| 16 জুলাই 2024
Categories
গদ্য সাহিত্য

সুবোধ সরকারের কবিতা সময়ের প্রচ্ছদে জীবনের গল্প

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

আমাদের জীবনের যে গল্প জমে আছে, যে কল্পনা রসিকতা ব্যঙ্গ বিদ্রোহ, প্রেম-বিরহ, সম্ভব-অসম্ভব, বাস্তব-অবাস্তব, দুঃখ-আনন্দ সেসব নিয়ে কবিতার কোলাজ এঁকেছেন সুবোধ সরকার। সত্তর দশকের শেষ দিক থেকে তিনি লেখালেখি শুরু করলেও আশির দশকেই তাঁর সগর্ব উত্থান। কবিতাকে গল্পের বাতাবরণে মুড়ে এক জাদু শক্তির মতো পাঠককে টেনে নিয়ে যান নিজস্ব সমীক্ষার ক্ষেত্রটিতে। আমরা জীবনকে ভাবতে শিখি, প্রবৃত্তির বহুমুখ দানবদের চিনতে শিখি, অন্ধকার ও স্পষ্টতায় আত্ম-স্বরূপ উন্মোচন করি, এমনকী আত্মসমালোচনাও। এই ধারা থেকেই দেশ-কাল, সমাজ-সভ্যতা, রাজনীতি-ধর্মনীতি, দর্শন-ইতিহাস, বিরহ-বিনোদন, কাম-কামনা, নারী-পুরুষ, আভিজাত্য-অনাভিজাত্য, পাপ-পুণ্য সবই উঠে আসে। একটি ক্ষীণ গল্পের সঙ্গে থাকে বিষয়, কখনো দ্রোহ, কখনো ব্যঙ্গ, কখনো তুলনা, কখনো মন্তব্যও। কল্পনাও সিদ্ধান্তের আসন দখল করে। কথার কেরামতিতে স্বর্গ ও জাহান্নামে মেলবন্ধন ঘটে, আবার দাম্পত্যের সুখেও সমুদ্র আছড়ায়। সহজ ও সরসতায় সাম্প্রতিক প্রেক্ষিত থেকেই কবি কবিতায় ফসল তোলেন। তাঁর গল্পের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে গল্প, যা অতিলৌকিক এবং মেধাবী চাবুক। ব্যঞ্জনার মূলসূত্র সেখানেই। সুতরাং সেগুলি শুধু গল্প নয়, আমাদের চর্মচক্ষুর বাস্তব রসায়নে মর্মরিত অধিবাস্তবের স্ফুলিঙ্গ। পড়তে পড়তে নেশার মতন পেয়ে বসে। এক একটি আবিষ্কারের মতো চরিত্র দহনের যাপনে নেমে পড়ি। যে যৌনতা আমাদের নিত্যদিন ফুল ফোটায়, সে যৌনতাও যে ক্রূর ও ধর্ষক হয়ে ওঠে; যে পিতা আমাদের স্নেহে অভিষিক্ত করে—সেই পিতাই আমাদের নিষ্ঠুর শাসনও হানে। যে প্রেমিকা এমন কোমলগান্ধার, সে-ই আবার স্বার্থপর বিমুখ নিঠুরা হয়ে যায়। বিপদের সময় যারা সঙ্গে থাকার কথা দেয়, কিন্তু সে কথাও ডাহা মিথ্যে হয়ে যায়। যে মেয়ে চিঠি লেখে, সে-ই একদিন চিঠি ফেরত নিতে আসে। যারা সকালবেলায় সৎ থাকে, রাত্রে বেলায় তারাই খারাপ হয়। আঃ মানে জীবন এবং আঃ মানে মৃত্যুও। যে রক্ত ভালোবাসতে শেখায়, সেই রক্তই গরমও হয়ে ওঠে। যে পৃথিবী সুন্দর, সেই পৃথিবী নিষ্ঠুরও। কবিতায় এসবের মধ্যেই আমাদের ঢুকিয়ে দেন। এক বিবেকের সামনে আমরা দাঁড়াই, অধঃপতন লক্ষ করি। আদর্শ কখনো কখনো ডেকে ওঠে।

        সহজ গদ্যের চালে প্রতিটি ভাবনায় শান্তস্নিগ্ধ উত্তরণ আবিষ্ট করে রাখে। মর্মপীড়ার ক্ষত উন্মোচিত হলেও উত্তেজনা আসে না। আবেগ তপ্ত উল্লাসে ফেটে পড়ে না। উচ্চকিত তাড়নও নেই। অনুভাবনার অনুধাবন আছে। দ্রষ্টার নিবিড় তর্পণও আছে। আত্মতার স্ফূরণ আছে। কথার ধ্বনিসাম্যে নিয়ন্ত্রিত বলয় আছে এবং কবিতা হয়ে ওঠার দর্শন আছে। বিনম্র স্মৃতিমেদুরতায় তিনি যেমন অতীতকে ছুঁয়েছেন, তেমনি নিখুঁত স্রষ্টার সৃষ্টিসমূহ থেকে পেয়েছেন বর্তমানের প্রেরণা। ভাষায় রূপকল্পে, গল্পের চালে এর শেষ সিদ্ধান্তের মোচড়ে কবিতায় যে মিথের সৃষ্টি করেছেন, তাতে সহজেই একক পরিধির ক্ষেত্র চিহ্নিত হয়ে গেছে—তা বাংলা সাহিত্যের এক নতুন সংযোগ। যে তুচ্ছ বিষয়, যে তুচ্ছ ভাবনাকে তিনি নিরীক্ষীয় সূত্রের পর্যবেক্ষণে যখন অবধারিত করে তুলেছেন— তা তখন তার লঘুত্ব অনিবার্য মননক্রিয়ায় সংঘটিত হয়ে বিশালত্বের মর্যাদা পেয়েছে। একটা ছোট কবিতাতেও এই বিস্তার ও বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। তাঁর সমগ্র কবিতাতেই এই লক্ষণীয় উপপাদ্য বিশিষ্টতা পেয়েছে।

       একদিকে মানবপ্রবৃত্তির ক্রিয়া এবং ক্রিয়ার বিস্তার ও পরিণতি; যেখানে যৌনতা থেকে স্বপ্ন, বৈকল্য সমস্তই ধরা আছে।

      অপরদিকে সমাজক্ষেত্র, যেখানে রাজনৈতিক থেকে বেকারত্ব, অধঃগামিতা সবই পর্যবসিত হয়েছে। সুতরাং উপপাদ্যের দেওয়ালে ব্যক্তি থেকে নৈর্ব্যক্তিক, অংশ থেকে সামগ্রিক প্রতিফলিত। তিনি যখন লেখেন:

“আশির দশক বলে আলাদা করি না; ট্রাউজার

নদীতে ভাসছে,পাড়ে ভ্যান, ভিড়, মারা গেল গেল।

চূড়া থেকে দেখি সারসার জিপ শহরে ঢুকছে

আমি থাকব না জেনো, থাকবে না আশির দশক।”

            (থাকবে না: ঋক্ষ মেঘ কথা)

১৯৮৩ সালে বেরোনো ‘ঋক্ষ মেঘ কথা’ কাব্যে সময়টিকে চূড়ান্তভাবে ধরেছেন কবি। যে হিংসার কবলে আমাদের দেশ-সমাজ শাসিত হয়েছে, হানাহানির রক্তপাতের চোরাস্রোতে সময় বয়ে গিয়েছে—সেই অস্থির দুর্যোগকে কবি দেখেছেন কাছ থেকে। উদ্বাস্তুর সমস্যা, বিপন্ন মানুষের নেতিবাচক জীবনযাপন, শূন্যতার মহারুদ্রে তার অভিযোজনও বিস্ময়কর। নিজ অবয়বেই ফুটে উঠেছে ঋক্ষ ও মেঘ। মানুষের এই রূপান্তর গভীর আত্মতায় সত্তার বিকীর্ণ-মিথস্ক্রিয়া, যাতে নিজেকে আলাদা,একক ও নিঃসঙ্গতায় পর্যটন করায়।কবি তখনই লিখতে পারেন:

“এক গন্ধর্বের ছেলে-মেয়ে সূর্যাস্ত দেখতে এসেছে

আমি তাদের মাঝখানে পিঠে কুঁজ নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছি

কুঁজের অগণিত মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে কীট”

                                     (ঋক্ষ মেঘ কথা)

  এসব কীট তো আদিম স্পৃহারই অনবদ্য রূপ, অবদমিত ইচ্ছারই অনুক্রিয়া। ‘কুঁজ’ সভ্যতার মারণ অসুখ, যা প্রত্যেককেই বয়ে বেড়াতে হয়। কবির এই গল্প কতখানি অন্তর্দ্রষ্টার নিরপেক্ষ উচ্চারণ এবং ভেতরের কথা হয়ে ওঠে—তা পাঠকমাত্রই জানেন। সুতরাং গল্পের ভেতরে শুধু গল্প থাকে না—থাকে জীবনের অনুক্ষার, সময়ের দর্শন এবং ইতিহাসের তাৎপর্য। এই কাব্যের আর একটি কবিতায় দেখিয়েছেন ঘাতকের নিষ্ঠুরতার সঙ্গে যৌনতারও কী সম্পর্ক। ধর্ষক ও ঘাতক—যে অনুভব থেকে চিত্র তৈরি হয় এবং যে চিত্র শুধু জৈবনিক বিকৃতির অন্তরালে ক্ষয় ও নৈতিকতাহীন জীবনের পরাগমোচন করে সেই চিত্রকেই কবি ভাষা দেন।—

“তখন দুভাবে নামে সমকাল,একদিকে নেমে আসে বৃষ্টি

যেদিকে উটের শারি, কুঁজের মতন স্তন,শক্ত কঠিন

চামড়া পরানো; দাঁতে কেটে কেটে সে চামড়া করেছে ছিবড়ে

তবু শান্তি নেই আজ,কালপুরুষের সাতবাহু গ্যালাক্সিতে

লুঠ ও সন্ত্রাস করে ফেরে” (ভিক্ষা)

       এক যৌনকারী স্বৈরাচারী প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি, অঙ্গ ও অনঙ্গ কল্পনার মেধা থেকে পরাহত হয়ে ফিরে আসে ভিক্ষান্নের কাছে; এও তো জৈবপাত! যেখানে আশ্চর্য সবুজ ভাত ও আদিম জীবনচারণাই কাম্য হয়ে ওঠে। ‘শরীরে ছত্রাক’ নিয়ে সেই উপেক্ষা। আদিম পরবশতায় সৃষ্টির উৎসে ফিরে কবি নিজেকে ভাবতে ভালোবাসেন। তাই জলাশয় থেকে অরণ্য, পাশবিক থেকে মনুষ্যত্ব লাভ সবই ক্রমপর্যায়ে ফিরে আসে। বিচরণ ক্ষেত্রের যেমন বিস্তার ঘটে, তেমনি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেও বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়।

            ‘একা নরকগামী’ কাব্যে ‘অলিভ গাছের পুত্র’ কবিতায় এই সৃষ্টির উৎস স্বপ্ন কাম দ্রোহ সবই আত্মকথার মতো শুনিয়েছেন। পরনারী কামনা না করলেও নিজে যে একদিন অশ্বের মতো কামুক ছিলেন,পরের দ্রব্য তছনছ করতেন তা অকপটে স্বীকার করেছেন। আর তারপরের অনুভব কাহিনি এরকম:

“তখন আমার বাইশ বছর,সে এক ভীষণ বয়েস

বন্ধুর বোন,বন্ধুর নারী,বন্ধুর টাকা না পেলে

মনে হোত আর বেঁচে থাকবো না,হয়েছি গন্ধমূষিক

গর্ত পাহারা দেবার জন্য জন্মেছিল যে হঠাৎ।

তখন কিছু ভালো লাগত না রোজ মৈথুন করেছি

বাঁটা লঙ্কার সমস্ত রাগ মিটিয়ে নিতাম শরীরে।”

        বয়ঃসন্ধি ও নবযৌবনের সম্মোহন ও যৌনক্রিয়ার আবশ্যিক পর্যায় হয়তো এটাই। তখন নার্সিসাসের সঙ্গে বিপরীত লিঙ্গের প্রতিও আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। কিছুতেই ‘থির নাহি বান্ধে’। কবি বলেন ‘আমার অশ্ব অবুঝ, আমরা সংযত হবো কী করে?’ সমস্ত নারীরই সে দখল চায়, প্রকৃতিও যৌনতার ঘর হয়ে ওঠে। যে চোখ ভেতরে ঢোকে তা নারীর, কাপুরুষকে রক্তাক্ত করা তির।

    কবি যে ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছেন তার অতীতে ফিরে তাকিয়েছেন। চণ্ডাল পিতার বিদ্রোহী সন্তান হয়ে তিনি বিভেদের, অমর্যাদার, নিঃস্বতার রূপ উপলব্ধি করেছেন। ভাষায়, চালচলনে, রুচি ও জ্ঞানে নিজেকে ব্রাত্য মনে হয়েছে। উচ্চকণ্ঠে চণ্ডালের পরিচয় দিয়ে কবি প্রতিবাদ করেছেন:

“অদ্ভুত এক জায়গা

আমি যে একটা মানুষ

আমি যে এক মানুষ

কখনোই মনে থাকে না ভদ্রলোকদের।”

(আমার শরীরে করমচা কাঁটা জন্মায়: ঐ)

      পৌরাণিক বাতাবরণ থেকে, আর্যগণের সামাজিক বৈষম্য থেকে নিজেকে দেখেছেন ইতিহাসে অবহেলায়।আর সেই ঐতিহ্যকে লাথি মেরে, ঘৃণা করে ভেঙে ফেলতে চেয়েছেন। সাম্যের যুগ, সৃষ্টির সমতার যুগে ব্রাহ্মণ বলে কেউ অসাধারণ মানুষ থাকতে পারে না। প্রাচীন দেশের প্রাচীন মানুষের কাছে কবি পৌঁছে গেছেন। আর্যাবর্তের মানুষ যেখানে অসভ্য উপজাতি থেকে বিজ্ঞানী, বিদ্বান, আকাশবিজ্ঞানী,চণ্ডাল, আচার্য সবাই আছেন। হস্তিনাপুর, বিপাশা, নর্মদা, সুবর্ণরেখা সবই জন্ম-আশ্রয়ের লীলা ও রূপ। উজ্জয়িনী, শূদ্রক, বাসবদত্তা আজকের দেশ ও জনমানুষে রূপান্তরিত। বাহক রিক্সাওয়ালাই ভগীরথ। ইতিহাস চেতনার সঙ্গে নৃতত্ত্ব বিদ্যায়ও কবি দেশের ভেতরে, দেশ ও মানুষের ভেতরে মানুষ খুঁজে পেয়েছেন। কবি সেই ঠিকানাও দিয়েছেন:

“প্রতিটি ঘরের

প্রতিটি দরজা তুমি আঘাত করবে

কাকে চাই? কাকে চাই? কাকে?

বাসবদত্তাকে

আম্রপালীকে

শকুন্তলাকে”

(আমরা একুশ জন: চন্দ্রদোষ ওষুধে সারে না)

         বহু মানুষ যেমন একক মানুষ, তেমনি একক মানুষও বহু মানুষ। তাই কখনো কখনো এক সুবোধ সরকার আটটি যুবকে পরিণত হন, আটটি জায়গা থেকে ফিরে এসে রাত্রি বারোটায় বাড়ি ফিরতে চান। পেট, শোয়াশুয়ি, বিগ্রহ নিয়ে যেসব নিচু স্বরে কথাবার্তা চলে তা যেমন রসিকতা, তেমনি সিরিয়াসও। যেমন ভরাপেট, খালিপেট এবং পরম চরম খাওয়ার পর জীবনকে উপভোগ করা গেলেও অবিবাহিত ছোট বোনের পেটে বাচ্চা এলে ‘ওটা কার’ সে-কথা জিজ্ঞেস করা কত কঠিন তা সুবোধ সরকার বলেছেন। তেমনি কার পাশে কে শোবে সেটাও বুঝে-সুুঝে নির্বাচন করতে হয়। তবে ছোটবেলায় বর্ষার রাতে মাকে ঝাপটে ধরে শোয়ার মতো আনন্দের স্মৃতি তিনিই জাগিয়ে তোলেন। জীবনের ব্যত্যয় থেকেই কবিতাকে তোলেন, আবার জীবনের দিকেই তাকে নিয়ে চলেন। তাই তাঁর কবিতার গল্প শেষ হয় না। একটা গল্প থেকে আর একটা গল্পের বাতাবরণ তৈরি হয়। সাময়িক থেকে শাশ্বত, মুহূর্ত থেকে মহাবিশ্ব ছড়িয়ে যায়। আমাদের মাত্র আড়াই হাতের গণ্ডি। জীবনের এই সীমানা ভেদ করলে প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে যখন নিজেদের গড়ে নিতে পারি—তখন ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা বিসর্জনও দিতে পারি। সেই আত্মহারার ডাকে আমরা কখনো কখনো ‘আড়াই হাত’ অতিক্রম করি। এখানেই সুবোধ সরকার দার্শনিক হয়ে যান:

“একটা দিন আমরা বাচ্চাদের নিয়ে

                                 ঝিলমিল দেখতে যাই

ঐ একটা দিন আমরা একটু বড়ো হয়ে উঠি

ভুলে যাই কাকে থাপ্পড় মারার কথা ছিল,

কাকে শাস্তি দেবার কথা

কুৎসা রটানোর কথা।” (আড়াই হাত মানুষ)

     চুম্বনের রহস্য যা-ই থাকবে থাকুক, পৃথিবীতে শান্তি ফিরুক। এই শান্তি কামনা সুবোধ সরকারের কবিতাকে বারবার সদর্থক করে তুলেছে। এই কারণেই এই কাব্যের ‘চুম্বন’ কবিতাতে লিখেছেন:

“আপাতত সারা পৃথিবী যে চুম্বন দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা করে আছে

তা হলো জর্জ বুশের গালে সাদ্দাম হুসেনের মোটা ভারী পুরুষালী ঠোঁট।”

          কিন্তু এ চুম্বন সম্ভব হয়নি ইতিহাস পাল্টে গেছে। আবুঘ্রাইব জেলের দৃশ্য আমাদের সচকিত করেছে। সাদ্দামের করুণ পরিণতিও ব্যথিত করেছে। কবির সদর্থক জীবনের অন্বেষণই মানবমুখী করে তুলেছে। তাই ‘দিনের বেলার ভাষা’ অর্থাৎ সরল ও স্বাভাবিক কল্যাণের বাণীকেই বুঝেছেন; কিন্তু পৃথিবী কত জটিল, কত শ্বাপদ-সঙ্কুল জীবন, হিংস্র ও কামুকতায় ভরা উপলব্ধি করেছেন রাতের মানুষের কাছে। শিল্প নগরীর অন্ধকারে।হোটেলে হোটেলে। নারী বিক্রি, নারী পণ্য, নারী পাচার এগুলো আজ আর নতুন নয়। এমনকী নারী ধর্ষণও জলভাত। রুটির সঙ্গে নারী, মদের সঙ্গে নারী। নারী ধর্ষণের কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখলেন—তাদের হাসি,ভর সন্ধ্যার ছাদে দাঁড়ানো, সুন্দর পা দেখানো, খোলা পোশাক ইত্যাদি। কিন্তু পুরুষ যন্ত্রটির দায়িত্ব তো পুরুষ নিতে পারে,তাহলে নারীকে ধর্ষিতা হতে হয় না। সাত বছরের মেয়ে, কারো বোন ধর্ষিতা হয়ে লজ্জায় যখন শিউলি গাছে রূপান্তরিত হয়, তখন ‘কোথায় কি সেই পুরুষ আছে যে এই গাছকে ধর্ষণ করতে পারে?’ কবি আবারও চাবুক মারলেন ধর্ষক সমাজকে। রাতের অন্ধ পশুকে। প্রতিভাবান মানুষদের যেমন ভালো মানুষ না হলেও চলে, তেমনি যত ইচ্ছে নারী সহবাস করা চলে। কথাটি যে মিথ্যে নয় তা আমরা অনেক প্রাতঃস্মরণীয় মানুষের আত্মজীবনীতেই জেনেছি। রাজনীতির লোকও যে বলাৎকার করতে পারে এবং ‘করে’ ‘খাওয়া’ ক্রিয়াপদ দুটি ছাড়া জীবন হয় না—তাও কবির অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে। কখনো ক্রিয়াপদও চরিত্র হয়ে ওঠে। ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটি একটি চরিত্র ‘মি. ষড়যন্ত্র’। পৃথিবী যখন মিস ইউনিভার্সে মেতে উঠেছে, রূপ-যৌবনে মাতাল হচ্ছে, তখন অন্যদিকে দারিদ্র্য ও বুভুক্ষু মানুষকে নরকে ঠেলে দিচ্ছে এ চিত্রও উঠে এসেছে। ভোটরঙ্গ, হরতাল, খুন, সুখের বাড়াভাতে ছাইও দেখেছেন কবি। ‘রূপমকে একটা চাকরি দিন’ সেই বেকারত্বের করুণ আবেদনও বেজে উঠেছে হাজার হাজার রূপমের জন্য। সেই সব রূপমের ডেডবডি জল থেকে তুলে দেখা গেছে ‘সারা গায়ে ঘাস,খড়কুটো, হাতের মুঠোয় ধরে থাকা একটা এক টাকার কয়েন’। জীবনের আদিম চাওয়া-পাওয়াকেই, জৈবনিক অভ্যাসকেই রূপম ধরতে চেয়েছিল। তাই সারা গায়ে খড়কুটো, হাতের মুঠোয় কয়েন। ছিঃ রাজনীতি  করবেন না,ভালো জায়গাটা কোথায়? ধন্যবাদ মরীচিকা সেন, জেরুজালেম থেকে মেদিনীপুর প্রভৃতি কাব্যগুলিতে জীবনের এই অস্থির ধূসরতা বারবার নাড়া দেয়। আত্মহত্যা থেকে খুন, জীবন থেকে পলায়ন সবই আমাদের অসহায়তার অনুলিপি সাজন কবি। সুন্দর স্তন যা দেখে অন্ধ হয়ে যেতে হয়, সেই স্তনও ক্যান্সারে পচা, অন্তঃসারশূন্য জীবনের করুন অন্তর্বিলাপ আমাদের কতখানি নিয়তির মতো ঘিরে থাকে তা নিজস্ব ঢঙেই কবিতা হয়ে ওঠে।

    কবিকে যতই ‘কেন গল্প বলছেন?’ বলে দোষারোপ করা হোক না, কবি জানেন বনলতা সেনও গল্প ছাড়া নয়। আসলেই গল্প ছাড়া জীবনই হয় না। সুতরাং ‘গল্প থাকবেই’। 

  কবিতার পাঠক কারা? অর্থাৎ মাছওয়ালা কবিতা পড়ে না, মধু বিক্রেতা কবিতা পড়ে না, মুমূর্ষু কিশোর, জ্যোতি বাবু কেউই কবিতা পড়েন না এসব কবিকে জানালে কবি উত্তর দেন ‘মরুভূমির গোলাপ’ কাব্যে:

“তবে কি রাক্ষস পড়ে সমস্ত কবিতা?

তবে কি খোক্ষস কেনে কবিতার বই?”

তখন আমরা বুঝতে পারি জীবনের জন্যই কবিতা। কবিতা সকলেরই। ব্যক্তিবিশেষকে দিয়ে বিচার করা যায় না। আবহমান কালের সমস্ত মানুষের জীবনধর্মেই তার আশ্রয়।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত