| 19 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

ইরাবতী গল্প: নাগরী । তিলোত্তমা মজুমদার

আনুমানিক পঠনকাল: 16 মিনিট

 

গণেশ, গোপাল আর ঝুনকা। মহিষবাথানে আজও যে কাহিনী লোকের মুখে মুখে ফেরে, তার মুখ্য চরিত্র এই তিন জন।

কাহিনীর মধ্যে প্যাঁচপয়জার কিছু নেই। একেবারে সরল সোজা। গ্রামে শহরে পাড়ায় পাড়ায় হামেশাই ঘটছে এমনটা। তখনও ঘটত, এখনও ঘটে। লোকে পাকা রসাল আম খাবার মতো একটা গোটা মরশুম এই নিয়ে আলোচনারত থাকে এবং পরচর্চামৃত সুধাবৎ তাদের জীবনকে রাখে সতেজ ও সুন্দর। এক সময় এক চর্চা ফুরিয়ে আসে কেননা ঘটি গরমের মতো পরচর্চার বিষয়ও হওয়া চাই মুচমুচে হাতে গরম। ঠাণ্ডা মেরে গেলে তার আর স্বাদ থাকে না। তখন বিষয়ান্তর চাই। নতুন চর্চার জন্য নতুন কড়চা।

তবু যে গণেশ, গোপাল আর ঝুনকার কাহিনী আজও লোকের মুখে মুখে ফিরছে, তার কারণ বোধহয় এই যে এর সঙ্গে যুক্ত আছে কলকলস্বনা নাগরী নদীর বহমানতা। বিচিত্ররূপিনী নাগরীর জন্যই আজ এই মহিষবাথানের বোলবোলাও। তাই নদীকে ঘিরে যা কিছু, যত রহস্যময়তা, যত কাহিনী, যত হত্যা মৃত্যু আত্মহনন রয়ে যায় নদীর বুকে আকাশ মেঘ চাঁদ তারার প্রতিচ্ছবির মতো।

গণেশ, গোপাল আর ঝুনকার কাহিনী অবশ্য আজকের নয়। সে অনেকদিন আগেকার কথা। এই মহিষবাথান তখন এতবড় শহরও ছিল না, পর্যটকের ভিড়ে এমন জনকল্লোলমুখরও সে হয়ে ওঠেনি। সমৃদ্ধ এক পল্লিই তাকে বলা যেত। লোকজন ছিল শান্ত। পরস্পরের পরিচিত। প্রতিবেশীরা সুখ পাবার যন্ত্রপাতি আহরণ করা নিয়ে পরস্পর প্রতিযোগী ছিল না। একে অপরের দুর্দিনে আত্মীয়ের মতোই পাশে দাঁড়াত। এখন সেসব গল্পকথা মনে হয় বটে, তবে লোভ-লালসা ঈর্ষা-পরশ্রীকাতরতা তখন মহিষবাথানের মানুষের মধ্যে সত্যি কম ছিল।

সুবিস্তৃত জলশালিনী সুন্দর নাগরী, মহিষবাথানের পূর্ব পর্যন্ত তার অস্তিত্ব আর পাঁচটা বড় নদীর মতোই। কিন্তু মহিষবাথানে পৌঁছে তার মতি-গতি সম্পূর্ণ আলাদা। যে তা না জেনে এ নদীতে নাও ভাসিয়েছে, তার মরণ কেউ ঠেকাতে পারবে না।

সেই সময় নাগরী নদীর দুই পারে ছিল গভীর বন। বনের কিনার ঘেঁষে রাস্তা। বড় বড় মাঠ ছিল রাস্তা পার করে। তারপর ছড়ানো ছিটোন বসবাস। এখানে কামারশালা তো বহূ দূরে কুমোরপাড়া। এ ধারে খাটাল তো অন্যধারে বাস করে ছুতোর সুরেন-বীরেন। স্কুলের প্রধানশিক্ষক স্নেহপরায়ণ এবং মিশুকে। ডাক্তার অমায়িক। নগরপাল ভদ্র সভ্য। গেরেমভারী নয় মোটেই। রাজকর আদায় করতে আসে যে লোকটি, সেও দু’দণ্ড বসে চা-কফি পান করে কুশল আলোচনা করে যায়। চোরেরাও এমনকী ভারী ভদ্র। আজ পর্যন্ত চোরের হাতে কেউ খুন-জখম হয়েছে বলে শোনা যায়নি। তবে হ্যাঁ, প্রেমঘটিত কারণে হিংসা ও মনকষাকষির ইতিহাস এ শহরেও ছিল। কিন্তু সে আর কোথায় না থাকে! তবে সে যাই হোক না কেন, এই কাহিনীর মতো আর কোনওদিনই কিছু ঘটতে পারে না বলে মহিষবাথানের লোক বিশ্বাস করে। এই ছোট শহরের লোক শান্ত। এখানকার বন নিরুপদ্রব। নদী মহিমান্বিত, কখনও প্রলয়ঙ্করী, কিন্তু দুকূল প্লাবিনী নয়।

আজকের মতো বহুতল বাড়ি, বিলাসবহুল সরাই, সরকারি ছাড়পত্র প্রাপ্ত ঝাঁ চকচকে জুয়াখানা — কিছুই তখন ছিল না মহিষবাথানে। জুয়ার আড্ডা সর্বজনবিদিত হলেও চোরাগোপ্তা ছিল। পর্যটক যে একেবারেই ছিল না তা নয়। তবে তাদের অধিকাংশই ছিল বিচিত্র এবং দুঃসাহসী। শুধু নদী জঙ্গলের শোভা দেখতেই তারা আসত না। কেউ জঙ্গলে তাঁবু ফেলে বন্য জানোয়ারের মোকাবিলা করতে চাইত। পশুশিকার নিষিদ্ধ ছিল না বলে দন্তুর বরাহ শিকার করে বা অসামান্য দক্ষতায় একটি চিতাবাঘ — আপন বীরত্বের গৌরব নিয়ে তারা ফিরে যেত আপন দেশে।

মহিষবাথানের অপর পারে, নদী পেরিয়ে যে জঙ্গল, তারও ওপারে ঘন বনে ঢাকা পাহাড়। একেবারে সমতল ভূমিতে এই পাহাড় যেন হঠাৎ গজিয়ে উঠেছে আর কিছুদূর পর্যন্ত মাটি-পাথরে মেশামেশি থেকে, ক্রমশ পাথরের উপকরণে নিজেকে কঠিন রুক্ষ করতে করতে, দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতো সটান থেকে বিস্তৃত হয়েছে সুদূরে। খোলা মাঠে গভীর গর্ত খুঁড়ে মাটি কাটার দল যেমন গর্তের ধারে মাটির পাহাড় জমিয়ে তোলে, তেমনি, কত লক্ষ-কোটি বছর আগে, খেয়ালি প্রকৃতি তার শাবল কোদাল গাঁইতি চালিয়ে এমন পাহাড় গড়েছে, যা আজ মানুষের অপার বিস্ময় এবং আকর্ষণ। এই পাহাড়ের পিছনে অন্য দেশ। তার নাম শিয়ালবনী। পাহাড় লাগোয়া তার যে শহর, তার নাম টিয়াল। টিয়ালে আছে বিলাসবহুল হোটেল রেস্তোরাঁ। এমনই তাদের উচ্চতা যে ছাতের সর্বোচ্চ বিন্দু থেকে ভুবনের গোলার্ধ্ব দর্শন করা যেতে পারে মনে হয়। সেখান থেকে সীমান্তরক্ষীর নজরদারিও কড়া।

পাহাড়ের মহিষবাথানমুখী দিক থেকে নদী পর্যন্ত অধিকারবিযুক্ত ভূখণ্ড। কোনও দেশই এর দাবিদার নয় কিন্তু এর নিজস্ব অবস্থান পরিরক্ষণের জন্য দুই দেশ চুক্তিবদ্ধ। তাই আজও ওই ভূখণ্ডের ঘন অরণ্য টিঁকে আছে। আছে করাল দংষ্ট্রা বন্য জন্তুরা। এখন ওই জঙ্গলে যেতে বিশেষ অনুমোদন লাগে। যে কোনও দেশই তা দিতে পারে। তাও কেবল দিনে ভ্রমণের জন্য। সঙ্গে থাকে সুশিক্ষিত পথপ্রদর্শক। আগে এসবের বালাই ছিল না। টিয়ালে তেমন জনবসতিই ছিল না। মহিষবাথানের রোমাঞ্চপ্রিয় লোকজনই অভিযাত্রীদের সঙ্গে জুটে যেত।

আজও নাগরী নদীর বুকে পড়ে গভীর জঙ্গলের হরিৎ গম্ভীর ছায়া। লোকে বলে, গণেশ গোপাল বলে চিৎকার করলে আজও সেইসব ছায়া তিরতির শিহরণ অনুভব করে। গভীর অনুভবীরা তা দেখতে পায়।

মহিষবাথানের দিকে এখন অরণ্য হালকা হয়ে নদী দৃশ্যমান। প্রাচীন মোটা গাছগুলি দল বেঁধে বেঁধে আছে। অরণ্য না বলে তাদের বীথিকা বলাই ভাল। তাদের পায়ের কাছে গালিচার মতো সবুজ ঘাস বুনেছে শহরবাসী। নদীর ধারে বসে শোভা দেখার জন্য কাঠের বেঞ্চ। সেখানে চুপটি করে বসে থাকলে মনে হয়, কোথাও কোনও অশান্তি নেই, ত্রাস নেই, খিদে কষ্ট যন্ত্রণা নেই। জগৎ শান্ত তৃপ্ত অপরূপ ছবি। মহিষবাথানের নাগরী নদী কিছুক্ষণের জন্য হলেও মানুষকে স্বর্গের স্বাদ দিতে পারে।

নদী, ছায়াবীথি আর মাঠ অবশ্য সারা বছর এমনটি থাকে না। শীতের মরশুমে যখন তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নেমে আসে তখন নদী জমে বরফ হয়ে যায়। চিরসবুজ গাছগুলি ছাড়া অধিকাংশই ন্যাড়া। ধূসর আকাশের নীচে তাদের ঊর্ধ্ববাহু ভূতের মতো দেখায়। পাহাড়শ্রেণী আরও রুক্ষ। ভীষণ। গুটিকয় পাগলাটে ভ্রমণার্থী ছাড়া আর কেউ আসে না তখন। জমাট নদী আর ভৌতিক নিষ্পত্র গাছ দেখতে কে আসবে? নাগরী নদীর সমস্ত সৌন্দর্য তার চলনে। প্রকৃতি তাকে পৃথিবীর চিরবিস্ময় করে তুলেছে।

যখন আকাশের তারা পেড়ে আনার মতো উঁচু সরাই ছিল না, সেই সরাইয়ে নগ্ননৃত্যের আয়োজন ছিল না, সভ্য শিক্ষিত বেশ্যা পাওয়া যেত না চাইলেই, আইনসম্মত এবং মর্যাদাপূর্ণ ঝলমলে গমগমে মহল ছিল না, পর্যটকের ভিড়ে যখন হারিয়ে যেত না প্রতিবেশীর সৌহার্দ্য, সেই সময়, সেই অনেকদিন আগে, গণেশ আর গোপাল নামে মহিষবাথানের দুই যুবক দুঃসাহসী বলে খ্যাত হয়েছিল। তাদের যেমন ছিল সাহস, তেমনই উদ্যম, তেমনই শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা। আর ভারী কড়ারকম ছিল তাদের বন্ধুত্ব। কেউ কাউকে ভাগ না দিয়ে একটি পেয়ারা পর্যন্ত খেত না। তাই গণেশ গোপাল দু’জনেই যখন ঝুনকার প্রতি অনুরক্ত হল, কেউ বিস্মিত হয়নি।

প্রকৃত পরিচয়ে গণেশ আর গোপাল ছিল ছুতোর। পৈতৃক সূত্রে তারা কাঠের কাজে দক্ষ হয়ে উঠেছিল। ঈশ্বর তাদের গুণ দিয়েছিলেন বহু রকম। সেইসঙ্গে সবল সুপুরুষ গণেশ ও গোপাল কাঠের কারুকর্মে শিল্পী হয়ে উঠেছিল।

গণেশের বাবা সুরেন আর গোপালের বাবা বীরেন বন্ধুলোক। এমনকী তাদের মায়েদের মধ্যেও মিলমিশ ছিল খুব। বীরেনের বউ নিতু যা শিখত সেলাই-ফোঁড়াই, সুরেনের বউ গীতুকে শেখাত। গীতু যা জানত রান্নাবান্না, শেখাত নিতুকে। দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠতা আত্মীয়তার পর্যায়ে চলে গেল। গাঁয়ে বা ছোট শহরে এমন হয়। রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বন্ধুত্ব বড় আত্মীয়তায় আবদ্ধ হয়। সুরেন-বীরেনের পরিবারও তাই। গণেশ ও গোপালও আশৈশব বন্ধু। অভিন্ন হৃদয় বললেও অত্যুক্তি হয় না। একেবারে ছোটবেলায় যে কোনও একজনের মায়ের কোল ঘেঁষেই তারা শুয়েছে। দোষ করলে যে কোনও মা-ই তাদের শাসন করেছে। দু’জনেই পেয়েছে পিতা ও পিতৃতুল্য একজন মানুষ। জীবনে স্নেহের অভাব নেই বলে তাদেরও হৃদয় ভালবাসায় পরিপ্লুত।

সুরেন ও বীরেন লোক ভাল। আমুদে, গপ্পোবাজ, পরোপকারী। নিতু আর গীতুও অল্পেতে খুশি। একটির বেশি দুটি গহনা নেই। সব উৎসবে সেই পরেই তারা সেজেগুজে ওঠে। গুটিকয় ভাল পোশাক তোলা থাকে তোরঙ্গে। একটু বেশি লাভ করতে পারলে সুরেন বীরেন দূরের বড় শহর থেকে বায়োস্কোপওয়ালা ডাকিয়ে মাঠে পর্দা টাঙিয়ে শহরসুদ্ধ লোককে বায়োস্কোপ দেখায় আর নিতু-গীতু এই মোচ্ছবে সেঁকা মাংস আর মদ দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করে। তবে এই উৎসব হামেশাই হয় তা তো নয়। অন্যরা মোচ্ছব করলে তারাও যায় নিমন্ত্রণে। তবে সবারই গোনাগুনতি টাকা। তাই দেদার খরচের সুযোগ আসে কালেভদ্রে। সুরেন ও বীরেন এই শহরের লোকের চাহিদা অনুযায়ী আসবাবপত্র বানায়। তা শহরের লোকের আর চাহিদা কী! মানুষ এক জীবনে একটি কী দুটি পালঙ্ক কেনে। তাই দিয়ে সারা জীবন চলে যায়। আলমারি, তোরঙ্গ, তাক, টেবিল, চেয়ার — এসবের চাহিদা মন্দ নয়। তাই দিয়েই সুরেন-বীরেনের উপার্জন। সেই উপার্জনেই সংসার। তবে ঘরবাড়ির দেওয়াল মেঝে — সব কাঠের হওয়ায় তক্তা বানানোর বরাত পেলে তারা ভাল দাঁও মারে। দু’জনে হয় না তখন। লোক খাটাতে হয় সাময়িক। সত্যি বলতে কী, অল্প-স্বল্প ছুতোরের কাজ, কলের মিস্ত্রির কাজ, রঙের মিস্ত্রির কাজ সবাই এখানে জানে। জানতে হয়। খুব বড় সমস্যা না হলে খামোখা বিশেষজ্ঞ ডেকে গাদা অর্থদণ্ড দিয়ে লাভ কী! বিশেষত বুড়োরা, যারা অবসর নিয়েছে, খুটুর-খাটুর করে সারাদিন তারা ঘরবাড়ি সারিয়ে-সুরিয়ে তুলছে। বাগানে কোদাল চালাচ্ছে। সবজি ফলাচ্ছে। ঘাস কাটছে। বুড়িরা সেলাই-ফোঁড়াই করছে। বাচ্চা সামলাচ্ছে। কাঠ-কুটো শুকিয়ে রাখছে জ্বালানির জন্য। সংসারে কেউ বসে থাকে না। থাকতে নেই। এক কাজ থেকে অবসর নিয়ে অপর কাজে গিয়ে পড়তে হয়। যতক্ষণ হাত-পা সচল ততক্ষণ সংসারে নিজের অবদান জারি রাখতে হয়। কেউ যেন মনে না করে এই লোকটা পরিবারের বোঝা। বরং, এমন হওয়াই আনন্দের যে, সত্যিই যখন অথর্ব হয়ে পড়বে কেউ, কিংবা থাকবেই না এই দুনিয়াতে — আপনজনেরা বলবে, আহা গো, লোকটা ছিল, অমুকটা নিয়ে কাউকে ভাবতে হয়নি।

মহিষবাথানের বুড়োরা এমনই নীতিতে বিশ্বাস করে। তাই সুরেন-বীরেন যখন বাড়তি কাজের জন্য লোক চাইত, মোটামুটি কাজ জানা বুড়োরা তাদের কাজে যোগ দিয়ে দুটি রোজগারও করে নিত, খানিক সাহায্যও হত প্রতিবেশীর।

।। ২ ।।

নাগরী নদী সুবিস্তৃত এবং সুগভীর। এক পাশ পাহাড় ঘেরা হলেও যখন নদীর চরিত্র নদীজাতীয় ততক্ষণ সে সামতলিক। বিপুল গভীর জলবাহিনী ভারী মধ্যম গতি চিরযৌবনা তটিনী। যেখানে তার বিস্ময় তা আকস্মিক। নদীর সেখানে আত্মহারা না হয়ে উপায় নেই।

মহিষবাথান সম্পূর্ণ সমতল। নদীও বহুদূর পর্যন্ত তার সহধর্মিণী।

নদীতে মাছ আছে প্রচুর। শহরে অনেকেরই নিজস্ব নৌকা আছে। কারও ছোট ডিঙি, কারও বড় বাহারি নৌকা। কেউ মাছ ধরা জীবিকা হিসেবে নিয়েছে। কেউ শখ করে জলে ভেসে পড়ে।

জেলেরা রোদবৃষ্টির পরোয়া করে না। মৎস্যজীবীর জীবন সংগ্রামপূর্ণ। কবে কেমন মাছ পাবে তা কেউ বলতে পারে না। ভাল পরিমাণ পেলে ক’দিন তার বিক্রির টাকায় বেশ চলে যায়। কিন্তু না পেলে জীবিকা ছুটিয়ে মারে। সত্যি বলতে কী, মৎস্যজীবীরা জলেই ভেসে থাকতে ভালবাসে বেশি। ডাঙার টান বুকে করে তারা জলে ভেসে যায়, জলের টান বুকে করে ডিঙি ভেড়ায় স্থলের ঘাটে।

আর মাছ-ধরা শখ যাদের, তারা যায় হিসেব করে। আবহাওয়া ভাল চাই। ঝড় আসার একটুও সম্ভাবনা থাকা চলবে না। আসল কথা, এ হল তাদের জলবিলাস। সুন্দরী নাগরীর মৃদু মন্দ হাওয়ায় বনের শ্যামলছায়া দেখতে দেখতে জলবিহার অত্যন্ত আনন্দের। খুব ছোটবেলাতেই এই আনন্দ কুড়োনর নেশা গণেশ ও গোপালকে পেয়ে বসল।

সুরেন-বীরেন নৌকা বানায় চমৎকার। কিন্তু নদীর জলে হাওয়া খাওয়ার বাসনা তাদের কখনও ছিল না। মাছ ধরার শখ পালনের ফুরসতই বা কোথায়। দু’জনে দিনভর র‍্যাঁদা করাত হাতুড়ি বাটালি পেরেক আর রং নিয়ে ব্যস্ত থাকে। দিনের শেষে স্নান সেরে হাঁটু অবধি পেন্টুলুন আর ফিনফিনে জামা গায়ে বাড়ির দাওয়ায় বা বাগানে চেয়ার টেবিল পেতে বসে ধীরে-সুস্থে চানাচুর বা পকোড়া দিয়ে মদ খায়। হাতে ভাল টাকা থাকলে গীতু শূয়োরের মাংস দিয়ে সসেজ রাঁধে, নিতু বানায় গোরুর মাংসের কাবাব। সেই দিনগুলোয় ভারী ফুর্তি জাগে মনে। দৈনন্দিন সুখ-দুঃখ, ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতি ছাপিয়ে সেদিন দুই বন্ধু আর তাদের বউরা পরচর্চা করতে বসে। এর মধ্যে শহরের পরকীয়াগুলোই প্রধান। শহরের ভালমানুষেরা কে কার বউ নিয়ে ফস্টি-নস্টি করছে, কার বউ দজ্জাল, কার স্বামী হাড়কেপ্পন, কার মনে সুখ নেই, কার ছেলে কোন বাড়ির মেয়ের সঙ্গে স্ফুর্তি করে এখন মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে, এইসব রসালো বিষয় মদের সঙ্গে গিলতে ভারী আরাম। আজকাল গণেশ-গোপাল মাঝে-মধ্যে এই আড্ডায় যোগ দেয়। তারা এখন বড় হয়েছে। কোনও প্রসঙ্গেই আর ঢাকঢাক গুড়গুড় করার দরকার হয় না। তা ছাড়া মহিষবাথানের লোকেরা মোটেও রক্ষণশীল নয়। জীবনের অলি-গলি আলো-অন্ধকার — সমস্তই ছোট ছেলেমেয়েদের বুঝে নেওয়া দরকার, এমনটাই তারা মনে করে। তাই, আপন গাঁ থেকে ডবকা মেয়ে এনে নিজের দেশি মদের দোকানে কম পয়সায় কাজ করায় যে কাজুলি, তাকে নিয়ে আলোচনা করতেও কারও বাধে না। আর কোনও প্রসঙ্গ নেই তো কাজুলি আছে। আর ঝুনকা ছিল কাজুলিরই সাক্ষাৎ ভাইঝি। তার শরীরে যখন যৌবন প্রায় ঠাসা, তখন সে পিসির ব্যবসায় যোগ দিয়েছিল। পিসি কাজুলি অবিবাহিত এবং চৌখস। মহিষবাথানের বহুতর লোকের সঙ্গেই তার প্রণয়ের কথা শোনা গিয়ে থাকে। আপন সন্তান না থাকায় ভাইঝিকেই সে কন্যাবৎ চৌখস করে নিচ্ছিল।

ঝুনকা যখন এ শহরে এল তখন গণেশ-গোপাল পঁচিশ-ছাব্বিশের সমর্থ যুবক। তাদের যখন বছর দশেক তখন থেকেই তারা কাঠের কাজ শেখে, নৌকা বানানোয় হাত লাগায় মৎস্যজীবীদের সঙ্গে নাগরী নদীতে ভেসে পড়ে। দুঃসাহসী অভিযাত্রীদের সঙ্গে জঙ্গলে রাত্রিবাস করতেও তারা শুরু করে তখন। বংশগতভাবেই তারা সবল ও রূপবান। সেই সঙ্গে পরিশ্রম, দুর্জয় অভিযান, অফুরন্ত সাহস ও উদ্যম তাদের সুঠাম, সুপুরুষ এবং ধনঞ্জয়ী করে তুলেছে। তারা বীর বটে — লোকে একবাক্যেই স্বীকার করে একথা। বারো বছর বয়সে তারা প্রবল লড়াই করে এক হিংস্র জলজন্তুর হাত থেকে একজন অভিযাত্রীকে রক্ষা করেছিল। কুমীর, হাঙর, কামট যা কিছুই তা হতে পারে। সাধারণত বড় কোনও জলজন্তু এখানে আসে না। নাগরী নদীর উন্মাদক বিস্ময়কে তারা ভয় পায়। তবু কখনও বা চলেও আসে পথ ভুলে কিংবা মানুষেরই মতো বেপরোয়া দুঃসাহসিকতায়। হয় তারা অসাবধানী মানুষ মারে, নয় নিজেরাই মারা পড়ে দক্ষ বুদ্ধিমত্ত মানুষের হাতে। তবে বারো বছরের কিশোরের হাতে কোনও জলজন্তু এর আগে মারা পড়েনি।

পনেরো বছর বয়সে গণেশকে এবং এক অভিযাত্রীকে জঙ্গলে একটি চিতা — আসলে লেপার্ড, এখানকার লোকেরা চিতা বলে — আক্রমণ করেছিল। গোপাল সঠিক লক্ষ্যে তাকে গুলি না করলে হয়তো তিনজনেই তারা মারা পড়ত। তখনই সম্ভবত বোঝা গিয়েছিল গোপাল একজন দক্ষ বন্দুকবাজ হয়ে উঠবে। আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক ছিল ওই অভিযাত্রী। যে পরিস্থিতিতে যথেষ্ট সাহসী শিকারীও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়, সেখানে এক কিশোর কী করে এমন টানটান স্নায়ু ব্যবহার করতে পারে? শহরের প্রধান মিলন ভবনে উপস্থিত শহরবাসীর সম্বর্ধনা নিতে নিতে নগরপালের সবিস্ময় প্রশ্নের জবাবে গোপাল বলেছিল, সেই মুহূর্তে ভয়-ভাবনা কিছুই তার ছিল না। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল গণেশকে বাঁচানো। এতটুকু ভুলচুক করার উপায় তার ছিল না। কারণ যে কোনও পরিস্থিতিতেই গণেশকে বাঁচানো তার প্রধান কাজ। কারণ তারা একে অপরের বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারবে না। তার জবাবে লোকে আনন্দে অভিভূত হয়েছিল। মেয়েরা রুমালে চোখ মুছেছিল। তখনও সবরকমের ঘনিষ্ঠতাকেই কামাতুর ব্যাখ্যা দেওয়ার রেওয়াজ আসেনি। এই গণেশ ও গোপালের এই গভীর ভালবাসাকে কেউই সমকামিতা বলে ভুল করেনি।

এর দু’বছর পরে, নাগরী নদীর ওপারের জঙ্গলে এক চতুর পাইথনের হাত থেকে গণেশ গোপালকে রক্ষা করেছিল। এ শহরেরই জনাকয় মধুসংগ্রহকারী তার সাক্ষী। গণেশকেও সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাকে প্রশ্ন করা হয়, কৃতজ্ঞতাবশেই আপন প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সে গোপালকে বাঁচিয়েছিল কিনা। তখন সে বলে, প্রতিদানের কথা মাথায় রাখলে তাকে আসলে গোপালের অমঙ্গল কামনা করতে হত। কারণ গোপাল বিপদে পড়লে তবেই প্রতিদানের সুযোগ আসে। তাই, সবিনয়ে সে জানায়, গোপাল তার ভাই, তার বন্ধু, তার পথ-বিপথের চিরসঙ্গী। যে কোনও অবস্থাতেই সে গোপালের জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিতে পারে। সেদিনও প্রশংসা এবং করতালির ঝড় বয়ে গিয়েছিল। এমন দুটি ছেলের জন্য সুরেন বীরেন গীতু নিতুকে সকলে অভিনন্দন জানিয়েছিল। সেই চিতাবাঘের মুড়োসুদ্ধু ছাল এবং ভিতরে খড়-পোরা লম্বা পাইথনের শরীরটি মহিষবাথানের প্রদর্শশালায় দেখতে পাওয়া যায়। গণেশ ও গোপালের সুকীর্তির কথা বলে শেষ করা যাবে না। কত ঝড়ে তারা উথাল-পাথাল নৌকা সামলেছে। কত ঘনবরিষণে প্রতিবেশীর পথ-হারা গাভী বন থেকে ফিরিয়ে এনেছে। কাজুলির পানশালায় কত দুর্বৃত্তকে শাসন করেছে। ওইরকম তরতাজা যুবা, তবু কোনওদিন তারা দেহপসারিণীর ডেরায় যায়নি।

কাজুলি যেসব ডবকা মেয়ে এনে দোকান চালায়, চোরাগোপ্তায় তারাই দেহব্যবসা করে। কাজুলি তার দস্তুরি নেয়। ব্যবসা তারই মূলত। লোকে জানে। কিন্তু বিশ্বসংসারে এমন কিছু ঘটনা আছে, যা জানলেও না জানার ভাণ করার নাম সভ্যতা। কাজুলির বেশ্যালয় তেমনই একটি। তার মদের দোকানে প্রায়ই নতুন নতুন মেয়ে। ঝুনকা তার সাক্ষাৎ ভাইঝি বটে। বাকিরাও তার দূরসম্পর্কের আত্মীয়া। হতে পারে গোটা গ্রামে গ্রামান্তরে কাজুলির আত্মীয়স্বজন ভরভরতি। গরিব পরিবারের মেয়ে সব। কিছুদিন শহরে থাকে। শিখে নেয় ছদ্মপ্রণয়। রোজগার করে গাঁয়ে ফিরে সাবলীল সংসার পাতে।

সুরেন ও বীরেন কোনওদিন রূপোপজীবিনীর কাছে যায়নি। তাদের ছেলেরাও যায় না। তবে মদের দোকানে জুলজুল করে যুবতী মেয়ে দেখতে বাধা নেই। ইন্দ্রিয়বিজয়ী মহাপুরুষরা পর্যন্ত তা করে। প্রথম প্রথম মেয়েরা থাকে সরল ও সংযত। মদ্যপের বেসামাল আবেগ ও বাতুলতার প্রতি সভয়ে তাকায়। ক্রমে ওই মেয়েরাই উদ্দাম ও রসবন্তী হয়ে ওঠে। খদ্দেরের দিকে কটাক্ষপাত করতে শেখে। শরীর মুচড়ে ছদ্মবেদনার ভাণ করতেও তারা দড় হয়ে যায়। কোন মন্ত্রে সুশান্ত সুশীল মেয়েরা এমন নির্ভেজাল ছলনাময়ী হয়ে ওঠে তা সুরেন-বীরেন যেমন কোনওকালে বোঝেনি, গণেশ-গোপালও বোঝে না। কিন্তু তাদের অন্তরে যে প্রেম, তাদের পুরুষোচিত স্বভাবে নারী সম্পর্কে যে কৌতূহল, মেয়েমানুষের জন্য শরীরে যে কামনার জোয়ার — সব, সমস্ত, সম্যক ধাবিত হয়েছিল ওই ঝুনকার প্রতি, কারণ, সে দেহপসারিণী ছিল না ঠিকই, কিন্তু তার রূপ ও যৌবনভার, তার লাস্য ও আকর্ষণী মোহিনী আহ্বান — দুই বন্ধুর কাছেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল।

।। ৩ ।।

অভিযানপ্রিয় গণেশ ও গোপাল অল্পবয়সেই সার বুঝেছিল, জীবনে রোমাঞ্চ উপভোগ করতে গেলে যা যা প্রয়োজন তার প্রায় সব তাদের আছে, কেবল একটি ছাড়া। তাদের সুস্থ সবল শরীর আছে, বুদ্ধি আছে, উদ্যম সাহস শক্তি আছে। নাগরী নদীকে তারা আপন নারীর মতো চেনে। জঙ্গলকে চেনে নিজের বাগানটির মতো। অভিযাত্রীদের মুখে মুখে তাদের নাম ছড়িয়েছে বড় শহরেও। কিন্তু আজও তারা সাহায্যকারীই হয়ে আছে। অভিযানের সহযাত্রীটি হতে পারেনি। তারা তাঁবু বেঁধে, নৌকা ভাসিয়ে, শিকার করে বাহবা পায়। পারিশ্রমিকও পায়। কেবল মর্যাদা পায় না। কেন? কারণ তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ নেই। রাতে জঙ্গলের তাঁবুতে অভিযাত্রীরা যখন ভাঁজ-করা চেয়ারে বসে ফুর্তিতে মদের বোতল বার করে, তারা সেই মদের ভাগ নিয়ে আগুনে মাংস ঝলসায়, তখন, তাদেরও ইচ্ছে হয়, পাল্টা একটি দামী মদের বোতল বেরিয়ে আসুক পকেট থেকে তাদেরও, অভিযাত্রীদের ভাড়া করা নৌকা চালিয়ে রোজগার নয়, তাদের ইচ্ছা হয়, তারাই হয়ে উঠবে বড় নৌকার মালিক। পর্যটকদের কাঁধে হাত রেখে বলবে, আজকের নৈশভোজ তাঁরই সৌজন্যে। এইসব ইচ্ছা তাদের হয় এবং গণেশ-গোপাল অচিরেই বুঝে নেয়, মানুষের আমোদ-উল্লাসের উপকরণই বলো আর মর্যাদাই বলো — আসলে সবই কিমতি চিজ। তা পেতে গেলে টাকা ওড়ানোর ক্ষমতা থাকা চাই। ফেলো কড়ি, মাখো তেল। এ নাগরী নদীর হাওয়া নয় যে সাহস করে ডিঙি নিয়ে ভেসে পড়লেই অফুরন্ত খেতে পাবে। দু’জনে ভাবতে লাগল। কী উপায় করা যায়। কী করলে ধনবান হওয়া যায়। জলজঙ্গল চেনে আর কাঠের কাজ জানে চমৎকার। আর কোনও বিদ্যেই জানা নেই উপার্জন বাড়াবার মতো।

শ্যাম নামে এক অভিযাত্রী অত্যন্ত দুঃসাহসী। নাগরী নদীর শেষ বিন্দুতে পৌঁছনো তার ইচ্ছা। কাজটা এখনও পর্যন্ত অসম্ভব। কিন্তু কোনও এক দিন সম্ভব হতেও পারে এই আশায় প্রৌঢ় ধনবান শ্যাম মাঝে মাঝেই চলে আসত মহিষবাথানে। গণেশ ও গোপালকে সে পছন্দ করত। তাদের উৎসাহ এবং দায়িত্ববোধ লক্ষ করে সে স্থির করল মহানগরে ফিরে সে তার অন্যান্য ব্যবসায়ের পাশাপাশি কাঠের আসবাবপত্র বেচবে। এই গোপাল ও গণেশ হবে তার জোগানদার।

গোপাল ও গণেশকে নির্বাচন করার আরও একটি কারণ ছিল। গোপালের কোমরে একটি ছোরা গোঁজা থাকত সবসময়। ছোরাটির বাট ছিল কাঠের। তাতে অতি সূক্ষ্ম সুন্দর কারুকাজ করা। শ্যাম দেখেই বুঝেছিল, এ অতি উঁচু দরের কাজ। সে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল কাজটি গণেশের। গোপালের জন্য সে ওটি বানিয়েছিল। শ্যাম যখন গণেশের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছে তখন গণেশ নিজের বুকপকেট থেকে বার করে দেখাল একটি দিয়াশলাইয়ের বাক্সর মতো কাঠের জিনিস। গোপালের করা। অপূর্ব কাজ। গণেশের একবার কঠিন অসুখ করেছিল। তখন গোপাল তার আরোগ্য সংকল্পে এই বাক্সটি বানিয়ে, নাগরী নদী পেরিয়ে, পাহাড় জঙ্গল ডিঙিয়ে টিয়ালের এক গুণীনের কাছ থেকে অব্যর্থ রোগহর ওষুধ নিয়ে এসেছিল। কাজটা সহজ ছিল না। গুণীন ছিল বদরাগী এবং খামখেয়ালি। গোপাল তার বাড়ির জঙ্গল পরিষ্কার করে, তার পা টিপে, তার জন্য একটি কাঠের জলচৌকি বানিয়ে তাকে তুষ্ট করে ওষুধ পেয়েছিল। অদ্যাবধি গুণীনের ওষুধ ওই বাক্সে পোরা আছে। গণেশকে বিপদ-আপদ থেকে বাঁচিয়ে চলেছে বলেই তাদের বিশ্বাস।

দুই বন্ধুর এমন শৈল্পিক গুণ দেখে শ্যাম তাদের ব্যবসায়ের প্রস্তাব দেয়। কিছু টাকা অগ্রিম দিয়ে সে গণেশ ও গোপালকে একটি কারখানা খুলতে বলে। অল্প দিনেই ভালরকম অর্থাগম হল তাদের। মহানগর থেকে এল নানাবিধ নকশাদার আসবাবের নমুনা দেওয়া বই। এল আধুনিক কাঠচেরাই যন্ত্র। আগে যে কাজ সুরেন-বীরেন দু’মাসে করে উঠতে পারত না, আজ তা পনেরো দিনে হয়ে যায়। মহিষবাথানের গণেশ ও গোপাল আর ছুতোর নয়, অভিযাত্রীদের সাহায্যকারী নয়। আজ তারা গণ্যমান্য ব্যবসায়ী। তাদের বড় কারখানা। জিনিস রফতানির জন্য লরি কিনবে ভাবছে। ঋণের জন্য ব্যাঙ্কের সঙ্গে কথাবার্তা পাকা। আজ তাদের নিজস্ব দুটি বড় সুসজ্জিত নৌকা অভিযাত্রীরা ভাড়া নেয়। তাদের নিজস্ব তাঁবু, নিজস্ব ভাঁজ করা চেয়ার, নিজস্ব অতিথিশালা। বাপ-মা যখন ভাবছে, এই হল ছেলেদের বিয়ে দেবার উপযুক্ত সময়, তখনই দুই বন্ধু ঝুনকার প্রেমে পড়ল।

প্রথম প্রথম তারা একসঙ্গেই ঝুনকার কাছে যেত। তার সঙ্গে হাসিগল্প করত। বাজার থেকে একসঙ্গেই উপহার কিনত। ঝুনকার চারপাশে আরও সব যুবকরা ঘুরঘুর করত। কিন্তু গণেশ ও গোপালের মতো সম্পন্ন ছিল না তারা। ঝুনকাও কাউকে প্রশ্রয় দেবার আগে তার ওজন বুঝে নিত। কিছুদিন এমনি করে চলল। কিন্তু শুধু গল্পগাছায় আর কোন প্রেমিকের মন ভরে? গণেশ ও গোপাল দু’জনেই ঝুনকাকে ছুঁতে চায়, কাছে পেতে চায়। ঝুনকার কাছে নিজেকে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার জন্য দু’জনেই লভ্যাংশের অনেকটাই ব্যয় করতে লাগল তার জন্য। একদিন গণেশ আলাদা করে ঝুনকার কাছে এল। বলল, ‘তুমি আমার।’

ঝুনকা খল খল করে হাসল।

একদিন গোপালও এল ঝুনকার কাছে। বলল, ‘তুমি আমার’।

সেদিনও ঝুনকা হেসে গড়িয়ে পড়ল।

দুই বন্ধু এই প্রথম এমন কিছু পেতে চাইল যা ভাগাভাগি করা যায় না। একদিন মদ খেতে খেতে গোপাল বলল, ‘গণেশ, ঝুনকাকে আমি বিয়ে করব। তুই আর ওর কাছে যাসনে।’

গণেশ বলল, ‘কিন্তু ঝুনকা তো আমার। তুই ওকে কী করে বিয়ে করবি?’

‘না। ঝুনকা আমার।’

‘না, আমার।’

‘তা হলে এক কাজ করি। আয়, হাত মেলা। কাল থেকে তুই-ও ঝুনকার কাছে যাবি না, আমিও যাব না।’

‘ঠিক আছে। তুইও ওকে ভুলে যাবি, আমিও যাব।’

‘ঝুনকা আমাদের কেউ না।’

‘তা হলে ঝুনকা কার?’

‘আমার।’

‘অ্যাই, অ্যাই, তুই যে বললি ও আমাদের কেউ না। তা হলে ও তোর হয় কী করে?’

‘ও আমাদের কেউ না। শুধু আমার।’

‘না। আমার।’

আলোচনায় নিষ্পত্তি হল না। প্রতিজ্ঞায়ও ফল হল না। মদের ঘোরে দু’জনে আবোল-তাবোল ঝগড়া করতে লাগল। একসময় রাত ফুরলো। চাঁদ অস্ত গেল। দুই বন্ধু হাত-পা ছড়িয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল। মদ তারা খাচ্ছিল নাগরী নদীর কুলে বাঁধা নৌকায় বসে। মাছি উড়ে উড়ে নাকে সুড়সুড়ি দিতে তারা উঠে বসল। দু’জন তাকাল দু’জনের দিকে। বৈরী চোখ। রাগী মুখ। একটি মেয়েকে কেন্দ্র করে পৃথিবীতে আরও একটি বন্ধুত্ব বিচ্ছেদের সূত্রপাত হল।

গোপাল মুখ ধুলো না, দাঁত মাজল না, সাজগোজ করল না। সোজা ঝুনকার কাছে গিয়ে বলল, ‘গণেশ বলল তোমাকে বিয়ে করবে। কিন্তু তুমি যে বলেছিলে তুমি আমার।’

‘আমি তো তোমারই।’

গোপালের গায়ে বাসি মদের গন্ধ। চোখে পিচুটি। পারিপাট্যহীন অবস্থায় তাকে পাগলের মতো লাগছে। তাকে আপাতত শান্ত করার জন্য ঝুনকা হেসে হেসে কথাগুলো বলল। এই কথা বলা সে ভালরকমই রপ্ত করেছিল। বস্তুত কাজুলির কারবার তাকেই ধরতে হবে শক্ত হাতে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে হাতের মুঠোয় না রাখলে চলবে কেন! তার জন্য ছলনাকে করে তুলতে হবে সত্যের মতো। সত্যকে মিথ্যায় গুলে করে দিতে হবে দুর্বোধ্য। সে তা ভালই রপ্ত করেছে। গণেশ তাকে বিয়ে করতে চেয়েছে তা সত্যি। সে সম্মতি দিয়েছে। এরকম সম্মতি সে আরও সাতজনকেও দিয়ে থাকতে পারে। তাতে কী! সে আপাতত গোপালকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। বিকেলে গণেশ এল তার কাছে। বলল, ‘গোপাল এসেছিল?’

ঝুনকা অস্বীকার করল না। করে লাভ নেই। গণেশ রেগে বলল, ‘শোনো, তুমি আমার ভাবী বউ। তোমার কাছে যখন-তখন যে-সে এসে পড়বে, এ আমি বরদাস্ত করব না।’

ঝুনকা বলল, ‘কী করবে?’

‘এই হাতে কত শক্তি আছে জানো?’

ঝুনকা গণেশের চোখ দেখে ভয় পেল। সে চোখ লাল। জ্বলজ্বলে। সে ভাবতে লাগল, এই যে নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছা, এই সংকেতটি ভাল নয়। ক’দিনেই গণেশ ও গোপালের আবেগের আতিশয্যে ঝুনকা অস্থির হয়ে পড়ল। একজন আসে তো আরেকজন যায়। একজন কেঁদে কেঁদে বলে — তোমাকে ছাড়া বাঁচব না, তো আরেকজন বলে খুন করে ফেলব। ব্যাপার দাঁড়াল এমন যে দু’জনেই সমস্ত কাজকারবার ফেলে ঝুনকার পিছু পিছু ঘুরতে লাগল। অন্য সব প্রেমিক পুরুষদের সঙ্গে যে প্রাণ খুলে একটু ঢলাঢলি করে নেবে, সে উপায় আর ঝুনকার রইল না। তার দমবন্ধ হয়ে এল। দুই দুঃসাহসী ধনবান তরুণের প্রেমাতিশয্যে তার দশা হল স্বৈরিণী মোনাল পাখির মতো। নিজের দিকে টানবে বলে দু’জনে যেন তার দুটি ডানা ধরে টানছে, সে উড়তে পারছে না। যেভাবে টানছে, একটিও ডানা ছিঁড়ে গেলে সে আর কোনও দিনই উড়তে পারবে না। কেন? এদের বোকা আধিক্য আতিশয্য কেন তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করবে? সে তো সত্যি কারও প্রেমে পড়েনি।

ছলনা ও মিথ্যাচারের কিছু মূল্য দিতে হয়। দৈনন্দিন যন্ত্রণা অশান্তি ও বিরক্তিতে ঝুনকা সেই মূল্য দিতে লাগল। ব্যাপারটা বহুদর্শিনী কাজুলির নজরে পড়ল। বস্তুত, গণেশ ও গোপালের বন্ধুত্বে যে চিড় ধরেছে, তা শহরবাসী আলোচনা করছিল। তাদের ব্যবসায়েও তার প্রভাব পড়ছিল। ঝুনকাজনিত সন্দেহ অবিশ্বাস রাগ ও একাধিপত্যের ইচ্ছা তাদের কারবারেও বিষক্রিয়া শুরু করেছিল। সুরেন-বীরেন এবং তাদের বউরাও আর আগের মতো ঘনিষ্ঠ থাকতে পারছিল না কারণ অপত্য স্নেহবশে তারা দু’জনেই মনে করছিল তাদের নিজের ছেলেটি সরল নির্দোষ এবং বঞ্চিত।

কাজুলি ঝুনকাকে বুদ্ধি দিতে লাগল। যে কাজ করে, যে ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায়িক লাভ হবে না, তা করার দরকার কী! দু’জনে বুদ্ধি আঁটল। এমন বুদ্ধি, যাতে সাপও মরবে, লাঠিও অটুট থাকবে।

এক সন্ধ্যায় গণেশের বুকে মাথা রেখে নিবিড় চোখে, ঘন স্বরে ঝুনকা বল, ‘প্রিয়তম, আর যে পারি না। তোমার বন্ধু ওই গোপাল আমার জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। ওকে বিয়ে করতে হবে, এই ওর দাবি। না হলে আমায় খুন করে ও আত্মহত্যা করবে বলে ভয় দেখায়। কিন্তু আমি যে তোমাকেই ভালবাসি প্রিয়তম।’

গণেশ রাগে গরগর করতে করতে বলল, ‘এত স্পর্ধা ওর! চলো, কালই তোমায় বিয়ে করি।’

ঝুনকা মধুমাখা স্বরে বলল, ‘শত্রুর শেষ রাখতে নেই প্রিয়তম। বিয়ের পরেও ও আমাকে খুন করতে পারে। তুমি নিশ্চয়ই তা চাও না।’

‘কখনও না। তুমি আমার প্রাণ। আমার প্রিয়তমা।’

‘তা হলে আগে ওকে নিকেশ করো গণেশ।’

‘কালই হবে ওর শেষ দিন সোনামণি।’

‘আরও একটা কথা প্রিয়তম।’

‘বলো প্রিয়া।’

‘পিসিকে তো জানো। হিসেবি মানুষ। বলছিলেন, গণেশ যদি তার কারবার তোর নামে লিখে দেয় তবেই এ বিয়েতে আমার মত থাকবে। … তুমি তো জানো, পিসির অমতে … না হলে আমি তো জানিই আমাকে তোমার অদেয় কিছু নেই।’

‘এ আর বেশি কী! বিয়ের আগে আমি সব তোমার নামে লেখাপড়া করে দেব।’

গোপালকেও একই কথা বলল ঝুনকা। গোপালও তাকে সব লিখে দেবার প্রতিশ্রুতি দিল।

পরদিন গণেশ এল গোপালের কাছে। বলল, ‘যা হয়েছে, হয়েছে। চল আবার আমরা মন দিয়ে কাজ করি। ব্যবসা নিয়ে ভাবনা-চিন্তাও করা দরকার। অনেক ক্ষতি হয়েছে।’

গোপাল বলল, ‘আমিও তাই ভাবছিলাম। তা এই উপলক্ষে নাগরী নদীতে জলবিহার করতে গেলে হয়। হাওয়া খেতে খেতে কথা বলা যাবে।’

‘চল্‌ আমাদের পুরনো ডিঙিটা নিয়ে ভেসে পড়ি। সেই আগেকার মতো।’

‘উত্তম প্রস্তাব।’

কিছু খাবার, কিছু মদ, দুটি দাঁড় আর ছোট ডিঙি নিয়ে দিন কয়েক পরে দু’জনে নাগরী নদীতে পাড়ি দিল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে স্রোতের দিকে বাইতে বাইতে গণেশ বলল, ‘কাজটা ভাল করলি না গোপাল।’

গোপাল বলল, ‘কোনটা?’

‘আমি বারণ করলাম তবু ঝুনকার কাছে গেলি।’

গণেশ উত্তেজিত হয়ে মদে চুমুক দিল। মদ এনেছে গোপাল। সে গণেশের আনা ভাজা মাংসে কামড় বসিয়ে পকেট থেকে ছোট্ট বাহারি বোতল বার করে মদ ঢালল গলায়। গণেশ যে বোতল থেকে পান করছিল, তা থেকে খেল না। বলল, ‘একই কথা তো আমিও বলতে পারি।’

দু’জনে বিবদমান হয়ে উঠল অচিরেই। একসময় গণেশের হাত শিথিল হয়ে এল। সে আর দাঁড় বাইতে পারছে না। সে বলল, ‘ডিঙি ফেরা। আমি ক্লান্ত। বেশি মদ খেয়ে ফেলেছি।’

গোপাল বলল, ‘তোকে আজ মরতে হবে গণেশ। মদে বিষ ছিল।’

গণেশ ঘোলাটে চোখে তাকাল। বলল, ‘মরতে তোকেও হবে গোপাল। মাংসে বিষ ছিল। ঝুনকা চেয়েছিল তোকে শেষ করতে। আমি করেছি। ও চেয়েছিল আমার ব্যবসায়ের অংশ দিয়ে দেব। সব দিয়ে দেব। আমার প্রেমের প্রমাণ।’

গণেশ হাসছে। উদভ্রান্তের মতো। এবার গোপালের কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। ঠোঁট নীল। বিষ ক্রিয়া করছে শরীরে। সে বলল, কী কী কী বললি? ঝুনকা! গণেশ, আমরা কী ভীষণ বোকা গণেশ। একটা মেয়েমানুষ আমাদের সব শেষ করে দিল।’

‘মানে?’

‘আমার কাছে তোর মৃত্যু চেয়েছিল ও। আমারও সম্পত্তি চেয়েছিল।’

‘ডিঙির মুখ ফেরা গোপাল। পারবি?’

‘হাত চলছে না। চোখ অন্ধকার।’

‘গোপাল! আমার গোপাল!’

গণেশ, এই ছুরি, তোর দেওয়া ছুরি, আমাকে এখুনি মেরে ফেল। একটা শস্তা লোভী মেয়ের জন্য আমি প্রাণের বন্ধুকে বিষ দিয়েছি।’

‘আমার বুকে গুণীনের ওষুধ আছে। আমি বাঁচব। আমি পারব। আয় ভাই। মানুষ চাইলে সব পারে। ডিঙি ঘোরা। ডিঙি ঘোরা।’

কত লক্ষ কোটি বছর আগে খেয়ালি প্রকৃতি মহিষবাথান থেকে টিয়ালি পর্যন্ত বিস্তৃত সমতল ভূখণ্ডকে প্রবল পরাক্রমে চিরে দু’ভাগ করে দিয়েছিল একেবারে। ছোট বাচ্চারা যেমন করে কেক কেটে ফেলে, তেমনি। হয়তো কোনও ভূকম্পণ, কোনও বিস্ফোরণ নাগরী নদীর তলপেট মসৃণভাবে কেটে একেবারে আলাদা করে দিল নিম্নভাগ। তার নাড়ি-ভুঁড়ি ভূগর্ভ থেকে উঠে এসে গড়ে তুলল আকস্মিক পাথুরে পাহাড়। নাগরীর জলস্রোত কাটা দেহখণ্ড থেকে বেরুনো রক্তের স্রোতের মতো আছড়ে পড়ল দু’ভাগ হয়ে যাওয়া ভূতলের মধ্যবর্তী হাজার হাজার ফুট নিম্নতায়। জলপ্রপাত। বিশাল জলবাহিনী সুন্দরী নাগরী এক প্রান্তে আকস্মিক জলপ্রপাত। হাজার হাজার কিউসেক জল হাজার হাজার ফুট নীচে অনবরত আছড়ে পড়ছে শুভ্র নির্মম শক্তিমত্তায়। তারপর আবার বয়ে যাচ্ছে নীচের দিকে শান্ত প্রবাহিণী। যে তা জানে না, সে মরে। যত সে প্রপাতের দিকে যায়, নদী তত স্রোতবতী। তত দুর্বার। তত অকরুণ। কোন বিন্দুতে ওই স্রোতবেগ আর মানুষের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়, মহিষবাথানের লোক তা জানে। নদীর পারে আছে চওড়া বিজ্ঞপ্তি। আর যেয়ো না। বিপদ। এরপর দুর্ঘটনার জন্য সরকার দায়ী নয়। আছে নজরদারের গুমটি। ভুলক্রমে যদি এদিকে চলে আসে কেউ, তারা সাবধান করে দেয়।

সেদিন বুড়ো কেষ্টদাস ছিল পাহারায়। ছোট ডিঙিটি হঠাৎ দেখতে পায় সে। নিয়ন্ত্রণহারা ডিঙিটি টলমল করতে করতে দ্রুত বেগে চলে যাচ্ছে প্রপাতের দিকে। বুড়ো চিৎকার করছে — হেই! ফেরত যাও! হেই!

সে চোখের কাছে হাত এনে দেখছে। কে? কারা? অর্বাচীন! মাতাল! বোকা! মরবে যে! দুটি ছেলে! উঠে দাঁড়াল। ডিঙি সামলাবার চেষ্টা করছে। টলছে! পড়ে যাবে! এই জলে সাঁতরানো অসম্ভব! হেই! হেই! গণেশ না? গণেশ আর গোপাল!

হাউ হাউ করে কাঁদছিল বুড়ো। বেঘোরে মরা দুটি সুস্থ সবল ছেলে। কিচ্ছু করতে পারেনি সে! মুহূর্তের মধ্যে নৌকাটি শেষ প্রান্তে চলে যায়। তবে হ্যাঁ, বুড়ো বলেছিল, সে দেখেছে, নিজের চক্ষে, শেষ মুহূর্তে ছেলে দুটি জড়াজড়ি করেছিল। তখনও কি তারা ঈর্ষাপরায়ণ হত্যাকারীর ভূমিকায় ছিল, নাকি পরস্পরকে ক্ষমা করে, পরস্পরের বিষ একত্রে একযোগে মিশিয়ে দিচ্ছিল নাগরী নদীর অমৃতধারায়?

গণেশ ও গোপালের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কথা যখন শুনল ঝুনকা, নগরপালের বাড়িতে নৈশভোজে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল সে। আয়নার কাছে, নিজের ঠোঁট দুটি ঘষাঘষি করে করে রং বসিয়ে নিতে নিতে সে বলল, ‘খুবই দুঃখের কথা। ভালমানুষের ছেলেরা আমাকে বড্ডই ভালবাসত।’

নাগরী নদীকেও যে তারা ভালবাসত। খুব। এ জগতে ভালবাসার ভাগাভাগি নিঃশব্দে সইতে পারে ক’জন?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত