| 18 এপ্রিল 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প ধারাবাহিক

অসমিয়া উপন্যাস: গোঁসাই মা (পর্ব-১৩) । নিরুপমা বরগোহাঞি

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Nirupama Borgohainঅভিযাত্রী’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি বিজেতা নিরুপমা বরগোহাঞি ১৯৩২ সনে গুয়াহাটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন।১৯৫৪ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ এবং ১৯৬৫ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসমিয়া সাহিত্যে এম এ পাশ করেন। লেখিকার প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে ‘সেই নদী নিরবধি’, ‘এজন বুড়া মানুষ’, ‘এপারর ঘর সিপারর ঘর’ সহ মোট একুশটি উপন্যাস এবং ‘সতী’, ‘নিরুপমা বরগোহাঞির শ্রেষ্ঠ গল্প’ইত্যাদি দশটি গল্প সংকলন রয়েছে।


তারপরে আরও এক ঘণ্টা পার হয়ে গিয়েছিল, শ্রীমতী গোস্বামী পুতুকে পাঠিয়ে দিয়েও কোনো সব খবর সংগ্রহ করতে পারছিলেন না, তাই সেই এক ঘন্টা তিনি এক প্রকার নরকযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে পার করে দিয়েছিলেন এবং তারপরে উস্কোখুস্কো চুল নিয়ে শেষ পর্যন্ত অপু যখন ঘরে ফিরে মাকে চিৎকার করে বলেছিল – মা,মা কী আছে খেতে দাও খুব ক্ষুধা পেয়েছে’,– তখন শ্রীমতী গোস্বামী দ্রুত রান্নাঘরে গিয়ে চোখের জল গোপন করেছিলেন। স্বস্তিতে, আবেগে, আনন্দ ও হৃদয় মথিত  করে বেরিয়ে আসা সেই চোখের জলও অপুর  প্রতি ভালোবাসার মতোই ‘ বিশেষ’ ধরনের চোখের জল।

কিন্তু শইকীয়ানীর কথার সঙ্গে অপুর কথার হুবহু মিল থাকাটাও তাকে কেন জানিনা বড় অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে ফেলে। কিছুদিন আগে রুণী তাকে কোনো একটি কলেজের একটি ম‍্যাগাজিন এনে একটি প্রবন্ধ দেখিয়ে হাসতে হাসতে বলেছিল–’ মা, মা তোমার বন্ধু শইকীয়ানী মাসির কন্যা তপতীর কী সুন্দর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে দেখ, লিখেছে যে অসমিয়া সংস্কৃতি সবদিক দিয়ে বিপন্ন হয়ে পড়েছে,– ভাষা সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে, চাল-চলন, আদব-কায়দা সবকিছুতে , তাই অসমের নতুন পুরুষ দলে দলে লাচিত, মূলার  মতো বেরিয়ে এসে এই সর্বনাশ থেকে অসমকে রক্ষা করা উচিত। প্রবন্ধটির নামই দিয়েছে– লাচিত মুলার দেশের নতুন পুরুষ কী না করতে পারে? মা তুমি গিয়ে  শইকীয়ানী  মাসিকে মেয়ের  প্রবন্ধের জন্য প্রশংসা কর, তপতীর ডি.এফ.ও পিতা দেশি- বিদেশিকে চোরাই করে বনাঞ্চল কেটে ধ্বংস করার সুযোগ করে দিয়ে যে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছে তা দিয়ে তোমাকে ভালোভাবে চা-জলপান খাইয়ে দেবে।’


আরো পড়ুন: অসমিয়া উপন্যাস: গোঁসাই মা (পর্ব-১২) । নিরুপমা বরগোহাঞি


শ্রীমতী গোস্বামীর যে কী  বিপদ ! তিক্ত বিরক্ত মনে তিনি  ভাবেন যে অপুর জন্য যদি তাঁর এক ধরনের চিন্তা,রুণীর জন্য আবার অন্য ধরনের চিন্তা। এই ছোট বড় না মানা মেয়েটি একেবারে স্রোতের সম্পূর্ণ বিপরীতে  চলেছে ,কথায় বলে দলবেঁধে ভেসে চললে ছোট পোকামাকড়ের ও মৃত্যু নেই( অবশ্য এই যুক্তিটা অপুর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে তার ইচ্ছা করে না অথচ সে স্রোতের বিপরীতে একাই ভেসে  চলেছে । এই বিষয়ে বাবাও চিন্তিত। একদিন তিনি আদরে মাথায় তুলে রাখা মেয়েকে দুর্বলভাবে হলেও এই কথায় সতর্ক করে দিতে চেষ্টা করেছিল , কিন্তু কে শোনে কার কথা ? একবার মাথায় উঠে গেলে কেউ কি আর সেখান থেকে নামে? কথাবার্তায় চৌকশ মেয়েটি বাবাকে হেসে হেসে বলেছিল – বাবা, আমি যে কাজ করি, নিজের যুক্তি-বুদ্ধির দ্বারা গভীরভাবে ভেবে চিন্তে, সমস্ত পক্ষের কথা পড়ে শুনে নিজের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে তবেই তা করি। এই বিষয়ে আমি কবি লং ফেলোর মহান বাণীকে অনুসরণ করে চলি–’Be not like dumb, driven cattle /Be a hero in the strife…’ 

এদিকে অপু বেশ আগ্রহ এবং আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করছিল বাবার সতর্কীকরণে রুণী কিছুটা হলেও কাবু হবে বলে, কিন্তু এখন তার এই ধরনের উত্তরে সে মুখ ভেঙ্গিয়ে বলে উঠেছিল–’ যা যা, কোথাকার এক বীরাঙ্গনা এসেছে। তুই টের পাচ্ছিস না তো, আমার বোন বলেই বেঁচে আছিস, নাহলে কবেই চুল কেটে দিত –’ অপুর কথার মধ্যে থাপ মেরে রুণী তখন বড় নিরীহ ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেছিল–’ কেন দাদা? তোদের আন্দোলন নাকি গণতান্ত্রিক, অহিংস এবং শান্তিপ্রিয়? তাহলে তো অন্তত গণতন্ত্রের নিয়মটিকে মেনে You must agree to disagree with me?’

উত্তরে অপু কিছু একটা বলার আগেই গোস্বামী হাঃ হাঃ করে প্রাণ খোলা হাসি হেসে বলেছিল–’ এইবার কিন্তু তোর কোনো জবাব নেই অপু…’

অপুর বোন বলে রুণী কতদিন রক্ষা পাবে শ্রীমতী গোস্বামী জানে না, কিন্তু এই মেয়েটিকে নিয়েও তাঁর ভয় কম নয়। এখন তিনি  তপতীর প্রসঙ্গে বিরক্ত হয়ে মেয়েকে ধমক দিয়ে উঠেছিলেন–’ এর আর কোনো কাজ নেই, কে কোথায় কী করছে কেবল তার খবর নিয়ে বেড়ায়। তপতী কিছু একটা লিখেছে তো লিখেছে, তাতে তোর কী হল।’

কিন্তু মুখে এভাবে বললেও শ্রীমতী গোস্বামী মনে মনে মেয়ের সঙ্গে একমত হন এবং রুণী তপতী সম্পর্কে কী কথা বলতে চাইছে তা ভালো করেই বুঝতে পারেন। ইংরেজ ভারত ছেড়ে যাবার তিন দশক পরেও তাদের শিক্ষা সংস্কৃতির ঐতিহ্য গৌরব সমস্ত দিকে যারা বহন করে চলেছে সেই বিরাট সংখ্যক অসমিয়াদের মধ্যে তপতীদের ঘরের মানুষ গুলিও অন্তর্ভুক্ত। তাদের পোশাক পরিচ্ছদ যতটা সম্ভব পশ্চিমী ধরনের– অর্থাৎ তপতী অসম রক্ষার আন্দোলনের আগে পর্যন্ত মেখেলা চাদর পরে দেখে নি, জীনছ  আদিতেই অভ্যস্ত ছিল সে, স্টিরিওতে বেশিরভাগ  নানা ধরনের পপ সঙ্গীতই বাজে, বাইরের বইপত্র ম্যাগাজিন ইংরেজি ভাষায় কেনে বা পড়ে। তাই সেই তপতী এরকম একটি প্রবন্ধ লিখতে যাওয়াটা ভন্ডামির নামান্তর।

তাই সেই তপতীদের ঘরের মানুষের কথার সঙ্গে অপুর কথার মিল থাকা কথাটা শ্রীমতী গোস্বামী কে অস্বস্তিতে ভোগায়, অথচ অপু এত গভীর নিষ্ঠায় আন্দোলনে ব্রতী  হয়েছে যে তাকে কোনো ধরনের আপত্তির কথা বলতে তার সাহস হয় না,রুণীতো কখনও কখনও মুখ ফুটে বলেই ফেলে–’ তুমি তোমার আদরের পুত্রকে কিছুই বল না, অথচ আমার প্রতি কথায় দোষ– তোমরা মহিলারা সবাই ছেলে মেয়েদের ক্ষেত্রে ছেলেটি সব সময় পক্ষপাতিত্ব করবেই …’

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত