| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য প্রবন্ধ: আহমদ ছফার রবীন্দ্র-ভাবনা ও অন্যান্য

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

 

 

যে লেখক তাঁর সময় ও যুগকে প্রভাবিত করতে পারেন না তিনি বড় লেখক নন। আহমদ ছফা তাঁর সৃজনশীল রচনা, চিন্তা, সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন দ্বারা সময়কে প্রভাবিত করেছিলেন। তাই তাঁকে ঘিরে আলোচনা সমালোচনা এখনও প্রাসঙ্গিক এবং আগ্রহোদ্দীপক। আহমদ ছফা পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের পছন্দ করতেন না, তাদের বই বাংলাদেশে বাজারজাতকরণের বিরোধী ছিলেন; এমনকি ছফা রবীন্দ্র-বিদ্বেষী ছিলেন এরকম একটা অপপ্রচারও প্রায়ই দেখা যায়। সহজলভ্য প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে আংশিক বা অর্ধসত্য জেনে কাউকে বিচার করার একটা প্রবণতা প্রবল। আহমদ ছফার বিরুদ্ধেও এরকম একটি প্রচারণা চোখে পড়ে। এর বিশেষ কারণ আছে। লেখার শেষাংশে কারণটা বলা যাবে। আহমদ ছফা তাঁর ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধগ্রন্থে ‘রবীন্দ্রনাথ’ অধ্যায়ে বলেছেন, “আজীবন সুন্দরের সঙ্গে সত্যের সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠার দুর্মর প্রচেষ্টারই তো নাম রবীন্দ্রনাথ। এ বিষয়ে তাঁর ঐকান্তিকতা ধর্ম প্রচারকের চাইতে কোন অংশে কম ছিল না। অত্যন্ত সুকুমার, সংবেদনশীল, স্পর্শকাতর, শ্রদ্ধার ভারে আনত একখানা মন নিয়ে তিনি যেন প্রচারকের ভূমিকায় নেমেছিলেন। কিন্তু প্রচারকের লেবাস তিনি কখনো অঙ্গে ধারণ করেননি।” একই প্রবন্ধের শেষাংশে ছফা আরও উল্লেখ করেন, “রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ভাষা নদীর স্রোতের মতো, কেউ তাতে নিজের নাম লিখে রাখতে পারে না। কিন্তু তিনি বাংলা ভাষায় নিজের নাম লিখে রেখেছেন। ভাষার মতো সংস্কৃতিকেও দেশসীমা কালসীমার মধ্যে কেউ বেঁধে রাখতে পারে না। অদল বদল, রূপান্তরের মাধ্যমে ধাবমান হরিণীর মতো দেশ দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়ায়। কালের বিবর্তনে জীর্ণ অংশ ঝরে যায়। নতুন প্রাণের স্পন্দনে নবাঙ্কুর গজায়। রবীন্দ্রনাথ অতীত বর্তমানের বিশ্ব-সংস্কৃতির স্রোতে অবগাহন করে তার প্রাণের শিখা ছেঁকে পরিশ্রুতভাবে প্রকাশ করেছেন। আপন বীণার মতো করে জীবন রচনা করেছেন। বিশ্বাভিসারী প্রাণের উদার আকুতি কর্মের পাষাণ-গলা স্রোতে ভাষায়িত করেছেন। আমাদের আনন্দ, আমাদের গৌরব রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে মানুষের উপযোগী ভাষা হিসাবে রূপায়িত করেছেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে আমরা মানুষ হওয়ার অনুপ্রেরণা পাই। রবীন্দ্রনাথের নাম এলেই কিশোর কবি সুকান্তের সে কয়টি পঙক্তি বারবার মনে পড়ে যায়: “এখনো প্রাণের স্তরে স্তরে/ তোমার দানের মাটি/ সোনার ফসল তুলে ধরে।” ছফার উপরের লেখাটি পড়ে শুধু রবীন্দ্রানুরাগ নয় তাঁর পরম রবীন্দ্র-ভক্তিও চোখে পড়ে। কবিগুরুকে নিয়ে তাঁর পুরো লেখাটি আরও গভীর ও অন্তর্ভেদী এক মূল্যায়ন। তবু ছফার নামে এই বদনাম রটনার একটা বড় কারণ বলা যেতে পারে। ছফা চাইতেন কলকাতার মুখাপেক্ষী নয়, স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানী ঢাকা-কেন্দ্রিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নতুন জাগরণ হোক। মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত পরিচয় বাংলাদেশী জাতিসত্তার পরিচয় প্রাধান্য পাক। কলকাতায় তৎকালীন পূর্ব-বাংলার লোকদের ‘বাঙ্গাল’ বলে উপহাস বা তাচ্ছিল্যের একটা প্রবণতা ছিল। পূর্ব বাংলা থেকে কলকাতায় ভাগ্যান্বেষণে যাওয়া লেখকরা এই অবজ্ঞার বাইরে ছিলেন না। পূর্ব বাংলার অনেক বড় মাপের লেখকদেরও খুব একটা গুরুত্ব ও মর্যাদা দেওয়া হয়নি। কলকাতায় বেশ চেনাজানা জসীম উদদীনের মতো কবির নামও বিকৃত করে লেখা হতো ‘জসীমুদ্দিন’। বাংলা বিভক্তির পর বিশেষ করে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদে উদ্ধুদ্ব স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর অবধারিতভাবে বাংলা ভাষার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে ঢাকা। বাংলা ভাষার ভবিষ্যত ঢাকা-কেন্দ্রিক নব্বই দশক থেকে এই সত্য কলকাতার প্রধান কবি ও লেখকরা প্রকাশ্যে ও অকপটে স্বীকার করেছেন। মনে পড়ে, ঢাকায় (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে) জাতীয় কবিতা উৎসবে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এসে ব্যক্তিগত এক আলাপচারিতায়ও দুই বাংলায় জনপ্রিয় লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এ সত্য জোর দিয়ে বারবার বলছিলেন। কিন্তু ছফার প্রতিবাদী চৈতন্যের কাল অর্থাৎ পুরো আশির দশকজুড়ে কলকাতার লেখকদের বইয়ে সয়লাব ছিল ঢাকার সাহিত্য বাজার। এটা দোষের নয়, যে ভালো লেখবে পাঠকের বাজার তাঁর দখলেই থাকবে। সর্বোপরি, সীমানায় কাঁটাতার থাকলেও ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য তো প্রায় অভিন্ন। তবে ছফার গোস্বা ছিল অন্য জায়গায়। তিনি মনে করতেন যোগ্যতা থাকার পরও পূর্ব বাংলার অনেক লেখক কলকাতার শিল্পসাহিত্য-সমাজে যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। উপেক্ষা ও অবহেলার শিকার হয়েছেন। তাদের সৃষ্টি ও রচনা সম্পর্কেও একই কথা খাটে। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে একুশে বইমেলায় প্রচুর পরিমাণে ভারতীয় বই আসতো। ছফা ভারতীয় বই মেলায় আনার বিষয়ে তীব্র বিরোধীতা শুরু করলেন। ছফার প্রতিবাদের মধ্যে এক ধরনের জেদ ছিল। তাঁর জেদ তিনি বাস্তবায়ন করে ছাড়তেন। নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেবার হুমকি দিয়ে হলেও। যথারীতি ভারতীয় বই একুশে গ্রন্থমেলায় আসা বন্ধ হলো। মূলত ছফার এই প্রতিবাদ করেছিলেন স্বাধীন দেশের লেখকদের বিকাশের স্বার্থে। যারা এক সময় কলকাতায় বাবুদের ধারে ধারে ঘুরেছেন। কিন্তু দু’একজন ব্যতিক্রম বাদে তেমন পাত্তা পাননি। তিনি তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “একুশের মেলা হল বাংলাদেশের লেখকরা কতটুকু উঠলেন, কতটুকু বিকশিত হলেন তার মান নির্ণয়ের মেলা। এখানে অন্য বই থাকবে না। আন্দোলন করে একুশের মেলাটিকে আমরা নিজের বইয়ের মেলা করতে চাইছি।” তবে তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, “কোন ভারতীয় বই যদি বাংলাদেশে ছাপা হয় তবে সে বই মেলায় থাকতে পারবে।” ছফা এ প্রসঙ্গে তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও বলেন, “একবার আনন্দবাজারের বাদল বসু আমার একটা ইন্টারভিউয়ের প্রতিবাদ করে খুব খারাপ কথা বলেছিলেন। তারপর আমাদের দেশের প্রবীণ লেখক শওকত ওসমান বললেন, আহমদ ছফা খুব খারাপ লোক। উনি (শওকত ওসমান) খুব খারাপ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন, সেই শব্দটা আমি বলছি না। এরপর একদিন আমি শওকত ওসমানকে সাথে নিয়ে ঢাকার নিউ মার্কেটে গেলাম। নিউ মার্কেটের সব বইয়ের দোকানে শওকত ওসমানের বই চাইলাম, কিন্তু কোন বইয়ের দোকানই শওকত ওসমানের কোনও বই দিতে পারে না। কিন্তু যখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বই চাইলাম, দেখা গেল মুদি দোকানও তা দিতে পারে। শেষে আমি শওকত ওসমানকে বললাম, সুনীল আপনার বড় না ছোট? তিনি বললেন, ছোট, অনেক ছোট। ওকে আমি জন্মাতে দেখেছি। আর জানবেন শওকত ওসমান লেখক হিশেবে ছোট লেখক নন, তার অনেক লেখা আছে উৎকর্ষের বিচারে যা বেশ ভাল। এই অবস্থা দেখে শওকত ওসমানকে আমি বললাম, দেশটা আমরা বা… ছেঁড়ার জন্য স্বাধীন করেছি?” এইখানে অনেকে ছফাকে খুব ভুল বুঝেন। মনে করেন ছফা পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের বিরুদ্ধে ছিলেন। মোটেই না। তিনি মূলত আনন্দবাজার গোষ্ঠীর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ছিলেন। তাদের অনেক স্বেচ্ছাচারী আচরণ তিনি মেনে নেননি। স্বভাবে খ্যাপাটে হলেও চিরকাল হৃদয়ে সহানুভূতিশীল এ লেখক ব্যতিক্রম ছিলেন না পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা চর্চাকারী লেখকদের প্রতি। অনেকেই তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু ও পরম সুহৃদ ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়েও ছফার উদ্বেগ ছিল। তাঁর জবানিতেই পাওয়া যাচ্ছে, “পশ্চিম বাংলার বাংলা ভাষাটা টিকিয়ে রেখেছেন লেখকরা। আর কোন ক্ষেত্রেই বাংলা ভাষার চর্চা নেই। বাংলা ভাষার ওপর ওখানে (পশ্চিম বাংলায়) যে আক্রমণটা চলছে সেই সময় আমরা যদি পশ্চিম বাংলার বই আমদানি করা বন্ধ করে দেই, তবে তার সুযোগ নেবে এখানকার মৌলবাদীরা, এবং ওখানকার বাংলা ভাষার চর্চা চরম বিপদে পড়বে। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম বাংলার রাজনীতি এবং অর্থনীতি বাংলা ভাষার অনুকূলে নয়। পশ্চিম বাংলার অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মাড়ওয়ারি এবং গুজরাটিরা। আর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ হয় দিল্লি থেকে। এমনকি বামফ্রন্ট সরকারকে সবার আগে প্রাধান্য দিতে হয় হিন্দি বলয়ের স্বার্থকেই। এই হিন্দি বলয়ই ভারতবর্ষকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই হিন্দি বলয়ই ভারতবর্ষকে নিয়ন্ত্রণ করে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও যে বাংলা ভাষা পশ্চিম বাংলায় টিকে আছে তার কারণ সেখানকার লেখকরা এখনো বাংলা ভাষায় লিখছেন। বাংলা ভাষার প্রতি প্রেমের কারণেই আমরা পশ্চিম বাংলার এই আমদানি বন্ধ করছি না।”

ছফা তাঁর কালের অগ্রসর, উদার ও অসাম্প্রদায়িক একজন লেখক ছিলেন। যিনি স্বাধীন বাংলাদেশে অনেক বিকাশোন্মুখ লেখক-প্রতিভার যত্ন নিয়েছেন। অকালে ঝরে পড়া থেকে বাঁচিয়েছেন। হুমায়ূন আহমদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, তারেক মাসুদ, সলিমুল্লাহ খান, হেলাল হাফিজ, রুদ মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রমুখ তাদের অকুণ্ঠ ঋণের কথা স্বীকারও করেছেন। শুধু সাহিত্য, সমাজ ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নয়; ‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’-এর লেখক ছফা সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে খুবই সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি সময়কে শুধু স্পর্শ করেননি প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে গেছেন। ছফা কবিগুরু সম্পর্কে কতোটা সশ্রদ্ধ ছিলেন এবং উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন আন্দাজ করা যায় তাঁর একটি বিশেষ উক্তি থেকে, ‘হিমালয় পর্বতকে যদি আরও পাঁচ মাইল উঁচু করে দেওয়া হয়, আমার বিশ্বাস রবীন্দ্রনাথের উচ্চতা স্পর্শ করতে পারবে না।’ মহৎ প্রতিভা উৎসাহ দেয়, প্রশংসা করে, অগ্রজের ঋণ স্বীকার করে; গড়পড়তা প্রতিভা পরশ্রীকাতর হয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ছফার রাজনৈতিক দর্শন ও অবস্থান নিয়ে বিতর্ক আছে তবে লেখক হিসেবে তিনি সন্দেহাতীতভাবে তাঁর সময়ের মহৎ প্রতিভা ছিলেন।

 

তথ্যসূত্র: ১. আহমদ ছফার সময়, নাসির আলী মামুন, ২. আহমদ ছফার সাক্ষাৎকার, চিন্তা ডট কম, ৩. বাঙালি মুসলমানের মন, আহমদ ছফা 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত