Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,গ্রামের

অসমিয়া অনুবাদ: রক্তের অন্ধকার (পর্ব-১০) । ধ্রুবজ্যোতি বরা

Reading Time: 4 minutes

ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি বরা পেশায়  চিকিৎসক,অসমিয়া সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য লেখক ২৭ নভেম্বর ১৯৫৫ সনে শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। শ্রীবরা ছাত্র জীবনে অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ‘কালান্তরর গদ্য’ ,’তেজর এন্ধার’ আরু ‘অর্থ’ এই ত্রয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সনে ‘ কথা রত্নাকর’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাকি উপন্যাসগুলি ‘ভোক’,’লোহা’,’যাত্রিক আরু অন্যান্য’ ইত্যাদি। ইতিহাস বিষয়ক মূল‍্যবান বই ‘রুশমহাবিপ্লব’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’,’ফরাসি বিপ্লব’,’মোয়ামরীয়া বিদ্রোহ’। শ্রীবরার গল্প উপন্যাস হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা, মালয়ালাম এবং বড়ো ভাষায় অনূদিত হয়েছে।আকাডেমিক রিসার্চ জার্নাল’যাত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে জড়িতরয়েছেন।’ কালান্তরর গদ্য’ উপন্যাসের জন্য ২০০১ সনে অসম সাহিত্য সভার ‘ আম্বিকা গিরি রায়চৌধুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।শ্রীবরা অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি।


অনুবাদকের কথা

আলোচ‍্য উপন্যাস ‘রক্তের অন্ধকার'(তেজরএন্ধার) একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ উপন্যাস। এটি লেখার সময় কাল ২০০০-২০০১ ছিল অসময়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দুর্যোগের সময়। সেই অশান্ত সময়ে, আমাদের সমাজে, আমাদের জীবনে এক দ্রুত অবক্ষয়ের স্পষ্ট ছাপ পড়তে শুরু করেছিল। প্রতিটি অসমিয়াইমর্মেমর্মে   একথা উপলব্ধি করে ভেতরে ভেতরে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। রাজ্যের চারপাশে দেখা দেওয়ানৈরাজ্যবাদী হিংসা কোনো ধরনের মহৎ রূপান্তরের সম্ভাবনাকে বহন করে তো আনেই নি, বরঞ্চ জাতীয় জীবনের অবক্ষয়কে আরও দ্রুত প্রকট করে তুলেছিল। আশাহীনতা এবং অনিশ্চিয়তায় সমগ্র রাজ্য ক্রমশ ডুবে যাচ্ছিল। এই ধরনের পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই যেন থমকে যেতে চায় কবির  কবিতা , শিল্পীর তুলি, লেখকদের কলম। তবে একথাও সত্যি যে শিল্পী-সাহিত্যিকরা সচেতন ছিলেন যে সমাজ জীবনের ভগ্নদশা’ খণ্ডহর’এর মধ্যে একমাত্র ‘সৃষ্টি’ই হল জীবন এবং উত্তরণের পথ। এই বিশ্বাস হারানোর অর্থ হল মৃত্যু । আর এই বিশ্বাস থেকেই সেই সময় লেখক লিখেছিলেন কালান্তর ত্রয়ী উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব – রক্তের অন্ধকার ।

এবার উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে এলাম। আশা করি ইরাবতীর পাঠকেরা এই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত অসাধারণ উপন্যাসটিকে সাদরে বরণ করে নেবেন ।নমস্কার।

বাসুদেব দাস,কলকাতা


   

      ‘তুমি কি এই কথাটা আমি ছাড়া আর কাউকে বলেছিলে নাকি?’

      মানুষটা কিছুক্ষণ নীরবে কিছু একটা ভাবল। তার কপালটা কুঁচকে গেল,চোখদুটি ছোট হয়ে পড়ল।

      মনে করে দেখ তো দাদা,কারও কাছে কথাটা বলেছিলে নাকি?’প্রেম অধীর ভাবে জিজ্ঞেস করল।

      না তো, কাউকে বলিনি।মনে পড়ছে না তো।মানুষটা প্রথমে ধীরে ধীরে আরম্ভ করল।তারপরে সে সজোরে বলে উঠল।-না ,না কথাগুলি আমি কাউকে বলিনি।একেবারে সত্যি কথা বলছি।’

      বিরাট আশ্বস্ত হওয়ার মতো প্রেম বলে উঠল-‘তোমাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিচ্ছি দাদা।সেই কথাগুলি তুমি কোনো মানুষের সামনে উচ্চারণ করবে না। একেবারে উচ্চারণ করবে না।বিরাট বিপদ হতে পারে।’

      লোকটি অবাক হয়ে প্রেমের দিকে তাকাল।তারচোখজোড়াবড়োবড়ো হয়ে উঠেছে।

      ‘বিপদ?’

      ‘যতীন দাদাকে কে মেরেছে প্রত্যেকেই জানে।‘-প্রেম খুব দ্রুত বলতে লাগল-‘জঙ্গলে থাকা সেই ছেলের দল এখনও আশেপাশেই ঘোরাফেরা করছে।কেন, সেদিন রাতে আমি এখান থেকে বাড়ি ফেরার সময় দেখেছি বন্দুকধারী তিনটি ছেলে বাঁশঝাড় থেকে বেরিয়ে চালতা গাছের গোড়া ধরে পথ অতিক্রম করে মাঠের মাঝখান দিয়ে চলে যাচ্ছে।সেদিন আমার সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল জানিস।আরও অনেকেই ওদের রাতের বেলা ঘোরাফেরা করতে দেখেছে।’-সর্বা দেখা কথাটা সে নিজে দেখেছে বলে মানুষটাকে বলল।

      ‘আর গুপ্তচর-কত গুপ্তচর পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে।কে কতটা রঙ চড়িয়ে কোথায় গিয়ে বলবে তার কোনো ঠিক নেই।তোমার মুখ থেকে সেই ছেলেগুলি হেমর দিকে তাকিয়ে কিছু বলেছে বলে যদি এই ছেলেগুলি শুনতে পায় তিলকে তাল করে বলে বেড়াবে নাকি যে যতীনদাদার মৃত্যুর সঙ্গে হেমর-আমাদের বাড়ির কোনো সম্পর্ক আছে। তখন আমাদের-বুড়োকে,আমাকেও ধরে নিতে পারে।বাড়িতে এসে গুলি করে মেরে রেখে যেতে পারে।তখন গোটা পরিবারটাকে বধের পাপ তোমায় মাথা পেতে নিতে হবে দাদা।আর আর….’,প্রেম এই কথাগুলি বেশ জোর দিয়ে বল্ল।‘যতীন্ দাদাকে হত্যা করা ছেলেগুলি যদি জানতে পারে যে তুমি এই সমস্ত কথা সবাইকে বলে বেড়াচ্ছ,তাহলে তারা তোমারও কোনো ক্ষতি করতে পারে…’—কথাটা অসমাপ্ত রেখে দিল প্রেম।

      প্রেমের কথা শুনে মানুষটাবড়োভয় পেয়ে গেল।

       ভয়ে তার চোখ জোড়া বড় বড় হয়ে পড়েছিল। কোনো মতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে সে বলল–’ না না প্রভু। আমি কিছুই বলিনি। ধর্মের নামে শপথ করে বলছি ,যা বলেছিলাম কেবল তোমাকেই বলেছিলাম। আজথেকে আমার মুখে কুলুপ পড়ল বলে ধরে নিও। মনে কর— তোমার কোনো কিছু দেখিনি শুনিনি’।’

মানুষটা চোখ পিটপিট করে রাস্তার এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল  আশেপাশে লোকজন আছে কিনা।

গ্রামের এক প্রান্তে রয়েছে একটি প্রকাণ্ড জঙ্গল।মাঠটা পার হলেই জঙ্গল। সরকারি রিজার্ভটা সেখান থেকে আরম্ভ।


আরো পড়ুন: রক্তের অন্ধকার (পর্ব-৯) । ধ্রুবজ্যোতি বরা


উচু উঁচু গাছের শরীরটা অর্ধেক পর্যন্ত লতায় ঘেরা, নিচে আরও গাছপালা লতা জাল বুনে রেখেছে। জঙ্গলটাতে ঢোকাই কষ্টকর। দিনের বেলাতেই অন্ধকার হয়ে থাকে। অনবরত ঝিল্লির ডাক জঙ্গলটাকেভয়াবহ করে তোলে। কাঠ চুরি করার ব্যাপার না থাকলে গ্রামের কোনো মানুষই জঙ্গলে যায় না। লোকেরা বলে জঙ্গলের ভেতরে দুটো রাজাদের আমলের শ্মশান আছে। রাতের বেলা সেখানে ভূত বের হয়। হাতি ঘোড়ার আওয়াজ পাওয়া যায়। আর নাকি কাউকে ইনিয়েবিনিয়েকাঁদতে শোনা যায়।

গ্রামের লোকেরা বলে শ্মশানে জীবন্ত পুঁতে রাখা মানুষগুলির কান্না সেটা।

সেই জঙ্গলে কেউ যায় না।

জঙ্গলের কাছেই মৃতপ্রায় একটি বিল। নদী পরিত্যক্ত জলাশয়টি কালক্রমে একটি ধনুকের মতো বিলে পরিণত হল। তারই একটা দিক আবর্জনা জমে জমে ডোবায় পরিণত হয়েছে। বেত গাছ এবং কলমি শাকে পুরো জায়গাটা ঘিরে ধরেছে। মাছ পাওয়াযায় যদিও একটু ধূর্ত মানুষরা সেখানে মাছ মারতেযায় না।

হেম কিন্তু গিয়েছিল।

একা একা সে  প্রায়ই বড়শিনিয়ে পরিত্যক্ত বিলের ডোবায় মাছ ধরতে যেত।

ভূত-প্রেতের ভয়ডর তার ছিল না। সে ভূত-প্রেত, দৈত্যদানো এসবে ভয়  করত না। এসব কথায় সে খুব একটা বিশ্বাস করত না। কেউ কিছু বললে সে আক্রমণাত্মক সুরে বলত ,– তোরা নিজে কখনও দেখেছিস?’

খুব ঘনঘন না হলেও সে প্রায়ই পরিত্যক্ত বিলটিতে মাছ ধরতে যেত। ঘন্টার পর ঘন্টা সে  বড়শি ফেলে বিলের কাছে বসে থাকত। প্রকাণ্ড একটা গাছের নিচে সে নিজের জন্য বড়শি পাতার একটা জায়গা বানিয়েনিয়েছিল। বড়শিবাওয়াটা তার শখ, কেবল যে মাছের জন্যই সে বড়শি বাইতে আসে, তা কিন্তু নয়। মাছ ধরাটা মূলকথা নয়। বড়শিবাওয়ার শখটাই মূলকথা। বড়শি ফেলে সে কখনও কখনও কিছু চিন্তায় এত তন্ময় হয়ে পড়ত যে মাছ কখন বড়শির টোপ খুঁটে শেষ করে ফেলত জানতেই পারত না।

বাড়িতে সে এই বিলটিতে মাছ ধরতে আসার কথা বলেনি। বললে মা তাকে কখনও আসতে দিত না।

এই বিলে মাছ ধরা কোনো মানুষের কখনও কোনোদিন ভালো হয়নি।বরং, খারাপ, অমঙ্গল হয়েছে। আজ কয়েক বছর আগে বিলটা ডাকে দেওয়াহয়েছিল। কিন্তু বিল ডাকে নেওয়া দুটি মানুষের একের পরে অপরের কোনোকারনে মৃত্যু হয়েছিল। বিলের মহলদাররাও মাছ ধরার জন্য যে সমস্ত বিহারী মানুষ এনেছিল, তাদের মধ্যেও একজন দুজনের মেলেরিয়ায় মৃত্যু হয়েছিল। ওরা পালিয়ে গিয়েছিল। ভূত থাকা বিলে মাছ ধরতে ওরা রাজি হয়নি। তারপরে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট বিলটা রিজার্ভের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বলে ডাকে দেওয়া বন্ধ করেছিল। আশ্চর্যের কথা গ্রামের লোকজন বিহুতে সংক্রান্তিতে আশেপাশের অন্য বিলে মাছ ধরেছিল যদিও এই বিলটাতে মাছ  ধরতে আসত না। বুড়ো মানুষরা বলত এই বিলটি নাকি ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। অনেক বছর আগে, দাদুদের সময়বড়োভূমিকম্পে নদীর গতিপথ অন্যদিকে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল । আশেপাশের মাঠ–ঘাট, গ্রামাঞ্চল ইত্যাদিও নাকি ভূমিকম্পের ফলে মাটির নিচে চলে গিয়েছিল। বিলটির নিচে এখনও বড়োবড়ো গাছের গুড়িপড়ে আছে। শত শত বছরেও সেইসবপচে  শেষ হয়নি।

সে কেন এই বিলে মাছ ধরতে এসেছিল সে কথা হেম নিজেও জানে না। তাদের গ্রামে দুগ্ধ নামে একটি বড়ো দুষ্ট প্রকৃতির মানুষ ছিল। তার সঙ্গে আশ্চর্যজনক ভাবে মানুষটার খুব ভাব ছিল। সেই হেমকে বড়শি বাইতে,চিটিকাপাততে, খৈনি খেতে শিখিয়েছিল। সেই প্রথম তাকে এই নিষিদ্ধ বিলটিতে মাছ  ধরতে নিয়ে এসেছিল। বড়ো  হলে মাছ ধরার  লোভ দেখায়। আর শোল মাছ ধরত ওরা।

তারপরে দুগ্ধ লাইন বাসের হ্যান্ডিমেন হল। এখন নাকি সে ড্রাইভার। অনেক বড় বড় ট্রাক নাকি চালায় সে। অনেক আগেই সে গ্রাম ছেড়ে গুয়াহাটির দিকে চলে গেছে।

.

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>