| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া অনুবাদ উপন্যাস: অর্থ (পর্ব-২৯) । ধ্রুবজ্যোতি বরা

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি বরা পেশায় চিকিৎসক,অসমিয়া সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য লেখক ২৭ নভেম্বর ১৯৫৫ সনে শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন ।শ্রীবরা ছাত্র জীবনে অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন ।’কালান্তরর গদ্য’ ,’তেজর এন্ধার‘আরু’অর্থ’এই ত্রয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সনে ‘ কথা রত্নাকর’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাকি উপন্যাসগুলি ‘ভোক’,’লোহা’,’যাত্রিক আরু অন্যান্য’ ইত্যাদি।ইতিহাস বিষয়ক মূল‍্যবান বই ‘রুশমহাবিপ্লব’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’,’ফরাসি বিপ্লব’,’মোয়ামরীয়া বিদ্রোহ’।শ্রীবরার গল্প উপন্যাস হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা, মালয়ালাম এবং বড়ো ভাষায় অনূদিত হয়েছে।আকাডেমিক রিসার্চ জার্নাল’যাত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ।’ কালান্তরর গদ্য’ উপন্যাসের জন্য ২০০১ সনে অসম সাহিত্য সভার ‘ আম্বিকাগিরি রায়চৌধুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।শ্রীবরা অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি।


অনুবাদকের কথা

কালান্তর ট্রিলজির তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হল’অর্থ’। সশস্ত্র হিংসার পটভূমি এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ জীবনের দ্রুত অবক্ষয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার তাড়না এবং বেঁচে থাকার পথ অন্বেষণেই আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনী ভাগ গড়ে তুলেছে। সম্পূর্ণ পৃথক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে অসমের মানুষ কাটিয়ে আসা এক অস্থির সময়ের ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের অন্বেষণ চিরন্তন এবং সেই জন্যই লেখক মানুষ– কেবল মানুষের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারে।

এবার উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে এলাম।আশা করি ইরাবতীর পাঠকেরা এই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত অসাধারণ উপন্যাসটিকে সাদরে বরণ করে নেবে। নমস্কার।

বাসুদেব দাস,কলকাতা।


    মাঝখানে শুধুমাত্র একটা কাঠের বেড়া।

    কাঠের বাটামে তক্তা গজাল মেরে তৈরি করা বেড়া।তক্তার মাঝখানের কাঠগুলি দিয়ে একটা ঘর থেকে অন্য ঘরে-র আলো দেখা যায়।

    সন্ধ্যাবেলা নানী রেঁধে দেওয়া মুরগির মাংসের তরকারি দিয়ে ভাত খেয়ে উঠার পরে মেয়েটি ঘুমোতে যাবার নাম নেয় না।বিরাট ক্লান্ত লাগছিল।সকালবেলা ট্রেকিং টিমটা যাবে বলে ঘুম থেকে বেশ তাড়াতাড়ি উঠেছিল।সে ভাত খেয়ে উঠার পরে ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল।আগুনে ফুঁ দিতে থাকা স্টোভের আগুনটা নিভে এসেছিল।ঘুমতে হবে বলে নতুন করে আর খড়ি দিই নি।ঠাণ্ডাও পড়ে এসেছিল।বিদেশি ট্রেকিং পার্টি এলে আমরা সাধারণত কেবিনটাতে দুই ঘন্টার জন্য একটা জেনেরেটর লাগিয়ে নিই।দলটা নিয়ে আসা গাড়িটাতে জেনারেটরটাও নিয়ে আসা হয়।ভাত খাওয়া হয়ে যাবার পরে তেল শেষ হয়ে আসা জেনারেটরটাও বন্ধ করে দেওয়া হল।নানী আগেই কেরোসিনের ল্যাম্প দুটো জ্বালিয়ে আমার শোবার ঘরটা এবং মেয়েটির শোবার ঘরটা জ্বালিয়ে রেখে  গিয়েছিল।

    ‘এখন শুয়ে পড়া উচিত।ঘুম পাচ্ছে,’আমি মেয়েটিকে বলেছিলাম।

    অনেক দেরি হয়ে গেল তাই না?’

    ‘খুব বেশি দেরি হয় নি।নয়টা বাজে।’

    ‘মাত্র নয়টা বাজে নাকি?এত রাত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে,’সে বলেছিল।

    ‘পাহাড়ে দ্রুত অন্ধকার হয়।তাড়াতাড়ি দেরি হওয়া বলে মনে হয়।

    ও হো তাই,সে তোতলাতে লাগল।

    ‘চল ঘুমোতে যাই।নানী লেম্প জ্বালিয়ে রেখে গেছে।’

    কিন্তু আমাদের শোবার ঘরের রুম দুটির মধ্যে একটা বন্ধ অন্ধকার ঘর।’

    আমি বুঝতে পারলাম মেয়েটির অন্য প্রান্তের একটি ঘরে একা শুতে ভয় করছে।মহিলাদের জন্য রাখা সবচেয়ে ভালো ঘরটা এক প্রান্তে।মেমদের সঙ্গে ভারতীয় মেয়ে দুটিকে এই ঘর দেওয়া হয়েছিল।তিনদিকে জানালা থাকার জন্য ঘরটা আলো এবং পূবদিকের হওয়ায় সকালবেলা রোদ পড়ে।মাঝখানের ঘরটি অন্ধকার এবং ঠান্ডা,এখানে কেবল বারান্দার দিকে জানালা আছে।এখানে সাধারণত পুরুষদের রাখা হয়।আমার শোবার অফিস ঘরটাও খুব বেশি প্রশস্ত নয়।টেবিল আলমারির সঙ্গে এখানে রান্নার জন্য স্টোভের ব্যবস্থাও আছে।আমি তাকে বললাম—‘চিন্তা করবেন না,আমি মাঝখানের ঘরে শোব।আর বারান্দায় চৌকিদার থাকবেই।।

    অতিথি থাকলে আমরা তাদের দেখানোর জন্যই রাতের জন্য একটা চৌকিদার রাখি।ভাত–রান্না করা নানীর দাদা দৈনিক হাজিরা এবং বকশিসের জন্য রাতে চৌকিদারি করে।স্টোভটার পাশে তিনি সারা রাত বসে থাকবেন।

    আমার কথা শুনে মেয়েটি কিছুটা লজ্জিত হল।

    ‘আসুন, আমি দেখিয়ে দিই,আমি কোথায় শোব,’মেয়েটিকে বললাম।আমরা উঠে শোবার ঘরের দিকে গেলাম।অফিস ঘর থেকে আলোটা নিয়ে গিয়ে মাঝখানের ঘরটা খুললাম।

    ‘দেখুন,আপনার ঘরের দিকে থাকা এই নিচের বাঙ্কটাতে আমি শোব।’মাঝখানে মাত্র এই কাঠের বেড়াটা থাকবে।’

    ‘আমার ভয় করছে না…কিন্তু রাতে যদি করে?’

    ‘কোনো ভয় নেই।এখানে চোর ডাকাত নেই।ভূতও দেখা যায় না।’

    ‘ভূত?মেয়েটি চোখ বড়ো বড়ো করে তাকাল।‘ভূতের কথা কেন বললেন,এখন সেইজন্যই ভয় লাগবে।’

    আমি সশব্দে হেসে উঠলাম।সেও হাসল।

    এবার আমি তার শোবার ঘরে গেলাম।সে গতরাতে ঘরটার জানালার পাশের একটা বাঙ্কে শুয়েছিল।তার শ্লিপিং ব্যাগটা টেনে এনে এদিকের নিচের বাঙ্কটাতে রাখল।তারপর হাতের তালুদুটি ঘষতে ঘষতে বলল ,‘এখন ঠিক আছে।’

    হঠাৎ বাইরের বারান্দায় ভারী পায়ের শব্দ হল।চমকে উঠার মতো সে জিজ্ঞেস করল,‘কে?’চৌকিদার,’আমি উত্তর দিলাম।জোরে চিৎকার করে ডাকলাম,‘রামলাল।’’জী সাহেব,’সে পুনরায় উত্তর দিল।‘রাতে হুশিয়ার থাকবে।’তাকে বললাম।‘জী সাহেব’সে পুনরায় উত্তর দিল।‘কোনো চিন্তা করবেন না,’ওকে বললাম।‘ঘুমিয়ে থাকুন,শুভ রাত্রি।’

    ‘তোমার গভীর ঘুম হয় নাকি?’মেয়েটি জিজ্ঞেস করল।

    ‘ঘুমিয়ে পড়লে আর বলতে পারি না।ঔষধ খেয়ে ঘুমোই তো।’

    ‘কী ঔষধ,শ্লিপিং টেবলেট?’

    ‘বলতে পারছি না।ডাক্তার দিয়েছেন।’

    ‘ডাক্তার ?কেন?

    ‘মাঝখানে একটা মেন্টেল শকের মতো পেয়েছিলাম।সাইকিয়াট্রিক কাউন্সেলর একজনকে দিল্লিতে দেখিয়েছিলাম।তিনি দিয়েছেন।’

    কাউন্সেলিং সেশন কর নি?’

    ‘করেছিলাম সপ্তাহে তিনবার করে।’

‘তারপরেও ঔষধ দিয়েছে?’

    ‘তার পরেও।’

    ‘আমাকেও কাউন্সেলিং করতে হয়েছিল।ডিভোর্সের পরে যে সাংঘাতিক অবস্থা এবং ডিপ্রেশন হয়েছিল,তখন তার কথাই আমার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছিল।’  ‘হ্যাঁ,আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেয় তারা।অনেক ফিরিয়ে দেয়।’

    ‘বাঁচিয়ে দিল ।আমাকে অন্তত বাঁচিয়ে দিল।’

    আমি চুপ করে রইলাম।সে দ্রুত শ্লিপিং বেগটা ঠিকঠাক করতে লেগে গেল। বেগটা ঠিক করার পরে আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল ‘ধন্যবাদ,শুভরাত্রি।’

    শুভরাত্রি জানিয়ে আমি ঘরের দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে এলাম।বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে রামলালের সঙ্গে কথা বললা্ল।তার মাধ্যমে অফিস রুম থেকে আমার বিছানাটা আনিয়ে নিচের বাঙ্কটাতে পেতে দিলাম।রামলালকে স্টোভে আগুন জ্বালিয়ে নিতে বলে পশাক বদলে বিছানায় গেলাম।ঠান্ডা পড়েছে।লেম্পের ফিতাটা একেবারে কমিয়ে দিলাম।ঘরটা অন্ধকার হয়ে পড়ল।বেড়ার সরল কাঠের তক্তার ফাঁক দিয়ে পাশের ঘর থেকে আলো ছিটকে এল।

    বিছানায় পড়ার সঙ্গেসঙ্গে হঠাৎ মনে পড়ল এই পাতলা কাঠের বেড়ার ওপাশে মেয়েটি শুয়ে আছে।সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখের পাতা ভারী করে আনা ঘুম পালিয়ে গেল।আমি হঠাৎ আশ্চর্য ধরনে সচেতন এবং সজাগ হয়ে উঠলাম।স্নায়ুগুলি টনটন করে উঠল।বেড়ার ওপাশ থেকে কোনো শব্দ সোনা যায় নাকি বলে আমি কান পেতে রিলাম।না,নীরব,সমস্ত কিছু নীরব।কোনো শব্দ নেই।

    ‘ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?’মেয়েটি হঠাৎ বেড়ার ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস করল।

‘না না,ঘুমিয়ে পড়িনি।’

    ‘আমারও ঘুম আসছে না।’

    ‘ভয় করছে নাকি?’

    ‘না না করছে না।তুমি রয়েছ যে বেড়ার ওপাশে।’

    ‘ঠাণ্ডা?’

    ‘ওহো।এই শ্লিপিং বেগগুলি খুব গরম।গরম লাগে।’তোমাকে আর অসুবিধা দেব না।শুভরাত্রি।’

    তার কণ্ঠস্বর খুব কাছ থেকে আসছে বলে মনে হল,যেন বিছানার পাশেই শুয়ে আছে।আমার কিছুটা অবাক লাগছে।বেড়াটা তো কণ্ঠস্বরকে কিছুটা হলেও অস্পষ্ট করে তোলার কথা ছিল।আমি বেড়াটার দিকে ভালো করে তাকালাম।সরল কাঠের তক্তার ফাঁকগুলি দিয়ে পাশের ঘর থেকে আলো আসছে,সরল রেখার মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ফাঁকগুলি।একটু ভালো করে তাকিয়ে আমি দেখতে পেলাম সরল কাঠের তক্তাটায় একটা বড়ো চোখ রয়েছে।চোখের মাঝখানের শ্বাস্টা বেরিয়ে যাওয়ায় সেদিকে একটা ফুটো হয়ে রয়েছে।ফুটোটা ঠিক আমার বালিশের কাছে,কানের কাছে।বোধহয় মেয়েটির ও একই জায়গায় হবে।আমি হাতের তালুর পেছন দিকটা ফুটোটার কাছে রাখলাম।হ্যাঁ,ফুটোটা দিয়ে তার নিঃশ্বাসের বাতাস আসাটা টের পাওয়া যায়।

    ‘কী হল? চুপ করে রইলে যে? মেয়েটি পুনরায় জিজ্ঞেস করল।

    ‘না।এমনিতেই।ভাবছি আমরা এত কাছে আছি।মাঝখানে শুধু সরল কাঠের বেড়াটা।’

    সে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

    ‘এই ……’মেয়েটি আমার নাম ধরে ডাকল।

    ‘তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করলে খারাপ পাবে নাকি?’

‘জিজ্ঞেস কর।কী কথা?’

    ‘পার্সোনাল কথা,’

    ‘পার্সোনাল?’

    ‘পার্সোনাল।কাউন্সেলারের কাছে তোমাকে কেন যেতে হয়েছিল?তুমি বলতে না চাইলে বলতে হবে না। আমি খারাপ পাব না।’

বলতে আমার আপত্তি নেই।’

    ‘আপত্তি নেই যদি বল।বানিয়ে হলেও কিছু একটা বল।’তিরশট ‘তারপরে?’উদ্বিগ্নভাবে বেড়ার ওপাশ থেকে সে প্রশ্ন করল।

    ‘সময় অতিক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি ক্রমশ ভুলতে শুরু করেছিলাম।ভোলা ঠিক নয়,কথাটা আগের মতো এত ঘন ঘন মনে পড়ত না।আমি নিজেও বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।খুব ব্যস্ত।তখন ঠিকই ছিল।সেই ভয়াবহ ঘটনাটা আমাকে এত ভয় দেখাতে পারে নি।তারপরে…’


আরো পড়ুন: অসমিয়া অনুবাদ উপন্যাস: অর্থ (পর্ব-২৮) । ধ্রুবজ্যোতি বরা


    ‘তারপরে কী?’

    ‘তারপরে,তার দুদিন পরে,পুনরায় একটা দিন এল,দিন নয়,একটা রাত এল যেদিন ,যেদিন,আমি পুনরায় একটা একই ঘটনা—পুনরায় একই ধরনের একটা হত্যা দেখা পরিস্থিতির সম্মুখিন হলাম……’

    ‘হত্যা……?’তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।

    আমি তাকে সেই ঘটনাটির কথা বললাম।রমেনের গুলি খাওয়ার কথা।ছয়গাঁয়ের জঙ্গলের দিকে আমরা তেড়ে যাওয়ার কথা,অন্ধকার বাড়িটার বাগানে অন্ধকারের মধ্যে হওয়া গোলাগুলির কথা।রমেনকে গুলি করা ছেলেটির মৃত্যুর কথা।তার সঙ্গের বাকি কয়জন পালিয়ে যাওয়ার কথা এবং বাড়ি থেকে একটা মানুষকে ধরে আনার কথা।

    পাতা বিহীন কালো গাছের ডাল সৃষ্টি করা জালের মধ্য দিয়ে নিচে খসে পড়া জ্যোৎস্নার কথা।চিতা বাঘের ছালের মতো হয়ে পড়া জঙ্গলের কথা।জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো অন্ধকারগুলি—ছায়ামূর্তিগুলির কথা—

    ‘ছায়ামূর্তি?’মেয়েটি জি্জ্ঞেস করল।

    ‘ছায়ামূর্তি—অন্ধকারের মধ্যে ওরা এই বের হয় এই নাই হয়ে যায়,’আমি বললাম।

সেই অন্ধকার আলোর মধ্যে হাঁটুগেড়ে বসা মানুষটি,চাঁদের আলোতে এক মুহূর্তের জন্য ঝলমল করে উঠা পিস্তলটা …… খট করে সেফটি ক্যাচ খোলার নির্জীব ধাতব শব্দটা এবং সঙ্গে সঙ্গে ফেটে চৌচির হওয়া আকাশটার কথা তাকে বললাম।

    ‘তুমি চিৎকার করতে আরম্ভ করলে?’বেড়ার ফুটো দিয়ে তার নিশ্বাস গাঢ় হয়ে এল।

    ‘বলতে পারি না হঠাৎ কী হল,আমি নিজের ওপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম,আর নিজের অজান্তে ক্রমাগত চিৎকার করতে লাগলাম।ভয়াবহ,আদিম এক জান্তব চিৎকার করে করে একটা সময়ে আমি সংজ্ঞা হারিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ছিটকে পড়লাম……।

    বেড়াটার ওপাশে মেয়েটি এবার জোরে জোরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।

আমি ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলাম। গায়ের  লেপ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিছানার ওপরে বসে পড়লাম। সরল কাঠের বেড়ার ফুটো দিয়ে আমি ঘরের ওপাশে দেখতে চেষ্টা করলাম। না,কিছুই দেখা যায় না, লেম্পটা জ্বলে ঘরটাকে আলোকিত করে তুলেছে— তার বাইরে কিছুই দেখা যায় না।

    ‘ কী হল? কী হল? কেন কাঁদছ?’ আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। বেড়াটায় ধীরে ধীরে দুটো চাপড় মারলাম। পাশের ঘর থেকে কান্নার শব্দটা অনেকটা কমে এল।

    লম্বা করে নিশ্বাস নিয়ে মেয়েটি বলল,’ খারাপ পেয়ো না। তোমাকে বিরক্ত করছি। কী করবে হঠাৎ তোমার কথাটা শুনে কান্না বেরিয়ে এল। নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলাম না। কিছু মনে কর না।’

    ‘ সব সময় নিজেকে কন্ট্রোল করাটাও ঠিক নয়,’ আমি বললাম। মেয়েটির প্রতি আমার অন্তরে এক বোঝাতে না পারা গভীর মমতা জেগে উঠল। সুদূরের নষ্টনীড় থেকে উড়ে আসা অনিশ্চিত পাখি— হিমালয়ের ছায়ায় এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিচ্ছে। নিজের দুঃখের বোঝায় ডানা অবশ হয়ে পড়েছে— তার মধ্যে আবার আমার কথা শুনে আরও দুঃখ পেয়েছে… … 

    ‘অনেক রাত হল বোধ হয়,’ মেয়েটি বলল। প্রায় বারোটা বাজে এখন। তোমার ঘুম আমি নষ্ট করেছি। শুয়ে থাকো ।শুভরাত্রি।’

    গায়ে কাপড় চোপড় চাপিয়ে সে পুনরায় বিছানায় শুয়ে পড়ল।

    আমার ঘরে-র লেম্পটা একেবারে কমিয়ে রাখা ছিল। শিখা থেকে খুব ধোঁয়া ছড়াচ্ছিল এবং ঢিমে তালে জ্বলছিল। এখনই বোধহয় নিভে যাবে। নিভে যাক। আমি হাত মেলে লেম্পটা জ্বালাবার চেষ্টা করলাম না। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শিখাটা দপদপ  করে নিভে গেল। ঘরটা অন্ধকার হয়ে পড়ল এবং কেরোসিনের ধোঁয়ার একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। আলোটা নিভে যাওয়ায় কাঠের তক্তার ফাঁক দিয়ে পাশের ঘর থেকে আলো আর ও উজ্জ্বল হয়ে আসতে লাগল। পুরো  দেওয়ালটাতে পাথালিভাবে আলোর কিছু সরল রেখা ছড়িয়ে পড়ল। ফুটোটাতে চোখ রেখে তাকালাম, না আলো ছাড়া অন্য কিছু দেখা যায় না।

    চারপাশ ক্রমশ নীরব হয়ে এল।ওপরের দিকে মুখ করে শুয়ে আমি অসংলগ্নভাবে এটা ওটা ভাবতে লাগলাম।মেয়েটি কেন ট্রেকিঙে গেল না।সত্যিই কি শরীরখারাপ লাগছিল না কি মনটাই বেশি খারাপ লাগছিল?না কি জোড়ায় আসা নারী পুরুষের দলটিতে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করেছে।হয়তো নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ত।সেইজন্যই হয়তো সে  গেল না।আমি যদি যেতাম ,হয়তো মেয়েটিও তখন যেতে সম্মত হয়ে যেত।হ্যাঁ,মেয়েটির সান্নিধ্যের প্রয়োজন।কারও সঙ্গে কথা বলার ,কারও কথা শোনার।আর আমাকে অসমিয়া বলে জানতে পারার পরে তার হয়তো কথা বলতে আরও ইচ্ছা করছে।আশ্চর্য মেয়ে।আমাকে আসমিয়া বলে জানতে পারার পরে সে কোনো কিছু বলে নি।প্রত্যেকে চলে যাবার পরে আমাকে জানিয়েছে  

    পাশের ঘরে নাড়াচাড়ার শব্দ শোনা গেল।শ্লিপিং বেগটার ঊষ্ণতার ভেতরে সে  হয়তো পাশ ফিরেছে।তার হয়তো ঘুম পেয়েছে।ঘুম তার চোখের পাতা ভারী করে এনেছে। আর চোখ জুড়িয়ে আসা ঘুমের মধ্য দিয়ে সে সাঁতার কাটতে শুরু করেছে তার ভেতরে থাকা দুঃখের শীতল হৃদে!

    শব্দ বেড়েই চলল। হয়তো তার ঘুম আসছে না, নাহলে হয়তো ঘুমের মধ্যে অশান্ত হয়ে পড়েছে— এপাশ ওপাশ করছে।

    মেয়েটির বয়স কত হয়েছে?ত্ৰিশ? বেশি হবে ।তার নয় বছরের একটি ছেলে আছে। তেত্ৰিশ  চৌত্ৰিশ  হবে,। নিশ্চয় হবে ।আমি মনের মধ্যে একটা আনুমানিক হিসেব করে নিলাম।

    কিন্তু তার চেহারা সুন্দর হয়ে আছে ।মুখের ত্বক মসৃণ। চোখের কোনে এখনও বয়সের ছাপ পড়েনি। ঠোঁট তার রসাল ফলের মত পুষ্ট। চলাফেরায় যুবতি সুলভ সফলতা এখনও আছে। আর আছে হাসির মধ্যে স্নিগ্ধ মাধুর্য। বয়স এখনও তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ছোটো বুকটা এখনও আঁটোসাটো হয়ে আছে।  নাইলন জেকেট পরার আগে পুল অভার পরা অবস্থায় তাকে দেখেছি। মেদহীন গঠনে উরু জোড়া জিন্স পরে থাকা অবস্থাতেও বোঝা যায়…  …।

    আমি বেড়ার  ফুটো দিয়ে তাকালাম। ফুটো দিয়ে সেই ঘর থেকে আলো ছিটকে আসছে…  …।

    হঠাৎ ফুটোটা অন্ধকার হয়ে পড়ল। কী হল পাশের ঘরের লেম্পটা নিভে গেল নাকি? না তো তক্তার ফাঁক দিয়ে আলো আসছেই।মেয়েটি ফুটোটাতে চোখ দিয়ে রেখেছে নাকি? সেই জন্য আলো আসছে না? হ্যাঁ, মেয়েটি বালিশ থেকে মাথা তুলে ফুটো দিয়ে উঁকি দিচ্ছে ।

    ‘তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি?’ফিসফিস করে কথা বলার মতো অনিশ্চিতভাবে মেয়েটি জিজ্ঞেস করলই?’

    ‘না না’, আমি উত্তর দিলাম। ঘুম পালিয়েছে।

    আমারও  একেবারেই ঘুম আসছে না।। একটুক্ষন অপেক্ষা করে মেয়েটি পুনরায় বলল,‘এভাবে শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে না’।

 ‘তাহলে উঠে পড়,’ আমি বললাম।‘স্টোভটা ভালো করে জ্বালিয়ে কফি খাও।’

 সুন্দর। রাতের বাকি সময়টুকু কথা বলেই কাটিয়ে দেওয়া যাবে।’

    ‘কাপড়-চোপড় ভালোভাবে পরে আসবে—এখন কিন্তু বেশ ঠান্ডা পড়েছে।’




















error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত