয়েছে। স্বাধীনতা বলতে চিন্তার স্বাধীনতাকেও বোঝায়। মহাভারতে গণের এই চরিত্রটির প্রশংসা করা হয়েছে এবং এটিকে তাদের শক্তিশালী হয়ে ওঠার চাবিকাঠি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। স্বভাবতই প্রত্যেকে যদি স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ও তা ব্যক্ত করার অধিকারী হয় তাহলে কেউই নিজেকে অবদমিত ভাববে না। আবার পরিচালকগণ উন্নয়নের নিত্যনতুন ধারণা লাভ করতে সক্ষম হবেন। এই আদর্শ অবশ্যই গন রাজ্যের একটি বড়ো দান।

 

তৃতীয়ত, এই গণরাজ্যগুলি সাধারণপূর্বাব্দের ষষ্ঠ শতক বা তারও আগে থেকে নতুন দার্শনিক ধ্যান ধারণার উৎপত্তি স্থল হয়ে উঠেছিল। কারণ এখানে স্বাধীন চিন্তার অবকাশ ছিল। আর এইসময়ে, লোকায়ত, আজীবিক, জৈন, বৌদ্ধ প্রমুখ প্রতিবাদী ধর্মের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছিল, যেগুলির ভিত্তিভূমি ছিল অনেক সময়েই এইসব গণরাজ্য। প্রায় প্রত্যেক গণরাজ্যে থাকতো ‘কুতুহল-শালা’। এখানে দার্শনিক, রাজনৈতিক, সামাজিক মতামতের আলোচনা ও আদান-প্রদান চলতো। রোমিলা থাপার লিখেছেন, “In the middle Ganga Valley, there were ‘Kutuhal-shalas’ of places for relaxation and debate.” এগুলি শ্রমণদের অন্যান্য বর্ষাবাসের মতো নির্জন থাকত না। বরং এখানে শ্রমণ ও পণ্ডিতদের বৃহৎ জমায়েতের সম্মুখীন হতে হতো। আবার তারাই যে কেবল বক্তা হতেন, এমন নয়। নাগরিকরা সক্রিয়ভাবে আলোচনায় অংশ নিতেন আর এই অংশগ্রহণ গণের সকলের জন্য ছিল অবাধ। এখানে নানা মানবিক অভিজ্ঞতা, প্রবণতা ও জ্ঞানের চর্চা হতো। এই কুতুহল-শালাগুলিকে সারা বছর সযত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো। এইভাবে বিভিন্ন; এমনকি পরস্পর বিরোধী আলোচনারও একটি সাধারণ মঞ্চ হয়ে উঠেছিল গণরাজ্যগুলি। এই দৃষ্টান্ত আজকের যুগেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

 

চতুর্থত, এই গণরাজ্যগুলি কৃষ্ণ, বুদ্ধ বা মহাবীরের নতুন আদর্শকে সমর্থন করে সেগুলিকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছিল। নিজেরাও অজস্র দেবদেবীপূজা, জাতিবর্ণজনিত অসাম্য, হিংস্রতা ইত্যাদি থেকে মুক্ত হতে পেরেছিল। সম্ভবত বুদ্ধ তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংঘের নিয়ম কানুন নির্ণয়ে গণরাজ্যে প্রচলিত রীতিপদ্ধতি থেকে ধারণা গ্রহণ করেছিলেন। কৃষ্ণের কর্মযোগের ধারণাতেও গণরাজ্যের আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। তাই গণরাজ্যগুলি প্রাচীন ভারতের সংস্কৃতি, দর্শন, সাহিত্য ও রাজনৈতিক চিন্তায় বিশিষ্ট অবদান রেখেছিল তাতে সন্দেহ নেই।

 

পঞ্চমত, শাসক-শাসিতের মধ্যে (সামাজিক) চুক্তি সংক্রান্ত যে ধারণা, সেই আদিবৈদিক কালের পর লুপ্ত হতে বসেছিল, গণরাজ্য তাকে অব্যাহত রেখেছিল। ভারত তথা বিশ্বরাজনীতির দরবারে এ তাদের বিশাল কৃতিত্ব।

ষষ্ঠত, স্বায়ত্বশাসন বিষয়ক ধারনার দিক থেকেও এরা অনেক এগিয়ে ছিল।

 

সপ্তমত, গণরাজ্যগুলি অনেক সময়েই একাধিক গণ নিয়ে তৈরি হতো। যেমন বৃজি গণরাজ্যে আটটি আলাদা আলাদা উপজাতি ছিল। সুতরাং আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন পদ্ধতিতেও তারা অভ্যস্ত ছিল এবং এই ব্যবস্থাকে কীভাবে সফল করা যায় সে শিক্ষা এদের কাছে পাওয়া যায়।

 

অষ্টমত, গন রাজ্যগুলির সদস্যদের প্রত্যেককে কমবেশি অস্ত্রশিক্ষা নিতে হতো। ফলে তাদের প্রতিরোধ হতো অনেক দৃঢ়। কারণ এরা বেতনভুক বা ভাড়াটে সেনা ছিল না। এছাড়া সকলকে কৃষিক্ষেত্রে শ্রমদান করতে হতো। সম্পদ বন্টিত হতো সমবায় ভিত্তিতে। এই পদ্ধতির উপযোগিতা আজও প্রশ্নাতীত।

নবমত, এখানে নারীর স্বাধীনতা অনেক বেশি ছিল। কৃষিক্ষেত্রে, অন্যান্য উৎপাদনমূলক কাজে, এমনকি রণক্ষেত্রেও তারা পুরুষের সঙ্গে সমভাবে অংশ নিত (যৌধেয় নারী বাহিনী)। বিবাহ বিষয়েও নারীর ইচ্ছাকে সম্মান জানানো হতো।

অর্থাৎ আধুনিক রাষ্ট্রের যে আদর্শ ও ধ্যানধারণা, প্রাচীন ভারতীয় গণরাজ্যগুলি তা থেকে পিছিয়ে ছিল না— এবং এই আধুনিকতার শিক্ষাই, তাদের সবচেয়ে বড়ো অবদান।

 

পরিশেষে আর একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার। ভারতের উত্তর-পশ্চিমাংশে যতদিন এই গণরাজ্যগুলির স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় ছিল, ততদিন তারা বহিরাক্রমণকে প্রতিহত করেছে। সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত এগুলিকে সমূলে বিনাশ করার ফলশ্রুতিতেই কুমারগুপ্ত স্কন্দগুপ্তের আমলে উত্তর ভারতে হূণ আক্রমণের ঘটনা ঘটতে পেরেছিল।

 

 

 

শীর্ষক চিত্র পরিচিতিঃ লিচ্ছবি গোষ্ঠীর সভা

 

 

 

তথ্যসূত্র:

K.P. Jaiswal, ‘Hindu Polity: A Constitutional History of India in Hindu Times’, Chaukhamba Sanskrit Pratishthan, March 2006

A.S.Altekar, ‘State and government in ancient India’, Motilal Banarsidass, January 2016

Upinder Singh, ‘A History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th Century,’ Pearson Education India, January 2009

রাহুল সাংকৃত্যায়ন, ‘জয় যৌদেহ’, অনুবাদক শ্রীভগীরথ, বিশ্ববাণী প্রথম প্রকাশ ১৩৬৮, পিডিএফ (এটি মূলত ঐতিহাসিক উপন্যাস হলেও ঐতিহাসিক তথ্যে সমৃদ্ধ)।

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত