Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,ট্রাফিক

ধারাবাহিক: চিন্তামণির দরবার (পর্ব-১২) । জয়তী রায় মুনিয়া

Reading Time: 3 minutes

মনের রাস্তায় ট্রাফিক

নমস্কার বন্ধুরা,চিন্তামণির দরবারে স্বাগত আপনাদের। এখন পর্যন্ত যে সব আলোচনা হয়েছে, তার মুখ্য বিষয় — মন। নানা ভাবে তাকে আমরা দেখতে চেয়েছি, বুঝতে চেয়েছি ছুঁতে চেয়েছি। প্রকৃতপক্ষে , চিনতে চেয়েছি। কিন্তু কেন? কারণ , সমস্ত সাফল্য ও সুখের চাবিকাঠি আছে মনের হাতে। কাজেই, তাকে ভালো রাখার কৌশল জানলে, জীবনে দুঃখ বস্তুটি থাকবে না। এখন কথা হল, মনের রাস্তা ধরে সুখের বাড়ি পৌঁছে যাওয়ার এই চেষ্টায় থাকবে অনেক বাধা। এমন এক বাধার কথা আজ আলোচনা করব।

ছোটবেলায় ট্রাফিক পুলিশ হতে চায় নি, এমন শিশু কমই ছিল। ওই হাতের দৃপ্ত ভঙ্গিতে ছুটন্ত গাড়ির গতি বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা ভীষন আকর্ষণ করত। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা , তিনি অটল আছেন ডিউটিতে। মনে করা যাক ট্রাফিক কন্ট্রোল নেই ই রাস্তায়। গাড়িগুলো ছুটছে ইচ্ছে মত। অনিবার্য দুর্ঘটনা। অথবা, এমন জ্যাম জট পাকাবে, সেটা সরিয়ে পৌঁছুতে পারবে না কেউ। অর্থাৎ গন্তব্যে পৌঁছানোর আশা দুরাশা।

আমরা প্রত্যেকেই একটা কোনো গন্তব্যে পৌঁছতে চাই। যে ফিল্ডের কাজ করি না কেন , তার শেষ দেখাটা জরুরি মনে হয় নিজের কাছে। লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য বাইরের পরিশ্রম জরুরি, তেমনি মনের জমি শক্ত হওয়া উচিৎ। কারণ আমরা যারা নতুন লিখছি, ব্যর্থতার কুয়াশা প্রায়ই গ্রাস করে। আর এটা খুব স্বাভাবিক বটে। মন খারাপ লাগে। দিন খুব খারাপ যায়। নিত্যকার কাজে নানারকম ঝামেলা শুরু হয়। নিজেরাও বুঝি , মন ঠান্ডা রাখা উচিত। হয় না। মনের রাস্তায় নানা রকম চিন্তার গাড়ি ভিড় করে ঝামেলা করে। হর্ন মারে। এদিক দিয়ে একটা চিন্তা বেরুতে চায় তো আরেকটা চিন্তা লাফিয়ে পড়ে তার ঘাড়ে। কবিতা লিখতে লিখতে চট করে দেখে নিলাম মেসেজ। অথবা পুজো করতে করতে গালাগালি দিলাম কাউকে অথবা রান্না বসিয়ে আরো কিছু। করতেই হয়। সংসার কবে কাকে সময় দিয়েছে? ফলত মনের রাস্তায় ট্রাফিক বৃদ্ধি পেতেই থাকে। পেতেই থাকে। সৃষ্টি হয় অজস্র জটিলতার। সমাধান খুঁজে পেতেও দেরি হতে থাকে। চিন্তার কোন গাড়ি আগে যাবে, কোন গাড়ি পরে, কিভাবে এগোলে পিছলে রাস্তা ক্লিয়ার থাকবে, জানব কি করে? ট্র্যাফিক পুলিশের কাজ এটা। আমার মনের ট্রাফিক পুলিশ কই? কে নিয়ন্ত্রণ করবে কখন কোন চিন্তা গুরুত্ব পাবে? ইমার্জেন্সী চিন্তা হলে তাকে রাস্তা ছেড়ে দিতে হবে? কে করবে এটা?

মনের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে আমাদেরই। উপায় নেই। Monkey mind অর্থাৎ একটা চিন্তা থেকে আর একটা চিন্তায় লাফিয়ে পড়ার প্রবণতা বেড়ে চলেছে দিনদিন। জটিল হচ্ছে মনের গঠন। খুব তাড়াতাড়ি সব কিছু করতে হয়। এই রান্না, এই বাচ্চা, এই প্রেম, এই পরচর্চা, এই সেলফি, এই পুজো , এই তেল মারা, এই বাড়ির নানা ঝামেলা … তারপর …. রাতে ফেসবুক। আগে রাতে বহুলোক বসে পড়ত ডায়েরি নিয়ে। তখন ওটাই ছিল ওয়াল। যা খুশি প্রাণে চায় লেখো। মনের ভার হালকা করো। কেউ জানতে পারবে না। দেখবে না। এটা কিন্তু সুন্দর থেরাপি। নানা জ্যাম জটের মাঝে একটু হলেও মনে হয় দেখি এই পথ দিয়ে যেতে পারি কি না? বলার কথা এই যে, সংসারী মানুষের মুক্তি নেই। তাকে সব ম্যানেজ করতে হবে। সন্ন্যাসীর ঝামেলা নেই। পুরো ডোনেশন জীবন। আমি তো সংসারী মানুষদের স্যালুট ঠুকি। কি পায় তারা? দিন শুরুতে ঝামেলা। দিন শেষে ঝামেলা। ঘুমিয়ে দুঃস্বপ্ন!

ট্রাফিক পুলিশের কাজ কঠিন কিন্তু করা যাবে না এমন না। চিন্তার উপর একটু হলেও কন্ট্রোল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজ আমি যতই ভীম পালোয়ান হই না কেন, সামনের দিন কিন্তু চিন্তা রোগে শেষ করে দেবে। তাই নিজেকে শাসন । নিজেকে নিয়ে একটু বসা। দুই মিনিট মৌন থাকা। ( ফোন রেখে) সেই সময় মনকে কপালের মাঝখানে নিয়ে আসা। এবং , যখন যেটা করছি তার উপর একটু হলেও সময় দেওয়া। এটা সবচেয়ে কঠিন। কিন্তু একবার আয়ত্বে এসে গেলে মারাত্মক ফল লাভ। নিজের উপর আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। দিনের শেষে আরাম লাগে বেশ।


আরো পড়ুন: চিন্তামণির দরবার (পর্ব-১১) । জয়তী রায় মুনিয়া


মনের রাস্তায় ট্রাফিক বা জ্যাম সৃষ্টি হয় নানা কারণে। যেমন হঠাৎ অবাঞ্ছিত কোনো সমস্যা লাফিয়ে পড়ল। কেমন সেই সমস্যা? নিজের সন্তান কথা শুনছে না। ছোট ছোট কথা শুনছে না। যা ই বলা হচ্ছে উল্টো মানে করছে। ফলে , সৃষ্টি হচ্ছে দূরত্ব। বাড়িতে অশান্তি। অভিভাবকের নিজস্ব একটা অভিজ্ঞতা থাকে। সেটা ঠিক হবেই তার কোনো মানে নেই কিন্তু আলোচনা করা যেতেই পারে। সেটাও যখন হয় না, সন্তানের বিপদ যখন হয়, তখন প্রবল অশান্তি এড়ানো যায় না। বেড়ে যায় রক্ত চাপ। একটা কথা মনে রাখতে হবে, এই সময় ধ্যান করুন। সন্তান হলেই যে তার সমস্ত সমস্যার সমাধান আপনার হাতে, তার কোনো মানে নেই। কাজেই, ধ্যান করুন আর কোনো রকম নেগেটিভ চিন্তা বা সন্তানের উপর রাগ না করে ক্রমাগত বলে চলুন , যা হবে ভালো হবে। মনে রাখবেন, আপনার রাগ করে উচ্চারিত বাক্য , তার জন্য ভালো ফল আনবে না। কাজেই, কিছু করতে না পারলে কিছু খারাপ ও উচ্চারণ করবেন না। বরং, মন শান্ত করে ভালো চিন্তা করুন। দেখবেন, আপনার ট্রাফিক একটু হলেও কন্ট্রোল করা যাবে। একবারও ভাববেন না, যা হয় হবে আমার কি? বরং, নিজেকে বলবেন, আমি তো মঙ্গল চিন্তা করি, পজিটিভ বাতাবরণ তৈরি করি, তারপর দেখা যাবে।

ট্রাফিক সৃষ্টির বড় কারন অযথা চিন্তা। চিন্তা কখনো একলা আসে না, সঙ্গে করে অনেক সঙ্গী নিয়ে আসে। চিন্তার ডাল পালা গজায়। অনেকগুলি গাড়ি গুঁতো গুতি করে ট্রাফিক তৈরি করে। চিন্তা করুন সৃষ্টি বিষয়ক। মানুষ নিয়ে নয়। মানুষ নিয়ে চিন্তা এলে একটু সতর্ক হয়ে যান। ভালো করে বিচার করুন, কেন ভাবছেন , কি কারণে এমন ভাবনা আসছে? নিজেকে বারবার সতর্ক করুন। বারবার। তবে দেখবেন, সমস্যা সহজ হয়ে আবার চলতে শুরু করবে মনের গাড়ি।

সবাই যে বিখ্যাত হবে, সার্থক হবে তেমন তো কোনো কথা নেই! তেমন হতেও পারে না। কিন্তু, সুখ? সেটা তো আমার হাতে। সুস্থ শরীর? সেটা তো প্রয়োজন। দিনের শেষে ঝলমল আত্মবিশ্বাসী মুখ একসময় সাফল্যের মুখ দেখবে না কে বলতে পারে? কাজেই , তাড়াতাড়ি গাড়ি না চালিয়ে ধীরে সুস্থে মন স্থির করে গাড়ি চলুক রাস্তায়, ব্যর্থতার ট্রাফিক জ্যাম কাটিয়ে আমরা পৌঁছেই যাব সফলতার দরজায়।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>