| 3 মার্চ 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া অনুবাদ উপন্যাস: অর্থ (পর্ব-১২) । ধ্রুবজ্যোতি বরা

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি বরা পেশায়  চিকিৎসক,অসমিয়া সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য লেখক ২৭ নভেম্বর ১৯৫৫ সনে শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন ।শ্রীবরা ছাত্র জীবনে অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন ।’কালান্তরর গদ্য’ ,’তেজর এন্ধার‘আরু’অর্থ’এই ত্রয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সনে ‘ কথা রত্নাকর’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাকি উপন্যাসগুলি ‘ভোক’,’লোহা’,’যাত্রিক আরু অন্যান্য’ ইত্যাদি।ইতিহাস বিষয়ক মূল‍্যবান বই ‘রুশমহাবিপ্লব’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’,’ফরাসি বিপ্লব’,’মোয়ামরীয়া বিদ্রোহ’।শ্রীবরার গল্প উপন্যাস হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা, মালয়ালাম এবং বড়ো ভাষায় অনূদিত হয়েছে।আকাডেমিক রিসার্চ জার্নাল’যাত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ।’ কালান্তরর গদ্য’ উপন্যাসের জন্য ২০০১ সনে অসম সাহিত্য সভার ‘ আম্বিকাগিরি রায়চৌধুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।শ্রীবরা অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি।


অনুবাদকের কথা

কালান্তর ট্রিলজির তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হল’অর্থ’। সশস্ত্র হিংসার পটভূমি এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ জীবনের দ্রুত অবক্ষয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার তাড়না এবং বেঁচে থাকার পথ অন্বেষণেই আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনী ভাগ গড়ে তুলেছে। সম্পূর্ণ পৃথক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে অসমের মানুষ কাটিয়ে আসা এক অস্থির সময়ের ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের অন্বেষণ চিরন্তন এবং সেই জন্যই লেখক মানুষ– কেবল মানুষের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারে।

এবার উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে এলাম।আশা করি ইরাবতীর পাঠকেরা এই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত অসাধারণ উপন্যাসটিকে সাদরে বরণ করে নেবে ।নমস্কার।

বাসুদেব দাস,কলকাতা।


 

‘ঘুষি মেরে দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছে? বাবা খুব আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল।’ আরে ঠ্যাং ভেঙে দেওয়া উচিত ছিল।’

শ্রীমান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। বলব না বলব না করে সে গত রাতের ঘটনাটা সকালবেলা মা-বাবার কাছে বলেছিল।

‘ আমার নিজে যাওয়া উচিত ছিল। তোরা আমাকে কোনো খবরই দিলি না,’ তিনি ছেলের দোষ ধরলেন।’ রমেনের সঙ্গে যাওয়া ঠিক হতেই  আমাকে খবর দেওয়া উচিত ছিল। আমি গিয়ে চৌরাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম।’ তিনি খাবার টেবিলটা থেকে উঠে গিয়ে ঘরের ভেতরে পায়চারি করতে লাগলেন।’ সেই ঘনশ্যাম বেপারীই আসল বদমাস। সে আফিমের ব্যবসা করে। ছয় মাইলে প্রাসাদ বানিয়েছে। সেখানে যাবার নাম নেই। সেই ছোটো ঘরটাতে ভাইপো,শালি সবাইকে নিয়ে বসবাস করে। জঘন্য, জঘন্য‌। সেই এই ভাড়াটিয়াকে ঘর খালি না করার বুদ্ধি দিয়েছে। তার ঠ্যাং ভেঙে দেওয়া উচিত ছিল।’

শ্রীমান আশ্চর্য হয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়া বাবার দিকে তাকাল। ঠিক, ঠিক একটা পিঞ্জরাবদ্ধ বাঘের মতোই বাবা এপাশ থেকে ওপাশে পায়চারি করে বেড়াচ্ছে।

সে এবার মায়ের দিকে তাকাল। মা হাসিমুখে বাবার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মায়ের চোখে বাবার প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন যেন ফুটে উঠেছে সেরকম মনে হল শ্রীমানের।

‘ রমেন এখন আসবে তো? বাবা তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল। এবার রমেনের সঙ্গে আমি নিজে যাব।’

শ্রীমান ‘প্র্যাকটিক্যালি’ প্রমাদ গুনলো। রমেনের সঙ্গে গিয়ে বাবা কী করবে তার ঠিক নেই।

‘ আমরা সম্মুখে না থাকাই ভালো,’ সে উপায় না পেয়ে বলল। রমেনরা তো বাড়িটা কিনে নিয়েছে বলেই জানিয়ে দিয়েছে। ওরাই আগে থাকুক। আমরা ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকি; শ্রীমান বলল।

‘ তুই ভয় করছিস? বাবা তাকে প্রশ্ন করল; প্রায় ভৎর্সনার সুরে।

‘ ভয় করার কথা নয়’, শ্রীমান কিছুটা উষ্মার সঙ্গে বলল। এতদিন তো বাবার কোনো খবরা খবরই ছিল না। এখন রমেন, অঞ্জুদাদের বন্দুকের জোর আছে বলে বাবা একেবারে তর সইছে না।দ্রুত ভাড়াটিয়াদের বিপক্ষে অভিযানে নেমে পড়তে উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন। ‘কথাটা বুদ্ধির কথা । রমেনরা যখন সামনে আছেই আমাদের পেছনে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।’

মা এবার সমর্থন জানাল, আপনি এগিয়ে যাবেন না। শ্রীমান ঠিকই বলেছে। আপনি গিয়ে মারপিট করেছেন বলে আপনার ওপরে কেস দিয়ে দেয় যদি ঘনশ্যাম? রমেনদের উপরে তো কেস দিতে সে সাহস করবে না।

শ্রীমান মায়ের দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকাল। মায়ের বাস্তব বুদ্ধির তারিফ করতে হবে। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর এবার  দুর্বল। শ্রীমান বুঝতে পারল যে বাবা আর গুন্ডা পার্টি  নিয়ে ভাড়াটিয়াদের ভয় খাওয়াতে যাওয়ার নাম করবে না। সে লম্বা করে শ্বাস নিল‌।

তুফানের মতো রমেন প্রবেশ করল।

‘ কাকাবাবু, কাকাবাবু’, শ্রীমানের পিতাকে দেখতে পেয়ে সে চিৎকার করে উঠল।’ এগারোটার সময় রেডি হয়ে থাকবেন। আমি এসে উকিলের কাছে নিয়ে যাব। এখন কথা বলছি না। আমার তাড়া রয়েছে। শ্রীমান সম্ভব হলে তুইও রেডি হয়ে থাকবি।’ তুফানের মতো এসে তুফানের মতোই বেরিয়ে গেল রমেন। কথাবার্তা বলার সুযোগ না পেয়ে শ্রীমানের পিতার মুখটা কালো হয়ে গেল। তিনি বড়ো ব্যাস্ত হয়ে রমেনকে দেখে বেরিয়ে এসেছিলেন।


আরো পড়ুন: অর্থ (পর্ব-১১) । ধ্রুবজ্যোতি বরা


শ্রীমানের জিভটা সামান্য বিস্বাদ হয়ে পড়ল। সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।

শ্ৰীমান প্রিয়ম্বদাদের বাড়িতে যাবার জন্য বাসে উঠল। 

বাসে উঠার সঙ্গে সঙ্গে তার হঠাৎ চিন্তা হল– রমেনরা যে ঘনশ্যামের সঙ্গে মারপিট করে এল সে যদি এখন কিছু করে! সেও তো সাধারণ মানুষ নয়। তার  সঙ্গেও নিশ্চয় মানুষ আছে। আজকাল কার সঙ্গে কোন মানুষ আছে, বলা যায় না। অনেকের আন্ডারগ্রাউন্ডের সঙ্গে লিঙ্ক থাকে, অনেকের লিংক থাকে রমেন, অঞ্জুদাদের মতো ছেলেদের সঙ্গে। রমেনদের মতো ছেলের দল তো কয়েকটি আছে। নিশ্চয় আছে। থাকবেই। কেন, সে দেখছি জানেই দুই তিনটা গ্রুপ আছে বলে। ঘনশ্যাম যদি সেরকম কোনো একটি গ্রুপের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে? ওরা যদি শ্রীমানদের বিরুদ্ধে কিছু করে! বাড়িঘর বিক্রি করার সময় কেন আমাদের জানালি না বলে যদি ধরে– আসলে তো বিক্রিও হয়নি,তখন? তখন কী হবে?

কয়লার সিন্ডিকেটে  দু দলের মধ্যে গোলাগুলি হওয়ার মতো পানবাজারের দোকানটিতেও  যদি কিছু একটা হয়…  …

শ্রীমানের বুকটা পুনরায় একবার কেঁপে উঠল।

ভাবব না বলে ভেবেও সে পুনরায় বালির খাদানের মৃত মানুষটির কথা ভাবল। এই ধরনের ছোটো কথা থেকেই কখনও বড়ো ঘটনা ঘটে। মানুষ খুনোখুনি হয়ে যায়।

বাসের আগের সিটে বসে থাকা দুটি মানুষই কেন তার দিকে পেছন ফিরে তাকিয়ে রয়েছে?কে? মানুষ দুটি কে? ঘনশ্যামের মানুষ নয় তো? ধ‍্যাৎ,আমি কী সব ভাবছি। শ্রীমান মাথা নাড়ল।

তথাপি শ্রীমানের মনটা খোলসা হল না। সে বারবার আড়চোখে মানুষদুটির দিকে তাকাতে লাগল। এখন অবশ্য ওরা তার দিকে ঘুরে তাকাচ্ছে না।

প্রিয়ম্বদাদের বাড়ির কাছের স্টপেজটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে দ্রুতবাস থেকে নেমে পড়ল। আড় চোখে সে হঠাৎ দেখল বাসের আগের সিটে বসে থাকা মানুষগুলিও নামার জন্য সিট থেকে উঠে দাঁড়াল। তার বুকটা হঠাৎ ধক করে উঠল। কোন দিকে না তাকিয়ে সে দ্রুত প্রিয়ম্বদাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। গেটটা খুলে ভেতরে ঢুকে সে কম্পাউন্ডের ভেতর থেকে মানুষগুলি কোন দিকে গেল দেখতে লাগল। ওই যে মানুষ দুটি সামনের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওরা পান খাচ্ছে। একজন পিক ফেলে তার দিকে ফিরে তাকাল।

তার সন্দেহ ঠিকই। ওরা তার ওপরেই চোখ রাখছে।

বুকের ধুকপুকানি নিয়ে প্রিয়ম্বদাদের বাড়ির বারান্দায় উঠে কলিং বেলটা বাজাল।

বেল বাজার সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়ম্বদা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।’ এত দেরি করলে’, সে অনুযোগের সুরে জিজ্ঞেস করল।’ আমি তুমি আসবে না বলেই ভেবেছিলাম। আজ আর অফিসে যাব না বলে জামাকাপড় বদলে নিতে যাচ্ছিলাম।’

শ্রীমানের এরকম মনে হল যেন সে তার আসার জন্য পথ চেয়েছিল। তার মনটা ভালো হয়ে গেল।

‘ সরি, বাড়িতে লোকজন এসেছিল। তাই দেরি হয়ে গেল।’

‘ এসো, ভেতরে এসো। এক কাপ চা খেয়ে যাও।’

‘এখন?’

‘ হবে এসো। মাকেও তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।’

একটা ছিমছাম ড্রয়িং রুমে সে তাকে নিয়ে গিয়ে বসাল।

চা এল। মা এল। মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল। সাদা লোমশ স্পীৎজ কুকুরটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল। পরিচয় পর্ব এবং চা-পর্ব শেষ হওয়ার পরে সে তার পুরোনো মডেলের মারুতি স্টিয়ারিং হুইলে বসল। আর খোলা গেট দিয়ে দুজনেই বেরিয়ে গেল। 

প্রিয়ম্বদার কাছে থাকার সময় এতক্ষণ সে মানুষ  দুটির কথা ভুলে ছিল। এখন গেটের বাইরে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে তার চট করে মনে পড়ে গেল। বুকটা তার পুনরায় ধকধক করে উঠল। না, মানুষ দুটি নেই। রক্ষা। সে বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল।

‘ কী হল?’ তার হাতটা একটু টিপে ধরে প্রিয়ম্বদা জিজ্ঞেস করল।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলছ যে।’

শ্রীমান পুলকিত হয়ে উঠল। সে একটা হাসি হেসে বলল,’ না এমনিতেই।’

ভাই বাড়িতে রেখে যাওয়া এবং মা ধুয়ে ইস্তারি করে রাখা একটা শার্ট পরে সে এসেছে আজ। সকালে বেরিয়ে আসার সময় সে প্রথমবারের জন্য ভাবল– তার তো দেখছি ভালো কাপড় নেই। জীনসটা চলবে। কিন্তু শার্ট চাই। তার নিজের অপরিষ্কার শার্টটা পছন্দ হল না। ভাইয়ের শার্টটা দেখে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

কয়েকটা শার্ট কিনতে হবে।জীনস চলে যাবে…   ….

অফিসের কম্পাউন্ডে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল ভেতর থেকে দ্রুত কৌশিক বেরিয়ে আসছে। বাইরে মোটরসাইকেল নিয়ে একজন তার জন্য অপেক্ষা  করছে। ওরা তিনজনেই  একে অপরকে একই সময়ে দেখতে পেল বলা যেতে পারে। শ্রীমানের মনে হল কৌশিকের দু চোখে ফুটে উঠেছে অবাক বিষ্ময়। তার মনটা হঠাৎ ভালো লেগে গেল। হাতটা তুলে সে কৌশিককে হাত নেড়ে তার সামনে দিয়েই পর্চের সামনে দিয়ে অফিসের পেছনে থাকা গাড়ি রাখা জায়গায় এগিয়ে গেল।

প্রিয়ম্বদা তাকে কিছু একটা বলছিল। বাড়ি থেকে বেরোনোর পর থেকেই সে অনর্গল কথা বলছিল। হঠাৎ কৌশিককে দেখে সে কথার মধ্যেই সশব্দে হেসে উঠল– যেন সে বলে থাকা কথার মাঝখানে হাসার কোনো কথা ছিল। আর হাসতে হাসতে সে শ্রীমানের গায়ে ঢলে পড়তে লাগল। শ্রীমান আশ্চর্য হল। তার কথার মধ্যে এত হাসির কী আছে সে বুঝতে পারল না।

‘হেঃ কী করছ’, সে বলে উঠল।’ এক্সিডেন্ট হয়ে যাবে এখন।’ সত্যিই গাড়িটা একটু এদিক ওদিক হয়ে পড়েছিল। অফিসের লোকরা কী বলবে?কৌশিক?

প্রিয়ম্বদা  পেছনে দেখার আয়নাটাতে উকি দিয়ে দেখতে চেষ্টা করছিল।

গাড়িটা দাঁড় করিয়ে এসে অফিসের দিকে তাকাতেই দেখল কৌশিক হঠাৎ  ঘুরে মোটরসাইকেলের পেছনে উঠল। এতক্ষণ যে সে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিল শ্রীমান তা বুঝতে পারল।

‘ কৌশিকের কী হয়েছে?’ গাড়ি থেকে নেমে শ্রীমান জিজ্ঞেস করল।’ তোমাদের মধ্যে কিছু হয়েছে নাকি?’

বাদ দাও ওর কথা,’ প্রিয়ম্বদা বলল। সে একটা অসভ্য,আনকুথ, মতলবী ছেলে।’

‘ কেন? কেন বললে এভাবে?’

‘ ছেড়ে দাও তার কথা। ওকে আমার দেখতে ইচ্ছা করে না’; অফিসে ঢোকার সময় প্রিয়ম্বদা বলল। সে আমাকে, তার কলিগকে, তার মতলব পূরণ করার জন্য ব্যবহার করতে চায়। তুমি পারবে এরকম জঘন্য কথা ভাবতে? চিন্তা করতে?’

শ্রীমান নীরব হয়ে পড়ল। হঠাৎ তার চোখের সামনে ভেসে উঠল রমেন এনে দেওয়া রঙিণ বইয়ের মৈথুনরত ছবিগুলো– যেন ফাস্ট ফরওয়ার্ডে ঘুরতে লাগল ছবিগুলি হু হু করে– মতলব– কীসের মতলব? সে চুপি চুপি এসে অফিসের ভেতরে ঢুকল।

আজ দিদি এসে বসে আছে। ছিঃআজ দেরি হয়ে গেল। ভেতরে কয়েকজন মানুষ আছে। কথাবার্তার অনুচ্চ শব্দ কাঠের পার্টিশনের ওপাশ থেকে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে।

‘ আজ কিছু একটা হয়েছে বুঝেছ,’প্রিয়ম্বদা তাকে বলল।’ ব্যাপারটা দেখে আসি দাঁড়াও।’

‘ কোথায় যাও? ভেতরে মানুষ আছে।’

‘ না জানার ভান করে ঢুকে যাই। ঘর থেকে বের করে তো দেবে না। তা না হলে ভেতরে ফিসফিস গুরগুর কী চলছে জানতে পারব না,’ সে দ্রুত দিদি-র রুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল। শ্রীমান ধীরে ধীরে নিজের ডেস্কে  গিয়ে বসল। টেবিলের তালা খুলে ভেতরের কাগজপত্র গুলি বের করে নিল। কয়েকদিন থেকে সম্পাদক করতে দেওয়া অনুবাদের কাজগুলি আধা হয়ে পড়ে আছে। সম্পাদকও সেই সবের কোনো খোঁজ খবর করেনি। কাগজ কবে বের হবে কোনো ঠিক নেই। বের হবে কিনা তারও ঠিক নেই। সে ডেস্কে বসে ভাবতে লাগল– কাগজ যদি না বের হয় কী হবে! এই কয়েকদিন না বেরোনো কাগজের সাংবাদিক হয়েই তার বেশ ভালো লাগছিল। যদি কাগজ না বের হয় তাহলে– তখন আর তার সাংবাদিক হওয়া হবে না। অন্য কোনো কাগজে চট করে কোথায় চাকরি পাবে? কাগজ বের না হওয়া কাগজে কাজ করা সাংবাদিকের বাজারদর কি থাকবে? কে জানে দিদি কী করছে! কাগজ বের করার ব্যাপারটা চাপা পড়ে গেছে দেখছি। সেদিন পরিচিত একজন মানুষ মন্তব্য করেছিল যে একটা কাগজ বের করা কত শক্ত সেই বিষয়ে চিন্তাভাবনা না করেই কাগজ বের করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল বোধহয়। এখন কাজটাতে অনেক অসুবিধা জনক দেখে  ভয় পাচ্ছে। থমকে গেছে। এরা তো সাংবাদিকতার সেবা করার জন্য কাগজ বের করার কথা ভাবেনি, শখ এবং তাৎক্ষণিকভাবে কোনো রাজনৈতিক লাভ হয় নাকি একথা ভেবে কাগজ বের করতে উদ্যোগ নিয়েছিল। মাত্র কয়েক বছর মন্ত্রী হয়েই এত সম্পত্তি করে ফেলেছিল যে শখের কাগজ বের করার কথা চিন্তা করতে সক্ষম হয়েছিল।’ এসব একেবারে ক্ষণস্থায়ী শখ বুঝেছ, ফেড, ফেড  যাকে বলে,’ লোকটি বলছিল।’ অসুবিধার সম্মুখীন হলেই এই শখ উড়ে যায়। কিছুদিন বের করে লোকসান ভরুক তো, তখন কোথাকার শখ কোথায় যায় দেখবে।

এখন পর্যন্ত তো লোকসানে চলছে। এই ঘর, অফিস ,স্টাফ, ফার্নিচার, এসবই দেখছি বহু লাখ টাকার কারবার!

টেবিলের ওপরে কাগজপত্রের স্তূপ নিয়ে আকাশ পাতাল ভেবে শ্রীমান চুপ করেছিল। হঠাৎ কড়াৎ করে একটা দরজা খুলে গেল।

প্ৰিয়ম্বদা বেরিয়েছে নাকি? আবার বের করে দিল নাকি? শ্রীমান ভাবল।

‘ একা বসে কী করছিস?

 অবিনাশ! তুইও ছিলি নাকি ভেতরে?

অবিনাশ এসে তার ডেক্সের কাছে বসল।

প্রিয়ম্বদা ভেতরে কী করছে?’

‘ তোর কি প্রয়োজন? অবিনাশ হঠাৎ বেশ তীক্ষ্ণভাবে জিজ্ঞেস করল।

শ্রীমান অবিনাশের মুখের দিকে তাকাল। সে একটু হাসছে। হয়তো না জেনেই।

‘ এমনিতেই জিজ্ঞেস করছি’,শ্ৰীমানও সাধারণভাবে উত্তরটা দিতে চেষ্টা করল।

‘ দিদি কে  তেল দিচ্ছে,’ অবিনাশ আস্তে করে উত্তর দিল। স্পেসিয়ালিস্ট সেই কাজ।’ সে যোগ দিলো তারপর সে বাঁকা হাসি হেসে বলল,’ তোর নাকি আজকাল প্ৰিয়ম্বদার সঙ্গে খুব ভাব, একসঙ্গে ঘুরে বেড়াস। কৌশিককে তুই নাকি সরিয়ে দিয়েছিস, তাই কি? অবিনাশ যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল।

‘ কি বলছিস তুই এসব? শ্রীমান আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল। গতকাল আর আজ মাত্র…  …’ তার কথা শেষ হল না।

‘যা করবি সাবধানে করবি, অবিনাশ বলল।’

‘ দাড়া, কোথায় যাস? কথাটা কী বলে যা।’

‘ এখন দাঁড়াব না। তুই আমার অফিসে আসিস। আজ আমি অনেক দেরি পর্যন্ত থাকব। সেখানে বলব। অবিনাশ উঠে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হল। যাবার আগে এসে কিছুক্ষণ ফিসফিস করে বলার মতো বলে গেল,’প্ৰিয়ম্বদা, কৌশিক দুজনেই কিন্তু সুবিধেজনক মানুষ নয়। তুই মাঝখানে ফেঁসে গিয়ে মরবি।’

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত