| 15 এপ্রিল 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অনুবাদ উপন্যাস: সুবালা (পর্ব-৩) । হোমেন বরগোহাঞি

প্রচ্ছদশিল্পী: শৌনক দত্ত
আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লখিমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোটো গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়। সুবালা লেখকের প্রথম উপন্যাস।


(৫)

        দিদি তখন পূর্ণ যুবতি, বিয়ে দিয়ে স্বামীগৃহে  পাঠানোর বয়স । দুই একজন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে মায়ের সঙ্গে কথাবার্তা ও চালিয়েছিল। বিধবা দুঃখিনীর  মেয়ে হলেও দিদির ছিল রূপের ঐশ্বর্য, সমগ্র গ্রামটিতে দিদির সঙ্গে রূপ নিয়ে তুলনা করার মতো কোনো মেয়ে ছিল না। মায়ের অন্তরে কী মতলব ছিল ভগবানই জানেন, এক কথায় তিনি বলে দিলেন‘নগদ এক হাজার টাকা হাতে না পেলে আমি আমার মেয়েকে কারও কাছে দেব না।’ দিদিকে যারা পুত্রবধূ  হিসেবে পেতে চেয়েছিল তারা মাকে জিজ্ঞেস করল‘টাকা নিয়ে মেয়েকে বিক্রি করতে চাইছ নাকি?’ বিক্রি বললেও আমার কোনো আপত্তি নেই— মা নির্বিকার ভাবে উত্তর দিল,এভাবে যদি কিছু টাকা জোগাড় করে না নিই, মেয়ে দুটিকে বিয়ে দেবার পরে বুড়ি বয়সে আমার কীভাবে চলবে? কে আমাকে কাজ করে খাওয়াবে?’

        নগদ এক হাজার টাকা হাতে হাতে দিয়ে দিদিকে বিয়ে করার জন্য কোনো মানুষ বাস্তবে এগিয়ে এল না। কিন্তু তার জন্য মাকে কোনো রকম চিন্তিত হতে দেখা গেল না । এক কথায় মানুষগুলিকে বিদায় দিয়ে মা পুনরায় জাল বুনতে লাগল। কিন্তু মায়ের মনের কথাটা স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরে জীবনে কোনোদিন না ভাবা একটা চিন্তা আমার মনে জায়গা করে নিল। তাইতো আমরা দুই মেয়ে বিয়ে হয়ে বেরিয়ে যাবার পরে মা কাকে নিয়ে থাকবে?জীবন্ত পুড়ে মরা ভাইটির ভয়ংকর স্মৃতি বুকে নিয়ে এই শ্মশানের মতো বাড়িটাতে আধ পাগলি মা একা একা কীভাবে দিন কাটাবে?বুড়ো বয়সে অচল হয়ে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকলেও তার জন্য এক ফোঁটা জল কে দেবে? অন্যদিকে, এই ভরা যৌবনে পরিপূর্ণ দেহ নিয়ে দিদি চিরকাল অবিবাহিত আইবুড়ো হয়ে কী দোষে পড়ে থাকবে? হে ভগবান কি দোষে দিদি এই ভয়ংকর অভিশাপের ভাগী হবে? দিন রাত আমি এই কথাগুলিই ভাবতে লাগলাম।ভবিষ্যতের সামগ্রিক রূপটা আমার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠল। নির্বাক হয়ে দিনরাত জাল বুনতে থাকা একজন আধ বয়স্ক পাগলি বুড়ি এবং দুটি অবিবাহিত আইবুড়ো মেয়ে, মাথার উপরে আকাশ দেখতে পাওয়ার মতো একটি কুঁড়েঘর, শ্মশানের মতো নির্জন নিস্তব্ধ অন্ধকার ,মাঝেমধ্যে সেই নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে যায় কেবল একটা জীবন্ত দগ্ধ বালকের উন্মাদ আর্তনাদে, তিনটি বুকের দীর্ঘশ্বাস এবং দীর্ঘশ্বাসে দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর এই একই জীবন আশাহীন আনন্দহীন ভবিষ্যৎহীন তারপরে একদিন নেমে আসবে মৃত্যুর অন্ধকার, এক এক করে তিনজনেই ঘুমিয়ে পড়বে মৃত্যুর কোলে। এই জীবন্ত সমাধির কল্পনায় আমার তালু থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে কল্পনায় সমগ্র ভবিষ্যৎটা যাপন করে উঠে আমি আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠলাম।

দিনরাত কয়েকদিন চিন্তা করার পরে আমি অবশেষে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম। মনে মনে সাহস জোগাড় করে আমি একদিন মাকে বললাম, মা অনেক বাড়িতে দেখছি ঘরজামাই রাখে। তুমিও তাই করছ না কেন?’

        আমার মুখে এরকম একটি প্রস্তাবের জন্য মা বোধহয় বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিলেন না। কিছুক্ষণের জন্য জাল বোনা বন্ধ রেখে একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপরে তিনি প্রশ্ন করলেন,’ ঘর জামাই? কার জন্য?’

        ‘দিদির জন্য, ‘আমি উত্তর দিলাম।

        ‘ দিদির জন্য ঘরজামাই এনে তারপর তোকেও দিদির সতিনী করে দিতে হবে ,তাই না?’ কথাটা বলেই, মা পুনরায় মাকোটা হাতে তুলে নিলেন।

        মায়ের কথার অর্থ আমি ভালোভাবেই বুঝতে পারলাম। কিন্তু কথাটা একবার যখন উত্থাপিত হয়েছে, আমি তার শেষ দেখে ছাড়ব বলে মনে মনে স্থির করলাম । আমি পুনরায় বলে উঠলাম তুমি ঠিকই বলেছ।দিদির জন্য ঘর জামাই রাখতে হবে না । তুমি তাকে বিয়ে দিয়ে বের করে দাও। আমি বিয়ে-শাদি করব না, আমি সব সময় তোমার সঙ্গে থাকব।’ 

        মা আমার  কথার কোনো উত্তর দিল না। শূন্য উদাস দৃষ্টিতে জাল বুনতে বুনতে তিনি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। আমার কথা যেন তার মনে কোনোরকম প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করতে পারল না। আমিও উঠে না গিয়ে তার ভাব লেশহীন মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এভাবে বোধহয় ঘন্টাখানেক পার হয়ে গেল। হঠাৎ একবার তিনি আমাকে চমকে দিয়ে ক্ৰোধিত  কন্ঠে চিৎকার করে উঠলেন— তোদেরকে আমি বিক্রি করে দেব বলেছি— বিক্রি করব।’


আরো পড়ুন: সুবালা (পর্ব-২) । হোমেন বরগোহাঞি


(৬)

          শুধুমাত্র জাল বুনলেই তো হবে না,তা বিক্রিও হতে হবে।পাগলের মতো কিছুদিন অবিরামভাবে জাল বুনে বুনে হঠাৎ একদিন মা আবিষ্কার করলেন যে জাল আর বিক্রি হচ্ছে না;দুই পয়সা লাভ হওয়া দূরের কথা—সুতোর খরচটাই উঠে আসছে না।একদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে আমি দেখলাম,হাড়ির নিচে আগুন জ্বালানো হয় নি।দিদির মুখ থেকে জানতে পারলাম ,ঘরে একমুঠো চালও নেই।ক্ষুধায় পেটের নাড়ি ভুড়ি ছিঁড়ে যাবার অবস্থা,বাড়িতে এসে এই অবস্থা দেখে আমার চোখের জল বেরিয়ে আসার উপক্রম হল।বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি নীরবে কাঁদতে লাগলাম।

        অনেকদিন পরে মা সেদিন জাল বোনা বন্ধ করে বারান্দায় স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।পুরো বিকেলবেলাটা তিনি এভাবেই বারান্দায় বসে রইলেন।আমি শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম,দুপুরটা তো অনাহারে পার হয়ে গেল,রাতটাও নিশ্চয় এভাবে পার করতে হবে।কাল যে খেতে পাব তার কি নিশ্চয়তা আছে?ভিক্ষা করা ছাড়া তো এক মুঠো চাল জোগাড় করার আর কোনো রাস্তা দেখতে পাচ্ছি না।ক্ষুধার জ্বালায় তিল তিল করে দগ্ধ হয়ে তিনটি প্রাণী নিরুপায় যন্ত্রণায় অসার হয়ে পড়ে রইলাম।

        বিকেলবেলায় মা আমাকে কোনোরকম আওয়াজ না দিয়ে হঠাৎ গ্রামের দিকে বেরিয়ে গেল।প্রদীপ জ্বালানোর জন্য বাড়িতে তেলও ছিল না।আগুন ধরে আসতেই দিদি আর আমি দুজনেই আগুনের পাশে বসে রইলাম।অনেকক্ষণ নীরবে বসে থাকার পরে দিদি হঠাৎ একবার কথা বলে উঠল,’সুবালা,তুই অর্জুন সিং পাঞ্জাবিকে চিনিস?’

‘নরেন কাকাদের বাড়িতে যে সবসময় আসা যাওয়া করে সেই চোখ কানা বুড়ো পাঞ্জাবিটা?তাকে চিনি তো।কেন জিজ্ঞেস করলি?—আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

        দিদি আবার চুপ করে রইল।আমি হতভম্ব হয়ে দিদির দিকে তাকিয়ে রইলাম।অন্ধকারে মুখটা ভালো করে দেখা যায় না,আগুনের লাল আলোতে গালের একটা দিক জ্বলজ্বল করছে।কিন্তু কিছু জিনিস আলোর চেয়ে অন্ধকারেই বেশি ভালো দেখা যায়।আমি হঠাৎ দিদির মুখে কোনোদিন না দেখা একটা আশ্চর্য রূপ দেখে চমকে উঠলাম।এই অবস্থায় সে যেন যে কোনো কাজ করতে পারে,যে কোনো কাজ,মানুষের সহজ কল্পনা স্পর্শ করতে না পারা যে কোনো কাজ;আমি আতঙ্কে প্রায় চিৎকার করে উঠলাম,’তোর কী হয়েছে দিদি?

        মরা মানুষ যদি কখনও হাসতে পারে ঠিক সেরকম একটি হাসি দিদির ঠোঁটে ঢেউ খেলে গেল।‘কিছুই হয় নি,তুই ভয় পাস না’—শান্তভাবে দিদি উত্তর দিল—‘আমাকে কেবল একটা কথার উত্তর দে,এক হাজার টাকা নিয়ে মা যদি তোকে অর্জুন সিং পাঞ্জাবিকে বিক্রি করে তুই কি করবি?’

        ‘কী বললি তুই?’আমি আর্তনাদ করে উঠলাম—‘কথাগুলি পরিষ্কার করে বলছিস না কেন দিদি?আমার খুব ভয় করছে।’

        অবিচলিতভাবে দিদি একই প্রশ্ন পুনরায় করল,এক হাজার টাকা নিয়ে মা যদি তোকে অর্জুন সিঙের কাছে বিক্রি করে দেয় তাহলে তুই কী করবি?’

        ‘আত্মহত্যা করব।ফাঁসিতে লটকাব,জলে ডুবে মরব,বিষ খেয়ে মরব,নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়ে পুড়ে মরব।’আত্মহত্যার যে কয়টি উপায় সেই মুহূর্তে মনে পড়ল এক নিঃশ্বাসে সবগুলি আমি জোরে জোরে চিৎকার করে বলে গেলাম,যাতে আমার আত্মহত্যার সঙ্কল্প বিষয়ে দিদির মনে কোনো সন্দেহ না থাকে।

        সেই একই অদ্ভুত হাসিমুখে দিদি বলে উঠল,–ভয় নেই,তোর আত্মহত্যা করার দরকার পড়বে না।কথাটা তোকে এমনিতে জিজ্ঞেস করে রাখলাম।’

        আমাদের কথাটা এতটুকু পর্যন্ত চলতেই মা হঠাৎ এসে উপস্থিত হল।তাঁর হাতে একটা পুঁটলি।পুঁটলিটা দিদির দিকে এগিয়ে দিয়ে মা হঠাৎ কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠল,’এটা ধর,ভাত রান্না কর।’

        দিদি পুঁটলিটার দিকে হাত না বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর ভাবে বলল,‘আমি ভাত রাঁধব না।তুমি নিজে রান্না করে খাও।’

        দিদির এরকম একটি উত্তরের জন্য মা বোধহয় বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না।মেলে দেওয়া হাতটা তখনই সরিয়ে এনে তিনি দ্বিগুণ কর্কশ কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,’ভাত রাঁধবি না?কেন?’

        ‘তুমি এই চাল ভিক্ষে করে এনেছ।আমি মরে যাব,তবু ভিক্ষের অন্ন খেতে পারব না।তুমি খেতে চাইলে নিজে রান্না করে খাও।’

        আমি ভালোভাবে বুঝে উঠার আগেই মা হঠাৎ চালের পুঁটলিটা সজোরে দিদির মুখে ছুঁড়ে মারল।পুঁটলিটা খুলে গিয়ে চালগুলি সারা ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।‘তুই আমাকে ভিখারী বললি? এত অহঙ্কার তোর? আজ তোর অহঙ্কার চূর্ণ করব।’রাগে পাগলের মতো হয়ে হিংস্রভাবে গালি দিতে দিতে মা উনুন থেকে একটা আধপোড়া খড়ি তুলে নিয়ে দিদির চোখে মুখে মারতে লাগল।দিদি কিন্তু বিন্দুমাত্র নড়াচড়া না করে নির্বিকারভাবে বসে রইল।আমি চট করে উঠে এসে মায়ের হাত থেকে খড়িটা ছাড়িয়ে আনার জন্য সজোরে টানাটানি করতে লাগলাম। আমি যত জোরে টানতে লাগলাম মায়ের জিদ ততটাই বেড়ে গেল।যুদ্ধ করতে করতে আমরা দুজনেই মাটিতে ছিটকে পড়লাম।এবার মা আমাকে চেপে ধরতে দেখে দিদি উঠে এসে মাকে টানতে লাগল।টানাটানির ফলে তিনজনেরই পরনের কাপড় ছিঁড়ে খসে প্রায় অর্ধ উলঙ্গ হয়ে পড়লাম।কারও মুখে কোনো কথা-বার্তা নেই,ফোঁস ফোঁস করতে থাকা তিনজনেই সেই অন্ধকারে কেউ লাগিয়ে দেওয়া পথের কুকুরের মতো হিংস্র মত্ততায় গড়িয়ে পড়ে যুদ্ধ করতে লাগলাম।

   


error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত