| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

।। দীপক বিশ্বাস ।।

দৃশ্যটা আজ নিয়ে চার দিন চোখের সামনে ভেসে উঠল। ঠিক চার দিন নয়,ভাসল তিন দিন। সূচনা হয়েছে স্বপ্ন নিয়ে। তারপর চোখের সামনে ভাসছে একদিন পরপর। যেন নিয়ম করে। যতই ভাসছে ততই তাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন কালোসোনা গোঁসাই। কিন্তু মুখের ব্রণের মত, চেপে ধরলেও ফুঁড়ে বেরোয়! মানুষটিকে যেন খানিক তটস্থ মনে হচ্ছে ধামবাসীর। কিন্তু কেউ কোন কথা পাড়েনি তাকে। নবসৃষ্টির ভাবে বিচলিত হয়তো… তাই এমন। জানে নতুন কিছু ধরতে পারলে, তিনি নিজেই ভাগ দেবেন সকলকে। সে কারণে তারা কেউ ঘনিষ্ঠ হয়নি।

 

       বুকের বাঁ দিকে চেপে ধরে শান্ত থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি। চোখ বন্ধ। না, আর তেমন কিছু মনে হচ্ছে না। কোনো দৃশ্য ভেসে এলো না। যেন কিছুটা স্বস্তি পেলেন, মন স্থির হল। ঠোঁট মৃদু হাস্যে সামান্য প্রসারিত হলো। কিন্তু পরক্ষণে একটা পোড়া দেওয়া বেল ফাটার মতো ফটাস করে শব্দ হলো। এমন অপ্রত্যাশিত শব্দে অন্তরটা কেঁপে উঠলো তাঁর। শরীরটা টাল খেয়ে গেল। একটু দূরেই একজন ভক্ত গাঁজা সেবনের সরঞ্জাম নিয়ে বসেছিল। সে ছুটে এসে “কী হয়েছে কালোসোনা গোঁসাই ?” বলে তার টাল খাওয়া শরীরটা ধরল। কাঁসার কমণ্ডলু থেকে জল ছিটিয়ে দিল চোখে-মুখে। বট গাছের গায়ে  পিঠ ঠেকিয়ে চাতালে বসিয়ে দিল গোঁসাইকে। তারপর কিছু বলতে চাইলে কালোসোনা গোঁসাই তাকে হাত তুলে থামিয়ে দিলেন ।

 

    খানিক বাদে হাতের ইশারা পেয়ে আবার সে গোঁসাই এর কাছে গেল কল্কে নিয়ে। গোঁসাই তার হাত থেকে কল্কে নিয়ে দম দিয়ে আবার ফিরিয়ে দিলেন।

 

              ২.

 

     চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে একটা রাস্তা বেরিয়ে নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের বাড়ি ছুঁয়ে চলে গেছে বনগাঁর দিকে। সেই রাস্তার আবার একটা শাখা বারো-তেরো শো বিঘার জলা খাসজমি এফোঁড়-ওফোঁড় করে মেঠো রাস্তা হয়ে চলে গেছে হরিণঘাটার দিকে। এই রাস্তার ওপরে বিলের মাঝ বরাবর একটা বট গাছের নিচে গোলাকার শান বাঁধানো চাতাল, তার পুবে ভোলানাথের মন্দির এবং গাছের ডানদিকে একটা ধাম। শান্তিধাম। সারাবছর যেখানে গোঁসাই- গোবিন্দের বাস। যারা প্রতি সন্ধ্যায় গানের আসর বসায়। প্রচলিত ধর্মীয় সংগীত ছাড়াও এদের নিজস্ব রচিত গান। গান বাঁধেন কালোসোনা গোঁসাই, সুর দেন কমলহরি গোঁসাই কিংবা লক্ষ্মীনারায়ণ গোঁসাই। নতুন গান নিয়ে এক দেড় সপ্তাহ চলে চর্চা —- সঙ্গে পুরনোও। যেটা মনের সঙ্গে খাপ খায়,সেটা থেকে যায় কণ্ঠে। যেটা দাগ কাটে না সেটা বিলের ঘাসের মত কাস্তের পোঁচে হারিয়ে যায়।

 

              মন্দির এবং চাতাল কংক্রিটের হলেও গোঁসাইদের শান্তিধামের চাল খড়-বিছালির। বেড়া বাশেঁর বাখারি দিয়ে হোগলার। মেঝে মাটি নিকানো। খড়ের চাল প্রায় প্রতি বছর ছাইতে হয়। না হলে পচে জল পড়ে ঘরে। ধান তোলার মরসুমে প্রায় সকল চাষিই এক আঁটি করে বিছালি মন্দিরের নামে দিয়ে যায়। তাতেই ছাওয়া হয়। আর হোগলা তো আছে মাঠ ভরা, কেটে নিলেই হলো। এই এক ঘরেই আট-দশজন থাকা যায়। বর্তমানে ছয় জন আছেন। পাঁচজন গোঁসাই ও একজন ভক্ত — মহানন্দ। কাছের গাঁ চরণডাঙাতেই তার বাড়ি কিন্তু বেশিরভাগ দিন ধামেই কাটায়। গঞ্জিকা তার বড্ড প্রিয়। সে-ই সব জোগাড় করে। গোঁসাইদের প্রসাদ পায়। প্রতি সোমবার মহাদেবের পুজো দিতে আসে চারপাশের পাঁচ-ছয় গাঁয়ের লোক। মন্দিরটা মাঠের মাঝখানে হওয়ায় চারিদিকের লোকের আসতে সুবিধা হয়। সপ্তাহের একদিনে যা প্রণামি ও চাল-কলা- আলু পড়ে তাতে দিব্যি চলে যায় গোঁসাই-গোবিন্দের। গোঁসাইদের সকলে সৎ, ভদ্র এবং ধার্মিক বলে ভক্তেরা শ্রদ্ধা ভক্তি করে। তবে গঞ্জিকা সেবন ভোলে বাবার চ্যালা মাত্রই করে থাকে বলে ভক্তেরা সে বিষয়ে বিশেষ আমল দেয় না।

 

   কিছু সময় পার হলে কালোসোনা গোঁসাই একটু স্বস্তি বোধ করেন।গুছিয়ে বসেন বটতলার চাতালে। তারপর নিজেই ভাবতে থাকেন এমন প্রতিক্রিয়ার কারণ কী? সাধারণত খুঁজে পান না তেমন কিছু। কিন্তু কিছু না কিছু তো অবশ্যই আছে একথা মানেন। মাস দেড়েক আগের একটা কথা মনে পড়ে হঠাৎ । পাগলাতলা থেকে এক মহিলা এসেছিলেন সেদিন নৈবেদ্য সাজিয়ে। পুজোর শেষে সকল ভক্ত চলে গেলেও তিনি বসেছিলেন চুপ করে, চোখ বুজে। বহুক্ষণ পর কালোসোনা গোঁসাই এগিয়ে গিয়ে তার পাশে বসে মৃদু স্বরে বলেন,

” মা, তোমার কি কোনো বিশেষ প্রার্থনা আছে?” চোখের সামনে ধামের সবচেয়ে প্রাচীন গোঁসাইকে বসে থাকতে দেখে তাকে প্রণাম করে মহিলা বলেন,

 “বাবা আমার কোন প্রার্থনা নেই, কিন্তু আমি এক গভীর সমস্যায় বিচলিত ভাবে দিন কাটাচ্ছি। জানি না এর থেকে মুক্তির উপায় কী? আমার তিন সন্তান। বড়টি ছেলে, মেজো মেয়ে এবং ছোটটিও ছেলে। বড় দুজন স্বভাব, বৈশিষ্ট্যে এবং মুখের গড়নে ঠিক ওদের বাবার মত। কিন্তু আমার ছোট ছেলেটি অতিরিক্ত ফর্সা,স্বভাবও আলাদা এবং মুখের গড়নেও একেবারে ভিন্ন। তাই নিয়ে স্বামী আমাকে নানা কথা শোনায় এবং সন্দেহ করে। ক্রমশ তা চরম হয়ে উঠছে। অথচ আমি জানি এবং আমার ভোলেবাবা জানে আমি অন্য মানসিকতার নই। এখন আপনি বলুন বাবা আমি কী করবো? মহাদেব এবং আপনাদের তো আমরা আলাদা ভাবি না! সমাধান করতে পারলে আপনারাই পারবেন। আমাকে স্বস্তি দিন বাবা — স্বস্তি দিন।”

 

      আজ সকালেই মহানন্দ বৃকোদর গোঁসাইকে বলছিল পাগলা তলায় একজন মহিলা তার পাঁচ বছরের ছেলেকে গলা টিপে মেরে, নিজেও গলায় দড়ি দিয়েছে। কথাটা কালোসোনা গোঁসাই আর পাঁচজনের মতো সাধারণ মনে শুনেছিলেন। কিন্তু খানিক পরে তার মনে হলো মৃত মহিলা সে নয় তো, যে তার সমস্যার কথা বলেছিল সেদিন? কালোসোনা গোঁসাই তার বরকে নিয়ে শান্তিধামে আসার কথা বলেছিলেন। তিনি কথা বলে দেখবেন। কিন্তু তাকে রাজি করাতে পারেনি বোধহয় —- উল্টে নানা কথা শুনিয়ে থাকতে পারে; সে কারণে হয়তো অসহনীয় জ্বালা মেটাতে এমন চরম পথে চলে গেছে!

 

     বারবার মেয়েটির মুখ মনে পড়ে যাচ্ছে কালোসোনা গোঁসাইয়ের; কি আকুতি নিয়ে বলেছিল “মহাদেব আর আপনাদের তো আমরা আলাদা চোখে দেখি না। সমাধান করতে পারলে আপনারাই পারবেন।” কত বড় বিশ্বাস! কত ভরসা! কিন্তু তার কোনো কিছুই দেখাতে পারলেন না তিনি। মানুষকে সঠিক পথ দেখাতে না পারলে সন্ন্যাস জীবনের কী মূল্য ? চাতাল থেকে মন্দিরে উঠে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন তিনি মহাদেবের সামনে। তার চোখে চোখ রাখলেন। এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। খানিক পরে থুতনি বেয়ে কয়েকটা ফোঁটা ঊরুর ওপর পড়ল! ঝাপসা চোখে মহাদেবের চোখ যেন হারিয়ে গেল, বদলে একটা বীভৎস ক্ষত মুখ ভেসে উঠল। কেঁপে উঠলেন কালোসোনা গোঁসাই। কানে বেজে উঠল নারীর তীব্র অভিশাপ-” আমি সৃষ্টি করেছি,তুমি ধ্বংস! সৃষ্টির শাস্তি নেই, ধ্বংসের আছে। তুমি যদি তা করে থাক নিশ্চয় তা পাবে।” কঠোর ঘৃণা এবং নারীর অভিশাপ যে কত মারাত্মক হতে পারে তা জানা ছিল না কালোসোনা গোঁসাইয়ের। মহাদেবের পায়ে মাথা নত করে ভেঙে পড়েন তিনি -” বাবা, স্বস্তি কি পাব না? সব কিছুরই তো সীমা আছে, অসহনীয়তার কি সীমা-পরিসীমা নেই? এত কৃচ্ছ্রসাধনেও কি মুক্তি হবে না? তবে কি…… “

 

 

              ৩.

 

    ” কী বললে তুমি?  আর একবার বলো? “

” ঠিকই শুনেছ, আবার শোনার কী আছে? “

“তাহলে শুচিতা তোমার সন্তান নয়?”

“সে তো তুমিই সবচেয়ে ভালো জান। “

” তুমি জান না? তুমি বলতে পারলে এমন কথা?  এত বড়ো অবিশ্বাস! তুমি ভেবে চিন্তে বললে তো কথাটা? একজন স্ত্রী তার স্বামীকে অবিশ্বাস করেও সংসার করতে পারে, কিন্তু একজন স্বামী যখন স্ত্রীকে সন্তান তারই ঔরসজাত কিনা বলে সন্দেহ প্রকাশ করে, সেখানে কোনো স্ত্রীই সংসার করতে পারে না। তাই আমি আজই আমার মেয়েকে নিয়ে বাবার কাছে চলে যাচ্ছি। তুমি যদি কখনো এ ধারণার পরিবর্তন করতে পার, তাহলে আমাদের গিয়ে নিয়ে এসো।”

 

         মেয়েটির হাবভাব কোনোমতেই সৌগতর সঙ্গে মেলে না, না গায়ের রঙে,মুখের গড়নে, না হাঁটাচলা-স্বভাবে। তার মা, মাসি, বোনদের সঙ্গেও না। একেবারে যেন অন্য গোত্রের মনে হয় সৌগতর,তাই মনটা কেমন কেমন করে।  তাছাড়া বন্ধুমহলেও আড্ডাচ্ছলে কত কথা হয়।  সেখানেও মৃণাল একদিন কথা প্রসঙ্গে মজা করে বলল,” কিরে সৌগত, তোর প্রতিবেশীভাগ্যে সন্তানলাভ হল না তো? তোর সঙ্গে তো তোর মেয়ের কিছুই মেলে না!” কথাটা শুনে সৌগত কেমন উদাসী হয়ে গেল।

 

         পাঁচ-ছয় মাস পরে সৌগত শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে পূজার কাছে ক্ষমা চেয়ে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে বাড়িতে। স্বাভাবিক আচরণ করেছে। মেয়েকেও মেনে নিয়েছে,শুধু মানা নয়,যেন একটু বেশিই ভালোবাসা দেখিয়েছে। আগে যেখানে কোলে-কাঁখে নিত না বা আদর করত না, সেখানে মেয়ের জন্য কত কিছু কিনে আনছে। কত আদর করছে, পিঠে চড়াচ্ছে।

 

    একদিন মেয়েকে ওর পিসির বাড়ি থেকে ঘুরিয়ে আনবে বলল সৌগত। পূজা মেয়েকে সাজিয়ে-গুছিয়ে দিল। বাইকের পিছনে বসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে মাকে হাত নেড়ে বেরিয়ে গেল শুচিতা। কিন্তু সেদিন বিকেলে পূজা মর্গে গিয়ে যা দেখল তাতে মাথা ঘুরে গেল তার। ছোট্ট মেয়েটার মাথার ওপর দিয়ে লরির চাকা চলে যাওয়ায় মাথা বলে আর কিছু নেই, রাস্তার সঙ্গে মস্তিক লেপ্টে গেছে। শুধু থুতনিটুকু কণ্ঠ ছাড়িয়ে বুকের দিকে ঝুলে পড়েছে! সে কি ভয়ানক দৃশ্য! মা হয়ে কি সন্তানের এমন চেহারা দেখা যায়! মানুষ অল্প শোকে কাতর,আর অধিক শোকে পাথর। পূজা সেই পাথর হয়ে গেল। খায় না, শোয় না, কথা বলে না, চুপচাপ বসে থাকে সবসময়। সৌগত জোর করে খাওয়াতে যায়, পোশাক বদলাতে যায়,ঘুম পাড়াতে যায় ; কিন্তু সফল হয় না কোনোটায়। ক্যালেন্ডারের ছক লুডোর ঘুটির মতো গড়িয়ে এগিয়ে চলে। সৌগত সেদিন যখন পূজাকে জোর করে খাওয়াতে গেল তখন চারদিন পর প্রথম কথা বলল পূজা,-” এটা অ্যাকসিডেন্ট নয়,তুমি প্ল্যান করে আমার মেয়েকে হত্যা করেছ তাই না? তা না হলে সে মারা গেল, আর তোমার কিছু হল না কেন? তুমি বাঁদিকে আর ও ডান দিকে গাড়ির চাকার নিচে পড়ল কীভাবে? তুমি হত্যাকারী — খুনি! আমার মেয়েকে পরিকল্পনা করে খুন করেছ।”

” এ কি বলছো পূজা! এমন ভাবনা এল কী করে? ওটা অ্যাকসিডেন্ট, চাকা স্লিপ করে এমন হয়েছে, শুচি আমাকে ধরে থাকতে পারেনি সে অবস্থায়। তুমি সেখানে উপস্থিত থাকলে নিজেই বুঝতে পারতে কি ঘটেছিল। “

“না! তুমি ভাল সেজে প্ল্যান করেই এমন করেছ। তোমার মিথ্যা সন্দেহেই খুন করেছ আমার মেয়েকে। আমি সৃষ্টি করেছি, তুমি ধ্বংস করেছ। সৃষ্টির শাস্তি নেই, ধ্বংসের আছে। তুমি যদি তা করে থাক নিশ্চয়ই সাজা পাবে। সারাজীবন তুমি সন্তান হত্যার পাপে শাস্তি ভোগ করবে। কোনো দিন স্বস্তি পাবে না। কোনোদিন না।” – একথা বলেই পূজা বেরিয়ে গিয়েছিল বাড়ি থেকে।

 

      তবু সৌগত পূজার অপেক্ষায় ছিল, কিন্তু যখন দেখল আর ফেরার আশা নেই। তখন একদিন সেও রাস্তায় নামল।

 

 

              ৪.

 

   মন্দিরের ডানপাশেই একটা ছোট পুকুর। সেখানে গোঁসাই-গোবিন্দ স্নান করে বা হাত-পা ধুয়ে পবিত্র হয়ে মন্দিরে যায়। আজ ভোরে উঠে কালোসোনা গোঁসাই স্নান করে নতুন গেরুয়া বস্ত্র পরে মন্দিরে ওঠার আগে বৃকোদর গোঁসাইকে ডেকে বললেন তিনি টানা তিনদিন বাবার সামনে নির্জলা ধ্যানে বসবেন। কেউ যেন তার ধ্যান ভঙ্গ না করে। 

 

  ধামের নিয়মে সকলে সমান, কেউ প্রভু নয়, কেউ শিষ্যও নয়। সকলে সমান পদাধিকারী অথবা কোনো পদই নেই। তবু ধাম গড়ে তোলা এবং বয়ঃজ্যেষ্ঠ হওয়ায় কালোসোনা গোঁসাইকে গুরুর মতোই দেখে সকলে। মান্য করে। তার কথাই শেষ কথা ধরা হয় ধামে। বৃকোদর গোঁসাই অন্যান্যদের জানিয়ে দিলেন কালোসোনা গোঁসাইয়ের সিদ্ধান্ত ।

 

                   চার ফুটের কালো পাথরের মূর্তি মহাদেবের। আসনে বসা অবস্থার। চোখদুটি উজ্জ্বল। একেবারে জীবন্ত। চোখের দিকে তাকালে একটা প্রশান্তি আসে মনে। কালোসোনা গোঁসাই গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন। প্রণাম করলেন। বিড়বিড় করে কী বললেন মিনিট খানেক ধরে। তারপর আসন করে বসে দু’ হাত জড়ো করলেন। বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখ বন্ধ করে বসে রইলেন। মনকে একাগ্র করতে চেষ্টা করলেন। অনেকক্ষণ কেটে গেল। কিন্তু আজ মনকে তিনি একাগ্র করতেই পারলেন না। শুধু বাধা পড়ছে। পূজার কথাগুলো মনে পড়ছে। তার অভিশাপের কথা মনে বারবার ঢেউয়ের মতো ভেসে আসছে। অশান্ত মন শান্ত হচ্ছে না কিছুতেই। ভাবে সত্যিই কি সে খুনি? খুন করেছে মেয়েকে! আরো একবার ভাবতে চেষ্টা করেন কালোসোনা গোঁসাই ঠিক কীভাবে ঘটল ব্যাপারটা সেদিন?

রাস্তা মোটেই ভাল ছিল না। চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণের কাজ চলছিল। ফোর লেন তৈরি হচ্ছিল। কোথাও মাটি খুঁড়ে কোথাও বা মাটি দিয়ে উঁচু-নিচু সমান করা হচ্ছিল। ওই রাস্তায় সৌগত পলাশি থেকে দেবগ্রাম যাচ্ছিল বোনের বাড়িতে। ফুলবাগানের মোড়ে রাস্তাটা বড়ই বিপজ্জনক হয়েছিল। গাড়ি চলাচল করতে করতে চাকার লাইন বসে নালার মতো হয়ে গিয়েছিল। রাস্তা ফাঁকা দেখে সেই লাইন ধরে চলছিল সৌগত। কিন্তু মোড়ের কাছে হঠাৎ সামনে লরি চলে আসায় সেই নালার লাইন থেকে দ্রুত বাঁদিকে সরতে পারেনি সে। যদিও গতি খুব বেশি ছিল না; তবু টাল খেয়ে গেল বাইকটা। শুচিতা ডান দিকে পড়ে গেল, নিজে বাঁদিকে। কিন্তু সে টাল খাওয়া স্বাভাবিক ছিল না সৌগতর অবচেতনে পুষে রাখা স্পৃহাও কিছুটা কাজ করেছিল মনে করতে পারে না।

 

   ফটাস করে একটা শব্দ হলো। সেটা যে মেয়ের মাথা চাকার তলায় পড়ে বুঝতে পারল সে। দ্রুত উঠে দেখল শুচিতার দেহ একবার মাত্র সামান্য ঝাঁকুনি দিল, তারপর স্থির। মাথাটা বনবন করে ঘুরতে লাগল সৌগতর। কিছু মানুষ ছুটে আসছে বুঝতে পারল — আর কিছু মনে করতে পারল না।

 

             সে বাবার চরণতলে এসব মনে করে বাবাকে কী বোঝাবে? বাবা তো সব জানেন। সব! তিনি যার যা প্রাপ্য সেটাই করবেন।

 না চাইলেও দেবেন, আবার প্রার্থনা করলেও দেবেন না। একথা জানেন কালোসোনা গোঁসাই ; তবুও—–

 

 

   বাঁধ ভাঙ্গার মত মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায় কালোসোনা গোঁসাইয়ের। শিশু মাকে হারিয়ে যেমন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে তেমনি হুহু করে বাবার পায়ে হুমড়ি খেয়ে কেঁদে ওঠেন তিনি।

 

 

               ৫.

 

    খানিক পরে শান্তিধামে প্রবেশ করেন কালোসোনা গোঁসাই। একে একে গেরুয়া বস্ত্র, নামাবলি ত্যাগ করেন, একপাশে মহানন্দের জড়ো করে রাখা সাধারণ পোশাক থেকে একটা তুলে নিয়ে পরেন এবং গায়ে দেন। কণ্ঠের, বাহুর,কব্জির রুদ্রাক্ষের মালা খোলেন, তারপর সেগুলো গেরুয়া বস্ত্রের ওপর সাজিয়ে আবার মন্দিরে প্রবেশ করেন। মহাদেবের পায়ের কাছে সমর্পণ করেন। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসে দেখেন মহানন্দ, বৃকোদর গোঁসাই, কমলহরি গোঁসাই, লক্ষ্মীনারায়ণ গোঁসাই, ভক্তদাস গোঁসাই জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে কালোসোনা গোঁসাই বলেন, ” সংসারের প্রায়শ্চিত্ত শেষ না করেই আমি অমৃতের স্বাদ নিতে এসেছিলাম! যেখানে যা প্রাপ্য তা না দিলে নিস্তার নেই। বিদায় আমার সাথীরা…….”। পা বাড়ান সামনের দিকে, বৃকোদর গোঁসাই মুখ খোলেন কিছু বলার জন্য, কিন্তু তাকে হাতের ইশারায় থামতে বলে, নমস্কার করে এগিয়ে যান কালোসোনা গোঁসাই।

 

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত