Site icon ইরাবতী

ধারাবাহিক: দি স্টোরিজ অব জ্যাকসন হাইটস (পর্ব-১) । আদনান সৈয়দ

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,জ্যাকসন হাইটস
Reading Time: 4 minutes

নিউইয়র্ক জ্যাকসন হাইটস এর বাঙালিদের জীবন, তাদের স্বপ্ন, তাদের ত্যাগ, তাদের মন, মনন, প্রেম, ভালোবাসা আর বুক চাপা কান্নার গল্প । সব মিলিয়ে এই ধারাবাহিক লেখায় উঠে আসবে নিউইয়র্কের বাঙালির গল্পগাথা। আজ ইরাবতীর পাঠকদের জন্য থাকছে পর্ব-১।


   

গল্পটা তবে শুরু হোক

আমি এখন যে শহরের বুকে দাড়িয়ে আছি এই শহরের নাম জ্যাকসন হাইটস। নিউইয়র্কে বসবাসরত বাঙালিদের শহর। এখানে এলে আপনি বাংলাদেশকে খুঁজে পাবেন, বাংলাকে খুঁজে পাবেন, বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গেও আপনার অনেক পরিচয় ঘটবে।

ঠিক এই শহরের বুকেই বহু শত বছর আগে এক হৃদয় বিদারক ঘটনাটি ঘটেছিল। সেই ঘটনা নিয়ে বাতাসে নানা রকম জনশ্রুতি এখনো ভেসে বেড়ায়। কেউ বলেন অসম প্রেমের কারণে রিচার্ডকে আগুনে পুড়িয়ে, জ্যাকসন হাইটস এর ৭৫তম সড়কে ভুট্টা খেতের পাশেই হাত পা বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আবার কেউ বলেন, রিচার্ড নামের কালো নিগ্রো দাস এক শ্বেতাঙ্গ নারীকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়ার কারণেই তাকে গুম করা হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল নিউইয়র্কের  জ্যাকসন হাইটস শহরের পাশেই ওডসাইডে। সময়টা ১৯০৯ সালে শহরটির গোড়াপত্তনের গোড়ার দিকেই। তারপর জ্যাকসন হাইটস এর পাশেই রোড সাইডের ঘন জঙ্গলে মেপল গাছের সঙ্গে বেঁধে রিচার্ডকে উপর করে ঝুলিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে মারা হয়েছিল। কথা হল রিচার্ডকে নিয়েই বা এত কথা কেন? তাকে কেনই বা আমাদের মনে করতে হবে? আমেরিকার মাটিতে এমন শত শত ঘটনা ঘটেছে। রিচার্ডকে এখনো জ্যাকসন হাইটস এর কেউ কেউ মনে রেখেছে এর কারণ একটা আছে। সেটি হল প্রেম। যে কোন প্রেমের গল্প মানুষ মনে রাখে। জুলিয়াস সিজারকে মানুষ মনে রাখে, লাইলি মজুন বা ইউসুফ জুলেখাকেও মানুষ মনে রাখে। ঠিক তেমনি রিচার্ড নেন্সির কথাও মানুষ মনে রেখেছে।  আমি এই গল্পটি শুনেছিলাম নব্বই বছর বয়সি ক্রিস্টি ফস্টারের কাছ থেকে। ক্রিস্টির জন্ম এই শহরেই অর্থাৎ জ্যাকসন হাইটসে। কুইন্সের এস্টোরিয়া পার্কের এক কোনায় বসে আপন মনে সে উলের কাটা দিয়ে এটা-সেটা বানায়। আমিও তখন মাথা থেকে পা পর্যন্ত বেকার। পার্কের কালচে রং এর কাঠের একটা বেঞ্চ দখল করে দু পা সামনে মেলে ধরে উদাস হয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে আকাশ কুসুম ভাবি আর নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলি। সম্ভবত সেই সময়েই ক্রিস্টির সাথে আমার পরিচয়। গায়ের রং ফকফকে সাদা। মজবুত গড়ন। চামড়া কুচকে গেছে কিন্তু মনের চামড়া এখনো কুঁচকে যায়নি। ঠোটে লাল লিপস্টিক। একটা সময় এমন হল যে পার্কে গেলেই আমি আড় চোখে ক্রিস্টিকে খুজি। আবার ক্রিস্টিও ঠিক আমাকে খুঁজে বেড়ায়। তারপর হাসিমুখে হাতে বানানো পাম্পকিন কেক এর কৌটাটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে গল্প জমায়। কত শত গল্প! আমি আমার বাংলাদেশের গল্প বলি। আর ক্রিস্টি বলে তার ছেলেবেলার গল্প।  এস্টোরিয়া পার্কের গল্প, জ্যাকসন হাইটস এর গল্প, মানুষের গল্প, জন্তু—জানোয়ার আর ভূতের গল্পও।


আরো পড়ুন: অসমিয়া অনুবাদ গল্প: স্বপ্ন ভাঙ্গার পরে । মন্দিরা কলিতা


  এখন সময় বদলেছে। বলা যায় কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস এখন বাঙালির দখলে। এখন নিউইয়র্কের কুইন্স বরোর(জেলা) খুব গুরুত্বপূর্ণ শহর এই জ্যাকসন হাইটস। কত শত মানুষ, কত রঙের মানুষ এই শহরের বুকে হেঁটে বেড়ায়! তার কি কোন শেষ আছে? এই শহরের মানুষের বুকে আছে দুঃখ, আছে বুক চাপা কান্না আবার আনন্দও! শহরটির কী সুন্দর নাম, তাই না? জানেন, এই শহরের ইটের ভাজে ভাজে রয়েছে কত শত গল্প! বাঙালির রক্তমাংস দিয়ে তৈরি এই গল্প। সেই গল্প শুনলে হয়তো আপনার কান্না আসবে, মন খারাপ করবে, আবার হয়তো আপনার মনের কোন পরিবর্তনই হবে না। হয়তো আপনি ভাববেন, “জীবনতো এমনই!” তবে  এই সমাজের কিছু চিত্র যেমন আমাদের চেনা  আবার কিছু চিত্র খুবই অচেনা।

এই শহরের আকাশে স্বপ্নগুলো বাতাসে নরম পালকের মত ভেসে বেড়ায়। এখানে মায়ার সাথে মায়ার বন্ধন তৈরি হয়। এখানে ভালোবাসাগুলো কোথায় যেন লুকিয়ে থাকে। কখনো সেই ভালোবাসা দেখা যায় আবার কখনো মেঘের আড়ালে চাঁদের মত ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে। প্রতিদিন ভোরে এই শহরের মানুষের ঘুম ভাঙে। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষগুলো একটি গল্পের মতন জেগে উঠেন। তখন এই জ্যাকসন হাইটসের সরস মাটিতে অগণিত গল্পের ফুল ফুটতে শুরু করে। তখন কেউ কেউ কাব্য করে তাদের ডাক দেয়।  ”আমার ভীনদেশি তারা, একা রাতের আকাশে”। এই রাতের আকাশে তারাগুলো খুব নীরবে ফুটে। খুব একাকী হয়ে ফুটে। আবার কিছু তারা অভিমান বুকে বেঁধে আকাশে মিলিয়ে যায়। আমিও এই শহরের মানুষদের একজন। এই শহরের ধুলোমাটিতে আমিও নিত্য লুটোপুটি খাই।

সত্যি অদ্ভুত এক শহর এই জ্যাকসন হাইটস! মাঝে মাঝে মানুষগুলো দেখলে অচেনা মনে হয়। মনে হয় মানুষগুলো বুঝি অন্য গ্রহের মানুষ! তখন তাদের চেনা যায় না। কারণ তখন তাদের আত্মায় বাসা বাঁধে ভীনদেশি এক সংস্কৃতি। ভিনদেশি রং— ঢং, ভিনদেশি ঠাঁটবাট আর ভিনদেশি চোখ। মনে হয় ভিনদেশি এক বাতাস যেন তাদের ফুসফুস দখল করে বসে আছে। তারা তখন আর বাঙালি থাকে না। তারা হয়ে উঠেন আমেরিকার বাঙালি। আবার এঁদের কেউ কেউ খুব করে বাঙালি হতে চান। কেউ কেউ হঠাৎ হঠাৎ নিজের অস্তিত্বে বাঙালি রক্তের অস্তিত্ব আবিস্কার করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ততদিনে তাদের বাঙালি আত্মায় লাল সবুজের  রং এর উপর আমেরিকান নতুন রং এর প্রলেপ পরে। কি সেই নতুন রং?  সেই নতুন রং গায়ে মেখে লোকগুলো নতুন এক মানুষে পরিণত হয়।

 এই শহরের লতাপাতায় মিলমিশ হয়ে আমিও স্বপ্নখোর এক মানুষ। আমিও এখানে একটা যুতসঁই বাসা বেঁধেছি। এখানে আমি পাতার শব্দ শুনতে পাই, ঘাসের সাথে, ফুলের সাথে, ফড়িং এর সাথে, পাখির সাথে নিত্য কথা বলি। তারাও আমার ভাষা ঠিক বুঝতে পারে। এখানে রাস্তায় জমে থাকা ধুলোমাটিতে কান পাতলে বাঙালির পদশব্দ শোনা যায়। সেই শব্দে জমে আছে বাঙালির দীর্ঘশ্বাস। বিশ্বাস করেন, এখানের মাটির সোঁদা ঘ্রাণে আমি আমাকে আবিস্কার করি আবার সাত সমুদ্রের ওপারে ফেলে আসা বাংলাটাকেও আবিস্কার করি। আগে আমি এই শহরের অলিগলির বুকে হেঁটে বেড়িয়েছি। এখন এই  শহরটিই আমার বুকের ভেতর দিয়ে হেঁটে বেড়ায়।  এই শহর আমার শত্রু, আমার মিত্র আবার আমার সজ্জনও! এই আমার জ্যাকসন হাইটস। এই শহরের গল্প আমি আপনাকে শোনাবো  না তো কে শুনাবে? এই গল্পগুলো একান্তই আমার গল্প। আমার দেখা গল্প। আমার আপনার মত অস্থিমজ্জায় তৈরি কিছু মানুষের গল্প। আমাদের চারপাশে দেখা কিছু মানুষের গল্প। এই গল্পে আকাশ দেখা যায়, পাখির চোখের মত পরিষ্কার স্বচ্ছ নদীটাকেও দেখা যায়। আবার আবছা আয়নায় কিছু মানুষের ঝাপসা মুখগুলো দেখা যায়। দেখা যায় জীবনের নোনা জলের নানা রকম আকুলি বিকুলি কথা।

Exit mobile version