irabotee.com, চেসোয়াভ-মিউশ

বিশ্ব কবিতা দিবস: চেসোয়াভ মিউশ ও তাঁর কবিতা প্রসঙ্গে

Reading Time: 6 minutes
মতিন বৈরাগী
’’জীবন সংগ্রামে মানুষের আত্মরক্ষার জন্য দুটি সৃজনশীল হাতিয়ার হচ্ছে জ্ঞান আর কল্পনা। প্রাকৃতিক অবস্থা এবং মানব সমাজের বিভিন্ন পর্যায়কে বীক্ষণ ও পর্যালোচনা করার দক্ষতা, যার সাহায্যে সম্ভব হচ্ছে জ্ঞান বা চিন্তনের বিকাশ। কল্পনা যদিও একধরনের চিন্তন মানব মনের সচেতন প্রক্রিয়া, কিন্তু এ ক্ষেত্রে চিন্তার প্রকাশ ইমেজে। বলা যেতে পারে কল্পনা এমন এক শক্তি যার সাহায্যে মানুষ প্রাকৃতিক বিষয়বস্তুতে মানবিক গুণ.অনুভূতি ও বৈশিষ্ট আরোপ করে থাকে।’’ সংগত কারণেই সৌন্দর্য সৃষ্টির নিয়মানুযায়ী শিল্প-সাহিত্য-কবিতায় যুগ ও সমাজ পরিবর্তনের ছাপ তাৎক্ষণিক নয়। ’মানুষের সামাজিক সত্তাই তার চৈতন্যের নির্ধারক’। স্বাভাবিক ভাবে শিল্প-সাহিত্যিকরা যা কিছু নির্মাণ করেন তার মধ্য দিয়ে সামাজিক অবস্থানের চেতনাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মিউসের কবিতায় আমরা এই সত্য মোটামুটি ভাবে লক্ষ করতে পারি ।
 
চেসোয়াভ মিউশ-আমেরিকায় নির্বাসিত পোল-কবি, সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন ১৯৮০-তে। তাঁর শ্র্ষ্ঠে কবিতার অনুবাদ করেছেন মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়। মিউশের কবিতা নিয়ে কিছু বলবার আগে আমি বিনয়ের সংগে জানিয়ে রাখছি যে বিশ্ব সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত এতো বড় এক জন কবির কবিতা প্রসংগে প্রায় তাৎক্ষণিক কোন মন্তব্য করতে যাওয়া মোটেই সমীচিন নয় । তবুও ’কবিতাবাংলা’র সভাপতি আমার প্রিয় মানুষ ও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার অনুরোধ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি । আমি বিশ্বাস করি কোন কবির কবিতা প্রসঙ্গে কোন মন্তব্য বা আলোচনা করতে গেলে কবি ও কবির সৃষ্টিকে বার বার পড়ে, বুঝে, তার সৃষ্টির কালকে অনুধাবন করে তবেই পুরোপুরি কোনো মন্তব্য বা আলোচনা করা উচিত। উচিত সময় নেয়া, পড়া, এবং পঠিত বিষয়গুলোর অনুভূতিকে অন্তরঙ্গ করে শিল্পসত্তার ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করা। তবুও আমার স্বল্প পাঠে এই কবির মহত্ত যতোটুকু আমাকে মুগ্ধতা দিয়েছে আমি শুধু সেইটুকু নিবেদনের জন্যে দু’একটা কথা বলছি ।
 
অনুবাদক তার ভূমিকায় কবি এবং কবিতা প্রসঙ্গে অনেক কথা বলেছেন । বলতে গেলে আমার ভালো লাগবার বিষয়গুলোর অনেক তথ্য-উপাত্ত সেখানেই আছে। কবির স্বদেশ পোল্যান্ড বেশ কয়েকবার বাইরের আক্রমণের মুখে পড়ে এবং তার স্বধীনতা বিপর্যস্ত হয়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধকালে ১৯৩৯ সালে জার্মানরা আকস্মিক আক্রমণ করে পোল্যান্ড দখল করে নেয় । পোলিশ সেনাবাহিনীর সামান্য প্রতিরোধ কোনো কাজে আসেনি । ফ্যাসিষ্টরা দখল করার পর দখলে এগিয়ে আসে সোভিয়েত বহিনী এবং তারা পোল্যান্ডের শ্বেত রুশিদের অধ্যুষিত এলাকা প্রায় ৭৫ হাজার বর্গ কিলোমিটার-এর ভাগ জার্ম্নাদের কাছ থেকে গ্রহণ করে নিজদের নিয়ন্ত্রণে নেয় । শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে কমিউনিষ্টরা প্রধান্য বিস্তার করে এবং লাল ফৌজের সহযোগিতায় পোল্যান্ড মুক্ত হয়। এসব ঘটনাবলী কবির আবেগ আর অনুভূতিকে নানা ভাবে আলোড়িত করেছে এবং তার সৃষ্টিতে মৌলিক অনুসঙ্গ হয়ে আছে ।
 
কবি পরবর্তীকালে পোল সরকারের বর্হিদেশের কুটনৈতিক দপ্তরে সংষ্কৃতি বিভাগের প্রধান হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ’কোল্ড ওয়্যার’ যুগে আমেরিকাতে আশ্রয় নিয়ে প্রবাসী হয়েছেন । আর এভাবেই তিনি দেশান্তরী কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন । কেন তিনি তা’ করেছেন তার কোনো উল্লেখ কবি পরিচিতিতে নেই। অনুমানতো করাই যায়, যদিও কবি প্রবাসী তবু তিনি ঐ সমাজের সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে বসবাস করে নিজভূমির ইতিহাস ঐতিহ্যকে আশ্রয়-প্রশ্রয়-অবলম্বন করে তার সৃষ্টিকে সক্রিয় রেখেছেন ।
 
কবি তাঁর ’উৎসর্গপত্র’ কবিতায় বলেছেন ’কাকে বলে কবিতা, যদি তা না-বাঁচায় /দেশ কিংবা মানুষ?’ কবিতা মানুষকে বাঁচাবে কিংবা বাঁচার দাবীতে সোচ্চার হবে, মানুষ কে আশান্বিত করবে এবং হতাশা ও গ্লানি থেকে মুক্তির জন্য মানুষকে উদ্দীপ্ত করবে এমনটা যদি না হয় তো তাকে কবিতা বলবো কেন? কিন্তু তবুও কতো রকমের কবিতা রোজ লিখিত হচ্ছে পৃথিবী জূড়ে, আর তাতে কতো মত পথ ইত্যাদিরও প্রয়োগ রয়েছে। কিন্তু এমন উচ্চারণ তো সবটাতে আর থাকছে না যে ’যদি তা না বঁচায় দেশ-মানুষ’ । এই ধরনের পঙক্তি নিশ্চয়ই ভিন্ন করে দিচ্ছে কবিতার উচ্চারণ । ’এইতো পোল্যান্ডের সব অগভীর নদী-ধোঁয়া উপত্যকা।/ আর এক বিশাল সেতু/ শাদা কুয়াশায় চ’লে যাচ্ছে।/ এই যে ভাঙাচোরা শহর,/ আর হাওয়া ছিটিয়ে দেয় তোমার কবরের ওপর গাং-চিলের চীৎকার,/যখন আমি তোমার সঙ্গে কথা বলি’। গাংচিল নদী-নির্ভর পাখি, নদীর মাছ খেয়ে সে বাঁচে, তার কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ণ-তীব্র, সচকিত করে আস-পাশ এবং কখনো কখনো ইঙ্গিতবাহী হয়ে ওঠে ’আর ভাঙাচোরা শহর’ উপমা হিসেবে জীবন ও জীবিকার বিপর্যস্ততাকে তুলে আনছে সেই তুমির ক্ষেত্রে যাকে কবি বাঁচাতে পারেননি। শুধু তা’ কবি নয় আরো অনেককে, অনেক সহযোদ্ধা যাঁরা বাঁচেনি কিংবা যারা বেঁচে গেছেন, আকুতিটা নিজের মধ্য থেকে বৃহত্তের দিকে সম্প্রসারিত… ‘এবং আমি তোমার সংগে কথা বলি নিশ্চেতনা থেকে’ … এই ধরনের উচ্চারণ আমাদেরকে অন্যরকম ব্যঞ্জনাময় অনুস্বরের মধ্যে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। পাশাপাশি এরকম সরল ব্যাঞ্জনাধর্মী পঙক্তির বিস্তার আমরা লক্ষ্য করতে পারি। ’কোন নাগরিকের গান’ কবিতায় ’আমি দেখেছি দেশগুলোর পতন আর কত জাতির নরকবাস, রাজা ও সম্রাটদের পলায়ন, স্বৈরাচারীদের ক্ষমতা।’ ’কোন নাগরিকের গান’ কিংবা ’কাফে’ কবিতাটির ’কাফের সেই টেবিলটায় যারা বসতো/যেখানে শীতের দুপুুরে জানলার কাঁচে ঝলসে উঠতো বাগানের তুহিন/ শুধু অমিই বেঁচে আছি একা’ একদম সাদা-মাটা বিবৃতি কিন্তু ব্যঞ্জনাময়, দুপুর আছে, শীতও আছে কাফের সেই টেবিলটা ও আছে, কিন্তু আরো যারা ছিলো একদিন এবং একদিন যারা এমন শীতের দুপুরে এখানে থাকবে বসবে বলে আশা করা গেছে তারা আর নেই। এমন ’নেই হয়ে যাওয়ার’ স্মৃতিগুলো যা চেতনে অবচেতনে জাগ্রত দিনের মতো ’অবিশ্বাস ভরে আমি ছুঁই তুহিন মর্মর/অবিশ্বাস ভরে আমি ছুঁই আমার নিজের হাত’– এক দ্বান্দ্বিক সংকোচন ও সম্প্রসারণ পাঠককে মুগ্ধতা দেয় । ১৯৪৪ সালে লেখা এই কবিতাটি পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেবে পোল্যান্ডের মানুষের প্রতিরোধ যুদ্ধ, যুদ্ধের ভয়াবহতা আর সেই যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া তাজা প্রাণগুলোকে, ’কারণ আমি-তো এখনও জানি না মানুষের হাতে ম’রে যওয়াটা সত্যি কী, ওরা জানে ওরা জানে তার সব’। এই কবিতাটা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া মানুষদেরকেও যেন একই ভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়, একই ভাবে বলা যায় সবই আছে ওরা নেই, অথচ ওরাই জানে মানুষের হাতে মরে যাওয়ার সত্যিটা, ওরা জানে তার সব, শুধু এদিকের এরা আজও জানে না, তাই এতো বিপত্তি ।
 
আধুনিক কালের মনীষীরা সারা পৃথিবীকে তাঁদের সৃজন ক্ষমতা দ্বারা প্রভাবিত করেছেন, তাঁদের সর্বাগ্রগণ্যদেও মধ্যে আছেন মার্কস, ডারউইন আর ফ্রয়েড । বলা যেতে পারে তাঁদের জ্ঞানালোক দ্বারা তারা মানব জীবন বুঝতে জানতে এবং তা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে বিপুল অবদান রেখে গেছেন, যা আজো সারা পৃথিবীকে ভাবিয়ে চলছে, আলোড়িত করছে। ্ডারউইনের আবিষ্কার যুগ-যুগ ধরে প্রগতিরুদ্ধ মানুষদের জানতে চিনতে বুঝতে শিখিয়েছে জীবন বিকাশের নিয়মাবলী, আর মার্কসের সমাজত্ত্ব, দর্শন সমাজ রাষ্ট্র, রাজনীতি অর্থনীতি যে গতি দিয়েছে তা’ শুধু মাত্র রাষ্ট্র-রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্যেই সীমিত থাকেনি, বরং জীবনকে আমূল বদলাতে প্রয়োজনীয় বহু বিষয়ে মানুষকে বিপুল প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে । শিল্প-সহিত্য সহ নানা সৃজনশীল কাজে তার প্রভাব পড়েছে অপরিসীম । ফ্রয়েডের মনস্তত্ত্ব ’ ঈশ্বর অপরিবর্তনীয়, ধ্রুব বিশ্বাসের প্রতীক’ – মানুষের এই সনাতন মূল্যবোধে প্রচন্ড আঘাত হানলো। তার আবিষ্কৃত মনস্তত্ত্ব বলছে, মানুষের চেতনা সংহত কোন পদার্থ নয়, চেতনার আলো দূরবিস্তৃত এক অতল অন্ধকারে, যা নিয়ন্ত্রিত হয় চেতনার ক্রিয়া-কলাপে । ফ্রয়েড তত্ত্ব প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানেই যখন ভারতবর্ষে পৌঁছালো তখন তা’ এখানকার শিল্পী-সাহিত্যিকদের মানসিক জগতেও আলোড়ন তুলেছিলো। রবীন্দ্রনাথের সাথে ফ্রয়েডের সাক্ষাত হয়েছিলো ১৯২৬ সালে ২৫ অক্টোবর, ভিয়েনায়। ফ্রয়েড-এর তত্ত্ব সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন, জীবনের শেষের দিকে আনন্দরূপের জয়গান করতে করতে মনের আদিমতম রূপকেও তিনি অস্বীকার করতে পারেননি, ‘অচেতন তোমার অঙ্গুলি/ অস্পষ্ট শিল্পের মায়া বুনিয়া চলিছে/ আদি মহার্ণব গর্ভ হতে/ অকস্মাৎ ফুলে ফুলে উঠিতেছে/ প্রকা- স্বপ্নের পি-/ বিকালাঙ্গ,অসম্পূর্ণ ’ ’তুমি মোরে দিয়েছ কামনা. অন্ধকার অমারাত্রি সম’ বা ‘শত শত শুকরের চিৎকার সেখানে/ শত শত শুকরীর প্রসব বেদনার আড়ম্বর’’ এমনি অনেক পঙক্তি রচিত হয়েছে বাংলা কবিতায়। ফ্রয়েডের মনস্তত্ত্ব খুব বেশী বিস্তার পেয়েছে জীবনানন্দ দাশের কবিতায়, এ জন্যে কোন কোন সমালোচক তা’কে নিশ্চেতনার কবি বলেও অভিহিত করেছেন । যদিও আমার মনে হয় কখনো কোন কবিকে বিশেষ কোন অভিধায় অভিহিত করা যুক্তি-যুক্ত নয়। কবি যে কবি, এটাই তার সার্থক পরিচয় । ফ্রয়েড ’চেতন ও অবচেতনের’ নিচে আর একটি স্তরের কল্পনা করেছেন যাকে বলা হয়েছে প্রাগ-চেতনা; এতে থাকে সেই সব অভিজ্ঞতা যা এক সময় মানুষ উপভোগ করেছে। প্রাগ চেতনার মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে থাকে মনের প্রহরী, ফ্রয়েড যাকে বলেছেন ‘সুপার ইগো’। মনের অনেক কামনা বাসনা যা সমাজ কাঠামোয় প্রকাশ অসংগত ’সুপার ইগো’ তা’ প্রকাশে অনুমতি দেয় না । তার এ তত্ত্বের বিপরীত মতও আছে এবং বিধান নিয়েও নানা সময়ের আলোচনা আছে। ইয়ঙ এবং পাভলভ প্রমূখরা ভিন্ন কিছু মতামত এবং বিধানের কথাও বলেছেন। সে প্রসংগ এখানে আলোচ্যের নয়, তবে কাব্যে শিল্পে ফ্রয়েডের এই আবিষ্কার শিল্প শৈলী, চিত্রকল্প বিষয়বস্তু ইত্যাদিতে প্রয়োগ পেয়ে সৃষ্টিকে যে আরো গভীর, ব্যঞ্জনাময় করে তুলেছে এবং গতানুগতিকতাকে ভেঙে শিল্পী-কবিÑলেখক সৃজনশীল মানুষকে এবং তার পাঠককে নতুনতর নির্মাণ শৈলীর ভুবনে প্রবেশ করতে দিয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। মিউশের অনেক কবিতায় মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োগ সার্থকভাবে আছে । ’কোন দেশকে ভালোবেসো না : দেশগুলো চট ক’রে উধাও হ’য়ে যায়/ কোন শহরকে ভালোবেসো না ; শহরগুলো সব চট করে আবর্জনার স্তূপ হ’য়ে পড়ে..অতীতের সব দিঘিগুলোর দিকে তাকিয়ো না…এমন এক মুখ যা তুমি কখনও প্রত্যাশা করোনি’।
 
মিউশের কবিতাগুলোর ভিতরে দিকপাত করলে আমরা চেতন-অবচেতন আর অচেতন-এর নানা উপস্থিতি লক্ষ করতে পারি । নির্বাসিত জীবনে তিনি আমেরিকায় আর জন্মসূত্রে তিনি পোলিশ, পোল্যান্ডের ভূমি, বাতাস, মানুষ প্রান্তর তার চেতনা জুড়ে থাকলেও বর্তমান সময়, অবস্থা-অবস্থান-পারিপার্শিকতায় তার অনেক ইচ্ছে, কর্ম, সাধনা নানা রূপ বিরূপতায় ধূসর হয়ে উঠেছে। ওই সব দিনগুলোর স্মৃতি হারিয়েও যায়নি , আবার প্রকাশ পারঙ্গমও নয়, তাই তারা নানা প্রতীকী ব্যাঞ্জনায় উঠে আসছে এই ভাবে ’পশু শক্তির জয়ী হবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না/ আমরা বাস করি সফল ন্যায় বিচারের যুগে’; ‘আবার পশুশক্তির কথা উচ্চারণ কোর না, নয়তো তুমি সোপর্দ হবে/গোপনে-গোপনে হেরে যাওয়া সব মতবাদ মেনে নাও/যার শক্তি আছে ,তারই আছে ঐতিহাসিক যুক্তিপ্রক্রিয়া..’ এভাবে দ্বৈত বাক-বিন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি একটা সিদ্ধান্ত দিতেও চেয়েছেন এক আত্মগত প্রশ্ন আর জবাবে।
আনুবাদকের মিউশ প্রসংগে তার জীবন ভাষ্যে দেখা যায় যে প্রতিরোধ যুদ্ধের সময় পোল্যান্ডের আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টির সক্রিয় সদস্য, মার্কসবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। স্বভাবতই তার কবিতায় তাঁর অঙ্গীকার মানবতার পক্ষেই থেকেছে, তিনি ভুলে যাননি তার পোল্যান্ডকে আবার বন্ধন ছিড়েও ফেলেননি তার প্রবাসী জীবনের সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশ । অবশ্য যারা পার্টি সহিত্য বলতে রাজনৈতিক শ্লোগান বোঝেন. তাদের কথা ভিন্নরূপ। অথচ মার্কস শিল্পীদের সম্পর্কে যথেষ্ট অনুরাগ প্রকাশ করেছেন। তিনিও তাঁর কন্যারা শেকসপীয়র ভক্ত ছিলেন। ‘জোসেফ ভাইদেমেয়ারের’ কাছে লিখেছিলেন কবি তিনি যেমন মানুষই হোন না কেন, কিছু প্রশ্রয় ও প্রশংসার দাবী রাখে। .. হাইনেকে ভালোবেসে ফরাসী সরকারের কাছ থেকে অর্থ নেয়ার কলংক থেকে তাকে রক্ষার চেষ্টাও করেছেন। ফলে এখানেই উপলব্ধির পার্থক্য। জে. অপ্রেসিয়ান ’স্বাধীনতা এবং শিল্পী’ বই-এ সিদ্ধান্ত আকারে জানিয়েছেন যে ’মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দৃষ্টিতে শিল্পীর স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে জনগণের স্বার্থে জনগণের বৌদ্ধিক জীবনের সমৃদ্ধির জন্যে জনগণের সঙ্গে অগ্রসর হওয়া’।
তবুও শিল্প-সহিত্য প্রসংগে আলোচনার বিপরীতে আলোচনার শেষ নেই, বোধ করি শেষ হওয়াও উচিৎ নয়। কবি সহিত্যিকরা কোনো পার্টির সদস্য কিনা তা’ জরুরী নয়, যা প্রয়োজন তা হলো তিনি তার কাজে সৎ এবং সাহসী ছিলেন কিনা এবং সঠিকভাবে জীবনকে উপলব্ধি করে তার সৃষ্টিতে প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন কিনা, আর পাঠক তার রসাস্বাদনের মধ্য দিয়ে সুন্দরের অনুভবে একটি সত্যে পৌঁছাতে পারলেন কিনা। যেমন করে বলেছেন রবীন্দ্রনাথ, ’সত্যই সুন্দও, সুন্দরই সত্য’। আর সে সত্য হচ্ছে মানুষ, মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম আর সুন্দর হলো তার চেতনা। তাই সত্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে কবিকে পৌঁছাতে হয় বিস্তৃত চেতনায় । তার জন্য একজন কবির যেমন দরকার আবেগ তেমনি দরকার কল্পনা এবং বলবার মতো নিজস্ব ভাষা। তার আরো জানতে হয় নির্মাণ কৌশল আর উপযুক্ত সম্পাদনা। মিউশের কবিতায় এর সম মাত্রা ও পুষ্টির উপস্থিতি আছে।
 
আলোচ্য গ্রন্থ:
চেসোয়াভ মিউশ : শ্রেষ্ঠ কবিতা।
অনুবাদ: মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
দে’জ পাবলিশিং।
কোলকাতা।
প্রচ্ছদ দেবব্রত ঘোষ।
৩য় পরিবর্ধিত সংস্করণ ২০০০।
দাম ৬০ টাকা।
 
সহায়ক পাঠ :
১. অনুবাদকের ভাষ্য (মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়);
২. দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস (মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়);
৩. মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্ব (ড. বিমলকুমার মুখোপাধ্যায়);
৪. সাহিত্য বিচার-তত্ত্ব ও প্রয়োগ (ড. বিমলকুমার মুখোপাধ্যায়);
৫. ফ্রয়েড (সুনীল কুমার সরকার)
৬. ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব ও বাংলা কবিতা (মৃণালকান্তি ভদ্র )
 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>