| 21 মে 2024
Categories
ধারাবাহিক

ইরাবতী ধারাবাহিক: কদমতলি (পর্ব-৫) । শ্যামলী আচার্য

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

ছায়ায় ঢাকা, জলে-সবুজে ঘেরা এক ছোট্ট গ্রাম। দূরে বয়ে যাওয়া এক নদী। সে নদীর নাম ধলেশ্বরী। ঘোলা জল তার। বিরাট ঢেউ। একূল থেকে ওকূল চোখে পড়ে না। জলের দোলায় গা গুলিয়ে ওঠে। ধলেশ্বরীতে নৌকা পড়লে মাঝিরাও তটস্থ। চার মাল্লাই নৌকাতেও ভয় কাটে না। চারজন মাঝি, তাই চার মাল্লাই। তারা জলের ঢেউ দেখে, আকাশের রকমফের দেখে, হাওয়ার দিক চিনে নেয়, তারপর পাল তুকে দেয়। অনু ছইয়ের ধারে বসে ভাবে, আকাশ জল হাওয়াকে বুঝে চলা কী সহজ কথা! হাতের নাগালে থাকা মানুষজনই কত অচেনা। রোজকার আচারবিচারেও তাদের সবটুকু নজরে পড়ে না। আর ওই মাঝিমাল্লার কত শক্তি! গায়ে কী জোর!

       “এইবার চাইর মাল্লাই নৌকা আনলা ক্যান মেজমামা?”

       অনুর মেজমামা হাঁ করে তাকান ছোট ভাগ্নীটির দিকে। তারপর দালান ফাটিয়ে হেসে ওঠেন। তাঁর হাসিতে পাশের সুপুরিগাছ থেকে চার-পাঁচটা টিয়া ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে গেল… পষ্ট দেখতে পায় অনু।

       “বা রে বা! আমার বুইন যাইব তার বাপের ঘরে, সঙ্গে একরত্তি ভাগনা-ভাগনি, তাগো লিগ্যা অ্যাকখান বড় নৌকা আনুম না? কয় কি এই মাইয়াডা!”    

       “আগের বার দুই মাল্লা আনসিলা। স্মরণ আসে আমার।”

       “আর সেই কালে তোর মায়ের ক্যামন অস্থিরপানা হইসিল, সেই কথাখান স্মরণ নাই? হ্যর লিগা এইবার বড় ব্যবস্থা।”

       অনুর মা নগেন্দ্রবালা মুখ টিপে হাসেন। বাপের আদরের কন্যা, ভায়েদের শ্রদ্ধার দিদি তিনি। শ্বশুরঘর থেকে বাপের ঘরে যাবার সময় তাঁর আলাদা ইজ্জত। এটুকু সম্মান তাঁর প্রাপ্য। যদিও সংসারে মেয়েমানুষের পাওনাগণ্ডা নিয়ে কেউই তেমন মাথা ঘামায় না। তারা এদিক থেকে ওদিকে সরে; কেবল অন্যকে জায়গা দেয়, নিজের বলে তাদের কিছুই থাকে না। এক গা গয়না নিয়ে বাপের বাড়িতে এলেও দিনের শেষে সে নিছকই এক মেয়েমানুষ। সোনার গয়নাটুকু স্ত্রীধন হলেও সে ধনে টান পড়তে কতক্ষণ। যা পড়ে থাকে, তার মধ্যে শুধুই মুখ বুজে সামলে যাওয়া কর্তব্যের প্রতি সামান্য স্বীকৃতি। তা’ও মৃত্যুর পরে আর কিছু পড়ে থাকে কী? বেঁচে থেকে কারও মা, কারও বউ হয়ে থাকা পরিচয়। ওটুকুই যেন পাওনা।  

নগেন্দ্রবালার বাপ চলে গিয়েছেন গত বছর। অকালেই চলে গেলেন। উনপঞ্চাশ এমন কোনও বয়স নয়। সন্ন্যাস রোগে নিঃশব্দেই গেলেন। শেষরাতে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন। ব্রাহ্মমুহূর্তে পুকুরপাড়ে গিয়ে বসে থাকতেন। সেখানেই মুখ থুবড়ে পড়েন। ভোরের আলোর মধ্যেই পঞ্চভূতে মিশে যায় তাঁর প্রাণবায়ু। নগেন্দ্রবালা এবার পুজোর সময় বাড়ি গিয়েই বুঝেছিলেন বাবার কথাবার্তায় কেমন অন্য সুর। চিরকালের দার্শনিক মানুষটির মধ্যে এক অকালবৈরাগ্যের ছায়া। মানুষ বোধহয় তার প্রস্থানপথ অনুমান করতে পারে। অন্তত রেবতীভূষণ পারতেন। দূরাগত জগতের ছায়া পড়ছিল তাঁর রোজকার কাজেকর্মে। আর কারও বোঝার কথা নয়। বুঝতেন শুধু নগেন্দ্রবালা।

“এইবার তোমারে কেমন য্যান দেহি…।”

“ক্যামন? ক’ দেহি।” রেবতীভূষণ কথা বাড়াতে চান না। তবুও প্রিয়তম আত্মজার মুখ থেকে শুনতে ইচ্ছে হয় তার মনের গতিপথ। 

“তোমার চোখেমুখে কী য্যান সব আঁকা…”

“চিত্র কইতে চাস?”

“হ’, য্যান চিত্তিরের পারা, চোখ দুইটার মইধ্যে এক গহিন নদী। আগে এমন দেহি নাই। কী ভাবো আইজকাল?”

“যা ভাবি, সবই কি পুরা ভাবতে পারি?”

“ক্যান পারো না বাবা? কীসে আটকায়?”

“আটকায়… হ’ তা’ তুই ঠিকই কইলি… আটকাইয়া ধরে কেউ। ভাবলে কইতে পারি না… কারে কমু? বোজেই বা ক্যাডা? তোর মনে আসে, তরে কইসিলাম তখন মৃত্যুও ছিল না, অমরত্ব নয়, রাত্রি আর দিনের প্রভেদও নাই… আন্ধার দিয়া ঢাকা ছিল আন্ধার। আমি সেই আন্ধাররে খুঁজি…”


আরো পড়ুন: ইরাবতী ধারাবাহিক: কদমতলি (পর্ব-৪) । শ্যামলী আচার্য


নগেন্দ্রবালা কেঁপে ওঠে। ঋকবেদ, উপনিষদ কোথা থেকে বাবা কখন কী বলেন তার সূত্র ব্যাখ্যা করতেন বরাবর। এই প্রথম এড়িয়ে গেলেন। এই যে নানা সৃষ্টি কোথা থেকে হল, কেউ সৃষ্টি করেছেন কি করেননি, করলেও একমাত্র তিনিই জানেন যিনি স্রষ্টা। অথবা তিনিও না’ও জানতে পারেন। এই জানা আর না-জানার মধ্যেকার সূক্ষ্ম প্রভেদ নিয়ে আলোচনা চলে, তর্ক হয়, দীর্ঘ সময় যাপন হয়, কিন্তু অন্ধকারের উৎস সন্ধান করার বাসনা নগেন্দ্রনবালাকে অস্বস্তিতে ফেলে। বাবার মনের চলন সে খানিক জানে বোঝে বলেই হয়ত।  

সংসারের সমস্ত দায়দায়িত্ব কর্তব্য নিখুঁত নিয়মনিষ্ঠভাবে সাজিয়ে রেখেও বাবা উদাসীন হয়ে যেতেন। এমন ক্যান হয়? নগেন্দ্রবালা অবাক হন। দর্শনশাস্ত্রে পণ্ডিত বাবার কাছে ঘরের দাওয়ায় বসে তর্ক ন্যায় দর্শনের কূট প্রসঙ্গ শিখেছেন তিনি। জ্ঞানী পিতার কন্যাটির রীতিমতো পারদর্শিতা ছিল এই গভীর আলোচনায়। কিন্তু ঢাকা-বিক্রমপুরের একাদশী কন্যা বাপের ভিটের শিকড় উপড়ে গোত্রান্তরিত হয়ে যেদিন শ্বশুরঘরে চলে যায়, বাপ-বেটিতে সেদিনই বুঝেছিলেন, সংসার সত্যিই মায়া কাটিয়ে দিতে জানে। যে সুতোয় সে সকলকে বাঁধে, সে সুতো ছিঁড়ে নতুন গিঁট দেয়।

       চার্বাক অস্বীকার করেছিলেন সংসার, পুনর্জন্মে আস্থা রাখেননি। তাঁর তত্ত্বে ভক্তি নয়, মুক্ত কর্মই প্রধান। পিতার শেখানো ষড়দর্শনের তত্ত্ব সেদিন কন্যা আত্মস্থ করেনি, পরবর্তী জীবন তাকে শিখিয়েছে কর্ম, শুধু কর্মই মোক্ষ।   

       বাবা বেদকেই প্রামাণ্য মানতেন। কিন্তু জড়বাদী নাস্তিক দর্শনে আগ্রহী ছিলেন। নগেন্দ্রবালার কচি মস্তিষ্কে তখন এইসব জটিল দুরূহ তত্ত্বকথা তেমন রেখাপাত না করলেও কথাগুলির ধার আর ভার তার মনের মধ্যে কোথায় গেঁথে বসেছিল। হয়ত বড় হওয়ার পথে টুকরো টুকরো বোধ ছড়ানো থাকলে সে তত্ত্ব জীবনে কোথাও প্রয়োজন হয়। নগেন্দ্রবালা ভেবে দেখেছেন, জ্যোৎস্নার ভেসে যাওয়া আলোয় বসে জাগতিক সুখের কথাই বলেছেন বাবা। কোনও সংসার-পালানো মায়ার জগতের কথা নয়। যা তুমি চোখে দ্যাখো নাই, নিজের কানে শোনো নাই, তারে তুমি সইত্য ধরবা ক্যামনে? এই ছিল বাবার প্রশ্ন। অথচ এই বাবা যখন লোকমুখে শোনেন সম্পত্তির ভাগাভাগিতে শরিকরা বঞ্চিত করেছে তাঁকেই, তিনি আর সেই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতেই গেলেন না। আত্মীয়পরিজনের প্রতি পরম বিশ্বাসে ভর করে রইলেন। যা তাঁর প্রাপ্য, তাই তো পাচ্ছেন; এখানে আবার মিলিয়ে দেখার কী প্রয়োজন?

       নগেন্দ্রবালার মা এইসব দার্শনিক কূট তর্কের ধার ধারতেন না। প্রাপ্য মানে প্রাপ্য, অধিকার মানে অধিকার। এর আড়ালে অন্য কোনও কূটনৈতিক প্রশ্ন বা মীমাংসার তিনি তোয়াক্কা করেন না। শরিকি বিবাদে তাঁকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে দেখা যায় এবং তার ফলেই ভিটেমাটি জমিজায়গা নিয়ে একটা মোটামুটি সুস্থ ভাগাভাগি সম্ভব হয়।  

       দার্শনিক বাবার একমাত্র কন্যা নগেন্দ্রবালা ছেলেবেলা থেকেই বাপ-মায়ের এই বৈপরীত্য দেখেই বড় হয়েছেন। দুজনের মতামতকেই নিজস্ব বোধ আর অভিজ্ঞতার ছাঁচে ফেলে নিজের জীবন গড়ে নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ভায়েরা কেউ বাবার ধারা পাননি। তাঁরা তিন ভাই প্রত্যেকেই হিসেবি এবং সংসারী। সংসারের বাস্তব জ্ঞান দিয়ে তারা নিক্তিতে মেপে নিতে পারে চাওয়া-পাওয়া। কিন্তু হিসেবি হওয়া তো খারাপ কিছু নয়। মানুষ হিসেব করবে না? সে তার পাওনা বুঝে নেবে না? সবাই কি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী হতে এসেছে? জন্মমুহূর্তে কিছু না নিয়ে একা এসে পৌঁছনোর তত্ত্বে বিশ্বাসী নন নগেন্দ্রবালা। বাবাকে স্পষ্ট প্রশ্ন করেছিলেন, “একা আইব ক্যান? মায়ের প্যাটের ভিতর আসিল, বাইরাইয়াই মায়েরে দ্যাখে, কত লোক চাইরপাশে… তারা কি কেউ না? আবার মরণের সময়ও কত লোক থাকে… একা যাওনেরই বা কী আসে শুনি?”

       নাবালিকা কন্যার মুখে সরল প্রশ্নে কৌতুক বোধ করেন পিতা রেবতীভূষণ। তাঁর মনের মধ্যে ঘুরপাক খায় কত কথা। তখন পৃথিবী ছিল না, অতি দূরদূরান্ত বিস্তৃত চরাচর ছিল না। ছিল শুধু জল। চিহ্ন বর্জিত জলময়তা। অবিদ্যমান বস্তু দিয়েই ঢাকা সর্বত্র। একাকীত্ব আর অস্তিত্বের নিহিত কূট নিয়ে বহু প্রশ্নের মীমাংসা না করেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন তিনি।

       তাঁর মৃত্যুর পরে এই প্রথম বাপের বাড়ি আসছেন নগেন্দ্রবালা। সঙ্গে কন্যা অনঙ্গ, পুত্র পশুপতি।

       চার মাল্লা নৌকায় সমস্ত জিনিসপত্র বোঝাই হলে গলুইতে তিনবার জল দেন নগেন্দ্রবালা। তারপর তিন বার সেই হাত মাথায় ঠেকান। জলে পা ধুয়ে তারপর নৌকায় ওঠেন। গলুইয়ে বিছানা পাতাই থাকে। নৌকার দুলুনিতে অসুস্থতা এড়াতেই এই ব্যবস্থা। অনঙ্গ আর পশুপতি একঠায় চেয়ে দেখে শুধু জল আর জল। দুই মাঝি পিছন দিকে হাল ধরে বসে থাকে, সামনে দুই দিকে দাঁড় বায় দু’জন।

       নৌকা এসে পড়ে ধলেশ্বরী নদীতে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত