| 23 জুলাই 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত প্রবন্ধ

আধুনিক যুগের জন্ম কাহিনি (পর্ব -৩)। হোমেন বরগোহাঞি

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

লেখক পরিচিতি-

Adhunik Juger Janmakahini

১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস


(চার)

দান্তেকে বলা হয় মধ্যযুগেরসর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ প্রতিভূ।অন্যদিকে আবার বলা হয় যে রেনেসাঁ তথা নব-জাগরণ নামে প্রসিদ্ধ ইউরোপীয় মানসের যুগান্তকারী আন্দোলনেরও প্রথম উদ্গাতা ছিলেন দান্তে।এই নতুন যুগের উন্মোচন করেছেন দান্তে এবং সমাপ্তি ঘটিয়েছেনগ্যালিলিও (১৫৬৪-১৬৪২)।একজন বিখ্যাত পন্ডিত বলেছেন দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ছিল একতি মৃত জগতের সমাধিক্ষেত্র এবং একটি নতুন করে জন্ম হতে চলা জগতের গর্ভাশয়।

অবশেষে আমরা এসে উপনীত হয়েছি নব-জাগরণের উজ্জ্বল সুন্দর প্রভাতে,আধুনিক যুগের দুয়ারমুখে।

কিন্তু এই রেনেসাঁ বা নব-জাগরণটা কী জিনিস?

এই প্রশ্নের সোজাসুজি উত্তর দেবার আগে আমরা পনেরো শতকের ইটালিরফ্লরেন্স নগরীতে একবার ঘুরে আসতে পারলে ভালো হয়।

বিকেলের দিকের সোনালি রোদে ফ্লরেন্স নগর জ্বলজ্বল করছে।সারাদিনের কাজ শেষ করে একজন যুবক বেড়াতে বেরিয়ে এসেছে।গোলাপি রঙের পা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া জামায় ঢাকা তাঁর দীর্ঘ সুগঠিত শরীর,উজ্জ্বল গৌ্রকান্তিশোভিত মুখমণ্ডল ঘনকৃ্ষ্ণ দাঁড়ি গোঁফে আবৃত,তাঁর দেহের প্রতিটি লোমকূপ থেকে ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল প্রভা বিকরিতহচ্ছে।মানুষ যে এত সুন্দর হতে পারে সেকথা তাকে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।সৃষ্টিকর্তা যেন তাঁর কল্পনার সমস্ত ঐশ্বর্য ঢেলে দিয়েছেন এই একজন মাত্র মানুষকে সৃষ্টি করার কাজে।মানুষটাফ্লরেন্স নগরের ব্যস্ত বাজার অঞ্চল অভিমুখে এগোতেলাগলেন।সময় পেলেই তিনি সেখানে যান। তাঁর গন্তব্য স্থল হল বাজারের সেই বিশেষ অঞ্চলটি-যেখানে খাঁচায় বন্দি করে রাখা নানা জাতের বন্য পাখি বিক্রি করা হয়।মানুষটা সেরকম পাখি বিক্রি করা একজন দোকানির সামনে গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং একসঙ্গে বেশ কয়েকটি পাখি কিনে নিলেন।পাখিগুলি কিনে নিয়ে তিনি কী করলেন?এক এক করে খাঁচার দরজা খুলে তিনি পাখিগুলিকে মুক্ত করে দিলেন।বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে পাখিগুলি যখন মনের আনন্দে মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াতে লাগল ,তখন মানুষটা আত্মহারা হয়ে অনেকক্ষণ সেই দৃশ্যটা দেখতে লাগলেন।তাঁর দেবতার মতো সুন্দর মুখ স্বর্গীয় আনন্দের হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।

ইউরোপের নবজাগরণটা কী ঘটনা ছিল সেকথা এক কথায় বোঝাতে গিয়ে একজন পন্ডিত এই ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন।নব-জাগরণের আগে পর্যন্ত ইউরোপের মানুষের ভাবনা-চিন্তা এবং আশা-আকাঙ্খা ও ছিল খাঁচায় বন্দি করে রাখা পাখির মতো।রেনেসাঁ তথা নব-জাগরণের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এটাই যে এটা ইউরোপীয় মানসকে মধ্যযুগের দাসত্ব-বন্ধন থেকে মুক্ত করে ইউরোপীয় সভ্যতা এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করল।বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া পাখির মতো ইউরোপের মানুষও মুক্তির উল্লাসে নেচে-গেয়ে নিজের প্রতিভার সর্বাঙ্গীণ বিকাশের  জন্য নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র খুঁজে বের করতে লাগল। 

মধ্যযুগের দাসত্ব-বন্ধন কী ছিল সে কথা পরেবিস্তৃতভাবেবলা হবে। কিন্তু তার আগে ওপরে বলে আসা কথাটার আসল তাৎপর্য এবং কিছুটা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে।


আরো পড়ুন: আধুনিক যুগের জন্ম কাহিনি (পর্ব -২)। হোমেন বরগোহাঞি


ইতিহাসের প্রতিটি যুগই কিছু মহৎ প্রতিভাশালী মানুষের জন্ম দান করে।কিন্তু তার আগে সেই বিশেষ যুগটির প্রতিনিধি-স্থানীয় মানুষ বলে ধরা হয়,কারণ তাঁদের  চিন্তা এবং কর্মের মধ্যে সেই যুগের ধ্যান-ধারণা ,আশা-আকাঙ্খা এবং জীবনের আদর্শ প্রতিফলিত হয়।ইউরোপের নব-জাগরণের যুগের আদর্শ ছিল ‘পূর্ণ মানব’সৃষ্টি করা।মধ্যযুগে মানুষকে ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হত না। মানুষ ছিল সমাজের একজন সদস্য মাত্র,আর সমাজ যা ভাবে বা যা করে ,তাকে তাই করতে বা বাধ্য করা হত।সেই সময়ে মানুষের জীবনটা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাইবেল এবং গির্জার দ্বারা পরিচালিত হত। বাইবেল এবং গির্জা মানুষকে এই শিক্ষা দিয়েছিল যে এই পৃ্থিবীটামানূষের অস্থায়ী বিশ্রামের জায়গা মাত্র,আসলে মৃত্যুর পরে মানুষের জন্য অনন্ত জীবন অপেক্ষা করে আছে।এই ধরনের শিক্ষা পাওয়ার ফলে মানুষ পার্থিব উন্নতি এবং পার্থিব সুখ-সম্ভোগের জন্য চেষ্টা করাটা অনুচিত এবং অদরকারি কার্য বলে মনে করত,সে এই পৃ্থিবীটার দিকে পিঠ দেখিয়ে সব সময় কেবল পরকালের চিন্তায় ব্যস্ত ছিল। কোনো বিষয়েই প্রশ্ন করার তার অধিকার ছিল না, কারণ তাকে বলা হয়েছিল যে তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর চিরকালের জন্য ধর্ম শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ হয়ে রয়েছে। এখন যদি মানুষ ভাবে যে তার জীবনটা অর্থহীন, আর কোনো বিষয়েই তার কোনো প্রশ্ন করার অধিকার নেই, তাহলে সেরকম মানুষের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব বলে কোনো একটা জিনিস গড়ে উঠতে পারে না। এর কারণ দুটি। প্রথমত পার্থিব উন্নতির জন্য চেষ্টা না করার ফলে তার সহজাতবুদ্ধিবৃত্তি এবং প্রতিভার পূর্ণবিকাশ ঘটে না। দ্বিতীয়তঃ সমাজের সমস্ত মানুষই একই কথা ভাবা এবং একই কার্য করার ফলে একে অপর থেকে আলাদাভাবেচেনার কোনো উপায় থাকে না। কিন্তু ইউরোপের নবজাগরণ এই সমস্ত কিছু পরিবর্তিত করে ফেলল। কীভাবে করল সে কথা পরের একটি অধ্যায়ে   বিস্তৃতভাবে বলা হবে। অন্যান্য অনেক কথার সঙ্গে নবজাগরণ ইউরোপের মানুষকে এই শিক্ষা দিল যে প্রতিটি মানুষের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার এবং সমস্ত বিষয়ে প্রশ্ন করার অধিকার আছে;অর্থাৎ সমস্ত কথায় অন্যের কর্তৃত্ব মেনে চলার কোনো প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয়তঃ, এই পৃথিবীটাই হল   মানুষের আসল বাসভূমি; মানুষকে সমস্ত সুখ, আনন্দ আর জ্ঞানের অভিজ্ঞতা এই পৃথিবী থেকেই আহরণ করতে হবে। অবশ্য এই শিক্ষা নবজাগরণের যুগের ইউরোপের নিজস্ব আবিষ্কার নয়; তারা এই শিক্ষা পেয়েছিল প্রাচীন গ্ৰিকদের কাছ থেকে। সে যাই হোক না কেন, এই শিক্ষা পেয়ে ইউরোপের মানুষ বুঝতে পারল যে মানুষ কেবল সমাজের সদস্য মাত্র নয় নিজের ধ্যান ধারনা আশা আকাঙ্ক্ষা এবং বিচার বুদ্ধি এই সমস্ত কিছুকে নিয়ে তিনি একজন অদ্বিতীয় ব্যক্তি। আর এই ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ হল জীবনের একটি প্রধান লক্ষ্য। দ্বিতীয়তঃ এই অপরূপ ঐশ্বর্য-মন্ডিত পৃথিবীটাই মানুষের প্রকৃত বাসভূমি, আর এই পার্থিব জীবনেই সমস্ত ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করার জন্য মানুষের জন্মগত অধিকার আছে। এই দুটি শিক্ষা পাওয়ার ফলে নবজাগরণের যুগের ইউরোপের মানুষ মানব প্রতিভার সর্বাঙ্গীণ বিকাশের ওপরে বিশেষ গুরুত্ব দিতে লাগল। মানুষ কেবল মানুষ হলেই হবে না। তাকে হতে হবে সম্পূর্ণ মানুষ। উদাহরণস্বরূপ একজন মানুষ যদি দিনরাত কেবল শরীরচর্চায় ব্যস্ত থাকে, তাহলে সে মানসিক উৎকর্ষ মানুষকে দিতে পারা আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে। অন্যদিকে একজন মানুষ যদি কেবল গভীর বিষয়ের ধ্যানে বা দুরুহ জ্ঞান চর্চায় নিমগ্ন হয়ে থাকে, তাহলে সে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে পেতে পারা বিচিত্র অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হবে। জীব মানুষ কেবল শিল্পকলা এবং সঙ্গীত থেকে আনন্দ আহরণ করতে জানে, সে যুদ্ধবিদ্যা বা দুঃসাহসিক ভ্রমণের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সঙ্গে চিরকাল অপরিচিত হয়ে থাকবে। অন্যদিকে যে মানুষ বিজ্ঞান ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ের চর্চা করে না, সে একটি রমণীয় চিত্র বা একটি সুন্দর কবিতা দিতে পারা অনিবর্চনীয় আনন্দের কোনো আস্বাদ না পেয়েই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। তাই পার্থিব জীবন দিতে পারা সমস্ত সুখ এবং আনন্দ পেতে হলে মানুষ তার অন্তর্নিহিত বিচিত্র প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে একজন সম্পূর্ণ মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এটাই ছিল নবজাগরণের একটি মূল শিক্ষা। এই শিক্ষাকে শিরোধার্য করে লোকেরা কোনো একটি মাত্র বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার চেষ্টা না করে বিভিন্ন এবং বিচিত্র কর্মক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা প্রতিপন্ন করার জন্য প্রয়াস করত। উদাহরণস্বরূপ সেই যুগে রাজসভার একজন সভাসদ কেবল কূটনীতি বা যুদ্ধবিদ্যায় নিপুণ হলেই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হত না, যে হাতে নিপুণভাবেতরোয়াল চালিয়ে তিনি মানুষকে চমৎকৃত করতেন সেই একই হাতে তিনি একটি সুন্দর চতুর্দশপদী কবিতা রচনা করেও মানুষকে মুগ্ধ করতেন । যে মানুষ গ্রিক এবং ল্যাটিন কবিতা অনায়াসে মুখস্ত বলে যেতে পারতেন সেই একই মানুষযুদ্ধক্ষেত্রে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। ইউরোপের নবজাগরণের যুগে এই ধরনের অনেক অসাধারণ মানুষের জন্ম হয়েছিল তাদের ভেতরে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি –নবজাগরণের জীবন্ত প্রতিমূর্তি। 

উপরে যে দেবসদৃশ সুন্দর মানুষটিখাঁচায় বন্দী হয়ে থাকা পাখি গুলিকে মুক্ত করে দিয়ে বিমল আনন্দ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি হলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। পশুপাখিকে তিনি ভালোবাসতেন; ওদের কষ্ট বা বন্দিদশা তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তিনি খাঁচার পাখিগুলি কিনে নিয়ে মুক্ত করে দেওয়ার সেটাই ছিল প্রধান কারণ। কিন্তু ঐতিহাসিকরা তার এই কর্মের মধ্যে একটি প্রতীকী তাৎপর্য ও আবিষ্কার করেছে। নবজাগরণ ইউরোপের আত্মাকে মধ্যযুগের খাঁচা থেকে মুক্তি দিয়েছিল;সেই নবজাগরণের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বিমল আনন্দ পেতেন খাঁচায় বন্দী হয়ে থাকা পাখিগুলোকে মুক্তি দিয়ে। মুক্তিই ছিল নবজাগরণের মূল মন্ত্র। ইউরোপের নবজাগরণ মানুষের স্বাধীন চিন্তার পথ সুগম করে আধুনিক যুগের সূচনা করল।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত