| 2 মার্চ 2024
Categories
পাঠ প্রতিক্রিয়া

পাঠ প্রতিক্রিয়া: কেবল জাগে প্রেম মানবসত্তায় । খালেদ হামিদী

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

জিললুর রহমান

ইটালো ক্যালভিনো যে বলেন, classic is a book that has never finished saying what it has to say.’, তা কি জিললুর রহমানকে অনুপ্রাণিত করে দূরান্তে দেইলি আলিগিয়েরি বা দান্তের দ্য ডিভাইন কমেডির অসমাপ্ত বক্তব্য উদ্ধারে, নাকি মহাকবির ধরনে মহাকাশ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে ভিন্ন কিছু বলতেই রচেন এই নতুনতর কাব্য এক সে মেরাজের রাত্রে ঘুমিয়েছি? কিন্তু তিনি শবে মেরাজের রাতে কেন ঘুমিয়ে পড়েন এবং নিদ্রিতাবস্থায় স্বপ্নে ঊর্ধ্বমুখি হন মুসলিম মানসে চিরস্থায়ী সেই সপ্রাণ বাহন বোরাকে? সংশ্লিষ্ট প্রেক্ষাপটে দৃকপাতপূর্বক পাঠক হিসেবে আমরা তাঁর এই অভিযাত্রার সাক্ষী হয়ে ওঠার প্রয়াস পেতে পারি।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচা আবু তালিবের কন্যা হিন্দা, মালেক ইবনে সা’সাআ’হ (রা.) থেকে বর্ণনাকারী আনাছ (রা.) প্রমুখের ভাষ্যে মেরাজের রাতে নবীজির ঊর্ধারোহণ বা বেহেশত-দোজখ পরিদর্শনের যে বিবরণ পাওয়া যায় তাতে স্বর্গে আদম (আ.), ইব্রাহিম (আ.), ইসা (আ.), ইউসুফ (আ.), ইদ্রিস (আ.), হারুন (আ.) প্রমুখকে একে একে দেখা যায়। বিশেষ করে মুসা (আ.), মুহাম্মদ (সা.)-কে মহান আল্লাহর কাছে একাধিকবার ফেরত পাঠিয়ে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার বিধানকে পাঁচ ওয়াক্তে ধার্য করতে সহায়তা করেন। কিন্তু পবিত্র কোরান শরিফে এই ভ্রমণের বিস্তারিত কোনও উল্লেখ নেই। কেবল সুরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে নবীজিকে মক্কার কাবা ঘর বা মাসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমের মাসজিদুল আকসায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। তবে এতে মেরাজের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মুহাম্মদ (সা.)-এর আশেপাশে কিছু বরকত দেয়া হয় যাতে আল্লাহ তাঁর কিছু নিদর্শন ওনাকে দেখাতে পারেন।  যদিও, নবীজির ভাষ্যে, ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) কর্তৃক মক্কার জমজমের পানিতে তাঁর বুক চিরে কলব বা হৃৎপিÐ পরিষ্করণের পরপরই বোরাকে আরোহণের কথা বলা হয়। জিবরাইল (আ.)-এর আগমণের আগে তিনি কাবা গৃহের উন্মুক্ত অংশে (হাতিমে) ঘুমিয়েছিলেন। সবই ঘটে নবীজির নবুয়ত প্রাপ্তির দশম বছরে, সপ্তম শতাব্দীতে।

এদিকে আমাদের কবি জিললুর রহমান মেরাজের রাতে ঘুমিয়ে পড়েন এবং স্বপ্নে ঊর্ধ্বলোকে যাত্রা করেন বোরাকে। উপর্যুক্ত বয়ানে বলা হয়, বোরাক খচ্চরের চেয়ে একটু ছোট এবং গর্দভের চাইতে একটু বড় সাদা একটি প্রাণী। জিললুর তো বোরাককে চিত্রিতই করেননি, বাহন হিসেবে নামোল্লেখ করেছেন মাত্র। কেননা, বোরাক এ-কাব্যে একটি ঊর্ধ্বগামী যান মাত্র, সামান্য বিশেষ্য (ইংরেজি কমন নাউন অর্থে) হিসেবে উল্লেখিত। তাছাড়া কবির এই স্বপ্নযাত্রা বা মহাকাশভ্রমণ মেরাজের অনুরূপ নয়। যদিও, তিনি সপ্তম আসমান পর্যন্ত পৌঁছান। তাহলে এ কেমন অভিযাত্রা? কোনও কোনও ইসলামী চিন্তাবিদের মতে, মুহাম্মদ (সা.)-এর ঊর্ধ্বারোহণ দৈহিক নয়, বরং আত্মিক আরোহণ। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য, ইসলাম ধর্মমতে, ইব্রাহিম (আ.) এবং মুসা (আ.)ও আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেন। না, আমাদের কবির স্বপ্নযাত্রার প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য মোটেও তেমন নয়। তাহলে কেন তিনি এই কাব্যে সাত আকাশ পর্যটনে ব্রতী হন? কোন প্রেরণায় তাঁর অমন কাব্যযাত্রা?

উপর্যুক্ত প্রশ্নগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে স্মৃতিতে ঝিলিক দেয় চতুর্দশ শতাব্দীর ইটালীয় মহাকবি দুরান্তে দেইলি আলিগিয়েরি বা দান্তের দ্য ডিভাইন কমেডির প্রসঙ্গ, যা ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের পরকাল দর্শনের মহাকাব্য। দান্তের হারানো প্রেম বিয়াত্রিচে (দান্তে নয় বছর বয়সে যে অভিন্ন বয়সী কিশোরীর প্রেমে পড়েন, যার সঙ্গে জীবনে মাত্র দু-তিনবার কথা  হয় এবং যে ২৪ বছর বয়সে মারা যায়), তাঁর কাছে, তাঁরই অরণ্যবাসের সময়, স্বর্গ থেকে খ্রিস্টপূর্ব যুগের মহাকবি ভার্জিলকে পাঠান। ভার্জিল তাঁকে ঊর্ধ্বারোহণের সঙ্গী করেন এবং নরক ও পার্গেটরি বা শোধনস্তর অব্দি পরিভ্রমণ করান। শেষে তৃতীয় ও শেষ স্তর স্বর্গে পরিদর্শক হিসেবে বিয়াত্রিচে ভার্জিলের স্থলাভিষিক্ত হন। কিন্তু জিললুর আকাশে আকাশে ভ্রামণিক হয়ে ওঠেন কার প্রেরণায় বা প্রত্যাশায়? না। নারীপ্রেম বা গুরুত্বপূর্ণ কোনও ব্যক্তিজৈবনিক শক্তির ইশারায় নয়, তিনি একা বোরাকারোহী হন মৃত্যুর অভিঘাতে। কোভিড-আক্রান্ত স্বজন ও অন্য মানুষদের মৃত্যু তাঁর দার্শনিক জীবনজিজ্ঞাসাকে অনিবার্য করে তোলে। মহামারির ছোবলে সংঘটিত অকালপ্রয়াণের উদ্দেশ্য বিষয়েই যেন ভাবিত হন তিনি। কবির এই উদ্দেশ্যর প্রশ্নে এগুনোর আগে স্মরণে জেগে ওঠে, ডিভাইন কমেডির প্রথম অংশে ৩৪টি এবং বাকি দুই অংশে ৩৩টি করে মোট ১০০টি গান রয়েছে যা একটি পূর্ণ সংখ্যা। এ জন্যে মহাকাব্যটিকে প্রতিসম বলা হয়। এদিকে জিললুর রহমান আদিপর্ব, উড্ডয়নপর্ব, প্রথম আসমানে, দ্বিতীয় আসমানে, তৃতীয় আসমানে, চতুর্র্থ আসমানে, পঞ্চম আসমানে, ষষ্ঠ আসমানে, সপ্তম আসমানে, স্বর্গলোকে, লওহে মাহফুজে, নরক গুলজার, প্রত্যাবর্তনপর্ব এবং প্রত্যাগমনের ভোর শীর্ষক মোট চৌদ্দ পর্বে সমগ্র কাব্য রচনা করেন লক্ষণীয় এই প্রতিসাম্যে যে, বোরাকে তিনি সাত আসমান পর্যন্ত উড়ে যান বিধায় প্রতিটি কবিতাই সপ্তপদী এবং প্রায়ই সমিল সাত মাত্রার মাত্রাবৃত্তে বিরচিত। এবং, আলোচ্যমান গ্রন্থভুক্ত মোট কবিতার সংখ্যা ১২৬ যা ৭ দ্বারা বিভাজ্য। ভাগফল ১৮ মানে কি এখানে প্রাপ্ত বয়স্কতা বা পরিপক্কতা? না, এই পরিণত অবস্থা দৈহিক নয় নিশ্চয়, মানসিক। কেননা অনেক চল্লিশ ও পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের মানুষেরই প্রচলের বিপরীত জ্ঞানকাÐের সঙ্গে কোনও পরিচয়ই নেই। এ-প্রসঙ্গের আগে প্রতিসাম্য বিষয়ে ফের বলতে হয়, জিললুরের ছন্দের দুই পর্বের প্রতি চরণের মৃদু দোলাহেতু পাঠক যেন স্যাটেলাইট থেকে সারা পৃথিবীকে, এর সমগ্র সাহিত্যিক-শৈল্পিক-সাঙ্গীতিক অতীত সহযোগে, দেখতে পান। তা কীভাবে?

লক্ষণীয়, এ-কাব্যের আদিপর্বে আত্মার ধারণার অসারতা প্রমাণিত হয়। আত্মার কোনও ঠিকুজি কবির মেলে না। উড্ডয়ন পর্বের প্রথম দিকে, অর্থাৎ, আকাশে উড়াল দেবার খানিক পরেই, ‘কত শত’ আত্মাকে ‘বোঁচকায়’ (১০-সংখ্যক কবিতা) বন্দি দেখতে পান কবি। এই পর্যবেক্ষণের মধ্যে আত্মার প্রাচীন গ্রীক ধারণা সেমেটিক ‘নফস’ বা হৃৎযন্ত্রের কিংবা প্রাণের অনুভব দ্বারা নস্যাৎ হয়ে যায়। আরও লক্ষণীয়, কবির ঊর্ধ্বযাত্রা স্বাপ্নিক হলেও আত্মিক নয়। কেননা কবিকে আগুনের ছেঁকা দিয়ে কী যেন কোথায় ছুটে যায় এবং তিনি তা উল্কা নাকি নভোযান মর্মে প্রশ্ন তোলেন (১৩-সংখ্যক কবিতা)। এবং,পরের চরণে ‘বুঝি না মিথ আর সত্য কোন্ জ্ঞান’ বলে পুরাণ বা লোকবিশ্বাসের বিপরীতে বিজ্ঞানচেতনাদৃপ্ত অভিযাত্রার মাইল ফলক উন্মোচিত করেন। স্মর্তব্য, এর আগে এই বিজ্ঞান-কাব্যচেতনার প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি পপলার বন মরে পড়ে আছে (ফেব্রæয়ারি; ২০২২) কাব্যগ্রন্থে। কবির ক্রমান্বয়ে আকাশে আকাশে গমন, উল্লেখিত একেক পর্বে, অব্যাহত থাকে। ‘প্রথম আসমানে’ উঠেই অ্যাডাম-ঈভের স্বর্গচ্যুতির গল্পের ভিত্তিহীনতা শনাক্ত করেন তিনি এই বলে: “বলেছি, তবে ওই স্বর্গ থেকে তাড়া?/‘ওসব কিছু নয়, মনের কড়া নাড়া’/সব তো ঘুঁটে গেলো, আপেল খেলো কাক!” কাকের আপেল খাওয়ার উল্লেখে যে ক্লিকিং তা অভিনব এবং এমন চমকে-দেয়া উচ্চারণ আরও মেলে জিললুরের এই বইয়ে। বিস্মিত আনন্দে পাঠকও কবির সঙ্গে, প্রথম আকাশেই, লালনকে দেখতে পান (কবিতা ১৫-১৮) প্রায় পৃথিবীরই বাস্তবতায়। কবিকে তিনি মানুষ ভজে যেতে বলেন। জিললুর দেখতে পান সিরাজ সাঁই ও হাসন রাজাকেও। এরপর অদ্ভুতভাবে, দ্বিতীয় আসমানে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে সেমেটিক নবীদের সাথে। কিন্তু ভিন্নভাবে। কবির মুখে বাংলার রাজনৈতিক সমস্যার কথা শুনে মুসা তাঁর সেই লাঠি এখানে ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দেন (কবিতা ২০)। ওদিকে জিসাস স্বর্গে অসহায়, রোগীর অসুখ সারাতে অপারগ (কবিতা ২১)। ২২-সংখ্যক কবিতায় তাঁর ক্রুশবিদ্ধ হবার পর আসমানে উড়াল দেবার ঘটনার অসত্য খোদ জিসাসই উচ্চারণে অনিচ্ছুক থাকেন। নবী লুত কবিকে বলেন: ‘কমেনি সমকাম;/আমার কওমেতে কেন যে বিধি বাম?’ (কবিতা ২৩) এভাবে নুহ ও মিকাইলের সাক্ষাতের পরে জিললুর ফিরে পান প্রাচ্যের মহাপুরুষকে। স্বর্গেও গৌতম বুদ্ধকে তিনি, একা ধ্যানমগ্ন দেখতে পান। নির্বাণের হেতুও জানতে চান সিদ্ধার্থের কাছে। উত্তর মেলে: ‘কী ধন পেয়েছিনু জানিনে দিন শেষে!’ (কবিতা ২৬-২৮) এরপর তৃতীয় আকাশে কবির জীবনজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হন বাল্মিকী, তারাশংকর এবং রবীন্দ্রনাথ। ভারতবর্ষের বর্তমান আত্মিক সংকটে তাঁর হতাশা (কবিতা ৩২) এমন যে ‘সোনার তরী ধায় কবিকে একা ফেলে।‘ (কবিতা ৩৪) চতুর্থ আকাশের শুরুতে  (কবিতা ৩৬) দেখা যায় হোমার ও জেমস জয়েসের চরিত্রদের। কবি কি এ-পর্যায়ে সাহিত্য সমালোচকও হয়ে ওঠেন প্রথমজনের ইউলিসিসকে শহর ডাবলিনে দিনব্যাপী ঘুরতে দেখে? এই ক্ষেত্রে সামনে চলে আসে ফ্রয়েডীয় ব্যাখ্যাও: স্বপ্ন আসলে ঐহিক অভিজ্ঞতারই অবচেতন-উৎসারিত বিশেষ চিত্ররূপ। এভাবে বুঝি বা ধারাবাহিকভাবে বিশেষ ধরনে চলচ্চিত্রায়িত হন চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক, শরৎচন্দ্রের দেবদাস (কবিতা ৩৭) থেকে শুরু করে এরিস্টটল, গ্যালিলিও এবং ব্রুনোও (কবিতা ৩৮)। তাঁদের অনুপস্থিতিতে তাঁদের অবদান মানবসমাজ কতোটা ধারণ করে এবং করে না, না করবার হেতু ইত্যাদির কাব্যিক জিজ্ঞাসারই, নরক পরিদর্শনের আগ পর্যন্ত, ভাষাশিল্প মূলত এই কবিতাগুলো। ধর্মীয় মৌলবাদের আস্ফালন এ-পর্যায়ে প্রকাশিত এই বলে: ‘ধকল গেলো কতো ব্রæনো ও গ্যালিলি’র/এখনও পৃথিবীতে মিথ্যা তোলে শোর!’ (কবিতা ৩৮) পরবর্তী পর্ব পঞ্চম আসমানে উঠে জিললুর দেখতে পান ফার্সি কবি রুমি এবং বাঙালি নাট্যকার সেলিম আল দীনকে (৩৯ ও ৪০-সংখ্যক কবিতা)। ৪১ নম্বর কবিতায় প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সোফিয়া লরেনসহ প্রয়াত নায়ক-নায়িকাদের আসর ‘জমজমাট’ হয়ে ওঠে। ষষ্ঠ আসমানে চিত্রী সুলতানের পাশাপাশি মকবুল ফিদা হোসেন যেমন, তেমনি, বাদ পড়েন না পিকাসো-ও। কথাসাহিত্যিক বিভূতি ভূষণের ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ও বাদ পড়ে না।


আরো পড়ুন: এক ঘোরলাগা কাব্য : জিললুর রহমানের একটি মেরাজের রাত্রে ঘুমিয়েছি । বিচিত্রা সেন


বিশেষভাবে লক্ষযোগ্য, সপ্তম আসমান শুরুই হয় সুরে। তানসেন সেখানে গাইতে থাকেন। ভারতীয় ঐতিহ্য এখানে হয়ে ওঠে অনস্বীকার্য। (৫০-সংখ্যক কবিতা) এ তবে সঙ্গীতের ঊর্ধ্বগামী তরী বেয়ে ব্রহ্মের দিকে যাত্রা নয়। তা ছাড়াও দেহান্তরিত আরও সঙ্গীতজনের সক্রিয়তা এই শেষ আসমানে পরিলক্ষিত, শোনা যায় আমাদের ভাটিয়ালি গানও (৫২)। হ্যামিলনের বাঁশি (কবিতা ৫১) এবং বাংলার বাউলের একতারাও এখানে বিশ্রæত। ৫৬-সংখ্যক কবিতায় এসে আমাদের কবি বেটোফেন, মোৎজার্ট এবং চাইকোভস্কি শুনে বলে ওঠেন: ‘এমত দিন যায় কোথাও মন নেই/এভাবে চলে যদি লাভ কী স্বর্গেই?’ (কবিতা ৫৬) মনে পড়ে, হেনরি ও. লংফেলো বলেন, “Music is the universal language of mankind.” ভাষাগত বিভিন্নতাহেতু গানের বাণীর সীমাবদ্ধতা থাকলেও, বলা বাহুল্য, সুর সীমান্ত-অতিক্রমী কিংবা বিশ্বপ্লাবী, যেন তা সপ্তম আকাশে আরোহণের পরেও তাল, লয়, মেলোডি ও হার্মোনির কোনোটাই  হারায় না। প্লেটো ঢের আগে বুঝতে পারেন সঙ্গীতের অনিবার্যতা এই ব’লে, “Music gives a soul to the universe, wings to the mind, flight to the imagination, and life to everything.”

তারপর স্বর্গলোকে কবির আরোহণ ঘটলে আট বেহেশতের পরিচিত বা শ্রæত ছবির ব্যতিক্রম ঘটান কবি, সেখানে চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিকে দিয়ে হুর আঁকিয়ে। (কবিতা ৫৬) সনাতনী বিশ্বাস ও পুরাণের কাউন্টার ডিসকোর্স তিনি রচনা করেন বিষ্ণু ও শিবকে একসাথে গাঁজা খাইয়ে। (কবিতা ৬৩) আর, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে আগামেমননের পাশে ‘পেরেশান’ দেখতে পান। (কবিতা ৬২) বলে রাখা দরকার, জিললুর রহমানের আলোচ্যমান কাব্যগ্রন্থের কাহিনিরূপ উপস্থাপন বর্তমান গদ্যকারের লক্ষ্য নয়। তাই এটুকুু বলতে হয় যে ৫৭ থেকে ৮৫ সংখ্যক কবিতায় স্বর্গলোকে শীর্ষক পর্বে কবি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাহিত্য, পুরাণ, ধর্ম, রাজনীতি ও বিজ্ঞানের অনেক পুরোধা ব্যক্তির দেখা পান যারা মহাকাশে মানবসভ্যতা ও সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করেন। মানুষের সভ্যতা এবং অর্থনীতি ও রাজনীতির অসঙ্গতি ও অসম্পূর্ণতাসঞ্জাত, কবির নানা প্রশ্নেরও সম্মুখীন হন তাঁরা।

দান্তের ডিভাইন কমেডির নরকে নয়টি বৃত্ত, শোধন স্তরে সাতটি সোপান এবং স্বর্গে রয়েছে নয়টি গোলক। চাঁদ, মঙ্গল গ্রহ ও জুপিটারসহ মোট নয় গ্রহ-উপগ্রহ-তারকায় স্বর্গের অবস্থান দেখতে পান দান্তে। এখানেও গাণিতিক প্রতিসাম্য লক্ষণীয়, তিন অংশে বিন্যস্ত মোট ২৫টি ধাপ ৫ দ্বারা বিভাজ্য এবং প্রাগুক্ত প্রতিসম সংখ্যা ১০০-ও এই ২৫ দ্বারা সহজে বিভাজ্য। এখানে জিললুরের প্রাগুল্লিখিত ৭ ও ১৮-এর প্রতিসাম্যের চেয়েও বেশি লক্ষণীয় প্রাণের অস্তিত্বহীন পরিচিত গ্রহ-নক্ষত্রে তিনি স্বর্গ প্রত্যক্ষ করেননি। বরং মেরাজে বর্ণিত যাত্রার ধরনের সঙ্গে খানিকটা মিল রেখেই সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্যযোগে তাঁর কাব্যিক-দার্শনিক অভিযাত্রা সম্পন্ন করেন সার্বিক সচেতনতার প্রাজ্ঞ ঝিলিকে। আরও লক্ষযোগ্য যে, দান্তে স্বর্গের নিম্ন দুই গোলকে দেখতে পান জুলিয়াস সিজার, অগাস্টাস, সিসিলির কুইন কন্সট্যান্স প্রমুখকে। এর আগে তাদের প্রভু ও উপকারীদের প্রতি অকৃতজ্ঞ জুডাস ইসকেরিওট, ক্যাসিয়াস লঞ্জিনাস এবং মার্কাস  জুনিয়াস ব্রুটাসকে তিনি নরকাগ্নিতে পুড়তে দেখেন। এই দাহ কবির নৈতিক বিবেচনাপ্রসূত প্রত্যাশারই প্রতিফলন। আর, আমাদের জিললুর ক্লিওপেট্রাকে দেখেন নরকে। তাঁর নরক সফরের আগে উল্লেখ্য, ৮৪-সংখ্যক কবিতায় কর্তব্যনিষ্ঠার ফলস্বরূপ সেই বুড়ির স্বর্গলাভ ঘটে। কবিতা ৬০-এর পর থেকে প্রশ্ন উত্থাপন; ৯০-এ শিশুমৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন এবং ৯২-এ বেলালের প্রসঙ্গ টেনে বর্ণবাদের উল্লেখ প্রণিধানযোগ্য।

কবিতা ৯৩-এ প্রথমবারের মতো নরকের উল্লেখ অসাধারণ: ‘আগুনে দেখেছি তো হাজার রাজাকার/দোজখে বসে করে নিত্য হাহাকার।’ এই দেখাতেই আকীর্ণ-বিকীর্ণ হয়ে আছে কবির স্বদেশপ্রেমের মহিমা। এরপর ৯৫-এ কামের প্রথম উল্লেখ, একটু সরাসরিই। ১০৪-এ এসে প্রথমবার দান্তেকে স্মরণ এবং ভিন্ন পথে যেতে চাওয়া। ১০৬ দারুণ! ১০৭-এ হিটলারের উপস্থিতি। ১০৮-এ ২য় মহাসমরের রাজনীতির উল্লেখ- সম্রাট আকবরও তাদের সাথে নরকে। ১১০ সমাজতান্ত্রিক চেতনার অসামান্য কবিতা। ১১১-য় ধরাধামে, নিজের শয্যায় ফেরেন কবি। এরপর ১১২ থেকে সাত আসমান ভ্রমণের স্মৃতিচারণ? ১১৪-সংখ্যক কবিতায় আত্মা বিষয়ে প্রশ্ন এবং স্মৃতি ও স্বপ্নের দারুণ উল্লেখ। তারপর (১১৫-এ) প্রেমের গুরুত্ব অনুধাবন, সন্তান বাৎসল্যে, মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে পড়া (১১৭-এ) আর ১১৮-এ প্রকাশিত সারল্য কিন্তু আরও দারুণ ঠেকে। ১১৯ ঐহিক চেতনার আরেক অসাধারণ কবিতা। ১২০ সাম্যবাদী চেতনায় নারীজাগরণের চমৎকার স্বপ্ন। এরও পরে ১২৪ পর্যন্ত প্রেমের  জন্য  আর্তি। সর্বশেষ কবিতা ১২৬ মৃত্যুঞ্জয়ী জীবনবোধের ভাষাশিল্প। 

আরও স্মর্তব্য, প্রায় সব ভাষ্যকারের স্বাভাবিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইতালিরই মহাকবি ভার্জিলের সফরসঙ্গী হওয়ার আগে দান্তের সেই অরণ্যবাস তাঁর জীবন-বাস্তবতার সাথে সম্পর্কিত, বিশেষ করে, তাঁর নিজের আবেগাচ্ছন্ন, বিভ্রান্তিপূর্ণ জৈবনিক অবস্থার সাথে। অরণ্যের রূপকে ফ্লোরেন্সের রাজনৈতিক অবস্থা এবং ডিভাইন কমেডির রহস্যময় গানের সমস্ত প্রতীক একত্র করে, ব্যাখ্যাতাগণ এই মহাকাব্যের একটি রাজনৈতিক অর্থও দাঁড় করান। আধ্যাত্মিক চিন্তনের সহায়তায় দান্তে, স্বর্গীয় জ্ঞান ও ধর্মতত্ত¡ দ্বারা পরিচালিত প্রজ্ঞাযোগে, কবিতায় মূর্ত শাস্তি, শুদ্ধি এবং পুরস্কারের স্থানগুলির মধ্য দিয়ে গিয়ে, দোষের শাস্তি দেন, সান্ত¡না দেন এবং দুর্বলতা সংশোধনের মাধ্যমে সর্বোত্তমের চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে পুণ্যকে পুরস্কৃত করেন। সমালোচকদের মতে, দান্তের এই মহাকাব্যের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে কলহবিদীর্ণ একটি দুষ্ট জাতিকে রাজনৈতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় ঐক্যের দিকে আহŸান জানানো। তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে দান্তে এই মহাকাব্য রচনার মাধ্যমে আবেগ ও বিভ্রান্তিতে পূর্ণ সেই জীবনাবস্থা থেকে রক্ষা পান, বিশেষ করে, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে। এদিকে জিললুর রহমান মড়কের অভিঘাতে, সম্পূর্ণ বৈপরীত্যযোগে, বুঝি বা মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনে ব্রতী হন। এবং, ঊর্ধলোকেও পৃথিবীর মানবসমাজের কার্ল মার্কস কথিত উপরিকাঠামোর (সুপার স্ট্রাকচারের) আলোয় উদ্ভাসিত হতে থাকেন। এভাবে, দান্তের ধরনে বিশ্বাসের তরী না বেয়েও, স্রষ্টাকে খুঁজে না পেয়ে, নিজের অধীত বিদ্যার বিশাল পশ্চাৎভূমির ঐশ্বর্যে পাঠককেও ক্রমান্বয়ে ঋদ্ধ করে নেমে আসেন ইনফ্রা স্ট্রাকচারে। এর আগে সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজতে বলেন মানুষেরই ভুবনে। তাই মূলত সমাজতান্ত্রিক, সাম্যবাদী ও বৈজ্ঞানিক চেতনায় গভীরভাবে দীপ্ত-দৃপ্ত কবি অমোঘ উচ্চারণের দৃঢ়তায় সচ্ছন্দে বলতে পারেন: 

স্বর্গ নরকের শুলুক সন্ধানে

নেই তো প্রয়োজন ঘোরার আসমানে

মানুষে ভেদাভেদ যেদিন উঠে যাবে

সেদিন পৃথিবীতে স্বর্গ বিরচিবে

ভরো না ধরণীটা কেবল ছলনায়

শ্রমের হাতগুলো উঁচুতে ধরা চাই

স্বর্গ আমাদের ঘুরছে হাতে হাতে

                (১১৮)

একশ ছাব্বিশটি কবিতার এই মাল্যখানা মহাকাব্যধর্মী দিঘল কবিতাও, যা আমার এ-যাবৎ পঠিত শ্রেষ্ঠ দীর্ঘ কবিতাগুলোর অন্যতম। তাছাড়া যতদূর জানা যায়, উভয় বাংলায় এমন ধরনের কাব্য এর আগে রচিত হয়নি। শুভ পাঠ।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত