| 30 মে 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

প্রবন্ধ: মুক্ত বাক্‌ মুক্ত প্রাণ । নবনীতা দেবসেন

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

 

॥১॥ 
 

সময়টাই ছিল অন্য । প্রতিবাদে ঝলমলে উজ্জ্বল যৌবনের দিন – তখনও যৌবন স্বপ্ন দেখতো এক মুক্ত বাক্‌, মুক্ত পৃথিবীর – যেখানে সাম্য আছে সুবিচার আছে, শান্তি আছে । কি কবিতায়, কি সঙ্গীতে, কি ছাত্র রাজনীতিতে সর্বত্র মুক্তির ডাক, সাম্যের হাঁক উঠেছিল । যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল পশ্চিমের তারুণ্য, কি ইয়োরোপে, কি আমেরিকায় । সেটা ছিল ষাটের দশক । ভিয়েত্নামের সেই ভয়ংকর সময় তখন – তরুণদের মধ্যে সাড়া পড়েছে – প্রশ্ন তুলেছে তারা অকারণে আমরা বিদেশে উজিয়ে গিয়ে অপরিচিত মানুষদের খুন করবো কেন ? নিজেরাই বা মেরে মরে উচ্ছন্ন হয়ে যাবো কেন ? জগতের কোন উপকার সাধিত হচ্ছে এই যুদ্ধে ? যুদ্ধে কবে মানুষের কী উপকার হয়েছে ? তখন কিউবাতে বিপ্লবী স্বাধীন সরকার সদ্যোজাত । এই শুভসময়ের গোড়া থেকেই আমি মার্কিন দেশে ছাত্রী ছিলুম – আস্তে আস্তে রং বদলাতে দেখেছি । এখন ভাবলেও রোমাঞ্চিত লাগে, সাক্ষী ছিলুম বটে কিছু অসামান্য মহার্ঘ্য মুহূর্তের । পৃথিবীর ইতিহাসে যে মুহূর্তগুলি কোনোদিনও মুছে যাবার নয় ।

পশ্চিমগোলার্ধের সেটাই ছিল হয়তো যুদ্ধপরবর্তী বিশ শতকের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর সময় – মৃত্যুর বিরুদ্ধে, অপ্রেমের বিরুদ্ধে যৌবনের প্রতিবাদের । পঞ্চাশ দশকের মার্কিন দেশে ছিল ম্যাকার্থির রাজত্ব । বাক্‌-এর ঘোরতর বন্দিদশা । কী বললে যে তুমি হঠাৎ ণধণ্ণযং ধী লত্রছস্‌ংশঠবছত্র বিঞঠটঠঞঠংয -এর কুনজরে পড়বেনা – তোমার পাশের বাড়ির অমায়িক মানুষটিই যে তোমার বিরুদ্ধে নালিশ করবেনা, – তা তুমি জানো না । কী করলে, কী বললে যে হঠাৎ তোমার চাকরি যাবে, তোমাকে হয় জেলে পুরে দেবে, নয়তো দেশ থেকে বিতাড়ন করবে, তা তোমার জানা নেই । সর্বত্র একটা সন্দেহের, বাধার, নিষেধের অন্ধকার তমশ্ছায়া । তারই বিরুদ্ধে বেঁকে দাঁড়ালো মার্কিনী যৌবন ষাটের দশকে, কেনেডির মুক্ত আলোয় । ওদিকে ফ্লাওয়ার চিলড্রেনদের গানে-কবিতায়, নেশা-ভাঙে, ও স্বপ্ন দিয়ে অস্ত্রের বিরোধিতা শুরু হলো – এদিকে জেগে উঠেছে কালোমানুষ ।

গাইছেন ডিক গ্রেগরি – তখনও কালোমানুষদের জন্য দক্ষিণের অঞ্চলে বাসের পিছনদিকের আসনগুলি নির্দিষ্ট ছিল – আমাকে পিছনে খুঁজে না পেলে বাসের সামনের দিকে যাও অসামান্য সেই গান ।

তখনই আলাবামাতে এক কালো যাজক মার্টিন লুথার কিং বক্তৃতা দিয়ে স্বপ্ন বিলোচ্ছেন এবং সেই স্বপ্ন সত্যে পরিণত করছেন । শুধু কালোমানুষ নয়, জেগে উঠেছে মেয়েরাও । যত নিপীড়িত, বঞ্চিত, অপমানিত মানুষরা তখন নতুন করে নিজের কথা ভাবতে শুরু করেছে । শুরু হয়েছে পশ্চিমের পৃথিবী জুড়ে ষাটের দশকের মুক্তিযুদ্ধ । আদর্শের জন্য মানবতার জন্য সচেতনতার লড়াই । পশ্চিমী যন্ত্রসভ্যতার দানবিক লোভের, পৈশাচিক উত্পীড়নের হাত থেকে মুক্তির লড়াই । সিভিল রাইটস মুভমেন্ট । সেই লড়াই অবশ্য থামেনি । সেই উত্পীড়নও থামেনি । কিন্তু সে তো অন্য কথা । তখন কালোদের পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছে মেয়েরা ।

বেটি ফ্রীডনের কন্ঠে নারীমুক্তির ধ্বনি শোনা যাচ্ছে । আমার কপালগুণে, আমিও এই আশ্চর্য ব্যাকুল স্বপ্নময় প্রতিবাদী যৌবনের সামিল হতে পেরেছিলুম, ইংলণ্ডেও, আমেরিকাতেও । ইংলণ্ডে তখন বার্ট্রাণ্ড রাসেল স্বয়ং ঙবী -এর সংস্থার পক্ষ থেকে প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দেন । – অলডারমাস্টন বলে একটি জায়গায় ব্রিটিশ সরকারের পারমাণবিক বোমা প্রস্তুতির গবেষণাকেন্দ্র ছিল, সেখানেই মিছিল করে যেতেন তিনি প্রতিবছর । ছাত্র, অধ্যাপক, কবি, শিল্পী সবধরনের শান্তিপ্রিয় মানুষেরা তাতে যোগ দিতেন, সারা ইংলণ্ড থেকে জড়ো হয়ে বেরুতো সেই বামপন্থী মিছিল, শান্তিবাদী মিছিল — ব্রিটিশ যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদের ইতিহাসে উজ্জ্বলতম নাম। আমিও তাতে হেঁটেছিলুম আমার সিংহলী বন্ধু কুমারী জয়বর্ধনের সঙ্গে — কিন্তু তিনদিন ধরে নয়। একদিনই। সারাদিন । তিনদিন ধরে হেঁটে মিছিল লণ্ডন থেকে অলডারমাস্টনে গিয়ে পৌঁছে, “ঘেরাও” করতো, “ধর্না” দিতো, সারাদিন স্লোগান দিতো, প্রতিবাদ জানাতো ।

১৯৬৩-তে সই হল । ঙবী র প্রভাব বিশ্ব রাজনীতিতে প্রমাণিত হল । আমাদের অত হাঁটাহাঁটিতে কাজ হল । কাজ কি হল ? অলডারমাস্টনে তো এখনও মার্চ চলছে – প্রতিবছর । এখন যায় প্রধানত ইউনিয়নগুলো থেকে শ্রমিকরা । আর নাতিনাতনীর প্র্যাম ঠেলে সেই ষাটের দশকের দাদু ঠাকুমারা । নবীনযৌবনের কোনও আগ্রহ নেই । প্রতিবাদী ছেলেমানুষীতে সময় নষ্ট না করে তারা দু’পয়সা বেশি রোজগার করে নেবে । ১৯৬০-৬৩ তে ১০০,০০০ মানুষের ভিড় অলডারমাস্টনে হাঁটতো । আনবিক অস্ত্রের গবেষণাকেন্দ্রটি এখনও বন্ধ হয়নি । “জছত্র-ঞচ্‌ং-জধস্ঢ!” স্লোগান আমাদেরই সময়ের স্লোগান । এ তো ইংলণ্ডের কাহিনী । ঙবী র গল্প ।

আজ বলতে বসেছি বার্কলের কথা – ১৯৬৪ তে সেখানে যে ছাত্রবিপ্লব হয়েছিল যনৌ বলে প্রখ্যাত সেই যশংং নৃংংবচ্‌ ংঔধটংস্‌ংত্রঞ -এরও সামিল হবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার । ১৯৬৪-৬৫ আমি বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলুম । প্রত্যেকদিন ক্লাসিক্স্‌ বিভাগের লাইব্রেরিতে নিজের কাজ করি — ঠিক তখনই ঘটেছিল সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা — “মুক্ত করো বাক্‌” বলে ছাত্র এবং অধ্যাপকদের মিলিত প্রতিবাদ — অধিকার চেয়ে । মাসটা ছিল ডিসেম্বর — ডিসেম্বরের তিনটে উত্তাল দিনের ঘটনা, ২রা থেকে ৪ঠা ডিসেম্বর, ১৯৬৪, বার্কলেতে ফ্রী স্পিচ মুভমেন্টের ইতিহাস রচিত হয়েছিল ।  কলকাতার কাছেও তা রীতিমতো “জ্বালাময়ী” ভাষা । ছাত্রদের ক্যাম্পাসে রাজনীতি করা চলবেনা – এই হুকুম জারি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ– সেই হুকুমেরই প্রতিবাদ । দ্বিতীয়ত, ভিয়েত্নামযুদ্ধে ছাত্র-ছাত্রীরা কেন যোগ দেবে ? তৃতীয়ত, কিউবা থেকে মার্কিনী হাত হটিয়ে নাও ! – প্রধানত যদিও ফ্রী স্পিচ মুভমেন্ট চ্যান্সেলরের অন্যায় কানুন জারি করার বিরুদ্ধে, কিন্তু শুধু সেখানেই থেমে ছিলনা — ক্যাম্পাস পলিটিক্স থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বে — মার্কিন বিদেশনীতির বিপক্ষে । আমারই বন্ধুরা বামপন্থী ছাত্রনেতা, তারাই বক্তৃতা দিচ্ছে, আমি স্বভাবতই তাদের দলে ঢুকে গেলুম চিন্তাভাবনা না করেই । অত্যন্ত ন্যায্য কারণে ছাত্র-রা প্রতিবাদ জানাচ্ছে — ক্যাম্পাসে রাজনীতির আলোচনা চলবে না মানে ? অধ্যাপকরাও মাঠে নেমে পড়লেন – কেউ বিপক্ষে কেউ সপক্ষে বক্তৃতা দিতে লাগলেন । আমার উত্তেজনা, আনন্দ, সীমাহীন । এতবছরের দেখা মার্কিন ছাত্রজগৎ কখনও এমনভাবে জেগে ওঠেনি । আমার মনে পড়ে ১৯৬০-এ জছষ্‌ ধী ঠৈভয ঘটনার পরে আমি উত্তেজিত হয়ে হার্ভার্ডের ইয়ার্ডে ঘুরছি, কোথাও কোনও উত্তেজনা নেই । কোথাও কোনও মীটিং হচ্ছে না, ছাত্ররা পড়াশুনোয় ব্যস্ত । কী আশ্চর্য দেশ রে বাবা ? হঠাৎ দেখি রাজপথে ছাত্রদের মিছিল বেরিয়েছে । যাক্‌ – প্রতিবাদ ক্যাম্পাসে না হোক, রাজপথে তো আরোই ভালো ! আমি দৌড়ে মিছিলে যাই – ওমা ? এ কী ? এদের সঙ্গে যে জছত্রত্রংশ আছে — তাতে লেখা, “আমরা ল্যাটিন ভাষাতেই আমাদের গ্রাজুয়েশন সার্টিফিকেট চাই — ইংরিজিতে লেখা সংশাপত্র নেব না!” এ একটা প্রতিবাদী বিষয় হোলো ? যে ল্যাটিনে এতকাল ঙছত্ঠভশছৃচ্ষ্‌ করত সে মারা গেছে তাই ইংরিজিতে সার্টিফিকেট লেখা হচ্ছে ! এই তো এদের সচেতনতা ।

কেমন করে যেন আমরা সবাই ত্রক্রমশ তার মধ্যে প্রবেশ করে সেটিকে দখল করে বসলুম — এটাই হলো আমাদের প্রতিবাদের ভাষা — সেখানে বারান্দা থেকে মাইকে বক্তৃতা দিচ্ছে মারিও আর ওদিকে গীটার বুকে গান করছেন! গায়ে কাঁটা দেওয়া সব সঙ্গীত মুহূর্ত — কলকাতাতে এখন পচে-যাওয়া, কিণ্ডারগার্টেন ইস্কুলের প্রার্থনাসভার গান– গাইছেন। -সেই গান তখন রাজা-গান ! সেই গান গেয়েই মার্টিন লুথার কিং তাঁর ওয়াশিংটন মার্চ করেছিলেন । প্রচণ্ড উত্তেজনা — কেননা সশস্ত্র পুলিশ আমাদের ঘেরাও করেছে । ওদেশে সর্বদাই একজাতের পুলিশ থাকে ! এখনও থাকে কিনা জানিনা, তখন তো থাকতো – (সত্তরের দশকে ৪জন ছাত্র-ছাত্রীকে তারাই মেরেছিল) কোমরে বন্দুক ঝুলিয়ে । একসময়ে শুনছি ঘোষণা হচ্ছে — “পুলিশ আমাদের গ্রেপ্তার করতে এসেছে — খবরদার তোমরা কেউ শক্তি প্রয়োগ করে বাধা দিওনা – আমাদের প্রতিবাদ হিংসার বিরুদ্ধে, অহিংস প্রতিবাদ — কিন্তু তোমরা একেবারে গা এলিয়ে দেবে — ওরা আমাদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাক — হেঁটে হেঁটে ওদের পিছু পিছুও যাবনা আমরা -“

আমি ভাবছি অমর্ত্য তো তাঁর দোর-আঁটা অফিসে বসে লেখালিখি করছেন, তিনি কিছুই জানবেন না আমাকে ধরে যদি । ইতিমধ্যে আবার ঘোষণা — “যত বিদেশী ছাত্র-ছাত্রী আছো আমাদের সঙ্গে — তোমরা বেরিয়ে যাও — খবরদার গ্রেপ্তার হোয়োনা, তাহলে তোমাদের ভিসাও যাবে, জলপানিটাও যাবে, হয় তো ডিপোর্ট করে দেবে — তোমরা বিলডিংয়ের বাইরে থেকেই আমাদের শক্তি যোগাও এবং ধন্যবাদ জোন বায়েজকে, তুমিও বাইরে থেকে আমাদের উত্সাহ দান করো -” এই ঘোষণা শুনে আমরা জনা কুড়ি ছাত্রছাত্রী — একলা আমিই ভারতীয় মেয়ে — বেরিয়ে এলুম । এবং সঙ্গে জোন বায়েজও । পুলিশের প্রতিবাদ ভয়ংকর চেহারা নিল এরপর । সেদিন রাত্রে মোট ৮০৬ জন ছাত্রছাত্রী গ্রেপ্তার হয়ে জেলে গিয়েছিল, বাক্‌ স্বাধীনতার জন্য যুঝতে ।

ইতিহাস তৈরি হয়ে গেল । ছাত্র রাজনীতিতে আমেরিকায় এত বড় প্রতিবাদ কোনোদিনই হয়নি ।

অনেক বছর পরে আমাদের “ভালোবাসা” বাড়িতে একদিন এসেছিল, সেদিনকার অন্যতম বিপ্লবী ছাত্র নেতাদের বন্ধু । তার মুখে শুনেছিলুম প্রত্যেকের জীবন ভিন্নপথে মোড় ঘুরেছে । বেশিরভাগই মাষ্টারি করছে – জেরি নিজে নাকি ব্যবসায়ী হয়ে গিয়েছিল এবং অসাধুও । জেরি আর মারিও এই দুজনের অকাল মৃত্যুর দু:সংবাদ কলকাতায় পৌঁছেছিল, বিভিন্ন সময়ে । খুব মনকেমন করেছিল তখন । ওদের অবশ্য কেউ ভুলবে না । ছাত্র ইতিহাসে কিংবদন্তি ঘটনার সঙ্গে মিশে গিয়েছে ওদের নামগুলি চিরদিনের মতো ।

॥২॥

 

নাম অবশ্য বেশিদিন মনে রাখেনা মানুষ । এই তো সেদিন কাগজে পড়লুম রোজা পার্কসের মৃত্যুর খবর । তিনি যে এতদিন জীবিত ছিলেন তাই জানা ছিল না । অথচ আমার তরুণ বয়সের অন্যতম হিরোয়িন ছিলেন রোজা পার্কস । পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে আমি আমেরিকাতে ছাত্রী হয়ে গিয়েছিলুম — তখন রোজা পার্কসের নাম বামপন্থী হৃদয়ে সূর্যোদয় ঘটাচ্ছে — একটি অসীম সাহসী আত্মবিশ্বাসী কালো মেয়ের প্রথম পদক্ষেপে কেঁপে উঠেছিল শ্বেতাঙ্গ বে-আইনের নড়বড়ে খাঁচাটা। বাসের শেষদিকের সীটে বসাই ছিলো কালোদের নির্ধারিত নিয়ম — আমেরিকার দক্ষিণভাগে তুলোচাষীদের কালো ত্রক্রীতদাস দাসীদের তখনও এই সামান্য গণতান্ত্রিক অধিকারটুকুও ছিলনা যে তারা যেকোনও আসনে বসতে পারবে । অথচ আইনের হিসেবে ত্রক্রীতদাসপ্রথা উঠে গেছে । আমেরিকার গণতান্ত্রিক সরকার চালু । একদিন সামনের আসন ভরে গিয়েছিল বলে এক শ্বেতাঙ্গ বাসের পিছনের দিকে বসতে গেলেন । কিন্তু কালোদের পাশে গিয়ে তো বসা যায় না ? তাই কালোদের তিনি বললেন উঠে যেতে । উঠে গেলও তারা — কেবল একটি কালো মেয়ে উঠল না । সে অবাক হয়ে বললো সাদা যাত্রীটিকে : “কেন ? ওই তো কত খালি সীট আছে পিছনদিকের । আমার এই আসন আমি কেন ছাড়ব ? আপনি বসুন না ।” রোজাকে জোর করে নামানো হল । তাকে ১৮ ডলার জরিমানা করা হল । তখনকার দিনে সেটা প্রচণ্ড ধাক্কা । ক্ষেপে উঠল মার্কিন দেশের কালোমানুষ । মন্টগোমারির একজন তরুণ কালো ধর্মযাজক — মার্টিন লুথার কিং রোজা পার্কসের পক্ষ নিয়ে লড়তে রাস্তায় নামলেন । শুরু হল অহিংস প্রতিবাদ — কালো মানুষরা ঐ রুটের বাসে ওঠাই বন্ধ করে দিলেন । পুরো একবছর ধরে বাস বয়কট চলবার পরে টনক নড়লো আদালতের । ধ্বসে পড়ল নোংরা বর্ণবিদ্বেষের বালির পাঁচিল । শেষ পর্যন্ত বদল হল মার্কিন দেশের বিদঘুটে অসাম্যের আইন । কৃষ্ণাঙ্গদের বাসের পিছনের সীটে বসানোর অন্যায় আব্দার উঠে গেল। এবার বাস সকলের ।

একটি মেয়ে `না’ বলে উঠেছিল ।
একটি মেয়ে তার আসন ছাড়েনি ।
সমগ্র মার্কিন দেশ তারই সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলে উঠল `না’ । বলে উঠল, গণতান্ত্রিক অধিকারের কোনও সাদাকালো নেই ।

আমি যখন ছাত্রী, তখন ওদেশে নানাদিক থেকে জানলা দরজা খুলে যাচ্ছে, খোলা হাওয়া ঢুকছে — যদিও ণধণ্ণযং ধী লত্রস্‌ংংইশঠবছত্র বিঞঠটঠঞঠংয তখনও সক্রিয় । আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে স্‌ংংইশঠবছত্র ঙঠটঠৎ ত্ঠঢংশঞঠংয লত্রঠধত্র —রোজা পার্কসের নাম তখন আমাদের মুখে মুখে । সেইসব দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল । নব্বই পার হয়ে, ভিমরতি ধরেছিল তাঁর । রোজা পার্কস নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন । জনতার চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন নিজেকে । এতদিন যে তিনি জীবিত ছিলেন সেটাই খেয়াল ছিল না কারুর । এবার তিনি মরিয়া প্রমাণ করলেন যে তিনি মরেন নাই । খবরটা পড়ে অনেক কিছু মনে পড়ে গেল ।

রোজা পার্কসের গল্প আমাকে বলেছিল ইনডিয়ানাতে, একটি কালোমেয়ে । আমার বন্ধু, আমার হস্টেলেই থাকত সে — জেন । জেন মুসলমান হয়ে গিয়েছিল । ম্যালকম এক্স-এর একজন মন্ত্রশিষ্যা । – আর তার ছোটভাই জুলিয়ান হয়েছিল প্রথমসারির সক্রিয় বামপন্থী রাজনীতিক । ইলেকশনে জিতে ওয়াশিংটনে থাকতো, কালোদের জন্য নিয়ত সংগ্রাম করতো । জেন ইসলামী নিয়মে রোজা পালন করত । ওর কাছেই আমি দুটি বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞানলাভ করেছিলুম । এক, মার্কিনি কৃষ্ণাঙ্গদের সমস্যা বিষয়ে, আর দুই, ইসলাম ধর্মের আচার বিচার বিষয়ে । এবং জেন, আমার অ্যালবামে আমাদের `ভালো-বাসা’ বাড়ির ছবি দেখে সত্যি সত্যি অবাক হয়ে বলেছিল, “ইনডিয়াতে এরকম তিনচার তলা বাড়ি আছে ? তোমার বাবা কি রাজা ? আমি তো ভাবতাম ওখানে সবাই গাছের ওপর বাসা বেঁধে থাকে !” কিন্তু ওর চেয়েও অবাক আমি হয়েছিলুম ওর ইনডিয়া বিষয়ে এত গভীর অজ্ঞতা দেখে । তারপরে দেখলুম জেন মোটেই ব্যতিক্রমী নয়, জেনই সাধারণের প্রতিনিধি, যখন আমার আরেক বন্ধু, নেওমি আমার নতুন দক্ষিণী সিল্কের শাড়িতে হাত বুলিয়ে মুগ্ধকন্ঠে বলেছিল, “ঈশ তোমরা কত দ্রুত প্রগতির পথে এগিয়েছো — এই তো সেদিনই মহাত্মা গান্ধী তোমাদের সুতো কাটতে শেখালেন এরই মধ্যে এরকম সিল্ক বানিয়ে ফেলেছো ?” এদের সাধারণ জ্ঞানের বহর দেখে আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল । পরে ভেবে দেখেছি এদের তো দরকার হয়নি ভারতবর্ষ বিষয়ে জানবার — এরা জানে শুধু ইয়োরোপকে । কতো ক্ষুদ্র ছিল ওদের জগৎ সংসার । কতো অপুষ্ট । অপূর্ণ ।

এখন বরং অনেক বেশি জানে মার্কিন দেশের মানুষরা ভারতবর্ষের কথা । ভারতীয় খাবার, ভারতীয় পোশাক, ভারতীয় সঙ্গীত, ভারতীয় সিনেমা, ভারতীয় “ইংরিজি” সাহিত্য – স-ব ! মার্কিন দেশে এখন বোঝ ভারতীয় বাসিন্দাদের সংখ্যা তো অল্প নেই আর ? তাদের সন্তান-রাও ব্রিলিয়ান্ট হয়ে উঠছে । সত্তর দশক থেকেই দৃশ্যপট পাল্টে গেছে — পুরোনো দিনের প্রবাসী ভারতীয়দের জীবন, তাদের বিশ্বাস, তাদের স্বপ্ন, সবই ছিল একেবারে আলাদা । বছর বছর দেশে আসা যেতনা তখন, তাই মনপ্রাণটা হয়ে থাকতো দেশে ভরপুর । এখন যাহা কলকাতা তাহাই নিউজার্সি । যাহা নিউজার্সি, তাহাই বাঙ্গালোর । তাই অত মনকেমনের বালাই নেই আর । তবু, রোজা পার্কসের খবরে বার্কলির জন্য মনকেমন করে উঠলো ।

 

(পরবাস, মার্চ, ২০০৬)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত