| 19 এপ্রিল 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া অনুবাদ উপন্যাস: অর্থ (পর্ব-২৪) । ধ্রুবজ্যোতি বরা

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি বরা পেশায় চিকিৎসক,অসমিয়া সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য লেখক ২৭ নভেম্বর ১৯৫৫ সনে শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন ।শ্রীবরা ছাত্র জীবনে অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন ।’কালান্তরর গদ্য’ ,’তেজর এন্ধার‘আরু’অর্থ’এই ত্রয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সনে ‘ কথা রত্নাকর’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাকি উপন্যাসগুলি ‘ভোক’,’লোহা’,’যাত্রিক আরু অন্যান্য’ ইত্যাদি।ইতিহাস বিষয়ক মূল‍্যবান বই ‘রুশমহাবিপ্লব’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’,’ফরাসি বিপ্লব’,’মোয়ামরীয়া বিদ্রোহ’।শ্রীবরার গল্প উপন্যাস হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা, মালয়ালাম এবং বড়ো ভাষায় অনূদিত হয়েছে।আকাডেমিক রিসার্চ জার্নাল’যাত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ।’ কালান্তরর গদ্য’ উপন্যাসের জন্য ২০০১ সনে অসম সাহিত্য সভার ‘ আম্বিকাগিরি রায়চৌধুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।শ্রীবরা অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি।


অনুবাদকের কথা

কালান্তর ট্রিলজির তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হল’অর্থ’। সশস্ত্র হিংসার পটভূমি এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ জীবনের দ্রুত অবক্ষয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার তাড়না এবং বেঁচে থাকার পথ অন্বেষণেই আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনী ভাগ গড়ে তুলেছে। সম্পূর্ণ পৃথক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে অসমের মানুষ কাটিয়ে আসা এক অস্থির সময়ের ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের অন্বেষণ চিরন্তন এবং সেই জন্যই লেখক মানুষ– কেবল মানুষের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারে।

এবার উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে এলাম।আশা করি ইরাবতীর পাঠকেরা এই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত অসাধারণ উপন্যাসটিকে সাদরে বরণ করে নেবে। নমস্কার।

বাসুদেব দাস,কলকাতা।


বাগানটা কয়েকটি স্তরে ক্রমশ নদীর দিকে নেমে গেছে। নিচের এই অংশ অযত্ন পালিত প্রায়। দুই চারটি গাছ আছে। গাছগুলির গোড়া দিয়ে  আঁকাবাঁকা একটা পথ নিচে, নদীর তীরে নেমে গেছে। খাড়াইটা উঁচু, নেমে যাওয়া পথটা খাড়া এবং পেছল। একপাদুপা করে সে সন্তর্পণে নিচে নেমে গেল। সামনে ওটা কি? বালি, বালির চর। ব্রহ্মপুত্রের বালির চর। শব্দ পেয়ে হয়ে সামনে পড়ে আছে ব্রহ্মপুত্রের বালির চর। শ্রীমানের বুকটা ধক ধক করে উঠল। অজানা ভয়ে তার বুকটা যেন মোচড়খেয়ে উঠল। সে সেই জায়গায় আর অপেক্ষা করতে পারল না। ঘুরে দাঁড়িয়ে সে দ্রুত দৌড়ে আসার মতো ফিরে এল। উঁচু খাড়াইটার পেছনে পৌঁছে দুই একবার সে আছাড় খেয়েপড়ল। একেবারে ওপরের বাগানে উঠে তার শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল। এতক্ষণ সে যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করেছিল।

‘ শ্রীমান দা’ কেউ তাকে ডাকল।

সে চমকে উঠল।

‘ শ্রীমানদা কোথায় গিয়েছিলে?’ একটা ছেলে তাকে জিজ্ঞেস করল।

‘ নিচে, নিচে,’ সে কোনোমতে উত্তর দিল। বাড়িতে থাকা একটি ছেলে। মাঝেমধ্যে সে বন্দুক নিয়েপেছনের বারান্দাটা পাহারা দেয়। প্রবীণ,হ‍্যাঁ, প্রবীণ তার নাম।

‘ওদিকটায় যাবেন না। পথটা ভালো নয় ।নোংরা।’

কেন আমাকে প্রবীণ যেতে  নিষেধ করল? শ্রীমান মনে মনে ভাবল।’ কেন সে আমাকে মানা করল? কিছু আছে নাকি সেদিকে? নদীর তীরে, খাড়াইয়ের নিচে, বালির চরে! পথটা খারাপ কিন্তু নোংরা তো নয়। কেন সে আমাকে মানা করল! নিশ্চয় কিছু আছে, কিছু লুকানোর জিনিস আছে। সেদিন, সেদিন রাতে যে কেউ খুব চিৎকার করেছিল। একবার, দুবার– ওটা সেই নিচের দিক থেকেই এসেছিল না কি? সেই ভয়ার্ত  চিৎকার গুলি!

‘ অঞ্জুদাআসেনি নাকি?’ সে প্রবীণকে জিজ্ঞেস করল।

‘ এই কিছুক্ষণ আগে পৌঁছেছে মাত্র। আপনার কথা জিজ্ঞেস করেছিল।’

শ্রীমান দ্রুত অঞ্জুদার কাছে গেল। তার কাছে সে সহজ অনুভব করে। কেন জানি বুকের ধপধপানিটা, জমাট বেঁধে থাকা ভয়টা নাই হয়ে যায় ।

‘এসোএসো, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কোথায় গিয়েছ।’ অঞ্জুদা বলল।

শ্রীমান তার কাছেই একটা চেয়ারে বসল।

কফি এল। অন্য ছেলেগুলোও এসে একসঙ্গে বসল। কফি বিস্কুট খেয়েপ্রত্যেকেই হাসি স্ফুর্তি করে কথা বলতে লাগল। ওরা যতই হাসতে হাসতে মজার কথা বলল ততই শ্রীমানের মনের ভেতরে উত্তেজনা বেড়ে চলল ।

‘কী হল শ্রীমানদা, মন খারাপ করে বসে আছেন দেখছি?’ একটি ছেলে জিজ্ঞেস করল।

অঞ্জুদা তার দিকে তাকাল। তাঁর মুখে হাসি। শ্রীমান হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।’ এইসব বন্ধ হবে না কি?’

সবাই নীরব হয়ে পড়ল।

‘ বন্ধ হবে,’ অঞ্জুদা ঠাট্টার সুরে বলল।’ আমাদের আক্রমণ করা বন্ধ করতে হবে– ওরাই প্রথমে এই কাজ আরম্ভ করেছিল, নয় কি? না হলে– আমরা সবাই মরে শেষ হতে হবে।’ 

প্রত্যেকেই আবার মনে মনেরইল।

‘ বেশি চিন্তা করে লাভ নেই বুঝেছ শ্রীমান। যা হয় দেখা যাবে।’

ওরা পুনরায় অন্য কথা আরম্ভ করল। শ্রীমান এবার একটা দুটো কথায় অংশগ্রহণ করল। ফোন আসতেথাকল– কর্ডলেস,মোবাইল দুটিতেই।

বোতল এল, গ্লাস এল, সোডা,আলুভাজা, চীজ এল। নিরুদ্বেগভাবে কথাবার্তা চলতে থাকল। সন্ধ্যা নামল, আকাশটা কমলা বেগুনি রঙের হয়ে অন্ধকার হয়ে পড়তে আরম্ভ করল। বাগানের আশেপাশে গাছ পালার পাতায় অন্ধকার জমা হল।

কথাবার্তা চলতে থাকল। শ্রীমানের মনে হল প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা প্রসঙ্গের অবতারণা করছে, কিন্তু সে যে সমস্ত কথা শুনবে বলে ভেবেছিল সে রকম একটা কথাও উত্থাপিত হল না। আন্ডার গ্রাউন্ডের কথা, গোলাগুলি ,সংঘর্ষের কথা, তাড়িয়েদেওয়ার কথা কিছুই তারা উত্থাপিত  করল না । ওরা মাছ ধরার কথা ,ব্রহ্মপুত্রের বালিতে ভাঙ্গড় মাছ ভেজে খাওয়ার কথা, লাই শাক দিয়ে মাংস বানানোর কথা। এইসব কথার আলোচনা হল।শ্রীমানের মনে হল যে ওরা ইচ্ছা করেই কিছু প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলেছে । সে কথা বলার জন্য,আলোচনায় অংশ গ্রহণ করার জন্য কিছুই খুঁজে পেল না । ধীরে ধীরে তার ঘুম আসার মতো অবস্থা হল। হুইস্কির গ্লাসটা দুহাতে ধরে সে ঝিমোতে লাগল। 

ঠিক কখন ফোনটা এল সে বুঝতে পারেনি।

তন্দ্রার ঘোরের মধ্যে সে শুনতে পেল অঞ্জুদারকণ্ঠস্বর। অঞ্জুদাকঠোরভাবেজিজ্ঞেস করছে,’কী? কোথায়?’

সে সজাগ হয়ে উঠল। অঞ্জুদা নিরুদ্বেগ ভাবে ফোন ধরে আছে। হুহু, দুই একটা শব্দ ছাড়া কোনো কিছু বলছে না। মাঝে মধ্যে কখনও একটি দুটি শব্দ দিয়ে প্রশ্ন করছে। শ্রীমানের মনে হল যে বাকি ছেলেগুলি হাতের গ্লাস টেবিলে রেখে নীরবে অপেক্ষা করছে। অঞ্জুদা ফোন ধরে থাকার সময়টুকু যাচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে। কিছু একটা ঘটেছে, নিশ্চয় কোনো বড়ো ঘটনা ঘটেছে– সে বুঝতে পারছে, বুঝতে পারছে। রক্তের মধ্যে সে কিছু একটা টের পাচ্ছে, তার স্নায়ু টান টান হয়ে উঠেছে । বাকি ছেলেরাও টের পেয়েছে। ওরা সোজা হয়ে বসেছে।

অবশেষে মোবাইলের সুইচ বন্ধ করে অঞ্জুদা শরীরটানাড়াচাড়া করে বসল। রমেনকে গুলি করেছে ‘, নিরুদ্বেগভাবেঅঞ্জুদা বললেন ।

‘কী? কোথায় ?’বলে হঠাৎ শ্রীমান বসে থাকা থেকে উঠে দাঁড়াল– তার কন্ঠস্বর অত্যন্ত কর্কশ এবং সজোরে বের হল।

‘লখরায়’ একই নিরুদ্বেগ সুরে অঞ্জুদা উত্তর দিল। তারপর শ্রীমানের দিকে তাকিয়ে বলল, মরেনি সে, বেঁচেছে। সহজে মরবে না সে, বিড়ালের প্রাণ। উরুরহাড় ভেঙেছে। ইতিমধ্যে মিলিটারি হাসপাতালে নিয়ে গেছে। চল আমরা দেখতে যাই,  চল- শেষের কথাটা বাকি ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বললেন।

দ্রুত সবাই নিচে নেমে এল। দৌড় মেরে পাতলা জেকেটটা এনে শ্রীমানওপেছনপেছনদৌড় মারল। ঘরের নিচে তিনটা গাড়ি প্রস্তুত হল। শ্রীমান গিয়ে পৌঁছাতে পৌছাাতেঅঞ্জুদারগাড়ি ভর্তি। সে দৌড় মেরে অন্য একটি গাড়িরপেছনদিকে উঠল। মোবাইল ফোনে অঞ্জুদা কথা বলছে। ইঞ্জিনের গর্জন তুলে গাড়ি তিনটি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। ছেলেগুলোর হাতে হাতেবন্দুক,মোবাইল।ওদের মাঝখানে বসে শ্রীমান একটা কথাই বারবার ঘুরিয়েফিরিয়ে চিন্তা করতে থাকল- ঈশ্বরকে ধন্যবাদ,রমেন বেঁচে গেছে।হর্নবাজিয়ে বিরাট গতিতে গাড়ি গুলি মহানগরীর ব্যস্ত রাজপথ দিয়েএগিয়ে চলেছে।শ্রীমানের মুখ শুকিয়েএল,জিহ্বাটা ভারী হয়ে যেন তালুতে আঠা লেগে ধরেছে। বুকের ধপধপানি এসে কানে তালা লেগে গেছে। মনটা তার আশ্চর্য ধরনের শূন্য- শূন্য মনের ভেতরে কেবল একটা কথাই আসা-যাওয়া করছে-ইসরমেনবেঁচে গেল।

রাস্তাঘাটের গর্ত না দেখেই ড্রাইভারগাড়ি চালাচ্ছে। পেছনে বসে আসা মানুষগুলি ছিটকে পড়ার মতো বারবার এ ওর গায়ে ছিটকে পড়ছে। ধরার মতো কোথাও সুবিধা নেই. গুয়াহাটি শিলং রাস্তা পেয়ে ঝাঁকুনিটা কমে এল।

 শ্রীমানের ধীরে ধীরে রাগ হচ্ছিল। এক বোঝাতে না পারা যুক্তিহীন ক্রোধ।রমেনকে,রমেনকেকেন গুলি করবে?প্রশ্নটির উত্তর আছে কি? সে প্রশ্নটির উত্তর ভেবে বের করতে পারল না। ভাবতে পারছেনা। কিন্তু তার রাগ উঠতে থাকল। হাত দুটো সে সজোরে মুঠো মেরে ধরল। দাঁত দুপাটিকামড়ে ধরল। মাথার ভেতরে ক্রোধ  একটা বিষাক্ত পোকার মতো ঝাঁ ঝাঁকরতে লাগল। হাসপাতাল পাওয়া পর্যন্ত সে এভাবেই এক অবুঝ ক্রোধের আবর্তে ডুবে রইল।

রমেন ইতিমধ্যে ওয়ার্ডেরবেডেফটফট করে কথা বলছে। শ্রীমান দৌড় মেরে গিয়েসিপাহীপ্রহরীদের ঠেলে রমেনের কাছে পৌঁছাল। উদ্বেগ,উৎকণ্ঠায়ঠান্ডা হয়ে যাওয়া শ্রীমানেরমুখটার দিকে তাকিয়েরমেনবলল-‘বেঁচে গেলাম দোস্ত। ভাগ্য ভালো উরুরহাড় ভেঙেছে। বুলেটটা একটু ওপরে এসে দুটো পায়ের মাঝখানের জায়গায়লাগলে কীহতো বলতো?’

 কিছুক্ষণ পরে রমেনেরঅপারেশন হবে। ডাক্তার নার্স তাকে রেডি করতে গিয়ে প্রত্যেককেই চলে যাবার জন্য অনুরোধ করল। পরের দিন সকালে আসার জন্য বলল।অঞ্জুদা ফিসফিস করে তার সঙ্গে কিছু কথা বলল।প্রত্যেকেই তার সঙ্গে হ্যান্ডসেক করল।রমেনকে  ছেড়ে আসতে শ্রীমানেরএকটুও ইচ্ছা করছিল না। রমনের হাতটা ধরে নাড়িয়ে দিয়ে বিদায় দেবার সময়শ্রীমানের মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলল,’যা যা আমার কিছুই হবে না।গুলিতেমরিনি যখন অপারেশনেও মরব না যা। মাদেরকে খালি কিছু জানাবি না। একেবারে পায়েহেটেবাড়ি যাব।

বাইরে গাড়ির কাছে অঞ্জুদা তাকে  জিজ্ঞেস করল, তুমি ফিরে যাবে নাকি ?’

‘আপনারা?’

‘আমরা এদিকে যাব।’

‘আমিও আপনাদের সঙ্গে যাব।’

বাইরে দিনের আলোর মতোজ‍্যোৎস্না। মহানগরীর বাইরে একটু ঠান্ডাপড়েছে। পড়েছে পাতলা কুয়াশা। তিনটা জিপসিগাড়ি, বিরাটগতিতে  এগিয়ে গেল। ওরা কোথায় যাচ্ছে শ্রীমান জানে না। গাড়ির ভেতরে ঢুকে মনের মধ্যে একটা বুঝাতে না পারা আক্রোশ এবং ক্রোধ নিয়ে সেও যাচ্ছে। বাইরেরজ‍্যোৎস্নায় তার চোখ পড়েনি। ছায়াময়- মায়াময় ধানক্ষেত গুলি তার চোখে পড়েনি, অথবা মাঠের মাঝখানে থাকা ছায়ারমতো অন্ধকার গাছগুলি।

গাড়িগুলিহঠাৎ ছোটো রাস্তা একটা দিয়েবাঁদিকে ঢুকে গেল।সেটা রিজার্ভ ফরেস্টে যাওয়ার পথ। কিছুটা গিয়েই আগের গাড়িটা একটা বাড়ির সামনের উঠোনে ঢুকে একেবারে ঘরের সামনে গিয়েদাঁড়াল। বাকি দুটি গাড়ির একটি নঙলা পার হয়ে আর ও একটি গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ল। কী হচ্ছে শ্রীমান কিছুই বুঝতে পারল না। জায়গাটিতে কোনো বিদ্যুতের আলো নেই, ঘরটিতেও নেই। চাঁদের আলোতে ছায়া ঘন পরিবেশ চারপাশে। গাড়িগুলি থেকে লাফ মেরে ছেলেগুলি নেমে অন্ধকার ঘরটির ভেতরে দৌড়ে ঢুকে গেল। দুটো ঘরের পাশ দিয়ে পেছনে দুপদাপ করে দৌড়ে গেল। কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে না পেরে শ্রীমানও গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামল। গাড়ি চালানো ছেলেটি তাকে চাপা কন্ঠে ডাকল।

‘হাতিয়ারছাড়া আপনি যাবেন না, দাদা। ।গোলাগুলি চলতে পারে।’

বিমূঢ় হয়ে শ্রীমান পুনরায় গাড়িতে উঠল।

‘এখানে কে আছে?’ শ্রীমান জিজ্ঞেস করল।

কোনো খবর পেয়ে এসেছে বোধহয়। এগুলো মনে হয়পুরোনো ঘাঁটি। ড্রাইভারছেলেটি উত্তর দিল।

হঠাৎ অনেক দূরে বন্দুকের শব্দ শোনা গেল। ঘর থেকে অনেকটা পেছনে ঝোপের মধ্যে যেন গুলির শব্দ হল। কিছুক্ষণ সবাই নীরব। দুরুদুরু বক্ষে শ্রীমান গাড়ির ভেতরে অপেক্ষা করল। দশ  মিনিটের ভেতরে ছেলেগুলি অন্ধকারের মাঝখান থেকে বেরিয়ে এল।

ছেঁচড়ে আনছে! ওরা কিছু একটা জিনিস ছেঁচড়েআনছে। বস্তার মতো! 

শ্রীমান গাড়ি থেকে নেমে এল।

অঞ্জুদার মুখে ঘামের  বড়োবড়ো ফোঁটা ছড়িয়ে  পড়ছে। চাঁদের আলোতে তার মুখটা অত্যন্ত ফ‍্যাকাশে বলে মনে হল। উত্তেজনায় চোখ দুটি চকচক করছে। শ্রীমানকে সামনে দেখে তিনি বললেন,’ রমেনকে এই ছেলেটিই গুলি করেছিল।’

কীভাবে জানতে পারল রমেনকে এই ছেলেটিই গুলি করেছিল? জিজ্ঞেস করবে ভেবেও শ্রীমান চুপ করে গেল। সে ছেঁচড়ে আনা ছেলেটির দিকে তাকাল। তার মাথাটা একপাশে কাত হয়ে পড়েছে। সামনের শার্টটার পেটের কাছটাতে কালো হয়ে পড়েছে– জ্যোৎস্নার আলোতে রক্তের দাগ কালো মতোদেখায়। একটা হাত ধরে কেউ তাকে ছেঁচড়ে এনেছে, শক্তপোক্ত একটি ছেলে। কে ছেলেটি? অন্ধকারের মধ্যে সে ছেলেটিকে চিনতে পারল না।

দুটি ছেলে হাত পা ধরে তুলে মানুষটাকেজিপসিটার পেছনে তুলল ঠিক একটা বস্তা টেনে তোলার মতো। শ্রীমান ছেলেটির কাছে গেল– কী হল ছেলেটি মারা গেছে না বেঁচে আছে?

‘একে হাসপাতালে নিয়ে যাবে নাকি,’ সে বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য না করে জিজ্ঞেস করল।

‘এটাতোখতম।শেষ।’ অন্ধকারের মধ্যে কেউ উত্তর দিল।

শ্রীমানের মাথা থেকে পা পর্যন্ত যেন একটা শীতল প্রবাহ বয়ে গেল– খতম, শেষ! হঠাৎ তার মাথাটা যেন কেমন ঘুরে উঠল।

পেছনে অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ একটা হুলস্থূল শোনা গেল।

শ্রীমান স‍্যাৎ করে পেছন ফিরে দিকে তাকাল। অন্য কাউকে ধরে এনেছে? তার বুকের ধপধপানিটাহঠাৎ বেড়ে গেল। কোনো একজনকে ধরে এনেছে। দুই তিনটি ছেলে একটা মানুষকে ঠেলে এনে গাড়িতে তুলল। কে?কে মানুষটা?

শ্রীমান কিছু বুঝতে পারার আগেই গাড়িগুলিঘুরিয়েনেওয়া হল। সেও এদিক ওদিকে দৌড়াদৌড়ি করে শেষের গাড়িটাতে উঠে বসল। হাইওয়ে পেতে গাড়িগুলি পুনরায় পশ্চিমে দৌড়াতে লাগল। কিছুক্ষণ যাবার পরে ওরা পুনরায় একটা ছোটো রাস্তায় ঢুকল। অন্ধকারের ছায়ায়শুয়ে থাকা গ্রাম পার হয়ে ওরা ক্রমশ জঙ্গলে প্রবেশ করল। জঙ্গলের মধ্যে এক জায়গায়ওরাদাঁড়িয়েপড়ল। দুজন গাড়ি চালক জায়গাতেই গাড়ি ঘুরিয়ে নিল।


আরো পড়ুন: অর্থ (পর্ব-২৩) । ধ্রুবজ্যোতি বরা


এই গভীর জঙ্গলের মধ্যে এরা কোথায় পৌঁছেছে?

পাতা খসে পড়া গাছের ডালগুলির মধ্য দিয়েজ্যোৎস্নার আলো ছিটকে পড়ায় নিচের দিকটা চকচক করছে। চিতা বাঘের ছালের মতো। চারপাশে এক ভয়াবহনৈঃশব্দ। ঝিঝি পোকা বা অন্যান‍্য পোকা -পতঙ্গের একটা শব্দও শোনা যাচ্ছে না। শ্রীমান বুঝতে পারছে না সে কোথায় আছে,কী করছে। নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো সে গাড়ি থেকে নামল। কোনো চিন্তাই করতে পারছে না সে। গাড়ির ঝাঁকানিতে শরীরের নিম্নাংশ ভারি হয়ে উঠেছে– এতটুকু মাত্রই টের পেয়েছে সে।

মাথা ব্যথা করছে। কানের ওপরটা ব্যথা করছে। ওখানকার শিরা দুটো দপদপ  করছে।

অনুচ্চকণ্ঠে কেউ কথা বলছে।

কোথাও মাটি খোঁড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। কোদালের শব্দ। শুকনো মাটিতে কোদাল চালানোর শব্দ…

শব্দটা সে শুনেছে। ঠিকই শুনেছে। কথাগুলি তার মস্তিষ্কে দাগ কাটছে না। তার মগজটা যেন জমাট বেঁধে গেছে।

এবার সে আবিষ্কার করল সে নিঃসঙ্গ। তার আশেপাশে কেউ নেই। গাড়ি গুলি চালিয়ে আসা ড্রাইভারও নেই। সে এদিকে ওদিকে তাকাল। কান খাড়া করে শব্দ শুনতে চেষ্টা করল। না কোনো শব্দ নেই। কিছুক্ষণ আগে কারও কণ্ঠস্বর শোনা বলে মনে হচ্ছিল তার, এখন কোনো আওয়াজ নেই।

চিতা বাঘের চালচলনের মতোফুটফুটেজ‍্যোৎস্নার মধ্য দিয়েভূতগ্রস্থ মানুষের মতোউদ্দেশ্যহীনভাবে সে এগিয়ে যেতে আরম্ভ করল।

সামনের ছায়াটা ঘন হয়ে পড়েছে। সামনে কিছু একটা রয়েছে। অপেক্ষা করছে। কাছাকাছি চলে এল। তিন চারটি ছেলে অপেক্ষা করছে। অন্ধকারে তারা কে সে বুঝতে পারল না। ওদেরকে অনুচ্চ কণ্ঠে সে কথা বলতে শুনল।

‘ কিছু জানি না বলেই বলেছে’ কেউ একজন বলল।’ ‘হঠাৎ এসে পড়েছে বলে মনে হয়।’

উত্তরে কে কী বলল কিন্তু কী বলল শ্রীমান বুঝতে পারল না।

‘ ট্রিটমেন্টটা শুরু করে দিই, মুখ খুলে যাবে।’

শ্রীমান এবারও উত্তরটা শুনতে পেল না।

সামনের অন্ধকারটুকু দু’ভাগ হয়ে গেল। কয়েকজনএগিয়ে গেল। শ্রীমান ওদের অনুসরণ করল। অন্ধকারের মধ্যে একটু একটু ধরতে পারা যাচ্ছে। সে একটু দূরত্ব রেখে দেখতে লাগল। ওই যে, ওরা ধরে আনা ছেলেটও রয়েছে। তার হাত দুটো পেছনে বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা আছে। পায়েও বাঁধন রয়েছে মনে হয়। তাকে কেউ কিছু একটা বলছে। সমস্ত কথা শ্রীমান বুঝতে পারছে না। গুলি খেয়ে মরা ছেলেটি এবং তার সঙ্গে কয়েকজন এসে ঘরটাতেশেল্টারনেওয়ার কথা তাকে বারবার জিজ্ঞেস করা হচ্ছে। মানুষটা মাথা নাড়ছে। কিছু বলছে কিনা শ্রীমান শুনতে পারছে না। কিন্তু মানুষটা এবার কাকুতি মিনতি করতে লাগল। অসুস্থ কুকুরের বাচ্চার মতো তার কণ্ঠস্বরথেকে কেও কেও ধ্বনিত হল। কাকুতি মিনতি করতে লাগল।’ নিয়েআয় ওকে,’ কর্কশস্বরে কেউ বলে উঠল। কাকুতি-মিনতি করা মানুষটাকে দুজন বাহুতে ধরে টেনে জঙ্গলের মধ্যে দিয়েনিয়ে যেতে লাগল। মানুষটারকণ্ঠস্বরকান্নারমতো বের হল। জোরে জোরেফুঁপিয়ে  উঠারমতো সে কাঁদতে শুরু করল।

শ্রীমানের গলা শুকিয়ে গেল। তার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। ডান হাতটা সামনে ঝুলতে লাগল। সেই হাতটা দিয়ে যেন সে কাঁদতে থাকা মানুষটাকে স্পর্শ করবে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সে নিজের অজান্তে ওদের পেছনে পেছনে জঙ্গলের মধ্যে এগিয়ে যেতে লাগল।

ওই যে, ওই যে জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে গেছে। পায়ের নিচে শুকনো পাতার মড়মড় ধ্বনি উঠছে। মানুষটাএগিয়ে যেতে চাইছে না। পা দুটি দিয়ে সে মাটিতে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে চাইছে। ওরা হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে। তার পা দুটি শুকনো পাতা এবং মাটির ওপর দিয়েছেঁচড়ে যাচ্ছে। তার কণ্ঠস্বরঘড়ঘড় হয়ে গলায় লেগে যাচ্ছে। ওরা তাকে ছেঁচড়েনিয়ে যাচ্ছে। এক জায়গায়ওরাথেমে গেল। মানুষটাকে দুই বাহুতে ধরে দাঁড় করিয়ে দিল। ওরামানুষটার দুই পাশে দাঁড়িয়েছে।ইসইস – এই দৃশ্য শ্রীমানের পরিচিত, পরিচিত! সে আগে দেখেছে! সে চিৎকার করে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়েআওয়াজ বের হল না। গলা থেকে অস্পষ্ট সোঁসোঁ করে একটা শব্দ বের হল কেবল। কেউ একজন তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষটানড়াচাড়া করতে চাইছে কিন্তু পারছে না। সে ঘনঘন মাথাটা এদিকে ওদিকে দোলাচ্ছে। মুখ থেকে থুথুর সঙ্গে অস্পষ্ট কিছু শব্দ বের হচ্ছে। মাঝে মাঝে সে লম্বা করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে এবং তারপরেই মুখে বিড়বিড় করছে।

খুব নিপুণভাবে এবার তার হাঁটুর পেছনদিকে লাথি বসিয়েদেওয়া হল। মানুষটা হাঁটু ভাঁজ করে সামনের দিকে হুমড়িখেয়েপড়ল। তার মুখ দিয়ে একটা কাতর শব্দ বের হল। পড়ে যেতে চাওয়ামানুষটাকে কিন্তু পড়তেদেওয়া হল না। তাকে মাটিতে হাঁটু গেড়েবসিয়েদেওয়া হল। নিপুণভাবে হাঁটু গেড়েবসিয়েদেওয়া হল।

হাঁটু গেড়ে বসে থাকা অবস্থায় সে প্রস্তুত হয়ে রইল। তার মুখে এখন শব্দ নেই, সে নীরবে প্রস্তুত হয়ে রইল।

চিতা বাঘের ছালের মতোফুটফুটেজ‍্যোৎস্নার আলোতে তার পেছনদিকেদাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির হাতে একটি ধাতব হাতিয়ার এক মুহূর্তের জন্য ঝলসে উঠল।

এক মুহূর্তের জন্য। এক মুহূর্ত মাত্র, ধাতব একটি স্ফুলিঙ্গ বের হল।

পিস্তল, পিস্তল! তার হাতে সেটা পিস্তল। বিমান ঠিকই বুঝতে পারল সেটা একটা পিস্তল!

শ্রীমানেরপায়ের নিচে যেন শিকড় গজাল। সে স্থানুরমতো এক জায়গায়শিকড়গজানো মানুষের মতোনড়াচড়া  করতে না পারা হয়ে গেল। সে থেমে গেল, এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে পড়ল।

প্রস্তুত হয়ে থাকা মানুষটার মাথার পেছনদিকে পিস্তলের নলটা লাগিয়েদেওয়া হল। এপাশওপাশ করতে থাকা মাথাটায়নলটারপেছন দিক দিয়ে সজোরে আঘাত করা হল। হাতে পিস্তল নেওয়াছেলেটি কর্কশ ভাবে হিসহিস করে বলল–’কী, এখন বল।’ তার কণ্ঠস্বর সাপের হিসহিসানির  মতো মনে হল – সাপের হিসহিসানিরমতো…  … 

হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মানুষটার গলা থেকে একটা ঘড়ঘড়  শব্দ বের হতে লাগল। গলায় কফ জমে থাকা মানুষের মতোঘড়ঘড় শব্দ।

কট করে একটা শব্দ হল। একটা ধাতব শব্দ! পিস্তলের সেফটি কেসটা খোলার কট করে একটা ধাতব শব্দ হল।

 আর ঠিক সেই মুহূর্তে, সেই মুহূর্তে চিতা বাঘের ছালের মতোফুটফুটেজ‍্যোৎস্না প্রবেশ করা জঙ্গলের নৈঃশব্দ বিদীর্ণ করে এক অমানুষিক আর্ত চিৎকার আরম্ভ হল

ফুটফুটেজ্যোৎস্নার আলোগুলি ছিটকে পড়ল-চারপাশে ছিটকে পড়ল।

মাথার ওপরে পাতা খসেশীর্ণ হয়ে পড়া গাছের ডালগুলিতে ঝুলে থাকা অবশিষ্ট একটা-দুটো বুড়ো পাতা নিচে খসে পড়ল… ঘুরে ফিরে পাতাগুলি নিচে নেমে এল।

প্রস্তর মূর্তির মতোস্থানু হয়ে পড়া শ্রীমান হাতদুটি তুলে থাকা অবস্থায় ক্রমাগতভাবে আর্তনাদ করে যেতে লাগল।অন্তরভেদ করে ত্রাস এবং হাহাকার মিলে বেরিয়ে আসা সেই আদিম জান্তব আর্তনাদ আকাশ-বাতাস যেন ভেদ করে চৌ্চির করে ফেলল।

ঘাতক,শিকার,শিকার ধরে থাকা ছেলেগুলি সবাই নিমেষে পাথরে রূপান্তরিত হল।মুহূর্তের জন্য পৃ্থিবীথেমেগেল,থেমে গেল সমস্ত গতি,সমগ্রসময়।এবং পাথর হয়ে যাওয়া মানুষগুলির আশ্চর্যস্থবির দৃষ্টির সামনে ক্রমাগতভাবে বিকট আর্তনাদ করে যাওয়া শ্রীমান এক সময় সংজ্ঞা হারিয়ে জঙ্গলের নিচের শুকনো পাতায় আচ্ছাদিত মাটিতে ছিটকে পড়ল।চারপাশেহঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এল-হঠাৎ নৈঃশব্দের মধ্যে পৃথিবী ডুবে গেল…  …

ছিটকে যাওয়া জ্যোৎস্নারফুটফুটে আলোতে -চিতাবাঘের ছালের মতোফুটফুটে আলোগুলি পুনরায় উলঙ্গ গাছগুলির ডালের জালের মধ্য দিয়ে ফিরে এল-জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে পড়ল-ঢুকে পড়ল ঝোপ এবং গাছগুলির গায়ে,পড়লখসে পড়া পাতায় ঢেকে থাকা জঙ্গলের নিচে,পড়ল হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মানুষটা এবং তাকে ধরে থাকা ছেলেগুলির গায়ে।

সেই জ্যোৎস্নায় ,জঙ্গলের নিচে পাতা ঢাকা মাটিতে ,হাতদুটিদুপাশে নিয়ে নিঃসার হয়ে পড়ে থাকা শ্রীমানকেশুয়ে থাকার মতো মনে হল।বয়সের তুলনায় বেশি বুড়ো একটা কিশোর যেন পরম শান্তিতে মাটি জড়িয়ে শুয়ে আছে-শান্তিতে শুয়ে আছে-শুয়ে আছে পরম প্রশান্তিতে… …নির্ভয়ভাবে… …

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত