| 27 মে 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: দুয়ারে ভূত । ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

আজকাল বড় বিষন্নতায় পেয়ে বসে চান্দ্রেয়ীকে। কারণে অকারণে মুড স্যুইং। আর আকাশে রোদ না উঠলে তো কথাই নেই। ঘোর নিম্নচাপ ঘরে ও বাইরে। অথচ আগে ভোরে উঠে এই বৃষ্টি দেখলেই যেন মন কানায় কানায় ভরে উঠত। রান্নাঘরে গোবিন্দভোগ চাল, সোনামুগ ডাল, পাঁপড়ের প্যাকেট, ভাজা বড়ির কৌটো… এসবের কথা মাথায় আসত। খিচুড়ি খেতে সবাই খুব ভালোবাসে তারা। কিন্তু এখন জীবনটা কেমন যেন পানসে হয়ে গেছে। কোনোকিছুতেই যেন আর স্পৃহা নেই চান্দ্রেয়ীর। ছেলেমেয়ে বিদেশে। তার স্বামীর অবসর জীবন শুরু হয়েছে সবে। মাঝেমধ্যে দুজনের বন্ধুবান্ধব আর কাছেপিঠে কোথাও ঘুরে আসা ছাড়া জীবনের স্পন্দনটা আর আগের মত নেই যেন। সেইসঙ্গে এক অদ্ভূত উপসর্গ শুরু হয়েছে। এমনিতে শরীরে রোগব্যাধি বড় একটা নেই কিন্তু কেমন যেন এক অস্বস্তির স্বীকার সে। সবসময়ই মনে হয় কেউ যেন আছে তার আশেপাশে। তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতেই হয়। সংসারের রোজনামচায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে চান্দ্রেয়ী। দুজনের পেটের দায়ে ঢুকতেই হয় রান্নাঘরে। অনেকদিন বাদে কল্পনা হাজিরা দিতে পারেনি। ভারী বৃষ্টি যে। ইশ! সামান্য আদাবাটা লাগবে খিচুড়ি তে। তার জন্য মিক্সার গ্রাইন্ডার আছে অবিশ্যি। স্টেইনলেস স্টীলের গ্রেটারও আছে একটা।
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। চাল আর ডাল জলে ধুয়ে ভিজিয়ে রেখেছে চান্দ্রেয়ী। আদার খোসা ছাড়িয়ে মিক্সির মধ্যে দেবার আগেই মনে পড়ল সামান্য গরম মশলা থেঁতো করে ফোড়ন না দিলে খিচুড়ি জমবে না। কল্পনা কিভাবে দেয় কে জানে? শাশুড়িমায়ের হামানদিস্তের কথা মনে পড়তেই সেই পুরনো আমলের লোহার হামান দিস্তের পরিচিত শব্দটা যেন পেল চান্দ্রেয়ী। ও বাবা! সেটা আছে কোথায় তার নেই ঠিক। বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট হবার সঙ্গে সঙ্গে কোথায় যে গেল! কিন্তু চেনা শব্দটা? এগিয়ে আসছে ক্রমশই তার কানের কাছে। হ্যাঁ, মা তো এতেই এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি থেঁতো করতেন। মিক্সির মধ্যে দুটো করে এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি দিয়ে একপাক ঘোরাতেই জব্দ। কিন্তু কেন জানেনা আজ সেই হামান দিস্তের শব্দটা তাকে সেই মুহূর্তে বড় অস্বস্তি দিচ্ছে। আদাটা বাটতেই হবে এবার। সে তো হল। এবার ননস্টিকের কালো ডেকচির মধ্যে তেল দিয়ে শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা আর সেই গরম মশলার গুঁড়ো ফোড়ন দিতেই চড়বড় করে উঠল। মডিউলার কিচেনের বন্ধ কাবার্ডের মধ্যে থেকে শব্দ পেতে লাগল চান্দ্রেয়ী। পেতলের বাসনের ঝনঝন আওয়াজ। মানে জানান দিচ্ছে তারা। শাশুড়ি মা সোনার মত চকচকে পেতলের হাঁড়িতেই খিচুড়ি করতেন। মনে পড়ে গেল। শব্দটা যেন ঠিক পেতলের হাঁড়িতে পেতলের হাতা খুন্তি দিয়ে নাড়লে যেমন হয় ঠিক তেমনি।
ননস্টিক ডেকচির মধ্যে ফোড়ন দিয়ে সেই আদাছেঁচা, ট্যোম্যাটো কুচি দিয়ে ছ্যাঁকছোক করে চাল ডাল ঢেলে কষিয়ে সেদ্ধ বসাল। ও মা! বেমালুম এইসব অদ্ভূত আওয়াজে ভুলেই গেছে সে খিচুড়িতে একটু আনাজপাতি দেবার কথা। ফ্রিজ খুলে আধখানা গাজর, দু চারটে ফুলকপির টুকরো বের করে ধুয়ে নিয়ে চপিং বোর্ডের ওপর রাখে। ছুরিতে কাটাই বহুকালের অভ্যেস তার। অথচ শাশুড়িমা নিয়ম করে রোজ সকালে সাবেকী বটিতে বসে আনাজ কাটবেনই। মডিউলার কিচেনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আনাজ কাটতে গিয়েই পায়ে কী যেন একটা ঠেকল তার। একবার নয়, দু’ তিন বার। আনাজ কুচিয়ে ফুটন্ত খিচুড়ির মধ্যে ফেলে তবেই সেই রহস্যের কিনারা করতে বসা। পায়ের কাছে ঠেকছিল সেই ত্রেতা যুগের বটি খানি। কী যে সব হচ্ছে আজ সকাল থেকে। চান্দ্রেয়ী ভেবে পায় না। হামানদিস্তার পর পেতলের বাসনকোসন আর তারপরই সেই পেল্লায় বটি। কী যে চাইছে এরা আজ চান্দ্রেয়ীর কাছে!  
কী আর করি মা! লোকজন আজকাল পেতল কাঁসার বাসন মাজতেই চায়না। ননস্টিক প্যান আমিই মেজে নিতে পারি তাই…
আজ হঠাত চান্দ্রেয়ীর স্বামী এসে দাঁড়িয়েছেন রান্নাঘরে। “তা হ্যাঁগো, টেফলন কোটেড এই ননস্টিক প্যান কিন্তু বছর দুয়েকের বেশী ব্যবহার কোরো না, কার্সিনোজেনের রিস্ক কিন্তু”
চান্দ্রেয়ী ভাবে, তাইতো। এবার বদলে নিয়ে আসবে। তার চেয়ে বাবা মায়ের মত পেতলের ডেকচিতেই তো রাঁধা যায়।
অমনি সেই পেতলের বাসনকোসন যেন আবারো ঠনঠন আওয়াজে মাতিয়ে দিল রান্নাঘর। চান্দ্রেয়ী বলল, “ঘাট হয়েছে খিচুড়ি রাঁধতে বসে! পাগল করে দিল যেন সকাল থেকে সব” মানে ভূত যেন খুশি হয়েছে চান্দ্রেয়ীর কথা শুনে।
অমনি আবার কেউ যেন বলে উঠল “বসে মানে? আজকাল মাটিতে বসে কেউ রান্না করে বুঝি? কোথায় গেল সেই কাঁঠাল কাঠের পিঁড়িখানা? বংশপরম্পরায় চলে আসছিল দিব্য। তা না সব হাটিয়ে দিয়ে সবাই সাহেব হয়েছেন বিবিরা! পিঁড়েয় বসে রান্না করতেন সবাই। উনুনের ধারে ঘন্টার পর ঘণ্টা। তাদের কথায় কথায় অত বাতের ব্যাথাও ছিলনা।”
আচ্ছা কোথায় গেল সেই পিঁড়িখানা? শাশুড়িমা কেও দেখেছে বটে সে। নিয়ম করে রোজ সকালে আনাজপাতি কেটে দিতে।
“সে তো তোমার বারান্দায় পড়ে থেকে রোদবৃষ্টির জল পেয়ে আধমরা এখন।”
বারান্দায় গিয়ে নজর পড়ল সেই পিঁড়ির করুণ অবস্থা। পঞ্চত্বপ্রাপ্তির আর বেশী দেরী নেই। পঞ্চভূতে বিলীন হবার আগেই সে ভূত হয়ে গেছে বুঝি। আর তাকে এখানে এক মুহূর্ত ঠাই দেবেনা চান্দ্রেয়ী।
তারপর বেমালুম ভুলে গেছে সে। খিচুড়ি নেড়েচেড়ে নামিয়ে ঘি ছড়িয়ে তবেই শান্তি হয়েছে তার। আজকের মত নিশ্চিন্ত।  
হাতের ফোন নিয়ে এবার খবরের কাগজে মনোনিবেশ। ঘরে ফ্যান চলছে না। অথচ টেবিলের নীচে রাখা খবরের কাগজগুলো ফড়ফড় করে উঠছে কেন? তাদেরও কী কিছু বলার আছে তবে? আজকাল আর খবরের কাগজ আসেনা বাড়িতে। সব খবর তারা দুজনেই হয় ফোনে নয় ল্যাপটপে পড়ে নেয়। কয়েকটা কাগজ রাখা আছে কেবল প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কাজে আসবে তাই। কিছু প্যাকিং করতে, রুটি বেলতে… নাহ! কাগজগুলো সব খুলে একেবারে ভাঁজটাজ খুলে পায়ের কাছে। বিরক্তিকর। একেক দিন কী যে সব হয়!
দেওয়ালের ঘড়ির দিকে চোখ যেতেই দেখে ঘড়িটা কাল মাঝরাত থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে।
একটা ব্যাটারী লাগিয়ে দেবে গো? স্বামীকে ডাকলেন। যেই না ভদ্রলোক ঘড়িটা নামিয়ে ব্যাটারী বদল করে জানতে চাইলেন টাইম আর চান্দ্রেয়ী অমনি শুনতে পেল পাশের ঘর থেকে দাদাশ্বশুরের সেই প্রকান্ড দেওয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং আওয়াজ। সেথ থমাস ঘড়ি।
কালো পালিশ। ভেতরের সাদা রঙেও মালিন্য। রোমান হরফগুলো পরিষ্কার যদিও। তবুও ওয়াল হ্যাংগিং হয়ে অ্যান্টিক শোপিসের মত দেওয়ালের শোভা বাড়ায় এখনো।  
“বারোটা বেজে দশ মিনিট বাজে। কল্পনার জন্য ৫ মিনিট ফাস্ট করে দিও…” বলতে বলতে সেই সেথ থমাস ঘড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই আর কোনো শব্দ এলো না কানে। এই ঘড়িকে না পারে তারা ফেলতে, না সারাই করে রাখতে।  নিয়ম করে দম দেওয়াটাও একটা কাজ যে। তার মানে সেদিনের লিস্টিতে বাড়ির সব আদ্যিকালের ভূতেরা নড়েচড়ে বসেছে মনে হচ্ছে। চান্দ্রেয়ী এসব কথা তার স্বামী কে বললেই তিনি হেসে উড়িয়ে দেবেন হয়ত। বলবেন, মনের ভুল, পেট গরম হয়েছে এইসব। কিন্তু চান্দ্রেয়ী অবিশ্বাস করতে পারে না তার ইন্দ্রিয়কে।
দুপুরের বৌয়ের হাতে খিচুড়ি খেতে খেতে ভদ্রলোক বললেন, মাঝেমধ্যে কল্পনা কামাই করলে মন্দ হয়না। হেঁশেলে হাতবদল হলে মুখ বদল হয় বৈকি!
চান্দ্রেয়ী এক গাল হেসে বলল, রান্নাটা ভুলিনি কী বল? আজ দুপুরে তবে ওটিটি তে কী দেখার প্ল্যান ফেঁদেছো ? ভদ্রলোক নিজের ফোন হাতে নিয়ে বললেন, এই যে কী যেন একটা বিতর্ক চলছে সেই ভুতুড়ে ওয়েব সিরিজটা নিয়ে?
আবার ভূত?
জানোই তো। একে ভূত তায় আরগুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ানদের মধ্যে অন্যতম বাঙালী। তুমুল আড্ডা চলছে সেখানে… এই দেখো। বলে ফেসবুকে সেই দুরন্ত থ্রেডটা চান্দ্রেয়ীর সামনে খুলে দিয়ে পাঁপড় ভাজায় মনোনিবেশ করলেন। কমেন্টের ফুলকি আর তর্কের তুফান উঠেছে রীতিমত।
কই ? দেখি, দেখি… বলে ফোন হাতে নিতেই চান্দ্রেয়ী শুনতে পেল তাদের ফ্ল্যাটবাড়ির নীচে প্রচন্ড আওয়াজ। মানুষ ঝগড়া করছে না আড্ডা দিচ্ছে বোঝা দায়। উঠে গিয়ে বারান্দা দিয়ে নীচে উঁকি মারল সে। কিন্তু সেই মুহূর্তে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। কারোকেই দেখতে পেলনা। তাহলে কারা তবে এত কোলাহল করছিল তখন? সে স্পষ্ট শুনেছে। সেই যে পাড়ার কানুবাবুর হম্বিতম্বি? কিছু হলেই নিজের রেশনের দোকান থেকে বেরিয়ে এসে সে কী আস্ফালন তাঁর ! তারপর সেই বিমলবাবু? পাড়ার ছেলেদের আচরণে পান থেকে চুন খসলে সেই দাপুটে হুঙ্কার ছেড়ে এমন দাঁড়াতেন সবাই তখন দৌড়ে পালাত। কিন্তু আজ তাঁরা কেউ বেঁচে নেই। কোভিডে সবাই মারা গেছেন। অথচ চান্দ্রেয়ী স্পষ্ট শুনেছে তাঁদের সেই অতি পরিচিত কন্ঠস্বর। ও তার মানে আবার সে ফিরে এল তবে!

চান্দ্রেয়ী মরিয়া এবার। এই ভূতেদের হাত থেকে রেহাই পেতেই হবে যেনতেনপ্রকারেণ। যেই না ফেসবুকের দেওয়াল আড্ডার সেই থ্রেড পড়ছিল সে ঠিক তখুনি পাড়ার রাস্তার আড্ডা একেবারে সশরীরে যেন উপস্থিত। মানে ঘর ছেড়ে এবার হুড়মুড়িয়ে দুয়ারে ভূত।

এইসবে মাত্র খিচুড়ি খেয়েদেয়ে একটু আয়েশ করবে তা না আবারো সেই অস্বস্তি কুরেকুরে খেতে লাগল তাকে। খেয়ে উঠে ভদ্রলোক টেলিভিশনে কাস্ট করতে ব্যাস্ত ওটিটির সেই বহুল আলোচিত ওয়েব সিরিজ। ঘরের এলইডি বাল্ব জ্বালতেই  ছাদ থেকে ঝোলানো তার শখের একরত্তি কাচের স্যান্ডেলিয়ার খুব জোরে নড়ছে… ভূমিকম্প হল ? দেখো না গো।
আরে ধুস! কী যে বল সারাক্ষণ। ভদ্রলোক বললেন।
আরে আমি দেখছি নড়ছে আর তুমি বলছ না? চান্দ্রেয়ী বলল।
ভদ্রলোক বললেন, এ এক বাতিক হয়েছে তোমার। বলে ছোট্ট ঝাড়বাতির স্যুইচ অন করলেন। এই তো কেমন জ্বলছে দেখো। উজ্জ্বল আলো। তবে বেশীক্ষণ জ্বালিও না। অতগুলো পুরনো বাল্ব। সব মিলিয়ে কয়েকশো ওয়াটেজ।
চান্দ্রেয়ী বলল, এবার বুঝেছি। এবার বাল্বের ভূত। দুয়ার ছেড়ে এবার সোজা ঘরের সিলিংয়ে।
মানে? এলইডি ভার্সেস ওল্ড বাল্বের অদ্ভূতুড়ে কিসসা।
এবার মন দিয়ে ওয়েব সিরিজ টা দেখো দিকিনি। আজকাল গৃহিণীর মন ঘোরাতে শত চেষ্টা করেন ভদ্রলোক। কিন্তু ভবি ভোলার নয়।
ভদ্রলোকের কথায় ওয়েব সিরিজ দেখতে বসে একটু সাময়িক নিস্তার পাবে হয়ত চান্দ্রেয়ী। ও বাবা! যেই সেখানে কালো স্ক্রিনে “ধূমপান ক্যান্সারের কারণ, ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর” শুরু হল অমনি সে সোজা পৌঁছে গেছে ততক্ষণে পাড়ার সেই সিনেমা হলে… অনেককাল আগে যেমন যেত তারা। চিপস, পপকর্ণ হাতে ছেলেগুলো এগিয়ে আসছে চান্দ্রেয়ীর দিকে। নাকে আসছে সব ভাজাভুজির গন্ধ। আলুর চপ, পেঁয়াজি, চিংড়ির কাটলেট…অন্ধকার হলের মধ্যে টর্চ হাতে নিয়ে সেই বয়স্ক মানুষগুলো? ঠিক যেন ওদের গাইড করে বিশাল টর্চের আলোয় টিকিট পড়ে সিট নাম্বার দেখিয়ে দিচ্ছেন… “লাস্ট রো তে চারজন ছেড়ে”
চান্দ্রেয়ী ভাবছে সে তো বসেই আছে নিজের ঘরে। ড্রইংরুমে যেমন রোজ বসে টিভি দেখে… কিন্তু মেলাতে পারেনা কিছুতেই সেই অঙ্ক। কেন এমন হচ্ছে তার?  
তুমি দেখো বরং, আমি দেখব না… বলে চান্দ্রেয়ী এগিয়ে চলে বেডরুমের দিকে… ভদ্রলোক ভাবেন, এই বলল দেখব, আর এই বলে দেখব না… বুঝিনা বাপু। কী যে তার মতিগতি।
তার চাইতে বেডরুমে ঢুকে সিরিয়াল দেখা ভালো। মনটা ঘুরে যাবে অন্যদিকে। তিনি দেখুন গে সেই ভুতুড়ে ওয়েব সিরিজ। কয়েকদিন ধরে এতসব ভূতের সঙ্গে মোকাবিলা করতে করতে চান্দ্রেয়ী রীতিমত ক্লান্ত। টিভির রিমোট হাতে নিয়েও ইচ্ছে করল না।
আচ্ছা ছাদে গেলে কেমন হয়? ছাদের প্যারাপেটের ধার ঘেঁষে দাড়িয়েছে এসে চান্দ্রেয়ী। পাশেই ডিটুএইচের প্রকান্ড ডিশ যেন ঢাল বুকে করে ছাদের অতন্দ্র পাহারায়। সেইসঙ্গে চিলেকোঠার মাথায় সেই আদ্যিকালের টিভির অ্যান্টেনা। বেঁকা চোরা, খানিকটা ঝুলছে। জঙ ধরেনি অবিশ্যি কারণ অ্যালুমিনিয়াম রাস্ট প্রুফ। খুলে দিলেই হত সেবার। দৃশ্যদূষণ। ভদ্রলোক সেবার বললেন, থাক না। পরে দেখে ভালো লাগবে। এসব আমাদের ছোটোবেলার নস্ট্যালজিয়া। তাই বলে ভাঙা অ্যান্টেনাও থাকবে? আচ্ছা ভাঙা অ্যান্টেনার রড গুলো কী চান্দ্রেয়ী কে দেখামাত্রই দুলতে শুরু করে দিল? নাহ! হাওয়া তো তেমন নেই ছাদে। কাক বসেছিল বোধহয়। কিম্বা পায়রা বা অন্য কোনো পাখী। ভাবতে ভাবতেই আবার চান্দ্রেয়ীর সেই ব্যারাম মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আচ্ছা একলা থাকলেই কী এমন হয় তার?
মন তোলপাড় করতে করতে নেমে আসে সে। ভূতের উপস্থিতির চক্কোরে কতদিন আলমারি গোছায় না সে। এলোমেলো হয়ে রয়েছে সব। ওহ! মনে পড়ে গেল। মেয়ে আসবে। ইমেইল করার কথা ছিল তাকে। সে আবার হোয়াটস্যাপ দেখে না। বলে দরকারি কথা, কিছু আনার কথা, অর্ডার দেবার কথা সব মেইলে পাঠাতে। ফোন থেকেই ইমেইলটা করে দেবে তবে। তারপর আলমারি নিয়ে বসবে। আলমারি ততক্ষণ খোলা থাক ফ্যানের হাওয়ায়। যা বৃষ্টি দিন কয়েক ধরে। জামাকাপড়ে কেমন যেন ভ্যাপসা গন্ধ সেই স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায়। হাতের মুঠোয় ফোন নিয়ে মেয়েকে ইমেইল করতে যাবে অমনি হল কেলেঙ্কারি কান্ড।
শাড়ির নীচ থেকে এক গোছা পুরনো চিঠি পড়ে গিয়ে ছত্রাকার মেঝের ওপর। চান্দ্রেয়ী দিশেহারা তখন। ফ্যানের হাওয়ায় ভাঁজ করা সব চিঠি খুলে গিয়ে যেন গিলতে এল তাকে। এবার তবে ইমেইল ভার্সেস হাত-চিঠির রাইভালরি শুরু হল বুঝি। মানে আধুনিক জীবনের যে কোনো অনুষঙ্গ মানে তা ইমেইল বা হামানদিস্তাই হোক আর ডিশ টিভির কেবল বা অ্যান্টেনা কিম্বা মিক্সার গ্রাইন্ডার বা শিলনোড়া, ওটিটি বা সিনেমা হল সব যেন আষ্টেপিষ্টে গিলতে আসে তাকে। কিছু যেন বলতে চায়। মানে জীবনযাপনের ভূতগুলো যেন মরে গিয়েও মরে নি। তাদের আধুনিক কাউন্টারপার্টে হাত দিতে গেলেই গিলতে আসে চান্দ্রেয়ী কে।  

কেন এমন হয় তার? আর কারোর তো এমন হয়না। আসলে চান্দ্রেয়ী এক অদ্ভূত রোগের স্বীকার। কতধরণের ভয়ের ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার সাইকিয়াট্রিস্ট। এ হল ফিয়ার অফ প্রেসেন্স বা মেডিক্যাল পরিভাষায় FOP। ডাক্তারবাবু কাউন্সেলিং করে বলেছেন এ ভূত আপনাকেই স্বয়ং তাড়াতে হবে। কোনো রেমিডি নেই।

পুরনো ভূতেরা যেন পাল্লা দিয়ে, রেষারেষি করে নতুনদের জব্দ করতে ব্যস্ত সর্বদা। এ যেন ভূতের দেশে দাদাগিরি। পুরনোদের অস্তিত্ত্বের সংকট আর নতুনদের জায়গাটা পাকাপোক্ত হয়েছে দেখে ঈর্ষার দ্বন্দ। ঠিক মানুষে মানুষে যেমন হয়। খালবিল নদীনালায় বড় মাছেরা ছোটো মাছেদের খেয়ে ফেলে। কলেজে প্রাক্তনীরা নবীনদের র‍্যাগিং করে, বাড়িতে নতুন বউ এলে বাড়ির প্রবীণরা সবসময় যেন এক হাত নেয়। কর্মস্থলেও সিনিয়াররা কথায় কথায় জুনিয়রদের ওপর হম্বিতম্বি করে। তাই এ আর নতুন কথা কী! ফিরে এল চান্দ্রেয়ীর জীবনে ঐতিহাসিক সেই মাতসন্যায়। তবে তা পুরোটাই ভৌতিক।
চান্দ্রেয়ী এখন সেই সত্য অনুধাবন করার পর তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয় আজকাল সেইসব পুরনো ভৌতিক অনুষঙ্গ গুলো। আসলে ডাক্তারবাবু বলেছেন মোটেও পাত্তা না দিতে। অন্য কাজে ডুবে যেতে… তাই তো সেদিন ছাত থেকে ঝট করে নেমে আলমারি গোছানোয় ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তারপর যে কী হল? মেয়েকে ইমেইলটাও পাঠানো হয়নি। ড্রাফট হয়ে বসে আছে মেইলবক্সে। তবে ইমেইলের ভূত চোখ খুলে দিয়েছে সেদিন চান্দ্রেয়ীর। পুরনো লালচে হয়ে যাওয়া সব চিঠির ভাঁজে ছিল চান্দ্রেয়ীর পুরনো প্রেমিকের একখান চিঠি। স্বামী সংসার, সন্তান নিয়ে মেতে উঠেও মনের কোণায় যেন থিতিয়ে গেছিল তাপসের সঙ্গে প্রেমের সুখস্মৃতি। তাপস পথ দুর্ঘটনায় চলে যায় চান্দ্রেয়ীর বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই। এবার কী তবে চান্দ্রেয়ীর এই অসুখ মানে FOP মুক্তি দিল তাকে? তাপসই কী তবে বারেবারে নিজের উপস্থিতি প্রমাণ করতেই আসত চান্দ্রেয়ীর যাপনে? চিঠিখানা ছিঁড়ে ফেলল চান্দ্রেয়ী। সেটাই হয়ত সেই মুহূর্তে তার এই বিরল রোগের অব্যর্থ দাওয়াই।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত