irabotee.com,নারী তসলিমা নাসরিন

ইরাবতী প্রবন্ধ: পুংপুজো । তসলিমা নাসরিন

Reading Time: 4 minutes
পুরুষের মঙ্গল চেয়ে সিঁদুর খেলা, করবা চৌথ ঘটা করে পালন করছে নারী। পুরুষ কিন্তু নারীর মঙ্গলকামনায় কোনও ব্রতই পালন করে না। মেয়েরা নিজের অসম্মানের উৎসব পেয়ে খুব খুশি। লিখছেন তসলিমা নাসরিন।
সতীদাহ বন্ধ হয়েছে, কিন্তু নারীবিরোধী অনেক প্রথাই বেশ বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে ভারতীয় উপমহাদেশে। এ সব দূর করার কোনও উদ্যোগ তো নেওয়া হচ্ছেই না, বরং আরও ঘটা করে পালন করার ব্যবস্থা হচ্ছে, আরও জাঁকালো উৎসব হচ্ছে এ সবের। কিছু দিন আগেই বাঙালি বিবাহিত মেয়েদের ‘সিঁদুর খেলা’ হল। দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের দিন পরস্পরের মাথায় মুখে গালে কপালে চিবুকে নাকে কানে সিঁদুর মাখামাখি চলল। সিঁদুর খেলার একটিই উদ্দেশ্য, স্বামীর দীর্ঘায়ু। বিধবা আর অবিবাহিতদের জন্য সিঁদুর খেলা বারণ। বারণ, কারণ তাদের স্বামী নেই! মাথায় তাদের সিঁদুর ওঠেনি, অথবা সিঁদুর মুছে ফেলা হয়েছে।
দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিয়ে করার পর এক জনের শরীরে শাঁখা সিঁদুর পলা লোহার উপদ্রব চাপানো হয়, আর এক জনের শরীর আক্ষরিক অর্থে রয়ে যায় যেমন ছিল তেমন। কেউ কি এই প্রশ্নটি করে: যে কারণে বিবাহিত মেয়েরা শাঁখা সিঁদুর পলা লোহা পরছে, সেই একই কারণে কেন বিবাহিত পুরুষেরা শাঁখা সিঁদুর লোহা পরছে না? অথবা যে কারণে বিবাহিত পুরুষেরা শাঁখা সিঁদুর পলা লোহা পরছে না, সেই একই কারণে কেন বিবাহিত মেয়েরা ও সব পরা থেকে বিরত থাকছে না?
 
সাফ কথা হল, পুরুষ বিশ্বাস করে এবং নারীকেও বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সব চেয়ে মূল্যবান বস্তুটি— মানুষ প্রজাতির মধ্যে পুরুষ নামক যে প্রাণীটি আছে, তার উরুসন্ধিতে দুই বা তিন বা চার ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের যে লিঙ্গটি ঝুলে থাকে— সেটি। সেটি যাদের আছে, তাদের গায়ে কোনও উপদ্রব চাপাতে হয় না! তাদের জীবনসঙ্গী বা স্ত্রীটির সুস্থ থাকার জন্য, তার পরমায়ুর জন্য, তার ধনদৌলত লাভের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করার কোনও আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হয় না, স্ত্রীর মঙ্গলকামনায় তাদের দিনভর উপোস করতে হয় না, সিঁদুর খেলতে হয় না! পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতি দিন সকাল সন্ধে যে পুজোটি চলে, সে পুংলিঙ্গ পুজো। পুরুষেরা সমাজের ঈশ্বর, মহাশক্তিমান, মহাক্ষমতাবান, পুরুষেরা নারীর প্রভু, অভিভাবক, কর্তা, দেবতা। পুরুষের আরও ক্ষমতা, আরও প্রভাব, প্রতাপ এবং প্রাচুর্য বৃদ্ধির জন্য, পুরুষের দীর্ঘ জীবন এবং অমরত্বের জন্য, নারীদের, দুর্বলদের, দুর্ভাগাদের, দলিতদের, নির্যাতিত, নিপীড়িতদের উপোস করতে হয়, প্রার্থনা করতে হয়। পুরুষের মঙ্গলকামনায় ভাইফোঁটা, শিবরাত্রি, রাখি, শ্রাবণ সোমবার কত কিছুই সারা বছর পালন করছে নারীরা!
নারী শিক্ষিত হচ্ছে, এমনকী স্বনির্ভর হচ্ছে, স্বামীর ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা অনেকের প্রায় নেই বললেই চলে, স্বামী ছাড়া চলবে না— এমন কোনও ব্যাপারই নেই, এমন নারীও পুরুষতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থাগুলো দিব্যি মাথা পেতে মেনে নিচ্ছে। কেউ প্রশ্ন করছে না, বিয়ের পর কেন নারীর পদবি পালটাতে হবে, পুরুষের নয়? কেন নারীকে শ্বশুরবাড়িতে বাস করতে হবে, কেন স্ত্রীর মতো পুরুষের কর্তব্য নয় শ্বশুরবাড়িতে বাস করা আর শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা? পণের নিয়ম যদি মানতেই হয়, শুধু স্ত্রী কেন স্বামীকে দেয়, স্বামী কেন স্ত্রীকে পণ দেয় না?
ভারতবর্ষের বেশ কিছু রাজ্যের বিবাহিত মেয়েরা ‘করবা চৌথ’ পালন করে। এই উৎসবটা মূলত— স্বামী দীর্ঘজীবী হোক, অনন্ত কাল বেঁচে থাকুক, স্বামীর অসুখ-বিসুখ না হোক, দুর্ঘটনা না ঘটুক, আমাদের যা-ইচ্ছে-তাই হোক, আমাদের সুস্থতা গোল্লায় যাক, আমাদের দীর্ঘ জীবনের বারোটা বাজুক-এর উৎসব। সূর্যোদয় থেকে চন্দ্রোদয় অবধি স্বামীর সুস্বাস্থ্যের জন্য উপোস। চাঁদ দেখবে তবে জলস্পর্শ করবে লক্ষ লক্ষ পতিব্রতা স্ত্রী। এটিও ওই পুংপুজো। এই সব আচার-অনুষ্ঠানের একটিই সার কথা: সংসারে স্ত্রীর নয়, স্বামীর জীবনটি মূল্যবান।
লক্ষ করার, দরিদ্র অশিক্ষিত পরনির্ভর মেয়েরা নয়, পুরুষতান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠানগুলো বেশির ভাগই পালন করছে উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত শ্রেণির শিক্ষিত স্বনির্ভর মেয়েরা। এই মেয়েরাই কিন্তু আজকাল ধর্ষণ এবং অন্যান্য নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে খুব সরব, কিন্তু সিঁদুর খেলা বা করবা চৌথ পালন করছে রীতিমত উৎসব করে। ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, করবা চৌথ, সিঁদুর খেলা— সবই পুরুষতন্ত্রের নারীবিরোধী উপসর্গ।
নারীবিরোধী এ সব অনুষ্ঠান নিয়ে তুমুল বাণিজ্যও হচ্ছে। করবা চৌথ-এর চোখধাঁধানো উৎসব এখন সিনেমায়, থিয়েটারে, টিভি সিরিয়ালে। বিজ্ঞাপনে পুরুষতান্ত্রিক আচারাদিতে অলংকৃত লাস্যময়ী নারীদের ঝলমলে দৃশ্য। যে মেয়েরা দূর থেকে দেখে এ সব, দুঃখ-দুর্দশার জীবন যাদের, তাদের ইচ্ছে হয় ওই সাজগোজ করা ফর্সা ফর্সা সুখী সুখী মেয়েদের মতো উৎসব করতে। তারাও এক সময় ফাঁদে পা দেয়, বাণিজ্যের ফাঁদে। শাড়ি গয়না কেনার ফাঁদ। এমনিতেই এই সমাজ মেয়েদের পণ্য বলে ভাবে। পুংপুজোর আচারে অংশ নিয়ে মেয়েরা নিজেদের আরও বড় পণ্য করে তোলে। এ সব করে যত বেশি পুরুষকে মূল্যবান করে মেয়েরা, তত বেশি নিজেদের মূল্যহীন করে। পুরুষতান্ত্রিক অসভ্যতাকে, অসাম্যকে, লিঙ্গবৈষম্যকে, নারী-বিদ্বেষকে, নোংরামোকে কেবল সহনীয় নয়, আদরণীয় আর আকর্ষণীয় করার পাঁয়তারা চলছে চার দিকে। যে সব রাজ্যে করবা চৌথ পালন করা হত না, এখন সে সব রাজ্যেও পালন হয়। পুরুষতন্ত্র বড্ড সংক্রামক।
পুং-রা যে সমাজে প্রতি দিন বধূহত্যা করছে, বধূনির্যাতন করছে, ধর্ষণ করছে, গণধর্ষণ করছে, কন্যাশিশু হত্যা করছে, সেই সমাজে আড়ম্বর করে মেয়েরাই পুংপুজো করছে। এমন চলতে থাকলে, পুং-দের বোধোদয় কি আদৌ ঘটবে কোনও দিন? পুং-আধিপত্যবাদের কৌশল শিখে বেড়ে ওঠা পুরুষেরা কি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারবে যা শিখেছে সব?
এই সমাজে সমানাধিকারের কোনও চর্চাই নেই নারী পুরুষের সম্পর্কে। পুরুষ মনে করে তার পুরুষত্ব খানিকটা খসে গেলে বুঝি অপমান হবে তার, নারী মনে করছে তার নারীত্ব কিছুটা কমে গেলে রক্ষে নেই। এক-এক জন প্রাণপণে বজায় রাখতে চায় পুরুষ আর নারীর জন্য সমাজের বানানো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যদি ধরেই নিই পুরুষের ভেতর তথাকথিত এই পুরুষত্ব আর নারীর ভেতর তথাকথিত এই নারীত্ব আছে, তবে নিশ্চয় করে বলতে পারি, পুরুষের ভেতর যা আছে তার একশো ভাগই পুরুষত্ব, নারীর ভেতর যা আছে তার একশো ভাগই নারীত্ব— এ সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। সমাজ চোখ রাঙায় বলে পুরুষ প্রকাশ করতে চাইছে না তার ভেতরে যেটুকু নারীত্ব আছে সেটুকু। নারীকে প্রকাশ করতে বাধা দেওয়া হয় তার ভেতরের পুরুষত্বটুকু। যদি সমাজের বাধা না থাকত, যদি সবাই সত্যি সত্যি খুলে মেলে ধরতে পারত নিজেদের সত্যিকার চরিত্র, তা হলে সমতা আসত সম্পর্কে। পুরুষও কাঁদত, শিশু পালন করত, ভালবাসার মানুষকে রেঁধে খাওয়াত। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যে মাথার ওপর বসে খবরদারি করছে। পুরুষকে শুধু নৃশংসতা করে যেতে হবে, নারীকে শুধু সর্বংসহার মতো সয়ে যেতে হবে। যতই যা হোক, নারী কিন্তু প্রমাণ করেছে পুরুষ যা পারে নারীও তা পারে। নারী পুরুষের মতো পাহাড়ের চুড়োয় উঠতে পারে, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে বাণিজ্য করতে যেতে পারে। পুরুষ কিন্তু আজও প্রমাণ করতে পারছে না নারী যা পারে, তা পুরুষও পারে। ঘরদোর সাফ করা, ঘরের রান্নাবান্না করা, শিশুর লালন পালন— এ সব এখনও করছে না পুরুষেরা। যত দিন না করবে, তত দিন এ কথা বলার উপায় নেই যে সংসারে বৈষম্য নেই।
যত দিন সমাজে পুরুষতন্ত্র টিকে আছে, তত দিন এই সমাজ কাউকে সমতার আর সমানাধিকারের দিকে হাত বাড়াতে দেবে না। একের অধীনতা ও অন্যের আধিপত্য ঘোচাতে হলে যেমন আধিপত্যতন্ত্রটাকেই নির্মূল করতে হয়, নারী ও পুরুষের বৈষম্য ঘোচাতে হলে পুরুষতন্ত্রকেও নির্মূল করা প্রয়োজন। ‘পণপ্রথা বন্ধ করো’, ‘ধর্ষণ বন্ধ করো’ বলে সারা বছর চেঁচালেও এ সব উপসর্গ কখনও উবে যাবে না। যত দিন রোগটা আছে, উপসর্গগুলো ঘাপটি মেরে থেকেই যাবে। রোগটা সারাতে হবে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>