| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: রাক্ষসবাগান । কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 13 মিনিট

 

 

 

ঢং, ঢং, ঢং . . .

চার পিরিয়ডের ঘন্টা পড়ে গেল । তার মানেই টিফিন । ছোট্‌, ছোট্‌, ছোট্‌ । এক ছুট্টে স্কুলের গেটে । ওখানে শণবুড়ি বেতের ঝাঁকায় লোভনীয় সব খাবার নিয়ে বসে আছে । কাঁইদানা, আমের আচার, কামরাঙা । ওঃ, ভাবলেই জিভে জল এসে যায় ।

বুড়ির চুলগুলো একদম শণের দড়ির মতো । তাই আমরা ওর নাম দিয়েছি শণবুড়ি । রোজ টিফিন পিরিয়ডে সে আমাদের স্কুলের গেটে এসে বসবে আর ফোকলা দাঁতে হাসতে হাসতে জিনিষ বিক্রি করবে । সেইসঙ্গে মুখে তার কথার ফুলঝুরি ।

প্রথম প্রথম আমরা তো কী ভয়ই না পেতাম ! তারপর একদিন ক্লাসের বন্ধু সুপ্রতীপ যেদিন বুড়ির কাছে গল্প শোনার কথাটা বললো, সেদিন থেকে গল্প শোনার লোভে ভয়ডর সব চলে গেল, আর সেই লোভেই আমরা পায়ে পায়ে বুড়ির কাছে যেতে শুরু করলাম ।

তারপর ? আঃ, সে যে কী দারুণ দারুণ সব গল্প ! বাঘের গল্প, যুদ্ধের গল্প, ভূত-ভুতুনীর গল্প । আর ছিল রূপকথা । কী যে স্বপ্নময় সব রূপকথার গল্প শোনাতো শণবুড়ি । রাজপুত্র আর রাজকন্যা, পক্ষিরাজ ঘোড়া, দত্যিদানো । আমরা গল্প শুনতে শুনতে যেন সত্যিকারের সেই দেশে চলে যেতাম নিজের অজান্তেই ।

সেদিন কী কারণে যেন চার পিরিয়ডের পরেই ছুটি হয়ে গেল । আমাদের আর পায় কে ! আজ আর বুড়িকে ছাড়া নেই । জম্পেশ একটা গল্প শুনতে হবে । একে একে আমরা পাঁচ বন্ধু গিয়ে জড়ো হলাম স্কুলের গেটে । দেখি বুড়ি ঠিক বসে আছে তার ঝাঁকা নিয়ে । সব ক্লাশের ছেলেরা ভিড় করেছে তার চারপাশে । আমরাও ঘিরে ধরলাম বুড়িকে। বললাম, ‘ও শণবুড়ি, শণবুড়ি, আজ কিন্তু একটা মস্ত গল্প শোনাতে হবে আমাদের । দারুণ একটা গল্প ।’

আমাদের বায়না শুনে বুড়ির ফোকলা দাঁতে সে কী হাসি ! চোখদুটো তার চকচক করে উঠলো । বুড়ি বললো, ‘বেশ বাছা বেশ । আগে এই ক’টা জিনিষ বিক্‌কিরি করে নিই । তারপর তোদের গল্প শোনাবো, কেমন ?’ শুনে আমাদের কী আনন্দ ! লাফাতে লাফাতে চলে গেলাম স্কুলের সামনের বটগাছটার কাছে, যেখানে মোটা মোটা শিকড়গুলো আমাদের জন্য আসন পেতে রেখেছে ।

একটু পরেই বুড়ি তার ঝাঁকা মাথায় নিয়ে চলে এল আমাদের কাছে । সবার হাতে হাতে একটা করে কামরাঙা ধরিয়ে দিল । তারপর গাছতলায় জমিয়ে বসে বুড়ি বলতে শুরু করলো তার গল্প ।

 

 

 

সে এক অদ্ভুত দেশ । কত কত রাতের আঁধারপথ পাড়ি দিয়ে, কত মস্ত মস্ত পাহাড় আর গর্জে ওঠা নদী পেরিয়ে সেখানে পৌঁছতে হয় । যেতে যেতে সঙ্গের খাবার যায় ফুরিয়ে, বনের জন্তুরা ভয় দেখায়, চোর-ডাকাতের দল লুকিয়ে থাকে ঝোপেঝাড়ে, প্রতি মুহুর্তে প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে যেতে হয় সেই দেশে । পৃথিবীর একেবারে পশ্চিমদিকে এক বিশাল উঁচু পাহাড়ের ওপর সেই রাজ্য, যার নাম উধাওপুর ।

কে যে সে রাজ্যের রাজা, তা কেউ জানে না । কোথায় বসে সে রাজত্ব চালায়, তাও কারুর জানা নেই । শুধু সবাই জানে, সে এক রহস্যে ভরা রাজ্য । আর এই রহস্যময় রাজ্যের ভেতরেই সেই অদ্ভুত বাগান — রাক্ষসবাগান । যেখানে সূর্যের আলো ঢুকতে ভয় পায়, গাঢ় আঁধারের লুকোচুরি খেলা আর গা-ছমছমে হাওয়ার মধ্যে সেই বাগানে কী হয় ? সেখানে রাক্ষসের চাষ হয় !

রাক্ষসের চাষ !!

হ্যাঁ, রাক্ষসের চাষ । মস্ত মস্ত বিদ্‌ঘুটে সব গাছের থেকে জন্মায় ভয়ংকর সব রাক্ষস, যারা রাত্রি গভীর হলেই বেরিয়ে পড়ে সেই রাজ্য ছেড়ে, আর দিকদিগন্তে ঘুরে ঘুরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ধরে আনে খাবার জন্যে । যখন রাত শেষ হয়ে পূর্বদিগন্তে ফুটে ওঠে ভোরের আলো, তার আগেই তারা আবার সেই বাগানে ফিরে এসে গাছের সঙ্গে মিশে যায় । তাদের কথা আর কেউ জানতে পারে না । এমনকি সেইসব হারিয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েদের বাবা-মায়েরাও না ।

কিন্তু সত্যিই কি তাই ? কেউই কি সে কথা জানে না ? পৃথিবীর কেউ না ?

একজন । গোটা পৃথিবীতে মাত্র একজন সে কথা জানত । তার নাম শেকড়বুড়ো ।

উধাওপুর রাজ্যটা যে বিশাল পাহাড়ের মাথায়, তারই নিচে গভীর ঘন জঙ্গলে তার বাস । একটা বহু প্রাচীন বটগাছ, যার বয়েস কারও জানা নেই, সেই বটগাছের শেকড়ে সে মিশে থাকে শেকড় হয়ে, আর মাটির তলা দিয়ে ঘুরে বেড়ায় সারা পৃথিবী ; সেইসঙ্গে খবর নিয়ে বেড়ায় গোটা দুনিয়ার ।

এখন হয়েছে কী, ঐ উধাওপুর রাজ্য থেকে বহু—উ-উ-দূরে, প্রায় একমাসের পথ পাড়ি দিলে একটা ছোট্ট গ্রাম, নাম তার বাসন্তী । মস্ত মস্ত উঁচু আর ঘন পাতাওলা গাছ দিয়ে ঘেরা সেই গ্রাম, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কাঁকন নদীটিতে টলটল করে কাচের মতো স্বচ্ছ জল । বসন্তকালে সে গ্রামের চারিদিকে কানায় কানায় ফুটে ওঠে স্বর্গীয় রূপ, গাছগুলো ভরে যায় রঙবেরঙের ফুলে, আর নাম-না-জানা কত পাখি এসে সেইসব গাছে বসে মনের সুখে গান গায়, তাই সে গ্রামের নাম বাসন্তী ।

কিন্তু অমন নিরিবিলি গ্রামটিতেও একদিন নেমে এল অশান্তির ঝড় ।

সেদিন ভোর থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি । মেঘলা আকাশের আড়ালে সুয্যিমামা লুকিয়ে পড়েছে চোরপুলিশ খেলার মতো । হঠাৎ গ্রামের উত্তরে শিমূলতলার দিক থেকে শোনা গেল বুকফাটা একটা কান্নার আওয়াজ । কার কান্না ? এই সাতসকালে কে অমন বুকফাটা স্বরে কাঁদে ?

হৈ হৈ করে ছুটে গেল গ্রামের ছেলেবুড়োর দল । গ্রামের একপ্রান্তে কয়েকটা শিমূলগাছকে ঘিরে ছোট্ট কতকগুলো মাটির বাড়ি । তারই মাঝে একটা দোচালা ঘর থেকে ভেসে আসছে বুকফাটা হাহাকার । বৃষ্টির জলের শব্দের সঙ্গে সেই আওয়াজ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে । সবাই চমকে ওঠে । এ তো পরাণ মুদীর ঘর ! তবে ? ওর আবার কী বিপদ হল ?

সকলের হাঁকডাকে পরাণ চোখ মুছতে মুছতে বাইরে বেরিয়ে আসে । তারপর ওর মুখেই শোনা যায় সব কথা । গতকাল রাতে পরাণ আর তার বউ রোজকার মতোই তাদের পাঁচ বছরের বাচ্চাটাকে মাঝে রেখে ঘুমিয়ে ছিল দোর বন্ধ করে । কিন্তু আজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে তারা দেখে, বিছানার দুপাশে তারা দুজন ঘুমিয়ে আছে, দোরও যেমন কে তেমন বন্ধ, কিন্তু তাদের মাঝখানে ছেলেটা নেই ! পরাণের বউ তো হাঁউমাউ করে উঠে চারিদিকে খুঁজতে শুরু করে, সেই সঙ্গে পরাণও । কিন্তু ঘরের ভেতর-বাইরে আঁতিপাতি করে খুঁজেও ছেলের খোঁজ আর পাওয়া যায় না । এমনকি আশেপাশের বাড়িগুলোর কোনটাতেই তাদের ছেলে নেই !

সব শুনে তো গ্রামের সবাই হতবাক । এ আবার কী কথা ? বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে ছেলে উধাও ! এ তো বড়োসড়ো ছেলে নয় যে, নিজে নিজেই কোথাও চলে যাবে । তাহলে ?

এই ‘তাহলে’-র উত্তর পাবার জন্য অপেক্ষা করতে হল প্রায় সন্ধে পর্যন্ত । গ্রামের বুড়ো গণৎকার শিবাই ঠাকুর সেই দুপুর থেকে আঁক কষে কষে সন্ধের মুখে ঘোষণা করলেন, গাঁয়ের পশ্চিম দিক থেকে একটা খারাপ হাওয়া এসে এই কান্ড ঘটিয়েছে । কিন্তু সেটা যে ঠিক কী, তা সঠিকভাবে বলতে পারলেন না ।

পরাণ মুদীর বউ কতবার কাতরস্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘বলো না ঠাকুর, আমার ছেলের খবর কী ? সে বেঁচে আছে তো ?’

কিন্তু বুড়ো শিবাইয়ের সেই এক কথা, ‘সেটা তো ঠিক বুঝতে পারছি নে গো । শুধু বলতে পারি, তোমার ছেলেকে পশ্চিমদিকেই নিয়ে চলে গেছে । এখান থেকে অনেক, অনে-ক দূরে । এ বড়ো ভয়ংকর অপদেবতার কারসাজি গো ! ওই পশ্চিমে গিয়ে খোঁজ করা ছাড়া আর উপায় নাই ।’

উপায় তো নেই । কিন্তু যাবে কে ? কোথায় যেতে হবে, কতদূরে, তারই যখন কোন ঠিকঠিকানা নেই ! তাই পরাণ আর তার বউ চোখ মুছতে মুছতে তাদের নিজেদের ঘরে ফিরে গেল, আর তারপর বুকে পাথর চাপা দিয়ে দিন গুণতে লাগল, কে জানে কিসের আশায় !

কিন্তু সেই হল শুরু । তারপর কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামের আরও কয়েকটি ঘর থেকে শোনা গেল সেই একই খবর । মাঝরাতে সকলের অজান্তে বন্ধ ঘর থেকে উধাও হয়ে যেতে লাগল শিশুরা ।

এই ভয়ঙ্কর সংবাদে গোটা গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল এক অজানা আতঙ্ক । প্রত্যেকটা রাত যেন নেমে আসতে লাগল ভয়ের মুখোশ পরে । কখন কার ঘর থেকে ছেলে চুরি যাবে, তার কোন ঠিক নেই । কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, সবাই মিলে এত সতর্ক থাকা সত্ত্বেও কোন্‌ এক জাদুমন্ত্রবলে যেন বাবা-মায়ের কোল ফাঁকা করে কেবলই উধাও হয়ে যেতে লাগল শিশুর পর শিশু ।

এমনি করে কেটে যায় কয়েক মাস । বাসন্তী গ্রামের হাটখোলার পাশে যে মস্ত দাওয়াওলা আর কঞ্চির বেড়া দিয়ে ঘেরা ছোট বাড়িটা আছে, সেই বাড়ির টুকান নামের ছেলেটা তখন বেশ বড় হয়েছে । নয় নয় করে চোদ্দ বছর বয়েস হল তার । একদিকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, অন্যদিকে শক্তপোক্ত শরীরে যেন হাতির বল ।

ছোটবেলাতেই তার বাবা মারা গিয়েছিল এক দুরারোগ্য অসুখে । আর দু বছর আগে তার মা-ও চলে গেল তাকে একলা ফেলে রেখে । তখন থেকেই সে তার এই মাসীর বাড়িতে থাকে । তাকে দেখার তো কেউ নেই, তাই মাঠেঘাটে ঘুরে তার সময় কাটে । কাজেই একদিন সে-ও যখন গ্রামের অন্য বাচ্চাদের মতোই হঠাৎ উধাও হয়ে গেল, তখন কেউই বিশেষ মাথা ঘামাল না, শুধু তার মাসী সকলকে লুকিয়ে গোপনে চোখের জল ফেলতে লাগল । কেউ একবার ভেবেও দেখল না যে, আগে যত বাচ্চা হারিয়ে গেছে, তাদের সকলের বয়েস ছিল তিন থেকে সাত বছরের মধ্যে । তাহলে এই চোদ্দ বছরের টুকান কেন উধাও হল ? কোথায় গেল সে ?

না । টুকান অন্যদের মতো হারিয়ে যায়নি । তাকে দেখতে পাওয়া গেল পশ্চিমদিকের রাস্তায় । সেই যেখানে প্রান্তরের শেষে এক গভীর ঘন জঙ্গল, ভয়-দেখানো ছায়া বিস্তার করে রেখেছে চারিপাশে । সেই বনে হেঁটে চলেছে টুকান । পিঠে ঝোলানো এক পোঁটলায় একটা গামছা, দুটি শুকনো চালভাজা আর সবসময়ের সঙ্গী তার প্রিয় গুলতিটা । আর কিচ্ছুটি নেই তার সঙ্গে ।

জঙ্গলের ভেতরটা শুনশান, নিস্তব্ধ । বড় বড় গাছের আড়ালে যেন রাজ্যের জীবজন্তু লুকিয়ে রয়েছে । এই গা-ছমছমে পরিবেশে অতি বড়ো সাহসীরও বুক কেঁপে উঠবে ভয়ে । কিন্তু টুকান নির্বিকার । ভয়ডর বলে কিছু নেই তার । সে শুধু জানে, সেই অচিন রহস্যের সন্ধান তাকে করতেই হবে । খুঁজে বার করতেই হবে সেই অপদেবতার রহস্য ।

গ্রামের যেসব শিশুরা একের পর এক হারিয়ে গেছে, টুকানের কাছে তারা ছিল নয়নের মণি । গ্রামের চারিদিকে ঘুরে ঘুরে তাদের সঙ্গেই দিনরাত খেলে বেড়াত টুকান । সেইসব ভাইবোনেরা একের পর এক উধাও হয়ে যেতে টুকান তাই স্থির থাকতে পারেনি । সকলকে লুকিয়ে শিবাই ঠাকুরকে ধরে পড়েছিল ও । আর তখন শিবাই ঠাকুর ওর হাত দেখে বলেছেন, একমাত্র ও-ই পারবে সেই অপদেবতার অভিশাপকে কাটান দিতে । তাই কাউকে না জানিয়ে টুকান একলাই বেরিয়ে পড়েছে অজানার পথে ।

দেখতে দেখতে সন্ধে হয়ে এল । ক্রমশ অদ্ভুত আর শিহরণ জাগানো সব শব্দ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো বনের ভেতর । আর হাঁটা যাবে না । এবার কোন উঁচু গাছে উঠে আজ রাতটার মতো আশ্রয় নিতে হবে ।

একটু আগে একটা পিয়ারা গাছ থেকে ক’টা পিয়ারা পেড়ে নিয়েছিল টুকান । ওই পিয়ারা আর চালভাজা খেয়ে রাতটা কাটিয়ে দেওয়া যাবে । দেখেশুনে বেশ উঁচু আর শক্তপোক্ত একটা গাছের মাথায় উঠে দুটো ডালের মাঝখানে আরাম করে শরীরটাকে ছড়িয়ে দিল টুকান । আঃ ! কী শান্তি !

 

          #                 #                 #                 #                 #

 

ভালো করে ভোরের আলো তখন ফোটেনি, সবে কয়েকটা পাখি কিচিরমিচির শুরু করেছে, এমন সময় কেমন একটা অস্বস্তিতে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল টুকানের । ধড়মড়িয়ে উঠে বসে চোখ কচলে তাকিয়ে দেখে, গাছের তলায় একটা অদ্ভুত লোক দাঁড়িয়ে । ছোট্টখাট্টো চেহারা, মুখময় দাড়িগোঁফ । পরণে একটা খাটো ধুতি । আর তার মাথাভরা বিশাল চুল পিছনপানে এলিয়ে গিয়ে যেন মিশে আছে সামনের ওই বটগাছটার শেকড়ের সঙ্গে । এই অদ্ভুত লোকটা কোথা থেকে এল ?

ভাবতে ভাবতেই টুকান দেখে, লোকটা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে । নেমে আসতে বলছে গাছ থেকে । ভাল করে চারপাশটা দেখে নিয়ে সাবধানে গাছ থেকে নেমে এল টুকান ।

অমনি লোকটা কেমন সরু গলায় প্রশ্ন করে টুকানকে, ‘কী হে ? পশ্চিমের হাওয়ার খোঁজে বুঝি ?’

ভীষণ অবাক হয়ে যায় টুকান । কেউ যে কথা জানে না, এই উড়ে এসে জুড়ে বসা লোকটা কেমন করে সে কথা জানল ? সে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কী করে জানলে ? কে তুমি ?’

লোকটা মাথা নেড়ে নেড়ে বলে, ‘হুঁ হুঁ বাবা । জানা-ই তো আমার কাজ । এই যেমন আমি আরও জানি যে —

বয়েস তোমার চোদ্দ, টুকান তোমার নাম ;

ঘর তোমাদের নিরিবিলি বাসন্তী গ্রাম ।

যাচ্ছো তুমি নিরুদ্দেশ, যাচ্ছো অনেক দূর,

কিন্তু শেষে যেতে হবে সেই উধাওপুর ।’

এবার টুকান সত্যি হাঁ হয়ে যায় । এ তো সবই জানে দেখছি । কিন্তু, শেষকালে কী বললো লোকটা ? উধাওপুর ? টুকানকে সেখানেই যেতে হবে ? এর মানে কী ?

সেটাই ও এবার জিজ্ঞেস করে লোকটাকে । আর তার উত্তরে লোকটা কেমন একটা রহস্যময় হাসি হেসে টুকানের হাতটা ধরে ধুপ্‌ করে বসিয়ে দেয় গাছতলায় । তারপর নিজেও বসে পড়ে ওর পাশে । টুকান প্রথমে তো কিছুই বুঝতে পারে না । তারপর ধীরে ধীরে লোকটা সবকিছু খুলে বলে তাকে, আর তখন টুকানের কাছে সবকিছু ক্রমশ একটু একটু করে পরিষ্কার হতে থাকে ।

লোকটার নাম নাকি শেকড়বুড়ো । ও মাটির তলা দিয়ে দিয়ে গাছের শেকড়ের সঙ্গে মিশে নাকি ঘুরে বেড়ায় চারিদিকে । তাই পৃথিবীর কোথায় কখন কী ঘটছে, সবকিছু সে জানতে পারে চোখের নিমেষে । আর তেমন করেই ও জানে টুকানদের বাসন্তী গ্রামের ছেলেধরাদের আসল সত্যি কথা ।

কী কথা ? কী কথা ? টুকানের প্রবল আগ্রহ দেখে বুড়ো চোখ কুঁচকে হাসে । তারপর হঠাৎ তার তর্জনীটা তুলে ঠোঁটে চাপা দেয় । বুড়োর রকমসকম দেখে টুকান থ । এবার বুড়ো ফিসফিসিয়ে বলে —

‘সেই কথাটা গোপন কথা, সেই কথাটা গূঢ়,

                    এই দুনিয়ায় সেটা কেবল জানে শেকড়বুড়ো ।

                    এখান থেকে আড়াইশো ক্রোশ পশ্চিমে সেই পাহাড়,

                   দক্ষিণে তার বাগানভরা ফুলের সে কি বাহার ;

                   কিন্তু সেটাই মরণবাগান, রাক্ষসেরই চাষ,

                   তারাই হল ছেলেধরা, খবর দিলাম খাস ।’

টুকান হাঁ করে শুনছে । ওর মুখে কোন কথা নেই । চোখদুটো স্থির । আর ওর মনটা চলে গেছে সেই পশ্চিমের পাহাড়ে রাক্ষসবাগানে । সেই বাগানের মায়াবী রাক্ষসগুলোকে যতক্ষণ না ও ঢিট করতে পারছে, ততক্ষণ ওর শান্তি নেই ।

শেকড়বুড়ো টুকানের মুখ দেখে বোধহয় ওর মনের কথা বুঝতে পারল । তাই এবার সে বলল, ‘কী হে ? কী ভাবছো ? ঐ রাক্ষসবাগানে এক্ষুণি পৌঁছে গেলে ভাল হয়, তাই তো ? কিন্তু সে তো বাপু তোমার কম্মো নয় ।’ এই বলে বুড়ো আবার তার চোখদুটো আধবোজা করে হাসতে থাকে ।

এবার টুকানের রাগ ধরে যায় । টুকানকে কী ভেবেছে কী বুড়োটা ? সে বলে, ‘কে বলল আমার কম্মো নয় ? কী ভাবো তুমি আমায় ? মাত্র আড়াইশো ক্রোশ তো দূর । ও আমি সাত দিনেই চলে যাব । আর একবার পৌঁছে যাই ওখানে, তারপর দেখবে ঠিক বুদ্ধি বার করে ফেলবো রাক্ষসগুলোকে মারার ।’

বুড়ো ঠিক সেই একইরকম হেসে বলে, ‘তাই নাকি ? সাত দিনেই চলে যাবে ? আর মাঝখানে ওই উথালপাথাল নদীটা, যেখানে সাতের জায়গায় সাতশো কুমীর সাঁতরে বেড়াচ্ছে ? আর সেই দুর্গম কর্কটবন, যা বাঘ-সিংহ-হায়েনা আর ভয়ঙ্কর ময়াল সাপের রাজত্ব ? কিংবা দুর্ধর্ষ ডাকাতের আস্তানা সেই হল্লাপাহাড়, যার ত্রিসীমানায় একবার ঢুকে পড়লে প্রাণ নিয়ে বেরোনো শক্ত হয়ে পড়ে ?’

কথাগুলো যতই শুনছিল, ততই টুকানের মনে একটু একটু করে ভয়ের কাঁপুনি জাগছিল বটে, কিন্তু তার পাশাপাশি আরও কঠিন সংকল্পে দৃঢ় হচ্ছিল বুকের ভেতরটা । তাই বুড়োর কথা শেষ হতেই সে বলে, ‘বেশ । তাই যদি হয়, তবুও যেতে আমায় হবেই । যত বিপদই থাকুক, সব কিছুর মুখোমুখি আমায় হতেই হবে । সমস্ত বাধা কাটিয়ে আমায় পৌঁছতেই হবে সেই উধাওপুরে । পৃথিবীতে এমন কোন শক্তি নেই যা আমাকে বাধা দিতে পারে ।’

এবার বুড়ো থমকে যায় । কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে টুকানের মুখের দিকে । তারপর আস্তে আস্তে কেমন একটা অদ্ভুত হাসিতে ভরে যায় তার মুখ । সে বলে, ‘বাঃ ! এই তো চাই । এই তো বীরের মতো কথা । তবে শোনো । 

                   বিপদ দেখে ভয় পেয়ো না, বিপদ পায়ের ধূলি ;

                   বুদ্ধি দিয়ে, সাহস দিয়ে ভরো পিঠের ঝুলি ।

                   দত্যি-দানো অক্কা পাবে, নাও শিখে সে’ বুলি —

                   সঙ্গে রাখো মন্ত্রপূত গোলমরিচের গুলি ।’

এই বলে ধাঁ করে কোঁচড়ের কোন্‌ ভেতর থেকে কটা গোলমরিচ বের করে এনে সে মেলে ধরে টুকানের সামনে । তারপর বলে, ‘নাও, এগুলো তোমার পোঁটলায় পুরে নাও । তারপর এসো, তোমার কানে কানে মন্তরটা বলে দিই । গোলমরিচগুলো হল একেকটা মরণবাণ । দুনিয়ার কোনও রাক্ষস খোক্কস দত্যি দানো এর সামনে দাঁড়াতে পারে না । একটা করে হাতে নেবে আর মন্তরটা আওড়াবে, ব্যস্‌ ।’

এতক্ষণ হাঁ করে টুকান শুনছিল বুড়োর কথা । এবার বোকার মতো প্রশ্ন করে, ‘কী হবে তাতে ?’

আবার সেই আধবোজা চোখে হাসতে হাসতে বুড়ো বলে, ‘হুঁ হুঁ । সে তখনই দেখতে পাবে কী হয় না হয় । এখন এসো দিকি, চট্‌ করে মন্তরটা তোমায় শিখিয়ে দিয়ে যাই । আমার আবার দেরী হয়ে যাচ্ছে । এক্ষুণি ছুটতে হবে প্রচন্ডপুরে । ওখানে সেনাপতির ছেলের আবার ধর্মকর্মে মতি । সে কিছুতেই অস্ত্র ছুঁতে চায় না । তার জন্যে আবার কালমনসার শিকড় নিয়ে যেতে হবে । কাজ কি কম ? এসো এসো, চটপট এসো ।’

টুকান আরও একটু এগিয়ে এসে কানটা বাগিয়ে ধরে বুড়োর মুখের সামনে, আর বুড়ো ফিসফিস করে গুপ্তমন্ত্রটা বলতে থাকে টুকানের কানে কানে ।

 

          #                 #                 #                 #                 #

 

প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছে । সূর্য ঢলে পড়েছে উধাওপুর রাজ্যের পাহাড়ের পেছনে । গা ছমছমে একটা অন্ধকার এখন নেমে আসছে রাজ্য জুড়ে । টুকান দ্রুতপায়ে এগিয়ে চলেছে রাজ্যের দক্ষিণ প্রান্তে, সেই ভয়ংকর রাক্ষসবাগানের দিকে । অন্ধকারের ছায়া ঘন হয়ে উঠবার আগেই তাকে বাগানের সামনে গিয়ে পৌঁছতে হবে, না হলেই ভয়ংকর বিপদ । হয়তো টুকানের প্রাণ নিয়েই টানাটানি পড়ে যাবে ।

কিন্তু টুকান উধাওপুরে এল কী করে ? হুঁ হুঁ বাবা, সেটাও একটা রহস্য । আসলে এর পেছনেও আছে সেই শেকড়বুড়ো । সে না থাকলে টুকান আদৌ এখানে এসে পৌঁছতে পারত কী না কে জানে । সে-ই তো টুকানের মাথায় হাত ঠেকিয়ে বিদঘুটে কী একটা মন্ত্র আউড়ে দিল, আর তারপরেই ঘুম, ভীষণ ঘুম পেল টুকানের । আর যখন তার ঘুম ভাঙল, সে দেখল একটা পাহাড়ের মাথায় মস্ত একটা ছাতিমগাছের তলায় সে পড়ে আছে । একটু দূরেই শুরু হয়েছে গভীর বন, আর সেই বনের গাছগুলোর ওপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা ঝকঝকে প্রাসাদের মত বাড়ি ।

‘উধাওপুর !’ নিজের মনেই বলে ওঠে টুকান । বুড়োর কাছে সে ঠিক এইরকম বর্ণনাই শুনেছিল উধাওপুর রাজ্যের । তাই চিনতে তার একদমই ভুল হয়নি । ওটাই নিশ্চয়ই এই উধাওপুর রাজ্যের মায়াবী রাজার প্রাসাদ । তার মানে বুড়োর মন্ত্রের জোরে সে এক লহমায় পার করে এসেছে এই আড়াইশো ক্রোশ দূরত্ব !

অবাক ভাবটা মনে চেপে রেখেই এবার সে ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ে । সূর্য পশ্চিম আকাশের প্রান্তে । অতএব আর বসলে চলবে না । একবার মনে মনে বুড়োর বলে দেওয়া পথের নিশানা ঠিক করে নিয়েই সে বনের ধার দিয়ে চলতে শুরু করল দক্ষিণদিকে । ওদিকেই রয়েছে সেই রহস্যময় রাক্ষসবাগান, যা টুকানের লক্ষ্য ।

 চলতে চলতে একসময় যখন তার পা অবশ হয়ে এল, তখন টুকান দেখল, সে রাস্তার শেষে এসে পড়েছে । তার সামনে এখন একটা মস্ত উঁচু পাঁচিল । সে পাঁচিল চলে গেছে এ পাশ থেকে ও পাশ বরাবর । তার যেন শেষ নেই । তার মানে এর ওপারেই আছে সেই রাক্ষসবাগান !

কিন্তু এর ভেতরে টুকান ঢুকবে কী করে ? তার জন্যে তো ভেতরে ঢোকার দরজা চাই । সেটা কোথায় ? ভাবতে গিয়েই টুকানের মনে পড়ল শেকড়বুড়োর বলা গোপন সেই রাস্তার কথা । সে পাঁচিলের মাথার দিকে তাকিয়ে হেঁটে চলল সোজা পাঁচিল বরাবর । এখানেই কোথাও একটা মস্ত শিমূলগাছ আছে, যার একদিকের ডাল লম্বা হয়ে বেরিয়ে এসেছে পাঁচিলের বাইরে । সেখানে গেলেই . . .

বেশি দূর যেতে হল না । মিনিট পাঁচেক হাঁটতেই . . . ঐ তো সেই শিমূলের ডাল, পাঁচিল টপকে ঝুঁকে পড়েছে বাইরে । এবার নির্ভয়ে টুকান এগিয়ে গেল সেই শিমূলের ডালটার কাছে । তারপর সেই ডালের দুদিকে পা ঝুলিয়ে বসে ডালটা আঁকড়ে ধরে জোরে জোরে উচ্চারণ করল শেকড়বুড়োর শেখানো সেই কথাটা —

সাকাডুম লাকাডুম বাঁকাডুম ঝা —

রাক্ষসবাগানেই যা নিয়ে যা ।

ব্যস্‌, সঙ্গে সঙ্গে হু-উ-উ-শ করে ডালটা যেন টুকানকে উড়িয়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল বাগানের ভেতর । ভাগ্যিস সেখানে একটা ঘাসের স্তূপ ছিল । সেখানেই টুকান ছিটকে পড়ল মুখ থুবড়ে ।

পড়ার পর কিছুক্ষণ টুকান সেখানেই বসে রইল থম মেরে । তারপর উঠে গা হাত পা ঝেড়ে পিঠের ঝোলাটা ঠিক করে নিয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখল । ওর চারপাশে ছোটবড় নানা গাছের জটলা । তার মধ্যে যেমন বিশাল বড় আর মোটা মোটা সব গাছ রয়েছে, তেমনই ছোট ছোট ফুলের গাছও আছে অনেক । সেইসব গাছে কী চমৎকার সব বাহারের ফুলও ফুটে আছে । আর কী মিষ্টি সুবাস তার ! এখন এইসব গাছের মধ্যেই কোন গাছ থেকে যে রাক্ষসগুলো জন্মায়, তার কিছুই টুকানের জানা নেই । এখন সবে সন্ধে । আর একটু রাত না বাড়লে কিছু বোঝাও যাবে না । কিন্তু এই বাগানে এখনই কীরকম যেন থমথমে ভাব । যেন ভয়ের একটা কুয়াশা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে গোটা বাগান জুড়ে ।

কিন্তু টুকানের মনে আছে শেকড়বুড়োর শিখিয়ে দেওয়া কথাগুলো । এখানে পৌঁছনোর পর কী করতে হবে না হবে, শেকড়বুড়ো তা সব পইপই করে বলে দিয়েছে টুকানকে । তাই সে একটুও ভয় না পেয়ে চলতে শুরু করল বাগানের পশ্চিমদিক লক্ষ্য করে । ওদিকে একটা ছোট্ট টিলা আছে । টুকানকে গিয়ে লুকোতে হবে তারই আড়ালে ।

 

          #                 #                 #                 #                 #

 

রাত গভীর হয়েছে । গোটা বাগানটা এখন কীসের এক অজানা আতঙ্কে যেন নিশ্চুপ হয়ে আছে । অনেকক্ষণ হয়ে গেল, টুকান এসে লুকিয়ে আছে সেই টিলাটার ওপরে একটা পাথরের আড়ালে । ওর বাঁ হাতে ওর প্রিয় সেই গুলতি, আর ডানহাতে সে মুঠো করে ধরে আছে শেকড়বুড়োর দেওয়া সেই মন্ত্রপূত গোলমরিচগুলো । ও জানে না, এগুলো দিয়ে ঠিক কী কাজ হবে । কিন্তু শেকড়বুড়োর কথামতো এতদূর যখন টুকান আসতে পেরেছে, অতএব ওর স্থির বিশ্বাস যে এই গোলমরিচ দিয়েই ওর কাজ হাসিল হবে ।

হঠাৎ শোঁ শোঁ করে একটা প্রবল হাওয়া বয়ে গেল বাগানের ওপর দিয়ে । আর সঙ্গে সঙ্গেই গোটা বাগান জুড়ে যেন ঝড়ের তান্ডব । বাগানের সমস্ত গাছগুলো দুলতে লাগল পাগলের মতো । আকাশের বুক চিরে যেন একটা বিদ্যুতের শিখা এসে পড়ল বাগানের ওপর । আর সঙ্গে সঙ্গেই টুকান দেখল, বাগানের এক একটা গাছ থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল ভয়ঙ্কর সব মূর্তি । কী সাংঘাতিক চেহারা তাদের ! দেখলেই বুকের রক্ত যেন শুকিয়ে আসে । গোটা শরীরটা যেন থরথর করে কাঁপে ।

এক মুহূর্তের জন্য ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল টুকান । পরক্ষণেই সে চোখ খুলে দেখে, কোন মায়াবলে যেন সমস্ত রাক্ষস হঠাৎ জেনে ফেলেছে টুকানের কথা । তারা সবাই এবার টিলার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে । তার পরেই একে একে তারা উড়ে আসতে লাগল সেই টিলার দিকে ।

টুকান প্রাণপণে শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে মনে মনে বলল, ‘না । আমি ভয় পাব না । কিছুতেই না ।’

পরক্ষণেই সে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল শেকড়বুড়োর শেখানো সেই গুপ্তমন্ত্র । একবার, দুবার, তিনবার । মন্ত্র পড়া শেষ হওয়ামাত্রই টুকান অনুভব করল, ওর হাতের মুঠোয় গোলমরিচগুলো যেন জ্যান্ত হয়ে উঠেছে, ছটফট করছে ওর হাত থেকে বেরোবার জন্যে ।

এবার সেগুলো একটা একটা করে গুলতিতে পরিয়ে সেই উড়ে আসা রাক্ষসদের দিকে মারতে শুরু করল টুকান । কী আশ্চর্য, প্রতিটা গোলমরিচের গুলি যেন এক একটা বজ্রের শিখা হয়ে উড়ে যেতে লাগল সেই রাক্ষসগুলোর দিকে, আর তার আঘাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে লাগল সেই ভয়ঙ্কর আর মায়াবী রাক্ষসের দল ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাগানের সমস্ত রাক্ষস নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, সেইসঙ্গে বাগানের ওপর থেকে অন্ধকারের কালো পর্দাটাও যেন কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল । চাঁদের আলোয় বাগানটা যেন ঝলমলিয়ে উঠল । টুকান তাকিয়ে দেখল, সেই বড় বড় কালো গাছগুলো বাগানে আর নেই । গোটা বাগানটা এখন শুধু ফুলগাছে ভর্তি ।

হঠাৎ কেমন একটা কলরব শুনে টুকান অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে, বাগানের মাটি ফুঁড়ে উঠে আসছে একদল ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেমেয়ে । আরে ! এরা তো টুকানের গ্রামেরই সেই হারিয়ে যাওয়া ভাইবোনগুলো ! হৈ হৈ করে টিলা থেকে নেমে এল টুকান । আর তাকে দেখে বাচ্চাগুলোও কী খুশি ! এই অজানা অচেনা জায়গায় কেউ না থাকলেও তাদের টুকানদাদা আছে । তাদের আর কোন ভয় নেই ।

কিন্তু টুকানের মনে দুশ্চিন্তা । এই দুর্গম পথ পেরিয়ে ওদের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাবে কী করে ?

ঠিক এই সময় একটা সড়সড় আওয়াজ । সামনের গুলঞ্চ গাছটার গোড়া থেকে ওটা কী বেরিয়ে আসছে ? বাচ্চাগুলো টুকানের পেছনে লুকিয়ে পড়ে । টুকান দেখে, সেটা একটা ছোট্ট মানুষ । একমুখ দাড়িগোঁফের আড়ালে মানুষটা মিটিমিটি হাসছে ।

শেকড়বুড়ো ! নিমেষে টুকানের মন থেকে সমস্ত চিন্তা দূর হয়ে যায় । আর ঠিক তখনই, বাগানের পূর্বদিকে ফুটে ওঠে একটা আবছা আলো । ভোর হচ্ছে ।

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত