| 1 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক

ধারাবাহিক: রাণীয়ার রান্নাঘর (পর্ব-১৮) । ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

ঘরে ফেরার গান

যত দূরে আমি ধাই না কেন আমার দেশ, আমার আত্মীয়, পরিবার, বন্ধু, পরিজন আমার পিছু ছাড়েনা কিছুতেই…কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই… ভাবতে ভাবতেই গেয়ে ওঠে রাণীয়া মনে মনে। মোচড় দিয়ে ওঠে তার বুকের ভেতরটা। সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে ঘর বাঁধার যে কত সুখ তা যারা সে ঘর বেঁধে দীর্ঘদিন পড়ে আছে তারাই টের পায় হাড়েহাড়ে। বন্ধুবান্ধবেরা মেসেজ করে বলে, বেশ আছিস তোরা ঠান্ডার দেশে। চির নবীনের দেশে। তোরা অনেক কাজ করতে পারিস। আমাদের এখানে সব কর্মশক্তি ক্ষয় হয়ে যায় গরমের চোটে।
রাণীয়া বলে, ” দই বেচতে যে কী সুখ সে তোরা বুঝবি না রে”

ঘরে ফেরার গান গাইতে গাইতে ক্লান্ত রাণীয়া।কিন্তু ঘরে আর তার ফেরা হয়না।

মনে পড়ে আরও স্মৃতি। এরোপ্লেন মোডে ফোনের নীল একফালি জানলার ধারে বসে ফোনেই স্মৃতি রোমন্থন করে সে। দূরে ফেলে রাখে নতুন দেখা শহর। শিকেয় তোলে রান্নাবান্না, অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং,পডকাস্ট। স্মৃতি বড় বেদনার। জাবর না কেটে লিখে না রাখলে মন শান্তি পায়না কিছুতেই। রাণীয়া ভুলতে চায় দেশের বাড়িঘর। দিদির সঙ্গে এযাবৎ টানাপোড়েন… বড় কষ্টের। বাবামায়ের জন্ক্ষয মনখারাপ। বয়সের ভারে তাঁরাও একদিন অক্ষম হয়ে যাবেন। ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় সে। যেমনটি ভাবনার বাইরে ছিল তার তেমনটিই যেন পিছু নিয়েছে। মিঠি কে ছেড়ে কিভাবে সে থাকবে একদিন সেই নিয়ে উথালপাথাল হত তার মন।
মা বলেছিল, হস্টেলে চলে গেছিল যখন? তখন তো এমন করিস নি?
তখন প্রতি মাসে দিদি বাড়ি আসত যে। রাণীয়া বলেছিল। তুইও চলে যা তবে। ট্রেনে করে গিয়ে দেখা করে ফিরে আসবি। জামশেদপুর থেকে কলকাতা তো। মাত্র কয়েক ঘন্টা। রাণীয়ার তখন পড়াশুনোর প্রবল চাপ। সবসময় যাব বললেই কী আর যাওয়া যায়? এক আধবার গেছেও সে। মায়ের অনুরোধে অবিশ্যি। বড় মেয়ের জন্য এটা, ওটা, সেটা খাবারদাবার করে দিয়েছেন।পরক্ষণেই মনে হয়েছে রাণীয়ার, মা কী তবে দিদিকে একটু বেশীই ভালোবাসে? আফটার অল মিঠি তো বড় মেয়ে তাঁর, প্রথম সন্তান। তারপরেই ভেবেছে, এ তাঁর ভুল। সেও তো কোলের মেয়ে বলে মায়ের বড় আদরের। মা কথায় কথায় বলে তা। তবে জামাইবাবু শৈবাল দার মা যেন কেমন একজন মানুষ । বেশ কটকটি মহিলা তিনি। যাকে বলে ঠোঁট কাটা। কথাবার্তায় আগল নেই তাঁর। বারেবারে বৌমার বাপের বাড়ির লোকজন আসছে, এদিকে ছেলের বউ রান্নাঘর মাড়ায় না… কিন্তু কিন্তু ঠেকত রাণীয়ার বাবার। যদি আবার তাঁর নিয়মিত সেখানে যাওয়া নিয়ে মিঠি কে খোঁচা দেন তিনি! বাবা এইজন্যই বুঝি বলেছিলেন, কুটুম বাড়ি অত ঘন ঘন যেতে নেই, বুঝলি? মান থাকেনা। রাণীয়া সঙ্গেসঙ্গে বলেছিল, আমার নিজের দিদির বাড়ি, কুটুম বাড়ি? হোয়াট ডু ইউ মিন বাবা? বউয়ের বাড়ির লোকজন ছেলের বাড়ি গেলেই আপদ? উল্টোটা হলে তো কেউ কিছু বলেনা। সেই বৌমার বাপের বাড়ি গিয়ে দিব্য তারা জামাই আদর পেয়ে যেন বর্তে যায়।

কলকাতায় সাহা ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে কী একটা সেমিনারে গিয়ে মিঠির অফিসে দেখা করে এসেছিল। তখন মিঠি-শৈবাল সল্টলেকে সেক্টর ফাইভের অফিসে পোস্টেড। অফিস সেরেই আহ্লাদে আটখানি দিদি জামাইবাবু ট্রিট দিয়েছিল একমাত্র শ্যালিকা কে নিয়ে। সেই দিদি কেমন যেন হয়ে গেল! এই দিদিই বোন আমেরিকায় যাবার পরেপরেই বোনের বিয়ের ছবিগুলো দিয়ে সুন্দর বিয়ের ভিডিও বানিয়ে, টুং টাং বিয়ের গান, সানাই এমবেড করে বোন কে মেইল করেছিল। ভাবতে পারেনি রাণীয়া। এসব তো বারেবারে দেখা। তখন ক্যাসেটের যুগ গিয়ে সিডি এসেছে। সিসি আবার সিডি তে সব ভিডিও ভরে মা’কেও ক্যুরিয়র করেছিল। এই দিদি যেন কেমন হয়ে গেল। তখন কথায় কথায় মিস করেছে মিঠি তার বোন কে । বিয়ের পরে তো বছর দুয়েকের মত ছিল সে মিঠির কাছাকাছিই। সত্যিকথা বলতে সেইজন্যই কলকাতায় দুই মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ করেছিলেন ওদের বাবা মা। পাশাপশি থাকলে মেয়েদুটো ভালো থাকবে। অনসূয়া অবিশ্যি বলেছিলেন একবার। “কানের কাছে কানাইয়ের বাসা” বলে একটা কথা আছে জানো তো? ভদ্রলোক বলেছিলেন, ধুস! কী যে বল তুমি। তবে দুই মেয়ে একই শহরে থাকবে তা ভেবে মনে মনে অবিশ্যি অনসূয়ার চেয়ে আর কেউ বুঝি এত খুশি হয়নি। আমাদের অবরতমানে দুজন দুজন কে দেখবে। এই ভেবে। আর আনন্দ হয়েছিল রাণীয়ার। ম্যাট্রিমনি ওয়েবসাইটে রেজিস্টার করে রাণীয়া কুশলের গায়ের রঙটা তার চেয়েও বেশী ফরসা দেখে বেজায় হেসেছিল। জানিস দিদি? ফরসা বাঙালি ছেলেগুলো খুব বোকা বোকা হয়। একদম মাখন দিয়ে আলুভাতে যেন। তুই বেশ পেরিয়ে গেছিস সে যাত্রায়। শৈবাল দা কালোর ওপর বেশ স্মার্ট। ইস! কুশলের গায়ের রঙটা এত ফরসা কেন? বাকি সব ভালো।


আরো পড়ুন: রাণীয়ার রান্নাঘর (পর্ব-১৭) । ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


পাগলী মেয়ে একটা! কী সব আলতু ফালতু বকছিস! কুশলের চাকরির প্রসপেক্ট দেখ। ওর সিভি বিদেশের যেকোনো কোম্পানি লুফে নেবে । সারাবিশ্ব এখন তোলপাড় এই টেকনোলজি নিয়ে। একে ইলেক্ট্রিক্যাল, অ্যাট দ্যা সেম টাইম ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়র তায় আবার আইআইটি। টেলিকম সেক্টরে এত ভালো ভালো জায়গায় কাজের এক্সপিরিয়েন্স ওর। থ্রি জি, ফোর জি, ফাইভ জি… আরও কত জি কুশলই নিজে বের করে ফেলবে দেখিস। এসব সেক্টরে চাকরীর কোনোদিন স্যাচুরেশন হয়না। ঠিক যেমন ডাক্তারদের বা ফার্মা কোম্পানির।টেকনলজি আর মেডিক্যাল সায়েন্স এর চাহিদা চিরকাল থাকবে সারা বিশ্বে। মিঠির মুখে এমন সব ভালো ভালো কথা শুনে সেদিন ঘুণাক্ষরেও মাথায় আসেনি রাণীয়ার। এখন বুঝতে পারে সে । ওর দিদি কুশল কেও তবে হিংসে করেছিল সেদিন। দিদির মুখের কথাই তার প্রমাণ। মানে কুশলের চাকরীর কেরিয়ার, ফিউচার শৈবাল দার থেকে অনেক অনেক বেশী প্রস্পেক্টিভ? দিদি-শৈবাল দা দুজনেই ইঞ্জিনিয়র। সেই জন্যই কী তবে মিঠির মনের এই চাপা অন্তর্দ্বন্দ থিতিয়ে পড়েছিল মনের কোণায়? ছাইচাপা আগুণ হঠাত করেই এখন ধিকধিকি জ্বলে উঠছে তবে। দিদি শৈবাল দা ইঞ্জিনিয়র হয়েও দেশেই পড়ে রইল আর দিদির মুখের কথাই ফলে গেল । মানে কুশল আজ টেলিকমের গবেষণায় একটা আন্তর্জাতিক নাম। বিখ্যাত কোম্পানির রিসার্চ ল্যাবে চাকরি তার। কুশল একটু বেশীই ফর্সা তো কী? তার টেলিকমের যুগান্তকারী আবিষ্কার, একে একে নতুন নতুন ওয়েবসাইটে কুশলের নাম ছড়ানো… রাণীয়াদের আমেরিকায় থেকে যাওয়া, এসবও কী তবে মিঠির হিংসের কারণ?

কে বারণ করেছিল তোদের? মিঠির উদ্দেশ্যে রাণীয়া বলে মনে মনে। তোরাও চলে আসতেই পারতিস তো এদেশে। ব্যাঙ্গালোরে পড়ে রইলি কেন তবে? ডলারে ইনকাম করে ফুলে ফেঁপে উঠতিস। রোজগারপাতি করে বিশাল বাড়ি, একাধিক গাড়ী… সবকিছুর অফুরন্ত চাহিদা মেটাতিস। তোদের দুজনেরই বাবামায়েরা তো একাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে তোদের ছাড়া থাকতে। কেউ তো বারণ করেনি তোদের। এসব ভাবনাগুলো কে প্রশ্রয় না দেওয়াই ভালো।কাছের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তেতো করে লাভ বই ক্ষতি হয়না।বাবামায়ের পরে আর কেই বা আছে রাণীয়ার? হঠাত করেই মনে হল তার। আফটার অল মায়ের পেটের বোন ওরা। কিন্তু সব কেমন গুলিয়ে যায় যে আজকাল… রাণীয়া মন দেয়। মুঠোফোনের নোটপ্যাডে লিখতে থাকে…

সেবার তার প্রিয় দিদা-র মুখে শুনেছিল সে যুগের পশ্চিম যাত্রার কথা।
দিদা বলেছিল পশ্চিমে হাওয়া বদল করতে যেতেন তাঁরা নিয়ম করে।
রাণীয়া বলেছিল সেই শুনে…
কি বললে পশ্চিম?
দিদা বলেছিল হ্যাঁ, সুদূর প্রাচ্য থেকে পশ্চিমই তো পাড়ি দিতাম আমরা। চেঞ্জে যেতামই বছরে একবার। শরীর আর মন ভালো রাখতে।জামশেদপুরে ওরা মানুষ তবে ছোটো থেকে বাড়িতে বাংলায় কথা বলা আর বাংলা বই পড়ে অনেকটাই শিখে গেছে অনসূয়ার দুই মেয়ে। কিন্তু মাঝেমধ্যে এইসব খটমট বাংলা শব্দ দিদার মুখে শুনে মাথা চুলকোতে হয়। দিদা-দাদুদের মধুপুর-দেওঘরে যাত্রার গল্প চেটেপুটে উপভোগ করত দুই বোনে। দীর্ঘদিন রোগভোগান্তির পর নিয়ম করে তাঁরা হাওয়া বদলে যেতেন। মা বলে চেঞ্জে যাওয়া। পশ্চিমে বায়ু পরিবর্তনে নাকি শরীর সুস্থ হয়। শীতকাল হলে কাশী অথবা মধুপুরের ভাড়া নেওয়া বাড়িতে। এলাহি ব্যাপার। তাঁদের সঙ্গে যাবে সহকারী, ভৃত্য-অনুচর, পাচক-ঠাকুর অথবা বামুনদিদি। রেলকামরায় তাস খেলা হবে শতরঞ্চি বিছিয়ে। মেয়েরা বিন্তি, ছেলেরা টোয়েন্টিনাইন, ছোটোরা গাধা পেটাপিটি, ছোটরা লুডো অথবা দাবা খেলবে । বড়রা তুখোড় আঁতেল হলে ব্রিজ। রাণীয়ার দিদা খুব স্মার্ট মহিলা ছিলেন। ক্যালকাটা ক্লাবে যেতেন শিল্পপতি দাদুর সঙ্গে। তিনি ব্রিজ খেলায় পারদর্শী ছিলেন। ইকমিক কুকারে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া জম্পেশ মশলাপাতি মাখানো ম্যারিনেটেড দই মাংস আর মিষ্টি ঘি-ভাত দমে বসবে। যথাসময়ে বেতের বাক্স থেকে বেরিয়ে আসবে উগরে ওঠা গুড় আমের মাখামাখা চাটনি অথবা তেঁতুল-আমসত্ত্ব-খেঁজুর-টমেটোর রেলিশ। সরষের তেলে পাঁপর ভেজে এয়ারটাইট স্টিলের কন্টেনারেও বন্দী করেও নিয়ে যেতেন তাঁরা। মধুরেণ সমাপয়েত হত পান দিয়ে। সে পানের বাটা থেকে চুন, খয়ের, সুপুরি, জর্দা সব মজুত ট্রেনের মধ্যে। অনুষ্ঠানের কোনও ত্রুটি নেই। চায়ের সরঞ্জামও দিব্য ছিল মজুত। এলুমিনিয়ামের ঢাউস কেটলিতে জল আনবে একজন প্যান্ট্রি কার থেকে অথবা স্টেশনে ট্রেন থামলে চা ওয়ালাকে দুটো টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে। ন্যাকড়ার মধ্যে চায়ের পুঁটুলি। সঙ্গে কনডেন্সড মিল্ক অথবা গ্ল্যাক্সোর গুঁড়োদুধ । আর সঙ্গে থাকত বিশাল থারমোস ফ্লাস্ক। একটু গরম জল থাকবে, বাচ্চাদের দুধ গোলার জন্যে। এসব শুনে দুই বোন হেসে খুন হত। ইশ! আমরা কেন তখন জন্মাই নি! বল দিদি? রাণীয়ার আফসোস হত খুব। মিঠির কথা মনে পড়লেই দু’চোখে জল টলটল করে ওঠে তার। কেমন যেন সব হয়ে যাচ্ছে। দিদি তুই এমন করে বদলে গেলি কেন রে? আমি কী অন্যায় কাজ করেছি বলবি আমাকে? কোনদিন ভুল করে তোর মনে দুঃখ দিয়েছি বলে তো মনে পড়েনা। নেপথ্যে কেউ একজন বলে ওঠে, নিশ্চয়ই দুঃখ দিয়েছ তুমি। নয়ত এমন কেন হবে? রাণীয়ার বুক ফাটে। সে আবারও গেয়ে ওঠে…
” মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ, দুঃখ হয় হে দুঃখের কূপ, তোমা হতে যবে হইয়ে বিমুখ আপনার পানে চাই…”

পাশেই সিটবেল্ট বেঁধে ভাগ্যিস কুশল ঘুমিয়ে আছে। নয়ত রাণীয়ার চোখের জল দেখতে পেত সে। আর তারপরেই অনসূয়া কে ফোন… রাণীয়া কারোকে নাগাল পেতে দেবেনা ওর মনের তলের। মনের মেঝেটা ওর একান্ত গোপন থাক। ছোটো ছোটো না পাওয়ার দুঃখ, একরত্তি প্রাপ্তির সুখগুলো কে আঁকড়ে ধরে সে। তা সে যেই হোক…যত আপনার জনই হোক।

“নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারি, নিশিদিন কাঁদি তাই…”
হিউস্টন থেকে ফিরে আবারো সেই নিজের একলা মহলে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়বে রাণীয়া, সেটাই যা আনন্দের।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত