| 24 এপ্রিল 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: বিস্ফোরণ । যুগান্তর মিত্র

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

আজ প্রিয়াংকার বিয়ে হয়ে গেল। আজ না-বলে গতকালই বলা যাক, কেননা বিয়ের লগ্ন ছিল রাত বারোটার গা-ঘেঁসে। তারপরও বেশ খানিকটা সময়ও কেটে গেছে।

এই বিয়ে উপলক্ষ্যে গতকাল কাক-ডাকা ভোরে আমাদের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল। কুয়াশা মোড়া আবছা আলোয় শুধুমাত্র আমরাই হয়তো তখন রাস্তার ধারে; মহা উৎসাহে চলছিল আমাদের কর্মসূচি। হয়তো বলছি, কারণ সেইসময় অন্য কারও দিকে তাকানোর ফুরসতই ছিল না আমাদের।

প্রিয়াংকার বিয়ে নিয়ে আমাদের উত্তেজনার শেষ ছিল না। আবার আমাদের অনেকেরই বুকের ভেতরে চিনচিনে ব্যথাও ছিল। আমাদের বলতে আমি, সুকৃতী, বিধান, মন্টাই, শুভ, শ্যামল, জয়দীপ এবং আরও কেউ কেউ। একসাথে উত্তেজনা আবার চিনচিনে ব্যথা ব্যাপারটা হয়তো মানানসই নয়। কিন্তু আমার অনুভূতিটা এইরকমই। অন্যদেরও একই অবস্থা হওয়ার কথা। সেসব না-হয় অন্য কখনও বলা যাবে।

প্রিয়াংকার পরিচয় একটু দিয়ে রাখি। ‘সেভ নেচার’ সংগঠনের সদস্যা প্রিয়াংকার বিয়েতে আমাদের বিরাট দায়িত্ব ছিল। এই দায়িত্বটা দিয়েছিলেন সতীশকাকু, মানে প্রিয়াংকার বাবা। পুরো ব্যাপারটা খোলসা করা যাক।

একেবারে শুরু থেকেই ঘটনাটা বলছি। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ঠিক করেছিলাম এলাকার বিভিন্ন জায়গায় গাছ লাগাব। এর জন্য একটা সংগঠনও গড়ে নিতে হয়েছে। বৃক্ষরোপণের ব্যাপারে আমাদের খুব সাহায্য করেছে পুরসভা। আবার ঠিক পুরসভাও নয়, সবথেকে বেশি যাঁর থেকে সাহায্য পেয়েছি, তিনি হলেন সুব্রত জেঠু। সেইসময় এলাকার ডাইসাইটে কাউন্সিলার ছিলেন। প্রথমদিকে বেশ কয়েক বছর জেঠুই বেশিরভাগ গাছের যোগান দিয়েছেন। তারপর একসময় তাঁর কাউন্সিলারের পদ হাতছাড়া হল। অন্য দলের লোক সেই পদ পেলেন। নতুন কাউন্সিলারের থেকে এ ব্যাপারে সাহায্য পাই না ঠিকই, তবে বিরোধীতাও আসে না। সুব্রত জেঠু ছাড়া ব্যক্তিগতভাবেও কেউ কেউ গাছ দিয়েছেন বা গাছ কেনার টাকা দিয়েছেন। এখন অবশ্য বৃক্ষরোপণের জন্য নানা সূত্র থেকে আমরা সহযোগিতা পাই। নিজেদের পাড়া ছাড়িয়ে আমাদের কর্মকাণ্ড আশপাশের পাড়াতেও গড়িয়েছে।

তখন আমরা সবে মাধ্যমিক পাশ করে ইলেভেনে ভর্তি হয়েছি। কেউ কাছের স্কুলে, কারও স্কুল কিছুটা দূরে। আমাদের পড়াশোনাও চলছিল জোরকদমে। কয়কেজন মিলে টিউশন স্যারের বাড়ি দলবেঁধে যাওয়া, পড়ার আগে-পরে স্যারেদের বাড়ির সামনে বা অন্য কোথাও একটু আড্ডা মারা। সেইসঙ্গে চলছিল ভোর থেকেই স্কুলমাঠে ফুটবল পেটানো। সেখানে অবশ্য স্কুলের বন্ধুদের পাশাপাশি পাড়ার অন্য বন্ধুরাও আসত। সেইরকমই একদিন ফুটবল পিটিয়ে বসে গল্প করছি। বিধান বলেছিল, ‘এলাকায় কেমন গাছপালা কমে গেছে দেখেছিস? গাছ কেটে সাফ করে হাইরাইজ বিল্ডিং উঠছে!’

এ খবর আমরা সবাই জানি। আমাদের চোখের সামনেই একে একে জমিবাড়ি চলে যাচ্ছিল প্রোমোটারদের হাতে। স্বভাবতই সেইসব জমির গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছিল। সেইসঙ্গে জলাশয় বুজিয়েও গড়ে উঠছিল প্রোমোটিং ব্যবসা। ওরা অবশ্য প্রোমোটিংকে বলত ডেভেলপিং। সেই ডেভেলপমেন্টের ঝোড়ো হাওয়ায় ভেসে গিয়ে আমাদের কারও কারও বাবা-মা-কাকা ফ্ল্যাট বুকিং করতেও তৎপর ছিলেন। ফলে বিধানের কথায় খুব-একটা গুরুত্ব দিইনি আমরা। বিধান আবার বলে উঠেছিল, ‘বিপুল স্যার বলছিলেন এমন একদিন আসবে, যখন সবাইকেই পিছনে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ঘুরতে হবে।’ কথাটা শুনে আমরা হইহই করে হাসিমস্করা করছিলাম। কেননা পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্যটা কল্পনা করে বেশ মজা পেয়েছিলাম। কিন্তু পরক্ষণেই সব মজা উবেও গেল। ব্যাপারটা যে খুবই সিরিয়াস, আমরা বুঝতে পেরেছিলাম। বিধানই প্রস্তাব দিল এলাকায় গাছ লাগানো যায় কিনা ভাবতে। তারপর থেকে কয়েকদিন খেলার সময় কমিয়ে আমরা সেইসব নিয়ে আলোচনা করতাম। কিন্তু শুধু আলোচনা করলেই তো হবে না, তার জন্য চাই নির্দিষ্ট প্ল্যান-প্রোগ্রাম। তাই ঠিক হল সবাই মিলে বসতে হবে। সবাই বলতে এলাকার বড়দেরও সঙ্গে নিতে চেয়েছিলাম আমরা। আসলে এই ব্যাপারে টাকাপয়সা ও অন্যান্য সাহায্যেরও প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া আমাদের সাহসের অভাবও ছিল।

‘এসব করার ক্ষেত্রে একটা ব্যানার থাকলে ভালো হয়। অন্তত থাকা উচিত।’ বলেছিলেন সুব্রত জেঠু। ওনার বাড়িতেই বসেছিল আলোচনা সভা। আসলে সুব্রত জেঠুর বাড়ির ছাদটা বিরাট বড়, তাই ওই জায়গাটা আমাদের সবারই খুব পছন্দের ছিল। উনি নিজেও ওখানে বসেই আলোচনার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। অনেকেই আসার কথা বলেও আসেননি, ফলে জনা পনেরো লোক নিয়ে বৈঠকটা হয়েছিল। এক-একজন এক-একটা নামের প্রস্তাব দিচ্ছিল। ‘আমরা সবাই’, ‘নতুন কুড়ি’ এইরকম আরও কিছু নাম উঠে আসার পর তরুণ সঙ্ঘের সভাপতি বীরুপাক্ষকাকু নাম বলেছিলেন ‘প্রকৃতি বাঁচাও’। নামটার মধ্যে কেমন যেন স্লোগান-স্লোগান ভাব আছে বলে কারওই পছন্দ হয়নি। সুব্রত জেঠু যখন ‘লাভ নেচার’ নামটা প্রস্তাব করলেন, আমরা হইহই করে সমর্থন জানিয়েছিলাম। যাকে বলে ধ্বনিভোটে জয়। তবে বীরুপাক্ষকাকুর নামটা পছন্দ না-হলেও অন্য প্রস্তাব আমরা লুফে নিয়েছিলাম। প্রথমবার এলাকায় বৃক্ষরোপণের জন্য যে কুড়িটার মতো গাছ পেয়েছিলাম, তার প্রায় পুরোটাই তাঁর দেওয়া। ওই একবারই অবশ্য গাছ দিয়েছিলেন। পরের সপ্তাহ থেকে পরপর কয়েক সপ্তাহ পুরসভা থেকে এনে গাছের জোগান দিয়ে গেছেন সুব্রত জেঠু। আমরাও চাঁদা তুলে কিছু কিছু গাছ কিনতাম। গাছের চারপাশে ঘিরে দেওয়ার জন্য গোলাকার বেড়া কিনতাম। আর থাকত ‘লাভ নেচার’ লেখা ছোট্ট টিনের প্ল্যাকার্ড। আমরা প্রতি রবিবার ভোরে বৃক্ষরোপণ অভিযানে বেরোতাম।

প্রিয়াংকাকে নিয়ে বলা শুরু করেছিলাম, চলে গেলাম অন্য প্রসঙ্গে! আবার প্রিয়াংকার কথায় ফিরে আসি।

শিবানী পিসি একদিন আমাদের দলের মাঝে এসে বললেন, ‘তোদের এই বৃক্ষবালকের দলে আমিও যোগ দিতে চাই। এই বুড়িটাকে নিবি?’ তখনও আমাদের দলে কোনও মহিলা ছিল না। তাই ‘বৃক্ষবালক’ শব্দটা একেবারে লাগসই ছিল। পিসিকে না-নেওয়ার মতো কিছু ছিল না। অবিবাহিতা শিবানী পিসি প্রিয়াংকার একমাত্র পিসি। তবে মোটেই বুড়ি নন। কাছাকাছিই একটা স্কুলের ইংরেজির দিদিমণি। সবসময়ই খোশমেজাজে থাকেন। প্রিয়াংকাদের বাড়ির পাশের জমিতে আলাদা করে একটা একতলা বাড়ি করে নিয়েছেন। সেই বাড়ির সামনে ছোট্ট বাগান করেছেন। তাতে যেমন ফুলগাছ আছে অনেক, তেমনি আছে বেগুন আর লংকা গাছও। শিবানী পিসি প্রথম যেদিন খুব ভোরে আমাদের সঙ্গে গাছ লাগাতে বেরিয়েছিলেন, সেদিন প্রিয়াংকাকেও সঙ্গে এনেছিলেন। আমরা অবাক হয়েছিলাম। কেননা পিসি যে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষিকা, সেই সুনীতিবালা গার্ল স্কুলে পড়ত প্রিয়াংকা। হয়তো ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ত বলেই আলাদা রকমের অহং ছিল। আমরা সেরকমই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ক্লাশ নাইনে পড়া প্রিয়াংকা যখন রাস্তা দিয়ে স্কুলে বা অন্য কোথাও যেত, তখন মনে হত সদ্য ডানা-গজানো একটা পরি উড়ে উড়ে চলেছে। আমাদের অনেকেরই ওর দিকে চোখ ছিল। আমারও ছিল। ওর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতাম খুব। আমরা ভাবতাম ও অহংকারের জন্যই আমাদের পাত্তা দিচ্ছে না। এই নিয়ে মনে মনে ক্ষোভ ছিল প্রায় প্রত্যেকেরই। সেই মেয়ে পিসির সঙ্গে একেবারে আমাদের কর্মসূচিতে! পরে বুঝতে পেরেছি, ও আসলে মিশতে পারত না কারও সঙ্গে সহজে। তবে আমাদের দলে ভিড়ে যাওয়ার পরে প্রিয়াংকা দারুণভাবে মিশে গিয়েছিল। অর্ণব তো ওকে প্রেমের প্রস্তাবও দিয়েছিল। এই নিয়ে দিনকয়েক আমাদের মধ্যে চাপা কথাবার্তা চালাচালিও হয়েছিল। অর্ণবের যে ওই আচরণ করা ঠিক হয়নি, আমরা সবাই মেনে নিয়েছিলাম। আবার এও ঠিক, মনে মনে আমরা অনেকেই প্রিয়াংকাকে এইরকম প্রস্তাব দিয়েছি কত! প্রকাশ্যে বলার সাহস দেখিয়েছে একমাত্র অর্ণব। তাই ওর প্রতি চাপা সম্ভ্রমও তৈরি হয়েছিল। একসময় অর্ণব আমাদের দল ছেড়ে দিল। ‘ভোরে উঠে গাছপালা লাগানোর থেকে পড়াশোনায় মন দেওয়া ভালো’—এমন কথা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছিল সে। আমরাও স্বস্তি পেয়েছিলাম। কেননা অর্ণবের জন্য দলের মধ্যে যে গুমোট আবহাওয়া ছিল, সেটা কেটে গিয়েছিল।


আরো পড়ুন: গল্প: হাসপাতাল হ্যালুসিনেশন । ক্ষমা মাহমুদ


আমরা বছরের নানা সময়ে বৃক্ষরোপণ করি। এমনকি শীত-কুয়াশার চাদর সরিয়েও আমরা গাছ লাগিয়েছি। কোনো কোনো গাছ পরিচর্যার অভাবে মরে যেত। সব জায়গায় তো আমরা গাছগুলোর দেখাশোনা করতে পারতাম না! এলাকার লোকজনদের বলে রাখতাম জল-টল দিতে। কেউ দিত, কেউ দিত না। ফলে কিছু গাছ মরে যেত, কিংবা অন্যভাবে নষ্ট হয়ে যেত। সেইসব জায়গায় আবার গাছ লাগাতাম। এভাবেই আমরা কখন যেন অনেকটাই বড় হয়ে গেলাম! অনেকেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফেলেছি। কেউ কেউ চাকরিও পেয়ে গেছে। ইদানিং প্রিয়াংকা খুব কমই আসত। শিবানী পিসিও কোমরের ব্যথা বাড়লে আসতেন না।

গত মাসের প্রথম রবিবারের ঘটনা। তখন আমাদের বৃক্ষরোপণ চলছিল কাছাকাছি অঞ্চলেই। সেইসময় অবাক হয়ে দেখছিলাম সতীশকাকু এসে দাঁড়িয়েছেন। মুখে হাসি আর মাথায় উলের টুপি চেপে বসে আছে। উলের টুপি পরার মতো ঠান্ডা ত্রিসীমানায় নেই, তবু সেভাবেই বেরিয়েছিলেন ভোরে। অবশ্য সেজন্য যতটা না অবাক হয়েছিলাম, তাঁর থেকেও বেশি অবাক হয়েছিলাম অন্য কারণে। সতীশকাকু এইসব গাছপালা লাগানোর ব্যাপারে মোটেই আগ্রহী নন। এমনকি আমাদের এই নিয়ে ঠারেঠোরে কথাও শুনিয়েছেন দু-একবার। ‘ফালতু কাজে’ সময় নষ্ট করছি বলে মনে হয়েছিল তাঁর। আমরা সেসবে গুরুত্ব দিইনি। শিবানী পিসির থেকে শুনেছি, প্রিয়াংকা যে ভোরবেলায় আমাদের সঙ্গে যোগ দিত, এতেও নাকি আপত্তি জানিয়েছেন বেশ কয়েকবার। নেহাত নিজের বোন জড়িয়ে আছেন, এবং এই বোন দাদার সংসারে নানাভাবে সাহায্য করেন, তাই বাধা দিতে পারেননি সেভাবে। সেই তিনি এখানে কেন? একটু পরেই জানতে পেরেছিলাম প্রিয়াংকার বিয়ে এবং আমাদের নাকি ‘গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব’ নিতে হবে।

ঠিক দু-সপ্তাহ আগের রবিবারই আমাদের সঙ্গে প্রিয়াংকাও বৃক্ষরোপণের সময় ছিল। শিবানী পিসিও ছিলেন। কই, আমরা তো জানতে পারিনি ওর বিয়ের ব্যাপারে! প্রিয়ংকা বলেনি, শিবানী পিসিও বলেননি! কেসটা কী? তাহলে কী হঠাৎ করেই বিয়ে ঠিক হল? এইসব প্রশ্ন নিশ্চয়ই আমার মতোই সবার মাথাতেই এসেছিল। কিন্তু প্রশ্নটা করে উঠতে পারিনি কেউই। এর মধ্যেই মন্টাই বলে উঠেছিল, ‘আমাদের কী করতে হবে কাকু?’

—কী করতে হবে না, তাই বলো! আমি একা মানুষ। তোমরাই তো সব। তোমরা না-থাকলে চলে নাকি? সিরিয়াস মুখ করে কথাটা বলেছিলেন। এরপর সতীশকাকু বিয়ের জোগাড়যন্ত্রের নানা ফিরিস্তি শুনিয়ে আমাদের কাজের কথা বলেছিলেন। তাও একবারেই কাজের কথায় আসেননি। নানা গলিঘুঁজি ঘুরে তবে কাজটা সম্পর্কে জানিয়েছেন।

ডেকরেটার্স, ক্যাটারিং, লাইটের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এমনকি ‘মোনালিসা অ্যাপার্টমেন্ট’-এর ভাড়াবাড়িও বিয়ের জন্য বুক করে ফেলেছেন। এসব জানিয়ে বলেছিলেন, ‘সব ব্যবস্থাই পাকা, বুঝলে। শুধু সেদিন ভোরে একটা খুব খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে তোমাদের।’

‘ভোরে কাজ? গুরুত্বপূর্ণ?’ কে যেন প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়েছিল, ঠিক খেয়াল করতে পারিনি। কেননা আমরা সবাই হয়তো সতীশকাকুর দুবার ‘খুব’ উচ্চারণে আটকে গিয়েছিলাম।

—হ্যাঁ হ্যাঁ, ভোরে। সেই সময়ের কাজটাই তো আসল। সেটা আবার তোমাদেরই করতে হবে। কী কাজ পরে বলছি। ছেলের বাড়ির সম্মতি পেয়েছি। তবু আর-একবার কথা বলে নিতে চাই। আফটার অল ওদের ফাইনাল মতামতটাও জানা জরুরি।

বিস্ময়ে আমাদের সবারই চোয়াল ঝুলে পড়েছিল। কী এমন কাজ, যেটা ছেলের বাড়ির সঙ্গে কথা বলে ঠিক করতে হবে? আর সেই কাজটা করতে হবে আমাদেরই?

সতীশকাকু প্রথমে পাত্র সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত বর্ণনা দিলেন। পাত্রের নাম শুনেই আমার মাথার মধ্যে ছিটকে উঠেছিল আগুন। ট্রেনের প্যান্টোগ্রাফ আর তারের ঘর্ষণে যেমন মাঝে মাঝেই চিরিক চিরিক করে আলো ছিটকে ওঠে, সেইরকম। কিছুক্ষণ পরে আমার বুকে চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়েছিল।

দেবাংশুদাকে আমরা প্রত্যেকেই খুব ভালো করে চিনি। পড়াশোনায় মোটামুটি রকমের হলেও কীভাবে যেন একটা বড়সড় মাল্টিন্যাশনাল ফার্মে চাকরি পেয়ে গেছে। অত্যন্ত দামি আর ঝকঝকে বাইক চালিয়ে ছুটির বিকেলে ঘুরে বেড়াত আমাদের এলাকায়। আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম আর ‘ঐরকম একটা বাইক ঠিক কিনে ফেলব’ ভাবতাম মনে মনে। কেন দেবাংশুদা প্রায়ই এদিকে আসত, সেসব তখন বুঝতেও পারিনি! তবে সেজন্য নয়, ওকে ভালোমতো চেনার অন্য কারণ আছে। বছর দুয়েক আগের কথা। এক ভোরে গাছ লাগাতে গিয়েছিলাম দেবাংশুদাদের পাড়ায়। ওখানকার অনেকের মধ্যেই বেশ উৎসাহ দেখেছিলাম। দেবাংশুদা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলেছিল, ‘আমাদের বাড়ির সামনে যে তোরা গাছ লাগাচ্ছিস, আমাদের অনুমতি নিয়েছিস?’

বলার ভঙ্গিটা এমন ছিল, যেন ক্ষমাহীন অপরাধ করে ফেলেছি আমরা। এটুকুই নয়, আরও নানা কথা গজগজ করে বলছিল। বিল্টু তেড়ে গিয়েছিল, ‘এটা কি তোমাদের কেনা জায়গা? মিউনিসিপ্যালিটির…।’

—খুব যে বড় বড় কথা বলছিস, আমি যদি তোদের বাড়ির সামনে গিয়ে ভ্যাটের ময়লা ফেলে আসি, তখনও কি বলবি মিউনিসিপালিটির জায়গা?

—বেশ। ফেলে এসো! তোমার যদি ময়লা ঘাঁটতে ভালো লাগে, তাহলে ফেলবে। জবাব দিয়েছিল বিল্টু।

আরও কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটির পরে স্থানীয় কয়েকজন দেবাংশুদাকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের দলের নবীন সদস্য বিল্টুর সেদিনের ভূমিকায় আমরা বেজায় খুশি হয়েছিলাম।

হঠাৎ সতীশকাকু আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, ‘আমাদের বাড়ি থেকে আমার জামাইয়ের বাড়ির দূরত্ব মোটামুটি কেমন হবে বলতে পারো?’

আচমকা ভেসে আসা প্রশ্নে বুকের ব্যথা সামলে আমি যখন জবাব হাতড়াচ্ছি, সেইসময় দলের আর-এক নতুন সদস্য ভুতো জবাব দিয়েছিল, ‘তা প্রায় দেড় কিলোমিটার হবে।’

—আমি তাহলে ঠিকঠাকই আন্দাজ করেছিলাম। তার মানে দেড় হাজার মিটার। একটা গাছ থেকে অন্য গাছের দূরত্ব যদি তিরিশ মিটার হয়, তাহলে একদিকে লাগবে পঞ্চাশটা গাছ। দুদিক মিলিয়ে একশোটা। মাঝে অবশ্য দু-এক জায়গায় গাছ লাগানো যাবে না।

নিজের মনেই বিড়বিড় করলেও সতীশকাকুর সব কথাই আমাদের কানে পৌঁছেছিল। আমরা বিন্দুবিসর্গ বুঝতে না-পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলাম শুধু।

—একশোটা গাছ মানে কী? একটু ঝেড়ে কাশুন তো! বলেছিল অর্ক।

দুমদাম কথা বলা অর্কর বদ অভ্যেস। এই নিয়ে কয়েকবার আমরা সামান্য সমস্যায় পড়েছিলাম। এমনকি একবার তো বর্তমান কাউন্সিলারকেও তেড়িয়া হয়ে কী একটা বলেছিল বলে খুব রাগারাগি করেছিলেন তিনি। তবে সতীশকাকু রাগলেন না। মুখে হাসির আলখাল্লা ঝুলিয়ে আর উজ্জ্বল আলো জ্বেলে বললেন, ‘আমার বাড়ি থেকে জামাইয়ের বাড়ি দেড় কিলোমিটার টানা রাস্তা। তার দুপাশে জারুল, শিমুল, পলাশ, পিপুল, দেবদারু এইসব গাছ লাগানো হবে। আর সেটা করবে তোমরা। মানে তোমাদের ‘লাভ নেচার’। আমার প্রিয়াংকা মায়ের সেরকমই ইচ্ছে। এসব হবে বিয়ের দিন ভোরে। আর সেদিনই একটু বেলার দিকে আমাদের আর দেবাংশুদের বাড়িতে লাগাতে হবে একজোড়া মেহগনি গাছ। গাছের চারিদিকে সুন্দর করে বাঁধিয়ে দেওয়া হবে। আইডিয়াটা কেমন?’ ভুরু নাচিয়ে প্রশ্নটা ভাসিয়ে দিয়েই চোখ ঘোরাচ্ছিলেন চারিদিকে। কার কী প্রতিক্রিয়া দেখে নিতে চাইছিলেন।

—কিন্তু কাকু, এতগুলো গাছ লাগাতে গেলে তো মিউনিসিপালিটির পারমিশান নেওয়া উচিত। সুকৃতি এমনভাবে কথাটা বলেছিল, যেন এই ব্যাপারটা নিয়ে সে খুব চিন্তিত। কিন্তু যার উদ্দেশে বলা, তাঁর কন্ঠে কোনও উদ্বিগ্ন ভাব নেই। চোখে হাসির চিহ্ন এঁকে জবাব দিয়েছিলেন, ‘এসব ব্যাপারে আমি খুব পারফেক্ট। দু-হপ্তা আগেই দরখাস্ত দিয়েছিলাম। বারবার তদ্বির করে চেয়ারম্যানের লিখিত পারমিশানও আদায় করে নিয়েছি।’

আমরা এর-ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম। এতদিন কারও জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকীর বিশেষ দিনে সেইসব বাড়িতে গাছ লাগিয়েছি তাদের আমন্ত্রণে। তাও দু-চারটে গাছ বড়জোর। দু-মাস আগে কৃষ্টির জন্মদিন উপলক্ষ্যে ওর মা মালাদিদি এসে বলেছিল গাছ লাগানোর কথা। আমরা উৎফুল্ল হয়ে গাছ লাগিয়ে এসেছি ওদের বাড়ি আর বাড়ির সামনের জায়গাটায়। কিন্তু এইরকম বিরাট অঞ্চলে, কোনও একটা অনুষ্ঠান সামনে রেখে, এত গাছ লাগাইনি কখনও! যে রাস্তায় গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, সেটার ধারে আমরা গাছ লাগাইনি বেশি। সাধারণত পাড়ার গলির ধারেই গাছ লাগিয়েছি আমরা, চালু রাস্তার ধার এড়িয়ে যেতাম। এবার সেখানেই গাছ লাগাতে চলেছি! সতীশকাকুর মুখে তখন হাজার ওয়াটের আলো জ্বলছে। সেই আলো আমাদের সবার মুখেও ছড়িয়ে পড়েছিল।

অঘ্রাণের শীত হালকাই থাকে সাধারণত, কিন্তু এবার শীতটা একটু বেশিই পড়েছে। হালকা কুয়াশায় মোড়া পথ। তার মধ্যেই ভোর থেকে আমরা একে একে বৃক্ষরোপণ করে চললাম। দু-একদিন আগেই অবশ্য মাপঝোপ করা হয়ে গিয়েছিল। বেলা প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ রাস্তার দু-ধারের গাছ লাগানো শেষ করে ফেললাম আমরা। এমন একটা হইহই করা কাণ্ডে অনেক নতুন নতুন ছেলেমেয়ে জুটে গিয়েছিল। সেইসঙ্গে ছিল বিয়েবাড়িতে আসা আত্মীয়দের মধ্যেও কয়েকজন। এরপর বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ প্রিয়াংকাদের বাড়িতে, তারপর পা দেবাংশুদাদের বাড়িতে মেহগনি গাছ লাগিয়েছি আমরা জনাকয়েক বন্ধু। গাড়িতেই গিয়েছিলাম তখন। দেবাংশুদাকে দেখলাম হাসি-হাসি মুখে আমাদের কাজ দেখছে। তবে আমরা সচেতনভাবেই কেউ ওকে পাত্তা দিতে চাইনি।

বিয়ের সাজে প্রিয়াংকাকে দেখতে অসম্ভব ভালো লাগছিল। দেবাংশুর সঙ্গে কীভাবে প্রেম হল, কখন ওরা দেখা করত, এসবও মাথার মধ্যে কিলবিল করে যাচ্ছিল সারাটাক্ষণ।

রাত হেলতে হেলতে ভোরের দিকে এগোচ্ছে। আমি যখন বাসরঘরের কাছাকাছি ঘুরঘুর করছি, প্রিয়াংকার সঙ্গে দেখা করে বাড়ির পথ ধরব বলে, দেবাংশুদা আমাকে দেখেই প্রায় লাফ মেরে বেরিয়ে এল ঘর থেকে।

—অ্যাই ঋষভ শোন।

—কিছু বলবে?

কানের কাছে মুখ এনে প্রায় ফিসফিস করে বলল, আমাকে তোদের দলে নিবি?

—আমাদের দলে মানে?

—তোদের বৃক্ষরোপণ, মানে লাভ নেচারে?

—তুমি আসবে আমাদের দলে? হা হা করে হেসে উঠলাম। আচমকা একটা সাপ হিসহিস করে উঠল আমার ভেতরঘরে, ‘একদিন এ ব্যাপারে কী বলেছিলে মনে আছে?’

—ছাড় তো পুরনো কথা! স্যরি রে সেই ঘটনার জন্য। সেসব কথা আর মনে রাখিস না ভাই!

দেবাংশুদা যে আমাকে লাভ নেচারে যোগ দিতে চাওয়ার কথা জানিয়েছে, সেটা কি প্রিয়াংকাই শিখিয়ে দিয়েছিল? হতেই পারে। এমনিতেই প্রিয়াংকার জন্য একটা চিনচিনে ব্যথা বুকের মধ্যে ছিলই, সেইসঙ্গে রাগও জড়ো হল সেদিনের কথা মনে পড়ায়। তাই প্রসঙ্গটা তুললাম। চিবিয়ে চিবিয়ে জবাব দিলাম, ‘সবার সঙ্গে আলোচনা না-করে কী করে কথা দিই বলো! আগামী সপ্তাহে আমাদের কোর কমিটির মিটিংয়ে বিষয়টা তুলব। দেখি সবাই কী মতামত দেয়।’

আমাদের আবার কোর কমিটি? এসব কিছুই নেই। তাছাড়া দেবাংশুদা সঙ্গে থাকলে প্রিয়াংকা সহজেই আমাদের কর্মকাণ্ডে যোগ দিতে পারবে। নিয়মিত না হোক, মাঝে মাঝেই যে আসবে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। সেইসময় অন্তত প্রিয়াংকাকে কাছ থেকে দেখতে পাব। এইরকম সুযোগ হাতছাড়া হোক চাই না। আমি জানি এ ব্যাপারে কেউ আপত্তিও জানাবে না। বরং যাতে দ্রুত দেবাংশুদাকে দলে নেওয়া যায়, সেইজন্যই তদ্বির করব। তবু কথাগুলো বলতে পেরে ভালো লাগল কিছুটা। যেন ক্ষতের ওপর প্রলেপ পড়ল। সেই মলম লাগানো ক্ষতে তৃপ্তির হাত বোলাতে বোলাতে ঝাড়বাতির নীচে এসে দাঁড়ালাম।

—যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সিদ্ধান্ত জানাস ঋষভ। আমি কিন্তু সিরিয়াসলিই তোদের সঙ্গে থাকতে চাই। কথাগুলো বলে দেবাংশুদা বাসরঘরে ঢুকে পড়ল।

আমাদের পাড়ার স্বঘোষিত অভিভাবক কেষ্টদা এতক্ষণ মোটামুটি কাছাকাছিই ছিলেন। আমি ঝাড়বাতির দিকে সরে আসায় আমার কাছে এসে মুখে চুকচুক শব্দ করে বলল, ‘বৃক্ষরোপণ করিস, এদিকে বুকের মধ্যে যে বিষরোপণ করে রেখেছিস সে খেয়াল আছে?’

কেষ্টদার দিকে দৃষ্টি পেতে দিয়ে থমকে থাকলাম কিছুক্ষণ। সুকৃতী আমার সঙ্গে বাড়ির পথে যেতে যেতে জিজ্ঞাসা করল, ‘কেষ্টদা কী বলছিলেন রে? বিস্ফোরণ?’

আমি মিনমিন করে উচ্চারণ করলাম, ‘হুম। বিস্ফোরণ! এখন বাড়ি যা। কাল সব বলব।’ কথাটা বলেই সুকৃতীকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত বাড়ির দিকের অন্ধকার গলিপথ ধরলাম আমি।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত