| 16 এপ্রিল 2024
Categories
গীতরঙ্গ

আহারে বাহারে চোদ্দশাক । সায়নী মুখার্জী

আনুমানিক পঠনকাল: 14 মিনিট

আজকের সময় থেকে যদি বেশ কয়েক দশক পিছিয়ে যাইযখন লাইফ ওয়াস নট ডিজিটালযখন স্মার্টফোন আমাদের সকলকে স্মার্ট হওয়ার বাধ্যতামূলক কোর্স করায়নিযখন পাড়ায় পাড়ায় থিম পুজোর টক্কর কিংবা চৌরাস্তায় লাগানো চারদিকের চোঙা মাইকের পাঁচমিশেলি গান উৎসবের আড়ম্বর প্রকাশ করত নাতখন গ্রাম শহর মফস্বলের রীতি আচারে বিভাজন সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। ছোটো ছোটো আবাসনের পুজোর হিড়িক এর পরিবর্তে গোটা গ্রামের বা গোটা এলাকার একটাই পুজো হত সেইসময়৷ দুগ্গাপুজো মানেই উমার বাপেরবাড়ি আসা, ছেলেপুলে সঙ্গে করে কটা দিন কাটিয়ে ফের ফিরে যাওয়া কৈলাসে তাই একচালার প্রতিমাকে ফুলজল অন্নবস্ত্র দিয়ে আদরযত্ন করে বাঙালি। দুর্গাপূজার বহু উপাচার ব্যায়সাপেক্ষ তাই না পারলেও মর্ত্যের মেনকা সংসারের মঙ্গল কামনায় শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে ঘরে লক্ষ্মীদেবীর আরাধনা করেন সাধ্যমত।

সেইসময় ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ বয়ে আনত লক্ষ্মীপুজো আর দীপাবলি।

বাঙালির উৎসব সমান সমান খাওয়া দাওয়া। তাই লক্ষ্মীপুজোর নাড়ু পাকানোর সঙ্গে সঙ্গেই উৎসবের সলতে পাকানো হত৷ আজকের মত মিষ্টির দোকানে গেলেই প্যাকেটজাত নাড়ু তখন পাওয়া যেত না। সংসারে সকলের সারাদিনের রান্নাখাওয়া শেষ হলে বাড়ির মা বউরা শুদ্ধবস্ত্রে উনুনের ঢিমে আঁচে নারকেল কোরাতে গুড় মিশিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আগুনতাতে বসে থেকে পাকশালা সুগন্ধে ভরিয়ে তুলে জানান দিত উৎসব এসে গেছে। মিষ্টিমুখ হলো আর আলো জ্বলবে না তাই কী হয়থালার ওপর সোনার দানার মত নাড়ু উৎসবের রঙ আর গন্ধ দুই নিয়ে আসত কিন্তু উৎসবের রূপ আলোয় আলোয়।

তখন আর্থিক কারণেই মোমবাতির ব্যবহার তেমন ছিল না বোধহয়৷ পুকুরপাড় বা গঙ্গারধার থেকে নরম কাদামাটি তুলে এনে প্রদীপ বানিয়ে রোদে শুকোনো হত৷ তুলোটুকুও না জোগাড় করতে পারলে কত্তামশায়ের পুরোনো ধুতির টুকরোই হত প্রদীপের সলতে। তবুও আলো জ্বলবে। আলোটুকুই উৎসব৷

ছোটো থেকেই দীপাবলির আলোর প্রতি আমার অমোঘ আকর্ষণ। সারাবছরের শ্রান্তি ভুলে সকলে নিজের ঘরে আলো জ্বালানোয় মেতে ওঠে। অন্ধকার রাত্রে কাছে দূরের সেইসব মিটমিট করে জ্বলা আলো দেখলে মনে হত আকাশের তারারা মাটিতে নেমে এসেছে।

দীপাবলির আলো ভালোবাসলেও দীপাবলির আগের দিন দুপুরে ভাতের পাতে চোদ্দশাক খেতে মোটেই ভালো লাগত না। তেতো তাই খেতে চাইতাম না। মা বলত খেতে হয়। দিদার কাছে শুনেছিলাম দীপাবলির আগের দিন ভূতচতুর্দশী তাই এইদিন দুপুরে চোদ্দশাক খেলে আর সন্ধ্যেতে চোদ্দপ্রদীপ দিয়ে ভুত তাড়ানো হয়৷ ভূত কীভূত কেমন হয়এর উত্তরে রাম !রামওসব বলতে নেই! ‘ উত্তর পাওয়া গেলেও চোদ্দশাক কেনো খাবোভূত ভালোবাসেনা তাইএমন প্রশ্নের কোনো উত্তর মেলেনি। কেবল খেতে হয়আমরাও ছোটোবেলায় খেয়েছিএগুলো নিয়ম তাই খাবি এই ধমক খেয়ে চুপ করে শাক খাওয়া ছাড়া কিছুই হয়নি৷

দিদা থেকে মা থেকে আমি দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানমানসিক সামাজিক বহু বদল পেরিয়ে এসেও এইসব আচার নিয়ম কীভাবে যেন থেকে গেছে। তাই ডিজিটাল ইমেজের শুভেচ্ছা আমার মনকে নিয়ে যায় সেই না দেখা অচেনা কোনো গ্রামের ছোট্ট কুঁড়ের তুলসীমঞ্চে প্রজ্বলিত প্রদীপের কাছে। পুরোনো সব কিছু নতুন করে আরেকবার দেখার জন্যই ঠাকুরদার বইপত্রছোটবেলার পড়া উদ্ভিদবিজ্ঞান আর বড়বেলার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আন্তর্জাল মিলিয়ে মিশিয়ে নিজের মত করে এই লেখায় তুলে আনলাম চোদ্দ শাক।

বিশেষ কিছু রোগের ক্ষেত্র ছাড়া শাক দুনিয়ার সব প্রান্তের পুষ্টিবিজ্ঞানীদের কাছে খাদ্যতালিকার অত্যাবশ্যক একটি উপকরণ এটা আমরা জানি। বাঙালির পাতেও শাকের গুরুত্ব চিরকালীন। সুখী দাম্পত্য জীবনের রহস্যের কথা প্রসঙ্গে প্রাকৃত ভাষায় বাংলার অন্যতম প্রাচীন রচনা ‘প্রাকৃতপৈঙ্গল’এ শাকের উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়েছে 

ওগগর ভত্তা রম্ভঅ পত্তা গাইক ঘিত্তা দুগ্ধ সংযুক্তা।
 
মোইলি মচ্ছা নালিত গচ্ছা দিজ্জই কান্তা খা (ই) পুণবন্তা।
 
(বা.ই – ৪৪৪ পাতা)

অর্থাৎ কোনও স্ত্রীলোকের পরিবেশন করা কলাপাতায় গাওয়া ঘি দিয়ে গরম ভাত সাথে দুধমৌরলা মাছ আর নলচে শাক যিনি খান তিনি পুণ্যবান। নীহাররঞ্জন রায়ের লেখা “বাঙ্গালীর ইতিহাস” গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে প্রাচীনকালে গ্রামের গরিব বাঙালির অন্যতম প্রধান খাবার ছিল শাকসব্জি। ষোড়শ শতকের চৈতন্যকাব্যগুলিতেও বাঙালির খাবার হিসেবে শাকের উল্লেখ রয়েছে। শ্রীচৈতন্যদেব নিজেই নানা ধরণের শাক পছন্দ করতেন।

কারও মতে শস্যদায়িনী দেবী শাকম্বরী অর্থাৎ দুর্গার আরাধনার পরেই আসে কালীপুজো। তাই দুগ্‌গামায়ের সঙ্গে যেমন নবপত্রিকার গাঁটছড়া বেঁধে দেওয়া হয়েছে তেমনই কালীর সঙ্গে চোদ্দো শাকের গাঁটছড়া বাঁধা হয়েছে। আবার সমাজবিজ্ঞানীদের মতেশরৎ থেকে শীত ঋতুতে পদার্পণের সময় ঋতু পরিবর্তনজনিত নানা রোগ হয়। তাই ভেষজগুণসম্পন্ন চোদ্দ শাক খেয়ে সেইসব রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি হয়েছে এই রীতি।প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী মহালয়ার দিন তর্পণ করা হয় পিতৃপুরুষদের অন্নজল দানের জন্য। চোদ্দপুরুষ যমালয়ে কালাতিবাহিত করার পর অমৃতলোকে যাত্রা করেন। তার আগে বসতভিটে দেখতে আসেন তাই তাদের যাত্রাপথে আলো দেখানোর জন্য চোদ্দপ্রদীপ জ্বালা হয়৷ বিজ্ঞানমতেও fourteenth generation খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই বিশ্বাস এর বা এই আচারের অন্য আরেকটি ব্যবহারিক দিকও আছে বলেই আমার মনে হয়৷ শীতের সমস্ত উৎপাদিত ফসল হেমন্তে কাটা হয়৷ সেই ফসলকে পোকা ইত্যাদির ক্ষয় ক্ষতি থেকে বাঁচাতে প্রদীপ জ্বালানো হত ৷ এইসময় প্রচুর শ্যামাপোকা হয় আর আলোর চারদিকে তারা ঘুরে বেড়ায় তাই প্রদীপের আলোয় গৃহ সৌন্দর্যবৃদ্ধি আর হৈমন্তিকা ফসল রক্ষা উভয়ই হত বলেই মনে হয়৷আর ভূতচতুর্দশীর দিন যেসব শাক খাওয়ার কথা বলা হয়েছে সেই শাক গুলির গুণাগুণ দেখে আমারও তাই মনে হয়েছে যে রোগ প্রতিরোধের জন্যই এমন রীতির প্রচলন।

যদিও এখন বাজারে যে চোদ্দো শাকের আঁটি ভূত চতুর্দশীর দিন বিক্রি হয় তার সঙ্গে প্রচলিত চোদ্দো শাকের খুব একটা মিল নেইকারণ সব জায়গায় সব শাক পাওয়া যায় না। তাই বাঙালি চোদ্দো শাকের ব্যাপরে এখন অনেকটাই উদাসীন।

ভূত চতুর্দশীতে প্রচলিত চোদ্দো শাক খাওয়ার কথা পাওয়া যায় ষোড়শ শতাব্দীর স্মৃতিশাস্ত্রকার রঘুনন্দনের লেখা “কৃত্যতত্ব” গ্রন্থে যেখানে তিনি প্রাচীন স্মৃতির গ্রন্থ “নির্ণয়ামৃত”এর অভিমত অণুসরণ করেছেন। শ্লোকটি হল –

“ওলং কেমুকবাস্তূকং, সার্ষপং নিম্বং জয়াং।
 
শালিঞ্চীং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলুকং গুড়ূচীন্তথা।
 
ভণ্টাকীং সুনিষন্নকং শিবদিনে খাদন্তি যে মানবাঃ,
 
প্রেতত্বং ন চ যান্তি কার্ত্তিকদিনে কৃষ্ণে চ ভূতে তিথৌ।“
 
অর্থাৎ চোদ্দো শাক হল ওল, কেঁউ, বেথো বা বেথুয়া, কালকাসুন্দা, সরষে, নিম, জয়ন্তি, শালিঞ্চা, হিংচে, পলতা, শুলকা, গুলঞ্চ, ঘেঁটু বা ভাট ও শুষনি।

এই সব শাক কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথি অর্থাৎ ভূতচতুর্দশীতে খেলে তার কাছে প্রেত ঘেঁষতে পারে না। এখানে প্রেত বলতে যদি রোগজীবাণুদের বোঝানো হয় তবে তা সত্যি তাৎপর্যপূর্ণ । আমার মনে হয় তখনকার মানুষের স্বাস্থ্যজ্ঞান বা রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তেমন ছিল না কিন্তু ভগবানে বিশ্বাস হেতু ভুতে ভয় ছিল তাই ভুতের কথায় শাকপাতা গলাধকরণ করার এই প্রয়াস। কারণ ভুত আর জীবাণু কাউকেই খালি চোখে দেখা যায় না!

১। ওলঃ বিজ্ঞানসম্মত নামঃ Amorphophallus paeoniifolius

সাধারণ বিবরণঃ বন্য ওলের সংস্কৃত নাম শূরণ। যে ওল চাষ করা হয় তার নাম ভূকন্দহিন্দিতে বলে জমিন কন্দ্। বাংলাউড়িষ্যাঅন্ধ্রপ্রদেশতামিলনাডু ও মহারাষ্ট্রে ব্যাপক ওল চাষ হয়৷

এই কন্দ থেকেই বহু সাদা শিকড় বেরোয়৷ এক একটা ওলের কন্দ একদেড় ফুট ব্যাসের হতেও দেখা যায়।

সমগ্র ক্রান্তীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কন্দজাতীয় সবজি হিসাবে ওল সবার প্রিয়। ওলের জন্য জল দাঁড়ায় না এমন উঁচু জমি দরকার। ছায়া থাকলে ভালো হয় না। বেলেদোআঁশ মাটিতে ওল ভালো বাড়ে।

মাটির নিচে থাকা কন্দ থেকেই পাতা জন্মায় পরের বছর। ছত্রাকার পাতা হয় একটাই। পাতার বৃন্ত বেশ মোটা হয় এবং মাটি ভেদ করে ওঠে বলে কান্ড বলে ভ্রম হয়। একটাই মাত্র পত্রফলক হয় বৃন্তের আগায়। ওলের মেরুন রঙের বেশ বড়ো একটা পুষ্পমঞ্জরী মাটি ভেদ করে উঠে আসে। বন্য ওলের কোষে calcium oxalate একগুচ্ছ সূচের আকারে থাকায় খেলে গলায় বিঁধে যায়। তেঁতুল বা লেবু খেলে এই সূচগুলি গলে যায়। বম্বেতে এই বুনো ওল চাকা চাকা করে কেটে শুকিয়ে‘ মদন মস্ত‘ নামে বিক্রি হয়৷ বুনো ওল শোধন করে রসায়ন ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার হয়৷

ভোজ্য অংশঃ কচি পাতাপাতার বৃন্ত এবং কন্দ।

ভেষজ গুণাবলীঃ ওলের শুকনো কন্দের গুঁড়ো অর্শহাঁপানিটিউমারপ্লিহার বৃদ্ধি ও রক্ত আমাশার ঔষধ হিসেবে প্রাচীনকাল থেকে ভারতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। টাটকা মূল ব্যবহৃত হয় কফনাশক ও বাতের চিকিৎসায়। কাঁকড়া বিছার কামড়ে পত্রবৃন্তের রস ব্যবহৃত হয়।

ঝলসে পোড়ানো ওল এর সঙ্গে ঘি মাখিয়ে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যে উপকার হয়৷ আর সর্দিতে পূর্বোক্ত মিশ্রণের সঙ্গে নারকেল কোরা মিশিয়ে খেলে কফ দূর হয় তবে অতিরিক্ত খেলে চুলকুনি হতে পারে৷ বাতের ব্যথায় ঝলসে পোড়ানো ওল ঘিয়ে মাখিয়ে কাপড়ে বেঁধে গরম শেঁক দিলে আরাম হয়৷ মৌমাছি বোলতা কামড়ালে ওলের ডাঁটা সেই জায়গায় ঘষে দিলে যন্ত্রনার উপশম হয়।

তবে ওল পোড়ানোর নিয়ম আছে৷ সরাসরি ওল পোড়ালে উপকার পাওয়া যায় না৷ ওলের গায়ে মাটি লাগিয়ে একটু রোদে শুকিয়ে নিয়ে তারপর তাকে উনুনে পোড়াতে হয়৷ পোড়ানো হয়ে গেলে মাটি ঝেড়ে ফেলে প্রয়োজনমত ব্যবহার করতে হয়৷

২। কেঁউ ঃ বিজ্ঞানসম্মত নামঃ Costusspeciosus

কেঁউ আদার সমগোত্রীয় বলা যায় । কেও বা কেওমূল এক ধরনের সপুষ্পক উদ্ভিদ। এর (বৈজ্ঞানিক নাম Cheilocostus speciosus বা Costus speciosus) ইংরেজিতে এটি ‘Crêpe ginger’, ‘Malay ginger’ এবং ‘White costus’ নামে পরিচিত। এটি দক্ষিণ এশিয়া ও এর আশপাশের অঞ্চলের উদ্ভিদ। বাংলাদেশভারত ও চীন থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া ও কুইন্সল্যান্ড পর্যন্ত এর আদি বিস্তৃতি।

মাটির নিচে এর কন্দ জন্মায়। তবে পাখিরা এর বীজসহ ফল খেয়ে দূরে মল ত্যাগ করলে মলের সাথে বেরনো বীজ থেকে চারাগাছ জন্মায়। এভাবে কেঁউ দূরে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফুলের রঙ সাদা আর ফলের রঙ লাল। বীজের রঙ কালো। ফুলসহ পুরো পুষ্পমঞ্জরী দেখতে খুব সুন্দর হয় বলে অনেকে একে বাগানে লাগায়। তবে অসাধারণ ভেষজগুণের জন্য এই উদ্ভিদটি প্রাচীনকাল থেকে ভারতে সমাদৃত।

কেঁউ এর নরম পাতা খাওয়া হয়৷ কেঁউ গাছের পাতা সবুজউপবৃত্তকারপুরু ও মসৃণ। পাতার নীচের দিক পশমের মত লোমে ঢাকা। পাতার দৈর্ঘ্য ৫১০ ইঞ্চি প্রস্থ ৩৪ ইঞ্চি হয়৷ পাতার বোঁটা ফিতের মত কাণ্ডের গায়ে জড়িয়ে থাকে৷

ভেষজ গুণাবলীঃ কেঁউ পাতার রস ভালো হজমকারক ও ক্ষুধাবর্ধক। জ্বরআমাশাডায়েরিয়াকফকাটাছেঁড়াক্ষতচর্মরোগজন্ডিসআরথ্রাইটিসকোষ্ঠকাঠিন্যকুষ্ঠহাঁপানিব্রঙ্কাইটিসরক্তাল্পতাকৃমিচুলকানিবমিভাব ইত্যাদি রোগের ঔষধ ও সাপে কাটার প্রতিষেধক হিসেবে কেঁউ পাতার নির্যাস প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় সমাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

৩। বেথুয়া বা বেথো বা বথুয়া শাক – বিজ্ঞান সম্মত নাম ঃ Chenopodium album

সাধারণ বিবরণঃ গ্রাম বাংলার খুব পরিচিত শাক হল বেথুয়া বা বেথো। মাঠেবাগানে আপনাআপনি জন্মায় আগাছার মতোকেউ চাষ করে না। বাজারে আঁটি বেঁধে বিক্রি হতে দেখা যায়। ২/৩ ফুট লম্বা বীরুৎ জাতীয় গাছ। পাতার রঙ ফ্যাকাশে সবুজ। কান্ডে উঁচু শিরা আর বেগুনি রেখা দেখা যায়। লম্বাটে পাতার ওপরে বেশি মোম থাকায় জল ধরে নাআর পাতার নিচে সাদাটে পাউডারের মতো আস্তরণ থাকে। বেথুয়া শাকে প্রচুর ভিটামিন–এভিটামিন–সিলোহাক্যালসিয়ামম্যাগনেশিয়ামপটাশিয়ামফসফরাস ও জিঙ্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ ৮ টি অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে।

ভোজ্য অংশঃ ছোটো গাছের পুরো বিটপ অংশআর বড়ো গাছের পাতাসহ ডগা।

ভেষজ গুণাবলীঃ কোষ্ঠবদ্ধতারক্তাল্পতাঅম্বলকৃমিবৃক্কপাথুরিমুখে ঘাপায়েরিয়াত্বকের রোগবাত ও অর্শ প্রতিরোধে বেথুয়া শাক খুব উপকারী। গর্ভরোধক হিসেবে এর ব্যবহার রয়েছে। বথুয়া শাক বিভিন্ন রোগ সারাতে ও রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দামে খুব সস্তা। বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। অন্যান্য প্রচলিত শাকের চেয়ে বথুয়া শাকে ভিটামিন ‘এ’ বেশি থাকে। ক্যালসিয়াম ও আয়রনের পরিমাণও বেশি থেকে। ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কলমিশাকপুঁইশাকপাটশাকডাঁটাশাকমুলাশাক ও পালংশাকের চেয়ে বেশি থাকে। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ীআয়ুর্বেদ মতে, বথুয়া শাকে রয়েছে প্রচুর ভেষজ গুণ।প্রোটিন,ফ্যাট, শর্করা, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ক্যারোটিন (ভিটামিন এ)ভিটামিন বি১,ভিটামিন বি২, ভিটামিন সি। তবে এই পুষ্টিমান শাকের জাত ও উৎপাদনের স্থানের জন্য কিছুটা তরতম্য হতে পারে।

এই শাক সহজে হজম হয়। খিদে বাড়ায়। লঘু, শুক্র ও মল বৃদ্ধি করে, মল নিষ্কাশন করে, লিভারের অসুখ, রক্তপিণ্ড, কৃমি, অর্শ, বাত, পিত্ত ও কফ নাশ করে। দেহের ব্যথা সারায়। এই শাক ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত গম ক্ষেত, কপি ক্ষেত ও পিঁয়াজসহ বিভিন্ন শাকসবজির ক্ষেতে আগাছা হিসেবে জন্মায়। আয়রন থাকায় হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধি পায় এই শাক খেলে৷

৪। কালকাসুন্দা – বিজ্ঞান্সম্মত নাম ঃ Senna sophera / Cassia Sophera

সংস্কৃত : কাশমার।

বাংলা: কালকাসুন্দা, কালকাসুন্দি, কালকেসেন্দা।

Senna গণের দুটি প্রজাতিকে বাংলাদেশে কালকাসুন্দা বলা হয়। এর একটির নাম বড় কালকাসুন্দা (Senna occidentalis ) এবং ছোটো কালকাসুন্দ (Senna sophera)।

বড় কালকাসুন্দা – Senna occidentalis

হিমালয় থেকে সিংহল পর্যন্ত এবং ভারতের পশ্চামঞ্চল থেকে মায়ানমার পর্যন্ত এই গাছ প্রচুর দেখা যায়। এটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। পূর্ণবয়স্ক কালকসুন্দা (কালকসিন্দ) গাছ ৭ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। তবে গড় উচ্চতা ৫ ফুটের কাছাকাছি। কাণ্ডের রং গাঢ় সবুজ। বেশ শক্ত। গাছের কাণ্ডের বেড় ৫ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। কাণ্ডের নিচের দিক থেকেই অসংখ্য ডালপালা বের হয়। তাই অল্প দিনের ভেতরেই একটা গাছই একটা ছোটখাট ঝোপে পরিণত হয়। এর পাতা যৌগিক। একটা বোটায় ৫–১০ জোড়া পাতা থাকে। বোটার দৈর্ঘ্য ১০–১২ ইঞ্চি। পাতারি প্রতিটা পাতার দৈর্ঘ্য ১.৫–২ ইঞ্চি।এর ফুল সোনালি–হলুদ রঙের। এর মঞ্জরী ও বোটা হলদেটে সবুজ। মঞ্জরী বহুপুষ্কক। একটা মঞ্জরীতে ৫–১০ টা ফুল থাকতে পারে। একটা ফুলে ৫ টা পাঁপড়ি থাকে। সাধারণত ফাল্গুন মাসের শুরু দিকে ফুল ফুটতে শুরু করে। ফুলের গন্ধ উগ্র। এই গাছের ফল লম্বাটে শুঁটি। এর ভিতরে প্রায় ৫ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। প্রতিটি ফলের ভিতর ৩০–৪০ বিঁচি থাকে। বিঁচি দেখতে অনেকটা মুগ ডালের মতো। তবে আকারে কিছুটা বড়। এর বীজ দ্বিবীজপত্রী।সাধারণ বর্ষা থেকে শরৎকালের মধ্যে এই গাছ জন্মায়। আর শীতের শেষ পর্যন্ত বাড়তে থাকে। এই গাছের বীজ ও পাতা চর্মরোগের জন্য উপকারী। কবিরাজী মতে সর্পবীষ নাশকারী।

ছোট কালকাসুন্দা– Senna sophera

এই গাছ বড় কালকসুন্দার মতই। আকারে ছোটো বলেই হয়তো এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। এর পাতাগুলো বেশ ক্ষুদ্র। গাছগুলো লম্বায় ছোটো হলেও কাণ্ড বেশ মোটা হয়। এই উদ্ভিদের পাতা ফিতা কৃমিরোগে বাহ্য প্রয়োগ করতে হয়। গাছের বাকল শ্বাসকষ্টের জন্য উপাকারী।

বর্ষজীবী গাছএক মানুষ সমান উচুঁ হয়। ঝাড়দার গাছবর্ষার প্রারম্ভে বীজ থেকে গাছ জন্মায়। এর পাতাচটকালে কটুগন্ধ বের হয়। ফুলের রং লালচে হলদে। গাছের পাতার শির এবং গাছের উপরের অংশটা একটু বেগুনি রং এর হয়। একে কালা কাসুন্দে বলে। এই গাছের পাতাফুলমূল অর্থ্যাৎ সমগ্র গাছ ঔষধার্থে ব্যবহার হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাতা সিদ্ধকরে অল্প পরিমাণ খেতে হয় অথবা পাতা এবং ফুলের রস ১২ চা চামচ পরিমাণ খেতে হয়। আবার অনেক সময় মূলের ছাল বেঁটে খেতে হয়।

অ্যালার্জিকোষ্ঠবদ্ধতাহুপিং কাশিকফজ্বরবেতো জ্বরম্যালেরিয়াকঞ্জাংকটিভাইটিস ও ক্ষত নিরাময়ে কালকাসুন্দার পাতার রস খাওয়া হয়। মৃগি রোগীদের চিকিৎসায় গোটা উদ্ভিদের রস ব্যবহার হয়। রজঃস্রাবের সময় যন্ত্রণা হলে মূলের ক্বাথ কাজ দেয়। আবার ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসায় কালকাসুন্দার বাকল ভেজানো জল খেলে উপকার হয়।

৫। নিম – বিজ্ঞানসম্মত নাম ঃ Azadirachta Indica

একটি ঔষধি গাছ যার ডালপাতারস সবই কাজে লাগে। নিম একটি বহুবর্ষজীবী ও চিরহরিৎ বৃক্ষ। আকৃতিতে ৪০৫০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। এর কান্ডের ব্যাস ২০৩০ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। ডালের চারদিকে ১০১২ ইঞ্চি যৌগিক পত্র জন্মে। পাতা কাস্তের মত বাকানো থাকে এবং পাতার কিনারায় ১০১৭ টি করে খাঁজযুক্ত অংশ থাকে। পাতা ২.৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। নিম গাছে এক ধরনের ফল হয়। আঙুরের মতো দেখতে এই ফলের একটিই বীজ থাকে। জুনজুলাইতে ফল পাকে এবং ফল তেতো স্বাদের হয়। ভারত এবং বাংলাদেশের প্রায় সবত্রই নিম গাছ জন্মে। প্রাপ্ত বয়স্ক হতে সময় লাগে ১০ বছর। নিম গাছ সাধারণত উষ্ণ আবহাওয়া প্রধান অঞ্চলে ভাল হয়। নিমের পাতা থেকে বর্তমানে প্রসাধনীও তৈরি হচ্ছে। কৃমিনাশক হিসেবে নিমের রস খুবই কার্যকরী। নিমের কাঠ খুবই শক্ত। এই কাঠে কখনো ঘুণ ধরে না। পোকা বাসা বাঁধে না। উইপোকা খেতে পারে না। এই কারণে নিম কাঠের আসবাবপত্রও বর্তমানে তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া প্রাচীনকাল থেকেই বাদ্যযন্ত্র বানানোর জন্য কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। এর উৎপাদন ও প্রসারকে উৎসাহ এবং অন্যায়ভাবে নিম গাছ ধ্বংস করাকে নিরুৎসাহিত করছে। নিমের এই গুনাগুনের কথা বিবেচনা করেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‌একে ‘একুশ শতকের বৃক্ষ’ বলে ঘোষনা করেছে।

নিমের উৎপত্তি হল ভারতীয় উপমহাদেশ। এই বহুবর্ষজীবী বৃক্ষটিকে আমরা সবাই চিনি। এর নরম পাতা অনেকেই সকালবেলা চিবিয়ে খান। খুব তেতো স্বাদ। কচি নিম পাতা দিয়ে বেগুন ভাজা বা নিমের ফুল ভাজা খেতে আমরা অনেকেই খুব ভালোবাসি।

ভোজ্য অংশঃ কচি পাতা ও ফুল।

ভেষজ গুণাবলীঃ নিম পাতা বা পাতার রস কুষ্ঠ, চর্মরোগ, বহুমুত্র, জন্ডিস, একজিমার ভালো ঔষধ। ব্লাড সুগারের রোগীরা প্রতিদিন সকালে ১০–১২টা করে নিমপাতা চিবিয়ে খেলে সুগার কমে। পোকামাকড়ের কামড়ে মূলের ছাল বা পাতা বেটে লাগালে উপকার হয়। পাতা বাটা মাথায় মাখলে উকুন মরে। মূলের গুঁড়ো জলে মিশিয়ে খাওয়ালে বাচ্চাদের কৃমি নাশ হয়। নিম তেলের শুক্রানুনাশক ক্ষমতা থাকায় এটি জন্মনিয়ন্ত্রক হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। নিমের ছাল ভিজিয়ে জল খেলে অজীর্ণ রোগ সারে। নিম গাছের বাকল থেকে আহরিত রস এইডস ভাইরাস মারতে সক্ষম৷

৬। সরষে – বিজ্ঞানসম্মত নাম – Brassica Juncea

সাধারণ বিবরণঃ সরষের আদি নিবাস ইউরেশিয়া অঞ্চল হলেও প্রায় গোটা ভারতে বহুদিন ধরেই রবি শস্য হিসেবে এর চাষ হয়ে আসছে।সরিষা একবর্ষজীবি উদ্ভিদ।এই গাছ দৈর্ঘ্যে ১ মিটার মত হয়তবে রাই সরিষা ২ মিটারও উঁচু হতে পারে। যখন সরষে গাছে ফুল আসে তখন পুরো ক্ষেত হলুদ রঙে রেঙে ওঠে আর মৌমাছিদের গুঞ্জরণে মেতে ওঠে। ফুল থেকে জন্মায় সুন্দর ছোটো ছোটো শুঁটি। শুঁটির ভেতরে থাকে হালকা হলুদ বা বাদামি রঙের বীজ। বীজ থেকে প্রাপ্ত তেল ভারতে রান্নার কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হলেও এর শাকের জনপ্রিয়তাও কম নয়। গ্রিন স্যালাড হিসেবেও সরষে শাক কাঁচা খাওয়া হয়। আর মশলা হিসেবে সরষের ব্যবহার তো সারা ভারতেই প্রচলিত।

ভোজ্য অংশঃ পাতা ও পাতাসহ কচি কান্ড এবং বীজ।

ভেষজ গুণাবলীঃ ত্বক, যকৃৎ ও চোখের পক্ষে সরষে শাক খুব উপকারি। ভিটামিন K, C ও E এবং ক্যালশিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও লোহার সমৃদ্ধ উৎস হল এই শাক। এই শাক খেলে ক্যানসার, হৃদরোগ ও অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস হবার সম্ভাবনা কমে। এছাড়া আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস ও রক্তাল্পতা রোগের নিরাময়ে সরষে শাক যথেষ্ট উপকারি। দাঁতের মাড়ি ক্ষয় দূর করতে সরিষা মাজন হিসাবে ব্যবহার করলে ভাল ফল পাওয়া যাবে। ফাইলেরিয়া বা গোদ হলে খাঁটি সরিষার তেল খেলে উপকার হয়। সরষে শাক রক্তে উপকারী কোলস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।


আরো পড়ুন: বাংলার যত বুনো শাক । ড. মোঃ শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া


৭। শালিঞ্চাঃ বিজ্ঞানসম্মত নামঃ Alternantherasessilis

অনেকে এই শাককে সাঁচিশাকও বলে। ভারতে যে কোনও জলাশয়ের ধারে এই বীরুৎ জাতীয় লতানে উদ্ভিদটিকে দেখা যাবে। রাস্তার ধার বা নিচু জমিতে সামান্য আর্দ্রতা থাকলেই সেখানে শালিঞ্চা জন্মায়। সাধারণ মানুষ একে আগাছা বলেই মনে করে। ইংরেজিতে এর নাম Joyweed। প্রতি পর্ব থেকে মূল জন্মায়। পাতার কক্ষ থেকে সাদা রঙের বৃন্তহীন ক্ষুদে ক্ষুদে ফুল জন্মায়।

ভোজ্য অংশঃ পাতাসহ ডগা।

ভেষজ গুণাবলীঃ চোখ, চুল ও ত্বকের জন্য শালিঞ্চা শাক খুব উপকারী। ডায়েরিয়া, অজীর্ন, হাঁপানি, কফ, জ্বর, রাতকানা, খোসপাঁচড়া, একজিমা, অর্শ ও অন্ত্রে ঘায়ের চিকিৎসায় এই শাক খেলে উপকার হয়। এই শাক খেলে মায়ের স্তনদুগ্ধের পরিমাণ বাড়ে। প্রতিদিন ৭৫ গ্রাম করে শালিঞ্চা শাক খেলে ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে সুগারের পরিমাণ কমে। চোখে জল পড়া, কনজাংক্টিভাইটিস, মায়োপিয়া ও ছানির চিকিৎসায় মূলের রস ব্যবহৃত হয়। গোরুর দুধের সাথে শালিঞ্চা পাতার রস মিশিয়ে খেলে শরীরে শক্তি ও জীবনীশক্তি বাড়ে। কাঁটা বা হুল বিঁধলে ক্ষতস্থানে শালিঞ্চা পাতা বেটে লাগালে কাজ দেয়।

৮। জয়ন্তীঃ বিজ্ঞানসম্মত নামঃ Sesbaniasesban

সাধারণ বিবরণঃ সংস্কৃতে ‘জয়ন্তিকা’ শব্দ থেকে জয়ন্তী নামের উদ্ভব। নোনা মাটিক্ষার মাটিজলমগ্ন মাটিঅনাবৃষ্টিতে খটখটে শুকনো মাটি – সব মাটিতেই জয়ন্তী মানিয়ে নেয়। জয়ন্তী গাছ হল শিম পরিবারের শাখাপ্রশাখাযুক্ত উদ্ভিদ। এরা ৩৮ মিটার লম্বা হয়। প্রতি থোকায় ২২০টি হলুদ রঙের ফুল জন্মায়। প্রতি শুঁটিতে ১০৫০টি বীজ থাকে। জয়ন্তী গাছ বেশি উঁচু হয় না১০১২ ফুট হয়৷ দ্রুতবর্ধনশীল। এর কাঠ নরম৷ পাতাগুলি দেখতে তেঁতুল পাতার মত৷ ফুল গুলি ছোট ফিকে হলুদ রঙ এর।বর্ষাকালে ফুল হয়তারপর ৬৯ ইঞ্চি লম্বা সরু শুটি হয়। অনেকগুলি বীজ থাকে। ফাল্গুন চৈত্রে ফল পাকেআপনা আপনি বীজ খসে পড়ে।

ভোজ্য অংশঃ কচি সবুজ টাটকা পাতা। এই পাতা ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়৷

ভেষজ গুণাবলীঃ উদরাময়, বহুমূত্র, শ্বেতি, মৃগী, মানসিক সমস্যা, জ্বর, ফুসফুসের যক্ষ্মা, কিডনির সংক্রমণ, গনোরিয়া ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ও কৃমিনাশকের কাজ করে। সদ্য প্রসূতিদের জন্য এই শাক খুব উপকারি। মেধা ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও জয়ন্তী পাতার রস খাওয়ানো হয়।

৯। গুলঞ্চ ঃ বিজ্ঞানসম্মত নামঃ Tinosporacordifolia

এটি বেশ বড়োসড়ো গুল্মজাতীয় লতানে পর্ণমোচী উদ্ভিদ। এর ধূসর রঙের বাকল পাতলা কাগজের মতো। হৃৎপিন্ড আকৃতির পাতা শাক হিসেবে খাওয়া হয়। গাছের সব পাতা যখন ঝরে যায় তখন ফুল আসে। ফুল। একলিঙ্গতবে ভিন্ন ভিন্ন গাছে স্ত্রী ও পুরুষ ফুল ফোটেঅর্থাৎ ভিন্নবাসী। ছোটো ছোটো ফুলের রঙ হলদেসবুজ। ১৩টি লাল রঙের মটরের মতো ফল হয়। ভারতের পর্ণমোচী অরণ্যে এই লতা দেখা যায়। গুলঞ্চ বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় ও সংরক্ষিত উদ্ভিদ।

ভোজ্য অংশঃ পাতা।

ভেষজ গুণাবলীঃ গুলঞ্চকে স্বর্গীয় উদ্ভিদ বলে গণ্য করা হয় এর ভেষজ গুণের জন্য। ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, অ্যালার্জিক রাইনাইটিস, পাকস্থলীর গোলমাল, লিম্ফোমা সহ অন্যান্য ক্যানসার, কুষ্ঠ, যক্ষ্মা, কোষ্ঠকাঠিন্য, বাত, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হেপাটাইটিস, পেপটিক আলসার, গনোরিয়া, সিফিলিস, শোথ, জ্বর ইত্যদি নানা রোগের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় গুলঞ্চ ব্যবহৃত হয়। গুলঞ্চ শাক খেলে অনাক্রম্যতন্ত্র উজ্জীবিত হয়। গুলঞ্চের রস নিয়মিত খেলে আয়ু বাড়ে, যৌবন দীর্ঘস্থায়ী হয়, সুস্বাস্থ্য হয়, ত্বকের রঙ উজ্জ্বল হয়, ক্ষুধা বাড়ে ও বন্ধ্যাত্ব দূর হয়। গুলঞ্চ খেলে বৃক্কে পাথর জমার সম্ভাবনা থাকে না এবং রক্তে ইউরিয়ার মাত্রা সঠিক থাকে।

১০। পলতা বা পটল পাতাঃ বিজ্ঞানসম্মত নামঃ Trichosanthesdioica

সবজি হিসেবে পটল যতটা জনপ্রিয় শাক হিসেবে পটল পাতা বা পলতা ততটাই অপরিচিত। পটল লতানে উদ্ভিদ। ভারতে পুরো গ্রীষ্মবর্ষা ও শরৎকাল জুড়ে পটলই অন্যতম প্রধান সবজি।

ভোজ্য অংশঃ পাতা ও ফল।

ভেষজ গুণাবলীঃ শ্বাসতন্ত্রঘটিত যে কোনও রোগ সারাতে পটল পাতা উপকারি। রক্তবর্ধক ও রক্তশোধক হিসেবে এবং লিভার ও চর্ম রোগ সারাতে পটল পাতা খুব কার্যকর। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাতে এবং রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে পটল পাতার কার্যকরী ভূমিকা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন। পটল পাতা নিয়মিত খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য ও মানসিক অস্থিরতা দূর হয়। পটল পাতা ক্ষিদে ও হজমশক্তি বাড়ায়। জন্ডিস, কফ, জ্বর, পিত্তজ্বর, টাইফয়েড, অর্শ, কৃমি, ডায়েরিয়া ইত্যাদি রোগে পটল পাতা খেলে কাজ দেয়। ক্ষতস্থানে পটল পাতার রস লাগালে তাড়াতাড়ি সারে।

১১। ভাট বা ঘেঁটুঃ বিজ্ঞানসম্মত নামঃ Clerrodendrumin fortunatum

সাধারণ বিবরণঃ ঘেঁটু হল অসাধারণ ভেষজগুণসম্পন্ন বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। ২ মিটার উচ্চতার ছোট ছোট গাছ। পাতা নরম লোমশ স্পষ্ট শিরাযুক্ত৷ কাণ্ড অপেক্ষাকৃত শক্ত।

প্রায় শাখাহীন গাছ। বড়ো বড়ো ডিম্বাকার পাতা। কান্ড ফাঁপা। কান্ডের আগায় অসংখ্য হালকা বেগুনি বা গোলাপি ছিট যুক্ত সাদা ফুল সমন্বিত পুষ্পমঞ্জরী জন্মায়। মার্চ এপ্রিলে সাদা ধবধবে পাঁচ পাপড়ি বিশিষ্ট ফুল ফোটে। ফুলের নীচে লাল রঙের বৃন্তগুলোর ভেতর একটি কালো রঙের ফল হয়৷ ফলের বীজ আর কন্দ দুই থেকেই চারা জন্মায়৷

ভোজ্য অংশঃ পাতা।

ভেষজ গুণাবলীঃ ভাট হল বাংলার পথের ওষুধ৷ কেবল মানুষ নয় পশুচিকিৎসাতেও ভাটের মূল আর পাতা কাজে লাগে৷ ঘেঁটুতে প্রচুর ফ্ল্যাভোনয়েড থাকায় এটি ক্যানসার প্রতিরোধে সক্ষম। এছাড়া চুল পড়া, হাঁপানি, কফ, বাত, জ্বর, চর্মরোগ, লিভারের রোগ, মাথার যন্ত্রণা, কৃমি, কোলেস্টেরল, ব্লাড সুগার, উদরাময় ইত্যদি রোগ প্রতিরোধে ঘেঁটু পাতা খুব কার্যকর। ঘেঁটু পাতা বেটে ঘা বা ফোলা জায়গার ওপর লাগালে তাড়াতাড়ি সারে। দীর্ঘদিনের জ্বর আমাশয় থাকলে ভাটের কচি ডগার রস সকালে খেলে উপকার হয়৷

১২। হেলেঞ্চা বা হিংচেঃ বিজ্ঞানসম্মত নামঃ Enydra fluctuans

হিংচের চপের দৌলতে এই শাকটিকে অনেকেই চেনে। হেলেঞ্চা বা হিংচে হল জলজ লতানে গাছ। এর মূল জলাশয়ের পাড়ে কাদামাটির মধ্যে থাকেআর আগা ছড়িয়ে পড়ে জলে বা কাদা মাটির উপর। কান্ডের পর্ব থেকে মূল জন্মায়। কান্ড ফাঁপা। পাতা লম্বা ও কিনারা খাঁজবিশিষ্ট। শীতকালে কান্ডের আগায় গুচ্ছাকারে সাদা রঙের ফুল ফোটে।

ভোজ্য অংশঃ পাতাসহ ডগা।

ভেষজ গুণাবলীঃ আয়ুর্বেদে হেলেঞ্চাকে রক্তশোধক, পিত্তনাশক, ক্ষুধাবর্ধক, ব্যথানাশক, জীবানুনাশক ও জ্বরনাশক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই শাক নিয়মিত খেলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বাড়ে। কোষ্ঠকাঠিন্য, হাঁপানি, ডায়েরিয়া ও স্নায়ুরোগের ভেষজ চিকিৎসায় হেলেঞ্চা ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘ জ্বরভোগের পর হেলেঞ্চা শাক দিয়ে মাছের ঝোল খেলে ক্ষুধা বাড়ে ও মুখে রুচি ফেরে। হেলেঞ্চা শাকে যথেষ্ট অ্যান্টি–অক্সিড্যান্ট থাকায় এর ক্যানসার প্রতিরোধী ভূমিকা রয়েছে। মাথার যন্ত্রণায় মাথায় এই শাক বেটে লাগালে যন্ত্রণা কমে। হেলেঞ্চা শাক নিয়মিত খেলে ব্লাড সুগার কমে।

১৩। শুষনি – বিজ্ঞানসম্মত নাম ঃ Marsileaquadrifolia / Marsileaminuta

সাধারণ বিবরণঃ শুষনি হল জলজ ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ। ভারতসহ দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়াচিনমধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপে শাক ও ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবে শুষনি খুব পরিচিত। নরম কান্ডের এই লতানে উদ্ভিদটি জলাশয়ের পাড়ে বা ভেজা জায়গায় জন্মায়। পাতা যৌগিক প্রকৃতির। পত্রবৃন্তের আগায় একটা বিন্দু থেকে চারদিকে চারটি সম আকৃতির পত্রক জন্মায়। এ জন্যই বিজ্ঞানসম্মত নামে ‘quadrifolia’ শব্দটি রয়েছে। সমস্ত ফার্নের মতো এদেরও ফুল বা ফল হয় না। রেনুর মাধ্যমে বা অঙ্গজ পদ্ধতিতে এরা বংশবিস্তার করে। এদের গাঢ় বাদামি রঙের স্পোরোকার্প উৎপন্ন হয় যার মধ্যে রেনু থাকে।

ভোজ্য অংশঃ পাতা।

ভেষজ গুণাবলীঃ জনশ্রুতি রয়েছে যে শুষনি শাক খেলে ঘুম পায়। তাই নিদ্রাহীনতায় যাঁরা ভোগেন তাঁদের নিয়মিত শুষনি শাক খেলে কাজ দেয়। এ ছাড়া নিয়মিত শুষনি শাক খেলে মাথার যন্ত্রণা, তীব্র মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, গায়ে ব্যথা, পায়ের পেশির অনিয়ন্ত্রিত সংকোচন, বাত, জিভে ও মুখে ক্ষত, চর্মরোগ ইত্যদি দূর হয়। শুষনির কাশি ও কফ নিরাময়কারী ভূমিকা বিজ্ঞানীদের দ্বারা প্রমাণিত। চোখের রোগ, ডায়াবেটিস ও ডায়েরিয়া নিরাময়ে শুষনি পাতার রস কার্যকর। সন্তান প্রসবের পর মায়েরা শুষনি শাক খেলে দুগ্ধক্ষরণ বাড়ে। সাপের কামড়ে শুষনি পাতার রস দিয়ে চিকিৎসা করার প্রচলিত রীতি রয়েছে। কাঁচা শুষনি শাক বেটে জল আর অল্প চিনি মিশিয়ে খেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে৷ শৈশব থেকেই যাদের দুর্বল স্মৃতিশক্তি তাদের নিমিত এই শাক খাওয়ালে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়৷

১৪। শেলুকা বা শুলফাঃ বিজ্ঞানসম্মত নামঃ Peucedanumgraveolens /Anethumsowa

মশলা উৎপাদক উদ্ভিদ হিসেবে শুলফার খ্যাতি। কাঁচা গাছ ও বীজ মশলা হিসেবে রান্নায় ব্যবহৃত হয়। আর শাক হিসেবে ব্যবহৃত হয় পাতাসহ ডগা। ইংরেজিতে এর নাম Indian Dill আর হিন্দিতে সোয়া। মধ্য এশিয়ায় আদি বাসভূমি হলেও এখন এর বিস্তার পুরো ইউরোপ ও এশিয়ায়। মুলতঃ ঠান্ডা এলাকায় জন্মায়। প্রায় ৯০ সেমি লম্বা একবর্ষজীবী বীরুৎজাতীয় এই উদ্ভিদের কান্ড খাড়া হলেও বেশ নরম এবং ফাঁপা। পাতা বহু খন্ডে খন্ডিতমৌরি পাতার মতো। কান্ডের আগায় এক জায়গা থেকে অনেক শাখা বেরোয় আর তাতে ছাতার মতো বিন্যাসে পুষ্পমঞ্জরী উৎপন্ন হয়। পুষ্পমঞ্জরীতে অসংখ্য ফুল থাকে। এজন্য সংস্কৃতে শুলফাকে বলে শতপুষ্প। ফুলের রঙ উজ্জ্বল হলুদ। পুরো গাছটারই একটা তীব্র সুগন্ধ আছে। বীজ সুমিষ্ট গন্ধযুক্ত ও স্বাদে তেতো।

ভোজ্য অংশঃ পাতাসহ ডগা এবং বীজ।

ভেষজ গুণাবলীঃ মাতৃদুগ্ধের পরিমাণ বাড়াতে ও বাচ্চাদের পেটের রোগ সারাতে শুলফা শাক খুব উপকারী। বাচ্চাদের গ্রাইপ ওয়াটারের একটা উপাদান এই শুলফা শাক থেকে আসে। চোখের রোগ, চোখে ঘা, পুরানো ক্ষত, জ্বর, স্নায়ু রোগ, জরায়ুর ফাইব্রয়েড ইত্যদি রোগের নিরাময়ে শুলফা খুবই কার্যকর। বাচ্চাদের পেটফাঁপায় শুলফা বীজ জলে ভিজিয়ে সেই জল খেলে দারুণ কাজ দেয়। শুলফা বীজ থেকে প্রাপ্ত তেল সায়াটিকা বাত, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, স্পন্ডাইলোসিস, হাঁপানি, ব্রংকাইটিস, কফ ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

কালীপুজোর সঙ্গে চৌদ্দো শাকের সম্পর্ক নিয়ে কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। ভেষজবিজ্ঞানীদের মতেঋতু পরিবর্তনের সময়ে বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক হিসাবে এই শাকগুলি খাওয়া হত। বাংলার ঋতু প্রকোপ অন্যান্য জায়গার থেকে বেশি হওয়ার জন্য আশ্বিন ও কার্ত্তিক মাস দুটিকে যমদংস্টা কাল বলা হত। একারণেই হয়তো তখনকার দিনে বাংলার নব্যস্মৃতিশাস্ত্রকার রঘুনন্দন (১৬ শতাব্দীতাঁর অষ্টবিংশতি তত্ত্বের অন্যতম গ্রন্থ কৃত্যতত্ত্বে এই ভূত চতুর্দশীর উল্লেখ করে চৌদ্দ শাক খাবার উপদেশ দিয়েছেন।

আগেই বলেছি যে এই চোদ্দো শাকের সবগুলো আজকাল সব জায়গায় পাওয়া যায় না। তাই বাঙালি ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দো শাক খাওয়ার রীতি বজায় রাখতে গিয়ে শাকের তালিকাকে অনেকটা পরিবর্তন করে ফেলেছে। এখন শহুরে এলাকায় যে চোদ্দো শাক বেশি প্রচলিত সেগুলো এই সব শাকের মধ্যে থেকেই নির্বাচিত – পালংমুলোলাল শাককলমিশুষনিসরষেপাটনটেধনেমেথিপুঁইলাউকুমড়োহিংচে ও গিমে। অবশ্য গ্রামের দিকে চোদ্দো শাকের তালিকায় কুলেখাড়াবন নটেকাঁটা নটেতেলাকুচোচিকনিথানকুনিশতমূলিআমরুল ইত্যদিও সংযুক্ত হয়েছে। বলাবাহুল্য এইসব শাকের ভেষজ ও পুষ্টিগত গুণও অসাধারণ।

স্থানভেদে ও শাকভেদে নানা শাকের রেসিপি নানারকম। তবে বেশিরভাগ বাঙালি এই সব শাকের ভাজা বা চচ্চড়ি খেতে পছন্দ করে। শাকের পুরোনো ও পরিমার্জিত তালিকা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে পুরোনো তালিকার বেশিরভাগ শাকই ছিল প্রকৃতির স্বাভাবিক শাক। নয়া তালিকার অনেক শাকও স্বাভাবিক শাক। এদের আমরা চাষ করি না। এগুলো মাঠে–ঘাটে আপনা–আপনি জন্মায়। এই শাকে না আছে কোনও কীটনাশক, না আছে কোনও রাসায়নিক সার। ফলে এই সব শাকের পুষ্টিগুণ অসাধারণ। পালং, নটে, মুলো, পুঁই ইত্যদি শাক চাষে ব্যাপক কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। তাই আমরা যদি মাঠে–ঘাটে জন্মানো শাকগুলি বেশি বেশি খেতে পারি তবে আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষা করা অনেক সহজ হবে। এ জন্য এইসব দেশিয় শাকগুলোকে চিনতে হবে। পাশাপাশি জানতে হবে এই সব শাক রান্নার পদ্ধতিও। যাঁরা রেসিপি জানতেন, সেই সব মা–ঠাকুমা–দিদিমারা আজ অনেকেই বেঁচে নেই। বর্তমান প্রজন্ম ফাস্টফুড নির্ভর। শাক–সবজি সেখানে ব্রাত্য। কিন্তু এই চোদ্দশাকের গুণাগুণ যদি দেখি তাহলে দেখব আজকের দিনে যেসব রোগ আমাদের আক্রমণ করছে যেমন,

ব্লাডসুগারকোলস্টেরল প্রায় সকলের। এছাড়া আরও নানা রোগ আছেই৷ এই চোদ্দশাক খেতে তিক্ত হলেও আমাদের শরীরে রোগের বিপক্ষে শক্তিশালী অস্ত্রস্বরূপ৷ হয়ত চোদ্দশাক একত্রে পাওয়া সম্ভব নয় হয়ত তবুও কয়েকটা যদি আমাদের খাদ্যতালিকায় রাখা যায় তাহলে অনেক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব৷ যেমন হেলেঞ্চা শাক সামান্য সিদ্ধ করে জল ফেলে দিয়ে রসুন লঙ্কা পেঁয়াজ কুচি দিয়ে হাল্কা করে ভেজে নুন আর সামান্য চিনি মিশিয়ে নামিয়ে নিয়ে গরম ভাতে খাওয়া যেতে পারে৷ নিম বেগুন ভাজা আমরা অনেকেই খাই একইভাবে পলতা পাতা বেগুন দিয়ে ভেজে খাওয়া যেতে পারে আবার মটরডালের সঙ্গে পলতা পাতা মিশিয়ে বড়া বানিয়ে খাওয়া যায়। নিম বা পলতা পাতা তেতো হলেও সর্ষে শাক সুস্বাদুবেথো শাক ভাজা হোক বা চচ্চড়ি খুবই ভালো খেতে তাই চোদ্দশাক পাওয়া না গেলেও বা চোদ্দশাক একত্রে তিক্ত স্বাদের হলেও কেবল একদিন নয় প্রতিদিন কিছু না কিছু শাক থাকুক বাঙালির ভাতের পাতে । বিদেশি খাবারের দিকে তাকালেও দেখব স্যালাডের অন্যতম প্রধান উপকরণ সবুজ শাক পাতা। গ্রীন স্যালাড অত্যন্ত জনপ্রিয় যা মূলত নানা শাক পাতার সমাহার।সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে সুস্থভাবে বাঁচার জন্য শাকান্নের কোনো বিকল্প নেই । তাই এবার ভূতচতুর্দশীতে রোগের ভুত তাড়াতেই হবে সবুজ শাকপাতার সতেজতায়।

তথ্যসূত্রঃ ১। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্যচিরঞ্জীব বনৌষধি খণ্ড ২)আনন্দ পাবলিশার্স

২। নীহাররঞ্জন রায়বাঙ্গালীর ইতিহাস আদিপর্ব), দেজ

৩। বরুণকুমার চক্রবর্তীবঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি কোষ

৪। http://www.udrajirannaghor.wordpress.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত