| 24 মে 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: দয়াময়ের দুঃখ । তন্বী হালদার

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

দয়াময়ের কোনো দুঃখ নেই। সদাহাস্য, প্রাণবন্ত, সবসময় যেন টগবগ করে ফুটছে। এক কথায় করিতকর্মা। তবে দয়াময় বরাবর মিতবাক। যেহেতু সব্যসাচীর উদাহরণের মত যে কোনো কাজে তার শুধু হাত নয় সমস্ত শরীর যেন কথা বলে তাই এ বিষয়টা নিয়ে কেউ কখনও কিছু মনে করেনি। আরে বাড়িতে পাঁচটা ছেলেপুলে থাকলে কে বেশি কথা বলছে, কে কম কথা বলছে এসব নিয়ে দয়াময়দের সময় কেউ মাথা ঘামাতো না। তারপর আসলো, “হাম দো, হামারা দো”। বাবা মা বেশ সচেতন হয়ে উঠলো সন্তান নিয়ে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার তো হতেই হবে। না হলে আত্মীয়দের কাছে মুখ দেখানো দায়। এরপর দয়াময়দের ষাট ছুঁই ছুঁই সময়ে এলো “আমি সে ও সখা”-র মত স্বামী, স্ত্রী আর তাদের একটি সবেধন নীলমণি। এবার আর ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারে ক্ষান্ত না সেই বাচ্চাকে পারলে ষষ্ঠী পুজোর দিনই হাতে খড়িটা দিয়ে দেয়। তারপর আছে গান, নাচ, যোগা, আঁকা, সে লম্বা লিস্ট। তবে এটা ঠিক বাচ্চা বেশি কথা বলে না কম কথা বলে বাবা, মায়েরা ঠিক খেয়াল করতে পারে। দয়াময়দের সময়ে বাঁদরামির জন্য পেঁদিয়ে পগার পার করা হতো। তারপর সে মনের দুঃখ জানাতে নিজেই যেত বা সোহাগ করে নিয়ে যেত দিদিমা, ঠাকুমা, জেঠিমা, কাকিমা, মাসি, পিসিরা। এখনকার বাচ্চাদের সময় সেটা বাঁদরামি না এখন বলা হয় দুষ্টুমি, আরও ভালো করে বললে এক্সট্রোভার্ট, ইনট্রোভার্ট। সে বাচ্চাকে নিয়ে বাবা মায়েরা ছোটে মনোবিদের কাছে।

          দয়াময় দাস ছয় ভাইবোনের মধ্যে বড়ো। চার ভাই দুই বোন। ছোট বোন যখন সাত মাসের দয়াময় স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেবে। হঠাৎ দু’দিনের জ্বরে দয়াময়ের বাবা গত হন। অন্তিমকালে তিনি দয়াময়ের হাত ধরে বলে যান, “বাবা তুমি বড়ো, এরা সব রইলো, তুমি এদের দেখো”।

কে জানে এরপর থেকে এদের দেখতে দেখতে দয়াময় মিতবাক হয়ে গেল কিনা। তবে দয়াময় নিরুদ্দেশ হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত বাবার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছে। বয়সে জল মিশিয়ে নাবালক দয়াময়কে সাবালক বানিয়ে তার বাবার অফিসেই একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেন, সে অফিসের তখনকার বড়োবাবু। ইছাপুরের গানশেল ফ্যাক্টরিতে ষাট বছর পর্যন্ত কাজ করতে করতে গ্রুপ ডি থেকে জুনিয়র অফিসার পর্যন্ত গিয়েছিল দয়াময়। চাকরির মাঝেই টুকুস করে স্কুল ফাইনালটায় পাশ দিয়ে দেয়। সে হয়ে ওঠে বাড়ির অভিভাবক। সবসময় হাসিমুখটিতে তার যে কোনো গোপোন দুঃখ থাকতে পারে কেউ ভুলেও ভাবেনি। দয়াময়ের পরে ছিল বোন দামিনী। দু’বছর চাকরি করে সে বোনকে রেলে চাকরি করে পাত্রর সাথে বিয়ে দেয়। পাত পেড়ে দুশো পঁচাত্তর জন লোক খেয়েছিল। ধন্যি ধন্যি করে সবাই। কনকাঞ্জলির সময় সে বোন কাঁদতে কাঁদতে বলে যায়, “দাদা তুই তো শুধু দাদা না, তুইই হলি আমাদের বাবা। দীপু, দাশু, দীনু, দীপা, মা থাকলো, ওদের দেখে রাখিস”।

তা সত্যি রেখেছিল দয়াময়। মাকে কাশী, পুরী ঘুরিয়েছে। দীপুর আইসক্রিম ফ্যাক্টরির জন্য নিজে জামিনদার থেকে লোন করিয়ে দেওয়া। দাশু অবশ্য লেখাপড়াতে খুব মেধাবী ছিল। তার জন্য তেমন কিছু করতে হয়নি। সে জলপাইগুড়ি কলেজে ইংরাজি পড়ায়। পার্টির লোকেদের ধরে করে দীনুকে প্রাইমারি স্কুলে ঢুকিয়েছে। দীপাকে দয়াময় একেবারে সন্তান স্নেহে বড়ো করেছে। গান শিখিয়েছে। খুব ইচ্ছা ছিল মাস্টার ডিগ্রিটা করাবে। কিন্তু কলেজে থার্ড ইয়ারে পড়তে পড়তে এমএলএ-র বখাটে ছেলের সঙ্গে পালায়। দয়াময়ের স্থির সিদ্ধান্ত ছিল বোনকে আবার ফেরত আনবে। ঐ বখাটের সঙ্গে কিছুতেই থাকতে দেবে না। কী সুন্দর গানের গলা দীপার। আরে আর কিছু না হোক গান শিখিয়েই ওর চলে যাবে। দয়াময় দরকার হলে দীপাকে গানের স্কুল খুলে দেবে। দাশু অবরে সবরে বাড়ি আসে। নিজের পছন্দের ছাত্রীকে বিয়ে করে জলপাইগুড়িতেই ভোটার কার্ড, আঁধার কার্ড করে নিয়েছে। তার কানে খবরটা পৌঁছাতে সেই সবার আগে আপত্তি জানায়। সটান আগরপাড়া চলে এসে বাকি দুই ভাইকে নিয়ে পুরো দল পাকিয়ে ফেলে।

দয়াময়কে পরিষ্কার বলে, “দাদা তুমি দীপাকে ফেরত আনলে সমাজে আমরা মুখ দেখাতে পারবো? তোমার নয় সমাজ, সংসার নেই কিন্তু আমাদের তো আছে। আমাদের ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ আছে, শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন আছে। এগুলো তো দেখতে হবে। তাছাড়া দীপা তো বাচ্চা মেয়ে না। এমএলএ-র সঙ্গে পাংগা নিয়ে তুমি পারবে?”

দয়াময় কি এরপর আরও মূক হয়ে যায়! কে জানে! শোনা যায় কোনো রকমে নাকি মিনমিন করে বলেছিল, “ছেলেটা যে ভালো না। দীপার ভবিষ্যৎ কী হবে?”

না কেউ ভাবেনি। মা ততদিনে গত হয়েছেন সুতরাং দয়াময় আর দীপাকে ফিরিয়ে আনার কোনোও রাস্তা খুঁজে পেল না।

          দীপা কিছুদিন পরেই একদিন দয়াময়ের সঙ্গে অফিস ফেরত রাস্তাতে দেখা করেছিল। কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ে গায়ে মারের দাগ দেখিয়েছিল। দয়াময় সব ভেঙে বেরিয়ে আসার মত করে বলে, “তুই বাড়ি ফিরে চ। তোকে আবার কলেজে ভর্তি করে দেব। তুই আবার নতুন করে জীবন শুরু করবি”।

ম্লান হেসে দীপা জানায়, তা আর সম্ভব না। কারণ সে মা হতে চলেছে। এরকম পরিবেশে এরকম একটা সুখবরে আনন্দ পাবে বা দুঃখ পাবে বুঝতে পারে না। পরে বুঝেছিল সে দুঃখই পেয়েছিল। বুঝতে পেরেছিল দীপা আর ফিরতে পারবে না। দীপাকে কিছু করে মাসোহারা দিত দয়াময়।

          অবসর নেওয়ার পর দয়াময় দীনু আর দীপুর ভাগের দাদা হয়ে যায়। দীপুর বৌ রুমা খুব মুখরা। সে একদিন স্পষ্ট জানায়, “বড়দা তো প্রতি মাসে দীপাকে টাকা দেয়, তালে দীপাই বা দায়িত্ব নেবে না কেন?”

দয়াময়ের যাতে ব্যস্ত থাকতে পারে তার জন্য ভাইয়েরা তাদের ছেলে মেয়েদের স্কুল, ক্রিকেট খেলাতে, গান শেখাতে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বগুলো দেয়। কিন্তু এই প্রথম দয়াময় অসময়ের বর্ষণের মতো ঝরে পড়ে। ঠান্ডা গলায় বলে, “না”।

এই ছোট্ট ‘না’ তে রে রে করে সংসারে অশান্তির আগুন জ্বলে ওঠে।

দীপু এসে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করে, “সারাদিন ধরে তালে কী করা হবে তোমার?’’

দয়াময় উত্তর করে না। কিছুদিনের জন্য একদম চুপ করে যায়। তারপর একদিন ভাইদের ডেকে জানায়, “আমি বিয়ে করতে চাই। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছি”।

দীপু, দীনু আর কথা খুঁজে পায় না। অগত্যা তারা দাশুর শরণাপন্ন হয়। দীনুর বৌ তো হেসেই অস্থির। দীনুর বৌ রুমাকে সমানে বলে, “বুড়োর ভীমরতি ধরেছে। ভাইরা সব বৌ নিয়ে দোরে খিল দেয় তাই থাকতে পারছে না”।

দীপুর বৌও সায় দেয়, “তা যা বলেছিস”।

দাশু মোবাইলে পুরো হুমকি দেয়, “খবরদার দাদা একদম লোক হাসাবে না। এ বয়সে পাগলামী করলে সোজা পাগলা গারদে ভরে দেব।  আরে আমাদের তো একটা মান ইজ্জত আছে নাকি। আমাকে যদি যেতে হয় দক্ষযজ্ঞ হয়ে যাবে কিন্তু”।

দয়াময় চুপ ছিল। দয়াময়ের চুপ থাকাতে সবাই নিশ্চিন্ত হয়, যাক বাবা পাগলের পাগলামী গেছে।

          কিন্তু হঠাৎ একদিন সকাল থেকে দয়াময়কে আর পাওয়া যায় না। তার বদলে তার বিছানার উপর সম্মোধনহীন দু’লাইনের একটা চিঠি পাওয়া যায়।

“তোমরা কখনও আমার দুঃখের কথা জানতে বা বুঝতে চাও নি। আমি আর তোমাদের সুখে সুখী হতে পারছি না। আমি তার জন্য দুঃখিত বা লজ্জিত না। তোমরা যথেষ্ট স্বচ্ছল। দীপাও। তবু আমার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাটুকু তার নামে করে দিয়ে গেলাম। এবার আমি সত্যিকারের সুখী হব”।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত