| 16 এপ্রিল 2024
Categories
ইরাবতী তৃতীয় বর্ষপূর্তি সংখ্যা

তৃতীয় বর্ষপূর্তি সংখ্যা গল্প: জীবন । ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য্য

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

এখন রাত বারোটা বাজে তাও একটা চারতলা বিল্ডিঙের একদম ওপর তলার দক্ষিণ কোণের এই ছোট্ট এক কামরার আগোছালো ঘরটাতে গম্ গম্ করছে আওয়াজ টিভির আওয়াজ সেই সন্ধ্যে সাতটা থেকেই চলছে একভাবে ইদানীং প্রতিদিনই চলে যাক্এতদিনে অবশেষে কেবল্ লাইনের পয়সাটা অন্তত উঠছেনিজের মনে মনেই হেসে উঠলো অরিজিৎ সত্যিএকটা কিছু তো অ্যাট লিস্ট ভাল হল এই লকডাউনেআগে তো টিভিটা দেখতেই পেত না ও বাড়িতেই থাকতো না যেমাসে কালেভদ্রে এক দুখানা ছুটি পেলে হয়তো কখনও বা দু’ এক ঘন্টা চলতো ওটা বাইরের হযবরল জীবনের ফাঁকে পড়ে পাওয়া দুটো দিনকে আর অন্য কোনও আওয়াজ দিয়ে ঢাকতে চাইতো না সে তখন অথচ কত সাধ করে ওটা কিনেছিল একসময় বেশ কয়েকটা জব ছেড়ে এই এখনকার চাকরিটা পাওয়ার আনন্দ ও সেলিব্রেট করেছিল এই বিয়াল্লিশ ইঞ্চির ফ্ল্যাট স্ক্রীনের বোম্বাই টিভিটা কিনে প্রথম প্রথম খুবই দেখতো খেলাখবরডিসকভারিহিস্টরি আর ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক চ্যানেল এছাড়াও সময় হলে নানা ধরনের নানা বিষয়ের বাংলাহিন্দি আর ইংরাজী সিনেমা সাউথের মুভিগুলোও দারুণ লাগতো ওর। পুরো মাথাটা এক ঝটকায় খালি হয়ে যেত সময় কাটতো কি তাড়াতাড়িকিন্তু ধীরে ধীরে কাজের জায়গায় পদোন্নতির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে ব্যাস্ততাও বাড়লো ওর এই সর্বশেষ জবটাতে একটা বেশ ভালো মাইনের কেটারিং কোম্পানির হেড শেফ হিসেবে জয়েন করেছিল ও হ্যাঁছিল বলাটাই ঠিক এখন আজ এই ছয় মাসের কাল রাত্তির পেরিয়ে পুজোর মুখে রেস্টুরেন্টগুলো একটু একটু করে খুলতে শুরু করলেও কেটারিং সার্ভিস যে কবে আবার ঠিকমতো খুলবে তা কেউই নিশ্চিত ভাবে বলতে পারছে না ভয়শুধুই ভয় এখন চারপাশে আর সঙ্গে পাহাড়প্রমাণ অনিশ্চয়তা

আগেই বলেছিলামসরকারি চাকরি কর!”, বাবার আক্ষেপটা কানে বাজে ওর লকডাউন শুরুর ক’দিন বাদেই ফোন করেছিল বাবা,” 

তাহলে আর এই অনিশ্চয়তার জীবন কাটাতে হত নাএই দুর্দিনে ঘরে বসে মাইনেটা অন্তত পেতিসকিন্তুওই যে গোঁএখন দিনে দিনে কোথাকার জল কোথায় গড়ায় দ্যাখ!”, আর বেশি কিছু বলেনি বাবাজানেবলে লাভ নেই সেদিনও ছিল না আজও নেই মা আর বোনের সাথে ক’টা টুকটাক কথা বলেই ফোনটা রেখে দিয়েছিল ও ভাল লাগছিল না

উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে জেনারেল লাইনে না গিয়ে সোজা কলকাতায় এসে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়েছিল অরিজিৎ বহু টাকা গচ্চা গিয়েছিল বাবার তাদের মতো মাঝারি মাপের সংসারে এটা সত্যিই একটা আকাশকুসুম ধরনের সিদ্ধান্ত ছিল কিন্তু তাও কোনভাবেই বাবার মতন একটা আনগ্ল্যামারাস আর নন্ হ্যাপেনিং সরকারি চাকুরে হয়ে একটা গোটা জীবন কাটাতে ও কখনোই চায়নি পাশ করার পরে তিনবার জব চেঞ্জ করে এই নতুন কেটারিং সার্ভিসটায় ও ঢুকেছিল জাস্ট গত বছরের প্রথম দিকেইসব ঠিকঠাকই চলছিলএকদম হিসেব মেনেই কিন্তু হঠাৎ করে যে এই ছন্দপতন হবে ভাবতেই পারেনি ও কেউই পারেনি বোধ হয় সেই খবরই এতক্ষণ দেখছিল অরিজিৎ টিভিতে এখন তো টিভি খুললেই শুধু এই ধ্বসে পড়া অর্থনীতি 

আকস্মিক সীমাহীন বেকারত্ব বিপুল অনিশ্চয়তা আরআত্মহত্যা মনে মনে একটু হাসে অরিজিৎছকগুলো সব খাপে খাপে মিলে যাচ্ছেদিনের পর দিন এই একচিলতে ভাড়ার ঘরে বন্দীদিশাহীন বেকার এক জীবন আরচরম একাকীত্বও হেড শেফতাই প্রথম মাসে প্রায় পুরো বেতনই পেয়েছিলতারপর থেকে কমতে কমতে এই মাসে অবশেষে আর কিছুই ঢুকলো নাকাকে দোষ দেবেব্যাবসা নেই পয়সাও নেই সবার একই গল্প

ব্রাউন কালারের নরম গদিওলা সোফাটা ছেড়ে উঠে শোবার ঘরে গিয়ে বেডসাইড টেবিলটার কাছে দাঁড়ায় ও থরে থরে যত্ন করে সাজানো আছে কত সাপ্লিমেন্টের কৌটো নামী দামী সব কোম্পানি এক একটাসবই শরীর ভালো রাখতে মন নয়ওষুধ বিষুধের কৌটোও কিছু কম নেই প্রেসারসুগার থেকে শুরু করে সাধারণ জ্বরজ্বারিঠান্ডা লাগাপিঠ ঘাড় কোমর ব্যাথাএমনকি ঘুমোনোর পিল অবধি ও সব শিশিগুলোর ওপর ধীরে ধীরে একবার করে চোখ বুলিয়ে অবশেষে স্লিপিং পিলের সাদা কৌটোটা হাতে তুলে নেয় মুখটা খুলতেই দেখে অনেকগুলো বড়ি এখনও বাকি একটু থমকে যায় ও হঠাৎই একটা শিরশিরে চিন্তা মাথার ভেতরে ঘাই মারে ওর রোজকার মতো একটাই খাবেনাকিসব ক’টাইসত্যি বলতে কিআইডিয়াটা খুব মন্দ নয় ইন ফ্যাক্টএটা জাস্ট একটা ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়াআরসময়টাও একদম আইডিয়াল কেউ দেখবার নেই কেউ শোনবার নেই কেউ বলবার নেই আরপদ্ধতিটাও ভালো ভালো মানে এক্কেবারে বেস্টই বলা যায় নো কষ্ট ওনলি শান্তি একেবারে অপার চিরশান্তি রোজকার এই তিল তিল করে ঘুণপোকার মতো কুড়ে খাওয়া দুশ্চিন্তার জীবন থেকে এক ঝটকায় চিরমুক্তি

হঠাৎই এক ঝলকে অনেকগুলো ছবি ধাক্কা মারে ওকে ওর চলে যাওয়ার পর ঠিক কি কি হতে পারেমানেকে কি বলবেবাকে কি ভাববেভাববে কি আদৌ কেউমনে মনে এবার একটু থমকায় অরিজিৎ বেঁচে থেকে তো দেখল অ্যাদ্দিনকেউ ভাবেনা আজকাল কারুর জন্যই সময়ই নেই সে নিজেই তো ভাবে না অন্যকে কি বলবেশিশিটা যথাস্থানে রেখে আস্তে আস্তে বিছানায় এসে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে অরিজিৎ। ওপরের উঁচু সিলিঙের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ও অনেকগুলো ভাবনা একসাথে ঘিরে আসে ওকে জীবন মৃত্যু একাকীত্ব এভাবে ভাবেনি কখনও আগে সময়ই ছিল না আর এখনসময় অফুরন্ত আগে হলে এই পড়ে পাওয়া সময়ে কি করবে ভেবে পেত না ও আর এখন শুধু দুটি ভাবনা বেঁচে থেকে কষ্ট পাবেনামরে গিয়ে শান্তি!

হঠাৎ বাড়ির কথা মনে পড়ল ওর আচ্ছামা আর বাবা ঠিক কিভাবে নেবে ব্যাপারটামাকে কোনদিনই তার রাশভারী বাবার ছায়া ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি অরিজিতের তবে মা ভালোবাসে তাকে খুবই কাজেই কষ্টও পাবে বাবাও পাবে হয়তো হয়তো কেনপাবেই তবে একটা নিশ্চিন্দি যে খুব বেশিদিন এ দুঃখভোগ করতে হবে না ওদের কাউকেই আফটার অল্যাবার সময় তো নয় নয় করে ওদেরও হল

“ অত মনে নিস কেন রে দাদাছাড় নাএত উদ্ভুট্টি চিন্তা সারাক্ষণ করিস্ না তোসব ঠিক হয়ে যাবে!”, পুচকি বলেছিলতার কলকাতায় এসে কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে পরেই সেদিনও ফোনে একই রকম করে বললো মাছি তাড়ানোর মতো এক ফুঁয়ে সব দুশ্চিন্তা উড়িয়ে দিল যেন একটা হাসির রেখা ফোটে অরিজিতের মুখে এবার সত্যিপুচকিটা পুচকিই রয়ে গেল সব ঠিক হয়ে যাবেসেই ছোট্টবেলার মতোই কোনকিছুতেই বিশেষ কোনও হেলদোল নেই তবে মোটেই বোকা নয় কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান আছে যথেষ্ট বাবার মতো ওও পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতেই ঢুকেছে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষিকা হ্যাঁঅঙ্ক ওটা তারা দুজনেই খুব ভাল পারতো ছোটবেলা থেকেই বাবার মতো একটা কৌতুকদীর্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেললো অরিজিৎ আর পাঁচটা গড়পড়তা ভেড়ার মতো সেও আসলে অঙ্ক কষার আড়ালে পাতার পর পাতা জুড়ে হিজিবিজিই কেটেছে বছরের পর বছর। আজ বুঝতে পারছে যে আদতে সাবজেক্টটা থেকে কিছুই শেখেনি সেজীবনের অঙ্কটাই মেলাতে পারছে না!

ছোট্ট লম্বাটে ধরনের সাদা রঙের শিশিটার দিকে আবার তাকায় অরিজিৎ একদৃষ্টেচোখ কুঁচকে খুব মন দিয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সাবধানে হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে তুলে নিয়ে কৌটোটার গায়ে লেখা কুটি কুটি অক্ষরগুলো পড়ার চেষ্টা করে কি সব খটোমটো কেমিক্যালের নাম। উচ্চারণ করতেই অসুবিধা হয় ওর একটারও মানেও বোঝে না সে। থেকে থেকে শুধু একটা জিনিসই মাথায় চক্কর দিতে থাকে ওর ক’টা খাবে আজ?

হঠাৎই একটা কথা ভেবে থমকে যায় ও আচ্ছা তার চলে যাওয়াটা পুচকি ঠিক কিভাবে নেবেধড়মড় করে বিছানায় উঠে সোজা হয়ে বসে ও। তাই তোপুচকিকে এতক্ষণ ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনি অরিজিৎ

“ আমাকেও একবার বলতে পারলো না ও?”, আজ থেকে কত বছর আগে শোনা সেই বুকফাটা আক্ষেপটা স্পষ্ট মনে পড়ে যায় তার হঠাৎই সম্পর্কে অরিজিতের পিসতুতো দিদি হত বুলবুলি তিন ভাইবোন বুলবুলি আর টুলটুলি দুই যমজ বোন আর শেখরদা পরীক্ষায় পাশ করতে পারেনি বলে খুব ভেঙে পড়েছিল সেবার বুলবুলিদি নিজের যমজ বোন ওর সামনে দিয়ে প্রতিদিন কলেজে যেত সহ্য করতে পারতো না বুলবুলিদি হায়ার সেকেন্ডারিতে ইংরাজীতে ব্যাক পেয়েছিল আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগেকার কথা ডিপ্রেশন বলে কোনও রোগের অস্তিত্বই ছিল না তখন কেউ কখনও বুঝতেই পারেনি কি চলছিল বুলবুলিদির মনের ভেতরটায় তারপর এক গরমকালের দুপুরে বাড়ির সবার অনুপস্থিতিতে একতলায় নিজের ঘরে গলায় দড়ি দেয় বুলবুলিদি শোক ভুলতে টুলটুলিদির বহুদিন লেগেছিল মাঝেমাঝেই স্বপ্নে দেখতে পেত বোনকে আর আক্ষেপ করতো এখন আর বাহ্যিক শোকটুকু নেই কিন্তু কষ্টটা রয়েই গেছে মনের গহীনে সবার চোখের আড়ালে আজও তা নিজের নিয়মে বয়েই চলেছে কুল কুল করে। ও ব্যাথা আর এ জীবনে যাওয়ার নয়টুলটুলিদি নিজেই বলে কিন্তু সাথে সাথে নিজে বুঝতে পারেনি এই আক্ষেপ যেমন আছেকেন বোন বলতে পারেনি সেই অভিযোগও কিন্তু কম নেই সেদিনও অরিজিৎ এ বিষয়ে টুলটুলিদির সাথে একমতই হয়েছিল একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস পড়ে তার সত্যিএই হল মুশকিলঅন্যের ব্যাপারে যত সহজে জ্ঞান দেওয়া যায়নিজের ক্ষেত্রে তা মেনে চলাই দায় বুলবুলিদির কষ্টটা আজ সত্যিই নিজের জীবন দিয়ে বুঝতে পারছে সে কেন বলতে পারেনি বুলবুলিদি তা আজ আর জানতে বাকি নেই তার নিজের মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বোবা কষ্টনিজের মন কারুর কাছে হাট করে খোলা আসলে যে ঠিক কতটা কঠিন আজ নিজের জীবন দিয়ে বুঝতে পারছে অরিজিৎ কেন এমন হলকবে এমন হল জানেনা সে কিন্তু আশ্চর্য ভাবে তবুও এই দুর্বলতাটার কাছে হেরে যাবে কিনা এটাই এই মুহূর্তে হঠাৎ করে খুব জরুরি মনে হতে লাগল তার কাছে একটা খুব গা জ্বালানি শব্দ মনে পড়ে গেল তার হ্যাঁতখন ওটাই বলেছিল সবাই বুলবুলিদিকে হেরোবেঁচে থেকেও হেরো মরে গিয়েও হেরো তখন বরং আরও নিশ্চিত ভাবেই হেরো বেঁচে থাকলে অন্তত কিছু সুযোগ পেলেও পেতে পারতো বুলবুলিদি ওই বিচ্ছিরি তকমাটা কখনও বদলানোর। মরে গিয়ে সেই দরজাটাও বন্ধ হয়ে গেল চিরকালের জন্য

ভেতরে ভেতরে এবার কিরকম একটা যেন চিনচিনে অস্বস্তি হতে শুরু করেছে অরিজিতের এই হেরো শব্দটা ঠিক পছন্দ হচ্ছে না তার কিছুতেই খুব গায়ে লাগছে পুচকির কষ্টের মতো এই তকমাটাও তাকে হঠাৎ করে ধাক্কা দিচ্ছে খুব সত্যি বলতে কিসময় তো কেটেই যায় হয়তো আর মাত্র একটি বছর কাটিয়ে দিলেই বুলবুলিদি তার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে যেত আর সে মাত্র কয়েকটা মাসেই এত অধৈর্য হয়ে গেলযত অন্ধকারই হোকরাত কেটে ভোর তো একসময় হয়ই

একটা ম্লান হাসি ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে ওর নাঃএই যুদ্ধটা থেকে মুক্তি নেই তার এত সহজে শিশিটা থেকে একটা বড়ি খুব সাবধানে বের করে অরিজিৎ আর তারপরপাশের টেবিলে রাখা জলের গ্লাসটার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত