ঘুম

গিরীশ গৈরিকের ‘ঘুম’কবিতার ব্যবচ্ছেদ । অলোক বিশ্বাস

Reading Time: 2 minutes

পাঠকের সুবিধার্থে গিরীশ গৈরিকের ‘ঘুম’কবিতাটি দিয়ে শুরু করা যাক:

‘মানুষের মুখ পাঠ করতে করতে আজ আমি ক্লান্ত
এতটা ক্লান্তি প্রিয় সূর্যের আয়নায় নিজেকে নগ্ন করে দেখলেও হয় না।
অথচ প্রিয়মদ–রবীন্দ্রসংগীত ভিন্ন কথা বলে
সে শুধু ঘুমের মাঝে জেগে থাকার কথা বলে।
তাই আমি এক চোখ বন্ধ করে ঘুমাই।

প্রিয়বিছানা–আমার জন্মভূমির মাটিতে
আমার লাঠিয়াল পিতামহ রক্তাক্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে
আর একমাত্র এ কারণেই আমি লাল কালিতে কবিতা লিখি।

প্রিয়জমি–আমার বাবার প্রশস্ত বুক
যে বুকের মাঝে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সমস্ত সুখ
অথচ তার যৌবনের একাত্তরে সেই বুকে গুলি লাগে
এই কারণবশত আমি জোছনার কবিতা লিখি না।

প্রিয়বই–আমার মা
যে বই পৃথিবীর সমস্ত সত্যনিষ্ঠ পবিত্র গ্রন্থের সারাংশ।
আমার মাকে পাঠ করে হাজার বছরের মাঝেও কোনো ক্লান্তি নেই।’

‘ঘুম’ কবিতায় প্রশ্নচিহ্নসহ কোনো পংক্তি নেই। কিন্তু কবিতাটি পাঠের পর মনে হতে পারে কবি যেন নিজেরই অস্থির অস্তিত্বকে প্রশ্ন করছেন। মনে হবে যেন তাঁর জন্মভূমিকে প্রশ্ন করছেন, যে জন্মভূমি তাঁর ‘প্রিয়বিছানা’ নামে উপমায়িত হয়েছে। কবি তাঁর ‘প্রিয়জমি’ অর্থাৎ তাঁর পিতাকে যেন প্রশ্ন করছেন। আর যা যা প্রশ্ন আছে প্রশ্নচিহ্নহীনভাবে, সবই কবির বর্তমান অবস্থানের প্রকৃতিকে ভিত্তি করে।

প্রশ্ন করে তিনি কি কোনো সদুত্তর পাচ্ছেন, যা তাঁকে কোনো নিস্ক্রমণ দিতে পারে? যা তাঁকে আকাঙ্ক্ষিত অস্তিত্বের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে প্রেরণা দেয়? অথচ প্রতিটি স্তবকের শেষে উপসংহারহীন পদ্ধতিতে লিখে রেখেছেন অত্যন্ত সুকৌশলী উত্তর:
১. ‘তাই আমি এক চোখ বন্ধ করে ঘুমাই।’
২. ‘আর একমাত্র এ কারণেই আমি লাল কালিতে কবিতা লিখি।’
৩. ‘এই কারণবশত আমি জোছনার কবিতা লিখি না।’
৪. ‘আমার মাকে পাঠ করে হাজার বছরের মাঝেও কোনো ক্লান্তি নেই।’
প্রতিটি পংক্তি বহন করছে জীবনের বিক্ষুব্ধ অবস্থার ইঙ্গিত, কিন্তু সেই বিক্ষোভ যেন নদীর অভ্যন্তরীণ তীব্রধারার মতো যা ওপর থেকে হঠাৎ দেখা যায় না। আমি ‘ঘুম’ কবিতার চারটি স্তবকের প্রতিটির শেষ পংক্তির দিকে নিবিষ্টভাবে ঝুঁকে দেখি প্রথম স্তবকের শেষ পংক্তিটির চাইতে দ্বিতীয় স্তবকের শেষ পংক্তিটি অন্য রসায়নে তীব্রতর। আর দ্বিতীয় পংক্তির তীব্রতর শেষ পংক্তিকে আবেগের আতিশয্যহীনতায় ছাড়িয়ে যাচ্ছে তৃতীয় স্তবকের শেষ পংক্তি। চতুর্থ স্তবকের শেষ পংক্তিটি যেন নির্মাণ করছে ক্লাইম্যাক্স। প্রশ্ন এবং তৎসহ উত্তরের মতো সরল সমীকরণ ব্যবহার না করেও, কোনো সমাধান সূত্রের দিকে পাঠককে ঠেলে না দিয়েও, কবি গিরীশ গৈরিক ইঙ্গিতময় স্বীকারোক্তিতে পাঠক মনে কোনো বিভ্রম প্রবেশ করিয়ে দিতে চাননি। আরো এক ইঙ্গিতপূর্ণ কাব্যিক বিবৃতি আমার পাঠের অবস্থানকে ঝাঁকানি দিয়ে গেলো।

কবি তাঁর কবিতার প্রথম পংক্তিতে লিখছেন, ‘মানুষের মুখ পাঠ করতে করতে আজ আমি ক্লান্ত।’ আর কবিতার শেষ পংক্তিতে লিখছেন, ‘আমার মাকে পাঠ করে হাজার বছরের মাঝেও কোনো ক্লান্তি নেই।’ প্রথম পংক্তির অন্তরালে রয়েছে সামাজিক সম্পর্কের তিক্ততার প্রতিক্রিয়া আর শেষ পংক্তিতে মাতৃসম প্রিয়গ্রন্থ যা কবির নেতিবাচক সামাজিক সম্পর্কের প্রতিক্রিয়া থেকে ভিন্ন হওয়ায় কবির ক্লান্তি দূর করে দিচ্ছে বছরের পর বছর। কবিতায় উপমা ব্যবহার হলেও, ‘যেন’, ‘মতো’ ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে কবি উপমাকে প্রয়োগ করেননি। কবিতার নাম দিয়েছেন ‘ঘুম’ বৈপরীত্যের ব্যঞ্জনায়। কারণ কবিতাটি কোনোভাবেই ‘ঘুমাক্রান্ত’ কবিতা নয়, কবিতাটি জাগরণের কবিতা। ক্লান্তিহীনতার কবিতা। সবশেষে বলি, কবিতাটি অ্যান্টি-রোমান্টিকতার প্রাতিস্বিকতা অবলম্বন ক’রে আছে। দুটি প্রবল আত্মস্বীকারোক্তিমূলক পংক্তি সেকথাই বলে:
(১) ‘আমি লাল কালিতে কবিতা লিখি।’
(২) ‘আমি জোছনার কবিতা লিখি না।’

সমগ্র কবিতাটি দাঁড়িয়ে আছে অকপট, আনডিসগাইজড উচ্চারণ নিয়ে। তরুণ কবি গিরীশ গৈরিকের জন্য কাব্যিক শুভকামনা।

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>