| 18 জুন 2024
Categories
ধারাবাহিক

ধারাবাহিক: রাণীয়ার রান্নাঘর (পর্ব-১১) । ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

মিঠির চিংড়ি বিলাস

দাতসীর চিজে বিগলিত মিঠি সেদিন বেমালুম ভুলেই গেছিল সেদিনের সেই চিংড়ি-র রান্নাটার কথা। ফ্রিজে অনেকটা শ্রিম্প পড়ে আছে। ছুটির দিনে সন্ধেয় শৈবাল মাঝেমধ্যে ব্যাটারে ফ্রাই করে দেয় তাকে। দুজনে দু গ্লাস ভদকা কিম্বা সিঙ্গল মল্ট হুইস্কি নিয়ে মুখোমুখি বসে তখন। গোল্ডেন ফ্রায়েড প্রণ টা ব্যাপক বানায় শৈবাল। কোনও মশলাপাতি দেয় না। তবুও কী সুন্দর টেস্ট হয়। ফ্রোজেন ব্যাটারে আবার সামান্য সোডা ওয়াটার ফেলে দেয় ক্রিস্পি হবে বলে।
সেই কুড়মুড়ে চিংড়ি খেতে খেতেই সেদিন হঠাত মনে পড়েছিল তার ঠাম্মার চিংড়ি বাটিচ্চচড়ির অনবদ্য সেই স্বাদের কথা। গরমের ছুটিতে জামশেদপুর থেকে কলকাতায় এসে চেটেপুটে ভাত খেত দুই বোনে। খোসা শুদ্ধ আলুর সঙ্গে একটু পটোলও কুচিয়ে দিত বোধহয় তার ঠাম্মা । সরষের তেলের ঝাঁঝে চোখ দিয়ে জল পড়ত। কী করে বানায় সেটা জানে না মিঠি। রান্না নিয়ে কিছু জানতে চাইলে আবারও মা বা বোন হাসাহাসি করবে। তার চেয়ে আরেকটা রান্না ট্রাই করা যেতেই পারে। সেই সেবারে বন্ধুদের সঙ্গে চিল্কা বেড়াতে গিয়ে জ্যান্ত চিংড়ির সেই রান্নাটা? সমুদ্রের ধারে জ্যান্ত চিংড়ি দিয়ে কী একটা রেডি টু ইট রেসিপির ভিডিও তুলেছিল মিঠির বন্ধু শ্রুতি। হোয়াটস্যাপে পাঠিয়েছিল সবাই কে। সেটাও ট্র্যাই করতে পারে মিঠি। অসাম টেস্ট সেটার। প্রচণ্ড গরমে বিয়ারের সঙ্গে সেবার জমে গেছিল।

তখন সবেমাত্র চাকরীতে ঢুকবে সবাই। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেই সবার ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্ট হয়েছে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে চলে যাবে মেয়েগুলো। যাবার আগে চিল্কার চটজলদি প্ল্যান ফেঁদেছিল মিঠিই।

চিল্কার সাগরপাড়ে প্রচুর মাছ ধরছিল জেলেরা। বাগদা, কাঁকড়া, পমফ্রেট ও সার্ডিন। মনে পড়ল তার। সেই দেখে মেয়েরা সব দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সেই মাছ গরম গরম ভেজে দিচ্ছে। এমন অভিজ্ঞতা আগে হয়নি কখনো কারোর। ওদের সামনেই সেই জ্যান্ত মাছ ধুয়ে রান্না করে দিয়েছিল । তখন রান্নার ব্যাপারে কোনও ইন্টারেস্ট ছিলনা মিঠির। ভাগ্যিস শ্রুতি ভিডিও তুলে রেখেছিল।
একদিন এবার শৈবাল কে সারপ্রাইজ দেবে সে। কী ভাগ্যিস ফেসবুক তার মেমারি শেয়ার করে রোজ। নয়ত সে কোথায় খুঁজে পেত এসব? ভিডিও টি উদ্ধার করে মিঠি যা দেখল তা হল প্রথমে ওরা চিংড়ি গুলোকে ধুয়ে নুন হলুদ দিয়ে ম্যারিনেট করল। তারপর মাটির উনুনে বসানো কালো কড়াইয়ের মধ্যে সরষের তেল ঢেলে দিল ওড়িশার সেই ছেলে। তারপরেই ঝিরিঝিরি কাটা পেঁয়াজ, টমেটো আর অনেক চেরা কাঁচা লংকা। ব্যাস নুন দিয়ে সেগুলি নেড়েচেড়ে এবার দিয়ে দিল ম্যারিনেট করা জ্যান্ত চিংড়িগুলো। তারপর লাল লংকাগুড়ো। নামানোর সময় ছড়িয়ে দিল সামান্য একটু সরষের তেল। ব্যাস। মিনিট দশেকেই সেদ্ধ হয়ে সবশুদ্ধ শালপাতার থালায় চলে এলো সেই সুস্বাদু চিংড়ি ভাজা। মেয়েগুলোর হাতে। সমুদ্রের ধারের শ্যাকের বেঞ্চিতে বসে মেয়েদের তখন হইহই আড্ডা আর সঙ্গে ছিল বিয়ারে চুমুক।এখনও মনে পড়ে। এক প্লেটে ১০টা মাছ ১০০ টাকায়। ভাবা যায়? সো চিপ! এমন কত প্লেট যে সেদিন মেয়েগুলো পেটে চালান করেছিল তার ঠিক নেই। একে প্রচন্ড খিদে তায় আবার টাটকা মাছ ভাজা। দারুণ লেগেছিল ওদের সবার সেই মূহুর্তে।
মিঠির মা ভিডিও দেখেই বলেছিলেন, ওরে এই রান্নাটিই একটু ঝিরিঝিরি কাটা আলু আর ক্যাপ্সিকামের সমন্বয়ে হয়ে উঠতে পারে রুটি বা ভাতের সঙ্গে এক লা জবাব ডিশ।
মিঠি ভাবলো, আরে! খুব ইজি তো! মানে বেশ কেজো আর চটজলদি রান্না একটা। এটা করাই যায়। সবচাইতে বড় কথা হল বেশ হেলদি। একদম রিচ নয়। এটাই কী তবে দিদার হাতের বাটি চচ্চড়ি? মনে পড়ল না মিঠির। সেসব মনে রাখতে পারে তার বোন রাণীয়া। পাকা গিন্নী সে এক্কেবারে । রান্না টেস্ট করেই বলে দেয় কী মশলা দেওয়া। তাই দিদার বাটি চচ্চড়ি রাঁধতে মায়ের অথবা বোনের সাহায্য নিতেই হবে তাকে।


আরো পড়ুন: রাণীয়ার রান্নাঘর (পর্ব-১০) । ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


রাণীয়া কে ভিডিও কল করবে মিঠি। আজকাল তার বোন খুব ব্যস্ত। প্রোফেশানাল ফুড ইভেঞ্জালিস্ট । যখন তখন তাকে ফোন করলে হয় না। সে ব্যস্ত থাকে ভয়েস ওভার নিয়ে। চ্যানেলের অডিও, ভিডিও সব রেকর্ডিং নিয়ে। হারানো বাংলার ক্যুইজিন নিয়ে কাজ করছে সে। একের পর এক। বোনের এহেন উত্তরণে মিঠির চেয়ে বেশী খুশি তাদের মা সেই মুহূর্তে। করে দেখিয়েছে আমাদের মেয়েটা। শ্বশুরবাড়িতে যোগ্য জবাব দিয়েছে সে। তাই মিঠির আনন্দ হয়। বোনের শাশুড়ির কটকট করে কথা শোনানোর দিন এবার বুঝি শেষ। মনে মনে গর্ব হল একমাত্র ছোটো বোন রাণীয়ার জন্য। ব্যস্ত বোন কে ভিডিও কলে ধরার আগে মেসেজ করে সে।
ইজ দিস গুড টাইম টু টক নাও?
হ্যাঁ, বল । ফ্রি আছি দিদি । দাঁড়া, এই বলে রাণীয়াই ঘুরিয়ে ভিডিও কল করে দিদি কে। সঙ্গে ওদের মা’কেও জুড়ে দেয় একসঙ্গে।
আজ কী নিয়ে কাজ হল তোর?
মিঠির প্রশ্নের উত্তরে রাণীয়া জানালো প্রজ্ঞাসুন্দরীর সেই বইখানির কথা। আজ ছিল তাঁকে শ্রদ্ধায় স্মরণের দিন। তাই ওনার বই থেকে কিছু অংশ পড়লাম রে। সঙ্গে ওনার নিজস্ব একটা বাংলা রান্নার রেসিপি জানালাম।
অমনি মা বললেন কী রান্না রে সেটা?
রাণীয়া বলল, মা, তুমি যে চিংড়ির পোলাও টা করো সেটার কাছাকাছি। রুইমাছের পোলাও। সেইসঙ্গে পোলাও এর ইতিহাস নিয়ে কিছু বললাম।
এসব শুনলে গর্বে মায়ের বুক ফুলে ওঠে।ফোন ক্যামেরার ওপারে মিঠি টিশার্টের কলার তুলে বোন কে উইশ করে। প্রাউড অফ ইউ মাই ডিয়ার সিস্টার। তবে অনসূয়া বুঝতে পারেন মিঠির এসব লোকদেখানো। মনের ভেতরে বড় মেয়ের একটু হলেও বাঁক আছে। তিনি যে মা। বুঝতে পারেন। মুখে হয়ত বোন কে বলে সে। লিংক দিস কিন্তু। শুনব। তবে ওই পর্যন্তই। রাণীয়া বেচারা এতসব রাজনীতি বোঝেনা। দিদিকে পাগলের মত ভালোবাসে সে।
শিওর। হলেই লিংক দেব রে। মিঠি কে বলে রাণীয়া।
বাই দ্যা ওয়ে তুই বাটি চচ্চড়ি নিয়ে একটা এপিসোড করিস। ওটাও কিন্তু হারিয়ে যাওয়া বাংলার রান্না।
মিঠির নিজের স্বার্থ নিয়েই ভাবে কেবল।
মা মুখ টিপে হাসতে থাকেন। এবার বড় মেয়েটাকে বাটিচচ্চড়ি তে পেয়েছে । নয়ত মাঝরাতে মা’কে সেদিন ফোন করে?
রাণীয়া বলে সে জন্য তো মায়ের হেল্প নিতেই হবে তোকে অ্যান্ড অ্যাট দ্যা সেম টাইম আমাকে।
মিঠি বলল, তাহলে বোথ অফ আস উইল বি বেনিফিটেড।
রাণীয়া বলল, মা, সেবারের মত আবার রেডি কর ভেবেচিন্তে। আর জানাও আমাদের।
মা বলল, এসব নিয়ে আমার প্রেপারেশন লাগে না। এখুনি চাই তোদের? বলে দিতে পারি। রেসিপি তো কিছুই নেই রে।
রাণীয়া বলল আমার চাই ইতিহাস আর সেই সঙ্গে রেসিপি। দিদির চাই শুধু রেসিপি ।
মিঠি বলল, মা প্লিজ বলে দাও তবে। অনেকটা ছোটো শ্রিম্প পড়ে আছে ফ্রিজে। রাঁধব তবে এই উইকেন্ডে।
রাণীয়া বলে, মা তোমার বড় মেয়ে কী বলছে দেখ। সে কি না সব ছেড়েছুড়ে এবার বাটি চচ্চড়ি রাঁধবে।

রাণীয়ার ফুড চ্যানেলে সেদিন চিংড়ির বাটিচচ্চড়ির প্রোমো দেখে যারপরনাই উচ্ছ্বসিত বাড়ির লোকজন। মিঠি তো সুপার এক্সাইটেড। ওদের মায়ের আনন্দ ধরে না আর।
রাণীয়া সেদিন লাল জরি পাড় একটা সাদা গাদোয়াল শাড়িতে সেজে এসেছে টেলিভিশন চ্যানেলে। শাড়িটা বাঙালি স্টাইলে আটপৌরে ভাবে পরেছে। কপালে মস্ত সিঁদুরের টিপও । সিঁথিতে সিঁদুর। দু হাতে শাঁখাপলার কোলে এক গোছা চুড়ি। কানে বড় বড় ঝুমকো। বাঙালি বউয়ের সাজ। সামনেই নতুন বছর। পয়লা বোশেখ এপিসোড স্পেশ্যালে সে বলবে বাঙালির হারানো রান্না চিংড়ির বাটিচচ্চড়ি নিয়ে।

অবশেষে সবাইকে নমস্কার জানিয়ে টিভির স্ক্রিনে অবতীর্ণ হয় ঠিক রাণীর মতোই। অনসূয়ার আদরের ছোটো মেয়ে রাণীয়া। রোজ ভিডিও তে মেয়ের মুখ দেখতে পাওয়া যায়না। সেদিন নেপথ্যের নায়িকা থাকে সে। শুধু মেয়ের গলার আওয়াজ শুনেই মন ভরাতে হয় মা’কে । তবে বিশেষ দিনের ব্যাপারই আলাদা।

ঢলঢল রূপসী হাসিমুখে তখন বলতে শুরু করে…
শুভ নববর্ষ! মৎস্যপ্রেমী বাঙালির নববর্ষের ভোজে শুরু থেকে শেষ অবধি মাছ, মাছ আর মাছ। শুরুতে মাছের মাথা দিয়ে ডাল আর শেষে মাছের অম্বল। কী ঠিক বললাম তো?
তার মধ্যে আবার বাঙাল-ঘটি কাজিয়াও অব্যাহত।
বাঙালের ইলিশ আর ঘটিদের চিংড়ি নিয়ে বাকবিতণ্ডা জীবনেও মিটবে না। আজ একটু আমার কথা বলি তবে।
আমার মায়ের বাবা এবং বাবার মায়ের জন্ম পূর্ববাংলার খুলনা জেলার সাতক্ষীরায়। তাই এই দুই পরিবারের কথার টানে ছিল ঘটি বাঙালের মাঝামাঝি সুর। খাদ্য রসনায় ছিল মিষ্টি গন্ধ। রন্ধনপ্রণালীতে ছিল প্রচুর মিল আর এই সাতক্ষীরার মানুষজনের মুখে চিরকাল বলতে শুনেছিলাম তারা যেন আজীবনকাল ধরে দেশভাগের করুণ স্মৃতি বয়েও ক্ষান্ত নন। কারণ পূর্ববাংলায় জন্ম আর পশ্চিমবাংলায় কর্ম, বিবাহ তাই ঘরেও নহে, পারেও নহে অবস্থা সারাটা জীবন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতো এই দুই মানুষকেই। মাঝখানে কাঁটাতারের বেড়া তো কী? আমরা সমানতালে চিংড়ি-ইলিশ দুইই খাই কব্জি ডুবিয়েই খাই।

মাছ না হয়েও পতঙ্গ শ্রেণীর চিংড়ির কিন্তু আলাদা কদর আমিষ মহলে। তার গায়ে মাছের লাল রক্ত না থাক, রাজকীয়তা কিছু কম নেই। তার শরীরে আঁশ না থাক স্বাদ কিছু কম নয়। ইলিশের মত শুধু মরশুমি জলজ শস্য নয় বলে এর সম্বচ্ছরি আদরও বাঙালি রান্নাঘরে কম পড়েনি কোনোকালেই। তার পোকা শরীরের গন্ধের কারণেই আপামর বাঙালি তাকে একছত্র অধিকার দিয়ে আসছে বাজারের মাছের থলি তে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা মহার্ঘ্য গলদা, বাগদা খায়। যার কেনার সামর্থ্য নেই সে ধানক্ষেতের চাবড়া থেকে হরিণা চিংড়ি খায়। যে আরও দীন সে কুচো ঘুষো যা পায় তাই ছড়িয়ে রান্না করে সেই অনুপম গন্ধে শুধু দুটো ভাত উঠবে বলে।

আমাদের সাতক্ষীরার ঐতিহ্য মেনে মামাবাড়ির মেন্যুতে প্রতিদিন ভাতের পাতে মাছের জবরদস্ত প্রধান পদটি রুই-কাতলা-ভেটকি হলেও মাঝারি বা কুচো আকারের চিংড়ির একটি সাইড ডিশ ছিল বরাদ্দ। এমনি আদরের কুচো চিংড়ির এক কেজো রান্না হত আমার দিদার হেঁশেলে। মামারবাড়ির পুকুরে নাইতে গিয়ে গামছা ফেলে হঠাত করে তিনি চমকে দিতেন বেশ দু’ চার মুঠো চিংড়ি ধরে এনে। তারপর সেই জ্যান্ত চিংড়ি খোসা সমেতই বেশ কিছুটা হাতের চাপে মশটে নিতেন। খোসা সমেত কয়েকটা আলু কুচিয়ে দিত কেউ। সদ্য ওঠা কচি পটোলের কুচিও দিতেন কখনও সখনও। অনেকগুলি চেরা কাঁচা লংকাও। এবার অ্যালুমিনিয়ামের বাটির মধ্যে সরষের তেলে পাঁচফোড়ন দিয়ে আলু ভেজে নিয়ে চটকানো চিংড়িমাছ দিয়ে নুন, হলুদ আর কিছুটা লাল শুকনো লংকা বাটা দিয়ে জল দিয়ে বসিয়ে দেওয়া হত উনুনের মরা আঁচে সেই বাটি চচ্চড়ি। সেদ্ধ হলে খানিক টা ঘেঁটে দিয়ে উদার হস্তে সরষের তেল ছড়িয়ে গরম ভাতের শেষ পাতে সেই অনুপম চিংড়ির বাটি চচ্চড়ির স্বাদ আজও ভুলতে পারিনা। দিদার দেখাদেখি বাড়ির ছোটো ছেলেমেয়ারাও পুকুরে চান করতে নেমে এভাবে চুনোচানা মাছ ধরে ফেলত। পুকুরঘাটের শান বাঁধানো সিঁড়ির ধারে কোনো কোনোদিন জমিয়ে চড়ুইভাতির আয়োজন করত চুপিসাড়ে। কেউ আনত আলু। কেউ লংকা ডলে নিত পাথরের ওপরেই।কেউ আনত চুপিচুপি নুন, হলুদ আর সরষের তেল। সব মায়েদের আড়ালে। চারখানি ইটের মধ্যে শুকনো গাছের ডালপালা জ্বেলে একদিকে বসত ভাত আর অন্য দিকে চিংড়ির বাটি চচ্চড়ি। দিদা বলত টেপাগোঁজায় বাটি চচ্চড়ির খুব তার হয়।
এই বাটি চচ্চড়ির আবার অন্যস্বাদ হত তেলের মধ্যে পেঁয়াজ কুচি নেড়ে নিয়ে। পেঁয়াজ দিলে অন্য কোনও ফোড়ন নয় আর। দিদা বলত।
বাটি চচ্চড়ি হল ভেতোবাঙ্গালীর অন্যতম রুড ফুড। কাঁচা লংকা আর সরষের তেল যার স্বাদের মূলে। যবে থেকে বাঙালি মাছ আবিষ্কার করেছে তবে থেকেই বুঝি চল এই বাটি চচ্চড়ির। এই বাটিচচ্চড়ির আবিষ্কার নাকি কোনও এক বাঙালি বাল্য বিধবার। আনাজের ফেলে দেওয়া অংশ থেকে খুঁটে বের করে জমিয়ে তিনি গোছ করতেন হাবিজাবি সব আনাজপাতির সারটুকুনি । বাড়ির সবার রান্না হয়ে গেলে সবার অলক্ষ্যে উনুনের নিভু আঁচে বাটি করে ঢাকাচাপা দিয়ে নুন, তেল, লংকা হলুদ দিয়ে মেখে বসিয়ে দিতেন। স্বামীহারার মনের সব দুঃখ আছড়ে পড়ত উনুনের ছাইচাপা আগুণে। ওদিকে ধিকিধিকি আগুণে রান্না হওয়া বাটিচচ্চড়ির সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ত আনাচেকানাচে। অল্প আঁচে ঢাকাচাপা দিয়ে বাটির মধ্যে রান্না নিরামিষ বাটি চচ্চড়িতে চিংড়ি, চুনোচানা মাছ পড়ে বাটি চচ্চড়ি একধাপ ওপরে উঠেছিল।
ভাগ্যিস সেদিন মা হোয়াটস্যাপে বাংলায় লিখে পাঠিয়েছিলেন। নয়ত এমন বাংলা লেখার শক্তি তাদের দুই বোনের কারোর নেই। তারা জামশেদপুরে কনভেন্টে পড়েছে। তবে মায়ের কাছে কী ভাগ্যি বাংলা বই পড়ে পড়ে বাংলা রফত করেছিল। নয়ত ওদের মায়ের ভয় ছিল মেয়েরা যদি ভালো বাংলা বলতে বা পড়তে না শেখে! সেখানে সবাই হিন্দি তে সারাক্ষণ কথা বলে। মা ভয় পেতেন তাই বর্ণপরিচয় থেকে সহজপাঠ সব পড়িয়েছেন মেয়েদের। বাবা হাতে তুলে দিয়েছেন বাংলা গল্পের বই। টেলিভিশনের পর্দায় আমেরিকাবাসী মেয়ের মুখে এত সুন্দর বাংলা শুনে মায়ের আনন্দ আর কে দেখে! তপন বাবু মেয়ের ডিজিটাল টিভি শো শেষ হতেই অবিশ্যি ক্রেডিট নিলেন সে যাত্রায়। রান্না তোমার জন্য হলেও বাংলা শেখা কিন্তু আমার জন্য… এই বলে।

 

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত