| 21 মে 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: মায়া মমতা । গৌতম বিশ্বাস

আনুমানিক পঠনকাল: 13 মিনিট
আজকাল বাড়ি থেকে একবার বেরোলে আর ফিরতে ইচ্ছে হয় না।তবু নিয়ম করে প্রতিদিনই বেরোয় গোবিন্দ। আর ফিরেও আসে ঠিকঠাক। বাড়ি বলতে ঠিক যা বোঝায়, তেমনটা অবশ্য নয়।সাকুল্যে কাঠা পাঁচেক জায়গার ওপর খান কতক বাঁশ,খুঁটি খাড়া করে তার ওপর জং ধরা টিনের চালা।ফুটোফাটা দিয়ে যখন তখন যাতে কিনা আকাশ দেখা যায়।বৃষ্টি বাদলায় জল পড়ে।সেই জল ঠেকাতে পঞ্চায়েত থেকে পাওয়া কালো তাবু টাঙিয়ে রেখেছে তাও বছর তিনেক হয়ে গেল।রোদবৃষ্টি সয়ে সয়ে সেও এখন জীর্ণ দশায় শেষের দিন গুনছে।চারপাশে পাটকাঠির বেড়া।যা আবার বছর বছর পাল্টাতে হয়।এমনই একখানা ঘরের সামনে ছোট্ট একখানা ফালি উঠোন।উঠোনের পাশে একটা বেল,একটা বাতাবী,আর গোটা দুই হিমসাগর আমের চারাগাছ।এটাই বাপের ভিটে।আজ অবশ্য বাপ টা নেই।কিন্তু ভিটে টা আছে।আর সেখানে মাথা গোঁজার জন্য এই ছোট্ট একখানি ঘর।ঘরের সামনে বারান্দা। বারান্দার একপাশে ঘেরা দেওয়া বাঁশের মাচায় শোয় গোবিন্দর মা নেত্যকালী।আর ঘরের ভেতর বৌকে নিয়ে গোবিন্দ। না,ছেলেপুলে নেই তার।নয় নয় করেও আজ দশ দশটা বছর হয়ে গেল বিয়ে করেছে গোবিন্দ। কত সখ ছিল ছেলে পুলে নিয়ে ভরন্ত এক সংসার হবে তার।অথচ কোথায় কী।কাজলতারার পেটটা ঠাঁ ঠাঁ মরুভূমি। রুখুশুখু অনুর্বর ভূমি তে একফোঁটা জল নেই যাতে প্রাণের উৎপাদন হতে পারে।কত কোবরেজ-বদ্যি করেছে গোবিন্দ। কত জল পড়া,তেল পড়া।কিছুতেই কিছু হয়নি।অগত্যা হাল ছেড়ে দিয়েছে।এখন আর ওসব নিয়ে ভাবে না।এখন কেবল ভাবে সংসারে কবে শান্তি আসবে।কবে একটু খোলা মনে ঘুমোবে গোবিন্দ। যত দিন যাচ্ছে কাজলতারার স্বভাব টা খারাপ থেকে খারাপ হচ্ছে।সারাক্ষণ খিট খিট।লোকে বলে ছেলে পুলে না থাকলে মেয়েদের নাকি অমন একটু হয়।তা এ কী আর একটু সেকটুর ব্যাপার?সারাক্ষণই এটা ওটা নিয়ে খিট খিট করেই যাচ্ছে কাজলতারা।বিশেষ করে শ্বাশুড়ি নেত্যকালীর সঙ্গে তো লেগেই আছে।বুড়ি এক সময় কেবল শুনেই যেত।ইদানীং উত্তর দেওয়া শুরু করেছে।যদিও কাজলতারার সঙ্গে পেরে ওঠা তার সাধ্য নয়।অগত্যা যত ওজর অভিযোগ সব গোবিন্দ ফিরলে।
   ” ওরে ও গোবিন্দ, তোর বৌ যে আমারে এই বললে,তা তুই কিছু বলবিনে বাপ?”
   গোবিন্দ হয়তো তখন সদ্য মাঠ থেকে ফিরেছে।সারা গায়ে জবজবে ঘাম।রোদের তাপে ব্রহ্মতালুর নিচে কিছু একটা ফুটছে।শরীর জুড়ে কিছুর একটা জ্বলন।মায়ের কথায় মেজাজটা খিঁচড়ে যায় তার।বলে,” তুমি চুপ করবা?”
   ” কেনে রে,চুপ করবো কেনে?তোর বৌ যে আমারে সারাক্ষন দাঁতে কাটছে তারে চুপ করতি বলতি পারিস নে?”
   ” ধুর শালা।”
   ” গোবিন্দ রে,বাপ আমার,তোরে দশ মাস এই প্যাটে ধরিছি।গতরের অক্ত খাওয়াইয়ে জম্ম দিছি।তুই এর এট্টা বিহিত কর বাপ।”
   শরীরের সাথে সাথে মনটাও গরম হয়ে যায় গোবিন্দর।অগত্যা ওই ঘাম শরীরেই কাশীনাথ সাহার পুকুরে গিয়ে নামে।ঘষে ঘষে আগুন তোলে।জলের নিচে ডুব দিয়ে বসে থাকে খানিকক্ষন।এক সময় শরীর জুড়োয়।সাথে মনটাও।
   তবু এই ঝগড়াঝাটি একদমই পছন্দ হয় না তার।আর সেই কারনেই একবার বাইরে বেরোলে আর ফিরতে ইচ্ছে হয় না।তবুও সে ফেরে।এই যেমন এখন।সবে মাঠ থেকে ফিরে ঘরের দাওয়ায় বাঁশের খুঁটিতে পিঠটা হেলান দিয়ে বসেছে গোবিন্দ। শরীরের ওপর দিয়ে বড্ড ধকল গেছে আজ।মাথার ওপর বোশেখ মাসের অমন ঠাঁ ঠাঁ রোদ নিয়ে কাশীনাথ সাহার বিশ বিঘের ধানখেত আজই কাটা শেষ করলো।এখনও বাঁধা, ঝাড়া  –  কত কাজ বাকি।সেজন্যেই হাত চালিয়ে ধান কাটছিল ওরা।ওরা মানে গোবিন্দ, নিতাই,রসময়,সুবল,হারাধন,হরষিত,রিপন,মনতোষ,গনেশ,আর পঞ্চা।এরা সব কাশীনাথ সাহার বাঁধা মুনিষ।সারা বছর খেতের যত কাজ  –  এরাই করে।সময় অসময়ে একটু বেশিই করে দেয় তাই।দিয়েছিল আজও।বোশেখ মাসের এই চাঁদি ফাটা রোদে ঘন্টাটাক বাড়তি কাজ করা কত যে ধকলের গোবিন্দ এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তা।মাথার ভেতর টগবগ করে যেন ঘিলু ফুটছে।দুই চোখে তীব্র জ্বলন।শরীরের ভেতরের লবন ঘামের সাথে বাইরে বেরিয়ে চামড়ায় কাঁটা ফোটাচ্ছে।
   সবেই মিনিট তিনেক হল গা টাকে এলিয়ে দিয়ে বসেছে গোবিন্দ। আর কোত্থেকে অমনি নেত্যকালী এসে হাজির।
   ” ওরে ও গোবিন্দ, বাপ আমার,ইবার অন্তত এট্টা বিহিত কর। আর যে পারি নে।”
   গোবিন্দর দুই চোখে এখনও ভাটার আগুন।সেই আগুনচোখে মায়ের দিকে তাকালো সে।জিজ্ঞেস করলো,” তুমার আবার কী হল?”
   ” কী হইছে জানিস নে?নতুন করে বলতি হবে?এ তুই কারে বে করে আনছিস? অনক্কী,অনক্কী।এ সোংসার তোর উজোবে নারে।”
   আসল কথাটার ধার দিয়েই গেল না নেত্যকালী।আর অত ‘ ফাউ কথা ‘ শোনার মত ধৈর্য্য গোবিন্দর নেই।তার ওপর এমন হাজারো অভিযোগ শুনতে শুনতে কান দুটো তার এমনিতেই তেতে থাকে সারাক্ষণ। ভালো কথাও মাঝে মাঝে খারাপ লাগে।মাথার মধ্যে ‘ দপ ‘ করে কিছু একটা জ্বলে উঠতেই আগুন চোখে ভেতর ঘরের দিকে তাকালো গোবিন্দ। না,কাজলতারা নির্ঘাৎ ঘরে নেই।থাকলেই এতক্ষণে ফের শুরু হয়ে যেত।
   নেত্যকালীর অভিযোগকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে গোবিন্দ উঠে পড়লো।আর সোজা কাশীনাথ সাহার পুকুরে।
   বিরাট পুকুর কাশীনাথ সাহার।বাপ কেলে পুকুর তার।যেমনি টলটলে জল,তেমনি তার শীতলতা।চারপাশে সার দিয়ে আম,জাম,তাল,কাঁঠাল,নারকেলের গাছ।থেকে থেকে জলে ‘ ঘাই ‘ মারছে রুই,কাৎলা।অনেক বড়ো পুকুর।সারাবছর অনেক আয় দেয় কাশীনাথকে।খাওয়ারটা বাদ দিয়ে বিক্রি বাটাও কম হয় না।এমন একটা পুকুর তার যদি থাকতো  –  ভাবতে ভাবতে ডুব দিল গোবিন্দ। আর মুহূর্তে অনেকখানি জ্বলন উধাও।ডুব দিয়ে উঠে একবার আকাশের দিকে তাকালো।সূর্য টা হেলতে শুরু করেছে।ঝাঁঝ টাও বুঝি কমে আসছে তার।দুটো চিল অনেকখানি উচুতে ডানায় রোদ মেখে চক্রাকারে উড়ছে।ইস,কত সুখ ওদের।
   ভেজা গামছায় ঘষে ঘষে গায়ের ময়লা তুলতে গিয়ে দেখলো সারাবেলার জ্বলুনির আঁচ টাও উঠে যেতে শুরু করেছে।এমনটাই হয় প্রতিদিন। পুকুরের জল তার জ্বলন ক্ষতে মলমের কাজ করে। কী ভেবেছিল গোবিন্দ, আর হল কী।কত সখ করেই না বিয়েটা করেছিল।সুন্দর একটা সংসার।হাসি খুশি একটা জীবন।ধুর,ধুর।
   ইদানীং কেবলই এই জীবন থেকে মুক্তি পেতে ইচ্ছে হয় গোবিন্দর।বাড়ি থেকে যতক্ষণ বাইরে থাকে ততক্ষণ বেশ থাকে।কানের কাছে কারোর ওজোর আপত্তি নেই।কারও ঘ্যানোর প্যানোর নেই।কোনও ঝগড়াঝাটি নেই।বেশ একটা যেন মুক্তির আনন্দ। আর ঘরে ফিরলেই  – । এজন্যেই ঘরে ফিরতে একদমই ইচ্ছে হয় না।এক একটা সময় মনে হয় সে আর ফিরবেই না।যেতে থাকবে যেখানে ইচ্ছে হয়।
   সেদিন নিতাই দা জিজ্ঞেস করেছিল,” হ্যাঁরে গোবিন্দ, তোর কী হইছে বল দেহি?দিন দিন ক্যামন ঝিমোয়ে যাচ্ছিস।আগে তো এমন ছিলিনে?”
   সারাক্ষণ বাড়িতে যা হচ্ছে তাতে গোপন করার কিছু নেই গোবিন্দর।এমনিতেই সবাই সবটা জানে।তবু সে বলেছিল,” আমার শান্তি নাইগো নিতাই দা।না পারি মায়েরে কিছু বলতি।না পারি বৌ রে।বে ‘ না করাই মনে হয় ভালো ছেলো।”
   নিতাই দা বলেছিল,” বৌ রে এট্টু বুঝোয়ে বল।খুড়ির বয়াসটা নয় নয় করেও কম তো আর হল না।আজ আছে কাল নাই।তারপর তো কেবল তোরা দুইজন।কী দরকার অত অশান্তি করে।”
   এই কথাটা অনেকবারই বোঝাতে চেষ্টা করেছে গোবিন্দ। কাজলতারা বোঝেনি।উল্টে খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠেছে,” এ্যাতোই যদি মা’ র ওপর দরদ তো বে’ করছিলে কেনে?আইবুড়ো থাকতি পারলে না?তালে তো আর কেউ কানের কাছে ঘ্যানোর ঘ্যানোর করতো না।আমি কিছু বললিই ঝগড়া।আর ওই বুড়ি মাগি যহন  –  “
   শুনে কান জ্বলে যায় গোবিন্দর।হাজার হোক মা তো।দশ মাস গর্ভে ধরেছে।বুকের দুধ,রক্ত খাইয়ে বড়ো করেছে।শরীরের ওম দিয়ে শীতের থেকে বাঁচিয়েছে।তার সম্পর্কে কিনা  –  
   ভেতরে ভেতরে মাথাটা গরম হয়ে উঠলেও বাইরেটা ভেজা তুলোর মত ন্যাতানো ভাব করে চুপ মেরে যায় গোবিন্দ।সেদিন রাতে আর কাজলতারার কাছে ঘেঁষা হয় না তার।ইদানীং এটা আবার নিত্যকার ব্যাপার হয়ে উঠেছে। রাতটাকে তাই বড়ো বিস্বাদ মনে হয় তার।সারাদিনের ক্লান্তির শরীরটা নিয়ে বিছানায় কোথায় বৌয়ের সঙ্গে একটু আকুলি বিকুলি করবে,তা না  –  
   এই ভরদুপুরে পুকুরে আর একা নয় গোবিন্দ। অনেকেই নেমে পড়েছে।ঘাটের দিকে একটু ভীড়।খানিক হইচই।ভীড় ভাট্টা একদম ভালো লাগছে না তার।একটা সাঁতার দিয়ে পুকুরের মাঝখানটায় গিয়ে দাঁড়ালো সে।এখানে পুরোপুরি গলা সমান জল।জলের ওপর দিকটা ঈষৎ গরম হলেও নিচের দিকে বেশ ঠান্ডা।হাতের তালু দিয়ে নিচের জলটাকে খানিক ওপরে তুলে আনতেই ওপরের গরমটা সরে গেল।আঃ,বেশ লাগছে এখন।কোথায় সে সারাবেলার ক্লান্তি।কোথায় সে রোদের জ্বলন।চোখ বুঁজে দাঁড়িয়ে রইলো গোবিন্দ।
   চোখ বুঁজলেই আজকাল কি যেন একটা হয়।কার যেন একখানি অল্পবয়সী মুখ ভেসে ওঠে।বোধকরি কাজলতারারই হবে।সেই প্রথম যেদিন দেখেছিল কাজলতারাকে।হ্যাঁ,সেই চোখ।সেই মুখ।আর সেই লজ্জা মাখা হাসিটাও।এক পলক দেখেই মনে ধরে গিয়েছিল গোবিন্দর।ঘটক রাখোহরি হালদারকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলেছিল,” মেইয়ে ডা দেকতি বড়ো সোন্দর খুড়ো।এই মেইয়েরেই আমি বে করবো।”
   মাকাল ফল।সব মাকাল ফল।কেন যে বাইরেটা দেখেই বিয়ে করার জন্য অমন উতলা হয়ে পড়েছিল গোবিন্দ। সেদিন অমনটা না হলে আজ কি তার এই হয়।মেইয়ের কি কোনও অভাব ছেল দেশে?
   না,চোখ দুটো আর বুঁজে থাকতে পারলো না গোবিন্দ। ফের মাথার মধ্যে কি একটা হতে শুরু করেছে।দড়াম দড়াম করে ঢাকে কাঠি মারছে যেন কেউ।পর পর পাঁচ-ছ টা ডুব দিয়ে ফের একবার তাকালো আকাশের দিকে।মাথার ওপরে উড়তে থাকা চিল দুটো এখন আর নেই।এই ভর দুপুরে এমনি করে উড়ে কি সুখ পায় ওরা কে জানে।তবে গোবিন্দ উড়তে পারলে বেশ হত।ইচ্ছে মত চলে যেত এদিক-ওদিক।থাকতো পড়ে বাড়ি ঘর।থাকতো পড়ে কাজলতারা।পুকুরের চারপাশ দিয়ে আম,কাঁঠাল,তাল,নারকেলের বাগান।পূবের হাওয়ায় পাতা গুলো নড়ছে।কত সব পাখির ডাকাডাকি ওই পাতার আড়ালে।নারকেল গাছের মাথা অন্য সব গাছকে ছাড়িয়ে উঠে গেছে আকাশের দিকে।ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতে বেশ লাগে গোবিন্দর।প্রতিদিনই খানিক সময় তাকিয়ে থাকে সে।তাকালো আজও।পূব-দক্ষিন কোনায় বড়ো গাছটার মাথার ওপর দিয়ে ছোট্ট একফালি মেঘ দেখা যাচ্ছে।এতবড়ো আকাশটায় মাত্রই একফালি মেঘ। এ যেন পথ ভোলা উদাসী কোনও এক বাউল।কোথায় যে চলছে নিজেও জানে না।
   ” ও গোবিন্দ দা,আর কতক্ষণ চান করবা?বাড়ি যাবা না?”
   হুঁস ফিরতে বার কয়েক ভুঁস ভুঁস করে ডুব দিয়ে সোজা হয়ে উঠে ঘাটের দিকে ঘুরে তাকালো গোবিন্দ। হরষিত কখন পুকুরে নেমে স্নান টান করে উঠে  পড়েছে।গোবিন্দ মনে মনে বলল,” বাড়ি আর কুথায় যাবো রে হরষিত।তোগের মতন সুখির কপাল কি আমার আছে?”
   ” ও গোবিন্দ দা  –  “
   এবার সাড়া দিল গোবিন্দ, ” হঃ,যাই।”
   ঘাম শরীরে বেশিক্ষণ জলে থাকাটাও ঠিক নয়।তার ওপর মাথার ওপরে অমন ঠাঁ ঠাঁ রোদ।ঠান্ডা-গরমে শেষে সর্দি ফর্দি হয়ে বসলে  – 
   না,উঠেই পড়লো গোবিন্দ। 
   বেলা অনেকটাই কাত হতে শুরু করেছে।ক্রমশ কমে আসছে রোদের তেজ।ভরদুপুরে রোদের থেকে বাঁচতে ঝোপ ঝাড়ের আড়ালে চলে যাওয়া পাখিরা একটা দুটো করে ফের বেরোতে শুরু করেছে আবার।
   বাড়িতে ঢুকতেই কাজলতারার মুখোমুখি।অথচ সে যেন দেখেও দেখলো না গোবিন্দকে।খানিক আগেই স্নান করে উঠেছে।উঠোনে টাঙানো দড়িতে ভেজা কাপড় মেলতে মেলতে আড়চোখে গোবিন্দর দিকে একবার তাকালো কেবল।ওটুকুতেই গোবিন্দ দেখে নিল আজ আকাশের মুখটা একটু বেশিই বুঝি ভার।ঘাটাতে সাহস হল না গোবিন্দর। ভেজা লুঙি আর জামাটা দড়িতে ঝুলিয়ে দিয়ে হাঁড়ি থেকে ভাত বেড়ে নিয়ে দাওয়ায় এসে বসলো।সারাবেলার পরিশ্রমে পেটের মধ্যে খিদেটা হাত পা ছড়িয়ে আচড়াতে শুরু করেছে।পানতা ভাতে দুটো কাঁচা লঙ্কা আর এক দলা লবন দিয়ে মেখে গোগ্রাসে গিলতে লাগলো গোবিন্দ।
   খেতে খেতে পিছনের কথাগুলো মনে পড়তে লাগলো গোবিন্দর। বিয়ের পর প্রথম প্রথম এমন ভর দুপুরে কাজের থেকে ফিরে স্নান সেরে আসতে না আসতেই দেখতে পেত দাওয়ায় ভাত বেড়ে নিয়ে বসে আছে কাজলতারা।মুখে লাজুক হাসি।হাতে হাতপাখা।তার কমলালেবুর কোয়ার মত ঠোঁট দুটোর দিকে তাকিয়ে ভাতের খিদের  কথা ভুলে যেত গোবিন্দ।অন্য কিছুর একটা খিদে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতো।তার দিকে অমন ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে কাজলতারা জিজ্ঞেস করতো,” কী দ্যাহো?”
   গোবিন্দ বলতো,” তুমি কত সোন্দর। “
   কাজলতারা সারা মুখে একরাশ সলজ্জ হাসি ছড়িয়ে বলতো,” সোন্দর জন্যিই তো বে করলে।না লে কী করতে?”
   নামটা যে কে কাজলতারা রেখেছিল তা গোবিন্দ জানে না।তবে এটুকু জানে চেহারার সঙ্গে নামটা বড্ড বেমানান।গায়ের রং টা মোটেও তার কাজলের মত নয়।বরং একটু যেন বেশিই ফর্সা। তারার আলোর মত একটা ঝলক যেন ছড়িয়ে আছে সারা গায়ে।গরীব ঘরের মেয়ে না হয়ে একটু অবস্থাপন্ন ঘরের হলে তবেই রূপটা ঠিকঠাক বোঝা যেত।না,অন্যেরা না বুঝলেও গোবিন্দ ঠিকই বুঝেছিল।আর তাইতো একপলক দেখেই  –  
   মুখে ভাতের গ্রাস তুলতে তুলতে গোবিন্দ জিজ্ঞেস করতো,” আমার সোংসারে এস্যে তোমার খুব কষ্ট তাইনা?”
   ” কই?না,কোনও কষ্ট নাই তো।”
   ” আমি দিন আনি দিন খাই মানুষ।এই ভিটেটুক ছাড়া বাপের আর কিছু পাইনি।অন্যের জমি তি জন না খাটলি পয়সা পাইনে।তাতেও যা পাই প্যাটের ভাত জোগাতি চল্যে যায়।তোমারে সখ করে যে এট্টা সাজা পরার জিনিস এন্যে দেবো,তা পারিনে।”
   গোবিন্দর দিকে হাত পাখার হাওয়া করতে করতে কাজলতারা বলতো,” আমি কী কিছু চাইছি তোমার কাছে?আমার যা আছে তাই কত।অত সাজ পোশাক দে আমি কী করবো?”
   ভেতরে ভেতরে আস্বস্ত হত গোবিন্দ, ‘ যাক বৌ ডার মনে তালে সত্যিই কোনও কষ্ট নাই।’
   কত সুন্দরই না ছিল দিনগুলো।কত সুখ ছিল।কত স্বপ্ন ছিল।একটা মেয়ের বড়ো সখ ছিল গোবিন্দর। কাজলতারা বলতো,” না পেত্থম ছেল্যে হবে।”
   ” না মেইয়ে।”
   ” ছেল্যে।”
   ” কেনে?ছেল্যে কেনে?”
   ” মেইয়ে হলি তারে বে দিতি হবে।আর বে দিলিই পরের ঘর।তার চে যদি ছেল্যে হয় তাড়াতাড়ি বড়ো হইয়ে তোমার সাথে মাঠে যাবে।কাজ করবে।সোংসারের বাড়তি আয় উন্নতি হবে।”
   ” না,ছেল্যে রে আমি ইসকুলি দেবো।পড়ালেকা শেকাবো।”
   ” ঠিক আছে।তালে তাই কোরো।আগে তো ছেল্যে হোক।”
   সে ছিল গোবিন্দর সুখের সময়।আজ সে সুখও নেই।সে দিনকালও গেছে।মাঝেমধ্যেই তাই কেবল পেছনের কথাগুলোই ভাবে গোবিন্দ। আর ভাবতে গেলেই কোথায় যেন হারিয়ে যায়।বাহ্যিক জগতের কথা খেয়ালই থাকেনা তখন।এই এখনই যেমন।খেতে খেতে পেছনের কথাগুলো ভাবতে গিয়ে খাওয়ার কথাটাই ভুলে গেছে।মুখে ভাতের গ্রাস।সামনে ভাত মাখানো থালায় ভন ভন করছে একপাল মাছি।হাত দুটো দু পাশে ছড়ানো।এমন একটা অবস্থায় বাইরে উঠোনের দিকে তাকিয়ে হা করে বসে আছে।কখন যে কাজলতারা এসে সামনে দাঁড়িয়েছে সে খেয়ালটাও নেই তার।এদিকে কাজলতারার মনে সংশয়  –  হল কী মানুষটার?শরীর টরীর খারাপ করে বসলো না তো?যা দিনকাল পড়েছে কার আায়ু যে কখন ‘ ফুস ‘ করে যায় বোঝা ই দায়।তেমন কিছু হয়ে গেলে –
   একটু নিচু হয়ে কাঁধ ধরে নাড়া দিল কাজলতারা,” এ্যাই,শোনছো?”
   আচমকা নাড়া খেয়ে ঘোরটা কেটে গেল গোবিন্দর। মুখ দিয়ে কি একটা শব্দ বেরিয়ে এল তার তা ঠিক বোঝা গেল না।তবে ‘ ফিচিক ‘ করে মুখের ভেতর থেকে খানিক আধ চিবোনো ভাত বেরিয়ে এসে ছিটকে পড়লো চারদিকে।আর তাতে বেশ লজ্জাই পেয়ে গেল গোবিন্দ। একটা হেঁচকি উঠতে গিয়েও উঠলো না।গলার কাছে আটকে গিয়ে বেশ একটা অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে গেল সে।
   পাশ থেকে জলের গেলাস টা এগিয়ে দিয়ে কাজলতারা বলল,” নেও,খাইয়ে নেও।”
   জল খেল গোবিন্দ। মুখের ভাত আর না চিবিয়ে গিলে ফেলল জলের সাথে।জল টা পেটে যেতেই অস্বস্তির ভাব টা কেটে গেল।ফের সেই আগের মত।মাথা নিচু করে ফের খেতে লাগলো।
   দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতে শুরু করেছে।একটু একটু করে নিঃস্তেজ হয়ে আসছে রোদ।গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে যেটুকু হাওয়া বয়ে আসছে তাতে বেশ একটা মন ভালো লাগা অনুভূতি। শরীরটা ভারী ভারী লাগতে শুরু করেছে।হাত-পা ছড়িয়ে শরীর এখন জিরেন নিতে চাইছে খানিক।সারাবেলা যা খাটুনি গেছে তার।আর দেরি করলো না গোবিন্দ। থালার ভাতগুলো তাড়াতাড়ি শেষ করে কল থেকে হাত মুখ ধুয়ে এসে দাওয়ায় একপাশে গুটিয়ে রাখা খেঁজুর পাতার আধ ছেঁড়া মাদুরটা পেতে গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লো। আর শুতে না শুতেই ঘুম।
   রাজ্যের ঘুম এসে গোবিন্দকে সবে এক স্বপ্নরাজ্যে নিয়ে যেতে শুরু করেছে,আর ঠিক তখনই নেত্যকালীর চিল চিৎকারে সে ঘুমটার দফারফা।আচমকা ঘুম ভেঙে ধড়ফড় করে উঠে বসে সে দেখলো কাজলতারাকে উদ্দেশ্য করে হাত-পা নেড়ে মুখে যা আসছে তাই বলে গাল পাড়ছে নেত্যকালী।খানিক দূরে দাঁড়িয়ে সমান তালে উত্তর দিয়ে যাচ্ছে কাজলতারা।কী মুখের ভাষা তার।মাথাটা ‘ দপ ‘ করে গরম হয়ে গেল গোবিন্দর।একে কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়া।তারপর নিত্যদিনের অশান্তি।ইচ্ছে হল দুটোর পিঠেই ঘা কতক বসিয়ে দিয়ে সব ছেড়েছুড়ে যেদিক ইচ্ছে চলে যায়।জীবনটাকে শালা জাহান্নাম করে ছাড়লো দুজনা।অবশ্য নেত্যকালীর তেমন দোষ দেখতে পায় না গোবিন্দ।কই,যতদিন গোবিন্দ বিয়ে করেনি এমন তো হয়নি কোনওদিন।বরং বেশ শান্তিতেই তো ছিল।সংসারে কাজলতারা আসতেই সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল।মা টা ঠিকই বলে,’ এ তুই কারে বে করে আনলি গবা?এ যে অনক্কী রে।এ সোংসার তোর উজোতে দেবে না।’ 
   সত্যিই তো,সংসারে উন্নতি কোথায়?বাপ টা যা রেখে গিয়েছিল তাতেই তো আটকে আছে।এত খাটাখাটনি করেও সম্পত্তি তো এক ছটাকও বাড়াতে পারলো না সে।’ নুন আনতে পানতা ফুরোয় ‘ তার।অথচ সুবল,হরষিত,মনতোষ,গনশা রা তারই মত গায় গতরে খেটে কত কী করে ফেললো।সংসারে যদি লক্ষ্মীই না থাকে তো উন্নতি হয় কীভাবে?সত্যি,অলক্ষ্মী ই বটে কাজলতারা।এখন ঘা কতক যদি বসাতে পারতো পিঠে,জ্বালাটা বুঝি খানিক জুড়োতো তার।
   গোবিন্দ ভাবে বটে কিন্তু পারে না।চারিদিকের কত কথা কানে আসে।কীসব আইন টাইন নাকি হয়েছে মেয়েদের জন্যে।বৌ তে একবার ‘ কেস ‘ ঠুকে দিলেই  –  না,থানা পুলিশের বড্ড ভয় গোবিন্দর।কাজলতারার এই নিত্য অশান্তি তাই মুখ বুজে মেনে নেওয়া ছাড়া কোনও রাস্তাই আর খুঁজে পায় না সে।আর এ নিয়েই নেত্যকালীর অভিযোগ,” ওরে ও গবা,তুই কি কিছুই করবিনে?”
   গোবিন্দ জিজ্ঞেস করে, ” কী করবো?”
   “এ বৌ তুই ছাড়।দ্যাশে কী মেইয়ের অভাব রে?আর এট্টা বে কর।ভালো থাকপি।অনক্কী খেদায়ে নক্কী আন।আমিও বাঁচি।তুইও বাঁচ।”
   এটা যে একেবারেই ভাবে না গোবিন্দ  তা নয়।কিন্তু পারে না।হাজারো ভয় এসে চারপাশে সার দিয়ে দাঁড়ায়।দাঁত-নখ খিঁচিয়ে কামড়াতে আসে।আর অমনি জোঁকের মুখে নুন পড়ার মত চুপসে যায় ভেতরটা।
   কিন্তু আজ কেন জানি মাথাটা একটু বেশিই গরম হয়ে গেল তার।ইচ্ছে হল ঘা কতক বসিয়ে দেওয়ার।কিন্তু দিল না।হাতের তালুতে দু চোখ কচলে দড়িতে ঝোলানো গামছাটা কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লো গোবিন্দ। পুরোপুরি বিকেল বলতে যা বোঝায় এখন তাই।সূর্য টা অনেকখানি কাত হয়ে আকাশের পশ্চিম দিকটায় ঝুলে আছে।রোদের রং অনেকটাই ঘোলাটে।চারদিকে বেশ একটা ছায়া ছায়া ভাব।বাতাসের গতরটাও বেশ নরম শরম।
   নিশ্চিন্দিপুর গ্রামটা যতটা না ছড়ানো ছেটানো,তার থেকে বেশি লম্বাটে।বড়ো রাস্তাটা দক্ষিণ দিকে চলতে চলতে আচমকা বাঁক নিয়ে পশ্চিমে ঘুরে গেছে।বাঁকের মুখেই বড়োসড়ো এক কাঁটা বাবলার গাছ।গাছের গোড়া থেকেই মাঠের শুরু।মাঠ মানে সারি সারি ফসলের খেত।ধান কাটা মাঠ জুড়ে এখন ব্যাস্ততার ছবি।দুপুরের ক্ষীপ্রতা এড়িয়ে লোকজন ফের মাঠে নামতে শুরু করেছে।ধান কাটা,বাঁধা,’গাদি ‘ দেওয়া চলছে ব্যাস্ত হাতে।বাড়ির পথে চলছে আটি বাঁধা ধান।ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেশ কিছু তিল খেত।তার কচি সবুজ পাতায় দোখনে হাওয়ার মাতন।বেশ জোরে জোরে হাওয়া বইছে।গরমের এমন দিনে হাওয়াটা বেশ জোরেই বয়।দারুন একটা গা জুড়োনো হাওয়া।বাবলা গাছটার গায়ে ঠেঁস দিয়ে দাঁড়ালো গোবিন্দ। এখান থেকে আকাশটাকে বেশ বড়ো দেখায়।দূরে কৈখালি গ্রামের মাথার ওপর দিয়ে আকাশ যেখানে দিগন্তে মিশেছে সেখানে চক্রাকারে উড়ছে একঝাঁক শামুকখোল পাখি।দূর থেকে অনেকগুলো চলমান বিন্দুর মত দেখাচ্ছে ওদের।দেখে বেশ লাগলো গোবিন্দর।মনে হল,’ ইস,এট্টাবার যদি ওগের মতন উড়তি পারতাম – ‘
  আজকাল অনেক কিছুই গোবিন্দর মনে হয়।একটু যখন একলা থাকে,তখনই এই মনে হওয়াটা আরও যেন বেশি করে জাপটে ধরে তাকে।সে তখন উদাস ভাবে আকাশ দ্যাখে।গাছের পাতায় রোদের ঝিলিক দ্যাখে।পাতার আড়ালে চুপটি করে বসে থাকা পাখি দ্যাখে।দ্যাখে আর ভাবে।যত ভাবে,তত বেশি করে তার মনে হয়।এই যেমন এখন।আশ পাশে কেউ নেই।গোবিন্দ এখন একেবারেই একা।মাথার ওপরে কাঁটা বাবলা গাছের ছেঁড়া ছেঁড়া ছায়া।সামনে মাঠ।মাঠের ওপাশে কৈখালি গ্রামের মাথা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দিগন্ত।দোখনে হাওয়া গায়ে লাগতেই ভেতরের রাগটা খানিক কমে এলো গোবিন্দর। নিজের মত করে সাজিয়ে গুছিয়ে ভাবতে লাগলো গোবিন্দ। তবে যত না সামনের কথা,পেছনের কথা তার চে ঢের বেশি।ফেলে আসা দিন।চলে যাওয়া সময়।
   ভাবতে ভাবতে বিকেলটা যে কখন ফুরিয়ে গেছে সে খেয়াল নেই গোবিন্দর। যখন খেয়াল হল দেখলো আকাশ জোড়া রোদ ফুরিয়ে সন্ধে নামতে শুরু করেছে।বিরাট একটা ছায়া ঘিরে ধরেছে চারপাশ।ঝোপ ঝাড়ের গা পেচিয়ে উঠে আসছে অস্পষ্টতা। আকাশের রং বড্ডো বেশি ঘোলাটে।সারাটা মাঠ জুড়ে ঘরে ফেরার ব্যাস্ততা।ঘরে ফিরছে মানুষ জন,পাখ পাখালি,গোরু বাছুর।ঘরে ফেরা দরকার গোবিন্দর ও।
   বাড়ির কথা মনে আসতেই কাজলতারার মুখটা ফের মনে পড়ে গেল।আর অমনি রাগটা ফের চাগাড় দিয়ে উঠলো ভেতরে।একদলা থু থু ছিটিয়ে দিল মাটি তে।মাটি তো নয়,যেন কাজলতারার মুখেই।না,আজ আর ফিরবেই না সে।কিন্তু যাবেই বা কোথায়?এই এত বড়ো দুনিয়ায় গোবিন্দর জন্য জায়গা তো সেই সামান্যই।সেই ভাঙাচোরা এক কুঁড়েঘর। ফালি উঠোন।গোটা কয় গাছালি।
   হাঁটতে লাগলো গোবিন্দ।
   বাঁক পেরিয়ে আরও খানিক এগিয়ে নিতাই ধাড়ার বাড়ি।বাড়ির পেছনে আম বাগান।বাগানের ভেতর দিয়ে গেলে সামনেই বেশ বড়ো সড়ো পুকুর।পাড় বরাবর সারি সারি বাঁশ ঝাড়। ঝাড়ের নিচে মুলিবাঁশের বেড়া আর ত্রিপলের ছাউনি টাঙানো ভাটিখানা।পাশেই উনুন।চোলাই জ্বাল হচ্ছে।সারাক্ষণই এক দুজন পড়ে আছে সেখানে।বিকেলের পর থেকে ভীড় জমতে শুরু করে।অনেক রাত পর্যন্ত চলে বেচা কেনা।নিতাই ধাড়ার মেজো ছেলে গনেশ এই ভাটিখানার মালিক।এই ব্যবসা করেই অন্য দুই ভাইয়ের থেকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেকখানি এগিয়ে গেছে সে।আশ পাশের পাঁচ সাতটা গাঁয়ে নেশাখোর মানুষদের মধ্যে তার এক অন্যরকমের পরিচিতি।পুলিশ ফাঁড়িতেও তার বেশ খাতির।অনেক টাকা মাসোহারা দেয় সে।ফ্রী তে চোলাই সাপ্লাই ও করে সেখানে।তার এই রমরমা ব্যবসার পেছনে পুলিশেরও একটা বড়ো ভূমিকা আছে।
   গোবিন্দ নেশাখোর নয়।তবু কেন যেন হাঁটতে হাঁটতে এদিকেই চলে এল।
   সন্ধের অস্পষ্টতা ততক্ষণে আরও গাঢ় হয়ে নামতে শুরু করেছে।ঝোপঝাড়ের গা জড়িয়ে চেপে বসছে আঁধার।আম বাগান,বাঁশ ঝাড়ের গায়ে গায়ে জড়ানো সেই আঁধারে এখনই যেন আর দৃষ্টি চলে না।পুকুরের জল টাও কালো হয়ে এসেছে।খানিক আগেও এক ঝাঁক পাতিহাঁস সাঁতরে বেড়াচ্ছিলো।তারা সব ঘরে ফিরে গেছে।একটা নির্জনতা নেমে আসছে চারপাশে।পুকুরের এদিকটা এমনিতেই একটু বড়ো বেশি নির্জন।কেবল ভাটিখানা ঘিরেই জনা কয়েক মানুষের জটলা।চেঁচামেচি নয়,খুবই নিম্ন স্বরে তারা কথা বলছে নিজেদের মধ্যে।এরই মধ্যে চোলাই গিলে বসে আছে কেউ।কেউ সবে গেলাস হাতে নিল।
   গোবিন্দ গিয়ে দাঁড়াতেই গনেশ যেন চমকেই উঠলো খানিক।জিজ্ঞেস করলো,”আরে,গোবিন্দ যে?কী ব্যাপার? পথ ভুলে চলে এলি নাকি?”
   মাথা নাড়লো গোবিন্দ, ” না রে,ঠিক পথেই আলাম।”
   ” আমার যে বিশ্বেস হচ্ছে না রে।”
   ” নাই বা হল।তাতে অসুবিধে কী?”
   ” অসুবিধের আর কী?কোনওদিন আসিসনি তো  –  “
   ” তাতে কী?আজ তো আলাম।”
   ” বোস,বোস।তা কড়া করে দেবো নাকি দু গেলাস?”
   ” দুই গেলাস?ওতে আমার কিছু হবে না।খাবো য্যাকন তো প্যাট ভত্তি করে খাবো।”
   ” আরে এই,এই গোবিন্দ, তোর হল কী বল দেখি?বাড়ি থেকে ঝগড়াঝাটি করে আসিসনি তো?”
   ” বাড়ি?বাড়ি আমার কোথা?আমার শালা কোনও বাড়ি টাড়ি নাই।”
   ” বুঝছি।মাথাটা গরম হয়ে আছে।বোস।গায়ে খানিক হাওয়া লাগা।তারপর পেটে মাল পড়লে দেখবি সব আগুন গলে জল হয়ে যাবে।”
 
 
   গনশার কথাই ঠিক।পেটে চোলাই পড়তেই মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করে এসেছিল।পেছনের কথাগুলো ভুলে যেতে শুরু করেছিল একটু একটু করে।বেশ একটা অন্য রকমের অনুভূতি এসে কাতুকুতু দিয়ে যেন হাসাতে চাইছিলো গোবিন্দ কে।ফিচিক করে হেসেও ফেলেছিল বার কয়।তারপর ঘাড় টা এক পাশে  কাত হয়ে পড়তেই শরীরটাকে আর সামলাতে না পেরে একেবারেই গড়িয়ে পড়েছিল বাঁশের মাচালের ওপর।
   সে কোন সন্ধের কথা।এখন রাত্রি কত কে জানে।নেশার ঘোরে এতক্ষণ পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিলো গোবিন্দ। নিঃসাড় শরীরটাকে বাগে পেয়ে চারপাশে যত রাজ্যের মশা ছিল সব এসে হামলে পড়েছে।সারা গায়ে এক অসহ্য রকমের চুলকানি।এই চুলকানির চোটেই ঘুম টা ভেঙে গেছে তার।তবে নেশার ঘোরটা তার পুরোপুরি কাটেনি এখনও।
   ঘুম ভাঙতেই মাচালের ওপর উঠে বসে দু হাতের তালুতে চোখ দুটো বার কয় কচলে নিয়ে তাকালো সামনের দিকে।সারা ভাটিখানা জুড়ে রাজ্যের আঁধার এসে জমাট বেঁধে আছে।আলো বলতে কেবল ওই জোনাকির জ্বলা-নেভা আর বাঁশঝাড়ের ফাঁক ফোকর দিয়ে চ্যুঁইয়ে পড়া সামান্য জ্যোৎস্না।তাতে হাত কয়েকের বেশি আর দৃষ্টি চলে না। ওই সামান্য দৃষ্টি নিয়েই চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নেওয়ার চেষ্টা  করলো গোবিন্দ। না, সে ছাড়া আর কারও উপস্থিতি  নজরে পড়লো না তার।সকলেই যে যার বাড়ি ফিরে গেছে।একা সে ই কেবল পড়ে আছে।বন্ধ ভাটিখানার গা থেকে ভেসে আসছে কেমন এক ভ্যাপসা আর উৎকট গন্ধ।সেই গন্ধে পেটের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠলো তার।আর অমনি হড়হড় করে একগাদা বমি বেরিয়ে এসে সশব্দে আছড়ে পড়লো নিচে।
   ধাতস্থ হতে সময় লাগলো খানিক।
   মুখটা বড়ো বিস্বাদ লাগছে গোবিন্দর।খানিক জল না দিলেই নয়।আসার সময় ভাটির পাশে চাপাকল টা নজরে পড়েছিল তার।মাচাল থেকে নেমে গিয়ে কল চেপে  ভালো করে কুলকুচি করে চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিল বার কয়।আর জলের ছোঁয়া টা পেতেই নেশার ঘোর টা পুরোপুরি কেটে গেল তার।সেই সঙ্গে রাগ টাও।আকাশের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করলো রাত্রি এখন অনেকটাই।সারাটা গ্রাম নির্ঘাৎ এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে।বাড়ি না গিয়ে এখনও বাইরেই পড়ে আছে গোবিন্দ।বৌ না করুক মা টা নিশ্চয়ই চিন্তা করছে।এক্ষুনি তাই বাড়ি ফেরা দরকার।
   হাঁটতে গিয়ে দেখলো পা দুটো নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।তবু জোর করেই হাঁটতে লাগলো সে।
   গ্রামের রাস্তা।রাত্রি মানেই রাশি রাশি  নির্জনতার অখন্ড উপস্থিতি। সেইসঙ্গে সারা গায়ে মাখা জমাটি আঁধার।আকাশের এক কোনে ঝুলে থাকা আধখানা চাঁদের আলো আজ যেন বড়োই কৃপণ।নাকি নেশার ঘোর টা এখনও পুরোপুরি কাটেনি?ভাবলো গোবিন্দ। আর ভাবতে গিয়েই মায়ের মুখখানাই আরও একবার মনে পড়ে গেল তার।বাপ টা মারা যেতে ওই মা ইতো দেখে শুনে রেখেছে তাকে।কখন খেলো না খেলো,কোথায় গেল না গেল,কেমন আছে না আছে  –  সব খেয়াল রেখেছে।আর ছোটবেলায়?নিজে হাতে খাইয়ে দিয়েছে।হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছে।কোলের ‘ ওম ‘ দিয়ে শীতের রাতে গরম দিয়েছে।সেই মা ই আজ  –  
   মনে পড়লো গোবিন্দর   –  মা টা প্রায়ই বলে,” একদিন ঠিক চল্যে যাবো যেদিকি দুই চোখ যায়।নয়তো গলায় দড়ি দেবো।বিষ খাইয়ে মরবো।তালে যদি মাগির হাড় জুড়োয়।”
   কাজলতারার ওপর রাগ করেই কথা টা বলে মা।আজ কত রাগই না করেছে শেষ মেষ কে জানে।তার ওপর সেই কোন বিকেল থেকে গোবিন্দর খোঁজ না পেয়ে সত্যিই যদি কিছু একটা করে বসে?
   ভাবতে গিয়েই নেশা টেশা সব মুহূর্তে উধাও।রাগটাও আর নেই ভেতরে।উল্টে এক অজানা আতঙ্ক গাঢ় রাত্রির অখন্ড নির্জনতার সুযোগ নিয়ে সহস্র অক্টোপাশের শুঁড়ে আঁকড়ে ধরতেই বাড়ির দিকে ছুটতে শুরু করলো গোবিন্দ।
error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত